ধুলো মাখা গলিতে

পর্ব - ১

🟢

মা মারা যাওয়ার এক মাসের মাথায় দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন স্ত্রী ঘরে আনলেন কলির বাবা।

কলির কাছে করার মতন কিছুই নেই। বাবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে কথা বলার সাহস কলির নেই, আর বললেও যে তেমন কোন লাভ হবে না সেটা খুব ভালো করেই জানে কলি। সেজন্য আগ বাড়িয়ে আর কিছু বলেওনি।

পুরো পাড়ায় খবরটা ছড়িয়ে গেল। কলির কপাল পুড়লো, মা ম'রার শোক ভুলতে না ভুলতেই নিজের বাপ হয়ে মেয়েকে এত বড় একটা আঘাত দিয়ে বসলেন করিম হাসান সবার মুখে একই কথা। পাড়া-প্রতিবেশীর ভীষণ কষ্ট হলো কলির জন্য। সবাই আফসোসও করলো, তবে এই নিয়ে কোন আফসোস নেই করিম হাসানের মনে। বরং যেই তাকে আগবাড়িয়ে একটু বলতে আসে যে মেয়েটার এবারে কি হবে, তিনি চেঁতে উঠে বলেন,

মেয়ের জন্যই তো তিনিই বিয়েটা করেছেন। মা নেই মেয়েটাকে সামলাবে কে? যুবতী মেয়ে ঘরে একা রেখে তো তিনি কাজেও বেরোতে পারেন না। সুন্দরী মেয়ে তার, পাড়ার ছেলেদের তো নজর আছে। সেজন্যই তো তিনি বিয়েটা করে মেয়ের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেন।

তবে একটা সময়ের পর সবার কৌতূহল কমে গেল। বন্ধ হয়ে গেল কলি কে নিয়ে সবার আলোচনা। যে যার নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

কলিদের পাড়ায় বিশাল একটা খেলার মাঠ আছে। নিয়মিত এই জায়গাটায় আগে আসা হতো কলির। পাড়ায় যে বন্ধুবান্ধব আছে তাদের সাথে বিকেল বেলায় এদিকটায় হাঁটতে আসতো। তবে দু-তিন মাস হলো তেমন একটা আসা হয় না। ঘর থেকেই তেমন একটা বের হয়না। তবে আজ কেন যেন ঘরেও থাকতে ইচ্ছে করলো না।

ঘরের প্রত্যেকটা কোনায় যখন কলি অন্য কোন মহিলার উপস্থিতি টের পায়, যে জায়গাটা ওর মায়ের ছিল তখনই বুকটা কেমন যেন হুহু করে কেঁদে ওঠে। যে ঘরটাতে কলির মা থাকতো, সেই ঘরে আজ অন্য কারো বাস, যে রান্নাঘরে কলির মা রান্না করতো সেই রান্নাঘরে অন্য কারোর রাজত্ব, যে সংসারটা ছিল কলির মায়ের, সেই সংসারের সবকিছু আজ অন্যের। কেন যেন এই ব্যাপারগুলো মেনে নিতে পারছে না কলি।

তবে মুখ ফুটে এখনো অবধি একবারের জন্যও নিজের বাবার কাছে এই নিয়ে কোন অভিযোগ করা হয়নি, অভিমানও প্রকাশ করেনি। কেননা কলি খুব ভালো করেই জানে কোন লাভই হবে না। আর তার প্রমাণ তো অসংখ্যবার পেয়েও গেছে।

কলি এটাও খুব ভালো করে জানে ওর মা নিশ্চয়ই এমনি এমনি আ’ত্ম’হ’ত্যা করেনি। এর পিছনেও নিশ্চয়ই বড় কোন কারণ আছে। তবে আফসোসের ব্যাপার একটাই, কলির মা মেয়েকে সেই খবরটা একটু জানিয়েও গেলেন না। নিজের মনে জমে থাকা কষ্টগুলো একবারের জন্যও কলি কে বুঝতে দিলেন না। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে তিনি স্বার্থপরের মতন চলে গেলেন।

মাঠের একদম শেষ প্রান্তে একটা বিরাট বড় বটগাছ আছে। এই বটগাছটায় কলির ভীষণ ভয় ছিল। সবাই বলতো এই গাছে নাকি জ্বীন আছে। সবাই আবার একটু মজা করে কলি কে ভয় দেখানোর জন্যই বলতো, কলি দেখতে অনেক সুন্দর। তাই বেশিক্ষণ এই গাছের নিচে থাকলে নাকি জ্বীনের আছড় পড়বে ওর ওপর।

সেই ভয়ে কলিও খুব একটা বেশি আসতো না এই দিকটায়। তবে আজ মনের মাঝে আর সেসব কোন ভয় কাজ করল না। সঙ্গে আজ কোন বন্ধু-বান্ধবও নেই।

মাঠের বেশিরভাগ জায়গা দখল করে তখন পাড়ার ছেলেপেলে ফুটবল খেলছে। খেলার মাঝে একটা ছোট্ট বিরতি নিয়ে সবাই একটু বিশ্রাম করতে বসলো। খেলার মাঝেই ইমদাদ খেয়াল করেছিলো ওদের থেকে বেশ অনেকটা দূরে গাছের নিচে কলি বসে আছে। বিরতিরই অপেক্ষা করছিল ইমদাদ। ভেবেছিলো সুযোগ বুঝে গিয়ে একবার কলির সাথে কথা বলে আসা যাবে।

ইমদাদ গিয়ে ধপ করে কলির পাশে বসে পড়লো। কলি একটু চমকালো। ঘাড় কাত করে একবার তাকিয়ে দেখলো ইমদাদ। মুহূর্তের মাঝে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। আগ বাড়িয়ে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করলো না।

কলির এমন আচরণে অবাক না হয়ে পারলো না ইমদাদ। মেয়েটা তো আসর জমাতে পারে বেশ ভালো, অন্যান্য দিন মুখ দিয়ে খই ফোটে। ইমদাদকে একবার দেখলে অমনি শুরু হয়ে যায় মেয়েটার হাজারো কথা, তবে আজ কি হলো?

“আজ কিন্তু আমি একাই দুটো গোল দিয়েছি কলি, সেদিকে খেয়াল আছে?”

কলি নির্জীব গলায় উত্তরে বলল,

“না, খেয়াল করিনি। আমি অনেক পরে এসে বসেছি। এখান থেকে পরিষ্কারভাবে দেখাও যাচ্ছিল না।”

“তা তোকে এখানে এসে বসতে বলেছে কে? এখানে তো তুই বসিস না। চল, ওখানে গিয়ে খেলা দেখবি, আবার শুরু হবে খেলা।”

কথাটা বলেই ইমদাদ উঠে দাঁড়ালো। যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো, তবে কলি ওর প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলল,

“না ইমদাদ ভাই, যাব না। তুমি যাও।”

“যাবি না কেন? অন্যান্য দিন আমি গোল দিতে পারি না জন্য হাসিস, আজ আমি একটু গোল দিতে পারছি আর আজই দেখবি না।”

কলি তাও রাজি হতে পারল না। পুনরায় আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না ইমদাদ ভাই তুমি যাও। ভালো লাগছেনা। আজকের মত ছেড়ে দাও আমায়।”

ইমদাদ এবারে রেগে গেল। মাত্রাতিরিক্ত রাগ জন্মালো কলির প্রতি। ইমদাদ ভালো খেলে সেটা দেখে যে প্রশংসা করতে হবে, আর তো কোন খুঁত ধরতে পারবে না ইমদাদের। সেই জন্যই মেয়েটা যাবে না। না গেল, থাকুক এখানে বসে।

ইমদাদ রেগে মেগে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো, তবে যেতে পারলো না। দু কদম এগোতেই পা থেমে গেল। এবার ইমদাদের রাগ হলো নিজের উপরে। কেন যেতে পারছে না, কিসের এত পিছুটান এই মেয়েটার প্রতি?

ইমদাদ অনেক চেষ্টা করলো চলে যাওয়ার। ভাবলো আজ কোন মতেই মেয়েটার এসব রাগ, অভিমানকে পাত্তা দেবে না, তবে না শেষমেষ পারলোই না যেতে। আবারো পূর্বের জায়গায় এসে ধপ করে বসে বিরক্তিকর গলায় কলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এটা তো জানা কথা কলি যে তোর বাপ আবার বিয়ে করবে। সেটা নিয়ে এত মন খারাপ করে বসে থাকার কি আছে? তোর শুনতে খারাপ লাগলেও এটা সত্যি ওনার বড্ড বেশি উত্তেজনা। উনি এতটাই বেশি উত্তেজিত, যে একটা মাসও বউ ছাড়া থাকতে পারলেন না। অসভ্যলোক কোথাকার।”

কলি মলিন হেসে বলল,

“সুখেই তো আছে বাবা ইমদাদ ভাই। বাবা নিজের সুখের ব্যবস্থা করে নিয়েছে, মাও নিজের সুখের কথা ভেবেই চলে গেল, অথচ কেউ আমার কথাটা ভাবলোই না। মা-বাবারা নাকি নিজের সুখের আগে সন্তানদের সুখ কে প্রাধান্য দেয়, অথচ দেখো আমার বেলায় সব নিয়ম বদলে গেল তাই না?”

ইমদাদের কষ্ট হলো মেয়েটার জন্য। প্রাণোচ্ছ্বল, চঞ্চল মেয়েটা এই কটা দিনের ব্যবধানে কেমন যেন শান্ত হয়ে গেছে। আজকাল আর কোন আড্ডায় কলি কে দেখা যায় না। পড়াশোনার প্রতিও মেয়েটা কেমন যেন উদাসীন হয়ে পড়েছে। পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করছে। ঘরেই যে শান্তি নেই।

ইমদাদের কন্ঠটা এবার একটু নরম হলো। কলি কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“দেখ কলি, যা হওয়ার সে তো হয়ে গেছে। এখন আর মন খারাপ করে কোন লাভ নেই। পুরুষ মানুষ এমনই হয়। শালা কয়েকটার জন্য পুরো পুরুষ জাতির বদনাম হয়ে যায়।”

কলি আর কোন উত্তর দিলো না ইমদাদের কথার। চুপচাপ সেখানে বসে রইল। ইমদাদও বাড়তি কোনো কথা বলল না। গাছের সাথে গা এলিয়ে দিয়ে সেও বসে রইলো। খেলার জন্য ডাকলো, তবে ইমদাদ গেল না। কলি কে এখানে একা রেখে যেতে ইচ্ছে করলো না।

বেশ কিছুটা সময় এমন নীরবতার মাঝে অতিবাহিত হওয়ার পর কলি উঠে দাঁড়িয়ে ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এখন বাড়ি যাই ইমদাদ ভাই। বাড়িতে অনেক কাজ পড়ে আছে। সন্ধ্যাও হয়ে যাচ্ছে। বাবা যদি বাড়ি ফিরে দেখে আমি বাড়ি নেই অনেক রাগারাগি করবে।”

ইমদাদও উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“আমি এগিয়ে দিয়ে আসব?”

“না লাগবে না। ছোটবেলা থেকে এখানেই বড় হয়ে উঠলাম আবার বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে হবে নাকি।”

“একটা প্রশ্ন করি তোকে কলি? ঠিকঠাক উত্তর দিবি কেমন?”

কলি মাথা নাড়িয়ে ইমদাদ কে আশ্বস্ত করে বলল,

“ঠিক আছে, বলো।”

“তোর সৎ মা কি তোকে মা’রে? খুব অত্যাচার করে তাই না?”

কলি মলিন হেসে বলল,

“না তো। উনি খুব ভালো।”

“তাহলে এতো মন ম’রা হয়ে থাকিস কেন যদি উনি ভালোই হয়ে থাকেন?”

“উনি ভালো বাবার চোখে। উনি না আমাকে বকাবকি করেন, না আমার গায়ে হাত তোলেন। উনি সবটা খুব সুন্দর ভাবে আমার বাবাকে দিয়েই করান। এভাবেই আমার বাবার চোখে উনি ভালো, আর সেই জন্য আমারও ওনাকে ভালোই বলতে হয়।”

ইমদাদ ফের বলে উঠলো,

“তুই খুব কষ্টে আছিস তাই না কলি? আমি কি করে তোর এই কষ্ট কমাই বলতো? আমায় একটা উপায় বলে দে তুই। তোর নীরবতা আমায় ভীষণ ভাবে পোড়াচ্ছে। আমি জানি না কেন, তবে তোর কষ্টে আমার নিজের অস্থির লাগছে।”

বিজ্ঞাপন

কলি ফের মলিন হেসে বলল,

“কেন আবার ইমদাদ ভাই, করুণা হচ্ছে তোমার আমার প্রতি। বাকি সবার যেমন আমার প্রতি করুণা হয়,তেমনি তোমারও তাই হচ্ছে। আসি।”

কথাটা বলে কলি চলে গেল। ইমদাদ কলির যাওয়ার পথে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

“শুধুই করুণা না কলি। তোর প্রতি আমার অনুভূতি বাকিদের থেকে আলাদা, বাকিদের থেকে অনেক তীব্র। তবে সেটা কি আমি নিজেও বুঝে উঠতে পারিনা।”

ইমদাদেরও আর মন টিকলো না সেখানে, আর খেলতেও যাওয়া হলো না। নিজেও নিজের বাড়ি চলে এলো। কলির পিছনেই এসেছে। তবে কলি সেটা টের পায়নি। কলি ওর বাড়িতে ঢুকতেই ইমদাদও নিজের বাড়িতে চলে গেল। পাশাপাশি বাড়ি। খুব বেশি দূরত্বও না।

___________

বাড়ির সামনে বেশ অনেকটা জায়গা উঠোন হিসাবে ব্যবহার হয় ইমদাদের বাড়ি তে। সেই উঠোনের মাঝ বরাবর ওর মা আঁখি রান্না ঘরে বসে রান্না করছেন। মাঠ থেকে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে ইমদাদ পড়তে বসেছিল। সামনেই স্নাতক প্রথম বর্ষের পরীক্ষা। রেজাল্ট খারাপ করলে বাড়িতে টিকতে পারা মুশকিল হয়ে যাবে।

এমনিতেই পাড়ায় ইমদাদের ভালো ছাত্র হিসেবে বেশ সুখ্যাতি ছিল, এখন আর তেমন একটা নেই। ছোটবেলা থেকেই ভালো রেজাল্ট শুনতে শুনতে সবাই এখন যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সবারই ধারণা ছিল ইমদাদ কোন একটা ভালো ভার্সিটিতে চান্স নিশ্চয়ই পাবে।

ইমদাদেরও নিজের উপর আত্মবিশ্বাস ছিল। ইচ্ছে ছিল বুয়েটে পড়ার, তবে সেখানে চান্স হয়নি। নিজের ওপরে রাগ আর অভিমান থেকে ইমদাদ আর কোন ভার্সিটি তে পরীক্ষাও দেয়নি। সর্বশেষ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়ে গিয়েছে।

বই খুলে পড়ায় একটুও মনোযোগ দিতে পারলো না। বারবার কলির মলিন মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছে। বারবার শুধু মনে হচ্ছে মেয়েটা খুব অসহায়, খুব কষ্টে আছে কলি। কলি কে এতটা মনমরা হয়ে থাকতে কখনো দেখেনি ইমদাদ। এভাবে কলি কে দেখতে অভ্যস্ত নয় ইমদাদ। মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে আছে।

পড়ায় কোনমতেই মন বসাতে পারল না ইমদাদ। বইটা বন্ধ করে উঠে গেল মায়ের কাছে। অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। আঁখি তখন রাতের রান্না করতে ব্যস্ত। ইমদাদ গিয়ে একটা টুল টেনে নিয়ে মায়ের পাশে বসলো। ইমদাদকে হঠাৎ করে রান্না ঘরে আসতে দেখেই আঁখি যেন আন্দাজ করতে পারলেন যে ছেলে ওনাকে কিছু একটা বলতে এসেছে। না হলে ওনার ছেলে তো রান্নাঘরে আসার মানুষ না।

“কিছু বলবি ইমদাদ?”

আঁখির প্রশ্ন শুনে ইমদাদ একটু চমকালো। ভাবনার মাঝে ছিলো। ভাবনার বিষয় ছিল কলি। হঠাৎ করে আঁখির মুখ থেকে এই প্রশ্নটা শুনে একটু চমকালো, সেই সাথে এও ভাবলো কি করে ওর মা বুঝলো যে ও কিছু একটা বলতে এসেছে।

ছেলের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে আঁখি ফের জিজ্ঞেস করলেন,

“কি হলো, কিছু বলবি?”

ইমদাদ আমতা আমতা করে বলল

“মা একটু কথা ছিল তোমার সাথে।”

“হ্যাঁ বল।”

ইমদাদ ইতস্তত গলায় বলল,

“কলির খোঁজখবর নাও তুমি?”

আঁখি ভ্রুঁ কুঁচকে বললেন,

“মানে? কিসের খোঁজখবর নেওয়ার কথা বলছিস?”

“ওর বাবা ওর গায়ে হাত তোলে মা। ওর সৎ মা-ও খুব একটা সুবিধার না। বুঝতেই পারছো কয়েকদিন হচ্ছে মেয়েটার মা মা'রা গেছে, এর উপরে একেই তো সৎ মা, তার ওপরে আবার বাবার এমন বাজে ব্যবহার।”

আঁখি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

“সে তো জানি বাবা, কিন্তু কি করবো বল? ওনার মেয়ের উপর ওনার অধিকার আছে। আমরা পাড়া-প্রতিবেশী, কিছু বলতে গেলেই ঝামেলা হবে। কিছু বলতে গেলে উনি একটা অজুহাত দেখান, বাবা হয়ে মেয়েকে শাসন করছেন এতে আমরা কোন অধিকারের কথা বলছি।”

ইমদাদ রাগে ফুঁসে উঠে বলল,

“বাবা হয়েছেন জন্য যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন না। কলি যথেষ্ট বড় হয়েছে। এভাবে ওর গায়ে হাত তুলতে পারেন না উনি কারণে অকারনে।”

“সেটা তুই আমি বলার কেউ না। এই পাড়ায় আরো অনেক মানুষ আছে। কারোই অজানা না যে কলির বাবা ওর সাথে কেমন ব্যবহার করে। তাই তুই কিংবা আমি একা কিছু বলে কোন কিছুই করতে পারব না।”

ইমদাদ ফের রাগে ফুঁসে উঠে বলল,

‘কলির বাপকে সোজা করার জন্য আমি একাই যথেষ্ট। আর যদি কখনো দেখেছি কলির গায়ে হাত তুলেছ ওর খবর আছে।”

ইমদাদ কথাটা বলে উঠে চলে যেতে ধরলে ওর মা হাত টেনে ধরে ছেলেকে আবার পুনরায় টুলে বসতে ইশারা করলেন। আঁখি মাটির চুলায় একফালি চেরা কাঠ দিয়ে ছেলের দিকে ঘুরে বসে ভ্রুঁ কুঁচকে বললেন,

“কলিকে নিয়ে তোর এত চিন্তা কেন ইমদাদ?”

ইমদাদকে একটু বিচলিত হতে দেখা গেল। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে মৃদু তোতলানো গলায় আঁখিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এমনিতেই। ছোটবেলা থেকে চিনি মেয়েটাকে, খারাপ লাগবে না?”

“ছোটবেলা থেকে আমিও কলি কে চিনি, বাকি সবাই, কলির পুরো পরিবার ওকে চেনে। কারোরই কলির প্রতি তোর মতন এত দরদ নেই।”

ইমদাদ এবারে বিরক্তিকর গলায় বলল

“তুমি অযথা একটা স্বাভাবিক কথাকে টেনে বাড়াচ্ছো মা। ছাড়ো তো ঘরে যাব, পড়তে বসতে হবে।”

“একটা যুবতী মেয়ের সাথে যুবক ছেলের এতো মেলামেশা কিন্তু কেউই ভালো চোখে দেখে না ইমদাদ। তোর যথেষ্ট বয়স হয়েছে এইসব বোঝার। কলি পরের মেয়ে, ওকে কিছু বলার অধিকার আমার নেই। তবে তুই আমার নিজের পেটের ছেলে, তাই তোকেই বোঝাতে পারবো। অনেক কথাই কিন্তু আমার কানে আসে প্রতিবেশীদের। তোর বাবারও এই বিষয়টা পছন্দ না।”

“এখানে আবার পছন্দ-অপছন্দের কি আছে? কি করি আমি আর কলি?”

“মনে রাখিস ইমদাদ এটা বিদেশ নয় যে দুটো ছেলে মেয়ের বন্ধুত্ব মানুষ ঠিক নজরে দেখবে। নানান জন নানান রকমের কথা বলে। কলির কথাগুলো আমায় বললি ঠিক আছে, তবে তোর বাবার সামনে যেন ভুল করেও এই কথাগুলো তুলিস না। আর একটা কথা, কলির সাথে মেলামেশা কমা। আর ওকে নিয়ে তোর এত চিন্তা করতে হবে না। ওর পুরো গুষ্টি আছে ওকে নিয়ে চিন্তা করার জন্য।”

আঁখির কথার সাথে কোনমতেই সম্মতি জানাতে পারলো না ইমদাদ। চিন্তা করবে না কেন? অবশ্যই চিন্তা করবে। কলির পুরো গুষ্টি আছে জন্য ইমদাদ চিন্তা করে ছেড়ে দেবে নাকি। অদ্ভুত সব কথাবার্তা বলে মানুষজন।

কারোর কি হৃদয় নেই নাকি? ওই ফুলের মত ফুটফুটে মেয়েটাকে অযথা কারণ ছাড়া মা'রে। কেউ তো প্রতিবাদ করেই না, আবার ইমদাদ প্রতিবাদ করতে চাইলেও দোষ। আবার বলে যেন ওকে নিয়ে না ভাবে। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মৃদু গম্ভীর গলায় আঁখি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমাদের কাউকে চিন্তা করতে হবেও না কলিকে নিয়ে। এমনিতেও কলি খুব বেশিদিন থাকবেও না এই পাড়াতে। একবার ইমদাদ কে কিছু একটা করতে দাও, কলিকে নিয়ে চলে যাবে এখান থেকে।”

ছেলের কথা শুনে আঁখির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। কিঞ্চিত চেঁচিয়ে উঠে বললেন,

“চলে যাবি মানে? কোথায় নিয়ে যাবি তুই কলিকে? কলি কেন তোর সাথে যাবে?”

ইমদাদ নির্ভয়ে উত্তরে বলল,

“সময় হলে এমনিতেই টের পাবে। কলি কে আমি নিয়ে যাবোই।”

কথাটা বলে ইমদাদ হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে ঘরের ভেতরে চলে গেল। আঁখি হা করে সেখানে বসে রইলেন। কিছুক্ষণ থ মেরে বসে থাকার পর নিজেই নিজেকে বোঝালেন, ছেলের বয়স কম। আবেগের বশবর্তী হয়ে হয়তো কথাগুলো বলে ফেলেছে। আরেকটু বয়স হলে ঠিক বুঝবে।

বিজ্ঞাপন
ধুলো মাখা গলিতে গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সামাজিক বাংলা উপন্যাস