ধুলো মাখা গলিতে

পর্ব - ৪

🟢

পাড়ার কিছু ছোট ছেলে মেয়েদের পড়ায় কলি, খুবই অল্প বেতনে। আগে এ কাজটা শখের বসে করতো, তবে এখন যেন একপ্রকার বাধ্য হয়েই করতে হচ্ছে। কেননা খেয়াল করেছে কলির বাবার ইদানিং ওর পড়াশোনার খরচ দিতে ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে। শুধু পড়াশোনা না, যাবতীয় খরচ দিতেই ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে তার। বই, খাতা, কলম যেটাই কেনার টাকা লাগুক না কেন, তিনি যেন তেলে বেগুনে জ্ব'লে ওঠেন।

এই ছোট ছেলেমেয়েদের দলে অন্তর্ভুক্ত আছে ইমদাদের ছোট ভাই ইকবালও। ইমদাদরা তিন ভাই। ইমদাদ বড়, ওর মেজ ভাই কলিদের সাথেই পড়ে তবে কলেজ আলাদা, আর ছোট ভাই পড়ে ক্লাস টু তে। ইকবাল এই এক মাস হলো কলির কাছে প্রাইভেট পড়া শুরু করেছে।

অবশ্য এই ব্যাপারটা আঁখি দায়িত্ব নিয়ে করেছেন। অন্যান্য জায়গার থেকে এই জায়গাটায় কলি বেতনও একটু বেশি পায়। মাসে এক হাজার টাকা দেয় আঁখি। আবার আঁখির এই প্রচেষ্টারও একটা কারণ আছে।

ইমদাদ চাপ দিয়েছে ওর মা কে যেন ইকবালকে কলির কাছে পড়তে পাঠায়। শেষে ছেলের জোরাজুরির কাছে আঁখিকেও হার মানতে হয়েছে। এতদিন ইকবালকে ইমদাদই পড়াতো, তবে এবার ইমদাদের থেকে ছাড়া পেয়ে ইকবালও খুশি।

পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় কলি সন্ধ্যা সাতটার দিকে ইকবালকে পড়াতে আসে। কলির বাবাও এতে তেমন একটা আপত্তি জানায়নি। তার কারণ তার টাকা বেঁচে যাচ্ছে। মেয়ে যদি নিজেই নিজের খরচ চালাতে পারে, তবে চালাক না, সমস্যা কি।

ইকবালকে পড়াতে খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না কলিকে। ছেলেটা অন্যদের সাথে দুষ্টুমি করলেও কলির কাছে বেশ ভদ্রই থাকে। তবে আজ ইকবাল একটু দুষ্টুমি করছে। পড়তে চাইছে না। কলি একবার বুঝিয়ে দিলে ইচ্ছে করে বোঝার সত্ত্বেও বারবার বলছে বোঝেনি। ফলে কলিকে অনেক বেশি কষ্ট করতে হচ্ছে। আজ না পড়তে চাইছে, না লিখতে চাইছে।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ ইমদাদ ইকবালের এসব বেয়াদবি সহ্য করল। প্রথমে ভেবেছিল কিছু বলবে না, হয়তো একা একাই থেমে যাবে। তবে না, কলির থেকে প্রশ্রয় পেয়ে তো এই ছেলের বেয়াদবি আরো বেড়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে গিয়ে ইমদাদ নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। বেচারা ইকবালও খেয়াল করেনি যে দরজায় ইমদাদ দাঁড়িয়ে আছে। যদি খেয়াল করতো তবে অনেকক্ষণ আগেই শান্ত হয়ে যেত। তবে যেহেতু ভুল করেছে তার শাস্তি তো পেতেই হবে ইকবালকে। ফলস্বরূপ শাস্তি হিসেবে ইকবালের ভাগে পড়লো একটা শক্ত পোক্ত হাতের থা’প্প’ড়।

চ'ড়টা গালে পড়তেই ইকবালের সারা পৃথিবী যেন ভো ভো করে ঘুরে উঠলো। কলি আতঙ্কিত গলায় চেঁচিয়ে উঠলো। ইকবাল কিছুক্ষণ হা করে ইমদাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করে ভ্যা করে কেঁদে দিলো। তবে তার পরেও ইমদাদের বিন্দুমাত্র মায়া হলো না ছোট ভাইটাকে দেখে। এবারে ইকবালের কানটা শক্ত করে ধরে বলল,

“তোকে বলেছিলাম না কলির কাছে পড়তে হলে চুপচাপ ভদ্র ভাবে পড়বি? কথা শুনলি না কেন আমার? আজ রাতে তোর খাওয়া বন্ধ, তোর ঘরে ঘুমোনো বন্ধ। সারারাত উঠোনে ল্যাংটা করে দাঁড়িয়ে রাখব তোকে।”

ইকবাল কাঁদতে কাঁদতে নিজের মা কে ডাকল। কলি তাড়াহুড়ো করে ইকবাল কে নিজের কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করলো। তবে ইকবালের কান্না থামছে না। হয়তো ইমদাদের থেকে একটু আদর প্রত্যাশা করছে, তবে সেটা তো সম্ভব না ইমদাদের দ্বারা।

এক পর্যায়ে গিয়ে কলি নিজেই রেগে গেল। রাগান্বিত গলায় ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মা'রলে কেন অযথা ছেলেটাকে? বাচ্চা মানুষ, দুষ্টুমি করবে এটাই তো স্বাভাবিক। তুমি বড় হয়েও তো তোমাকে সামলানো যায় না, ওকে কি সামলাবে?”

ইমদাদ রাগে কটমট করে বলল,

“ও বেয়াদবি করেছে সেটা বড় কথা না। বড় কথা হলো, আমার কথা অমান্য করল কেন? পড়া ভুলে গেছে সেটা ঠিক আছে, কিন্তু আমি ওকে যেটা শিখিয়ে পাঠিয়েছি সেটা কেন ভুলে যাবে? ওকে আমি বারবার করে বলে পাঠিয়েছি যেন চুপচাপ পড়ে তোর কাছে, তোকে বিরক্ত করল কেন?”

“আরে সেটা আমি বুঝে নিতাম। আমার অভ্যাস আছে। ইকবাল বাদেও আমি আরো কয়েকজন বাচ্চাকে পড়াই, সবাই এমন করে। তাই বলে সবাইকে গিয়ে তুমি মা’র’বে?”

“দরকার পড়লে মা’র’বো। কার কার ছেলেকে পড়াস? নাম বলতো আমায়?”

“পাগলামি করো না ইমদাদ ভাই। আদর করো ওকে একটু।”

ইমদাদ নাক মুখ কুঁচকে বলল,

“আমি আদর করবো এই ভেড়াটাকে? অসম্ভব। পুরুষ মানুষ এভাবে কাঁদে কখনো দেখেছিস? ও যদি সত্যিকারের পুরুষ মানুষ হতো আমার হাতে একটা চ’ড় খেয়ে উল্টো আমাকে আরেকটা চ’ড় মা’রা’র জন্য তে’ড়ে আসতো।”

কলি বিস্ময় ভরা গলায় বলল,

“তোমার মাথা ঠিক আছে? ও একটা বাচ্চা, তোমার মতন দামড়া না। ভালোয় ভালোয় বলছি ওকে আদর করো ইমদাদ ভাই, নয়তো কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।”

ইমদাদ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“তুই আমায় হুমকি দিচ্ছিস? তোর মনে হয় তোর মতন দুই ইঞ্চির একটা মেয়েকে দেখে ইমদাদ ভয় পাবে? অনুরোধ করলে তাও একবার ভেবে দেখতাম, কিন্তু তুই ইমদাদকে আদেশ করছিস?”

“বেশ শুনবে না তো আমার কথা, ঠিক আছে। কাল থেকে আমি আর আসবো না ইকবালকে পড়াতে। আমার জন্যই তো ইকবাল আজ মা’র খেল, তবে আর আমি আসবো না। আর শুধু এই বাড়িতে কেন, নানীকে কল করে বলবো যেন আমাকে নিয়ে যায়। আমি মামা বাড়ি চলে যাব। আমার জন্য সব সময় সব জায়গাতে ঝামেলা হয়। এই পাড়াতেই থাকবো না আমি। দেখি কি করে আর ঝামেলা হয় কলির জন্য।”

মুহূর্তের মাঝে ইমদাদের মুখটা কেমন যেন চুপসে গেল। এটা তো ভাবেনি। এটা হবে সেটা তো জানতো না। কলি আসবে না কেন? তাছাড়া চলে যাবে মানেটা কি? ইমদাদ থাকবে কি করে?

ইমদাদ আগেই কিছু বলতে পারল না কলিকে, তার আগেই সেখানে আঁখি এলো। ছেলেকে এভাবে কাঁদতে দেখে তাড়াহুড়ো করে হাত বাড়িয়ে ছেলেকে কাছে ডাকলেন। ইকবাল ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে নালিশ করে বলল,

“ভাইয়া মে’রে’ছে আম্মু।”

ছেলের মুখ থেকে কথাটা শুনতেই আঁখি ইমদাদের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বললেন,

“মে’রে’ছি’স কেন ওকে? তোকে আমি বলেছি না ওর গায়ে হাত তুলবি না। বেশি বড় হয়ে গিয়েছিস।”

ইমদাদের কানে গেল না আঁখির বলা কথাগুলো। ওর মাথায় তখনও ঘুরছে কলির বলা কথাগুলো। কলি কি তবে সত্যি চলে যাবে? ওর কথা শুনে তো মনে হলো না মজা করছে। ইমদাদের এসব ভাবনার মাঝে কলি আঁখিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আন্টি, আমি কাল থেকে আর ইকবালকে পড়াতে আসবো না।”

“ও মা, সে কি কথা। পড়াবি না কেন? ও বেশি দুষ্টুমি করেছে?”

“না আন্টি তেমন কোন ব্যাপার না। ইকবাল খুবই ভালো। আসলে আমি আমার মামার বাড়ি চলে যাব। আমি পাড়াতে থাকবো না। আমার জন্য সবার জীবনে অশান্তি হয়। আজ আমার জন্য ইকবালও মা’র খেলো।”

আঁখি যেন কিছু একটা আন্দাজ করতে পারলেন কলির কথা শুনে। ইকবালকে একটু আদর করে বুঝিয়ে ঘর থেকে পাঠিয়ে দিলেন। ইকবাল সেখান থেকে চলে যেতেই গম্ভীর গলায় ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ইমদাদ, কি করেছিস তুই?”

ইমদাদ কে উত্তর দিতে না দিয়ে কলি নিজেই বলল,

“ইমদাদ ভাই কিছু করেনি আন্টি। আমি কারো ওপর রাগ কিংবা অভিমান থেকে তোমায় এই কথাটা বলিনি। আমি সত্যি চলে যাবে পাড়া ছেড়ে। এই পাড়াটা আমার কাছে এখন বিষাক্ত লাগে। আমার কোন আপন মানুষ নেই এখানে, কেউ নেই আমার।”

এতক্ষণ চুপ ছিল ইমদাদ, তবে কলির এই কথাটা ভীষণ অপছন্দ হলো। চোখ দুটো রাগে জ্বলজ্বল করে উঠলো। শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলল কলিকে উদ্দেশ্য করে,

“কথাটা ভেবে বললি তো কলি? কোন আপন মানুষ নেই এখানে তোর?”

কলি কোন প্রকার ভাবনা চিন্তা ছাড়াই বলল,

“নেই, কেউ নেই। এক মা ছিল, সেই মাও নেই এখন আর।”

“শেষবারের মতন বলছি, ভেবে বলছিস তো কথাটা? এর মাশুল দিতে হবে কিন্তু তোকে। আমায় রাগাস না। তুই পাড়া ছাড়া হওয়ার আগে আমি কিন্তু এই শহর থেকে উধাও হয়ে যাব।”

ইমদাদের মুখ থেকে এমন কথাটা শুনে আঁৎকে উঠলেন আঁখি। একেই তো ছেলের এমন কথায় ভয় পেলেন, তার ওপরে আবার ওনার স্বামীর ঘরে ফেরার সময় হয়ে গেছে। একেই তো ইকবালকে কলি প্রাইভেট পড়াবে এই ব্যাপারটা অনেক কষ্টে স্বামীকে রাজি করিয়েছেন। তার ওপর যদি উনি এখন বাড়ি ফিরে দেখেন যে ইমদাদ আর কলি একই ঘরে তাও এভাবে ঝগড়া করছে ভীষণ রেগে যাবেন স্ত্রীর উপরে। কলির তো এই বাড়িতে আসা বন্ধ করবেনই করবেন, সেই সাথে বাড়িতেও একটা তুমুল ঝড় উঠবে।

আঁখি দুজনকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,

“ইমদাদ চুপ কর তুই। আর কলি তোকেও বলছি এই ছোট ছোট কথা নিয়ে এত ঝগড়াঝাঁটি করতে নেই। আর মামার বাড়িতে যে যাবি বলছিস, তোর মামীর অত্যাচারে ওখানে টিকতে পারবি? মনে নেই কিভাবে ভরা সভার মাঝে তোকে নিয়ে যেতে অস্বীকার করলো। তোর নানীর বয়স হয়েছে, ক'দিন বেঁচে থাকবে সেটাও জানি না। ভুল সিদ্ধান্ত নিস না ঝোঁকের মাথায়।”

কলি মলিন হেসে বলল,

“তোমার কি মনে হয় আমি এখানে খুব ভালো আছি? এখানে দুটো কথা শুনতে হচ্ছে, ওখানে গেলে না হয় চারটে কথা শুনতে হবে।”

বিজ্ঞাপন

কলি বোধহয় আরো কিছু বলতো, তবে তার আগেই ইমদাদ ওকে থামিয়ে দিয়ে আঁখি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওকে নিয়ে তোমার এত ভাবার কি আছে মা? শুনলে না, ওর এখানে আপন কেউ নেই। ওর নিজেরটা নিজেকে ভাবতে দাও।”

আঁখি চোখ গরম করে ইমদাদের দিকে তাকাতেই ইমদাদ আপাতত থামল, কিছু সময়ের জন্য। আঁখি যেতে বলল ইমদার কে ঘর থেকে, তবে ইমদাদ গেল না। মুখের ওপর বললও না যে যাবে না, চুপচাপ সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো।

আঁখি এবারে কলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ওকে বুঝিয়ে বললেন,

“শোন মা, যেমনই হোক তাও করিম ভাই তোর বাবা। এখন হয়তো একটু অবহেলা করছে, তবে তুই তো ওনার মেয়ে, ভালো ঠিকই বাসেন। যেমনই হোক তোর বাবা তাও তোকে তিন বেলা খাওয়াচ্ছে, পড়াচ্ছে, মামা মামি কি আর সেসব করবে মা? ভুল সিদ্ধান্ত নিস না। আর তাছাড়া তুই তো বড় হয়ে গিয়েছিস। বাপের বাড়িতে আর কদিনই বা থাকবি। একটা ভালো ছেলে দেখে তোর বিয়ে দিয়ে দিলেই তো একটা শান্তির সংসার পাবি তুই।”

অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে এই কথাটা শুনতেই কলি কেন যেন আড়চোখে একবার ইমদাদের দিকে তাকালো। তবে অবাক করার বিষয় হলো ইমদাদও কলির দিকেই তাকিয়ে ছিল। দুজনের চোখাচোখি হতেই মুহূর্তের মাঝে আবার দুজনে নিজেদের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। ব্যাপারটা আঁখিও খেয়াল করলেন, তবে তিনি সেটা দুজনকে বুঝতে দিলেন না।

একটু ব্যস্ত ভঙ্গিতেই ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ইমদাদ, যা তো মোড়ের দোকান থেকে এক প্যাকেট লবণ নিয়ে আয়। রান্না আটকে আছে লবণের জন্য। তোর বাবা কখন আসবে কে জানে।”

ইমদাদ কেন যেন আপত্তি করলো না। যেতে যেতে বলল,

“তুমি আমার মা। তোমার ষড়যন্ত্র আমি খুব ভালো করেই বুঝি।”

কথাটা বলে ইমদাদ চলে গেল। আঁখি কলিকে বিছানার উপর বসিয়ে বললেন,

“গরম ভাত আর গরুর মাংস রান্না করেছি, একটু খেয়ে যা। বাড়িতে যে ঠিকঠাক খেতে পারিস না সেসব তো জানি। তোকে তিন বেলা ডেকে যে খাওয়াতেও পারি না মা। তোর বাবা অশান্তি করবে তোর সাথে সেই ভয়ে।”

কথাটা বলে আঁখি সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে কলি কি ভেবে যেন ওনার হাত টেনে ধরল। আঁখি থেমে গেলেন। কলি বেশ অদ্ভুত দৃষ্টিতে আঁখির দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলল,

“আমার কেন যেন মনে হয় আমার জন্য তোমার এই আদরের ভান্ডার একদিন ফুরিয়ে যাবে। আমার কেন যেন মনে হয় আমাদের এই মিষ্টি সম্পর্কটা একদিন নষ্ট হয়ে যাবে।”

কলির এই আশঙ্কার কারণটা আঁখি বুঝতে পারলেন হয়তো। আলতো হেসে বললেন,

“আমাকে অমন মানুষ ভাবিস না কলি, যে একটা অসহায় মেয়ে আমার বাড়িতে আশ্রয় চাইলে আমি তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেব। তবে আমার ভয় অন্য জায়গায়। এই বাড়িতে যে আমার সিদ্ধান্তে সবকিছু হয় না। ইমদাদের বাবাকে সামলানো যে আমার পক্ষে সম্ভব হয় না রে মা।”

__________

ইমদাদের বাড়ি থেকে বের হতেই কলি দেখলো গেটের কাছে ইমদাদ দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারের মাঝে হঠাৎ করে ইমদাদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভূত দেখার মতন চমকে উঠল কলি। আতঙ্কিত গলায় বলল,

“এভাবে কে দাঁড়িয়ে থাকে অন্ধকারের মধ্যে।”

ইমদাদ সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে বলল,

“ইমদাদ দাঁড়িয়ে থাকে।”

কলি কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বলল,

“তোমার নাম আমি জানি। নিজেই নিজের নাম এতবার করে বলার কোন দরকার নেই।”

ইমদাদ দু কদম কলির দিকে এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“খুব সাহস বেড়ে গিয়েছে তোর। এত তেজ এলো কোত্থেকে? মেলায় কি আমার স্বীকারোক্তি একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল জন্য এত সাহস বেড়ে গেছে?”

ইমদাদের কথার ইঙ্গিত কলি বুঝেও না বোঝার ভান করে বলল,

“কিসের স্বীকারোক্তি? তুমি তো কিছু বলোনি তেমন মেলায়। নাকি বলেছিলে কিছু যা আমি বুঝিনি?”

“সত্যি কিছু বুঝিস নি?”

“না তো।”

“বুঝবি কি করে, আমি তো কিছু বোঝাইনি। যাই হোক কাল ঠিক সময়ে চলে আসবি। এক মিনিটও দেরি হলে কিন্তু টাকা কাটবো।”

“আমি আন্টির সাথে কথা বলে নেব।”

কথাটা বলে কলি চলে যেতে নিলে ইমদাদ ওর হাত টেনে ধরল। কলি আতঙ্কিত গলায় বলল,

“হাত ধরেছো কেন? কেউ দেখে ফেলবে। বাবার বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গিয়েছে, যদি এভাবে দেখে আমি শেষ।”

ইমদাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

“তোর বাপের শরীরে ভয় আছে। জানে তোর কিছু হলে এই পাড়ায় তো দূরে থাক, এই দুনিয়ায় টেকা মুশকিল হয়ে যাবে। তারপরও যদি কলিজা খুব বেশি বড় হয়ে যায় একবার না হয় তোর বাপকে বলিস যে পাড়াতে তোর একটা নিজের মানুষ আছে, তোর ইমদাদ ভাই আছে।”

ইমদাদের চোখে চোখ পড়তেই কলি যেন এক অদ্ভুত ঘোরের মাঝে চলে গেল। দৃষ্টি সরাতে ইচ্ছে করল না। ইচ্ছে করলো এভাবেই তাকিয়ে থাকতে। আনমনে বলে উঠলো,

“সত্যি তুমি আমার নিজের মানুষ ইমদাদ ভাই?”

“আমার নিজের অবস্থানটাই যে শক্তপোক্ত না রে কলি। নয়তো তোর এই প্রশ্নের উত্তরটা মুখে না দিয়ে কাজে করে দেখাতাম। আমাকে একটু সময় দে, একটু ধৈর্য ধর, একটু কষ্ট গুলো সহ্য করে নে। তুই দেখিস আমি প্রমাণ করে দেবো যে আমি তোর নিজের মানুষ।”

“কতটা অপেক্ষা করাবে?”

কলির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ইমদাদ পাল্টা প্রশ্ন করলো,

“আমার জন্য কতদিন অপেক্ষা করতে পারবি তুই?”

কলি নির্দ্বিধায় নিঃসংকচে উত্তর দিল,

“সারা জীবন।”

“ভেবেচিন্তে বললি তো? একবার যদি নিজেকে ইমদাদের নামে করে দিস, তবে কিন্তু সারা জীবন ইমদাদের হয়েই থাকতে হবে। পারবি তো সারা জীবন আমার হয়ে থাকতে?”

“তুমি আমাকে আগলে রাখার জন্য সারা জীবন থাকবে তো?”

“আমি কোথায় যাব? আমি সারা জীবন তোর আশে পাশেই থাকবো। হয়তো কখনো দূরত্ব থাকবে, তবে তুই অনুভব করে নিস আমায়। সব সময় একটা কথা মাথায় রাখবি, ইমদাদ যেখানেই থাকুক না কেন ইমদাদের মনটা সব সময় কলির কাছেই থাকবে।”

“তবে আমিও কথা দিলাম সারা জীবন তোমার হয়ে থাকবো। তোমার যতদিন ইচ্ছে আমায় অপেক্ষা করিয়াে, তবে অপেক্ষার ফলটা যেন মিষ্টি হয় ইমদাদ ভাই। আমায় যেন শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিও না তুমি।”

ইমদাদ সযত্নে কলির কপালে পড়ে থাকে চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল,

“হৃদয়ের সমস্ত টুকু ভালোবাস উজার করে দিলাম তোকে, তবে শূন্য হলি কি করে তুই? তোর দু হাত তো আমি এখনই পূর্ণ করে দিয়েছি। আর এই অপেক্ষার ফল তো সেদিনই মিষ্টি হবে, যেদিন তোর এই নরম ঠোঁটের স্পর্শে আমার এই সিগারেটে পোড়া কালো ঠোঁট পাবে।”

বিজ্ঞাপন
ধুলো মাখা গলিতে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক বাংলা উপন্যাস