বেশ অনেকটা সময় নিয়েই কলি গোসল করলো। এতটা সময় নিয়ে গোসল করার প্রথম কারণ হচ্ছে একটু একাকী সময় কাটাতে চাওয়া। কলি জানে ঘরে গেলেই ইমদাদ ওকে এক মুহূর্তের জন্য শান্তিতে থাকতে দেবে না। ইচ্ছে করে কলিকে বিরক্ত করার জন্য সারাক্ষন ওর পিছনে লেগেই থাকবে। আর কলি এখন একটু একা থাকতে চায়।
তবে এভাবে ওয়াশরুমে আর কতটা সময়ই বা কাটানো যায়। নিজেই নিজের মনকে মানিয়ে কিছুটা সাহস আর ধৈর্য সঞ্চয় করে বের হলো ওয়াশরুম থেকে এবং কলির ধারণা অনুযায়ী দরজাটা খুলতেই ইমদাদের মুখটা দেখতে পেল।
কি সুন্দর বিছানার উপর বসে পা দোলাতে দোলাতে ফোন চালাচ্ছে। দরজা খোলার শব্দ পেতেই ইমদাদ মাথা তুলে একবার তাকালো সেদিকে।
দীর্ঘক্ষণ কাঁদার ফলে কলির চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। ইমদাদের কাছে কলির চোখ দুটো জ্বলন্ত মনে হলো। মনে হলো অসীম ঘৃণা জমে আছে সেই চোখ দুটোতে। ইমদাদের প্রতি তীব্র আক্রোশে ফেটে পড়ছে যেন কলি। তবে ইমদাদ খুব বেশি পাত্তা দিলো না সেসবে। চুপচাপ আবার নিজের দৃষ্টি নামিয়ে ফোনের স্ক্রিনের উপর রেখে পা দোলাতে দোলাতে আপন মনে ফোন চালাতে লাগলো।
কলি কয়েকটা শ্বাস ফেলে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করল। কলি যেহেতু বিপদে পড়েছে সেহেতু অযথা রাগলে চলবে না। নিজেকে সামলাতে হবে। নয়তো এই আশ্রয়টাও হারিয়ে ফেলার ভয় আছে। আর যদি এই আশ্রয়টা হারিয়ে ফেলে তবে গিয়ে সেই সরদার বাড়িতেই পড়বে। অন্তত সাঈদ না ফেরা অব্দি কলিকে শান্ত থাকতে হবে।
ঝগড়া ঝামেলা করার কোন ইচ্ছে নেই কলির। তাই চুপচাপ ইমদাদ কে পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলো। তবে দরজার কাছে গিয়ে থামতে হলো ইমদাদের ডাকে। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও থামতে হলো কলিকে।
“ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই। ভূতের সঙ্গে গল্প করার জন্য যাচ্ছিস?”
কলি পিছন ফিরে না তাকিয়েই শান্ত গলায় ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমিও ঘুমোনোর জন্যই যাচ্ছি।”
ফোনটা বিছানার উপর রাখলো ইমদাদ। উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত পকেটে গুঁজে কলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“একটু আগেই তো বললাম এই বাড়িতে কেবলমাত্র আমার ঘরেই তোর জায়গা হবে, অন্য কোথাও হবে না।”
কলি এবার কিঞ্চিৎ রাগী গলায় বলল,
“বিয়ে করেছি জন্য নিজের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছি নাকি? তোমার হাতের পুতুল না আমি যে তুমি যখন যা বলবে আমি তাই করবো। বিপদে পড়েছিলাম আমি সেইজন্য তোমার এই শর্তটা রাখতে বাধ্য হয়েছি। বাড়াবাড়ি করতে এসোনা।”
কলির কথা শুনে ইমদাদ কিঞ্চিত ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। কলি কপাল কোঁচকালো ইমদাদের সে হাসি দেখে। হাসার মতন কলি কি বলল সেটাই খুঁজে পেল না। বারবার নিজের বলা কথাগুলো মনে করতে লাগলো কলি, তবে এমন কোন কথা খুঁজে পেল না যাতে ইমদাদের হাসি পেতে পারে।
কলির এসব ভাবনার মাঝেই খেয়াল করলো ইমদাদ ওর দিকে এগিয়ে আসছে। কলি ঘাবড়ালো, তবে সেটা বুঝতে দিতে চাইলো না ইমদাদ কে। বরং রাগী গলায় বলল,
“সবসময় এমন আমার দিকে এগিয়ে এসে ভয় দেখাতে চাও কেন?”
কলির প্রশ্নের ইমদাদ কোন উত্তর দিল না। দেখতে দেখতে অনেকটাই কাছাকাছি চলে এলো ইমদাদ। কলিও ততক্ষণে দুই এক কদম করে পেছানো শুরু করেছে। ইমদাদ হাত বাড়ালো কলির দিকে। কলি এবারে বেশ ভালোই ঘাবড়ালো। ইমদাদের উদ্দেশ্যে সাবধানে বাণীও ছুড়লো।
“ভুলেও আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবে না। পরিণতি ভালো হবে না কিন্তু।”
ইমদাদ ফের রহস্যময় হাসলো। কলির দিকে বাড়ানো হাতটা ঘুরে নিয়ে গিয়ে দরজায় রাখলো। কলি ভয়ে খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে নিয়েছে। ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল ইমদাদ। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে কলি একটু কেঁপে উঠলো। চোখ খুলে দেখলো দরজার ছিটকিনি লাগাচ্ছে ইমদাদ।
“দরজা বন্ধ করছো কেন? বললাম তো জোর করে তুমি সব করাতে পারো না আমায় দিয়ে। আমি ইয়াসমিন আপুর সাথে ঘুমোবো।”
ইমদাদ এবারে রাগী দৃষ্টিতে কলির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“চুপচাপ বিছানায় গিয়ে ঘুমোবি। এই নিয়ে আর একটা কথাও আমি শুনতে চাই না তোর মুখে।”
কথাটা বলে ইমদাদ সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে কলি বলে উঠলো,
“তুমি পুরুষ মানুষ। আমি জানি আমি তোমার গায়ের জোরের সাথে পারবো না। তবে একটা কথা মনে রেখো, যদি তুমি আমার উপর স্বামী হওয়ার অধিকার জোর করে খাটাতে আসো তাহলে...…”
কলিকে নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে ইমদাদ ওর দিকে তেড়ে গিয়ে বলল,
“তাহলে কি? সিনেমার মতন ডায়লগ ঝাড়বি তাহলে তোর শরীর পাবো, তোর মন পাবো না তাইতো? একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ, আমার না তোর শরীরের দরকার আছে আর না তোর মনের দরকার আছে। আমার শুধু দরকার তোর চোখের জল, তোর আর্তনাদ, তোর হাহাকার। এছাড়া আমার তোর থেকে আর কিছুর প্রয়োজন নেই। তোর শরীর আর তোর মন দুটোই তুই তোর কাছে রাখ।”
কথাটা বলে ইমদাদ ঝড়ের বেগে গিয়ে বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। দরজার কাছে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল কলি। অসহায় লাগছে ভীষণ নিজেকে। মনে হচ্ছে কলি আরেকটা ভুল করে বসেছে। এক জা'নো'য়া'রে'র হাত থেকে বাঁচার জন্য আরেক জা'নো'য়া রে'র পাল্লায় পড়েছে।
বেশ কিছু সময় কলি সেখানে দাঁড়িয়ে কাঁদলো। একটু পর আবার কলির কানে ইমদাদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“এই ঘরের যেখানে ইচ্ছে ঘুমোতে পারিস। বিছানাতেই যে ঘুমোতে হবে এমনটা না। তবে এই ঘরের বাইরে ঘুমোতে পারবি না।”
কলির ইচ্ছে করলো গিয়ে ইমদাদের মাথা ফা'টা'তে। নয়তো গলা টিপে ধরে একেবারে মে’রে ফেলতে। এখন তো মনে হচ্ছে এতটা রাগ শাহিনের প্রতিও জমা ছিল না।
তবে কলি নিরুপায়। আরো কিছুটা সময় দরজার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো। অবশেষে বিছানায় এসে চুপচাপ গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পড়লো।
দুটো বিপরীত স্বভাবের মানুষ বিছানার দূপ্রান্তে দু'রকম ভিন্ন ভাবনায় নিমগ্ন। কে জানে এদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে!
__________
মাঝরাতের দিকে ঘুম ভেঙে গেলে ইমদাদের। ঘুম ভাঙলো বললে অবশ্য ভুল হবে। ঠিক ঠাক ঘুমোতেই পারেনি। কি যে এক অভ্যাস হয়েছে! ইমদাদের পাশে কেউ ঘুমোলে নিজে আর ঘুমোতে পারে না। যদিও কলি একটুও নিজের উপস্থিতি জানান দেয়নি। সেই যে ঘুমিয়েছে না ঘুমিয়েছে একটু নড়াচাড়াও করেনি। তারপরও ইমদাদের সমস্যা। এক পর্যায়ে গিয়ে ইমদাদ শুয়ে থাকতে না পেরে উঠে বসলো।
ঘাড় কাত করে পিছনে তাকাতেই দেখলো কলি একেবারে জড়োসড়ো হয়ে ঘুমিয়ে আছে। ইমদাদের একটু রাগই হলো। একেবারে একটা অসভ্য মেয়ে। ইমদাদ কাঁথা নিয়েছে জন্য সেটা নিজে গায়ে দেওয়া যাবে না?
ইমদাদ মনে মনে ঠিক করলো, ঠান্ডায় জমে গেলেও কাঁথা গায়ে দিয়ে দেবে না কলিকে।
একা একাই কলির সাথে ঝগড়া করে উঠে গিয়ে দাঁড়ালো জানলার ধারে। জানলাটা খুলে দিতেই বাইরের ঠান্ডা বাতাস ঘরে প্রবেশ করলো। এমনিতেই দিনটা ঠান্ডাই ছিল, তার উপরে আরো জানালাটা খুলে দেওয়ায় পুরো ঘরটা আরো বেশি ঠান্ডা হয়ে গেল।
ইমদাদ বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখলো কলি একটু নড়েচড়ে আরেকটু গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পড়লো। কিন্তু কলির যতই ঠান্ডা লাগুক না কেন ইমদাদ ওর গায়ে কাঁথা দিয়ে দেবে না।
বেশ অনেকক্ষণ নিজেই নিজের মন মস্তিষ্কের সাথে যুদ্ধ করলো ইমদাদ। তবে সব শেষে আর থাকতে পারলো না।
ধীর পায়ে কলির দিকে এগিয়ে গিয়ে কাঁথাটা কলির গায়ে জড়িয়ে দিল। পুরো কাজটা খুবই আস্তে ধীরে করলো যেন একটুও শব্দ না হয়। কেননা এখন যদি কলি জেগে গিয়ে দেখে ফেলে যে ইমদাদ ওর চিন্তায় ওর গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দিচ্ছে তবে তো ইমদাদের ভীষণ সম্মানহানি হবে।
কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে কলির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো ইমদাদ। ঘুমন্ত এই মেয়েটাকে দেখলে কে বলবে যে জেগে থাকলে সারাটা দিন ইমদাদের সাথে শুধু ঝগড়া করে! কে বলবে এই মেয়েটাকে দেখেে যে এই মেয়েটা এতটা অহংকারী!
ইমদাদ আবার এসে জানালার ধারে দাঁড়ালো। এত চেষ্টা করছে দৃষ্টি বাইরের দিকে রাখার তবে পারছে না। বারবার শুধু বেহায়া চোখ দুটো ঘুরেফিরে কলিকে দেখতে চাইছে।
ইমদাদ নিজেই নিজের প্রতি বিরক্ত হয়ে গেল। নিজেকে বকে, শাসন করে, ভালোভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু কোন কিছুতেই কাজ হলো না।
চেষ্টা করতে করতেই ইমদাদ হতাশ হলো নিজের উপর। আবারো তাকালো ঘুমন্ত কলির মুখটার দিকে। এত দূর থেকে যদিও ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেই বিড়বিড় করে বলল,
“তোকে কেন বিয়ে করলাম আমি বলতো? এর উত্তরটা আমি নিজেও জানিনা। তোকে কাঁদানোর জন্য বিয়ে করলাম, সরদার বাড়ির লোকজনকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিয়ে করলাম, আমার বোনের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে করলাম নাকি....…”
পরের অংশটুকু সম্পূর্ণ করতে পারলো না ইমদাদ।নিজে নিজেই থেমে গেল। নিজেই নিজেকে বোঝালো বাক্যটা এখানেই শেষ। এরপরে আর কোন শব্দ বসবে না।
__________
সারাটা রাত সরদার বাড়ির একটা মানুষ দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি। কলি কোথায় আছে সেই চিন্তায় কারোর ঘুমই আসেনি।
রাতে সাঈদ কল করে সবাইকে জানিয়েছিল যেন কলি কে নিয়ে চিন্তা না করে। সাঈদ কোথায় রেখেছে কিংবা কোথায় রাখতে পারে কলি কে এই বিষয়টা কেউ আন্দাজ করতে পারছে না। সাঈদের তো তেমন বন্ধুও নেই। আর আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে গেলে তো খবর পেয়ে যেত এতক্ষণে।
সবার এসব ভাবনার মাঝেই বাড়িতে সাঈদ প্রবেশ করলো। সাঈদ কে প্রবেশ করতে দেখে সবাই যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সবাই সবার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবে বলে নিশ্চিত হলো।
তবে সব থেকে বেশি তাড়া দেখা গেল শাম্মির মাঝে। সাঈদ কে আসতে দেখে তিনি রান্নাঘর থেকে ছুটে এসেছেন। কাউকে আগেই সাঈদ কে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে নিজে ছেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কলি কোথায়?”
সবার মনে একই প্রশ্ন। সবাই এই একটা প্রশ্নের উত্তরই জানতে চাইছে। তাই আলাদা করে আর আগেই কেউ কোনো প্রশ্ন করলো না। বরং অপেক্ষা করলো সাঈদের উত্তরের। সাঈদ বেশ শান্ত ভঙ্গিতে বলল,
“যেখানে কলি নিরাপদ, যেখানে কলির থাকা উচিত সেখানেই আছে কলি।”
“হেঁয়ালি না করে ঠিক ঠাক উত্তর দে সাঈদ। একটা কম বয়সি অবিবাহিত মেয়ে সারাটা রাত বাড়ির বাইরে কাটালো। মানুষ এসব ভালো নজরে দেখবে বলে তোর মনে হয়? মেয়েটার বদনাম হবে তো। এতক্ষণে নিশ্চয়ই পাড়ার মানুষ জেনে গেছে যে মেয়েটা সারারাত বাইরে ছিলো আর আমরা ওর খোঁজ জানিনা।”
শাম্মির কথার প্রেক্ষিতে সাঈদ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কিন্তু কি করে জানবে পাড়ার মানুষ? বাড়ির কথা বাড়ির বাইরে যায় কিভাবে? পাড়ার আর কারো কথা তো এতটা ছড়ায় না যতটা ছড়ায় সরদার বাড়ির কথা। কিভাবে ছড়ায় বলোতো আমায় মা?”
“আর কারো বাড়ির এত কাহিনী নেই ছড়ানোর মতন। সরদার বাড়ির কাহিনী বেশি সেজন্য সরদার বাড়ির কাহিনী ছড়ায়ও বেশি। এখন এতো আজেবাজে কথা না বলে আমার প্রশ্নের উত্তর দে। কলি কোথায়? বোনের বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে নেই তোর? একবারও ভেবে দেখেছিস কি করে বিয়ে দিবি এরপর ওর?”
সাঈদ এবারেও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“না। ভাবার প্রয়োজন মনে করছি না। কারণ কলির বিয়ে তো হয়ে গেছে। আবার নতুন করে ওর বিয়ের চিন্তা করার তো কোন প্রয়োজন নেই।”
উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ চমকে উঠলো সাঈদের কথায়। কারো মনে হল সাঈদ মজা করছে, কেউ বা আবার নিজের কান কে ভুল ভাবলো। তুমুল কৌতুহল তৈরি হলো মনের ভেতর সবার।
সেই কৌতুহল দমিয়ে রাখতে না পেরে সর্বপ্রথম রোকসানা সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলো,
“কলির বিয়ে হয়ে গেছে কিন্তু কি করে? কি দুদিন পরপর নতুন নাটক শুরু করেছিস তোরা ভাই বোন বলতো? কলি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে সেদিনই তোরা বলিস কলির বিয়ে হয়ে গেছে। কয়বার বিয়ে হয় একজনের শুনি? কোন বার সত্যি বলিস তোরা?”
সাঈদ এবারে রোকসানার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“এত কিছু শুনে তোমাদের লাভ নেই। শুধু এতটুকু জেনে রাখো এবারে কোনো নাটক, ছলনা, মিথ্যে কিচ্ছু নেই আমার কথায়। কলির বিয়ে হয়ে গেছে ইমদাদের সাথে।”
এতক্ষন চুপচাপ বসে ছিলেন কামাল সরদার। শুধুমাত্র সাঈদ কথাগুলো বলছিল বলে তিনি চুপচাপ সহ্য করছিলেন। তবে এবারে তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। গর্জে উঠে বললেন,
“চুপ করো। রোজ রোজ তোমাদের ভাই বোনের এই নাটক দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। এবারও যে তোমরা নাটক করছো সেটা আমি বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছি। চুপচাপ গিয়ে ইমদাদের বাড়ি থেকে তোমার বোনকে নিয়ে এসো। নয়তো আমাকে যেতে হবে।”
পরিস্থিতি পূর্বের তুলনায় এবার আরও বেশি ঘোলাটে হয়ে উঠলো। সাঈদ শাম্মি কে রেখে কামাল সরদারের দিকে এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“নাটক তো করেছেন আপনি। ভালো মানুষের নাটক করেছেন। তবে এবারে আর কোন নাটক হবে না। না আমি কলিকে আনতে যাব, না আপনি কলি কে আনতে যাবেন। এই বাড়ির কারো পা যেন ইমদাদের বাড়িতে না পড়ে। যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক করতে চান তবে যেতে পারেন। কিন্তু কলিকে আনার উদ্দেশ্যে যাবেন না।”
“তোমার সিদ্ধান্ত মতো এখন কামাল সরদার চলবে নাকি?”
সাঈদ কামাল সরদারের থেকেও দ্বিগুন চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“হ্যাঁ। প্রয়োজনে তাই চলবে। প্রয়োজনে পুরো সরদার বাড়ি আমার সিদ্ধান্তে চলবে। যদি আপনাদের কারোর জন্য আমার বোনের সংসারে বিন্দুমাত্র কোন অশান্তির সৃষ্টি হয়, কাউকে ছেড়ে কথা বলব না।
“বাইরের আবহাওয়া এতো ঠান্ডা বাড়ির আবহাওয়া এত গরম কেন? আল্লাহর গজব পড়েছে এই বাড়িতে। অবশ্য পড়বেই তো। ইমদাদের মতন রহমত যে বাড়িতে নেই সেই বাড়িতে গজব পড়বে এটাই তো স্বাভাবিক।”
কন্ঠটা দরজার কাছ থেকে ভেসে এলো। একযোগে সবার দৃষ্টি দরজার দিকে গেল। কারো অনুমানই ভুল না৷ ইমদাদই এসেছে। পরনে পাঞ্জাবি-পাজামা, হাতে ঘড়ি, চুলগুলো আজ সুন্দর ভাবে আঁচড়ানো, গালে হালকা দাঁড়ি। মুখে আবার এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি৷ সবমিলিয়ে মারাত্মক লাগছে দেখতে ইমদাদ কে।
এই মূহুর্তে সরদার বাড়িতে সাঈদ বাদে কারোরই সহ্য হলো না ইমদাদ কে। করিম সরদার তেড়ে গেলেন ইমদাদের দিকে। ইমদাদের পাঞ্জাবির কলার ধরে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললেন,
“শু’য়ো’রে’র বাচ্চা আমার মেয়ে কোথায়? কি করেছিস আমার মেয়ের সাথে তুই?”
ইমদাদ অবাক হলো না করিম সরদারের এই ব্যবহারে। আলতো হেসে বলল,
“বাপ তুলে যেহেতু কথা বললেন তাহলে জবাবটা তো দিতেই হচ্ছে। আমি যদি শু’য়ো’রে’র বাচ্চা হই, তবে আমার বাবাও নিশ্চয়ই শু’য়ো’রে’র’ই বাচ্চা। তারমানে আমার দাদু, সম্মানিত কামাল সরদারও নিশ্চয়ই শু’য়ো’রে’র বাচ্চা। যুগে যুগে একেকজন শু’য়ো’র থেকেই তো পরবর্তী তে তাদের বাচ্চারা জন্ম নিচ্ছে তাই না?”
করিম সরদার ফের দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললেন,
“তোর বাপ আমাদের র’ক্ত না। তোর জাত আলাদা। তোর বাপ ছিল তোর দাদির অবৈধ সন্তান। কে জানে তোর শরীরে কার র’ক্ত বইছে?”
করিম সরদার কথাটা বলতেই ইমদাদ নিজেই পাল্টা ওনার কলার চেপে ধরে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁত পিষে বলল,
“আর একটা শব্দ উচ্চারণ করলে এই মূহুর্তে তোর মুখ চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেব। আমাকে রাগাস না। তুই জানিস আমি দাদা-চাচা কিচ্ছু মানবো না যদি আঘাতটা আমার পরিবারের ওপরে আসে।”
করিম সরদার তবুও দমলো না। তবে সাঈদ তাড়াহুড়ো করে এসে ইমদাদ কে সরালো। করিম সরদার কে উদ্দেশ্য করে শাসিয়ে বলল,
“ইমদাদ জামাই এ বাড়ির। ভুলেও ওর গায়ে হাত তুলবেন না।”
করিম সরদার তাচ্ছিল্য গলায় বললেন,
“কেমন জামাই দেখতে পারছো না। আমার গায়ে হাত তুলছে, খু’ন করার হুমকি দিচ্ছে।”
“হুমকি দিতে বাধ্য হয় এমন কাজ করেন কেন? চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকুন । ইমদাদ, যে কাজে এসেছিস সেটা আগে কর।”
ইমদাদ জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ফেলে রাগ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলো। কাজও হলো। কলার ঠিক করে কামাল সরদারের দিকে এগিয়ে গেল। কামাল সরদার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ইমদাদের দিকে। আন্দাজ করার চেষ্টা করছেন যে ইমদাদ কি বলতে পারে।
ওনার এসব ভাবনার মাঝেই ইমদাদ বলে উঠলো,
“যেহেতু আপনি বাড়ির মুরুব্বি তাই আপনাকেই বলছি। আমার কোনো অভিভাবক নেই যে এই কাজটা করতে পারে। তাই বাধ্য হয়ে আমাকেই করতে হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের পরের দিন বৌভাতের আয়োজন করা হয়। গতকালই তো আমার আর কলির বিয়ে হয়ে গেছে। আজ আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আয়োজন করেছি। আপনারা সবাই অবশ্যই আসবেন।”
কামাল সরদার সেভাবেই তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ ইমদাদের দিকে। ইমদাদের দৃষ্টিতে আজ অন্য রকমের একটা আত্মবিশ্বাস, একটা তৃপ্তি খেয়াল করছেন উনি। প্রথম দিন তো সন্দেহ হয়েছিল ইমদাদের কথায়, তবে আজ ইমদাদ ওনাকে সন্দেহ করার কোন সুযোগই দিল না। কেন যেন কামাল সরদারের মনে হলো এবারে আর কোন মিথ্যে বলছো না ইমদাদ। সত্যি ওদের বিয়েটা হয়ে গেছে।
এদিকে অনেকটা সময় পার হওয়ার পরও কামাল সরদারের থেকে যখন কোন উত্তর পেল না তখন ইমদাদ উত্তরের আশাই ছেড়ে দিল। সাঈদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে চাইলো ইমদাদ। তখনই ভেসে এলো ওর কানে কামাল সরদারের কণ্ঠস্বর।
“সামর্থ্য অনুযায়ী যে আয়োজনের কথা বললে, তা তোমার সামর্থ্য কতটুকু? সরদার বাড়ির মেয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মতন সামর্থ্য আছে?”
ইমদাদ থামলো। পিছন ফিরে কামাল সরদারের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“ইমদাদের সামর্থ্য কতটুকু সেটাতো ইতোমধ্যে অনেকটাই দেখিয়ে দিয়েছি। কামাল সরদারকে টেক্কা দিতে পারে এতটুকু সামর্থ্য ইমদাদের। কামাল সরদারের গলার জোর কেড়ে নিতে পারে এতোটুকু সামর্থ্য ইমদাদের। আর সরদার বাড়ির মেয়েকে ভালোবাসা আর যত্নে আগলে রাখতে পারে এতোটুকু সামর্থ্য আছে ইমদদের।”