ধুলো মাখা গলিতে

পর্ব - ১৩

🟢

এক সপ্তাহ পর……

গতকালই ইমদাদকে চিকিৎসার জন্য ঢাকার হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছে। নিজের শহরের হসপিটালে যখন ভর্তি ছিল তখন একবার শুধু কলির সাথে অল্প একটু কথা বলতে পেরেছিল। বেশিরভাগ সময়ে জ্ঞানই ছিলো না। যতটুকু সময় জ্ঞান ছিল ডাক্তার কথা বলার জন্য কাউকে তেমন একটা অনুমতি দেয়নি। দু একবার শুধু ইমদাদের মা দেখা করেছিল। কলি একবারই সুযোগ পেয়েছিল দেখা করার।

ইমদাদ খুব কষ্টে চোখ দুটো মেলে শুধু দেখেছিল কলি দাঁড়িয়ে থেকে কাঁদছে। ইমদাদের সবার প্রথমে চোখ গিয়েছিল কলির কপালে, যেখানে একটা কা'টা দাগ দেখা যাচ্ছিলো। নিজের অসুস্থতার কথা ভুলে গিয়েছিল তখন ইমদাদ। নিজের শারীরিক দুর্বলতার কথাও ভুলে গিয়েছিল।

কম্পিত হাতটা তুলে কলির কপালে কা'টা জায়গাটার দিকে ইশারায় দেখিয়ে দুর্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল,

“তোর বাপ মে’রে’ছে তোকে আবার?”

কলি ক্রন্দনরত অবস্থায় দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর দিয়েছিলো, তবে ইমদাদ বিশ্বাস করেনি। আর একবার কলিকে ভরসা দিয়ে বলেছিল,

“আমাকে একবার সুস্থ হতে দে, তোকে নিয়ে আসবো আমি ওখান থেকে। আর তোর বাপকে বুঝিয়ে দেবো কার বউয়ের গায়ে হাত দিয়েছিল।”

কলি তখন ইমদাদের কথার প্রেক্ষিতে কিছু বলতে পারেনি, শুধু কেঁদেছে। ইমদাদের সক্ষমতাও ছিল না যে একটু উঠে বসে কলির চোখের জল টুকু মুছে দেবে। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে কলি কে ওই জা'হা'ন্না'ম থেকে মুক্তি দেবে। আর কলিকে কখনো কাঁদতে দেবে না।

সেখানে ইমদাদের শারীরিক অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। এক্সিডেন্টকালীন সময়ে ইমদাদ হেলমেট পরে না থাকায় সব থেকে বেশি আঘাতটা মাথায় পেয়েছিল। বাইরে থেকে সে আঘাতের তীব্রতা খুব একটা বেশি বোঝা যায়নি। ডাক্তার জানিয়েছিলো ইন্টারনাল ড্যামেজ হয়েছিল। ধীরে ধীরে মস্তিষ্কে রক্ত জমেছে। যেটা এখন দ্রুততার সাথে অপারেশন করতে হবে। সেজন্য ইমদাদকে তাড়াহুড়ো করে ঢাকায় আনা হয়েছে।

তবে অবাক করার বিষয় হলো ইমদাদকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে অথচ কলি কিছু জানে না। কেউ একটা খবরও দেয়নি কলিকে। কলি ভেবেছিল সাঈদের থেকে সব খবর পেয়ে যাবে, তবে এই খবরটা তো সাঈদ নিজেও জানতো না। ইমদাদের বাবা নিজেই সব সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবস্থা করে ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় চলে গিয়েছেন। আর ইমদাদের মা কোন কিছু জানানোর মতো অবস্থাতেই নেই।

তবে কলি সাঈদের থেকে খবর পেয়েছে আজ ইমদাদের অপারেশন হবে। ইমদাদ নাকি নিজেই মুখ ফুটে একবার কলিকে দেখতে চেয়েছে। সাঈদ কে অনুরোধ করেছে যেন যে করেই হোক কলিক একবার নিয়ে আসে।

কলির কানে সে খবরটা পৌঁছালো। কলি সাহস করে করিম সাহেবকে কথাটা বলল যে ও ঢাকা যেতে চায়। সঙ্গে সঙ্গে করিম সাহেব একটা চ'ড় বসালেন ওর গালে। সেই সাথে শাসিয়ে বললেন যে যদি কলি বাড়ির বাইরে পা রাখে, তবে আর কোনদিন এই বাড়িতে ফিরতে পারবে না।

কলির মনের মধ্যে একটু হলেও আশা ছিল যে এমন একটা পরিস্থিতিতে হয়তো করিম সাহেব ওকে যেতে দেবে। তবে না, তেমনটা হলো না। উল্টো কলিকে মা’র খেতে হলো। শুধু মা’র খাওয়া অব্দি থেমে থাকলো না বিষয়টা। রোজিনা বিভিন্ন আজেবাজে কথা বলতে শুরু করলো, কলির চরিত্রের উপর প্রশ্ন তুলতে থাকলো।

অনেক কিছু ভাবনা চিন্তা করে কলির মনে হলো এতদিন যাবৎ ওর কাছে এই বাড়িটা জা'হা'ন্না'মের মতন ছিল, আজ যদি বাড়ির বাইরে পা রাখে তবেও জা'হা'ন্না'মই হবে। এতদিন মা'র খেয়েছে, এখনো নাহয় মা'র খাবে। কোন কিছুই বদলাবে না। তাই বলে কলি ইমদাদের কথা রাখবে না এটা হতে পারে না।

নিজের বাবার থেকে অনুমতির অপেক্ষায় রইলো না। নিজে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা জানানোরও প্রয়োজন মনে করল না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে ধরলে পিছন থেকে করিম সাহেব গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

“যেখানেই যাচ্ছো যাও, তবে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসো।”

কলি থামল, তবে পিছন ফিরে তাকালো না। নিজেও পাল্টা গম্ভীর গলায় করিম সাহেব কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ইমদাদ ভাই যখন আমায় ডেকেছে তখন আমি যাবই। আর যখন আমার ইচ্ছে হবে তখনই আমি বাড়ি ফিরব। তোমার সন্তান আমি, এই বাড়িতে থাকার পূর্ণ অধিকার আছে আমার। আর আমি এখন প্রাপ্তবয়স্ক। আমার যা ইচ্ছে আমি তাই করতে পারি। যদি তোমরা বেশি বাড়াবাড়ি করেছো সোজা থানায় গিয়ে কেস করে দেবো তোমার আর তোমার দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে। আর আমার মায়ের মৃত্যুর রহস্য কিন্তু তখন বেরিয়ে ঠিকই আসবে বাবা।”

কথাটা বলে কলি আর সেখানে অপেক্ষা করলো না, বেরিয়ে গেল। করিম সাহেব হা করে মেয়ের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলেন। তার বিশ্বাসই হলো না যে এই কথাগুলো তার মেয়ে বলে গেল।

রোজিনা একটুও আটকানোর চেষ্টা করলো না, বরং তিনি মনে মনে খুশি হলেন কলির এই অবাধ্যতার কারণে। কেননা তিনি জানেন কলি বাড়ি ফিরে আসার পরও ঢুকতে দেবে না। ভালোই হবে। উনি একা একা থাকবে।

কলি বাড়ি থেকে বলে তো বের হলো যে ইমদাদের কথা রাখবে, তবে কি করে ঢাকা যাবে বুঝে উঠতে পারল না। ঢাকা তো দূর এর আগে কখনো এই শহরের বাইরেও পা রাখেনি। তাও নাহয় চিনে চিনে ঠিক চলে যেত, তবে টাকা নেই কলির কাছে। যতটুকু টাকা আছে বাসস্টান্ড অব্দিও যেতে পারবে না।

কলির মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলো। হঠাৎ করে মস্তিষ্কে সাঈদের নাম এলো। ভাবলো এখন শেষ ভরসা সাঈদ। সাঈদ তো বলেছিল ও ঢাকা যাবে। তাহলে ওর সাথে যাওয়া যাবে।

কোনরকম কোন সময় ব্যায় না করে কলি সাহায্যের জন্য সাঈদের কাছে গেল। সাঈদ ফিরিয়ে দিলো না কলিকে। সাঈদ রওনাই হচ্ছিল ঢাকার জন্য। আর কিছু সময় পরে গেলে হয়তো কলি সাঈদের দেখাও পেত না। ভাগ্য সহায় হয়েছে সেদিক থেকে বলতে গেলে। সাঈদের সাথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো কলি।

__________

ভালোবাসা সত্যিই কি অদ্ভুত তাই না! এইতো একটু আগে অবধি ইমদাদ চোখ দুটো ঠিক ভাবে খুলে রাখতে পারছিলো না, কথা বলার কোন ইচ্ছে শক্তিও ছিল না। তবে যেই না কলিকে দেখলো অমনি ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। কে জানে কলিকে দেখে শরীরে শক্তি পেলো নাকি নিজের উপরে জুলুম চালিয়ে হাসলো। হয়তো কলি কে বুঝতে দিতে চাইছে না যে ইমদাদ ঠিক কতটা অসুস্থ সেজন্য।

তবে ইমদাদ আড়াল করতে চাইলেও কলি ঠিকই বুঝে ফেলল যে ইমদাদের শরীরটা ঠিক কতটা খারাপ। কতটা কষ্ট হচ্ছে অনুভব করতে পারলো।

সাঈদের মনে হলো ওদেরকে একটু একা কথা বলতে দেওয়া উচিত। ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ইমদাদ তুই কথা বল কলির সাথে। কলির কথা হয়ে গেলে আমি আসবো।”

ইমদাদ দুর্বল কণ্ঠে বলল,

“কলি কি আদৌ কিছু বলতে পারবে? ওর তো দেখছি কান্নাই থামছে না।”

সাঈদ আর দাঁড়ালো না সেখান। সাঈদ সেখান থেকে চলে যেতেই ইমদাদ কলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোর বাপ তোকে আসতে দিল কলি? ওনার তো অনুমতি দেওয়ার কথা না।”

“দেয়নি তো অনুমতি। তুমি আমায় দেখা করতে বলেছো, সেখানে তুমি ভাবলে কি করে আমার বাবা অনুমতি না দিলে আমি আসবো না? ঠিক চলে আসতাম ইমদাদ ভাই। তোমার কথা কি আমি ফেলতে পারি?”

“কাজটা কিন্তু তুই ঠিক করিসনি। এখন আমি নেই, অবশ্য আমি ছিলামও না, তবে তাও তোর বাপের কথার অমান্য করে আসাটা ঠিক হয়নি। আমিও তোকে দেখতে চেয়ে ভুল করেছি। বাড়ি ফিরলে কি অবস্থা হবে ভাবতে পারছিস?”

“যা হওয়ার হবে। এত কিছু ভাবার মতন মন মানসিকতা আমার ছিল না। তোমার খবরটুকু কেউ একটু আমায় পৌঁছে দিচ্ছে না। আমার অবস্থাটা তুমি বুঝতে পারছো? তোমার পাশে থাকতেও পারছিনা আমি।”

ইমদাদ একটু ভাবুক হয়ে বলল,

“ঠিকই বলেছিস। তুই খুব অশান্তিতে আছিস। তোর কোন অধিকার নেই আমার উপরে তাই না? আমাদের সম্পর্কের কোন বৈধতা নেই, কোন নামও নেই তাই না?”

কথাটা বলে ইমদাদ নিজেই আনমনে একটু হাসলো। কলি ইমদাদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নিজে পাল্টা প্রশ্ন করলাো,

“আমাদের সংসার হবে তো ইমদাদ ভাই?”

ইমদাদ আলতো হেসে বলল,

“নিশ্চয়ই হবে। তুই বাড়ি গিয়ে নিজের চেহারার যত্ন নে। বিয়েতে কত ছবি তুলতে হবে আমাদের। তোকে কিন্তু মানাবে না আমার পাশে।”

কলি সন্দেহী গলায় বলল,

“সত্যি হবে তো আমাদের বিয়ে? তুমি আবার আমায় ফাঁকি দিয়ে চলে যাবে না তো? তোমার দেওয়া কথা রাখবে তো?”

“আমি তো চেষ্টা করবো কলি। তবে ধর যদি কথা রাখতে না পারি তুই যেন আবার সারাজীবন একলা কাটানোর সিদ্ধান্ত নেস না। নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু করিস।”

“তুমি পারবে আমার পাশে অন্য কাউকে দেখতে?”

বিজ্ঞাপন

“দেখার জন্য তো তখন আমি থাকবো না। যদি আমি আর না ফিরি তুই ভুলে যাস আমায় কলি। ভুলে যাস ইমদাদ নামের কেউ একজন ছিল, যে তোকে অসম্ভব ভালোবাসতো। যে তোর সাথে একটা ছোট্ট সংসার সাজাতে চেয়েছিল, তবে পারেনি।”

কলি রাগান্বিত গলায় বলল,

“তুমি এমনটা করতে পারো না। আমি কিন্তু সারা জীবন সবার কাছে তোমার পরিচয় দেব একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে। তুমি কি ভেবেছো তুমি তোমার কথা রাখবেনা আর আমি তোমায় তাও ভালোবেসে যাব? কখনো না। বরং আমি তোমায় ঘৃণা করবো। কোনদিন আর তোমায় নিয়ে ভাববো না।”

কলি হয়তো আরো কিছু বলতো তবে তার আগেই সাঈদ আবারও কেবিনে ঢুকে কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“একটু পর ডাক্তার আসবে কলি। অপারেশনের সময় প্রায় হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি কথা শেষ কর।”

কথাটা বলে সাঈদ আবারও বাইরে চলে গেল। কলি বুঝলো ওর যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। ইমদাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে ইমদাদের মাথায় হাত রাখল। কিছুক্ষণ মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

কলি নিজের কান্না নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। ওর গাল বেয়ে চোখের জল গুলো ইমদাদের মুখের উপরে পড়লো। ইমদাদ কাঁপা কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে কলির হাতটা নিজে হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,

“তুই এখন বাড়ি ফিরে যা। এখানে থেকে তোর আর কোন কাজ নেই। আর শোন, আজ তোর বাপ তো বেশি রেগে আছে। যদি দু একটা কথা বলে তাহলে কোন উত্তর দিবি না। চুপচাপ মুখ বুঝে সহ্য করে নিবি। আমার সুস্থ হতে বেশিদিন সময় লাগবে না। ইনশাল্লাহ, তাড়াতাড়ি তোর কাছে ফিরে যাবো।”

কলি পারল না নিজের কান্না আটকাতে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,

“আমি কিন্তু তোমার অপেক্ষায় থাকবো। তোমার দেওয়া শাড়ি, গয়না সবকিছু কিন্তু আমি আলমারিতে গুছিয়ে রেখেছি। তোমার জন্য কিন্তু আমি বউ সাজবো ইমদাদ ভাই। আমার জীবনটা তুমি বেরঙিন করে দিও না।”

ইমদাদ শুধু আলতো হাসলো। কলি চলে যেতে ধরলে ফের কলির হাত টেনে ধরে বলল,

“শোন কলি, জীবনে আমাদের প্রিয় মানুষগুলো আসবে যাবে এটাই নিয়ম, কিন্তু জীবনকে কখনো থামিয়ে রাখতে নেই। জীবনকে দ্বিতীয় সুযোগ দিতে হয়। আর একটা কথা সবসময় মনে রাখবি, ইমদাদ তোকে খুব ভালোবাসে। ইমদাদের মতন তোকে কেউ কখনো ভালোবাসতে পারবে না। ইমদাদ কলির জন্য হাসিমুখে নিজের জানটাও দিয়ে দিতে পারবে।”

কলির ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। কিছু বলতে চাইলো তবে ইমদাদ ওকে সেই সুযোগ দিল না। চলে যেতে বলল। কলি অনেকবার করে কিছু বলার চেষ্টা করলো, তবে ইমদাদ কোন মতেই কলি কে সেই সুযোগটা দিল না। কলি কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই সাঈদ ভিতরে এলো। একটা স্টুল টেনে নিয়ে ইমদাদের পাশে বসলো।

সাঈদ কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ইমদাদও বুঝলো সাঈদ বলার মতন কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। তাই ওকে তাড়াও দিলোনা। সময় দিল কথা খুঁজে বের করার জন্য। বেশ কিছুটা সময় নীরব থাকার পর সাঈদ বলে উঠলো,

“তাড়াতাড়ি সুস্থ হ। সামনে কিন্তু ম্যাচ আছে আমাদের। অসুস্থতার দোহাই দিয়ে বেঁচে যাবি সেসব কিন্তু হবে না। এই ম্যাচে আমি তোকে হারাবো। দেখিস তোকে কতগুলো গোল খাওয়াই।”

সাঈদের কথাটা শুনে ইমদাদ হেসে ফেলল। তবে হাসতে পারলো না সাঈদ। ইমদাদের হাসিটা দেখে সাঈদ কেঁদে ফেলল। ছোট বাচ্চাদের মতন কেঁদে উঠে বলল,

“তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি চল। তোকে ছাড়া ভালো লাগেনা। মনে হয় কি যেন একটা নেই। তাড়াতাড়ি ফিরে আয় ইমদাদ। তোকে ছাড়া আমরা অনেকগুলো মানুষ অচল।”

“এতদিনও তো আমি তোদের কাছে ছিলাম না। তখন তো জীবনটা ঠিক কেটে গেছে।”

“ছিলি তুই। ফোনে কথা হয়েছে রোজ নিয়ম করে। আমি জানতাম আমার যে কোন বিপদে একবার যদি আমার বন্ধুকে ডাকি ও ছুটে চলে আসবে আমায় সাহায্য করতে। আমার সারা জীবন তোকে লাগবে ইমদাদ। তোর পরামর্শ লাগবে, তোকে ঝগড়ার জন্য লাগবে, তোর সাথে খেলার জন্য তোকে লাগবে।”

ইমদাদ স্মিত হেসে বলল,

“কলিকে ঠিকভাবে বাড়ি পৌঁছে দিস। আর একটু খেয়াল রাখিস যেন ওর উপর বেশি রাগারাগি না করে।”

“আমি পারবো না খেয়াল রাখতে। তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে তোর বউয়ের খেয়াল রাখ।”

আর দু-একটা কথা হলো দুজনের মাঝে। সাঈদ তারপরে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। ইমদাদ যেমন কলির হাতটা টেনে ধরেছিল ঠিক সেই একইভাবে সাঈদের হাতটাও টেনে ধরল। সাঈদ থামলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ইমদাদ বলে উঠলো,

“যদি আমি আর না ফিরি তাহলে কলির দায়িত্ব নিয়ে নিস। আর যদি আমি ফিরি তাহলে তো নিতেই দেব না। আমি যদি কাউকে সব থেকে বেশি ভরসা করে থাকি সেটা তুই সাঈদ। আমার কলিকে ভালো রাখিস।”

_________

ইমদাদের কথা অনুযায়ী সাঈদ কলি কে নিয়ে এসেছে ওদের শহরে। কলির বিন্দুমাত্র আসার ইচ্ছে ছিল না, আর না ইচ্ছা ছিল সাঈদের ইমদাদকে ওই অবস্থায় ফেলে রেখে আসার।

বাস থেকে নেমে ঘড়িতে সময় দেখলো রাত দশটা বাজে। এত রাত হবে সেটা আগে থেকেই জানতো সাঈদ, তবে এখন চিন্তা বাড়লো। এত রাতে কলি কে বাড়িতে রেখে আসবে কি করে? একটা তুমুল ঝামেলা বেধে যাবে। এত রাতে ওদের দুজন কে একসাথে ফিরতে দেখলে পাড়ার লোকেরও মুখে খই ফুটবে। যার যা ইচ্ছে হবে বলবে।

একটু ভাবনা চিন্তা করে সাঈদ কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোকে না হয় আজ তোর খালার বাড়িতে রেখে আসি কলি। যতদিন না ইমদাদ ফিরছে তুই ওখানেই থাক।”

কলি আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না, আমার বাড়িতেই যাব। এভাবে লুকিয়ে তো থাকা যায় না। ইমদাদ ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য আমায় যা সহ্য করতে হয় আমি তাই করব। আমিও দেখতে চাই বাবা কি করতে পারে।অনেক সহ্য করেছি আর করতে পারবো না।”

সাঈদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওর ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলো ইমাদ কল করেছে। এক অনাকাঙ্ক্ষিত আশংকায় সাঈদের চোখ মুখ কালো হয়ে গেল।

কলিও ইমাদের নামটা দেখলো।একই ভাবে কলিও ভয় পেল। সাঈদ নিজেকে আর কলি কে বুঝ দেওয়ার জন্য বলল,

“আমরা ঠিক ভাবে পৌছেছি কিনা সেটা জানার জন্য বোধহয় কল করেছে। ইমদাদই হয়ত কল করিয়েছে। অপারেশন থেকে তো বের করার কথা।”

কলিও জোর করে নিজের মনকে বুঝ দিল। সাঈদ কলটা রিসিভ করে কিছু বলতে ধরেও থেমে গেল। অপর পাশ থেকে ইমাদ ওকে কিছু বলার সুযোগও দিলো না।

এদিকে সাঈদ কে চুপ করে থাকতে দেখে কলির অস্থিরতা বাড়লো। সমানে জিজ্ঞেস করতে লাগলো,

“কি বলছে ইমাদ? ঠিক আছে তো ইমদাদ ভাই? অপারেশন শেষ তো? জ্ঞান ফিরেছে? কথা বলতে পারছে এখন ইমদাদ ভাই?কবে ফিরবে?”

সাঈদ কলির প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। ফোনের অপর পাশে থাকা ইমাদকে উদ্দেশ্য করে শুধু “ঠিক আছে” বলে ফোনটা রেখে দিল।

সাঈদ ফোনটা রাখতেই কলি উদভ্রান্তের মতন সেই একই প্রশ্ন করতে থাকলো। তবে সাঈদ কোন উত্তর দিল না। এক পর্যায়ে গিয়ে কলি বিরক্ত হয়ে বলল,

“বাড়ি ফিরব না। চলো এখনই আবার ঢাকায় যাব। সাইদ ভাই চলো ঢাকায় যাব আমরা। তুমি শুনতে পারছো না আমার কথা? ইমদাদ ভাইয়ের কাছে যেতে হবে আমার।”

সাঈদ নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে কলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“ইমদাদ কে নিয়ে আসছে ওরা।”

“আসছে মানে? এত তাড়াতাড়ি তো ফেরার কথা না। তাহলে কি সুস্থ হয়ে গেছে ইমদাদ ভা নাকি আমার কথা খুব বেশি মনে পড়ছিল? তাহলে ইমদাদ ভাই যখন আসছে আমাদের বিয়েটা তো খুব তাড়াতাড়ি হবে তাই না? আমরা বরং কালই বিয়েটা করে নেব।”

সাঈদ খেয়াল করলো কলি হেসে হেসে কথাগুলো বলছে ঠিকই, তবে ওর চোখের কোণা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সাঈদ বুঝলো কলি নিজেও বুঝতে পারছে যে ওকে কি শুনতে হবে সাঈদের মুখ থেকে, তবে তারপরেও জোর করে পরিস্থিতিটা বদলানোর চেষ্টা করছে কলি।

কলি আরো অনেকক্ষণ পাগলামি করলো। কি সব যেন বলে গেল সাঈদের মাথায় সে সব কথা ঢুকলো না। অনেকটা সময় পর সাঈদ কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোর ইমদাদ ভাইয়ের লা’শ ঢুকবে পাড়াতে কলি, বিয়ে করবি কি করে?”

বিজ্ঞাপন
ধুলো মাখা গলিতে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক বাংলা উপন্যাস