ধুলো মাখা গলিতে

পর্ব - ২

🟢

রাতে বাড়ি ফিরে খাওয়া দাওয়া শেষে কলিকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠিয়েছে ওর বাবা করিম সাহেব। কলিকে ডেকে পাঠানোর কারণ কলির নামে কিছু অভিযোগ এসেছে ওনার কানে।

দরজার কাছে জড়োসড়ো হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে কলি। বিছানার ওপরে বসে আছে করিম সাহেব আর ওনার স্ত্রী রোজিনা।

রোজিনা স্বামীর কাছে অভিযোগ করছেন কলির নামে। অবশ্য তিনি বুঝতে দিচ্ছেন না যে এগুলো ওনার অভিযোগ, বরং এমন ভাবে কথাগুলো স্বামীর কানে তুলছেন যে ওনার কলির জন্য চিন্তা হচ্ছে জন্য এভাবে বলছেন উনি কথাগুলো।

উনি তো আর কলির নিজের মা না, তাই কলিকে শাসন করার অধিকার নেই। যদি শাসন করেন, তবে কলিও কষ্ট পাবে। পাড়ার লোকজনও কথা বলবে যে নিজের মা হলে এভাবে বলতে পারতো না। সেজন্য উনি কথাটা কলির বাবাকে বললেন।

স্ত্রীর থেকে সবকিছু শোনা শেষে করিম সাহেব গম্ভীর গলায় কলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ইমদাদের সাথে তোমার কিসের এত মেলামেশা?”

কলি মৃদু কেঁপে উঠলো। ভয়ার্ত গলায় বলল,

“তেমন কিছু না বাবা। ওই দেখা হলে টুকটাক কথাবার্তা হয় আর কি।”

কলিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রোজিনা নিজ থেকে বলে উঠলেন,

“তাই নাকি কলি? যদি শুধু এতোটুকুই হয় তবে পাড়ার মানুষ এত কথা বলে কেন? রোজ বিকেলে তোমার এত বাড়ি থেকে বের হতে হয় কেন? তাও সেই বড় খেলার মাঠটায় গিয়েই বসে থাকো, যেখানে ইমদাদ রোজ বিকেল করে ফুটবল খেলে।”

“আন্টি আমি আজ অনেকগুলো দিন পর বাড়ি থেকে বের হয়েছি। প্রায় দুমাস হলো আমি বাড়ি থেকে বের হই না বিকেল করে। একমাস হলো কলেজ যাওয়া শুরু করেছি। আপনি কেন বলছেন যে আমি প্রতিদিন বিকেলে বাড়ি থেকে বের হই?”

কলি কথাটা বলতেই করিম সাহেব ধমকে উঠে বললেন,

“উনি তোমার মা হয়, আন্টি করে ডাকছো কেন? এসব বেয়াদবি কার থেকে শিখেছো?”

“না, উনি আমার মা না। যে আমার মা ছিল সে চলে গেছে আমায় ছেড়ে।”

করিম সাহেব তাচ্ছিল্য ভরা গলায় বললেন,

“সে তোমার কেমন মা ছিল দেখলে না। অযথা একটা ছোট বিষয় কে কেন্দ্র করে আ’ত্ম’হ’ত্যা করলো, তোমার কথা একবারও না ভেবে। আর তোমার এই মা তোমায় কত ভালোবাসে, তোমার কথা কত চিন্তা করে।”

কলি ছলছল চোখে করিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমার মাও অযথা এক কারণে আ’ত্ম’হ’ত্যা করেনি বাবা। যদি আমার মায়ের মৃত্যুর কারণটা অযথা হতো, তবে আমার মায়ের মৃত্যুর এক মাসের মাঝে তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারতে না। উনি তোমার দ্বিতীয় স্ত্রী হতেই পারে, তবে আমার মা না। আর উনি যে আমায় কতটা ভালোবাসেন সেসব আমি জানি। তুমিতো চোখের সামনে একটা পর্দা ঝুলিয়ে বসে আছো, বেশ তেমনই থাকো। তবে আমায় জোর করো না।”

কলি কথাটা বলতেই রোজিনা কেঁদে উঠে বললেন,

“এজন্যই বলি পর পরই হয়। আমি তোমার সৎ মা, নিজের মা তো আর না। যতই ভালোবাসি না কেন তবুও আমার ভালোবাসার চোখে পড়বে না। থাকো, তুমি ওকে জোর করে না।”

কলি রোজিনার দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“এত নাটক কি করে করেন আপনি? আমার বাবার চোখে আমায় খারাপ বানিয়ে কি লাভ আপনার? আমি তো আপনার কোন ক্ষতি করিনি। না আপনার এই বাড়িতে আসা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছি। তবে অযথা কেন আমার নামে বাবার কাছে মিথ্যে অভিযোগ করছেন?”

কলি কথাটা বলতেই করিম সাহেব মেয়ের দিকে তেড়ে গিয়ে একটা কষিয়ে চ'ড় বসালেন। ব্যথায় আর্তনাদ গড়ে উঠলো কলি। তবে সেদিকে করিম সাহেবের কোন খেয়াল নেই। অন্যদিকে রোজিনা ধীরে ধীরে নিজের কান্নার বেগ বাড়িয়ে যাচ্ছেন, তো বাড়িয়েই যাচ্ছেন। করিম সাহেব আঙুল উঁচিয়ে মেয়ে কে শাসিয়ে বললেন,

“এরপর থেকে যদি তোমার মুখে আমি মা ডাক না শুনেছি তবে আমি কিন্তু ভুলে যাবো কলি যে তুমি আমার মেয়ে।”

কলি কোন উত্তর দিল না। কলির থেকে কোন উত্তর না পেয়ে করিম সাহেব আরো বেশি ক্ষিপ্ত হলেন। করিম সাহেব মেয়েকে নিজের দিকে ঘুরে দাঁড় করিয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বললেন,

“তোমাকে আজ শেষবারের মতন বলে দিচ্ছি কলি, রোজিনা যা বলবে সেটাই শুনবে। এই বাড়িতে থাকতে গেলে ওর কথা মতোই তোমায় চলতে হবে। আর ইমদাদের সাথে যেন এত ঘনিষ্ঠতা তোমার আমি না দেখি।”

কলি এবারও কোন উত্তর দিল না। ক্রন্দনরত রোজিনা কলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“হ্যাঁ কলি। তুমি যুবতী মেয়ে। ওই ছেলের সাথে এত মেলামেশা ঠিক না। যদি প্রেম ভালোবাসা কিছু থেকে থাকে তবে সেটা বলে দাও। এই বয়সে ভালোবাসতেই পারো কাউকে, এটা স্বাভাবিক।”

করিম সাহেব ফের গর্জে উঠে বললেন,

“যদি এসব প্রেম ভালোবাসায় তোমার নাম জড়িয়েছে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবো। ওই ইমদাদ আর ওর বাপ ভরা সভায় আমায় অপমান করেছে, আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ওর মতন বেয়াদব ছেলের সাথে আমি আমার মেয়ের সম্পর্ক কোনদিনও মানবো না, কথাটা মাথায় রেখো।”

কলি এবারও অসহায় গলায় বলল,

“নেই বাবা, আমার কোন সম্পর্ক নেই ইমদাদ ভাইয়ের সাথে। এক পাড়ায় থাকি, পাশাপাশি বাড়ি, দুটো কথাও বলতে দেবে না?”

“না। ওর সাথে কথা বলার কোন প্রয়োজন নেই তোমার।”

কলির আর সেখানে দাঁড়ানোর ইচ্ছে হলো না। আসার সময় কানে গেল রোজিনা ওর বাবার কানে আরও বেশ কিছু অভিযোগ দিল। এই যেমন কলি সারাদিন কাজ করে না, চুপচাপ ঘরে বসে থেকে ঘুমোয়। পড়াশোনা করে না, খেতে ডাকলে খেতে আসেনা, খাবার ঘরে দিয়ে আসতে হয়। রোজিনার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, দুচোখে সহ্য করতে পারে না, মাঝে মাঝে গালিও দেয়।

না জানি আরো কত অভিযোগ করলো। কলির নিজের হয়ে ওর বাবার কাছে গিয়ে কোন সাফাই দেওয়ার ইচ্ছে হলো না। কেননা জানে কোন লাভ হবে না। বরং হয়তো আরো দু চারটে চ'ড় বেশি খাবে।

______

ইমদাদের কলেজ থেকে বাড়ির দূরত্বটা খুব একটা বেশি না, আবার খুব একটা কমও না। তবে যদি রাস্তায় যানজট থাকে তবে সময় বেশ ভালোই লাগে। আজ কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে সেই যে যানজটের মাঝে আটকে গেল, আধ ঘন্টা পার হয়ে গেল তবে গাড়ি এক ইঞ্চিও বোধহয় এগোতে পারেনি। যে জায়গায় গাড়িটা আটকে ছিল সেই একই জায়গায় টানা আধঘন্টা আটকে রইলো।

অবশেষে ধৈর্য হারিয়ে ফেলল ইমদাদ। গাড়ি থেকে নেমে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা দিল। প্রায় বিশ মিনিট মতো হাঁটার পর ওদের পাড়ায় ঢুকলো।

ওদের পাড়ার মোড়ে নতুন একটা ফুচকার দোকান খুলেছে। কয়েকদিনের মাঝে বেশ ভালোই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেই ফুচকার দোকানে সকাল, দুপুর, রাত সবসময় বেশ ভালোই ভিড় লেগে থাকে। দোকানের ভেতরে যেমন বসার জায়গা আছে, ঠিক তেমনি বাইরেও কয়েকটা চেয়ার-টেবল পেতে বসার জায়গা করেছে।

সময়টা তখন বিকেল চারটা নাগাদ। সেই ফুচকার দোকানের সামনে এসে ইমদাদ থেমে গেল। দৃষ্টি হলো তীক্ষ্ণ, কপালের মাঝে তৈরি হলো গাঢ় ভাঁজ। সেই সাথে চোয়াল হয়ে এলো শক্ত।

কলিকে দেখতে পেল। যদি কলিকে একা দেখতো, তবে সমস্যা ছিল না। তবে কলির সাথে আরো বেশ কিছু ছেলে মেয়েকে দেখলো। আর ইমদাদের চোয়াল শক্ত হয়ে আসার কারণ হলো কলির পাশের চেয়ারটাতে একটা ছেলে বসে আছে, যে ছেলেটাকে ইমদাদ খুব ভালো করে চেনে। কলির সাথে একই ক্লাসে পড়ে।

ইমদাদের সাথে ওর বন্ধু সাঈদও আছে। সাঈদও এই পাড়ারই ছেলে। ছোটবেলা থেকে ইমদাদের সাথে দারুণ বন্ধুত্ব। এখন দুজনে একসাথে অনার্সে ভর্তি হয়েছে একই ডিপার্টমেন্টে।

ছোটবেলা থেকে স্কুল কলেজ সব বরাবর একই থেকেছে, তাই কখনো বন্ধুত্বে ফাটল ধরার সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। তবে সাঈদের ধারণা ছিল এইচএসসির পর ইমদাদ তো নিশ্চয়ই কোন ভার্সিটিতে চান্স পাবে। আর সাঈদের এই বিষয়েও আত্মবিশ্বাস ছিল যে ও নিজে কখনোই কোন ভার্সিটিতে চান্স পাবে না। ভেবেছিল তখন বোধ হয় বন্ধুত্বটা ফিকে হয়ে যাবে।

তবে ওদের বন্ধুত্ব দুর্বল হোক সেটা বোধহয় স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও চান না। সেজন্য দুজনকে আবার একই কলেজে ভর্তি করিয়েছেন।

দুজনে গল্প করতে করতেই হাঁটছিল। ইমদাদ যে অনেকক্ষণ আগে নিজের হাঁটা থামিয়েছে সেদিকে সাঈদের খেয়াল নেই। বকবক করেই যাচ্ছে, তো করেই যাচ্ছে। একসময় গিয়ে মনে হলো এবার ওর একটু থামা দরকার। ইমদাদের থেকেও কিছু জানা দরকার।

পাশে তাকাতেই দেখলো ইমদাদ নেই। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো বেশ অনেকটা দূরে ইমদাদ দাঁড়িয়ে আছে।

সাঈদ আবারো পিছিয়ে গিয়ে ইমদাদের কাঁধে হালকা করে ধাক্কা মেরে বলল,

“কিরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন এখানে? আর যখন দাঁড়াবি আমাকে একবার ডাকবি না? আমি কতদূর হেঁটে চলে গিয়েছিলাম।”

সাঈদ খেয়াল করলো ওর কথায় ইমদাদের বিন্দুমাত্র কোন মনোযোগ নেই। অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো যেন রাগে জ্বলজ্বল করছে। ইমদাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে সাঈদ একবার তাকালো সেদিকে।

কলি অপরিচিত নয় সাঈদের কাছে। বলা যায় পুরো পাড়াতে কলি কোন যুবকের কাছেই অপরিচিত নয়। নিজের অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য কলি পাড়ার লোকদের থেকে একটা ডাক নামও পেয়েছে, পরী। অনেকেই কলির অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ওকে পরী বলে ডাকে।

সত্যি বলতে কলিকে কোন পরীর সাথে তুলনা করলে ভুল হবে না। সৃষ্টিকর্তা একটু বেশিই নিখুঁতভাবে কলি কে তৈরি করেছেন। তার চেহারায় কোনো খুঁত খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। যেমন গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, ঠিক তেমনি গোলাপের পাপড়ির মতন টকটকে ঠোঁট। টানা টানা চোখের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য ঘন চোখের পাপড়ি, সরু নাক। আর পুরো মুখের সাথে মিলিয়ে একটা ছোট কপাল। গায়ে একটু টোকা লাগলেও যেন মনে হয় এখন চামড়া ফেটে র’ক্ত গড়িয়ে পড়বে।

আর কলির এই অপরূপ সৌন্দর্যের জন্যই সবার কাছে পরিচিত। বিশেষ করে পারার কম বয়সী যুবকদের কানে কলির নামটা গেলেও তারা যেন একটা ঘোরের মাঝে চলে যায়।

সরাসরি প্রেমের প্রস্তাব পাওয়া কিংবা প্রেম পত্র পাওয়া কলির জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রথমদিকে ভীষণ অস্বস্তি হতো, মাঝে মাঝে রাগও হতো, তবে এখন আর কোন অনুভূতিই কাজ করে না। কেউ সরাসরি এসে প্রেমের প্রস্তাব দিলে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নাকচ করে দেয় তার প্রস্তাব। আর কেউ প্রেমপত্র হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেলে কাগজটা অমনি ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

কত যুবক যে ভালোবাসার দাবি নিয়ে কলির সামনে হাজির হয়েছে তার কোন হিসাব নেই। বিয়ের প্রস্তাব এসেছে বেশ ভালো ভালো ঘর থেকে, তবে কলি সেসব বিয়ের প্রস্তাবও নাকচ করে দিয়েছে।

কলির মা বেঁচে থাকাকালীন কলির এইসব সিদ্ধান্তের মূল্য দিয়েছেন, তবে কলি জানেনা এখন কোন বিয়ের প্রস্তাব এলে কলি মানা করলে ওর বাবা ওর সিদ্ধান্তের গুরুত্ব দেবে কিনা।

সাঈদের আর বুঝতে বাকি রইলো না কলি কে বাকিদের সাথে হালকা হেসে হেসে কথা বলতে দেখেই ইমদাদের শরীরটা জ্বলছে।

সাঈদ ঠোঁট টিপে হাসি সংবরণ করে বলল,

“একদিকে প্রেমের আ'গু'নে প্রেমিকের হৃদয় জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে প্রেমিকার মনোযোগ তখন ফুচকায় ঝাল কতটা হয়েছে, তেঁতুল জলে মিষ্টির পরিমান ঠিক আছে কিনা সেদিকে। আহা! ভারী অন্যায় হচ্ছে প্রেমিকের সাথে।”

সাঈদের খোঁচা দেওয়া কথাটা বুঝতে পারলো ইমদাদ। এবারে অ'গ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সাঈদের উপরে। তবে সাঈদ ভয় পেল না মোটেও। এবারে আরো হো হো করে হেসে উঠলো। ইমদাদ সাবধানী গলায় বলল,

“মাথা প্রচন্ড গরম আছে সাঈদ। নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনিস না। ফুটবলের জায়গায় কিন্তু পায়ের নিচে তুই থাকবি, মনে রাখিস কথাটা।”

সাঈদ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

“সেটা তুই করতেই পারিস। তবে আমার অপরাধটা তো আগে জানাতে হবে।”

“আজেবাজে কথা বলছিস কেন?”

“কই আজেবাজে কথা বললাম? আমি তো একটা সাধারণ কথা বললাম। তোর এত গায়ে লাগছে কেন? তুই কি কারো প্রেমিক, তোর কি প্রেমিকা আছে?”

সাঈদের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না দিয়ে ইমদাদ রাগে কটমট করতে করতে বলল,

“মাঝে মাঝে মনে হয় কলিকে বাড়িতে আটকে রাখাই ঠিক আছে। পাড়ার সবগুলো ছেলে চরিত্রহীন। কলিকে দেখলেই একদম হায়নার মতন তাকিয়ে থাকে।”

ইমদাদের এত রাগের কারণ সাঈদের কাছে স্পষ্ট, তবে তা না বোঝার ভান করে বলল,

“তাতে তোর কি? কলি তো আর কারো সাথে প্রেম করে না। তাই যতদিন ওর জীবনে নির্দিষ্ট কেউ না আসছে ততদিন আমাদের সবার অধিকার আছে ওকে দেখার।”

“কলির নাম মুখে আনলে তোকে আমি পাড়া ছাড়া করবো কিন্তু সাঈদ।”

ইমদাদের হুমকির প্রেক্ষিতে সাঈদ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“কিন্তু কেন? আমি তো আর তোর প্রেমিকাকে দেখছি না। এমনও না যে তুই কলিকে ভালোবাসিস। তবে আমরা একটু দেখলে সমস্যা কি?”

ইমদাদকে কথাটা বলে সাঈদ এগিয়ে গেল কলিদের দিকে। ইমদাদকে আর কিছু বলার সুযোগই দিল না। একটা চেয়ার ফাঁকাই ছিল। আর সেই চেয়ারটা একদম কলির মুখোমুখি। সাঈদ ধপ করে চেয়ারের উপর বসে পড়লো। হঠাৎ করে নতুন কারা আগমনে সবাই একটু চমকালো। তবে পরিচিত মুখ দেখে সবাই আবার স্বাভাবিক হলো।

সাঈদ একবার আড়চোখে তাকালো ওদের থেকে একটু দূরে অ'গ্নিদৃষ্টিতে সাঈদের দিকে তাকিয়ে থাকা ইমদাদের দিকে। সাঈদের ইচ্ছে করলো ইমদাদকে আরো একটু জ্বা'লা'তে। তাই উপস্থিত বাকি সবাইকে অগ্রাহ্য করে সরাসরি কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কলি, কেমন আছিস?”

বিজ্ঞাপন

কলি অল্প একটু হেসে বলল,

“ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”

“আমি তো এমনিতেই বেশ ভালোই ছিলাম, তবে তোকে দেখে মনটা একদম ফুরফুরে হয়ে গেল। তা তুই এই গরমের দিনে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিস কেন? ফুচকা খাবি আমাকে বললেই তো বাড়িতে দিয়ে আসতাম। কষ্ট হচ্ছে না এখানে বসে?”

কলি ভ্যাবাচ্যাকা খেল, সেই সাথে একটু অস্বস্তিতেও পড়ল। ওর সঙ্গে থাকা বাকি সবার বেশ অদ্ভুত দৃষ্টি পড়লো কলির উপরে। সাঈদের পাশের চেয়ারে বসা কলির বান্ধবী মাইশা সাঈদের মুখ থেকে এমন কথা শুনে বলল,

“কলির কষ্ট হচ্ছে তা নিয়ে তোমার এত মাথাব্যথা কেন? আর কলির ফুচকা খেতে ইচ্ছে করলেই বা তোমায় কেন বলতে যাবে? হুট করে উড়ে এসে জুড়ে বসে বাড়াবাড়ি করছ না কি?”

মাইশার কথায় সাঈদ ভীষণ বিরক্ত হলো।

“চুপ করতো তুই। দেখছিস তো আমি খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছি। বিরক্ত করিস না আমায়।”

সাঈদের দৃষ্টি অনুসরণ করে মাইশা তাকালো সামনের দিকে। দেখলো ও কলিকে দেখছে। হা হয়ে গেল অমনি মাইশার মুখ। বুঝতে পারছে না হঠাৎ করে এই ছেলের এমন আচরণের কারণ।

এদিকে সাঈদ কে নিজের দিকে এভাবে হ্যাবলার মতন তাকিয়ে থাকতে দেখে ভীষণ অস্বস্তির মাঝে পড়লো কলি। এখানে বসে থাকতেই ইচ্ছে করল না। চেয়ার থেকে উঠে ঘুরে দাঁড়াতেই বেশ শক্ত পোক্ত কিছুর ধাক্কা খেয়ে তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলে একটা বলিষ্ঠ হাত কলির হাতটা ধরে ফেলল।

কলি মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো ইমদাদ ধরেছে ওর হাত এবং ইমদাদের সাথেই ধাক্কা খেয়েছে। কলি কৃতজ্ঞতা জানানোর আগেই ইমদাদ গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,

“কলেজ শেষে বাড়ি না গিয়ে এখানে কি করছিস?”

ইমদাদের গম্ভীর গলা শুনে ঘাবড়ালো কলি। খেয়াল করলো ইমদাদের চোখ দুটো লাল টকটকে রং ধারণ করেছে। ইমদাদের দিকে তাকিয়ে থাকার সাহস হলো না কলির। মাথাটা নামিয়ে নিয়ে ধীর গলায় বলল,

“বাড়িই ফিরছিলাম, তো পাড়ার মোড়ে এসে ফুচকার দোকানটা দেখে সবাই বলল ফুচকা খাবে সেজন্য থেকে গেলাম। অনেকদিন হলো খাওয়া হয়না।”

“তো সেটা আমায় বলতে পারতি। এভাবে এত লোকজনের মাঝে বসে থেকে ফুচকা খাওয়ার কি দরকার ছিল?”

মাইশা আফসোসের গলায় কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“বাহ কলি বাহ! তোরই দিন। যে দেখছে সেই ফুচকা খাওয়ানোর অফার করছে। আজ আমরা সুন্দর নই বলে কেউ একটু ফুচকা খাওয়াতে চায় না।”

মাইশা কথাটা বলতেই এবারে কলির ক্লাসমেট রবিন ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আরে ইমদাদ ভাই কলি কে আমি ফুচকা খাওয়াতে চেয়েছিলাম। আসলে কলির মনটা ভীষণ খারাপ ছিল তাই…....”

রবিন কে নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে ইমদাদ বেশ গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,

“কলির মন খারাপ কি ভালো সেটা দেখার দায়িত্ব কি তোমায় দেওয়া হয়েছে? কলির খারাপ মন কি করে ভালো করতে হয় সেটা আমি বুঝে নেব। তুমি আসতে পারো এখন। আর ভবিষ্যতে কখনো কলির মন ভালো করতে এসো না, নয়তো আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে।”

ছেলেটা বেশ সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে একটু হেসে বলল,

“আরে তুমি এমন করছ কেন? কলির তো কোন অসুবিধা নেই আমি ওর সাথে কথা বললে। আর তুমি তো কলির অভিভাবক না।”

“কলির অভিভাবক না হলেও তোর বাপ। ইমদাদের মাথা গরম করিস না। আর তুই যে কলির সাথে প্রেম করার ধান্দায় আছিস সেসব চলবে না। আর একদিন যদি তোকে কলির আশেপাশে দেখেছি, ঠ্যাং খোঁড়া করে রেখে দেবো। যা ভাগ।”

অপমান সহ্য করতে না পেরে রবিন চলে গেল। ইমদাদ এবারে গম্ভীর গলায় কলিকে আদেশ করে বলল,

“এক্ষুনি বাড়ি ফিরবি। রাস্তায় কোথাও এক সেকেন্ডের জন্যও দাঁড়াবি না। তোর চোখ থাকবে পিচ ঢালা রাস্তার উপরে। কারো মুখের দিকে আমি যেন তাকাতে না দেখি। পিছন পিছন কিন্তু আমি আসছি। যদি আমার কথার অবাধ্য হয়েছিস, তবে আমি জানি না কি করবো।”

কলি কোনো উত্তর না দিয়েই চলে যেতে ধরলে ইমদাদ ওকে আটকালো। ফের গম্ভীর গলায় বলল,

“কি হয়েছে তোর? কথা বলছিস না কেন আমার সাথে?”

কলি বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“কিছু না।”

ইমদাদের বিশ্বাস হলো না। তবে আর আটকালোও না।

কলি সেখান থেকে চলে যেতেই মাইশা নিজের চেয়ার থেকে উঠে কটমট করে ইমদাদ আর সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমরা দুজন মানে আস্ত ঝামেলার গোডাউন। পুরো বাংলাদেশে এত এলাকা থাকতে এই পাড়াতেই এসে উঠতে হয়েছিল তোমাদের? আর কোথাও জায়গা হয়নি? দিলে তো মাটি করে আমাদের সুন্দর আড্ডার আসরটা। মেয়েটা সারাদিন মন খারাপ করে ছিল, কলেজে কেঁদেছেও। সেই জন্য ভাবলাম একটু মনটা ভালো করব। তোমরা এসে সব নষ্ট করে দিলে। এজন্য

সহ্য হয় না তোমাদের।”

কথাটা বলে মাইশা চলে যেতে ধরলে ইমদাদ ওর সামনে দাঁড়ালো। ইমদাদ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“কাঁদছিল কেন কলি?”

মাইশা ঝাঁঝালো গলায় বলল,

“তোমাকে কেন বলবো? সরে যাও সামনে থেকে।”

“মাথা গরম করিস না মাইশা। আমার মাথা গরম করবি তো কাল কলেজে গেলে ওয়াশরুমে আটকে রাখবো।”

মাইশা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

“তুমি কি করে আমাকে আটকে রাখবে? আইডি কার্ড ছাড়া কলেজে কাউকে ঢুকতে দেয় না। আর তোমার মতন গুন্ডাকে তো কোনদিনও ঢুকতে দেবে না।”

“তোকে সোজা করার জন্য আমাকে ঢুকতে হবে না। ওটা আমার কলেজ। কলেজের পিয়ন থেকে শুরু করে দারোয়ান সবাইকে কলেজ লাইফে অনেক সিগারেট খাইয়েছি। শুধু একবার বলা, তোকে ছাদ থেকে ফেলে দিতেও দুবার ভাববে না। আর তুই জানিস ইমদাদ যা বলে তা করেই ছাড়ে। তাই বলছি চুপচাপ বল কলি কাঁদছিল কেন?”

মাইশা এবারে চুপসে গেল। এই কথাটা আসলেও সত্যি ইমদাদ যা বলে তা করেই ছাড়ে। তাই আর কোন ঝুঁকি নিল না। অকালে ম'র'তে চায় না মাইশা। এখনো বিয়ে করা বাকি।

“কলির বাবা ওকে মে’রে’ছে।”

“কেন মে'রে'ছে?”

“তোমার সাথে বেশি মেলামেশা পছন্দ না ওনার। পাড়ার সবাই নাকি কি সব বলেছ। ওর সৎ মা আবার সেগুলো ওর বাবাকে বলেছে। আর ওর বাবার তো কোন কাজ নেই, তাই মে'রেছে। মানে বুঝলে? এসবের পেছনে তুমিই দায়ী। দূরে থাকবে কলির থেকে।”

ইমদাদ প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“সেজন্য কি কলি আমার সাথে খুব বেশি কথা বলল না?”

“হতে পারে। আমি অত কিছু জানিনা। তবে ওর বাবা ওকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যেন তোমার সাথে কথা না বলে। তুমি অযথা ওর সাথে কথা বলার চেষ্টা করো না। মেয়েটার জীবনে এমনি দুঃখের অভাব নেই । এখন আসি।”

কথাটা বলে মাইশা যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। কয়েক কদম এগুলোও, ওমনি ইমদাদ পেছন থেকে ফের ডেকে উঠল। মাইশা বিরক্তিকর গলায় বলল,

“কি হলো আবার?”

“দু মিনিট দাঁড়া।”

ইমদাদ দৌড়ে গেল দোকানে। দোকানী কে উদ্দেশ্য করে ব্যস্ত গলায় তাড়া দিয়ে বলল,

“তাড়াতাড়ি দু প্লেট ফুচকা দিন, পার্সেল নেব।”

ফুচকার প্যাকেটটা নিয়ে এসে মাইশার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,

“এটা কলিকে দিয়ে দিস। আর বলিস তুই কিনে দিয়েছিস, আমার নাম যেন বলিস না।”

মাইশা প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বলল,

“আর আমি যে এই কাজটা করব তার জন্য আমি কি পাবো?”

“পাশের পাড়ার রতনের সাথে যে প্রেম করিস সেটা তোর মায়ের কানে না দিলেই হলো। চুপচাপ যা।”

মাইশার মুখটা চুপসে গেল। ইমদাদ একদম ঠিক জায়গায় নিশানা করেছে। তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে গেল মাইশা।

এদিকে ইমদাদের এখন যেমন রাগ হচ্ছে ঠিক তেমনি আবার চিন্তাও হচ্ছে। সব সময় তো কলিকে বাঁচানো সম্ভব না ইমদাদের পক্ষে। ওর এতটা ক্ষমতাও নেই। আর তাছাড়া কলির বাড়ির ভেতরে কখন কি ঘটছে সেসব খবর তো ইমদাদের পক্ষে পাওয়া সম্ভব না। কাছাকাছি বাড়ি সেটা ঠিক আছে, তবে মা'রলে কলি কাঁদলেও তো ওর বাড়িতে শব্দ আসে না। আর কলির বাবা জীবনেও ইমদাদকে ওদের বাড়িতে ঢুকতে দেবে না।

হঠাৎ করে ইমদাদ কাঁধে কারো স্পর্শ অনুভব করতেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখলো সাঈদ। মুহূর্তের মাঝে ইমদাদের মেজাজটা আবারো চটে গেল। সাঈদের হাতটা কাঁধ থেকে নামিয়ে নিয়ে বলল,

“চোখের সামনে থেকে দূর হ।”

সাঈদ আবার স্বভাবে একটু নির্লজ্জ। তাই বন্ধুর কথায় অপমানিত হওয়ার পরও গেলো ন। বরং এক হাতে সাঈদের কাধ পেঁচিয়ে ধরে বলল,

“কেন? কলি তো এখন আর নেই, যে আমি চোখের সামনে থেকে দূর হলে ওকে দেখবি।”

“তুই কলির নাম মুখে আনবি না সাইদ।”

সাঈদ এবারে আলতো হেসে ইমদাদের পিঠ চাপড়ে বলল,

“যদি সত্যিই চাস যে কলির সব বিষয়ে বরাবরের জন্য তোর, কেবলমাত্র তোরই অধিকার থাকুক, তবে খুব শীঘ্রই কিছু একটা কর। কলিকে পাওয়া কিন্তু অত সহজ হবে না। না ওর বাপ মানবে, না তোর বাপ মানবে। তাই কলিকে পেতে গেলে আগে দরকার তোর নিজের কিছু করা।”

সাঈদের কথার প্রেক্ষিতে ইমদাদ কিছু বলে উঠতে ধরলে সাঈদ ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“চুপ কর। কলিকে আমি সেভাবে দেখিনা, কলিকে আমি ভালোবাসি না, আমি যেমন ভাবছি তোদের সম্পর্কটা তেমন না এই মিথ্যেগুলোও আর বলিস না। পাড়ার সাধারণ মা-ম'রা মেয়ের জন্য চিন্তা, আর নিজের ভালোবাসার মানুষটার জন্য চিন্তার মাঝে পার্থক্য করতে আমি পারি ইমদাদ।”

ইমদাদ যেন হার মানলো সাঈদের কাছে। রাগে কটমট করে বলল,

“মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে কলির বাপটাকে পি'টি'য়ে রেখে আসি। শালা জানি না ভবিষ্যতে ওকে শ্বশুর বলে মানবো কিনা। এখন কলির ওপরে আমার কোন অধিকার নেই, তবে অধিকার হওয়ার পরে যদি ও কলির গায়ে হাত তুলেছে আমি শ্বশুর না কে সেসব মানবো না।”

সাঈদ শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“কলিকে বাঁচানোর জন্য এমনই হতে হবে তোকে। এখন চল। হাত মুখ ধুৃয়ে এসে মাঠে যাব। আজ তোর দলকে আমি একাই চারটে গোল খাওয়াবো।”

“ইমদাদ বেঁচে থাকতে না।”

ইমদাদ কথাটা বলতেই দুই বন্ধু একযোগে হেসে উঠলো। আরো কে কয়টা গোল দেবে, কে কিভাবে কাকে হারাবে সেসব বলতে বলতে হাসতে হাসতে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।

বিজ্ঞাপন
ধুলো মাখা গলিতে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক বাংলা উপন্যাস