ধুলো মাখা গলিতে

পর্ব - ৩

🟢

আজ সকাল থেকে কলির মন মেজাজটা বেশ ভালো। তার বেশ কিছু কারণও আছে। প্রথমত আজ শুক্রবার, কলেজ বন্ধ। আগে কলেজ যেতে কলির বেশ ভালেই লাগতো, তবে এখন আর ভালো লাগেনা। এখন ইচ্ছে করে সারাটা দিন ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকতে, তবে সেই উপায় তো নেই। আবার বিকেল বেলা মাইশা এসে জোর করে ঘর থেকে বের করে।

আর কলির খুশি হওয়ার দ্বিতীয় কারণটা হলো আজ ওর বাড়িতে ওর বাবা কিংবা সৎ মা কেউই নেই। করিম সাহেব গেছেন নিজের দ্বিতীয় স্ত্রীর বাপের বাড়িতে। সেই হিসেবে কলির আজ বাড়িতে একাই থাকার কথা ছিল।

তবে কলি কে তো বাড়িতে একা রাখা যায় না। অল্প বয়সী মেয়ে, ব্যাপারটা ঠিক ভালোও দেখায় না। পাড়ার মানুষজন কি বলবে সেসব ভেবে করিম সাহেব যাওয়ার আগে নিজের বোনের বাড়ি থেকে মা কে ডেকে এনে কলির কাছে রেখে গেছে।

নিজের দাদিকেও কলির ঠিক সহ্য হয় না। মনে হয় এর থেকে ও একা থাকলে বরং ভালো হতো। কি আর হতো? হয়তো বাড়িতে চোর ডাকাত আসতো কলির একা থাকার খবর শুনে। কলি যদি টের পেয়ে যেত তবে না হয় কলিকে খু'ন করে রেখে বাড়িতে যা টাকা-পয়সা আছে সেসব নিয়ে পালাতো। কিংবা হয়তো দেখা গেল মাঝ রাতের দিকে হঠাৎ করে প্রকৃতি উত্তাল হয়ে উঠতো। ঝমঝম বৃষ্টি আর মেঘের গর্জনে কলি ভয় পেয়ে যেত। হয়তো ভয় পেয়ে একটা সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলতো।

তবুও ভালো ছিল। কোন না কোন এক সময় তো কলির জ্ঞান ফিরতো। আর যদি না ফিরতো তাহলে তো আরো ভালো ছিল। কলি তো চায়ই যে ওর জ্ঞান একবার হারালে আর কখনো যেন না ফেরে। তবে কলির ভাগ্য সহায় হলো না। কলির জীবনের অন্যতম অপ্রিয় মানুষকেই ওর সাথে রেখে গেল ওর বাবা।

কলির নিজের দাদিকে অপছন্দেও কারণ আছে। প্রধান কারণটা হলো ওর মায়ের সাথে করা ব্যবহার।

কলি যথেষ্ট বড় হয়েছে। নিজের বাবার পরকীয়ার কথা জানতে পেরেই যে রাগে দুঃখে ওর মা গলায় দড়ি দিয়েছিল সে কথাটা বুঝতে বাকি নেই। তবে অবাক করার বিষয় হলো এই সত্যিটা জানার পরেও ওর দাদী ওনার ছেলেকেই সমর্থন করে গেছেন। শুধু দাদি না, ওর ফুপু, চাচার সবাই সমর্থন করেছে ওর বাবাকে।

কলির মা বেঁচে থাকাকালিন একটা দিন উনি কলির মা কে শান্তি দেননি। তখন ছেলের বাড়িতে থাকতে পারতেন। তবে ছেলের দ্বিতীয় স্ত্রী আসার পর থেকে তিনি এই বাড়িতে থাকতেও পারেন না। সেজন্যই তো ছেলে যখন দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে নিজের শ্বশুর বাড়িতে গেছে তখন ছেলে ওনাকে জোর করে ডেকে এনেছেন।

সেসব কথা এখন থাক। কলির আনন্দের তৃতীয় কারণটা হলো পাড়ায় আজ মেলা বসেছে।

বিকালের দিকে মাইশা এলো কলির বাড়িতে। উঠোন থেকেই কলির নাম ধরে জোরে জোরে চেঁচিয়ে ডাকলো। এমন অসময়ে উঠোন থেকে কোন মেয়েলি চেঁচানোর কণ্ঠস্বর পেয়ে ঘর থেকে কলির দাদি শাপলা বানু লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তিনিও হাঁক ছেড়ে বললেন,

“এই অবেলায় কে এসেছিস রে? আর কলির নাম ধরে এভাবে ডাকছিস কেন?”

মাইশার জানা ছিল না যে কলির দাদি এসেছে। যদি জানতো তবে আসতোই না, অন্য কাউকে পাঠিয়ে দিত কলিকে ডাকার জন্য। সহ্য করতে পারেনা এই বুড়িটাকে মাইশা। তবে এখন যেহেতু সামনে পড়েই গেছে ভদ্রতা বলেও তো একটা কথা আছে। সেই ভদ্রতার খাতিরেই কোনমতে একটা সালাম দিল।

শাপলা বানু সালাম এর উত্তর দিয়ে পুনরায় বললেন,

“ও তুই। কলিকে কি দরকার?”

“ওকে ডেকে দিন। ও জানে ওর সাথে আমার কি দরকার।”

শাপলা বানু অসন্তুষ্ট গলায় বললেন,

“আমাকে বলা যায় না?”

“পাড়ায় মেলা চলছে জানেন না। ডাকতে যখন এসেছি নিশ্চয়ই মেলাতে নিয়ে যাব বলেই এসেছি।”

শাপলা বানু গম্ভীর গলায় বললেন,

“কলি যাবে না মেলায়, তুই যা।”

মাইশা ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“যাবে না কেন?”

“আমি বলেছি তাই যাবে না। বাড়িতে ওর বাপ মা কেউ নেই, এই অবস্থায় আমি ওকে ছাড়বো কার দায়িত্বে? তোর মতন এক মেয়ের দায়িত্বে?”

“কলির মা তো এমনিতেও নেই। আর বাপ থেকেও নেই। ওনার আবার অনুমতি নেওয়ার কি আছে? মেয়ের জন্য যদি এতই চিন্তা হতো, তবে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময় মেয়েকে নিয়েই যেতেন। বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে। শ্বশুরবাড়ির আদর খেতে গেছে। লজ্জা শরম তো কিছুই নেই।”

শাপলা বানু চোখ গরম করে মাইশার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আমার বাড়ির উঠােনে দাঁড়িয়ে আমার ছেলেকে অপমান করছিস তুই। তোর মা বাপকে খবরটা দেব নাকি?”

মাইশা বেশ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“তেমন কোন অন্যায় কথা বলিনি। যে কথা পাড়ার সবাই বলে সে কথা আমিও বলেছি। যাই হোক, কলিকে ডেকে দিন।”

“বললাম তো কলি যাবে না।”

মাইশার সহ্য হচ্ছে না এই বুড়ির কথা। মাথায় একদম আ’গু’ন ধরে গেছে। এবারে মুখ ফঁসকে বেফাস কিছু কথাই বেরিয়ে যেত হয়ত। তবে ভাগ্যিস ঠিক সময় কলি ভেতর থেকে চলে এলো। বাইরে এত চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে ছুটে এসে মাইশা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি হয়েছে? চেঁচাচ্ছিস কেন তুই?”

শাপলা বানু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলেন কলি দাঁড়িয়ে আছে। কলিকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোথাও যাওয়ার জন্য হালকা পাতলা একটু তৈরি হয়েছে। সাজগোজ তেমন কিছুই করেনি, শুধু একটা নতুন সালোয়ার কামিজ পরেছে।

মাইশাকে কোন উত্তর না দিতে দিয়ে শাপলা বানু শক্ত করে কলির বাহু চেপে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে বললেন,

“এই মেয়ে, কোথায় যাচ্ছিস?”

কলি ব্যথায় আর্তনাদ করে বলল,

“হাত ছাড়ো দাদি। লাগছে আমার।”

“ঘরের ভেতরে যা। মেলায় যাবি না তুই।”

কলি এক ঝটকায় শাপলা বানুর হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“যাব আমি। আমার যেখানে ইচ্ছে হবে আমি সেখানে যাব।”

শাপলা বানু চোখ গরম করে কলির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“মেয়ে মানুষের এত নির্লজ্জ হওয়া ভালো না কলি। ঘরে যা।”

“নির্লজ্জতার কথা যদি বলো তবে নিজের ছেলেকে গিয়ে আগে বলো ভালো হতে। আমার শরীরে তো তোমার ছেলের র’ক্তই বইছে। নির্লজ্জ না হয়ে থাকি কি করি বলো। বউ ম’রা’র একমাস হতে না হতেই যে বিয়ে করে আনে তার মেয়ে নির্লজ্জ হবে এটাই তো স্বাভাবিক তাই না?”

শাপলা বানু ফের কলির বাহু শক্ত করে চেপে ধরে দাঁত পিষে বললেন,

“আমার ছেলের খেয়ে আবার আমার ছেলেরই দুর্নাম করিস। পেয়েছিস তো নিজের মায়ের ধাঁচ। নির্লজ্জ মেয়েমানুষ। স্বামীর সাথে কি একটু ঝামেলা হয়েছে তার জন্য গলায় দড়ি দিয়ে ম’রেছে।”

“কেউ শখ করে ম’রে না দাদি। তবে তুমি যেহেতু বলছো আমার মা টুকটাক ঝামেলার কারণে গলায় দড়ি দিয়েছিল, তবে আমি দোয়া করি তোমার মেয়ের সংসারেও যেন এমন টুকটাক ঝামেলাই লাগে।”

কলি কথাটা বলতেই শাপলা বানু কষিয়ে একটা চ'ড় বসালেন কলির গালে। কলি একটুও অবাক হলো না। তবে আঁৎকে উঠলো মাইশা। তাড়াহুড়ো করে কলির দিকে এগিয়ে এসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“ঠিক আছিস কলি?”

কলিকে কথাটা বলে এবার শাপলা বানুর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে কটমট করে বলল,

“এই বুড়ি, মা’র’লে’ন কেন কলিকে? কিছু বলছি না জন্য সাহস বেড়ে গেছে তাই না? দাঁড়ান এক্ষুনি ইমদাদ ভাইকে ডাকছি। অর্ধেক দাঁত তো পড়েই গেছে, বাকি দাঁতগুলো যদি ইমদাদ ভাই এসে না ফেলেছে তবে আমার নামও মাইশা নয়। এক ঠ্যাং কবরে গেছে তাও শয়তানি শেষ হয় না। কলি তুই দাঁড়া তো। ইমদাদ ভাই বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে।”

কলি মাইশা কে আটকাতে চাইলো, তবে মাইশা শুনলো না কলির কথা। ইমদাদের বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইমদাদ আর সাঈদ। কলির আসারই অপেক্ষা করছিলো। মাইশাকে পাঠিয়েছিল আনার জন্য কলিকে।

মাইশাকে একা ছুটে আসতে দেখে দুজনের কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হলো। মাইশা ছুটে এসে হাঁপিয়ে যাওয়া গলায় বলে ইমদাদ কে বলল,

“একবার কলির বাড়িতে চলো তো ইমদাদ ভাই। ওর বুড়ি দাদির সাহস বেড়ে গেছে। একেই তো ওকে মেলায় আসতে দিচ্ছে না, তার উপর আবার চ'ড় মা’র’লো।”

সাঈদ আঁৎকে উঠে বলল,

“কলি কে চ’ড় মা’র’লো? তাও তোর সামনে?”

“হ্যাঁ আমার সামনে মা’রলো। চলো আজ ওকে একটা শিক্ষা দিতেই হবে। বুড়িকে বলে এসেছি এক ঠ্যাং কবরে গেছে, এবার আমরা তিনজন মিলে আরেক ঠ্যাং কবরে দিয়ে একেবারে পুঁ'তে রেখে আসবো।”

মাইশার কথায় যেন সাঈদ নিজের মাঝে একটা আলাদা শক্তি অনুভব করলো। ভাবলো আজ একটা এসপার ওসপার করেই ছাড়বে। এরা পেয়েছে কি। কলির গাল যেন সরকারি সম্পত্তি, যে যখন পারে চ’ড় মা’রে।

সাঈদ পাশ ফিরে তাকিয়ে ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে চাইলো, তবে দেখলো ইমদাদ কে বেশ শান্ত দেখাচ্ছে। কলি মা’র খেয়েছে এই কথাটা শুনে ইমদাদকে একটুও বিচলিত হতে দেখা গেল না।

বিজ্ঞাপন

“কিরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? চল কলিকে গিয়ে নিয়ে আসি।”

ইমদাদ বেশ শান্ত গলায় বলল,

“তুই আর মাইশা ওকে নিয়ে আয়। আমি সামনের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি।”

“তুই যাবি না কেন?”

“আমি না যাওয়াই ভালো। তুই যা না। তোকে দেখলে ওই বুড়ি এমনিই কলিকে ছেড়ে দেবে। আর কলি কে ইশারায় বোঝাস যে আমি ডেকেছি, তাহলে এমনি চলে আসবে।”

কথাটা বলে ইমদাদ কলির বাড়ির উল্টো রাস্তায় হাঁটা দিল। ওই যে নিজের কথা মতো সামনের মোড়ে গিয়ে দাঁড়াবে। সাঈদ বুঝে উঠতে পারে না এই ছেলেটাকে। কলির ব্যাপারে একটা স্বাভাবিক কথা নিয়ে মাথা গরম হয়ে যাবে, অথচ এখানে এত বড় একটা কথা শুনেও মাথা গরম হলো না। বরং কিরকম নির্বিকার ভঙ্গিতে চলে গেল।

ইমদাদ সেখান থেকে চলে যেতেই মাইশা রাগান্বিত গলায় বলে উঠলো,

“ওই বুড়িকে গরম দেখিয়ে এলাম ইমদাদ ভাইয়ের, আর এই ছেলে নিজেই চলে গেল একটা বলদকে দায়িত্ব দিয়ে। তোমায় নিয়ে গিয়ে কি হবে? তোমায় দেখে কেউ ভয় করে নাকি?”

সাঈদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“ভয় করতেও হবেনা। ইমদাদ কি বলে গেল শুনলি না? কলিকে ইশারায় বোঝাতে হবে ইমদাদ ডাকছে। তাহলেই চলে আসবে।”

________

প্রত্যেক বছরই এই সময় পাড়ার বড় খেলার মাঠটা জুড়ে মেলা বসে। দু'দিনব্যাপী হয় এই মেলা। এই মেলার সময় পাড়ার প্রত্যেকটা বাড়ি থাকে অতিথিতে পরিপূর্ণ। অন্যান্য সময় মেহমানরা না এলেও এই সময়টাতে সবার বাড়িতেই কম বেশি মেহমান আসেই।

সাঈদ আর মাইশা মিলে তো ইমদাদের কথা বলে কলিকে নিয়ে এসেছে মেলায়, তবে এখনো ইমদাদের দেখা পাওয়া যায়নি। ছেলেটা যে বলল সামনের মোড়ে অপেক্ষা করছে সেই কথাটাও রাখেনি। কে জানে কোথায় গিয়েছে। সাঈদ অবশ্য কলি আর মাইশা কে রেখে এখন খুঁজতে গেছে ইমদাদকে।

মেলায় সব রকমের স্টলই বসেছে। খাবারদাবার থেকে শুরু করে খেলনা, কসমেটিক্স সবই আছে। মাইশা কলিকে নিয়ে গেল একটা কসমেটিকসের দোকানে। অনেক কিছু দেখার পর শেষে দুজনেরই কানের দুল পছন্দ হলো। তবে কানের দুলের দামটা শুনতেই কলির মুখটা কালো হয়ে গেল। মাইশার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“চল এখান থেকে। কিনব না কিছু।”

“কিন্তু কেন? সুন্দর তো। দেখ তোকে মানাবে ভালো, আমাকেও মানাবে।”

“আমার কাছে একশো টাকা আছে। আর দেড়শ টাকা কোথায় পাবো? চল। এখন না, অন্য কোন সময় কিনব।”

“আরে আমি আছি না। দরকার হলে আমি কিনব না, তোকে কিনে দেবো। আরে আমরা আমরাই তো। তুই কি নিবি একবার শুধু আমাকে বল, দেখ তোকে পুরো দোকান কিনে দেবো।”

মাইশার কথায় কলি তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“মোটেও না। চল এখান থেকে, আমি কিছু কিনবো না। আমার পছন্দ হয়নি কিছু।”

কলির কথা মাইশা শুনতে নারাজ, আবার মাইশার কথা কলি মানতে নারাজ। দুজনে বেশ অনেকক্ষণ সেখানে জোরাজুরি চালালো একে অপরের প্রতি। এক পর্যায়ে দোকানদার নিজেই বিরক্ত হয়ে অন্য কাস্টমারদের কাছে চলে গেল।

ওদের দুজনের তর্ক বিতর্কের মাঝে হঠাৎ কানে একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। যদিও ওদের কে উদ্দেশ্য করে কিছুই বলেনি। দুজনে একযোগে সামনে তাকাতেই দেখলো ইমদাদ দাঁড়িয়ে আছে। দোকানী কে ডাকছে। ইমদাদ কে দেখতেই মাইশা চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“আরে ইমদাদ ভাই, তোমাকেই তো দরকার ছিল। দেখোতো এই কানের দুলটা দামাদামি করে আড়াইশো থেকে একশো টাকায় আনতে পারো নাকি।”

ইমদাদ কোন জবাব দিল না মাইশার কথার। এমনকি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ওদের দিকে তাকালো না অব্দি। দোকানী সেখানে আসতেই ইমদাদ ওর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মাইশা আর কলিকে ইশারায় দেখিয়ে বলল,

“কি পছন্দ করেছে এই দুজন?”

দোকানী এক জোড়া কানের দুল দেখিয়ে বলল,

“এটা একজন পছন্দ করেছে। অন্যটা আরেকজন নিয়ে গেছে। ওনারা দুজন তো তর্ক বিতর্কে ব্যস্ত।”

মাইশা তাকিয়ে দেখলো ওর পছন্দ করা দুলটাই নিয়ে চলে গেছে। হা হুতাশ করে বলে উঠলো,

“আমারটাই নিয়ে যেতে হলো! আর আপনিও কেমন মানুষ, দিয়ে দিলেন?”

“তো কি করবো? আপনি কি একবারও বলেছিলেন যে আপনি নেবেন?”

দোকানী হয়তো আরো কিছু বলতো মাইশাকে, তবে ইমদাদ সেই সুযোগ দিল না। যে দুলটা ওনার হাতে আছে সেটা যে কলির পছন্দ করা সেটা বুঝলো। দুলটা প্যাক করে দিতে বলল। সেই সাথে নিজে চুরিও পছন্দ করল কলির জন্য, সেটাও দিয়ে দিতে বলল। দুটো জিনিসই প্যাক করে নিয়ে দোকানী কে টাকা দিয়ে এতক্ষণে ইমদাদ পিছন ফিরে কলির দিকে তাকালো। দেখলো কলি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

ইমদাদ জানে কলি অস্বস্তির জন্য কিংবা লজ্জায় মাথা নামিয়ে নেই, বরং ইমদাদের সাথে কথা বলতে চায় না জন্য এভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ইমদাদ কলির হাতে প্যাকেট দুটো দিয়ে বেশ শান্ত ভঙ্গিতে বলল,

“পছন্দের জিনিস কখনো অবহেলায় ফেলে রাখতে নেই, সেটা হোক কানের দুল কিংবা কোন মানুষ। দেখলি না এই গাধাটার কানের দুল কেমন হাতছাড়া হয়ে গেল। তুই তো গাধা না কলি, তবে অবহেলা করছিস কেন?”

কলি চমকে মাথা তুলে তাকালো ইমদাদের দিকে। ইমদাদের সহজ কথাটাও যেন বুঝতে অসুবিধা হলো। ফলস্বরূপ প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কিসের কথা বলছো তুমি? কি অবহেলা করেছি আমি?”

“এত অবুঝ তুই? তোর তো বোঝা উচিত আমি কিসের কথা বলতে পারি।”

ইমদাদের অদ্ভুত দৃষ্টিতে কলির এবার একটু অস্বস্তি হলো। অনেক কিছু যেন আন্দাজ করতে পারলো, তবে নিশ্চিত হতে পারল না। ফলস্বরূপ পুনরায় বলল,

“আমি অবুঝ। আমি বুঝতে পারছি না তুমি কিসের কথা বলছো।”

ইমদাদ অল্প একটু কলির দিকে ঝুঁকে গিয়ে বলল,

“কেন কানের দুল। মাইশার পছন্দ করা কানের দুল দেখলি না কেমন হাতছাড়া হয়ে গেল। এভাবেই দেখবি একদিন তোরও কোন মূল্যবান কিছু হাতছাড়া হয়ে যাবে। আজ এখানে দুলটা হাতছাড়া হলো না তার কারণ আমি ছিলাম। তবে কোন একদিন আমি না থাকলে কিন্তু হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই আমার অবর্তমানে নিজেকে আর নিজের প্রিয় জিনিসগুলোকে সামলে রাখিস।”

কথাটা বলেই ইমদাদ হো হো করে হেসে উঠে সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না, চলে গেল। কলি অবাক না হয়ে পারলো না। ভেবেছিল কি, আর ছেলেটা বলল কি। তবে কি কলির ধারণা ভুল ছিল?

ইমদাদ সেখানে যেতে না যেতেই কোত্থেকে যেন আবার সাঈদের আগমন ঘটনা। সেখানে উপস্থিত হওয়া মাত্রই হাস্যোজ্জ্বল গলায় কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কলি চল তোকে পুরো মেলাটা ঘুরিয়ে দেখাই।

নাগরদোলা আছে, উঠবি নাকি?”

সাঈদ কথাটা বলতেই মাইশা তাড়াহুড়ো করে এসে কলি কে আড়াল করে দাঁড়িয়ে বলল,

“ও তোমার সাথে যাবে না, আমার সাথে যাবে। তোমার সাথে নাগরদোলায় উঠলে যদি তুমি ফেলে দাও ওকে?”

সাঈক ধমকের গলায় বলল,

“কানের নিচে লাগাবো এক চ'ড়। ফেললে তোকে ফেলতাম, কলিকে ফেলব না। ফুলের কলি হোক কিংবা আমাদের পাড়ার কলি হোক, এদের শুধু যত্ন করা যায়। কলিদের অযত্ন করতে নেই। ঝরে পড়লে যে সমাজের সৌন্দর্য নষ্ট হবে।”

সাঈদ কথাটা বলতেই মাইশা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

“তাই নাকি? তো ডাকবো নাকি ইমদাদ ভাইকে? তোমার এসব কাব্যিক কথাবার্তা শোনাবো নাকি? বেশি কিছু হবে না, নাগরদোলা থেকে তুমি নিচে পড়বে।”

সাঈদ চোখ গরম করে মাইশার দিকে তাকাতেই ও থেমে গেল। তবে মাইশা সাঈদ কে পাত্তা দিল না। কলির হাতটা শক্ত করে ধরে ওকে ভরসা দিয়ে বলল,

“চিন্তা করিস না কলি, আমি আছি তোর সাথে। কে কি করে দেখে নেব।”

কথাটা বলে মাইশা কলির হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে ধরলে কলির অন্য হাত পিছন থেকে সাঈদ টেনে ধরল। কলি হকচকালো। হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে অস্বস্তি মাখানো গলায় বলল,

“হাত ছাড়ো সাঈদ ভাইয়া।”

সাঈদ একটুও দেরি করলো না। তৎক্ষণাৎ কলির হাতটা ছেড়ে দিয়ে সাবধান করে বলল,

“সন্ধ্যা হয়ে গেছে কলি। মেলায় অনেক মানুষ থাকলেও যেখানে সেখানে যাস না। ইমদাদ আমাকে বলে পাঠিয়েছে বেশিক্ষণ যেন তোকে মেলায় না রাখি। একটু ঘুরে চল বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবো।”

“আমি চলে যেতে পারবো, চিন্তা করো না। তুমি যাও।”

“ইমদাদ একটা দায়িত্ব দিয়েছে জন্য তোর পিছন পিছন যাচ্ছি, না হলে তোর পিছনে পড়ে থাকি না আমি।”

কলির আর কোন কথা বাড়ানোর ইচ্ছে হলো না। মাইশার হাত ধরে আগে আগে হাঁটলো, ওর পিছন পিছন সাঈদ হাঁটলো। ইমদাদও আশেপাশে আছে। সাঈদ সেটা জানে। কলিও খোঁজার চেষ্টা করলো ইমদাদ কে তবে পেল না দেখা। আর মাইশার সেসব দিকে কোন খেয়ালই নেই।

বিজ্ঞাপন
ধুলো মাখা গলিতে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক বাংলা উপন্যাস