ধুলো মাখা গলিতে

পর্ব - ১১

🟢

কলেজে যাওয়ার পথে সাঈদ কে আটকালেন ফরিদ সাহেব। ফরিদ সাহেব কে দেখেই সাঈদ একটা শুকনো ঢোক গিললো। বুঝতে বাকি রইলো না যে উনি এখন কি জিজ্ঞেস করবেন। তবে সাঈদ নিজে থেকে আগে আগে কিছু বলল না, অপেক্ষা করলো। কেননা যদি সাঈদের আন্দাজ ভুল হয়, আর ও ভুল করে আগে আগে কিছু বলে ফেলে তাহলে ওরই বিপদ বাড়বে।

খুব সুন্দর করে খুব মিষ্টি করে হেসে আগে ফরিদ সাহেব কে সালাম দিলো। ফরিদ সাহেব গম্ভীর গলায় সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,

“ইমদাদ কোথায়? তুমি নিশ্চয়ই জানো ইমদাদ কোথায় আছে এখন তাই না?”

ফরিদ সাহেবের কথাটা শুনে সাঈদ আকাশ থেকে পড়ার ভঙ্গিতে বলল,

“কি বলছেন চাচা এসব? আমি জানি না ইমদাদ কোথায়। আমি তো নিজেই আজ দুই মাস যাবত ওর খোঁজ করার চেষ্টা করছি। সেই যে দুমাস আগে ছুটিতে আসার পর চলে গেল, তারপর থেকে আমার ওর সাথে যোগাযোগ হয়নি।”

ফরিদ সাহেব মোটেও বিশ্বাস করলেন না সাঈদের কথাটা। সন্দেহী গলায় বললেন,

“আমায় বোকা বানাতে চাইছো? শোনো সাঈদ, আমি খুব ভালো করেই জানি যে ইমদাদের আর কারো সাথে যোগাযোগ থাকুক বা না থাকুক তোমার সাথে যোগাযোগ ঠিকই আছে। তাই ভালোয় ভালোয় বলে দাও ইমদাদ কোথায় আছে। পরে যদি আমি জানতে পারি যে তুমি মিথ্যে বলেছো তাহলে কিন্তু তোমার খবর আছে।”

সাঈদ নিষ্পাপ মুখ করে বলল,

“আমি সত্যিই জানিনা চাচা ইমদাদ কোথায়। আমি তো নিজেই খুব কষ্টে আছি। আমার ছোটবেলাকার বন্ধু, কতগুলো দিন হয়ে গেল দেখা-সাক্ষাৎ তো দূর কথা পর্যন্ত হয় না। আমার কি কম চিন্তা হচ্ছে বলুন? যদি আমি জানতাম তবে তো জানিয়ে দিতাম আপনাদেরকে। আমি ওকে বোঝাতাম যেন আপনাদের সাথে যোগাযোগ করে, কিন্তু আমি তো জানি না।”

ফরিদ সাহেব তাও বিশ্বাস করলেন না। আরো বেশ কিছুক্ষণ প্রশ্ন করলেন সাঈদ কে। খুব করে সাঈদের মুখ থেকে স্বীকার করাতে চাইলেন যে সাঈদ জানে ইমদাদ কোথায় আছে, তবে সাঈদ কোন মতেই কিছু বলল না। বারবার অস্বীকার করে গেল। এমন নিষ্পাপ ভঙ্গিতে বলল যে এক পর্যায়ে গিয়ে ফরিদ সাহেব নিজেও বিশ্বাস করতে বাধ্য হলেন। ফলস্বরূপ হাল ছেড়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন।

উনি সেখান থেকে চলে যেতেই সাঈদ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। আগে দেখে নিল ফরিদ সাহেব গিয়েছেন কিনা। উনি চলে যেতেই দৌড়ে একটা গলির মধ্যে চলে গেল সাঈদ। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ইমদাদের নাম্বারে ডায়াল করলো।

কয়েকবার রিং হতেই ইমদাদ ফোনটা রিসিভ করে ব্যস্ত গলায় বলল,

“তাড়াতাড়ি বল কি বলবি? কাজে আছি।”

সাঈদ ফিসফস করে কথা বলল। যেন মনে হচ্ছে ওর থেকে একটু দূরেই ফরিদ সাহেব দাঁড়িয়ে আছে, আর জোরে কথা বললেই উনি শুনতে পাবেন।

“তোর বাবা এসেছিল আমাকে জেরা করতে, যে আমি তোর খোঁজে জানি কিনা।”

ইমদাদের কাজের হাতটা থেমে গেল। আতঙ্কিত গলায় বলল,

“তুই বলে দিয়েছিস?”

“ধুর। আমায় কি তোর বোকা মনে হয়। আমি এমন নিষ্পাপ ভঙ্গিতে বলেছি যে আমি কিছু জানি না, চাচার মতন মানুষও বিশ্বাস করে নিয়েছে আমায়। তবে ভয় তো চাচিকে নিয়ে। আমার তো মনে হয়না চাচি আর বেশিদিন লুকিয়ে রাখতে পারবে। আর বাকি রইল কলি, ওকে চাচা জিজ্ঞেসই করবে না।”

ইমদাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“কথাটা ভুল বলিসনি। তবে যেহেতু মা দুটো মাস বাবার থেকে আড়াল করে কান্নাকাটি করতে পেরেছে, আশা করছি আরো কিছুদিন পারবে। অন্তত যতদিন না বাবার বোধ বুদ্ধি জাগ্রত হচ্ছে ততদিন ঠিক পারবে।”

________

রাতে অফিস থেকে ফিরেই আগে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো ইমদাদ। শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। আজ তিনদিন যাবত জ্বর নিয়েই অফিসে যেতে হচ্ছে।

ইমদাদের মাঝে মাঝে মনে হয় হঠাৎ করেই জীবনটা কতটা কঠিন হয়ে গেল। দায়িত্ববোধ মানুষকে কোথায় থেকে কোথায় নিয়ে যায় তাই না? আসলে কোন কাজের জন্য মানুষের নির্দিষ্ট একটা বয়স অবধি যেতে হয় না, পরিস্থিতি তাকে সেই বয়সের উপযোগী করে তোলে। তার মাঝে যদি একবার কর্তব্য জ্ঞান জাগ্রত হয় সে আসলে বড় হওয়ার জন্য বয়সের অপেক্ষা করে না।

পকেট থেকে ফোনটা বের করল। ফোনটা হাতে নিতেই দেখল ওর মায়ের নাম্বার থেকে বেশ অনেকগুলো মিসড কল উঠে আছে। পাঁচ বার কল করেছে আঁখি। হঠাৎ করে এতবার কল দেখে ইমদাদ একটু ঘাবড়ে গেল। লাফ দিয়ে সোয়া থেকে উঠে বসল। মাথাটা কাজ করা কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।

আঁখি তো এতবার কল দেয় না। আর উনি তো জানেন যে ইমদাদ কখন কথা বলতে পারবে, কখন কথা বলতে পারবে না। তবে এমন একটা সময় তাও এতবার বিরতিহীনভাবে কেন কল দিয়েছিলেন? বাড়িতে সব ঠিক আছে তো? ইমদাদের বাবা, মা, ভাইয়েরা, কলি সবাই ঠিক আছে তো? কোন বিপদ হলো না তো?

ইমদাদ সময় নষ্ট না করে তাড়াহুড়ো করে আঁখির নাম্বারে কল করলো। কয়েকবার রিং হতেই কলটা রিসিভ হলো। ফোনটা রিসিভ হওয়ার সাথে সাথে ইমদাদ শোনার প্রয়োজন মনে করলো না যে অপর পাশ থেকে কে কথা বলছে। বরং চিন্তিত গলায় বলে উঠলো,

“আম্মু সব ঠিক আছে তো বাড়িতে? তুমি তো এতবার কল দাও না অসময়ে। বাবা ঠিক আছে তো?”

ইমদাদ প্রশ্নটা করতেই অপর পাশ থেকে একটা পুরুষালি গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ইমদাদের কানে।

“তোমার বাবা ঠিক থাকলো কি থাকলো না সেই নিয়ে কি আদৌ তোমার কোন চিন্তা আছে? তুমি কি একবারও ভেবে দেখেছো একটা মেয়ের জন্য তুমি সন্তান হিসেবে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছো দিন দিন?”

প্রথমে ইমদাদ একটু চমকেছিল ফরিদ সাহেবের কণ্ঠস্বর শুনে। কিন্তু পর মুহুর্তে আবার নিজেকে স্বাভাবিক করলো। বুঝে গেল যে ওর মা আর লুকিয়ে রাখতে পারেনি ব্যাপারটা, ধরা পড়ে গেছে বোধহয়।

ফরিদ সাহেবের অভিমান মাখানো কথার প্রেক্ষিতে ইমদাদ নিজেও পাল্টা অভিমানী গলায় বলল,

“আমি তো আমার দায়িত্ব থেকে সরে আসতে চাইনি। আমি ভেবেছিলাম আমার বাবার কাছে আমার খুশি সবার আগে। আমার খুশির জন্য আমার বাবা নিজের সিদ্ধান্ত অনায়াসে বদলাতে পারে, কিন্তু সেটা তো ভুল ছিল তাই না বাবা? আমি সন্তান হিসেবে ব্যর্থ হতে চাইনি তবে তুমি আমাকে ব্যর্থ হতে বাধ্য করেছো।”

ফরিদ সাহেব এবারে বিস্ময়ের সুরে বললেন,

“একটা মেয়ের জন্য নিজের পরিবার, বাবা-মা, ভাই সবাইকে ছেড়ে দেবে? সবাইকে ভুলে যাবে শুধুমাত্র একটা মেয়ের জন্য? ওই মেয়ের কাছে আমরা সবাই পর হয়ে গেলাম?”

“সেটা তো আমি বলিনি বাবা। না আমি কলির থেকে তোমাদেরকে এগিয়ে রাখবো, না তোমাদের থেকে কলি কে এগিয়ে রাখবো। যদি কলি আমাকে কখনো বলে ওর জন্য তোমাদেরকে ছাড়তে হবে আমি তো তোমাদেরকে ছাড়বো না। তবে তোমাদের কথায় কেন কলিকে ছাড়বো? তোমরা তো আমার জন্য সমান। আর তুমি জানো তোমার ছেলে কারো কথায় কাজ করে না।”

ফরিদ সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় গম্ভীর গলায় বললেন,

“তার মানে ওই মেয়েকে বিয়ে করবে এটাই তোমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাই তো? আর যদি আমি এটা মেনে না নেই তবে আমি আমার ছেলেকে হারাবো?”

ইমদাদ একটু হেসে বলল,

“আম্মুকে কথা দিয়েছি তোমার অমতে বিয়ে করব না।আমি চাই সেই কথাটা যেন আমার ভাঙতে না হয়। তবে যদি কখনো দেখছি, যে আমি আমার সবটা দিয়ে চেষ্টা করার পরও তোমার মন জয় করতে পারলাম না তাহলে সেক্ষেত্রে আমার আম্মুকে দেওয়া কথাটা ভাঙতে হবে। কেননা আমি কলিকেও কিছু কথা দিয়েছি। তবে একটা কথা বাবা, যদি তুমি এই বিয়েতে মত না দাও তবে সত্যি আমাকে হারাবে। আমি হারিয়ে যাব চিরদিনের মত। তোমাদের সবার থেকে অনেক দূরে চলে যাবো। এইবারে তো মায়ের সাথে যোগাযোগ ছিল, তবে এবার আর সেটাও থাকবে না। এবারে তোমাদের সবার থেকে এতটা দূরে চলে যাবে যেন তোমরা চাইলেও কোনদিন আমার খোঁজ নিতে না পারো।”

বিজ্ঞাপন

“হুমকি দিচ্ছো আমায়?”

“যদি ধরেও নেই যে হুমকি দিচ্ছি, তবে একটা কথা মনে রেখো বাবা আমি ফাঁকা হুমকি দেই না। আমি যেটা বলি সেটাই করি। এত অশান্তির মাঝে আমি আর থাকতে পারবো না সেজন্য চলে যাব দূরে কোথাও।আমি আর কলিকে নিয়ে যদি তোমার এত অসুবিধা হয়, তবে আমরা থাকবো না তোমার আশেপাশে।”

ফরিদ সাহেব চুপ করে গেলেন। ফোনের অপর পাশে ইমদাদও চুপ করে গেল। বেশ কিছুটা সময় নীরবতা পালনের পর ফরিদ সাহেব নিজেই পুনরায় গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

“বাড়ি ফিরে এসো।”

“যদি তুমি আমার সিদ্ধান্ত মেনে না নাও, তবে আমার পক্ষে ওই বাড়িতে পা রাখা সম্ভব হবে না।”

ফরিদ সাহেব পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ গম্ভীর গলায় বললেন,

“যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে এসো, এটা আমার আদেশ। তোমার শর্ত তো এটাই ছিল যে তোমার সিদ্ধান্ত মেনে নিলে তুমি বাড়ি ফিরবে, তবে মেনে নিলাম তোমার সিদ্ধান্ত। বাড়ি ফিরে এসো।”

কথাটা বলে ফরিদ সাহেব কলটা কেটে দিলেন। কলটা কেটে দেওয়ার পরে ইমদাদ কিছুক্ষণ ফোনটা কানে ধরেই বসে রইল। বিশ্বাসই হতে চাইলো না যে ও যা শুনলো সেটা সত্যি কিনা। ইমদাদ ভেবেছিল ওকে হয়তো আরো কষ্ট করতে হবে, কিংবা এমনও হতে পারে শেষ পর্যন্ত হয়তো ফরিদ সাহেব মানবেনই না। তবে যাক ইমদাদের কষ্ট সার্থক হলো।

________

কলির উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। আর দুটো পরীক্ষা বাকি আছে। পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরে এসে ড্রয়িং রুমে পরিচিত কিছু মানুষকে বসে থাকতে দেখে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে গেল কলি। ইমদাদ ওর বাবা মাকে নিয়ে এখানে এসেছে, আর ওদের বিপরীত পাশের সোফায় বসে আছে কলির বাবা, আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কলির সৎ মা। মুখে ওনার কিঞ্চিত পরিমাণ হাসিও নেই। আবার উনি যে বিরক্ত সেটাও বোঝা যাচ্ছে না।

ইমদাদের পরিবারকে এখানে দেখে প্রচন্ড অবাক হয়েছে কলি। কলির মা বেঁচে থাকতে ইমদাদের মা মাঝে মাঝে এসেছে, তবে কলির মা মা’রা যাওয়ার পর উনিও আর আসেন না। বাকি রইল কলির বাবা। উনি জীবনেও কলিদের বাড়িতে পা রেখেছেন বলে কলির মনে পড়ে না। কখনো বোধহয় কোন দরকারও পরেনি, সেজন্য উনি আসেননি। ইমদাদ মাঝে মাঝে আসত, তবে সেটা দরকার। আর সেখানে আজ তিন জনই একসাথে এসেছে, তাও আবার কলির বাবা বেশ হাসিমুখেই কথা বলছে। এই ব্যাপারটা মোটেও ঠিক লাগলো না কলির কাছে।

“আন্টি, তোমরা এখানে?”

এতক্ষণে কেউ কলিকে খেয়াল করেনি। কলির কণ্ঠস্বরে সবার মনোযোগ গেল কলির উপরে। আঁখি কে কথাটা বলে কলি আড়চোখে একবার ইমদাদের দিকে তাকালো। দেখলো ইমদাদের মুখে মৃদু হাসি লেপ্টে আছে। কলি কে দেখে আঁখি হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,

“তোর অপেক্ষায় ছিলাম কলি। এখানে আয়, আমার পাশে বস।”

কলি চুপচাপ আঁখির পাশে বসতে নিলে রোজিনা বলে উঠলো,

“আগেই বসিস না কলি। একটু শাড়ি পরে সাজগোজ করে আয়। তোর বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে। যাক অবশেষে তবে তোর প্রেমিক বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এলো তোর জন্য। না হলে মাঝে তো আমি ভেবেছিলাম তোকে রেখে বোধহয় পালালো।”

কথাটা বলে রোজিনা ঠোঁট টিপে হাসলো। উনি যে খোঁচা দিয়ে কথাটা বললেন সেটা বুঝতে কারোরই বাকি রইল না। তবে ইমদাদ এখন রাগতেও পারল না। কেননা এখন যদি আবার রাগারাগি করে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যেতে পারে। অনেক কষ্টে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। আর কলি তো রোজিনা কে কখনোই কিছু বলে না। তবে রোজিনার কথাটা শুনে একটু অবাক হলো। ইমদাদ বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে, কই কলিতো কিছু জানতো না।

আঁখি হাত ধরে কলিকে টেনে নিজের পাশে বসালেন। আদুরে গলায় বললেন,

“এবার থেকে কিন্তু আর আমাকে আন্টি বলতে পারবি না। সম্পর্কটা কিন্তু আমাদের বদলে গেল কলি।”

কলি এবারও কোন উত্তর দিতে পারল না। এর মাঝেই ফরিদ সাহেব কলির বাবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“দেখো করিম, ছেলেমেয়ে আমাদের দুজনেরই এখনো অনেক ছোট। কারোরই পড়াশোনা শেষ হয়নি। আমি তাই চাইছি আপাতত আমাদের দুই পরিবারের মাঝে কথাটা হয়ে থাক যে ওদের বিয়ে হবে। তবে আমি এখনই বিয়েতে রাজি না। আগে ইমদাদ পড়াশোনাটা শেষ করুক, ভালো একটা চাকরি পাক, এদিকে কলিও পড়াশোনা করুক তারপরে আমরা ওদের বিয়ে নিয়ে ভাববো।”

ফরিদ সাহেবের কথার প্রেক্ষিতে কলির বাবা কিঞ্চিত গম্ভীর গলায় বললেন,

“আমিও এটাই ভাবছি। বিয়ে নিয়ে এত তাড়াতাড়ি তো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। আমার একটাই মেয়ে, যেখানে সেখানে তো আর ফেলে দিতে পারি না। আমায় একটু সময় দিন ভাবার জন্য। আমি ভেবে আপনাদেরকে সিদ্ধান্ত জানাচ্ছি।”

নিজের বাবার কথা শুনে কলি একটু ভয় পেল। এভাবে কেন বলল যে ভেবে সিদ্ধান্ত জানাবে। কলি তো জানে ওর বাবা ইমদাদের সাথে কখনো বিয়েটা দেবে না, তবে ইমদাদ কি ওর বাবাকে রাজি করানোর ব্যবস্থা করেনি।

কলি একবার তাকালো ইমদাদের দিকে। অমনি চোখাচোখি হলো দুজনের। ইমদাদও কলির দিকেই তাকিয়ে ছিল। চোখে চোখেই কথা হলো দুজনের। কলির চোখে চোখ রেখে ইমদাদ ওকে আশ্বস্ত করে বলল সব ব্যবস্থা করে রেখেছে, কলিকে কোন কিছু চিন্তা করতে হবে না। কলিও ইমদাদের চোখের ভাষা বুঝে আশ্বস্ত হলো।

আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা শেষে এবারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো। দুজনেরই বাবা-মা আগে আগে চলে গেল। ইমদাদ ইচ্ছে করে ওদের পেছনে রইল। সবাই বেরিয়ে যেতেই ইমদাদ কলির দিকে এগিয়ে গিয়ে ওকে আশ্বস্ত করে বলল,

“চিন্তা করিস না কলি, তোর বাবা রাজি আছে বিয়েতে। শুধু একটু ভাব দেখালো আমার বাপকে।”

কলি চিন্তিত গলায় বলল,

“কিন্তু ইমদাদ ভাই, বাবা তো আমার বিয়ে তোমার সাথে দিতে রাজি ছিল না। তোমার বাবাও তো রাজি ছিল না।কিভাবে কি হলো?”

“তোর বাপের সাথে আগেই কথা বলেছিলাম আমি যেন আমার পরিবার গেলে আজেবাজে ব্যবহার না করে। প্রথমে তো রাজি ছিলেন না, পরে আমায় বললেন তোকে বিয়ে দেবে কিন্তু টাকা-পয়সা, গয়না কিচ্ছু পাবো না আমি।”

কলি আতঙ্কিত গলায় বলল,

“আর তুমি কি বললে?”

“আমি বললাম এই বা'লগুলো আমার দরকার নেই। শুধু তোকে পেলেই চলবে। আর আমার বাপ রাজি হয়েছে এখানেও একটা শর্ত দিয়েছে। বাবা চায় আমাদের বিয়েটা পরে হোক। আগে আমি পড়াশোনা শেষ করে একটা ভালো চাকরি পাই তারপর বিয়ে দেবে।”

“তারমানে তো অনেক দেরি।”

ইমদাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“হ্যাঁ, অনেক দেরি। আসলে কলি, বাবা রাজি হয়েছে অনেক কষ্টে। বাবা যেহেতু আমার কথা শুনেছে, আমারও তো দায়িত্ব বাবার কথা শোনা। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আর জোর করতে পারিনি।”

কলি শঙ্কিত গলায় বলল,

“কয়েক বছর পরে তোমার মন বদলে যাবে না তো?”

ইমদাদ আলতো হেসে বলল,

“কয়েক মাস কেন, কয়েক যুগ পরেও আমার পছন্দ কেবল তুইই থাকবি।”

বিজ্ঞাপন
ধুলো মাখা গলিতে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক বাংলা উপন্যাস