চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছে ইমদাদ। মনে হচ্ছে মাথার ভেতর পুরো দুনিয়ার চিন্তা ঢুকেছে। ভীষণ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছে ইমদাদকে। আজ ইমদাদ ভীষণ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। ঠিক ভুল বিচার করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
একবার মনে হচ্ছে সাদিকের কথাটা শোনা উচিত। আবার পর মুহূর্তে মনে হচ্ছে না, ইমদাদ যা ভাবছে সেটাই ঠিক। আফসানার ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। আফসানার নিশ্চয়ই বড় কোন পরিকল্পনা আছে। না হলে ইমদাদের মতন এমন তুচ্ছ মানুষের পেছনে হাত ধুঁয়ে কখনোই পড়ে থাকতো না।
কিসের আশায়তেই বা পড়ে থাকবে ইমদাদের পিছনে। শুধুমাত্র ব্যবসার প্রস্তাব ভালো জন্য? এমন হাজার হাজার প্রস্তাব প্রতিদিন আফসানা পেয়েই থাকে। তাহলে তাদের পেছনে না পড়ে ইমদাদের পেছনে কেন পড়েছে? এ থেকেই কি স্পষ্ট হচ্ছে না যে আফসানা নিজের অপমানের প্রতিশোধ নিতে চাইছে?
তবে এখানে আরো একটা প্রশ্ন ঘুরছে ইমদাদের মাথায়। যদি আফসানার নিজের অপমানের প্রতিশোধই নেওয়ার হতো তাহলে বিভিন্ন ভাবে নিতে পারত। আবারো নিজে এগিয়ে এসে ইমদাদের কাছে ছোট হওয়ার তো কোন মানে ছিল না। ইমদাদের আরেকটা ব্যবসার খোঁজও পেয়ে গেছে। চাইলে সেটাতেও আঘাত করার চেষ্টা করতে পারতো। কিংবা আফসানা তো ক্ষমতাধর মানুষ, উঁচু শ্রেণীর। আরো বিভিন্নভাবে ক্ষতি করতে পারতো ইমদাদের। তাহলে সেসব না করে কেন ব্যবসার জন্যই ইমদাদের পিছনে পড়ে আছে?
তাহলে কি সাদিকের কথাটাই ঠিক? আফসানা আসলে খারাপ না। নিজের ভুলটা শুধু উপলব্ধি করতে পেরে ওদের একটা সুযোগ দিতে চাইছে?
ইমদাদের এসব ভাবনার মাঝে ওর ফোনটা বেজে উঠলো। ইমদাদের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে সাদিক কল করেছে। বিরক্তিতে নাক মুখ কোঁচকালো। আরেকটু সময় তো দিতে পারতো। এত তাড়াহুড়োর কি আছে?
চেয়ার থেকে মাথাটা তুলে সামনের ছোট টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে রিসিভ করে কানে ধরে বিরক্তিকর কর গলায় বলল,
“এত তাড়াহুড়ো করছিস কেন? সময় কি পালিয়ে যাচ্ছে?”
“সময় পালিয়ে না গেলেও সুযোগ পালিয়ে যাবে। তোকে ভাবার জন্য দু'ঘণ্টা সময় দিয়েছিলাম। তারপরেও আরো দশ মিনিট বেশি দিয়েছি তোকে। এখন সিদ্ধান্ত জানা। আমি কথা বলি আফসানা ম্যাডামের সাথে?”
ইমদাদ সংশয় নিয়ে বলল,
‘আমার মন সায় দিচ্ছে না সাদিক। মনে হচ্ছে আমরা বাজে ভাবে ফেঁসে যাবো।”
সাদিক বিরক্তিকর গলায় বলল,
“কি নিয়ে ফাঁসবো? আমরা কি অবৈধ ব্যবসা করতে চাইছি যে ফেঁসে যাবো? আর তাছাড়া ব্যবসায় তো আফসানা ম্যাডামও থাকবেন। আমরা ফাঁসলে উনিও ফাঁসবেন।”
“উনি ফাঁসলে ঠিক বেরিয়ে আসতে পারবেন। ওনার ক্ষমতা আছে ,টাকা আছ। কিন্তু আমরা ফাঁসলে বেরোতে পারবো না।”
সাদিকের রাগ হলো একটু ইমদাদের উপরে। তারপরও নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে ইমদাদ কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“দেখ ভাই ঝুঁকি না নিলে কোন কিছুই সম্ভব না। সফলতার পথে তো কত বাধাই আসে তাই বলে কি থেমে যাব আমরা? তোর দ্বারা তো আমি এতটা বোকামি আমি আশা করিনি ইমদাদ। এত বড় একটা সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। এমন সুযোগ আমরা আর সারা পৃথিবী হাতড়েও পাবো না। তুই ভাবতে পারছিস আফসানা ম্যাডাম নিজে আমাদের সাহায্য করতে চাইছেন।”
“সমস্যা তো ওখানেই, কেন চাইছেন? এতে ওনার কি লাভ?”
সাদিক এবারে মৃদু রাগী গলায় বলল,
“সব সময় এত লাভ ক্ষতি খুঁজতে আছিস না তো। উনি ভালো মানুষ। উনি হয়তো কোন লাভ লোকসান ছাড়াই আমাদের উপকার করতে চাইছে। সবাই তো আর লাভের পেছনে ছোটে না। তোকেই দেখ, এই পুরো বিজনেস আইডিয়াটা তোর। তারপরও তো তুই আমাকে তোর সাথে নিয়েছিস কোন লাভের আশা না করে তাই না?”
সাদিকের কথায় একটু হলেও যুক্তি খুঁজে পেল ইমদাদ। কিন্তু তারপরও মনটা এখনো খচখচ করছে। আরো অনেকক্ষণ যাবৎ সাদিক ইমদাদ কে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলো যে আফসানার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এক পর্যায়ে গিয়ে ইমদাদ নিজেই বিরক্ত হয়ে গেল। মনে হলো যা হবে হোক। আফসানার প্রস্তাবে রাজি হবেই।
__________
সাদিকের সাথে কথা বলা শেষে ইমদাদ ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বসার ঘরে এসে দেখলো এখনো সাঈদ বসে আছে সেখানে। সাঈদ কে দেখে ইমদাদের ভালোই লাগলো। ভাবলো একটু গল্প করা যাবে। তবে সেই ভালোলাগাটা প্রকাশ করল না। বরং সোফায় বসে সাঈদ কে খোঁচা দিয়ে বলল,
“এখনো যাসনি তুই? বোনকে আমার ঘাড়ে ঝুলিয়ে দিয়ে এবার কি নিজেও ঝুলে যাওয়ার ইচ্ছে আছে নাকি?”
সাঈদ তখন ইমাদের সাথে কথা বলছিল। ইমদাদের কন্ঠ পেয়ে একবার ঘাড় কাত করে ওর দিকে তাকালো। ইচ্ছে করলো অনেক কিছু বলার, তবে তাও থেমে গেল। সাঈদ আজ ঠিক করেই এসেছে যে কোন রকমের কোন ঝামেলা করবে না। রাগারাগি তো মোটেও করবেনা, কারো সাথেই না। নিজের রাগকে যথাসম্ভব সামলে রাখার চেষ্টা করবে। ইয়াসমিনের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে সাঈদ রগচটা স্বভাবের হলেও যদি ইয়াসমিন বলে তাহলে নিজেকে বদলাতেও পারে।
এদিকে সাঈদের থেকে কোন প্রত্যুত্তর না পেয়ে ইমদাদ হতাশ হলো। ইমদাদের তো একটু ঝগড়া করার ইচ্ছে ছিল। সাঈদ কে একটু রাগাতে মন চাইছে। তারপরে ঝগড়াটা যখন একটু বাড়বে তখন নিশ্চয় কলিও এসে ভাইয়ের পক্ষ হয়ে কথা বলতো। তখন ইমদাদ কলির উপরে অধিকার খাটাতো। জবাবদিহি চাইতো যে কেন স্বামীকে রেখে ভাইয়ের হয়ে কথা বলছে। বেশ ভালোই লাগতো কলির সাথে কোন কারণ ছাড়া ঝামেলা করতে। তবে সাঈদ তো ইমদাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে দিল।
কিছুটা সময় চুপচাপ বসে থাকার পর ইমদাদ আবারো সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সাঈদ, একটা সাহায্য করতে পারবি?”
ইমাদের সাথে গল্প গুজব থামিয়ে সাঈদ ইমদাদের দিকে ঘুরে বসে গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,
“কি সাহায্য?”
সাঈদ সত্যি ভেবেছিলে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজেই নিশ্চয়ই ইমদাদ ওর থেকে সাহায্যে চাইছে। তাই নিজেও গুরুতর ভঙ্গিতে প্রশ্নটা করলো। ইমদাদ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ইয়াসমিনের জন্য একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। আমি তো ব্যস্ত থাকি, তেমন একটা খোঁজখবর নেওয়ার সময় পাচ্ছিনা। ছেলের নাম ঠিকানা দিয়ে দিলে তুই একটু খোঁজ নিতে পারবি?”
ইমদাদ নিশ্চিত ছিল যে সাঈদ এবারে রাগবেই। ইমদাদ তো ভেবেছিলো একেবারে কুরুক্ষেত্র বেঁধে যাবে। এমনও হতে পারে ইমদাদের সাথে মা'রা'মা'রিও লেগে যেতে পারে।
ইমদাদের মনের মাঝে আবার এসবের মাঝে প্রশ্ন এলো, যদি ওরা দুজন মা'রা'মা'রি শুরু করে দেয় তাহলে কলি এসে কাকে বাঁচাবে? নিশ্চয়ই সাঈদের পক্ষ নেবে। আর সুযোগ বুঝে হয়তো সাঈদের হয়ে নিজেও ইমদাদ কে কয়েকটা কি'ল ঘু'ষি লাগিয়ে দেবে।
নিজের ভাবনার উপর নিজেরই হাসি পেল ইমদাদের। যদি সত্যিই ঘটনাটা ঘটে, আর যদি সেটা পাঁচ কান হয় যে ইমদাদ বউয়ের হাতে মা'র খেয়েছে তাহলে কেউ তার ইমদাদকে দেখে ভয় করবে না। যে যেখানে পাবে মজা করবে। কি হাস্যকর ব্যাপার তাই না! ইমদাদ বউয়ের হাতে মা'র খেয়েছে।
নিজের ভাবনার মাঝে একা একাই হাসলো ইমদাদ। আবার এমনি এমনি ধ্যান ভাঙলো। সাঈদের দিকে তাকাতেই দেখল সাঈদ জ্বলন্ত চোখ নিয়ে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ইমদাদের বেশ লাগলো সাঈদের চোখ দুটো দেখে। ইচ্ছে করলো আরো রাগাতে। তবে ইমদাদ আর কিছু বলে ওঠার আগেই সাঈদ নিজেই শান্ত গলায় বলে উঠলো,
“ঠিক আছে। ঠিকানা দিয়ে দেস, আমি খোঁজখবর সব নিয়ে রাখবো।”
সাঈদের বলা কথাটা এবারে হজম হলো না ইমদাদের। ইমদাদ বসা অবস্থাতেই সাঈদের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“তোর ব্যাপারটা কি আজ বলতো আমায়? ঝামেলা করার মেজাজে নেই নাকি? এত চেষ্টা করছি ঝামেলা করার, আর তুই তো দেখছি বারবার আমাকে নিরাশ করছিস।”
সাঈদ কাঁধের উপর থেকে ইমদাদের হাতটা সরিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আমার কাছে যে সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার জন্য নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করছি। তুই যতই চেষ্টা করিস না কেন আমাকে খারাপ বানাতে পারবি না।”
“সত্যিই তুই ভালো হতে পারবি?”
“তাকে ভালোবেসে নিজের জীবনটাও হাসিমুখে দিয়ে দিতে পারব। আমি তোকে দেখিয়ে দেব আমিও ভালোবাসতে পারি।”
সাঈদের কথাটা শুনে ইমদাদ হো হো করে হেসে উঠে বলল,
“কেউ ভালোবেসে প্রাণ কেড়ে নেয়, তো কেউ ভালোবেসে স্বেচ্ছায় প্রাণ দিয়ে দেয়। কি অদ্ভুত নিয়ম এই ভালোবাসার! কাউকে উজার করে ভালোবাসা দেয়, তো কাউকে বানায় সর্বহারা।”
কথাটা বলে ইমদাদ নিজে নিজেই হাসলো। বেশ অনেকটা সময় ধরে ইমদাদ হাসলো। ইমদাদের হাসির শব্দতে রান্নাঘর থেকে কলি একবার উঁকি দিল। গা পিত্তি জ্বলে গেল কলির ইমদাদকে হাসতে দেখে। বিড়বিড় করে কি সব বলতে বলতে আবার চলে গেল সেখান থেকে।
বেশ অনেকটা সময় হাসার পর ইমদাদ নিজের হাসি থামালো। অভিব্যক্তি এবার গুরুতর করে সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আজেবাজে কথা অনেক হয়েছে, এবার কাজের কথায় আসি। সরদার বাড়ির কি অবস্থা সেটা বল? আবহাওয়া এত ঠান্ডা হলো কি করে? এখন অব্দি কেউ আমায় আঘাত করার কোন চেষ্টাই যে করল না?”
সাঈদ ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,
“ব্যাপারটা আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না। ওরা হার মেনে নিয়েছে নাকি নতুন করে তোকে হারানোর ফন্দি করছে এই প্রশ্নটার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছি আমি, তবে পাচ্ছিনা।”
“তুই খবর না পেলেও আমি কিন্তু একটু একটু খবর পাচ্ছি।”
সাঈদ কপাল কুঁচকে বলল,
“কি খবর?”
ইমদাদ সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“কামাল সরদার কলিকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার পরিকল্পনা করছে। এমনও হতে পারে উনি হয়তো কলির সামনে শর্ত রাখবেন হয় সরদার বাড়ির সম্পত্তি নয়তো ইমদাদের সংসার। আর উনি ভাবছেন সম্পত্তির লোভে কলি ইমদাদের সংসার ছেড়ে ছুটে চলে যাবে আর ইমদাদও কলিকে যেতে দেবে। কি হাস্যকর তাই না?”
কথাটা বলে নিজেই একা একা একটু হাসলো ইমদাদ। সাঈদ কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কিন্তু তুই কি করে জানলি এসব? আমার কানে তো এমন কোন খবর এলো না।”
ইমদাদ বেশ গর্বের সাথে বলল,
“ইমদাদের হাত অনেক লম্বা। যে খবর তুই সরদার বাড়িতে থেকেও সংগ্রহ করতে পারিস না সেই খবর আমি এত দূরে বসেও খুব সহজে পেয়ে যাই।”
“কিন্তু কিভাবে পেলি সেটা বল?”
ইমদাদ শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“এসব খবর কাউকে দিতে নেই। পাঁচ কান হলেই সমস্যা। কিছু গোপন জিনিস গোপনই রাখতে হয়।”
________
বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে ইমদাদ। হাতে কি সব কাগজপত্র। খুব মনোযোগ দিয়ে সেসব পর্যবেক্ষণ করছে। এরই মাঝে কলি ঘরে এলো। গুটি গুটি পায়ে ইমদাদের পাশে এসে দাঁড়ালো। একটু অস্বস্তি হচ্ছে কলির কথাটা বলতে। কেননা ইমদাদের কোন বিশ্বাস নেই। কে জানে যদি আবার হুট করে অপমান করে দেয়।
কলি ভাবলো কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে। নিশ্চয়ই ইমদাদ আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করবে। তবে প্রায় পাঁচ মিনিটের অধিক সময় কলি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পরেও ইমদাদ কিছু জিজ্ঞেস করল না। অবশেষে কলিই ধৈর্য হারিয়ে নিজেই বলে উঠলো,
“তোমার ফোনটা লাগবে আমার।”
“কি করবি?”
“সেই কৈফিয়তও তোমায় দিতে হবে?”
কাগজের ওপর থেকে চোখ তুলে ইমদাদ কলির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“যখন কৈফিয়ত দিবি না তাহলে গিয়ে দেখ আর কারো ফোন পাস কিনা।”
রাগে শরীর জ্বলে উঠলো কলির। ইচ্ছে তো করছে গলা টিপে এখনই মে’রে দিতে। তবে সেটা তো আর করতে পারবে না। এই দামড়া মার্কা ছেলেটার সাথে শক্তিতে পেরে উঠতে পারবে না। শেষে দেখা গেল কলিরই হয়তো গলা টিপে ধরেছে।
“মা কে কল করবো। অনেকদিন হলো কথা হয়না মায়ের সাথে।”
“তোর মা আবার কোথা থেকে এলো? তোর মা আছে নাকি? ছেড়ে চলে গেছে তো তোকে।”
বেশ স্বাভাবিক ভাবে ইমদাদ কথাগুলো বলল। কলি একটু অবাকই হলো। এত সহজে এই কথাগুলো কি করে বলে দিলো ছেলেটা। বুঝতে কি পারলো না যে কলির কষ্ট হলো?
অবশ্য বুঝবেই বা কি করে। ও তো আর কলিকে ভালোবাসে না। আর ভালোই যখন বাসে না বুঝবে কি করে।
যেহেতু ইমদাদ বুঝলো না তাই কলি আর বুঝতে দিতে চাইলোও না।
“সে আমার মা আছে কি নেই আমি বুঝে নেব। তুমি ফোনটা দেবে কি দেবে না সেটা বলো? সামান্য একটা কল করার জন্য এত কথা বলতে পারব না আমি।”
ইমদাদের পাশেই ফোনটা রাখা। ইশারায় নিজের ফোনটা দেখিয়ে বলল,
“নিয়ে নে।”
কলি হাত বাড়িয়ে বলল,
“দাও।”
“তোর চাকর না আমি। নিজের দরকার নিজে নিয়ে নে।”
“একটু দিলে কি হয়! আমার আবার কতটুকু রাস্তা ঘুরে যেতে হবে।”
ইমদাদ কোন উত্তরই দিল না। কলি বুঝলো দেবে না ফোন। নিজেকে নিতে হবে। ইমদাদের গায়ের উপর দিয়েই হাতটা বাড়িয়ে কলি ফোনটা নিতে ধরলে ইমদাদ চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“কি করছিস?”
কলি কেঁপে উঠে ছিটকে দূরে সরে গিয়ে বলল,
“কি করেছি?”
“গায়ের উপর চড়ছিস কেন? অসভ্য, বেয়াদব মেয়ে কোথাকার।”
কলি অবুঝের মতন বলল,
“গায়ের উপর কখন চড়লাম? গালি দিচ্ছ কেন?”
ইমদাদ ফোনটা নিয়ে কলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“এটা নে। ভবিষ্যতে কখনো আর এমন করবি না। আমার পছন্দ না কেউ আমার এতটা কাছাকাছি আসুক। দূরত্ব বজায় রাখবি আমার থেকে।”
ইমদাদের কথা গুলো কলির আত্মসম্মানে গিয়ে লাগলো। এই ছেলেটা বলতে চাইছে কি। কলি কি ওকে ছোঁয়ার বাহানা খোঁজে নাকি।
ইমদাদের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে রাগী গলায় বলল,
“নিজে যখন সকালে ড্রেসিং টেবিলের উপর আমাকে চেপে ধরে বসে ছিলে তখন সমস্যা হচ্ছিল না? তখন এই ছোঁয়ার ব্যারাম কই ছিল?”
“সেটা তখন আমি আমার ইচ্ছেতে ছুঁয়ে ছিলাম। তাই আমার অনুমতি না নিয়ে আমাকে ছুঁবি না। আমার অস্বস্তি হয়। আর তুই দূরে থাকবি আমার থেকে।”
কলি মনে মনে কিছু একটা ঠিক করলো। সেই জন্য আপাতত এখন আর কিছু বলল না।
শাম্মির নাম্বারে কল করলো, তবে শাম্মি ফোনটা রিসিভ করলো না। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছে। কলি ভাবলো কাল সকালে কল করবে।
ইমদাদ তখনও সেই কাগজপত্র নিয়ে বসে আছে। ফোনটা কলি ইমদাদের পাশে রেখে অপর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো। তবে আজ বিছানার শেষ প্রান্তে ঘুমোলো না। বরং ইমদাদের দিকে এসে ঘুমোলো।
ইমদাদ যত সরে আসছে কলিও ততই ওর দিকে এগিয়ে আসছে। এক পর্যায়ে ইমদাদ খাটের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছল। কিন্তু কলি তো থামার নামই নিচ্ছে না। ইমদাদ বিরক্তিকর গলায় বলল,
“কোলে উঠে আয় আমার।”
কলি ঘাড় কাত করে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে অবুঝের মতন বলল,
“কিছু বললে?”
“বললাম কোলে উঠে আয়।”
কলির কি হলো কে জানে। শোয়া থেকে উঠে বসে সত্যি ইমদাদের কোলে ওঠার জন্য যেন উদ্দ্যত হলো। ইমদাদ বিছানা থেকেই নেমে গেল। রাগান্বিত গলায় বলল,
‘পা'গ'ল কুকুর কা'ম'ড়ে'ছে তোকে? এমন করছিস কেন?”
“কি করেছি আমি?”
কলির কথা বলার ভঙ্গি দেখে মনে হলো যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ইমদাদ রাগী গলায় বলল,
“পুরো বিছানাটা তোর নামে করে দেইনি। ওই দিকটা তোর, এই দিকটা আমার। নিজের সীমার মাঝে থাক।”
“কিন্তু আমার তো আজ তোমায় জড়িয়ে ধরে ঘুমোতে ইচ্ছা করছে। আসলে একা একা ঘুম হয় না। তাও আবার পাশে যখন স্বামী আছে না জড়িয়ে ধরে কি ঘুমোনো যায়!”
কলির কথা গুলো ইমদাদের মাথার উপর দিয়ে গেল। ভাবলো সত্যি মনে হয় এই মেয়েকে পা'গ'ল কুকুরে কা'ম'ড়ে'ছে। নয়তো উল্টোপাল্টা কিছু একটা খেয়ে এসেছে।
“মাথা ঠিক আছে তোর? কি আবোল তাবোল বকছিস?”
“মাথা আমার ঠিকই আছে। তুমি এখন এদিকে এসো। ঘুম পেয়েছে আমার। এসব কাগজপত্র রেখে দাও এখন। তোমায় জড়িয়ে ধরে ঘুমোবো আমি।”
ইমদাদ কিছুক্ষণ তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে কলির দিকে তাকিয়ে থাকলো। পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করলো কলি কে। ইমদাদ যেন ধরতে পারলো যে কলি কেন এমনটা করছে। ইমদাদকে বিছানা ছাড়া করতে চাইছে মেয়েটা। তবে কলি তো এটা জানে না যে ইমদাদের জেদের কাছে ওর অস্বস্তি হার মানতে বাধ্য।
ইমদাদ কে রাগাতে চেয়েছে তো। বেশ ঠিক আছে। আজ ইমদাদ কলির কথাই রাখবে। পাশে যে কলির স্বামী ঘুমিয়ে থাকে সেটা আজ কলি কে বুঝিয়েই ছাড়বে।
কাগজপত্র গুলো সব টেবিলের উপর রেখে দিল ইমদাদ। কলি সত্যি আশা করেনি যে ইমদাদ বিছানায় ঘুমোবে। তবে যখন দেখলো ইমদাদ বিছানার দিকে আসছে কলি একটু সরে বসলো। ভাবলো একবার শুয়ে পড়ুক তারপরে নাহয় বিরক্ত করে তুলে দেওয়া যাবে।
তবে কলির এতসব ষড়যন্ত্র একেবারে ব্যর্থ করে দিল ইমদাদ। ইমদাদ কে তুলে দেওয়ার জন্য কলি ইচ্ছাকৃতভাবে একটু এগিয়ে এলো ওর দিকে। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে ইমদাদ বিছানা ছেড়ে উঠে গেল না, আর না কলিকে পেছাতে দিল। বরং কলির হাত ধরে একেবারে নিজের কাছে টেনে এনে দু হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
কয়েক মুহূর্তের জন্য কলি নিশ্বাস নিতে পারল না। দমবন্ধ হয়ে এলে যেন। ইমদাদ একেবারে দুহাতে জাপটে ধরেছে। কলির গলার কাছে ইমদাদের তপ্ত নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে। কলি খেয়াল করলো ওর হৃদ স্পন্দনের গতি কয়েক হাজার গুণ বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডটা লাফাতে লাফাতে এখনই বেরিয়ে আসবে।
কলি কম্পিত গলায় ইমদাদ কে বলল,
“ছাড়ো। ছাড়ো আমাকে।”
ইমদাদ আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ঘুমোতে দাও বউ। তুমিও অনুভব করো যে তোমার পাশে তোমার স্বামী আছে, আমাকেও অনুভব করতে দাও যে আমার সাথে আমার বউ আছে।”
ইমদাদ এতই শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে যে কলি একটু নড়াচাড়াও করতে পারছে না। কোনমতে হাতটা উঠিয়ে ইমদাদের পিঠে হালকা করে টোকা দিয়ে বলল,
“ছাড়ো আমাকে বলছি। ছাড়ো।”
কলির গলার ভাঁজ থেকে ইমদাদ মুখটা তুলে কলির গালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“বউ হওয়ার পরে প্রথম আবদার করলি। আমি পূরণ না করে পারি! একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে ঘুমিয়ে দেখ, ভালো লাগবে। আমি কোন আঘাত করবো না তোকে। শুধু এভাবে ঘুমোবো। আমার কথাটা শোন। ভালো লাগবে।”
কথাটা বলে ইমদাদ আবারো কলির গলায় ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। কলির মুখ দিয়ে এবারে আর কোনো শব্দও বেরোলো না।
কিছুক্ষণ পর মনে হলো ইমদাদ সত্যি ঘুমিয়ে গেছে। যার একটু আগে সামান্য ছোঁয়ার কথা ভেবে অস্বস্তি হচ্ছিল এখন সে কলিকে জড়িয়ে ধরে কি করে ঘুমোলো? আবার কলিকেও বলল ঘুমোতে। ভালো লাগবে নাকি। আরে কলির ঘুম ধরলে তো ঘুমোবে।