অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ২১

🟢

মাঝে কেটে যাওয়া কয়েকদিনে সবার দিনকাল মোটামুটি ভালোই কেটেছে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে মার্চ মাস থেকে এপ্রিল মাসে চলে এসেছে। নতুন জায়গায় ইমদাদের দোকানটাও বেশ ভালোই চলছে। দোকানের জায়গা বদলালেও পুরনো কাস্টমাররা নতুন জায়গাতেই প্রয়োজনে আসে।

দোকানের কর্মচারী আজ ছুটি নিয়েছে একদিনের জন্য। ইমদাদেরও শহরের বাইরে কাজ ছিল না। সেজন্য নিজেই দোকান খুলেছে। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকে সকাল থেকে কাস্টমারের ভিড়ও একটু বেশি ছিল। বিক্রিও বেশ ভালোই হয়েছে আজ।

দুপুরের দিকে গিয়ে ভিড়টা কমলো। ইয়াসমিন বাড়ি থেকে দুপুরের খাবার রান্না করে দিয়েছিল। ভিড় একটু কমতেই ইমদাদ হাত ধুঁয়ে এসে খাবারের বাটিটা নিয়ে বসলো।

ইমদাদের খাওয়ার মাঝেই আবারো কেউ একজন এলো। ইমদাদ ভাবলো নিশ্চয়ই কোন কাস্টমার এসেছে। তবে মানুষটার মুখের দিকে তাকাতেই ইমদাদের ভাবনা ভুল প্রমাণিত হলো। কপালে সুখ খুব সুক্ষ্ম ভাঁজ সৃষ্টি হলো। করিম সরদার এসেছে। কিন্তু কেন এসেছে? ওনার তো এখানে কোন কাজ থাকার কথা না। এই দোকানের ঠিকানাই বা ওনাকে কে দিল?

ভাতের বাটিটা বন্ধ করে রেখে হাত ধুঁয়ে ওনার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

“আপনার কি কাজ এখানে?”

করিম সরদার আলতো একটু হেসে বললেন,

“দেখতে এলাম তোমার ব্যবসা কেমন চলছে। ব্যবসা মনে হয় ঠিকঠাক চলছে না তাই না? লাভও বোধহয় আজকাল খুব একটা হচ্ছে না। সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। তিনটে ভাই বোন সঙ্গে আবার আমার মেয়ের খরচও আছে। চাপ অনেক বেড়ে গেছে মনে হয়।”

“কে বলল আপনাকে এসব? নাকি নিজে নিজেই ভেবে নিয়েছেন? তাহলে আজকাল জ্যোতিষীর কাজও করছেন!”

করিম সরদার হো হো করে হেসে উঠে বললেন,

“কাউকে আলাদা করে বলতে হয়নি। এমনিতেই কথাটা স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছে। যদি সবাইকে খাওয়াতে কষ্টই না হতো তাহলে কি আর নিজের বোনকে আমার ছেলের পিছনে লাগাতে। আমার মেয়েটাকে কেড়ে নিয়ে এবার আমার ছেলেকেও পর বানানোর ধান্দায় নেমেছো।”

শেষের দিকে করিম সরদারের কন্ঠটা অন্যরকম হয়ে গেল। রাগের তোপে তিনি কাঁপছেন। ইমদাদের ঠিক হজম হলো না ওনার কথাটা। উনি ভাবলেনই বা কি করে যে ইমদাদের এতটা দুর্দিন এসে যাবে যে নিজের বোনকে করিম সরদারের ছেলের পেছনে লাগাবে!

ইমদাদ ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠলো,

“নিজেকে আর নিজের ছেলেকে কি ভাবেন আপনি? আপনার ছেলে এমনও বিশেষ কেউ না যার পেছনে আমি আমার বোনকে লাগাবো। আর তাছাড়া নিজের ছেলেকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখুন যে কে কার পেছনে পরে থাকে। আমার বোন কখনো আপনার ছেলের প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। আপনার ছেলেই নির্লজ্জের মতন দিনরাত পরে থাকে আমার বোনের পেছনে।”

করিম সরদার গর্জে ওঠে আঙ্গুল উঁচিয়ে বললেন,

“মুখ সামলে কথা বলো। সরদার বাড়ির ছেলে কখনো এমন করতে পারেনা। তোমার বোনের সৌন্দর্যের সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমার ছেলেকে দুর্বল করতে চাইছে তো। কিন্তু সেটা কখনোই পারবে না। তুমি যতই চেষ্টা করো না কেন ওই মেয়েকে আমার বাড়ির বউ হিসেবে আমি কোনদিন মেনে নেব।”

যথেষ্ট ভদ্রতা বজায় রাখা হয়েছে। আর সম্ভব না। এবার ইমদাদকে অসভ্য হতেই হবে। নয়তো এদের মতো মানুষকে শায়েস্তা করা সম্ভব না। ইমদাদ নিজেও পাল্টা হুংকার ছেড়ে বলল,

“আঙুল আর গলা দুটোই নামিয়ে কথা বলুন। আপনার সাথে অযথা চেঁচামেচি করার সময় কিংবা ইচ্ছে কোনটাই আমার নেই। আপনার যা কথা বলারসময়ই আপনার ছেলের সাথে গিয়ে বলুন। জানেন ছেলের সাথে পেরে উঠবেন না সেজন্য আমায় গরম দেখাতে এসেছেন। আপনাদের এসব গরম ইমদাদ সহ্য করবে না। বলে দেবেন আপনার ছেলেকে আমার বোন কেন আমার বাড়ির ত্রিসীমানাতেও যেন ওকে না দেখি। নয়তো ঠ্যাং ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব।”

করিম সরদার আবারও গর্জে উঠে কিছু বলতে চাইলে ইমদাদ ঠান্ডা গলায় ওনাকে সাবধান করে দিয়ে বলল,

“এটা আমার কাজের জায়গা। অযথা ঝামেলা করলে ভালো হবে না কিন্তু। প্রভাবটা গিয়ে সোজা আপনার বাড়িতে পড়বে। এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাবেন। আমার বোনের সম্বন্ধে আর একটা বাজে কথাও আপনার মুখ দিয়ে বের করলে আপনাকে কিছু করবো না। সরাসরি আপনার ছেলেকে গিয়ে ঠ্যাঁঙাবো।”

আর কিছু বললেন না করিম সরদার। এতটুকুই বলার ছিল ওনার ইমদাদ কে। এতোটুকুই শাসানোর ছিল। আটকাতে হবে নিজের ছেলেকে। নিজের ছেলেই যদি কথা না শোনে অন্যের মেয়ের উপর আর কিভাবে জোর খাটাবেন তিনি।

__________

করিম সরদার দোকান থেকে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই ইমদাদও দোকানটা বন্ধ করে বাড়িতে এলো। আজ দরজাটা খুলে দিল কলি। কলি দরজাটা খুলতে না খুলতেই ইমদাদ গটগট করে ভিতরে ঢুকে গেল। কলি তো একটা মানুষ নাকি! কথা না বলুক অন্তত একবার তাকানো তো উচিত ছিল কলির দিকে। বাপরে বাপ! এতই দেমাগ এই ছেলের।

কলির এসব ভাবনার মাঝে ওর কানে ইমদাদের বজ্রকন্ঠ ভেসে এলো। কেঁপে উঠলো কলি। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল ইমদাদ তখনও বসার ঘরে আছে। ইয়াসমিনকে ডাকছে।

ইমদাদের ডাকটা কানে যেতেই ইয়াসমিন নিজের ঘর থেকে ছুটে এসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কি হয়েছে ভাইয়া?”

“সাঈদের সাথে তোর কথা হয়?”

হঠাৎ করে ইমদাদের মুখ থেকে এই প্রশ্নটা ঠিক আশা করেনি ইয়াসমিন। থতমত খেয়ে বলল,

“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

ইমদাদ চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর গলায় বলল,

“যেটা জিজ্ঞেস করলাম সেটার উত্তর দে। সাঈদের সাথে কথা হয় তোর?”

মাথা নামিয়ে নিলো ইয়াসমিন। মিনমিনে স্বরে বলল,

“দিনে অনেকবার করে কল করে।”

“তুই রিসিভ করিস?”

ইয়াসমিন তৎক্ষণাত দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না ভাইয়া। তবে ও থামেই না। মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে একবার রিসিভ করে বলি যেন আর বিরক্ত না করে।”

“নাম্বার কি করে ব্লক করতে হয় সেটা জানিস না তুই? নাকি মোবাইল চালাতে শিখিসনি? আর যদি মোবাইল চালাতে না জানিস তাহলে মোবাইল ব্যবহার করিস কেন?”

ইয়াসমিন ফের মিনমিনে স্বরে বলল,

“আমি অনেকগুলো নাম্বার ব্লক করেছি ভাইয়া। আবার নতুন নাম্বার থেকে কল করে। সেজন্যই এবারে…..”

ইয়াসমিন নিজের কথা সম্পূর্ণ করার আগেই ইমদাদ চিৎকার করে উঠে বলল,

“তাহলে তুই তোর নাম্বার বদলাতি। আমাকে বলার প্রয়োজন মনে করিস না কেন? এত কিছু দিতে পারছি আর একটা নতুন সিম কার্ড এনে দিতে পারতাম না তোকে? দরকার হলে তুই ফোন ব্যবহার করা ছেড়ে দিতি। এই মাঝে মাঝে হঠাৎ দু একবার কল রিসিভ করে কি প্রমাণ করতে চেয়েছিস তোর একেবারে সম্মতি না থাকলেও অসম্মতিও নেই? মানে তুই ওকে বোঝাতে চেয়েছিস যে যদি সুযোগ থাকে তাহলে তুই ওকে বিয়ে করবি?”

ইমদাদের বলা প্রত্যেকটা বাক্যে কেঁপে কেঁপে উঠলো ইয়াসমিন। এদিকে ওদের পাশে দাঁড়ানো কলি বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইমদাদের কথা গুলো শুনছে। আজ তো কলি নতুন কিছু জানতে পারলো।

ইয়াসমিন আর সাঈদের বিয়ে এটা কি করে সম্ভব? কিসের সম্মতি আর অসম্মতি? প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল নাকি? কিন্তু প্রস্তাবটা কে দিয়েছিল? এদের কথা তো শুনে মনে হচ্ছে সাঈদই ইয়াসমিনের পেছনে পরে ছিল। কিন্তু তাহলে কলি জানতে পারলো না কেন ব্যাপারটা? তার মানে সেদিন যে ইয়াসমিনের ফোনে সাঈদের নাম্বার থেকে অতবার করে কল দেখেছিল এটাই তার কারণ।

কলি আগবাড়িয়ে গিয়ে ইমদাদকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলো। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ইমদাদ ওর দিকে আঙ্গুল তুলে শাসিয়ে বলল,

“তোর মুখ দিয়ে যেন একটা শব্দও উচ্চারিত না হয়। তুই, তোর ভাই আর তোর বংশকে নিয়ে যত অশান্তি হয়েছে আমার। চুপচাপ এক পাশে দাঁড়িয়ে থাক।”

মুহূর্তের মাঝে কলি থেমে গেল। কয়েক কদম পিছিয়ে আবার নিজে পূর্বের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো। ইমদাদ আবারও ইয়াসমিনের দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল,

“উত্তর দিচ্ছিস না কেন? বল প্রশ্রয় দিয়েছিস সাঈদ কে?”

বিজ্ঞাপন

ইমদাদ শেষের বাক্যটা একটু ধমকের সুরে বলে উঠলো। এর আগে কখনো এত ধমকা ধমকি করেনি ইমদাদ ইয়াসমিনকে। কখনো রেগেও কথা বলেনি। ফলস্বরূপ আজকে ইয়াসমিন ইমদাদের এই ব্যবহারটা সহ্য করতে পারল না। চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। ইয়াসমিন কাঁদছে তবুও একটুও নরম হলো না ইমদাদ। কেননা সব সময় ভালোবাসা দেখালে চলে না। মাঝে মাঝে একটু শাসনও করতে হয়।

“আমি কি কাঁদার মতন কোন কথা বলেছি? তোর গায়ে হাত তুলেছি যে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে? আর যদি আমার শাসন সহ্য না হয় সেটাও বলে দে। করবোনা আর শাসন। যা ইচ্ছে তাই করতে পারিস।”

ইয়াসমিন তড়িঘড়ি করে চোখের জল মুছে নিয়ে বলল,

“আমি কখনো প্রশ্রয় দেইনি ভাইয়া। আমি সব সময় বলেছি তুমি যা চাইবে সেটাই হবে। আমি সব সময় বলেছি তুমি আমার জন্য যে সিদ্ধান্ত নেবে আমি সেটাই হাসিমুখে মেনে নেব। তুমি সাঈদ ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করেও দেখতে পারো। আমি কখনো ওনাকে প্রশ্রয় দেইনি এটা উনি নিজেও স্বীকার করবেন। যদি আমার প্রশ্রয় দেওয়ার হতো উনি যতবার কল করতেন ততবারই তো রিসিভ করতাম। কথা বলার সুযোগ ছিল আমার কাছে ওনার সাথে। কিন্তু আমি তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি সেজন্য কথা বলিনি।”

“বলার প্রয়োজনও নেই। এইবার যদি ও কল করেছে তোর নাম্বারে সোজা ফোন এনে আমার হাতে দিবি। আমিও দেখবো ওর সাহস হয় কি করে পরবর্তীতে আবার তোর নাম্বারে কল করার। শালা ছেলে এসে প্রেমের গান শোনায় আর বাপ এসে শাসিয়ে যায়। শা’লা শু’য়ো’রে’র বাচ্চা শু’য়ো’র’ই হয়েছে।”

কথাটা বলে ইমদাদ ইয়াসমিন কে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। কলির ইয়াসমিনকে দেখে খুব খারাপ লাগলো। মেয়েটা এত ভদ্র, শান্তশিষ্ট, নরম তারপরেও অসভ্য লোকটা কিভাবে ধমকা ধমকি করে গেল। আসলেই শরীরে মায়া-দয়া বলতে কিছুই নেই।

আর এমন ভাব দেখাচ্ছে নিজে সাধু। সাঈদ তো অন্তত ভয় দেখিয়ে বিয়ে করতো না।নিশ্চয় সম্মতির অপেক্ষা করছিল ইয়াসমিনের। আর নিজে তো ভয় দেখিয়ে বিয়ে করেছে, তাও আবার সাঈদের বোনকে। আর এখন নিজের বোনকে দিতে যত কাঁপাকাঁপি উঠছে।

__________

সন্ধ্যের দিকে ইয়াসমিন এলো ইমদাদের ঘরে। দরজায় দাঁড়িয়ে ভিতরে প্রবেশের জন্য অনুমতি চাইলো। ইমদাদ গম্ভীর গলায় ভিতরে আসার জন্য অনুমতি দিল। কলিও তখনো ঘরেই আছে। দুজন দু প্রান্তে বসে। কারো সাথে কারো কোন কথা নেই।

ইয়াসমিন ঘরে এসে ইমদাদের দিকে গেল। হাতে থাকা ফোনটা ইমদাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“সাঈদ ভাইয়া বারবার কল করছে।”

ইমদাদ ইয়াসমিনের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে বলল,

“কয়বার কল করেছে?”

ইয়াসমিন তোতলানো গলায় বলো,

“পপপাঁচ বার।”

“প্রথমবারে কেন দিয়ে যাসনি? বাঁচানোর চেষ্টা করছিস? দরদ উতলে পড়ছে নাকি?”

ইয়াসমিন তাড়াহুড়ো করে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না। আসলে চাইছিলাম না ঝামেলা হোক। কিন্তু এখন বাধ্য হয়ে তোমায় দিলাম।”

“ঝামেলা তো ওর বাপ বাঁধিয়ে রেখে গেছে। এখন আমি সেই ঝামেলার সমাপ্তি করব। কখনো যদি রাস্তাঘাটে সাঈদের সাথে দেখা হয়ে যায় ভুলেও ওর সঙ্গে কথা বলবি না। ও যদি জোর করে কথা বলার চেষ্টা করে তাহলে চেঁচিয়ে লোক জড়ো করে বলবি তোকে বিরক্ত করে। পাড়ার বখাটে ছেলে। দরকার পড়লে লোক দিয়ে ওকে মা’র খাইয়ে নিবি। তারপর কি করে কি সামলাতে হয় তোর ভাই দেখে নেবে।”

ইমদাদ কথাটা বলতেই কলি ওর দিকে তেড়ে এসে বলল,

“অনেকক্ষণ থেকে তোমার বেয়াদবি সহ্য করছি। নিজেকে কি ভাবো তুমি? তুমি খুব সভ্য, তুমি খুব ভদ্র, খুব ভালো ছেলে? তুমি বখাটে না? আমায় জোর করে বিয়ে করোনি? ভয় দেখিয়ে বিয়ে করোনি? সেদিক থেকে বলতে গেলে তাে আমার ভাই যথেষ্ট ভদ্র। আমার ভাইয়ের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে না তুমি আমার সাথে যা করেছো তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তোমার বোনকে এতদিনে তুলে নিয়ে যেত।”

ইমদাদ খুব বিরক্তিকর দৃষ্টিতে কলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“যা জানিস না তা নিয়ে কথা বলিস কেন? তোর ভাইয়ের সম্মতি ছিল আমাদের বিয়েতে। ওই আমাকে প্রথমে এই কথাটা বলেছিল।”

সাঈদ কেন ইমদাদ কে কথাটা বলেছিল, কেন ইমদাদের মতন একটা খাটাশের সাথে ওর বিয়ে দিতে চেয়েছিল সেসব নিয়ে কলি এখন আর ভাবলো না। ভাবলো পরে নাহয় সাঈদকে জিজ্ঞেস করা যাবে। আপাতত সাঈদের হয়ে প্রতিবাদ করাটা জরুরী।

“আমার ভাই যখন তোমাকে নিজের বোন তুলে দিতে পেরেছে তুমি কেন পারছো না? তোমাকেও দিতে হবে। আমার ভাইয়ের অধিকার এটা।”

“কানের নিচে একটা লাগালেই অধিকার কাকে বলে টের পাবি। আমার হাতে কেন তুলে দিতে চেয়েছিলো তোর ভাই তোকে সেটা তুই ভেবে দেখ। কেন বিশ্বাস করল আমাকে?নিশ্চয়ই ইমদাদ সেটার যোগ্য। আর তোর ভাইকে আমি কেন ভরসা করতে পারছি না সেটাও ভেবে দেখ। এখন বের হ ঘর থেকে দুজনেই। ভুলেও দরজায় আড়ি পাতার চেষ্টা করবিনা। যদি আমি টের পেয়েছি দরজায় কেউ আড়ি পেতেছিস তাহলে তার কান ই কে'টে ফেলবো আমি।”

কলি তেজ দেখিয়ে বলল যাবে না। কলি ঝগড়া করতে চাইলো তবে ইয়াসমিন তার আগেই জোর করে টেনে নিয়ে বাইরে গেল। কলি যাওয়ার সময় বিভিন্ন ভাষায় গালাগালি করল। তবে ইমদাদ সেসব কানেই তুলল না। উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

ইয়াসমিনের ফোন থেকে সাঈদের নাম্বারটা ব্লকলিস্টে ফেলল। তারপরে ইয়াসমিনের ফোনটাই সুইচ অফ করে দিলো। তারপরে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে সাঈদের নাম্বারে কল লাগালো।

অপর পাশ থেকে সাঈদ ফোনটা রিসিভ করেই রাগী গলায় বলে উঠলো,

“ইয়াসমিনের ফোন তোর কাছে তাই না? ইয়াসমিন যথেষ্ট বড় হয়েছে। ওকে ওর জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে দে। অতিরিক্ত নাক গলানো উচিত না। শেষে দেখবি হাত থেকে বেরিয়ে যাবে।”

“ইয়াসমিনকে শিক্ষা দিয়েছে ইমদাদ। তোর মতন কিংবা তোর বাপের মতন কোন মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষ না। সে যাই হোক। আমার বোনকে বিরক্ত করছিস কেন? ও নিষেধ করেনি তোকে? ও বলেনি তোকে যে ওর ভাইয়ের সিদ্ধান্তই ওর সিদ্ধান্ত? কথা কানে যায় না তোর?”

সাঈদও পাল্টা দাঁত পিষে বলল,

“তোর কানে কথা যায় না যে, আমি ইয়াসমিনকে ভালোবাসি? বিয়ে করবো আমি ওকে। তুই কেন তোর চৌদ্দগুষ্টিও আটকাতে পারবিনা।"

“আগে নিজের গুষ্টি কে সামলে দেখা। তোর বাপ এসেছিল আমার দোকানে হুমকি দিতে যেন আমি আমার বোনকে সামলাই৷ আমার বোনকে নাকি তোর পেছনে লাগিয়ে দিয়েছি। আমার বোন নাকি নিজের সৌন্দর্য দিয়ে তোকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে।”

“কি? বাবা বলেছে এসব তোকে?”

“বিশ্বাস হয়না?”

“না তেমন কোন ব্যাপার না। কিন্তু আমায় তো কিছু বলেনি। ”

ইমদাদ ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠলো,

“তোকে কিছু বললে তো তুই হাত থেকে বেরিয়ে যাবি। তুই হলি করিম সরদারের সোনার ডিম পাড়া হাঁস। তোকে দিয়েই তো সব সম্পত্তি হাতাবে। তোকে গরম করলে চলবে নাকি! বরং তুই গরম হলে তোকে ঠান্ডা করার দায়িত্ব নেবে।”

তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর ভেসে এলো না ফোনের অপর পাশ থেকে। তাই কিছুক্ষণ গভীর ভাবনায় নিমগ্ন থাকার পর একটু তাড়া দিয়ে বলল,

“আচ্ছা এখন ফোনটা রাখছি। পরে কথা বলছি তোর সাথে।”

সাঈদ কলটা কাটতে ধরলে ইমদাদ ওকে ডেকে উঠে বলল,

“আমার কথাটা শুনে যা। তুই ছেলেটা কেমন, ভালো না খারাপ, ইয়াসমিনকে সত্যি ভালোবাসিস নাকি সবটাই নাটক এগুলো জানার আমার প্রয়োজন নেই। তোকে মেনে না নেয়ার জন্য তুই করিম সরদারের ছেলে এই একটা কারণই যথেষ্ট। যতই চেষ্টা করিস না কেন আমি ইয়াসমিন কে তোর হাতে তুলে দেব না। তাই বলছি সময় নষ্ট করিস না। ইমদাদের জেদ সম্পর্কে খুব ভালো মতোই ধারণা আছে তোর। ভালো একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করে ঘর সংসার কর। আর খুব তাড়াতাড়ি আমিও ইয়াসমিনের ভালো কোন জায়গায় বিয়ে দিয়ে দেব।”

সাঈদ বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“ঠিক আছে। চেষ্টা করে দেখ যদি ওর বিয়ে দিতে পারিস। আমার বিশ্বাস অন্তত এই ব্যাপারে ইয়াসমিন তোর কথা মানবে না। আমি বুঝি ও আমাকে ভালোবাসে ঠিকই। তবে শুধুমাত্র তোর ভয়ে কিছু বলতে পারেনা। তবে আমাকে হারিয়ে ফেলার সময় এলে ও ঠিকই তোর কথার অবাধ্য হয়ে আমার কাছে আসবে। জীবনে একবার অন্তত তুই আমার কাছে হারবি ইমদাদ।”

সাঈদের কথাটা শুনে ইমদাদ হো হো করে হেসে উঠে বেশ আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,

“আমার বোন খুব ভালো করেই জানে ও আমার কলিজার একটা টুকরো। নিজের র’ক্ত জল করে ওকে আদরে বড় করেছি। তোর মতন হাজারটা সাঈদ এলেও ও কখনো ওর ভাইকে কষ্ট দেবে না। ওর জীবনে ওর ভাইয়ের জায়গা ওর বাবারও আগে। তাহলে ভেবে দেখিস তোকে কোন জায়গায় পৌঁছাতে হবে।”

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প