অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ৯

🟢

কলেজ ক্যাম্পাসে মাঠের মাঝে নিজের বন্ধুদের সাথে বসে আছে ইমাদ। আজেবাজে কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না বরং ওদের আলোচনার মুখ্য বিষয় হচ্ছে পড়াশোনা। কেননা ইমাদ সাথে আছে। ইমাদ সাথে থাকতে পড়াশোনা বাদে অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে এটা অসম্ভব।

ক্লাস শেষে মাইশাও বান্ধবীদের সাথে নিচে এলো। হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলো ইমাদকে। বান্ধবীদেরকে একটু অপেক্ষা করতে বলে ছুটে এলো ইমাদের কাছে। একটু ভাব নিয়ে ইমাদ কে একবার ডাকলো। পরিচিত কণ্ঠস্বর পেয়ে ইমাদ মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,

“কিছু বলবে?”

“হ্যাঁ। একটা দরকারি কথা ছিল। একটু এদিকে এসো তো।”

মাইশা উঠে ওর সাথে একটু আলাদা জায়গায় যাওয়ার কথা বলল, তবে ইমাদের সেটা পছন্দ হলো না। ওদের মাঝে এত ভালো সম্পর্ক নেই। সেখানে কি এমন বলবে যে আবার উঠে গিয়ে শুনতে হবে।

“এখানেই বলো।”

মাইশা এবার একটু গম্ভীর গলায় বলল,

“বললাম তো দরকারি কথা আছে। সবার সামনে বলা যাবে না। এদিকে এসো।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইমাদ গেল। বন্ধুদের থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

“এবার বলো কি বলবে?”

মাইশা একটু সময় নিয়ে বলল,

“ইমদাদ ভাইয়ের নাম্বারটা দাও তো।”

মাইশা কথাটা বলতেই ইমাদ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“ভাইয়ার নাম্বার নিয়ে তুমি কি করবে?”

“কি করবো না করবো সেটা আমার ব্যাপার, আমি বুঝে নেব। তোমাকে নাম্বার দিতে বলেছি চুপচাপ নাম্বার দাও।”

ইমাদ দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“সম্ভব না। ভাইয়া নিষেধ করেছে ভাইয়ার নাম্বার তোমার মতন কোন আজেবাজে মেয়েকে দিতে।”

মাইশা চোখ বড় বড় করে ইমাদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কি বললে আমি আজেবাজে মেয়ে? আমাকে তোমার আজেবাজে মেয়ে মনে হয়?”

ইমাদ নিঃসংকোচে বলল,

“অবশ্যই। না হলে কি একটা মেয়ে হয়ে একটা ছেলের নাম্বার নিতে আসতে এভাবে।”

“আরে আমি কি অপরিচিত কারো নাম্বার চাইতে এসেছে নাকি? ইমদাদ ভাই তো আমার নিজের মানুষ। আমার কাছে ছিল ইমদাদ ভাইয়ের নাম্বার, তবে ডিলিট হয়ে গেছে জন্য তোমার থেকে চাইছি।”

ইমাদ বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

“অসম্ভব। তোমার কাছে ভাইয়ার নাম্বার থাকতেই পারে না। ভাইয়া যাকে তাকে নিজের নাম্বার দেয় না।”

মাইশা এবারে কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

“বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ইমাদ। তুমি বেশি অপমান করছো আমায়।”

ইমাদ আবারো নিঃসংকোচে বলল,

“অপমান করছি না। তোমার যেমন ব্যবহার প্রাপ্য তেমন ব্যবহারই করছি। আর যদি খুব বেশি দরকার হয় ভাইয়ার নাম্বার তাহলে ভাইয়ার থেকে গিয়ে চেয়ে নিও। আমি তোমায় নাম্বার দিয়ে পরে ভাইয়ার কাছে কথা শুনতে পারবো না।”

কথাটা বলে ইমাদ চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। রাগে মাইশার মাথাটা গরম হয়ে উঠল। ইচ্ছে করছে ইমাদের মাথার চুল টেনে ছিড়তে। কিংবা গালে কয়েকটা চ’ড় বসিয়ে দিতে। মাটির উপর ফেলে কয়েকটা কিল ঘুসি লাগাতে পারলেও হয়তো শান্তি পেত। মাইশা ভাবতে লাগলো আরো কি কি করা যায় ইমাদের সাথে এবং প্রতিজ্ঞা করলো নিজের কাছে, যেদিন সুযোগ পাবে ইমাদ কে মে’রেই ছাড়বে।

মাইশার এসব ভাবনার মাঝেই ইমাদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলো ইমাদ এখনো যায়নি। রাগী গলায় বলল,

“এখনো যাওনি তুমি? আরো অপমান করা বাকি আছে নাকি?”

ইমাদ একটু কেঁশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল,

“দেখতে শুনতে তো বেশ ভালোই, পড়াশোনাতেও ভালো, স্বভাব কেন এমন? নিজের স্বভাব বদলাও, তাহলে ইমদাদের মতনই কাউকে পেলেও পেতে পারো।”

__________

সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গিয়েছে তাও সরদার বাড়ি থেকে সাঈদের কাছে একটা কলও আসেনি। কামাল সরদার কি সিদ্ধান্ত নিলেন সেই বিষয়ে এখনো কিছু জানেনা সাঈদ। সাঈদ এই বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল যে বাড়িতে আগে সাঈদের জায়গা হবে তারপরে শাহিনের, তবে সেই বিশ্বাসটা যেন একটু একটু করে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

এতক্ষণে কোন খবর এলো না কেন? সারারাত বাড়ির ছেলে মেয়ে বাড়ির বাইরে থাকলো, আবার রাত পেরিয়ে সকাল গড়িয়ে দুপুরে হয়ে গেল তাও কোন খবর এলো না। কারো কোন চিন্তাই হলো না ছেলে মেয়ে দুজনের জন্য।

সোফায় বসে এসবই ভাবছে সাঈদ। ওর এসব ভাবনার মাঝেই ওর পাশে এসে ধপ করে ইমদাদ বসলো। আজ কাজে যায়নি ইমদাদ। তার অন্যতম কারণ বাড়িতে সাঈদ আর কলি আছে। পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না ওদের দুজনকে। আবার যেহেতু ওরা বাড়িতে আছে সরদার বাড়ি থেকেও কেউ আসতে পারে ওদেরকে নিতে। ইমাদও বাড়িতে নেই। ইকবাল আর ইয়াসমিনকে একা বাড়িতে রেখে যেতে মন সায় দেয়নি।

সাঈদ ঘাড় ঘুরিয়ে ইমদাদ কে দেখে নিয়ে আবার নিজের মুখটা ঘুরিয়ে নিলো। ইমদাদ সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কেউ তো নিতে এলো না ও বাড়ি থেকে তোদের। কাল বলেছিলাম যতদিন ইচ্ছে থাকতে পারিস, তাই বলে সত্যি সারা জীবনের জন্য থাকবি নাকি?”

সাঈদ কিঞ্চিত বিরক্তির সুরে বলল,

“বেশি অপমান করিস না ইমদাদ। একবার যদি আমার আত্মসম্মানে লেগে যায় চলে যাব কিন্তু।”

বাড়ির সদর দরজা তখন খোলাই আছে। ইকবাল একটু আগে বাইরে গিয়েছে, দরজাটার বন্ধ করা হয়নি। ইমদাদ হাতের ইশারায় দরজার দিকটা সাঈদ কে দেখিয়ে বলল,

“দরজাটা খোলা আছেই, যা। তোর যেন আত্মসম্মানে লাগে সেভাবেই তো আমি বারবার খোঁচা দিচ্ছি, কিন্তু দেখছি তোর আত্মসম্মানে লাগছেই না। আদৌ আত্মসম্মান বলতে কিছু আছে তোর?”

ইমদাদের কথাটা এবারে সত্যি সত্যি সাঈদের আত্মসম্মানে লাগলো। ভীষণ রাগ হলো ইমদাদের প্রতি, তবে ইমদাদের থেকেও বেশি রাগ হলো নিজের বাপ দাদার উপরে যে এতক্ষনো কেন তারা সাঈদ আর কলির খোঁজ করলো না।

বসা থেকে উঠে দাড়িয়ে রাগী গলায় ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“চিন্তা করিস না, চলে যাব। আর জীবনেও পা রাখবো না তোর বাড়িতে।”

ইমদাদ বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আমি তো এটাই চাই যেন তোদের বাড়ির কারোর ছায়াও আমার বাড়িতে না পড়ে। তবে আমার বউটাকে রেখে যাস। বউকে সারাজীবন বসিয়ে খাওয়ানো যায়, তবে শালা কে না। ওহ্ তুই তো আবার আমার শালা না, সম্বন্ধি।”

সাঈদের রাগ তরতর করে বাড়লো। ইচ্ছে করলো ইমদাদের মুখটাই বন্ধ করে দিতে। যদি সেলাই করে দিতে পারতো তাহলে হয়তো শান্তি পেত, তবে সেটা তো সম্ভব না। জানে ছেলেটার মুখ চলবেই, ওকে থামানো যাবে না।

তবে সাঈদও তো ইমদাদেরই বন্ধু, আবার ভাইও। সাঈদই বা কি করে থামে। সাঈদ নিজেও তেঁতে উঠে কিছু বলতে চাইলো, তবে সেই সুযোগ হলো না। তার আগেই ওর কানে কামাল সরদারের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

সাঈদ আর ইমদাদ দুজনেই একযোগে চমকে তাকালো দরজার দিকে। ওরা ভুল শোনেনি। দরজার সামনে স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছেন কামাল সরদার। বিস্ময়ে ইমদাদের মুখ হা হয়ে গেল। যে মানুষটা ইমদাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে চলাচল করতেও অস্বস্তি বোধ করে, সেই মানুষ কিনা স্বয়ং ইমদাদের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, এটাও সম্ভব!

কথাগুলো ভেবে হাসলো ইমদাদ। অবশ্যই সম্ভব। কামাল সরদারের আদরের নাতি এই বাড়িতে আছে বলে কথা। সরদার বাড়ির রাজপুত্র রাজপ্রাসাদ ছেড়ে কুঁড়েঘরে এসে থাকছে, কামাল সরদারের কষ্ট হবে এটাই তো স্বাভাবিক। সেজন্যই তো তিনি নিজেই নাতি কে নিতে এসেছেন। ভুলে গেছেন তার অস্বস্তির কথা।

কামাল সরদার একা আসেননি। ওনার সাথে ওনার স্ত্রী ফরিদা বেগম আর বড় ছেলে করিম সরদারও এসেছে। কামাল সরদারের কন্ঠ পেয়ে ঘরের ভেতর থেকে ইয়াসমিন আর কলিও বেরিয়ে এসেছে। নিজের পরিবারের লোকজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কলির মুখেও হাসি ফুটে উঠলো। মনে হলো আবার কলি নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

কামাল সরদার আর করিম সরদারের উপস্থিতি ইমদাদের ওপর তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারল না। ইমদাদের রাগ হয়েছে ওদের দেখে ঠিকই, তবে সেসব ওদের বুঝতে দিল না। এমন ভাব করলো যেন ওদেরকে দেখেইনি।

তবে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল ফরিদা বেগমের জন্য। এই মানুষটা ইমদাদের ভীষণ প্রিয়। যেমন ভালোবাসে ঠিক তেমনি শ্রদ্ধাও করে। হাত ধরে ফরিদা বেগমকে ঘরের ভেতরে নিয়ে এলো। ফরিদা বেগম একটু ভয়ে ছিলেন যে কখন না জানি তার স্বামী, ছেলে কি বলে ওঠে, তবে খেয়াল করলেন ওরা চুপ করেই দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বলল না। তাই তিনিও আর ভিতরে আসতে ভয় পেলেন না।

একে একে ঘরের ভিতরে কামাল সরদার আর করিম সরদারও এলেন। কামাল সরদার নিজের নাতির দিকে এগিয়ে বললেন,

“দাদুর প্রতি তোমার এতোটুকু বিশ্বাস ছিল না যে তিনি তোমাকে প্রাধান্য দেবেন? আমার প্রতি বিশ্বাস রেখেও কি থেকে যেতে পারতে না ঐ বাড়িতে?”

“যেদিন শুনেছি সম্মানের ভয়ে শাহিনের সাথে আমার বোনের বিয়ে ঠিক করেছেন সেদিনই সব বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেছে? বলা তো যায় না হয়তো আমার প্রাধান্যও কমে গিয়ে থাকতে পারে।”

কামাল সরদার কিছু বলার আগে নাতিকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলেন। নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদূরে গলায় বললেন,

“তোমার প্রাধান্য সরদার বাড়িতে কখনো কমতে পারে না। সরদার বাড়ির বিশাল সাম্রাজ্যের তুমিই তো রাজা। তোমায় ছাড়া কি ওই বাড়িতে ভালো লাগে? ফিরে চলো। তুমি যা চাইবে তোমার দাদু তাই করবে।”

ওদের থেকে একটু দূরে ইমদাদ দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো সাঈদ আর কামাল সরদারের দিকে। খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজের চোখ নামিয়ে নিল।

দূরে দাঁড়ানো কলি খেয়াল করলো ইমদাদকে। হঠাৎ করে ইমদাদের মুখটা কেমন যেন শুকনো লাগলো কলির। আবার মনে হলো চোখ দুটো যেন একটু ছলছল করছে। ইমদাদ কি কষ্ট পেল? নিজের গুরুত্ব খুঁজতে চাইলো সরদার বাড়িতে? হতেও পারে।

সাঈদের ইচ্ছে কামাল সরদার পূরণ করেছে। শাহিনকে নাকি নিজের নানু বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাই এখানে থাকার কোন মানে হয় না। নিজের নাতি নাতনি কে নিয়ে চলে যেতে চাইলেন তিনি। যদিও ওনার মুখ্য উদ্দেশ্য কলিকে নিয়ে যাওয়া না, সাঈদ কে নিয়ে যাওয়া। তবে এখন সাঈদ কে হাতে রাখার জন্য হলেও কলির সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। তিনি আদুরে গলায় কলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“কলি, চলো বাড়ি ফিরে যাই। দাদু তোমাদের নিতে এসেছে।”

কলির মন সায় জানালো না যাওয়ার জন্য। অবাক করার বিষয় হলো কলি এসে দাঁড়ালো ইমদাদের পাশে। ইমদাদ নিজেই চমকে তাকালো কলির দিকে। কলি নিজ থেকেই ইমদাদের বাহু ধরে বলল,

“ইমদাদ ভাই, আমি যাব না ওই বাড়িতে। ওখানে গেলে ওরা আমার অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দেবে। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই।”

ইমদাদ যেন ভুলেই গেল যে কলি নাটক করছে। বিপদ থেকে বাঁচার জন্য ওর কাছে আশ্রয় চাইছে। খুব অল্প সময়ের জন্য ইমদাদের কাছে সবটা সত্যি মনে হলো। মনে হলো কলি সত্যি ওর কাছে থাকতে চাইছে।

কলির হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,

“তুই সত্যি থাকবি আমার কাছে? থাকতে চাস তুই এখানে? তুই থাকতে চাইলে আমি রাখবো তোকে। কেউ নিয়ে যেতে পারবে না আমার কাছ থেকে তোকে।”

কলির কেন যেন মনে হলো যে ইমদাদ মন থেকে কথাগুলো বলল। কিন্তু এটা তো সম্ভব না। কলি নিজেই আবার নিজেকে বোঝালো যে ইমদাদ নিজেও নাটক করছে। মানুষটা এত সুন্দর অভিনয় করতে পারে যে কখন অভিনয় করছে, আর কখন সত্যি বলছে সেসব ধরাই যায় না। অভিনয়ে একদম ওস্তাদ।

এদিকে কলির কথাটা পছন্দ হলো না ওর বাবার। রাগী গলায় মেয়েকে উদ্দেশ্য করেন বললেন,

“বাড়িতে চলো। তোমার বাবা দাদু এসেছে আর তুমি আমাদেরকে রেখে ওই ছেলেটাকে প্রাধান্য দিচ্ছো।”

কলি নিজেই করিম সরদার কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“হ্যাঁ প্রাধান্য দিচ্ছি। তার কারণ আমার জীবনে ইমদাদ ভাইয়ের গুরুত্ব আছে। বিয়ে হয়েছে আমাদের। কতবার তোমাদের আর এক কথা বলতে হবে? আমি যাব না এখান থেকে।”

করিম সরদার এবারে গর্জে উঠে বললেন,

“বেশি বেয়াদবি করছো কিন্তু। আমাকে রাগিও না। ফল ভালো হবে না।”

করিম সরদার নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতেই ইমদাদ নিজেও গর্জে উঠে সাবধানী গলায় বলল,

“আস্তে কথা বলুন। এটা আমার বাড়ি। আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমার স্ত্রীর সাথে উঁচু গলায় কথা বলবেন এটা আমার মোটেই পছন্দ না।”

কলি চমকে তাকালো ইমদাদের দিকে। ইমদাদের কথা বলার ভঙ্গিটাই কেমন যেন অন্যরকম লাগলো। হালকা করে একটু খোঁচা দিল ইমদাদের কোমরে। ইমদাদ নড়ে উঠে তাকালো কলির দিকে। কলি ইশারায় ইমদাদ কে বোঝানোর চেষ্টা করলো যে ইমদাদ বাড়াবাড়ি করছে। এত নাটক করার দরকার নেই।

ইশারায় দুজনের কথোপকথনের মাঝে ফরিদা বেগম নিজের ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ছেলেমেয়ে তো বলছে ওদের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন আর রাগারাগি না করে আমাদের বড়দের এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা উচিত। আর আলোচনা করে ওদের চার হাতটা আনুষ্ঠানিকভাবে এক করে দেওয়াই ভালো হবে বলে আমি মনে করি।”

ফরিদা বেগম কথাটা বলার সাথে সাথে কামাল সরদার অগ্নিদৃষ্ট নিক্ষেপ করলেন ওনার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি থেমে গেলেন। এই সামান্য কথাটুকু বলার অধিকারও নেই তার এত বছরের সংসারে। তিনি আফসোস করলেন না, কোন আক্ষেপও নেই তার। ছিল একসময় প্রচুর আফসোস, তবে ধীরে ধীরে সবটাই শেষ হয়ে গেছে। এখন তিনি অনুভূতিহীন।

স্ত্রীকে সাবধান করা শেষে কামাল সরদার এবারে সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোমার কথা আমি রেখেছি, এবার আমাদের বাড়ির সম্মানকে আমাদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তোমার। কি করে কলিকে এই ছেলের কবল থেকে বাঁচাবে সেটাও তোমার ব্যাপার। শাহিনের থেকে বাঁচাতে চাইছো বোন কে, আমার তো মনে হয় এই ছেলের থেকে শাহিন অনেক ভালো।”

সাঈদ সরাসরি কামাল সরদারের কথায় তীব্র বিরোধিতা জানিয়ে বলল,

“এটা অসম্ভব। ইমদাদের তুলনা ইমদাদ নিজেই। আপনার কুলাঙ্গার নাতির সাথে ইমদাদের তুলনা করতে আসবেন না। আর এটা সত্যি যে ওদের বিয়ে হয়েছে। আমি নিজে খোঁজ নিয়েছি। বিশ্বাস আছে তো আপনার আমার ওপরে। ওরা যেহেতু বিয়েটা করেই নিয়েছে তাহলে আর আপত্তি জানানোর তো কোন মানে হয় না।”

কামাল সরদার বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সাঈদের দিকে। সাঈদ কি কথাটা সত্যি বলল যে কলি আর ইমদাদের বিয়ে হয়ে গেছে? কামাল সরদার তো বিশ্বাস করেন সাঈদকে। আর এই বিষয়টা নিয়ে মিথ্যে বলার কথা না সাঈদের।

একটা সময় ইমদাদ প্রিয় ছিল সাঈদের। এখনো খুব প্রিয় আছে। তাই বলে নিজের বোনের আগে ইমদাদ কে প্রাধান্য দেওয়ার কথা না। তবে কি সত্যিই ইমদাদ আর কলির বিয়েটা হয়ে গিয়েছে? যদি এমনটা হয়ে থাকে তবে তো ঠিক হয়নি। কামাল সরদার তো তবে হেরে যাবেন।

তিনি নিজে আপন মনে কিছু একটা ভাবলেন। কারো সাথে পরামর্শ করার দরকার হলো না। তিনি নিজেই মনে মনে কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে কলিকে আস্বস্ত করে বললেন,

“ঠিক আছে। মেনে নিলাম তোমার কথা। বিয়ে দেবো না তোমার শাহিনের সাথে। শুধু শাহিন কেন তুমি যতদিন না চাইবে তোমার বিয়ে কারো সাথেই দেব না। তবুও ফিরে চল বাড়িতে। এই ছেলের সাথে থেকো না। জীবন নষ্ট হয়ে যাবে।”

কলি সন্দেহী গলায় বলল,

“সত্যি বলছো? সত্যি আমার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে আমার অন্য কোথাও বিয়ে দেবে না তো দাদু?”

কামাল সরদার আলতো হেসে বললেন,

“তোমার ভাইয়ার সামনে কথা দিলাম, কথার খেলাফ হবে না। কামাল সরদার এক কথার মানুষ। তোমার ভালোর জন্যই তোমার বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম তাড়াতাড়ি, তবে যেহেতু তুমি সেটা চাইছো না তবে তুমি যা চাও তাই হোক। তুমি শুধু এই ভুল সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে এসো৷ এই বাড়ি, এই মানুষগুলো, এই ছেলেটা তোমার জন্য ঠিক না।”

কলির আর কিচ্ছু ভাবার প্রয়োজন হলো না। সঙ্গে সঙ্গে ইমদাদের হাতটা ছেড়ে দিল। ইমদাদের যেন টনক নড়ল। ধ্যান থেকে বেরিয়ে এলো। খেয়াল করলো কলি ওর হাতটা ছেড়ে দিয়ে চলে গেল নিজের দাদুর কাছে।

ইমদাদের কষ্ট হওয়ার কথা ছিল না, তারপরও কষ্ট হলো। মনে হলো ভুল মানুষের হাত ধরেছিল ইমদাদ। আজ আবারও কলি প্রমাণ করে দিল যে ও স্বার্থপর। আজ আবারও কলি প্রমাণ করে দিল যে ও সরদার বাড়ির মেয়ে। শুধু ইমদাদ কে ব্যবহার করলো নিজের স্বার্থের জন্য। যতটুকু সময় প্রয়োজন ছিল ঠিক ততটুকু সময় ইমদাদের হাতটা ধরেছিলো। যেই ইমদাদের প্রয়োজন শেষ ওমনি ইমদাদ কে ছুঁড়ে ফেলে দিল। একবার ফিরেও তাকানোর প্রয়োজন মনে করলো না।

কলির থেকে ইমদাদের নিজের উপরে বেশি রাগ হলো। কেন যে ইমদাদ বারবার ভুল করে এই মেয়েটাকে বোকা ভেবে কে জানে। কেন যে বারবার এই মেয়েটার প্রতি এত মায়া জন্মায় কে জানে। তবে আর এই মেয়েটার প্রতি কোন দুর্বলতা তৈরি হতে দেবে না।

নিজেদের মাঝে সবকিছু মিটমাট হয়ে গিয়েছে। তাই এবার সরদার বাড়ির লোকজন যাওয়ার জন্য তৈরি হলো। যাওয়ার আগে ফরিদা বেগম ইমদাদ আর ইয়াসমিন কে বেশ আদর করলেন, তবে তার সাহস হলো না নাতি-নাতনিদের ওই বাড়িতে যাওয়ার কথা বলার। একে একে সবাই চলে গেল বাড়ি থেকে। সবার শেষে কলি চলে যেতে ধরলে ইমদাদ ওর হাত টেনে ধরে সাবধান করে বলল,

“সাবধানে থাকিস। তোর দাদু কিন্তু লোক দেখানো কথা দিলো। উনি এক কথার মানুষ না। কথার খেলাফ করা ওনার স্বভাব। নিজের সম্মানের জন্য উনি সব করতে পারেন। একবার যদি কোন সুযোগ পায় তবে কিন্তু উনি শাহিনের সাথে তোর বিয়েটা দিতে দুবারও ভাববে না।”

ইমদাদের কথায় কলি অসম্মতি জানিয়ে বলল,

“না, এটা হবে না। দাদু কথা দিয়েছে।”

“বললাম না কথার খেলাফ করা ওনার স্বভাব। উনি কিন্তু আজ এখানে তোর টানে আসেননি, এসেছিলেন শুধু সাঈদের টানে। তোর প্রতি ওনার কোন ভালোবাসা, কোন দুর্বলতা, কোন মায়া নেই। তুই শুধু ওনার বাড়ির সম্মান কলি। আমার কথা শোন, যাস না ওই বাড়িতে। ক্ষতি তোর হবে।”

কলি এক ঝটকায় ইমদাদের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“মানছি তুমি সাহায্য করেছো আমায়। আমি এটাও মানছি যে বিপদ থেকে বেরোনোর জন্য আমি তোমায় ব্যবহার করেছি, তাই বলে এই সুযোগে আমার পরিবারের নামে আমার কানে বিষ ঢালবে তুমি? আমার পরিবার তাই বলে এতটাও খারাপ না। আর কখনো আমার কানে ওদের নামে বিষ ঢালার চেষ্টা করবে না।”

কথাটা বলে কলি চলে গেল। ইমদাদ তাকিয়ে থাকলো কলির যাওয়ার দিকে। নিজেই হাসলা। হঠাৎ করে ইমদাদের মন মেজাজটা কেমন যেন ফুরফুরে হয়ে উঠলা। কেননা ইমদাদ জানে কলি কে আবার এখানেই ফিরে আসতে হবে। ইমদাদ জানে কামাল সরদার নিজের কথার খেলাফ করবেই করবে। আর ইমদাদ এটাও খুব ভালোভাবেই জানে যে কামাল সরদার একটা সুযোগ পেলেই কলির বিয়ে দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন, আর কলিকে তখন ছুটে সাহায্যের জন্য ইমদাদের কাছেই আসতে হবে।

ইমদাদ শুধু অপেক্ষা করলো সেই সময়ের জন্য যখন কলি ওর কাছে সাহায্যের জন্য ছুটে আসবে। আর ইমদাদ সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে কলি সহ পুরো সরদার বাড়িকে শায়েস্তা করার একটা পথ খুঁজে নেবে।

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প