অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ১৮

🟢

সকালে নাস্তা করার জন্য ইয়াসমিন বেশ অনেকবার কলি কে ডাকলো। তবে কলি ঘর থেকে বেরোনো তো দুর বিছানা থেকেই উঠল না। ইয়াসমিন বেশি জোর করলে বলল শরীর ভালো লাগছে না। যখন ইচ্ছে হবে উঠে খেয়ে নেবে। ইয়াসমিনও তাই আর জোর করলো না। এতটা জোর জবরদস্তি কিংবা অধিকার খাটানোর মতন সম্পর্ক কলির সাথে নেই ইয়াসমিনের।

খাওয়া-দাওয়া শেষে ইমাদ চলে গেল পরীক্ষা দিতে। এদিকে কলি কে বাড়িতে একা রেখে ইয়াসমিন কলেজেও যেতে পারছে না। একবার ভাবলো যাবে কিন্তু আবার পরে ভাবলো কলির তো শরীর খারাপ। যদি আবার কোন অসুবিধা হয় সেই ভেবে আর গেল না। ঘরবাড়ি গোছাতে গোছাতে হঠাৎ ই এ কানে ফোনের আওয়াজ এলো। তাড়াহুড়ো করে গিয়ে দেখলো সাঈদের নাম্বার থেকে কল এসেছে।

গতকাল সারাটা দিন কল করেছে তবুও একবারও রিসিভ করেনি ইয়াসমিন। ঠিক কতবার যে কল করেছিলো সাঈদ সেই সংখ্যাটাও হয়তো হিসাব করা যাবে না। ইয়াসমিনের মনে হলো আজ অন্তত একবার রিসিভ করা উচিত। নয়তো রিসিভ না করলে এভাবে প্রতিদিনই হয়তো কল দিয়েই যাবে। তবে আবার ভয়ও হলো। কাল সারাদিন রিসিভ করেনি, এখন রিসিভ করলে নিশ্চয়ই রাগারাগি করবে। হয়তো কড়া কথাও শোনাতে পারে।

ইয়াসমিনের এসব ভাবনার মাঝেই কলটা কেটে গেল। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক অন্তত একটা অজুহাত দিতে পারবে যে ফোন রিসিভ করতে করতে কেটে গিয়েছিল। তবে খুব বেশিক্ষণ ইয়াসমিনেরই স্বস্তি টুকু টিকলো না। আবারও শব্দ করে ফোনটা বেজে উঠলো। এবারে রিসিভ না করে উপায় নেই। ইয়াসমিন মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে কম্পিত গলায় বলল,

“হ্যালো।”

তৎক্ষণাত অপর পাশ থেকে সাঈদের কোন উত্তর ভেসে এলো না। ইয়াসমিনও আগবাড়িয়ে কিছু বলল না। এমনটা না যে সাঈদের রাগ হয়নি। ভীষণ রাগ হয়েছে। তবে এই রাগের কোনো প্রভাব ইয়াসমিনের উপরে ফেলতে দেবেনা। সেই জন্যই একটু চুপ করে থেকে নিজের রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।

প্রায় দুই মিনিট এভাবে নীরবতার মাঝে কাটল। অবশেষে সাঈদ রাগ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হতেই ইয়াসমিন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কেমন আছো?”

ইয়াসমিন যেমনি চমকালো তেমনি ভ্যাবাচ্যাকা খেল সাঈদের মুখ থেকে তুমি সম্বোধনটা শুনে। ইয়াসমিনের মনে হলো ভুল করে বোধহয় বলে ফেলেছে। সেজন্য নিজ থেকেই সাঈদের ভুলটা সংশোধন করে দিতে চাইলো।

“কেমন আছিস হবে।”

“হতো, তবে আর হবে না।”

ইয়াসমিন কপাল কুঁচকে বলল,

“কিন্তু কেন?”

“তুমিতো সম্মান চাও। তুই সম্মোধনটা শুনতে একটু কম সম্মান লাগে। সেজন্য তুমি করে বলবো আজ থেকে। তুমি চাইলে আপনি করে বলতে পারি, সমস্যা নেই।”

“না না তার কোন দরকার নেই। এত সম্মান সহ্য হবে না। ফোন কেন করেছো? ইতোমধ্যে তোমার পাঁচটা নাম্বার ব্লক লিস্টে রেখেছি আমি। এরপরও কি বোঝোনা তোমার সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র কোন আগ্রহ নেই আমার।”

সাঈদ আলতো হেসে বলল,

“আমার ভালোবাসা পেয়েও তোমার আগ্রহ নেই। আর তোমার অবহেলায় আমার আগ্রহ বাড়ে।”

ইয়াসমিন এবার কিঞ্চিত বিরক্তিকর গলায় বলল,

“সবসময় এমন ভালোবাসি ভালোবাসি বলবে না তো। বিরক্ত লাগে এখন এই শব্দটা শুনতে আমার। কি বলার জন্য কল করেছিলে সেটা বলো। নয়তো আমি ফোনটা রেখে দেবো। আমার আরো অনেক কাজ আছে।”

“ইমদাদ বাড়ি ফিরেছে? ওকে ফোনে পাচ্ছি না।”

“না, এখনো আসেনি। আর কিছু?”

“কোন কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে জানাতে পারো।”

“কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। আমার ভাইয়া কোথায় যাওয়ার আগে সব ব্যবস্থা করে রেখে যায় যেন আমাদের কোন অসুবিধা না হয়। রাখছি।”

ইয়াসমিন ফোনটা কাটতে ধরলে অপর পাশ থেকে সাঈদ একবার অসহায় গলায় ডেকে উঠলো “ইয়াসমিন” বলে। ইয়াসমিন বুঝলো না কিসের এত পিছুটান সাঈদের প্রতি। ইয়াসমিন তো নিশ্চিত যে ও সাঈদকে ভালোবাসেনা। ওর প্রতি কোনো দুর্বলতা নেই। তাহলে কিসের এত পিছুটান?

সে পিছুটান এখনো ইয়াসমিনকে ফোনটা কাটতে দিল না। সাঈদের ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য করলো।

“বলো।”

“অবহেলায় কখনো ভালোবাসা কমে না। অবহেলায় আরো ভালোবাসা বাড়ে। একটা কথা নিশ্চয়ই জানো, নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আমাদের আগ্রহ বরাবরই বেশি থাকে। অবহেলা করে আমায় দূরে সরাতে পারবে না। তুমি যত আমায় দূরে সরানোর চেষ্টা করবে আমি তত তোমার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করব।”

সাঈদের কন্ঠে কিঞ্চিত অসহায়ত্ব প্রকাশ পেল। সেই অসহায়ত্ব ইয়াসমিনের হৃদয়কে একটু দুর্বল করতে চাইলো। তবে তখনই মনে পড়ে গেল যে সাঈদ সরদার বাড়ির ছেলে, করিম সরদারের ছেলে।

আর দুর্বলতা দেখাতে পারল না ইয়াসমিন। বরং কন্ঠে কঠরতা বজায় রেখে বলল,

“চেষ্টা করো না। তোমাকে আগেই বলেছি এখনও বলছি আমাদের সম্পর্কের কোন ভবিষ্যৎ নেই। তুমি আমি দুজন সম্পূর্ণ আলাদা, ব্যতিক্রম দুজন মানুষ। সব থেকে বড় কথা তুমি যতই আমার প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করো না কেন তোমার প্রতি আমার বিশ্বাসটাই আসে না। আর যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে ভালোবাসা সম্ভব না। দয়া করে আমায় বিরক্ত করা ছেড়ে দাও। রাখছি।”

কেটে দিল ইয়াসমিন ফোনটা। সাঈদেরও আর কল করার ইচ্ছে হলো না। সাঈদ তো বিরক্ত করতে চায় না ইয়াসমিনকে, শুধু একটু ভালোবাসতে চায়। কিন্তু ওর ভালোবাসাটা ইয়াসমিনের কাছে বিরক্তিকর? কি কমতি আছে সাঈদের ভালোবাসায় যা বিরক্তিকর লাগে ইয়াসমিনের কাছে?

___________

আজও ইমদাদদের সাথে আফসানার কিছু আলোচনা ছিল, সেজন্য অফিসে ডেকেছিল। তবে আজ আলোচনার পুরোটা সময় আফসানা ভীষণ গম্ভীর থেকেছে। নিজের আবভাব দ্বারা প্রতিটা মুহূর্ত বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে আফসানা ইমদাদের সাথে ব্যবসা করতে চাইলেও ওর মর্যাদা ঠিক কতটা ওপরে। ঠিকঠাক কথাও বলেনি আজকে ইমদাদের সাথে। যদিও বা কখনো কথা বলার প্রয়োজন হয়েছে সাদিকের সাথে কথাবার্তা বলেছে।

মিটিং শেষে কিছু কাগজপত্র সই করে আবার যে যার গন্তব্যে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। তখন দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। সাদিক আফসানা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ম্যাডাম, লাঞ্চ টাইম তো হয়েই গেছে। চলুন না আজ আমরা আপনাকে ট্রিট দেই। মানে আসলে এর আগের দিন তো আপনি আমাদের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করলেন। তো চলুন না আজকে আমরা তিনজনে বাইরে কোথাও গিয়ে খাই। আমরা দুজনেই চাই এটা। চলুন না ম্যাডাম!”

ইমদাদ তখন ওদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। যেহেতু সাদিক বলল ওরা দুজনেই এমনটা চায় তাহলে তো ইমদাদের চাওয়াটা মাটি করতেই হবে। আফসানা চৌধুরীর সাথে এক টেবিলে বসে খাওয়ার সুযোগ সবাই পায় না। তবে ইমদাদ কেন সে সুযোগটা পাবে? যথেষ্ট অপমান করে নিয়েছে এই কয়েকদিন আফসানা কে, এবার না হয় আফসানার পালা।

তবে আফসানা আগেই সাদিক কে নিষেধ করল না। ভাবলো ইমদাদ নিজে আগে একবার অনুরোধ করুক। তারপর ওর মুখের উপরে না করে দেবে। সেই সাথে নিজের জায়গাটাও খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে ছাড়বে ইমদাদ কে।

ফোনে কথা বলা শেষে ইমদাদ ওদের দিকে এগিয়ে আসতেই সাদিক বলল,

“কিরে ইমদাদ, ম্যাডামকে বল যে আমাদের পার্টনারশিপের খুশিতে আমরা ম্যাডামকে ট্রিট দিতে চেয়েছিলাম। আমি ম্যাডামকে বলেছি যে আমরা তিনজন আজকে লাঞ্চে বাইরে করবো।”

আফসানা ভাবলো এবার নিশ্চয়ই ইমদাদও ওকে যাওয়ার জন্য বলবে। তবে আফসানার সেই আশায় ইমদাদ এক বালতি জল ঢেলে দিয়ে বলল,

“ম্যাডামকে নিয়ে যা তুই। আমার সময় হবে না আজ। আমার একটু দরকারি কাজ আছে। আর তাছাড়া আমাদের মাঝে তো এমন কোন কথা হয়নি আগে। তুই হঠাৎ করে বললে কি করে হবে।”

একেবারে চরম পর্যায়ের অপমানিত বোধ করলো আফসানা। আফসানার তো মনে হলো ইমদাদ ইচ্ছাকৃতভাবে ওকে এভাবে অপমান করলো। যদি যেতে নাই পারে সেই কথাটা কি আরেকটু ভালো করে বলা যেত না? আফসানার সামনে কি মাথা নত করে দাঁড়িয়ে অপরাধী গলায় বলতে পারতো না ইমদাদ যে, ও যেতে পারবে না তার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। এমন একটা সুযোগ ও হাতছাড়া করতে চায়নি। কিন্তু তবুও কিছু করার নেই।

কিন্তু তেমন কিছু না করে মুখের উপরে বলে দিলো ওর সময় নেই। আফসানা চৌধুরী ওদের সাথে লাঞ্চ করতে যেতে চায় আর ইমদাদের মতন একটা সাধারন ছেলের সময় নেই।

আফসানার এসব ভাবনার মাঝেই ইমদাদ বলে উঠলো,

“ম্যাডাম, আমি আসছি। বাকি যে জরুরী কথাবার্তা কাল হবে।”

কথাটা বলে ইমদাদ চলে গেল সেখান থেকে। আফসানার অনুমতিরও অপেক্ষা করলো না। কিছু বলার সুযোগও দিলােনা। আফসানা তো ভেবেছিলো একটু রাগ দেখাবে। তবে সেটারও তো সুযোগ দিলো না এই ছেলেটা ওকে।

বিজ্ঞাপন

ইমদাদ সেখান থেকে চলে যেতেই সাদিক মিনমিনে গলায় আফসানা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আসলে ম্যাডাম আমি ভাবিনি যে ও এভাবে চলে যাবে।”

আফসানা অগ্নিদৃষ্টিতে সাদিকের দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত গলায় চিৎকার করে উঠে বলল,

“আপনার বন্ধুর মাথায় একটা কথা ভালোভাবে ঢুকিয়ে দেবেন যেন আফসানা চৌধুরীকে দেমাগ না দেখায়। আমার দু মিনিট লাগবে না ওর এই তেজ মাটিতে মিশিয়ে দিতে। ওকে আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে নিষেধ করুন। একবার আমার ধৈর্যের বাঁধ যদি ভেঙে যায়, ওর জীবন কিন্তু আমি একেবারে ছারখার করে ছাড়বো।”

কথাটা বলে আফসানা চলে গেল সেখান থেকে। এতক্ষণ যেন সাদিকের নিঃশ্বাসটা আটকে ছিল। আফসানা সেখান থেকে চলে যেতেই একটা স্বস্তির শ্বাস ছাড়লো। ইমদাদ কে সাবধান করে দিতে হবে। নয়তো ব্যবসাটা আর করা হবে না ওদের।

_________

ইমদাদের বাড়ি ফিরতে আরো একদিন সময় লাগলো। বাড়ি ফিরলো রাত আটটা নাগাদ। কলি জানতো না যে ইমদাদ ফিরবে আজ। তাই হঠাৎ করে ওকে দেখে যেমন অবাক হলো ঠিক তেমনি খুশিও লাগলো। তবে ইয়াসমিনকে দেখতে বেশ স্বাভাবিকই লাগলো। শুধু ইয়াসমিন না, ইকবাল আর ইমাদকে দেখতেও স্বাভাবিক লাগলো। তারমানে সবাই জানতো ইমদাদ আসবে শুধু কলিকে বলার সময় ছিল না কারো। বেশ ঠিক আছে। আজ থেকে কলিও আর কিচ্ছু জানাবে না ইমদাদ কে।

কলি তখন সোফায় বসে টিভি দেখছে। অন্যান্য সময় হলে লাফিয়ে উঠে এগিয়ে যেত। তবে আজ গেল না। ইমদাদ একবার আড়চোখে দেখলো কলিকে। ইমদাদের ইচ্ছে হলো না কলির সাথে কথা বলার। সোজা নিজের ঘরে চলে গেলো হাত মুখ ধোয়ার জন্য।

ইমদাদ হাত মুখ ধুয়ে এসে দেখলো কলি তখনও সোফায় বসে টিভি দেখছে। টিভিতে তখন কার্টুন চলছে। বোধহয় একটু আগে ইকবাল দেখছিল। কলির মনোযোগ মোটেই টিভিতে নেই। ইমদাদ জানে কলির মাথায় এখন ঘুরছে যে ইমদাদ আগে আগে ওর সাথে কথা বলবে কিনা। আর কথা বললেও কি কথা বলবে, কলিই বা কি জবাব দেবে, কলি ভালোভাবে কথা বলবে নাকি রাগ দেখাবে এসবই ভাবছে।

সত্যি বলতে ইমদাদের ধারণা একদমই মিথ্যা না। কলি মনে মনে এসবই ভাবছে। টিভিতে কি চলছে সেদিকে কোন খেয়াল নেই। সামনে যে টিভি চলছে সেটাইতো ভুলে বসেছে। তবে কলির এতসব ভাবনাই বৃথা গেল। কেননা ওর সাথে আগ বাড়িয়ে এসে কথাই বলল না ইমদাদ। চুপচাপ চেয়ারে গিয়ে বসে পরলো খাবার খাওয়ার জন্য।

ইয়াসমিন গলা উঁচিয়ে ইমাদ আর ইকবালকে ঘর থেকে ডাকলো। তারপরে কলি কেও ডাকলো খেতে আসার জন্য। কলির ধ্যান ভাঙলো। ইমদাদের দিকে তাকিয়ে দেখলো চুপচাপ মাথা নামিয়ে বসে আছে। কেন যেন খেতে চাইলো না কলি। ইয়াসমিনকে বলল খাওয়ার ইচ্ছে নেই। ইচ্ছে হলে পরে খেয়ে নেবে।

ইয়াসমিন মৃদু রাগী ভঙ্গিতে বলল,

“খাবে না কেন? দুপুরেও তো তেমন কিছু খাওনি। না খেয়ে থাকার ব্রত করেছো নাকি? এসো, খেয়ে যাও।”

কলি ফের ইয়াসমিনের কথায় অসম্মতি জানিয়ে বলল,

“না আপু, খাব না। ইচ্ছে করছে না।”

“ইচ্ছে না করলেও একটু খেতে হবে কলি। খেয়ে যাও। ঠান্ডা হয়ে গেলে ভালো লাগবে না।”

কলি ফের কিছু বলে উঠতে ধরলো। তবে তার আগেই ইমদাদ ইয়াসমিন কে উদ্দেশ্য করে ধমক দিয়ে বলল,

“কানে কথা যায়না তোর ইয়াসমিন। ও বলল তো খাবেনা। জোর করে খাওয়ানোর কি আছে? ও কি ছোট বাচ্চা নাকি অতিথি? ওকে এখানে আদর আপ্যায়ন করার জন্য নিয়ে আসিনি যে তিন বেলা ওকে জোর করে খাওয়াতে হবে। মুখের সামনে তৈরি খাবার পাচ্ছে তো সেজন্য অবহেলা বেড়েছে। কাল থেকে বলবি নিজে রান্না করে যেন খায়। আমার বোনের এত ঠ্যাকা পড়েনি যে ওকে বসিয়ে রান্না করে খাওয়াবে তিন বেলা।”

মুহূর্তের মাঝে কলির দুচোখ ছলছল করে উঠলো। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ছলছল দৃষ্টিতে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি তো বলিনি আমার আদর যত্ন করতে। আর আমার জন্য কষ্ট করে তোমাদের কাউকে রান্না করতেও হবে না। চিন্তা করো না, বেশিদিন বিরক্ত করবো না তোমাদের। চলে যাব খুব তাড়াতাড়ি।”

কলি কথাটা বলতেই ইমদাদ এবারে রাগান্বিত গলায় কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তো যেতে বারণ করেছে কেউ তোকে? দরজা খোলা আছে, বেরিয়ে যা। এমনিতেও তোকে সারা জীবন পালতে পারব না। রাত হয়ে গেছে জন্য ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারলাম না। নয়তো তোর মুখ দেখার বিন্দুমাত্র কোন রুচি নেই আমার।”

কলির দুচোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগলো। সেখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। দৌড়ে ঘরে চলে গেল।

ইমদাদ দেখালো ওর কোনো কিছুতেই যায় আসে না। সঙ্গে সঙ্গে খাবার থালায় হাত দিল। পাশে দাঁড়ানো ইয়াসমিন বলে উঠলো,

“এমন ব্যবহার কেন করলে ভাইয়া? দুইদিন থেকে মেয়েটা তোমার অপেক্ষায় আছে। সারাদিন কানের কাছে এসে ঘ্যানঘ্যান করছিল তুমি কখন ফিরবে জানার জন্য। আমি বলিনি ভাবলাম হঠাৎ দেখলে খুশি হবে তাই।”

ইমদাদ মুখের মাঝে থাকা খাবারটুকু চিবিয়ে নিয়ে বেশ শান্ত ভঙ্গিতে ইয়াসমিন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার র’ক্ত চুষে খেতে পারছিলো না যে, সেই জন্যই অপেক্ষা করছিল। আর এমনিতেও ওই শ’য়’তা’নে’র বংশধরকে আমি সারাজীবন পালতেও পারবো না। দেখছিস না যাওয়ার জন্য নিজেই লাফাচ্ছে।”

“পালতে পারবেনা তাহলে বিয়ে করেছিলে কেন? কেউ কি তোমায় শর্ত দিয়েছিল যে কলিকে বিয়ে না করলে খুব বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে?”

কোন উত্তর দিলো না ইমদাদ। এক লোকমা ভাত তুলে মুখে দিতে ধরল, তবে সেটাও আর পারল না। ইচ্ছেই হলো না খাওয়ার। প্লেটের মাঝে হাত ধুয়ে উঠে চলে গেল। যাওয়ার আগে পিছন ফিরে তাকিয়ে ইয়াসমিনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“না খেয়ে যেন একটাকেও ঘুমোতে না দেখি। সকালে উঠে যদি দেখি গামলায় ভাত আছে তাহলে এবার কাউকে না জানিয়ে একেবারের জন্য উধাও হয়ে যাব।”

কথাটা বলে হন হন করে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল ইমদাদ। ইমাদ আর ইকবাল ইয়াসমিনের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। ইয়াসমিন এবার ওদের দুজনকে উদ্দেশ্য করে রাগান্বিত গলায় বলল,

“আমার মুখ না দেখে খাবার খা। ভালোবাসেন অথচ স্বীকার করার সৎ সাহস নেই। বিয়ে করে এনেছে আবার বলে কেন করেছে কারণ জানে না। এখানে তো নাটক হচ্ছে। জীবন তো একটা নাটক। যত্তসব।”

কথাটা বলে ইয়াসমিন নিজেও সেখান থেকে ঘরে চলে গেল। ইমাদ আর ইকবাল পড়লো মহাবিপকে। ইমাদেরও আর খেতে ইচ্ছপ করলো না। তবে ইকবালকে জোর করে খাওয়ালো। গামলার ভাত অমনি থেকে গেল। রাতে আর কারোরই খাওয়া হলো না।

_________

জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে কলি। এতদিন এত ঝগড়া হয়েছে কলির ইমদাদের সাথে কিন্তু তারপরেও ইমদাদ কখনো ওর সাথে এতটা বাজে ব্যবহার করেনি যতটা আজ করল। যখন ওদের সম্পর্কটা খারাপ ছিল তখনই তো এত খারাপ করে কথা বলেনি ইমদাদ। আর এখন তো সম্পর্কটা একটু হলেও ভালো। কি এমন বলেছিল কলি যে অযথা রাগ দেখালো।

ইমদাদ ঘরে ঢুকে ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। দরজা বন্ধের শব্দটা কানে যেতেই কলি কেঁপে উঠলো। কলি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ইমদাদের দিকে। তবে ইমদাদ একবারও মুখ তুলে তাকালে না কলির দিকে।

বিছানার উপর গিয়ে বসে ড্রয়ারের ভেতর থেকে একটা ওষুধের পাতা বের করলো ইমদাদ। কলি খেয়াল করে দেখল ওই এক ওষুধের পাতা থেকেই চারটা ওষুধ নিলো ইমদাদ। কলি জানে ওটা ঘুমের ওষুধ। এর আগেও একদিন ইমদাদকে খেতে দেখেছে। কিন্তু একটা করে খেত। আজ সোজা চারটে নিল। বেড সাইডের উপর থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে ইমদাদ যেই না ওষুধটা খেতে ধরলো ওমনি কলি গিয়ে ওর হাত ধরল।

ইমদাদ মাথা তুলে কলির দিকে তাকালো। চোখ দুটো লাল টকটক করছে ইমদাদের। কলির ভয় করলো কিন্তু তবুও হাতটা ছাড়লো না। কম্পিত গলায় বলল,

“মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এতগুলো ঘুমের ওষুধ কেউ একসাথে খায়?”

“তাতে তোর কি? আমি ম’রলেই তোর কি, আমি বাঁচলেই তোর কি? কোন কি উপকার হচ্ছে আমাকে দিয়ে তোর? না তো। আমি বাঁচা ম’রার সাথে তোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে? তাহলে সমস্যা কি খেলে?”

“পাগলের মতন কথা বলো না। এসব কোন ধরনের পাগলামি। একসাথে চারটে করে ঘুমের ওষুধ খাওয়া কোন সুস্থ মানুষের লক্ষন না।”

কলির থেকে এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে গা ছাড়া ভঙ্গিতে ইমদাদ বলল,

“আমাকে দেখে তোর সুস্থ মানুষ মনে হচ্ছে? আমি যদি সুস্থ হতাম তাহলে কি ঘুমের ওষুধ খেতাম? আমার এখন ঘুমের প্রয়োজন। এখন যদি না ঘুমোই মাথা ব্যথায় পাগল হয়ে যাব। আর তার মধ্যে তুই পাগল করার জন্য তো আছিসই। তার থেকে সর আমাকে ওষুধটা খেয়ে ঘুমোতে দে।”

ইমদাদ আবারো ওষুধটা খেতে ধরলে কলি আবারও খপ করে ইমদাদের হাতটা ধরে বলল,

“এতগুলো খেতে দেওয়া যাবে না। একটা খাও। খুব বেশি হলে দুটো খাবে। কিন্তু চারটা না। আর সমস্যা আমাকে নিয়ে তো? আমি চলে যাচ্ছি ঘর থেকে। আমার মুখও দেখতে হবে না। এমনি ঘুম চলে আসবে।”

কথাটা বলে কলি ইমদাদের হাত থেকে তিনটে ওষুধ আর ওষুধের পাতাটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ইমদাদ হাতে থাকে একটা ওষুধও মেঝেতে ছুঁড়ে মারলো। ওটাও আর খাওয়ার ইচ্ছে হলো না। চুপচাপ এমনি কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো।

কলির জন্য চিন্তা হচ্ছে। খুব ভালো করেই জানে ইমদাদ ওর ঘুম ঠিকঠাক হবে না। কিন্তু তারপরও খোঁজ নিতে গেল না। এমন আহ্লাদ করে করেই তো প্রশ্রয় পেয়ে গেছে মেয়েটা। কথায় কথায় বলে চলে যাবে। ঠিক আছে যাক চলে। যেদিকে দু চোখ যায় সেদিকেই চলে যাক।

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প