সকালের নাস্তা শেষে ইমদাদ কলেজ যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ডাইনিং রুম পেরিয়ে সদর দরজা দিয়ে ঘর থেকে বেরোতে হয়। ডাইনিং রুমে তখন সকালের নাস্তা করছেন ইমদাদের বাবা ফরিদ সাহেব। ইমদাদ চলে যেতে ধরলে উনি খাওয়া থামিয়ে গম্ভীর গলায় ইমদাদকে একবার নাম ধরে ডাকলেন,
“ইমদাদ।”
দাঁড়ালো ইমদাদ। ফরিদ সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠস্বরটা শুনে ইমদাদ যেন কিছু একটা আন্দাজ করতে পারল। ওর মন বলল যে শুধু শুধু ওকে থামানো হয়নি, নিশ্চয় এমন কোন কথা এখন বলা হবে যেটা ইমদাদের মোটেই পছন্দ হবে না। তবে তারপরও আন্দাজের বসে ইমদাদ কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ফরিদ সাহেব কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“জ্বি বাবা বল।”
ফরিদ সাহেবের খাওয়া শেষ। প্লেটে হাত ধুঁয়ে চেয়ার থেকে উঠে চেয়ারের হাতলের সাথে রাখা গামছায় মুখ মুছে ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“মানুষের জীবনে ব্যর্থতা আসবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে সেই ব্যর্থতাকে ধরে বসে থাকলেই তো আমাদের চলবে না তাই না?”
ইমদাদ বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“আমি তো সেই ব্যর্থতা ধরে বসে নেই, পড়াশোনা করছি তো আমি। এমনটা তো নয় ব্যর্থতা ধরে বসে থেকে পড়াশোনা একেবারের জন্য ছেড়ে দিয়ে তোমার থেকে রিকশা কিনে নিয়ে রিকশা চালাচ্ছি।”
ছেলের কথায় ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেন ফরিদ সাহেব, তবে তিনি ধৈর্য ধরলেন। নিজের রাগ সংবরণ করলেন। কেননা তিনি জানেন এখন যদি তিনি রাগারাগি করেন, তবে তার ছেলে তার কোন কথা না শুনে সোজা বেরিয়ে যাবে। আর সেই ছেলে কখন ঘরে ফিরবে তার কোন ঠিক নেই।
“আমি চাই আমার ছেলের স্বপ্ন পূরণ হোক। যতদিন আমি বেঁচে আছি সে দায়িত্ব তো আমারই। আমি চাইনা আমার ছেলে জীবনে এমন কিছু করুক যেটা সে করতে চায় না। তাই আমি ঠিক করেছি তোমাকে বেসরকারি ভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি করাবো, ঢাকায়।”
“সে অনেক খরচের ব্যাপার বাবা। আমি চাইনা আমার পেছনে অযথা এত টাকা নষ্ট হোক। আমি এখানেই বেশ আছি।”
ফরিদ সাহেব এবার একটু গম্ভীর গলায় বললেন,
“তুমি বেশ আছো বললেই তো হবে না। আমি চাইনা তুমি আর এখানে থেকে পড়াশোনা করো। খুব শীঘ্রই ঢাকার কোন একটা ভালো ভার্সিটিতে তোমার পড়ানোর ব্যবস্থা করব। ওখানে তোমার চাচা থাকে, চাচার বাসায় থেকে পড়াশোনা করবে। আমি আর কোন কথা শুনতে চাই না। তুমি এখানে থাকবে না।”
ইমদাদের কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো ফরিদ সাহেবের শেষোক্ত লাইনটা শুনে। এখানে কেন থাকা যাবে না? কি হবে এখানে থাকলে? এ প্রশ্নগুলো বারবার ইমদাদের মাথায় ঘুরতে থাকলো। তবে কি ফরিদ সাহেবের হঠাৎ করে ওর ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার কথাটা বলা স্বাভাবিক না? তিনি কি বিশেষ কোনো কারণে আজ হঠাৎ করে এই কথাগুলো বললেন? এর আগেও এই কথাগুলো উঠেছে, ফরিদ সাহেব আগে থেকেই ইমদাদকে বেসরকারি ভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে চেয়েছিলেন, তবে ইমদাদ রাজি হয়নি। আর না তিনি কখনো জোর করেছেন। এক বাক্যে রাজি হয়ে গিয়েছেন, তবে আজ হঠাৎ করে কি হলো।
সন্দেহী দৃষ্টিতে ফরিদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
“আমি এখানে থাকলে কি সমস্যা? এতদিন তো কোনো সমস্যা হয়নি, তবে আজ হঠাৎ করে সমস্যার উদয় ঘটলো কেন?”
“আমি বলছি তাই। আমার কথাই কি তোমার জন্য যথেষ্ট না?”
“তুমি জানো বাবা যথেষ্ট না, অন্তত এই ব্যাপারটায় যথেষ্ট না। আমায় যথাযথ কারণ দেখাতে হবে। আর শুধু কারণ দেখালে হবে না, সেই কারণের ভালো দিক, খারাপ দিক সবটাই আমায় বোঝাতে হবে। তারপরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা আমি নেব যেহেতু জীবনটা আমার।”
এতক্ষণে নিয়ন্ত্রণ করা রাগটা ফরিদ সাহেব এবারে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। রাগে গর্জে উঠে বললেন,
“আমি খাওয়াবো, আমি পড়াবো আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে তোমার। মগের মুল্লুক পেয়েছো? হয় আমার কথামতো চলবে, নয়তো বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাবে।”
বাইরে থেকে এত চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়ে আঁখি ছুটে এলেন। ছেলের সাথে স্বামীকে এভাবে রেগে কথা বলতে দেখে আতঙ্কিত গলায় বললেন,
“কি হয়েছে? রাগারাগি করছ কেন?”
ফরিদ সাহেব পুনরায় রাগান্বিত গলায় বললেন,
“সেটা তোমার ছেলেকে জিজ্ঞেস করো। কেমন ছেলে মানুষ করেছো দেখো। ও বলে ওর জীবন ওর সিদ্ধান্ত মোতাবেক চলবে, আমার কোন মূল্য নেই।”
ইমদাদ যথাসম্ভব শান্ত গলায় বলল,
“তোমার যা বলার আমায় বলো বাবা। মাকে কিছু বলো না। কথা হচ্ছে আমার আর তোমার মাঝে অযথা মাকে দোষারোপ করছো কেন?”
“তোমার মাকেই তো দোষারোপ করতে হবে। ছেলেদের কেমন শিক্ষা দিয়েছে সেটা জানাতে হবে না।”
“আবার একা মায়ের শিক্ষার দোষ দিচ্ছো কেন? মায়ের শিক্ষার প্রতি যখন ভরসা ছিল না তবে তুমি কোথায় ছিলে?”
আঁখি এবার ধমক দিয়ে ছেলেকে থামিয়ে দিয়ে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“হয়েছেটা কি সেটা আমায় বলবে? দোষারোপ পরেও করা যাবে, কিন্তু কি কারণে দোষারোপ করছো সেটা আগে জানাও।”
“তোমার ছেলেকে স্পষ্ট করে একটা কথা জানিয়ে দাও, ওর আর এখানে থাকা হবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকায় ওর চাচার কাছে পাঠিয়ে দেবো। ওখানে থেকেই পড়াশোনা করবে।”
আঁখি নিজেও একটু চমকে উঠে বললেন,
“হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কেন? কই আমায় তো কিছু জানাওনি তুমি।”
ফরিদ সাহেবকে খেঁকিয়ে উঠে বললেন,
“সবকিছু তোমায় জানিয়ে করতে হবে? এখন কি তোমার আর তোমার ছেলের সিদ্ধান্ত মত আমি চলবো? ভুলে যেও না তোমরা আমার টাকায় চলো, আমার বাড়িতে থাকো, তাই তোমরা আমার সিদ্ধান্ত মত চলবে। আমি তোমাদের সিদ্ধান্ত মত চলব না।”
কথাটা বলে ফরিদ সাহেব নিজের ঘরে চলে গেলেন। উনি সেখান থেকে চলে যেতেই ইমদাদ কিঞ্চিৎ রাগী গলায় আঁখিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বাবার হঠাৎ করে কি হলো মা? নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে তাই না? সেটা তুমি জানো?”
আঁখি আমতা আমতা করে বলল,
“না, আমি জানিনা।”
“তাহলে তোঁতলাচ্ছো কেন? তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুমি মিথ্যে বলছো। সত্যি করে বলোতো কি হয়েছে? হঠাৎ করে আ'গু'নটা লাগালো কে?”
“তোর বাবা বোধহয় কাল রাতে কলির সাথে তোকে দেখে ছিল বাইরে কথা বলতে। কলি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তোরা কথা বলেছিলি কি?”
ইমদাদ মনে করার চেষ্টা করে বলল,
“হ্যাঁ কথা বলছিলাম, কিন্তু বাবা তো ছিল না তখন।”
“ছিল। তুই টের পাসনি। রাতে এই নিয়ে আমায় অনেক কথা শুনিয়েছে। সে সাথে বলেও দিয়েছে যেন কলি আর এই বাড়িতে না আসে ইকবালকে পড়ানোর জন্য। তোকে এ ব্যাপারে কিছু বলেনি কেননা জানে সরাসরি বলে তোকে থামাতে পারবেনা। সেজন্য এই রাস্তা বেছে নিয়েছে।”
ইমদাদ তৎক্ষনাত কোন উত্তর দিলো না। আপন মনে কিছুক্ষণ কি যেন ভাবল। ছেলের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে আঁখি প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কি ভাবছিস?”
“কিছু না। তুমি যাও কাজ করো।”
কথাটা বলে ইমদাদ চলে যেতে ধরলে আঁখি হাত টেনে ধরে চিন্তিত গলায় বলল,
“তুই কি ভাবলি? সত্যি করে আমার বল তোর মাথায় কি চলছে? আমাকে আর কথা শোনাস না বাবা।”
ইমদাদ আলতা হেসে নিজের মা কে আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করো না। আমি আছি না। আমি থাকতে তোমায় কে কথা শোনাবে? আমি যা করব ভেবেই করবো।”
ইমদাদ চলে যেতে নিয়ে আবারো থেমে গেল। আবারো আঁখির দিকে এগিয়ে এলো। আশপাশটা একবার ভালোভাবে দেখে নিলো কেউ আছে কিনা। কেউ নেই। তার পরেও ধীর গলায় আঁখি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আচ্ছা মা, কলিকে তোমার পছন্দ?”
ইমদাদের মুখ থেকে হঠাৎ এমন প্রশ্ন শুনে আঁখি একটু চমকালো। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন,
“হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”
“তুমি বলোনা, কলিকে তোমার পছন্দ?”
“কেমন পছন্দের কথা বলছিস?”
“মানে ধরো এমনি পছন্দের কথা বলছি না। ও তো ভালো মেয়ে, এমনিতে তো পছন্দ হবেই। মানে ও যদি এই বাড়িতে আসে, আমাদের সবার সাথে থাকে তাহলে তোমার আপত্তি আছে?”
আঁখি ভ্রুঁ কুঁচকে বললেন,
“ও পরের বাড়ি মেয়ে অযথা আমাদের সাথে থাকতে যাবে কেন? ওর বাবাই না থাকতে দিল নাকি?”
ইমদাদ এক হাতে মাথা চুলকে বলল,
“আরো অযথা কেন থাকবে? কারণেই থাকবে। সে ব্যবস্থা আমি করব। তুমি বলোনা তোমার সমস্যা নেই তো?”
ছেলের কথার ইঙ্গিত আঁখি এবারে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারলেন। এমনটা নয় যে তার আপত্তি আছে, এমনটাও নয় যে তিনি এক বাক্যে মত দিয়ে দিতে পারছেন। কেননা ইমদাদের এই সিদ্ধান্তের কারণে বাড়িতে যে কতটা অশান্তি হবে সেটা তিনি খুব ভালোভাবে আন্দাজ করতে পারছেন।
আর তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে ফরিদ সাহেব কখনোই মানবে না। আর কলির পরিবারের কথা না হয় বাদই দিল। ছেলের প্রশ্নের সরাসরি কোন উত্তর না দিয়ে ছেলেকে সাবধান করে দিয়ে বললেন,
“অযথা সংসারে আ'গু'ন লাগানোর কথা ভাবিস না। মেয়েটাকে শান্তি দিতে চেয়ে সারা জীবনের জন্য অশান্তির মাঝে এনে ফেলিস না।”
“তোমার ছেলে এমনটা করবে? যা কিছু কলির জীবনে অশান্তি তৈরি করবে সে সব কিছুর থেকে আমি ওকে দূরে রাখবো মা। আমি ওর জীবনের অশান্তির কারণ কখনোই হবো না।”
_______
কলেজ যাওয়ার পথে কলির আজ দেখা হলো ইমদাদের মেজ ভাই ইমাদের সাথে। ইমাদের সাথে খুব বেশি কথা হয় না কলির। ওই মাঝে মাঝে পড়া নিয়ে যা একটু কথা হয়। এর বাইরে আর তেমন কোন কথা হয় না। ইমদাদও পছন্দ করে না যে কলি ইমাদের সাথে কথা বলুক।
ইমাদও কখনো সেভাবে নিজ থেকে কলির সাথে এগিয়ে এসে কথা বলে না, তবে আজ কি হলো কে জানে। হঠাৎ করে এসে কি সব পড়াশোনার আলোচনা শুরু করলো। কলির মনে হলো এই আলোচনা গুলো করার কোন প্রয়োজন নেই, তবে তার পরেও ইমাদ ইচ্ছে করে আলোচনা গুলো করছে। একপর্যায়ে গিয়ে কলি এটাও বুঝতে পারল যে ইমাদের মনোযোগ এই পড়াশোনার আলোচনার থেকেও বেশি কলির পাশে থাকা মাইশার উপর।
কিছু একটা যেন আন্দাজ করতে পারলো কলি, তবে নিশ্চিত না। যাওয়ার পথে আগে কলিদের কলেজ, তারপরে ইমাদের কলেজ। কলেজের কাছাকাছি আসতেই মাইশা কলেজের ভিতরে চলে গেল। ওর পিছন পিছন কলিও ইমাদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে ধরলে ইমাদ ওকে দাঁড় করালো। অপেক্ষা করলো মাইশার চলে যাওয়ার। মাইশা খেয়ালই করলো না যে কলি ওর পিছনে আসছে না। নিজে চলে গেল ভিতরে।
কলি প্রশ্নাত্মক গলা জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু বলবে?”
ইমাদ যেন একটু কেঁপে উঠলো। তবে খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ। তোমার সাথে একটু কথা ছিল কলি।”
কলি একটু ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল,
“তাড়াতাড়ি বলো, ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। কলেজের গেট বন্ধ করে দিলে আর ঢুকতে পারবো না।”
ইমাদ খুব চেষ্টা করলো তাড়াতাড়ি কথাটা বলার, তবে ঠিক বলতে পারলো না। অস্বস্তি হচ্ছে। কথাটা মুখে এসেও কেন যেন আটকে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের প্রচেষ্টার পর অস্বস্তি মাখানো গলাতে বলল,
“ভাইয়াকে বলো না এই কথাটা কেমন? কথাটা শুধু তোমার আর আমার মাঝে থাক আপাতত। ভাইয়া জানলে বকাবকি করতে পারে।”
“কি এমন কথা?”
“আসলে বলছিলাম যে মাইশার নাম্বারটা পাওয়া যাবে?”
কলি যা সন্দেহ করেছিল ঠিক তাই হলো। কলির মন বলছিল যে এই কথাটাই বলবে ইমাদ। কেননা হাঁটার সময় আড়চোখে বারবার ইমাদের মাইশার দিকে তাকানোটা মাইশা লক্ষ্য না করলেও কলি বেশ ভালোই লক্ষ্য করছিলো। আর ইমাদের দৃষ্টিটা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না সেটাও কলি বুঝতে পেরেছিলো। তবে ইমাদ কে বুঝতে দিলো না যে কলি এত কিছু বুঝে গেছে। না বোঝার ভান করে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“হঠাৎ মাইশা নাম্বারের কি দরকার? আর কিছু বলার থাকলে একটু আগে তো সাথেই ছিল, তখন বলে দিতে পারতে।”
“না আসলে সামনাসামনি ওর সাথে কথা বলতে একটু ভয় লাগে। তাই ভাবলাম ফোনে কথা বলবো। দরকার ছিল।”
“ভয় যখন লাগে তাহলে তোমায় কথা বলতে হবে না। কি দরকার আমায় বলো, আমি ওকে বলে দেব।”
ইমাদ তড়িঘড়ি করে বলল,
“না না। আমাকেই ওর সাথে কথা বলতে হবে।”
কলি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“মাইশা প্রেম করে জানো সেটা? ওর প্রেমিক আছে। দুজনের একদম মাখোমাখো প্রেম চলছে। ওরা ওদের বাচ্চাদের নাম পর্যন্ত ঠিক করে নিয়েছে। এরপরও নাম্বার নেবে? নিলে বলো আমি দিয়ে দিচ্ছি সমস্যা নেই। তবে নিজের পায়ে নিজে কু’ড়া’ল মা’রা’র কোন মানে হয় বলে আমার মনে হয় না।”
ইমাদ চমকে উঠে বলল,
“মাইশার বয়ফ্রেন্ড আছে?”
“হ্যাঁ। গিয়ে দেখো মেসেজে বোধহয় অর্ধেক বিয়েও করে নিয়েছে। বোঝো না নতুন নতুন প্রেমে পড়েছে, এখন কত কি হবে। যাই হোক, ইমদাদ ভাই মাইশাকে তেমন একটা পছন্দ করেনা। যদি এই কথাটা জানতে পারে তাহলে রেগে যেতে পারে।”
ইমাদ আতঙ্কিত গলায় বলল,
“আরে ভাইয়া কে কেন বলবে? ভাইয়া যেন এই সম্বন্ধে কিছু না জানে। ও নিজে প্রেম করবে তাতে সমস্যা নেই, কিন্তু আমি করলেই সমস্যা।”
ইমাদ কথাটা বলতেই পিছন থেকে কেউ একজন ওর ঘাড়টা চেপে ধরলো। ইমাদ ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে বলল,
“কে?”
ইমদাদ দাঁত পিষে বলল,
“তোর যম। তোর প্রেম করার বয়স হয়েছে যে তুই প্রেম করবি? আর এসব কি অসভ্যতা রাস্তা ঘাটে মেয়েদের নাম্বার চাইছিস? লজ্জা করে না? বাবাকে বলবো?”
ইমাদ তোঁতলানো গলায় বলল,
“কি আজেবাজে কথা বলছো? আমি এসব কিছু করিনি। আমি তো এমনি কলির সাথে কথা বলছিলাম। কি হলো কলি বলো আমি নাম্বার চেয়েছি?”
কলি মহা বিপাকে পড়লো। ইমাদ নিষেধ করেছে ইমদাদ কে কথাটা বলতে জন্য বলতেও পারছেনা। আবার মিথ্যেও বলতে পারবে না। কলির অসহায়ত্ব বোধহয় ইমদাদ বুঝলো। ইমাদকে ঝাঁড়ি মে’রে বলল,
“একদম চুপ। মিথ্যে বলে আবার সেই মিথ্যেতে কলি কেও শামিল করার চেষ্টা করছিস? আর তুই না কলেজ যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলি। দুটো মেয়ের পিছু নিয়েছিস কেন? কলির সাথে তোকে কথা বলতে আমি নিষেধ করেছিলাম না? তোকে আমি বলেছিলাম না কলির আশেপাশে যেন তোকে আমি না দেখি? আর তুই কিনা বাড়ি থেকে বেরিয়ে টানা বিশ মিনিট কলির সাথে হাসতে হাসতে গল্প করতে করতে এলি। এর জন্য তোর কি শাস্তি প্রাপ্য তুই নিজেই ঠিক কর?”
“যা শাস্তি দেওয়ার দিয়ো, তবে আগে ঘাড় ছাড়ো আমার, লাগছে।”
ইমদাদ ঘাড় ছেড়ে নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“পুরুষ মানুষ হয়ে এতটুকু ব্যথায় কুঁকড়ে যাস। আবার এই আত্মা নিয়ে এসেছিস প্রেম করতে। মেয়ের বাপের এক ধমক খেলে তো পালাবি। যাইহোক, আর এক মুহূর্ত তুই এখানে দাঁড়াবি না। ছুটে নিজের কলেজ যা।”
ইমাদ সত্যি আর সেখানে দাঁড়ালো না। নিজের কলেজের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। ইমাদ সেখান থেকে চলে যেতেই ইমদাদ এবারের ভ্রুঁ কুঁচকে কলিকা উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোকে আমি বলেছিলাম না ইমাদের সাথে কথা বলবি না? তুই জানিস না আমি পছন্দ করি না?”
“কেন? একটু কথা বললে কি হবে? সমস্যা কি? তোমার বিশ্বাস নেই আমার ওপরে?”
“পুরুষ জাতির উপর আমার বিশ্বাস নেই। আমার ভাই কোন মেয়েকে পছন্দ করবে, আবার সেই মেয়েকে নিয়ে আমি টানাটানি করবো এসব আমার পছন্দ না। আমার পছন্দ মানে আমার পছন্দ, আমার ভাইয়ের পছন্দ মানে ভাইয়ের পছন্দ। তাই তুই ওর থেকে দূরে থাকবি। তোকে দেখলে তো যে কারোরই হৃদয় নড়ে উঠবে, সেখানে ও তো পুরুষ মানুষ।”
কলি এবারে কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,
“কিসব বলছো? ও তোমার নিজের ভাই। নিজের ভাইয়ের সম্বন্ধে এসব কেউ বলে?”
“নিজের ভাই হওয়ার আগে ও পুরুষ মানুষ। আর আমি নিজেও তো পুরুষ জাতিরই অংশ, খুব ভালো করে জানি কাকে দেখলে কার কি নড়ে ওঠে।”
কলি এবারে ভ্রুঁ কুঁচকে সন্দেহী গলায় বলল,
“তা তোমার কজনকে দেখে হৃদয় নড়ে ওঠে?”
ইমদাদের অভিব্যক্তিতে একটু পরিবর্তন ঘটলো। স্মিত হেসে বলল,
“একজনকে বারবার, বহুরূপে দেখে আমার হৃদয় নড়ে ওঠে। একজনকে দেখে যেমন আমার নিঃশ্বাস আটকে যেতে পারে, ঠিক তেমনি সেই একজন কে দেখেই আমার হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে যেতে পারে।”
কলি ফের বলল,
“তাই নাকি? তা কে সেই একজন?”
কলি জানে তার নামটা কি, তবুও ইমদদের মুখ থেকে শুনতে ইচ্ছে করলো। ইমদাও কলির সেই ইচ্ছেটাকে অপূর্ণ রাখল না। কলির দিকে হালকা একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,
“তুই। যে নিজের সব রূপে সর্বক্ষণ আমায় মুগ্ধ করতে পারে সে কেবল তুই। তুই ব্যাতীত না আমি কাউকে এত মনোযোগ দিয়ে দেখেছি, না কেউ আমার তার দিকে তাকাতে বাধ্য করতে পেরেছে, আর না আমায় মুগ্ধ করতে পেরেছে। আমার অতীত, বর্তমান সমস্তটা জুড়ে শুধুই তুই। আর ভবিষ্যতেও কেবল তুইই থাকবি, এটা ইমদাদের ওয়াদা।”