রাতের রান্না করার জন্য রান্না ঘরে গিয়ে বিপাকে পড়তে হলে জাবেদা বেগমকে। দুপুরেই তো চাল শেষ হয়ে গিয়েছিল। হাতে তো টাকা পয়সাও নেই। আজ দুপুরে মেয়েকে বই কেনার জন্য সব টাকা দিয়ে দিলেন। তখন তো ওনার একদমই মনে ছিল না যে রাতে চাল কেনার জন্য কিছু টাকা হাতে রাখা দরকার। সবই তো দিয়ে দিলেন। এখন কি খাবেন? এমনটাও তো না যে কোন ভাবে রাতটা কাটিয়ে নিলে সকালে উঠে চালের ব্যবস্থা করতে পারবেন। টাকা কোথায় পাবেন?
বিষন্ন মুখ নিয়ে জাবেদা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আবার ঘরে এসে বসলেন। মেয়ে তখন টেবিলে বসে পড়ছে। মায়ের এমন বিষন্ন মুখ দেখে বইটা বন্ধ করে উঠে এসে বিছানার উপর মায়ের পাশে বসে খাদিজা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“কি হয়েছে আম্মু? মুখটা এমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন?”
“চাল নেই বাড়িতে।”
“তো এমন কি হয়েছে। আমাকে টাকা দাও আমি গিয়ে নিয়ে আসছি।”
জাবেদা বেগম মুখ কালো করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“টাকা তো নেই। যা ছিল সব তোকে দিয়ে দিয়েছিলাম বই কেনার জন্য।”
খাদিজা মৃদু চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“কিইই? সব টাকা দিয়ে দিয়েছিলে? এমন কেউ করে? তুমিও না আম্মু। এখন কি করবো? আমারও তো সব টাকা শেষ।”
জাবেদা বেগম কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে বললেন,
“ইমদাদকে কল করি!”
খাদিজা অস্বস্তি জড়ানো গলায় বলল,
“না আম্মু, ভাইয়াকে কল করো না। এইতো কদিন আগেই তো টাকা দিয়ে গেলো। আজই আবার কল করে টাকা চাইবো কেমন লাগবে না! আর ভাইয়ার কাছেও এখন টাকা আছে কিনা কে জানে। আমরা কল করলে হয়তো আবার ধার দেনা করবে।”
“তাহলে কি করবো? না খেয়ে কতক্ষন থাকবো?”
দুই মা মেয়ে বেশ চিন্তার মাঝে পড়ে গেল। কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে খাদিজা একটা সমাধান বের করে বলল,
“ঘরে কি মুড়ি বিস্কুটও নেই?”
“মুড়ি আছে।”
“ওগুলো খেয়েই আজ রাতের মতন ঘুমিয়ে পড়ি। কাল সকালে আমি আমার কোন বন্ধুর থেকে টাকা ধার চেয়ে নেব।”
মেয়ের কথায় জাবেদা বেগমও সম্মতি জানিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ ঠিক বলেছিস, তাই করিস। আমারও কয়েকটা জামা বানানো শেষ। কালকে নিতে এলে টাকা পাব হাতে।”
মা মেয়ে মিলে সব ভাবনা চিন্তা করে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। রাত দশটা নাগাদ বাড়ির কলিং বেল বাজলো। খাদিজা তখনো পড়ছে। জাবেদা বেগম ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এত রাতে কলিং বেল বাজায় ভয় পেলেন তিনি।
এত রাতে তো কখনো কেউ আসে না। আর যদি কারো আশার থাকে তবে তো আগেই জানিয়ে দেয়। তেমন তো কোন আত্মীয়-স্বজনও নেই ওনাদের যে হুট করে চলে আসবে।
একেই তো যুবতী সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে একা থাকেন। পাড়ার ছেলেদেরও নজর খারাপ। তার উপরে আবার এত রাতে কলিং বেল বাজলো। কে জানে আবার নতুন করে কোন বিপদ এসে ঘাড়ে চাপল!
খাদিজা গিয়ে দরজা খুলতে চাইলে জাবেদা বেগম ওকে বাঁধা দিয়ে বললেন,
“দরজা খোলার দরকার নেই। অপেক্ষা করতে করতে যে এসেছে এমনি চলে যাবে। আমাদের পরিচিত কেউ হলে দরজা না খুললে তো কল করবেই।”
খাদিজা বিরক্তির স্বরে বলল,
“আহ মা! এত ভয় পাও কেন? দাঁড়াও আমি গিয়ে দেখছি। দরজা না খুললাম, অন্তত শুনি কে এসেছে। তাহলেই তো হয়।”
জাবেদা বেগম তাও মেয়েকে যেতে দিলেন না। ওনাদের দুজনের বাক-বিতণ্ডার মাঝে খাদিজার ফোনটা বেজে উঠলো। টেবিলের উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো স্ক্রিনে ইমদাদের নাম্বারটা ভেসে উঠেছে।
এই মুহূর্তে ইমদাদের কলটা আশায় জাবেদা বেগম ভীষণ খুশি হলেন। মেয়ের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে রিসিভ করে তিনি কানে ধরে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
“বাবা, তুই কল করেছিস ভালো হয়েছে। দেখ না এত রাতে কে যেন কলিং বেল বাজাচ্ছে। আমার তো ভীষণ ভয় হচ্ছে। তোর বোনকে বলছি দরজা না খুলতে। কিন্তু ও শুনছে না।”
ফোনের অপর পাশে থাকা ইমদাদ জাবেদা বেগমের কথাগুলো শুনে গুরুতর ভঙ্গিতে গম্ভীর গলায় বলল,
“একদম ঠিক করেছো বড় আম্মু। দরজা খুলো না। শহরে ডাকাতের সংখ্যা বেড়ে গেছে। দরজা খুললে যদি আবার তোমাদের ডাকাতি করে নিয়ে যায়!”
ইমদাদের করা মজাটা ধরতে পারলেন না জাবেদা বেগম। তিনি ব্যাপারটাকে সত্যিই ধরে নিলেন। ভয়ার্ত গলায় বললেন,
“আগে বলিসনি কেন এ কথা? আমি তো জানতাম না কিছু। এখন কি করবো? যদি সত্যি ডাকাত এসে থাকে তাহলে তো দরজা ভেঙে ঢুকে আসবে।”
ইমদাদ আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। হো হো করে হেসে উঠে বলল,
“আমি এসেছি বড় আম্মু। দরজা খোলো।”
“তুই এসেছিস?”
অবুঝের মতন প্রশ্নটা করলেন জাবেদা বেগম। ওনার প্রশ্নটা শুনেই খাদিজা বুঝে গেল দরজার বাইরে কে এসেছে। আর জাবেদা বেগমের থেকে কোন কিছু শোনার অপেক্ষাই করলো না। নিজেই গিয়ে দরজাটা খুলে দিল।
ইমদাদ কে দেখে খাদিজার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। দরজা খুলতে দেখে ইমদাদ ফোনটা রেখে দিল। ততক্ষণে জাবেদা বেগমও সেখানে চলে এসেছেন। ইমদাদ কে দেখে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“যাক বাবা, বাঁচলাম আমি। আমি তো ভেবেছিলাম কে না কে এসেছে।”
জুতোটা বাইরে খুলে রেখে ইমদাদ ভিতরে আসতে আসতে বলল,
“এত ভয় পেলে জীবন চলবেনা তো বড় আম্মু। সাহসী হতে হবে। তোমার মেয়ের মতন সাহসী।”
কথাটা বলে ইমদাদ এবারে খাদিজার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“কি খবর তোর? পড়াশোনা কেমন চলছে?”
খাদিজা হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,
“খুব ভালো চলছে ভাইয়া। তুমি বলো তুমি কেমন আছো? আর যখন এলে ভাবিকে নিয়ে এলে না কেন?”
ইমদাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দুঃখী ভঙ্গিতে বলল,
“ভাবিকে নিয়ে ঘোরার মতন কপাল এখনো তোর ভাইয়ের হয়নি। সে যাই হোক, আজ কিন্তু এখানেই থাকবো বড় আম্মু। খাবার দাবার কি কিছু আছে? তোমার হাতের রান্না খাবো বলে বাইরে থেকে কিছু খেয়ে আসিনি। একটু গরম ভাত রেঁধে দেবে!”
ইমদাদ কথাটা বলতেই খাদিজা আর জাবেদা বেগমের মুখটা কালো হয়ে গেল। কি উত্তর দেবে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। একে অন্যের দিকে তাকালো। ওদের দুজনকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে দেখে ইমদাদের কিছু একটা খটকা লাগল।
“ব্যাপারটা কি বলোতো? খাবারের কথা শুনে তোমাদের মুখ এমন হয়ে গেল কেন? অন্য দিন তো আমি খেতে চাইলে খুশিতে লাফিয়ে ওঠো। আর আজ এত চুপচাপ যে?”
দুজনের কেউই কোন উত্তর দিতে পারল না। ওদের দুজনকে চুপ করে থাকতে দেখে ইমদাদের কাছে ব্যাপারটা এবার একটু গুরুতরই মনে হলো। গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
“সত্যি করে বলতো আমায় কি হয়েছে? খাবার নিয়ে কোন সমস্যা? রান্না করা নেই জন্য এমন করছো?”
খাদিজা মিনমিনে গলায় বলল,
“না ভাইয়া। তেমন ব্যাপার না। আসলে…।”
“আসলে কি?”
“আসলে চাল নেই বাড়িতে। আমরাও রাতে খাইনি। তোমায় এখন কি খেতে দেই বলোতো?”
খাদিজা জানে এখন ইমদাদ রাগারাগি করবে। দুই মা মেয়েকেই এখন ইমদাদের কাছে বেশ ভালোই কথা শুনতে হবে। নিজেকে মনে মনে সে সবের জন্য প্রস্তুতও করলো খাদিজা এবং ইমদাদের কাছে কথা শুনতেও হলো। ইমদাদ মৃদু রাগী গলায় বলে উঠলো,
“মাথার ওপর তোর এত পড়ার চাপ। না খেয়ে-দেয়ে অজ্ঞান হয়ে পরে যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে? আর বড় আম্মু, তোমার না প্রেশারের সমস্যা। তুমিও তো না খেয়ে থাকলে জ্ঞান হারাবে। দুই মা মেয়ে অজ্ঞান হয়ে থাকলে জ্ঞান ফেরাবে কে? জ্ঞান ফেরানোর জন্যও তো আবার সেই ইমদাদ কে আসতে হবে। আর সামান্য বাড়িতে চাল নেই এই কথাটা আমাকে জানাতে পারলে না?”
জাবেদা বেগম অসহায় কন্ঠে ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আমি তোকে জানাতে চেয়েছিলাম বাবা। কিন্তু খাদিজা নিষেধ করল। বলল এমনিতেই তোর উপর অনেক চাপ হয়ে যায়।”
ইমদাদ খাদিজার উপরে রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই খাদিজা মিনমিনে গলায় বলল,
“ভুল হয়ে গেছে ভাইয়া। আর হবে না। আসলে কয়েকদিন আগেই তো তুমি টাকা দিয়ে গেলে। এত তাড়াতাড়ি টাকাগুলো সব শেষ হয়ে গেছে আবার তোমাকে বলতে অস্বস্তি হতো। তুমিই বা এত টাকা কোথা থেকে জোগাড় করো!”
“সেসব আমি বুঝে নেব। টাকা কোথা থেকে জোগাড় হবে সেই চিন্তা যদি তোকে দিয়ে করানোর হতো তাহলে পড়াশোনা করাতাম না। কোন একটা কাজে ঢুকিয়ে দিতাম। আজ প্রথম আর শেষবারের মতন ক্ষমা করলাম। আর যেন কখনো এই ভুল না হয়।”
দুই মা মেয়ে একসঙ্গে মাথা নাড়িয়ে ইমদাদের কথায় সম্মতি জানালো। ইমদাদ বুঝলো জুতো খুলে আর লাভ নেই। আবারও বাইরে যেতে হবে। আবারো বাইরে গিয়ে জুতোটা পড়তে পড়তে জাবেদা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আর কি কি নিয়ে লাগবে বলোতো আমায়? রাত তো অনেক হয়ে গেছে। তেমন তো কিছু পাবো না। টুকটাক যা পাবো নিয়ে আসবো। বাকি না হয় কাল সকালে কিনে দিয়ে যাবো আমি।”
জাবেদা বেগম তড়িঘড়ি করে বললেন,
“সব আছে। শুধু চালটাই নেই।”
ইমদাদ চলে যেতে ধরে আবার থেমে গেল। পিছন ফিরে তাকিয়ে ভ্রুঁ উঁচিয়ে খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“যাবি আমার সাথে?”
খাদিজা পাশে দাঁড়ানো ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মা তো এত রাতে বের হতে দেয় না বাড়ি থেকে।”
“সেজন্যই তো নিয়ে যেতে চাইছি। একা একা তো দশটার সময় রাতের শহর দেখার সৌভাগ্য হয় না। আজ তো ভাই আছে সাথে। যেতে ভয় কিসের! চলে আয়।”
ইমদাদ হাত বাড়িয়ে ডাকলো খাদিজাকে। খাদিজা আর জাবেদা বেগমের অনুমতির অপেক্ষা না করে দৌড়ে চলে গেল ইমদাদের কাছে। অনেকগুলো দিন পর ভরসাযোগ্য একটা মানুষ কে পেয়েছে। এই ঘোরার সুযোগ কি আর হাতছাড়া করা যায়!
__________
বিছানার শুয়ে শুধু এপাশ ওপাশ ফিরছে কলি। চোখে ঘুমের বিন্দুমাত্র কোনো লেস নেই। বিছানাটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এত বড় একটা বিছানায় কি আর একা ঘুমোনো যায়! অথচ এই বিছানায় একা ঘুমোনোর জন্য গতকালই ইমদাদের সাথে কত যুদ্ধ করলো। শেষে তো পারলোই না, অযথা সারারাত ঘুম কামাই হলো।
গতকালের কথা ভাবতে গিয়ে কলির আবার ইমদাদের কথা মনে পড়ে গেল। বারবার মনে হতে লাগলো ইমদাদ নেই। ইমদাদকে ছাড়া ভালো লাগছে না।
তবে কলির আরেকটা কথা ভেবে বেশ ভালোই রাগ হলো। লোকটা কি দায়িত্ব জ্ঞানহীন। সেই যে বাড়ি থেকে বেরোলো ঠিকঠাক ভাবে পৌঁছলো কিনা, রাতে কোথায় থাকল, কি খেল, কি করলো কিচ্ছু একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলো না কলিকে।
তার থেকেও বড় কথা কলি যে এতবার করে বাড়িতে ফিরতে বলল, মুখ ফুটে বলল যে ওকে ছাড়া ভালো লাগবে না তারপরও বাড়ি ফিরল না। কলিও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো আর কখনো ফিরতে বলবেও না। যখন ইচ্ছে হবে তখন ফিরবে।
কলি মনে মনে এও ঠিক করলো যে আর ইমদাদের কথা ভাববে না। চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়বে।
কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করলো কলি, তবে পারলো না। বিভিন্ন ভঙ্গিতে ঘুমোনোর চেষ্টা করলো। একেকবার বিছানার একেক পাশে গিয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করলো। কখনো কাঁথা মুড়ি দিয়ে, তো কখনো কাঁথা গা থেকে ফেলে দিয়ে, কখনো বালিশে শুয়ে, তো কখনো মাথার নিচ থেকে বালিশ ফেলে দিয়ে। কখনো আমার বালিশটা জড়িয়ে ধরেও ঘুমোনোর চেষ্টা করলো তবে কোনোমতেই ঘুম এলো না।
অবশেষে কলি উঠে পড়লো। দুহাতে মাথার চুল খামচে ধরে নিজেই নিজেকে গালাগাল করলো কিছুক্ষণ। তারপরে বিরক্তিকর গলায় বলল,
“ওই বজ্জাতের খোঁজ নিতেই হবে তোর? কেন নিতে হবে? যেখানে ইচ্ছে যাক, ফুটপাতে ঘুমোক তাতে তোর কি? ও কিছু খাক বা না খাক তাতে তোর কি? মনে নেই সেদিন কেমন তুই খেয়েছিস কিনা সে কথা না ভেবে চলে এসেছিলো? তাহলে আজকে ওর কথা ভাবছিস কেন? ভুলে যা ইমদাদের কথা। ও নিশ্চয়ই নিজের প্রেমিকাকে নিয়ে এখন রেস্টুরেন্টে বসে থেকে গিলছে।”
কথাগুলো বলতেই কলির হঠাৎ করে মনের মাঝে একটা চিন্তা খেলে গেল। ইমদাদ কি সত্যি নিজের প্রেমিকাকে নিয়ে এখন রেস্টুরেন্টে বসে খাচ্ছে? আচ্ছা সত্যিই কি ইমদাদের কোন প্রেমিকা আছে? আচ্ছা ইমদাদ আবার কলির কথা মত বিয়ে করে বউ নিয়ে চলে আসবে না তো?
দুই বউকে তো একসাথে এক বাড়িতে রাখা যায় না। তাহলে যদি অন্য কাউকে বিয়ে করে আনে কলির কি হবে? এখনতো কলির পক্ষে এই বাড়ি ছাড়া সম্ভব না। আর তাছাড়া কলি এই বাড়ি ছাড়বেই বা কেন। ওই বজ্জাতটা তো বিয়ে করেছে কলিকে। তাহলে এক বউ থাকা সত্ত্বেও আবার আরেকটা বিয়ে করবেই বা কোন সাহসে? বজ্জাতটা এখন কি করছে জানতেই হবে।
ইমদাদের সাথে যোগাযোগের একমাত্র উপায় হলো ফোন। কলির কাছে তো নিজের একটা ফোনও নেই এতটাই গরীব হয়ে গেছে সরদার বাড়ির মেয়ে। ভাবলো ইমদাদ এলে ওকে খোঁচাবে। বলবে গরিব ঘরে বিয়ে করে এসে কলিও গরীব হয়ে গেছে।
পরক্ষণেই আবার মনে হলো এটা বললে যদি বাড়ি থেকে বের করে দেয়! দিতেই পারে। হয়তো এক লাথি দিয়ে বের করে আবার বড়লোক বাড়ির মেয়েকে বড়লোক বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দেবে।
কলি ঘর থেকে বেরোলো একটা ফোন পাওয়ার উদ্দেশ্যে। এখন ভাবছে কার ঘরে যাবে, ইয়াসমিনের ঘরে নাকি ইমাদের ঘরে?
আগে ইয়াসমিনের ঘরে গেল। ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখল ইয়াসমিন ঘুমোচ্ছে। পুরো ঘর অন্ধকার। কলি ভাবলো ইয়াসমিনের ফোনটা নিলে কেউ টেরই পাবেনা যে ও ইমদাদের খোঁজ নিয়েছিলো। এটাই ভালো হবে।
পা টিপে টিপে ইয়াসমিনের ঘরে গেল কলি। আন্দাজে হেঁটে বিছানা অব্দি গেল। ইয়াসমিনের বালিশের পাশে হাতরে ফোনটাও পেয়ে গেল। ফোনটা নিয়ে আবারো পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। কলির ভাগ্য প্রসন্ন হলো। ইয়াসমিনের ফোনে কোন লক নেই। এই প্রথম কলিম মনে হলো ভাগ্য কলির সহায় হয়েছে।
ফোনটা নিয়ে কলি আবার নিজের ঘরে এলো। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় গিয়ে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বসল। ইমদাদের নাম্বারটা খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ কললিস্টে সাঈদের নাম্বার দেখল কলি।
ইয়াসমিনের ফোনে হাতে গোনা কয়েকটা নাম্বার থেকেই কল এসেছে। তবে সর্বাধিক কল এসেছে সাঈদের নাম্বার থেকে। ইমদাদও এতবার কল করেনি। আরো বেশি অবাক হলো এটা দেখে যে বেশিরভাগ কলই রিসিভ করা হয়নি। কলি একটু ভাবনার মাঝে পড়ে গেল যে সাঈদ ইয়াসমিনকে কেন এত বার কল করেছে? কলির খোঁজ নেওয়ার জন্য? কিন্তু কলিতো এখানে এলো দু তিন দিন হলো, তার আগেও তো অনেক বার কল করেছে।
এই ব্যাপারটা কলি মাথায় রাখলো। ভাবলো এই নিয়ে পরে গবেষণা করা যাবে। তবে এখন আগে ইমদাদের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
রাত বেশ অনেকই হয়েছে। ইমদাদের আর ইচ্ছে করলো না এখন আবার বাড়ি গিয়ে জাবেদা বেগমকে রান্না করতে দিতে। এলাকাতে তেমন একটা হোটেলও নেই। যেগুলো আছে বেশিরভাগটাই বন্ধ হয়ে গেছে। ভাগ্যক্রমে একটা হোটেল খুঁজে পেল। ইচ্ছে ছিল বিরিয়ানি নেওয়ার, তবে পেল না। শেষে মোরগ পোলাও নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো।
জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ইমদাদের ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই দেখলো ইয়াসমিন এর নাম্বার। এত রাতে ইয়াসমিনের কলটা দেখে ইমদাদের কেন যেন ব্যাপারটা একটু খটকা লাগলো।
একটু আগেই তো কথা হয়েছিল ইয়াসমিনের সাথে। আবার তো কল দেওয়ার কথা না। আর বাড়িতে কোন সমস্যা হওয়ারও কথা না। কেননা ওদের বাড়িতে সমস্যা হলে কেবলমাত্র সেই সমস্যা তৈরি করে সরদার বাড়ির লোকজন। আর তেমন যেন কোন সমস্যা তৈরি না হয় সেই ব্যবস্থা ইমাদাদ করে এসেছে। সাঈদকে বলে এসেছে সবটা সামলানোর জন্য। তাহলে হলোটা কি?
ইমদাদ যেন বেশ অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেল যে এটা ইয়াসমিন কল করেনি। মনে হলো কলি কল করেছে। অজান্তে ঠোঁটে একটা প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো। ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে ইমদাদ নিজেই আগে বলে উঠলো,
“চিন্তা করিস না প্রেমিকার সাথে ঘুরছি না, বোনের সাথে ঘুরছি। এখনো খাইনি কিছু। বাড়ি গিয়ে হাত মুখে ধুঁয়ে খাব। আর আমি প্রেম করতে পারি এমন কোন মেয়েও বাড়িতে নেই। নিশ্চিন্তে ঘুমো।”
ইমদাদের কথাগুলো শুনে কলি চমকে উঠলো। কি করে বুঝলো ছেলেটা যে কলি কল করেছে? আন্দাজে বলল নাকি কলি কল করার আগে ইয়াসমিন আবার জেগে গিয়ে ইমদাদ কে কল করে সবটা বলে দিয়েছে।
এদিকে কলিকে চুপ করে থাকতে দেখে ফোনের অপর পাশে থাকা ইমদাদ ফের বলে উঠলো,
“আমার আন্দাজ তাহলে ভুল না। যে ইমদাদ কে দুচোখে সহ্য করতে পারিস না, যে ইমদাদের নাম শুনলেও কথাকলি সরদারের সারা গা জ্বলে ওঠে সে ইমদাদের অনুপস্থিতি অনুভব করছে! ব্যাপারটা কি তোর বল তো? ভালোবাসার ইচ্ছে আছে নাকি আবার?”
একটু নড়ে-চেড়ে উঠলো কলি। গম্ভীর গলায় বলার চেষ্টা করল,
“ওসব আবার কেমন কথা? ভালোবাসার ইচ্ছে থাকবে কেন? তোমাকে একটা জরুরী কথা বলার জন্য কল করেছিলাম।”
“তাই নাকি? তা কি বলবি বল?”
কলি আমতা আমতা করে বলল,
“ইয়ে মানে বলছিলাম যে আসলে ইমাদের পরীক্ষা খুব ভালো গিয়েছে আজ। ও বলছিলো এটায় সব থেকে বেশি মার্ক পাবে। তারপরে ইয়াসমিন আজ মাংস রান্না করেছিল। খুব সুন্দর হয়েছিল রান্নাটা। আর হচ্ছে আজ সন্ধ্যায় ইকবালের সাথে খেলতে আমিও বাইরে গিয়েছিলাম।”
নিজের বোকা বোকা কথাগুলো শুনে নিজেরই হাসি পেল কলির। সেই সাথে আবার রাগও হলো। নিজেই নিজের কপাল চাপড়ালো। ফোনের অপর পাশে থাকা ইমদাদ ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করে বলল,
“ব্যাস এতটুকুই? আর কিছু হয়নি? তোর বাড়ির লোকজন আসেনি? আমি তো খবর পেলাম আজ মাঝ রাতে নাকি ওরা তোকে অপহরণ করতে আসবে? শাহিন বর সেজে কাজী সাহেব নিয়ে অপেক্ষা করছে। শোন, যদি বেশি জোর করে কবুল বলার জন্য তাহলে বলে দেস। না হলে আবার গলা টিপে মে’রে ফেলতে পারে। এমনও হতে পারে আমি পৌঁছানোর আগে হয়তো তোর লা’শ’টাই গুম করে দিল।”
কলি খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“আমাকে কি তোমার এতই গাধা মনে হয় যে আমি এগুলো বিশ্বাস করব।”
“উঁহু। তোকে গাধা কেন ভাববো? তুই তো গরু।”
ইমদাদের আরো খোঁচানোর ইচ্ছে ছিল কলিকে, তবে পাশ থেকে খাদিজা বলে উঠলো,
“একটু তো ভালোভাবে কথা বলতে পারো ভাবির সাথে। কত শখ করে ভালোবেসে খোঁজ নেওয়ার জন্য কল করলো আর তুমি খোঁচাচ্ছো!”
একটা মেয়েলি কন্ঠ কলির কানে বেশ পরিস্কার ভাবেই এলো। ইমদাদ যে বলল বোনের সাথে ঘুরছে। কিন্তু ইমদাদের বোনকে তো কলি একটু আগে ঘুমোতে দেখলো। তারমানে ছেলেটা একেবারে ডাহা মিথ্যে কথা বলল।
“এই, এই মেয়েটা কে? কোন মেয়ের কণ্ঠ শুনলাম? এই মিথ্যুক, তোমার বোনকে তো বাড়িতে রেখে গেছো। আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছো। যাক গে, আমার কি। তুমি যাকে নিয়ে ইচ্ছে তাকে নিয়ে ঘোরো। কাল সকালে আমিও আমার বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বেরোবো। বুঝতে পেরেছো? ছেলে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাব।”
ফোনে কথাগুলো বলতেই ইমদাদ ধমকে উঠে বলল,
“কানের নিচে এমন একটা লাগাবো যে শুধু কানে শোনা বন্ধ হবে না, মুখও বন্ধ হবে। সেই সাথে চোখেও ঝাপসা দেখবি। বাড়ি থেকে এক পা বেরোলে ঠ্যাং ভেঙে রেখে দেবো। আর আমি আমার বোনের সাথেই আছি। খাদিজাকে চিনিস? তোর দাদার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর বড় ছেলের মেয়ে। সম্পর্কের দিক থেকে তোরও বোনই হয়। মনে আছে নাকি সেসব গিলে খেয়েছিস? বুঝিস তো শুধু নিজের স্বার্থ। অন্যের তো খোঁজ খবর রাখিস না। বেইমানের বংশধর কোথাকার।”
কলি সত্যিই খাদিজা নামটা চিনতে পারলো না। খাদিজা আসলে কে সেটা মনে করার জন্য মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করতে হলো। বেশ অনেকটা সময় পর খাদিজার আসল পরিচয়টা মনে পড়তেই বলে উঠলো,
“হ্যাঁ চিনেছি, খাদিজা আপু৷ কিন্তু খাদিজা আপুকে কোথায় পেলে? আর ওদের সাথে তোমার যোগাযোগ আছে?”
“সবাই তো তোর আর তোর গুষ্টির মতন স্বার্থপর না যে নিজের লোকদের ভুলে যাবো। যাইহোক ফোন রাখ এখন। ভালো মন মেজাজটা খারাপ করে দিলি।”
ফোনটা রাখতে ধরলে অপর পাশ থেকে কলি চেঁচালো যেন ফোনটা না রাখে। বাধ্য হয়ে ইমদাদ আবারো ফোনটা কানে ধরে বিরক্তিকর গলায় বলল,
“কি হয়েছে?”
কলি ফিসফিসিয়ে বলল,
“ফোনটা নিয়ে খাদিজা আপুর কাছ থেকে একটু দূরে যাও।”
“কেন?”
“আরে যাও না।”
ইমদাদ দূরে গেল না কিন্তু কলিকে বলল দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ইমদাদ দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে কথাটা বলতেই কলি পূর্বের মতনই ফিসফিস করে বলল,
“খাদিজা আপুর কি বিয়ে হয়ে গেছে?”
“না তো। ওর বিয়ে দিয়ে তোর কি কাজ? তুই বিয়ে করতি?”
“আরে ধুর। যেটা বলছি মনোযোগ দিয়ে শোনো। তুমি তো দেখতে শুনতে মন্দ না, বেশ ভালোই। মানে খুব বেশি সুন্দর না হলেও চলন সই। অবিবাহিত মেয়েদের থেকে দূরে দূরে থেকো। আর শোনো, মেয়েদের থেকে নিরাপদে থাকার সবথেকে ভালো একটা উপায় বলে দেই তোমায়। সবার আগে ওদেরকে জানিয়ে দেবে যে তুমি বিবাহিত। তাহলে তোমার থেকে দূরে সরে থাকবে। আর হচ্ছে…...”
কলি নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই অপর পাশ থেকে ভেসে এলো ইমদাদের কণ্ঠস্বর,
“সম্পর্কটাকে জটিল বানাচ্ছিস কেন? এমনভাবে খোঁজ নিচ্ছিস, এমন ভাবে উপদেশ দিচ্ছিস যেন তুই সত্যি আমার বউ? দুদিন পর তো চলেই যাবি। আমি যার সাথে যা ইচ্ছে করি না কেন, যেই আমাকে পছন্দ করুক বা ভালোবাসুক না কেন তাতে তোর কি? এমনিতেও তুই চলে গেলে আমাকে তো জীবনে এগোতেই হবে তাই না?”
থেমে গেল কলি। এতক্ষণে নিজের বোকামি বুঝতে পারলো। ইমদাদ তো ভুল কিছু বলে না। সত্যি তো কিছুদিন পর কলি চলে যাবে। ইমদাদ কে তো জীবনে এগোতেই হবে। পুরুষ মানুষ বসে তো আর থাকবে না। যেখানে এক বউ থাকতেই আরেকটা বিয়ে করে, সেখানে জীবনে যদি কেউ না থাকে বিয়ে করবে এটাই তো স্বাভাবিক। কলির কন্ঠটা অনেকটা ধীর হয়ে গেল। জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল,
“সিরিয়াসলি বলিনি কথাটা। এমনি মজা করছিলাম। তুমি তো সত্যি ভেবে নিয়েছো। যাইহোক ঘুম ধরছে না এজন্য ভাবলাম তোমার সাথে একটু ঝগড়া করি। ঝগড়া করলাম এবার ঘুম ধরে যাবে আশা করছি। ফোনটা রাখছি। যখন ইচ্ছে তখন বাড়ি ফিরো। কোন তাড়া নেই। তোমায় ছাড়াও বেশ ভালোই কেটেছে সারাটা দিন।”
কথাটা বলে নিজেই ফোনটা কেটে দিল কলি। ইমদাদের আর কিছু বলার ইচ্ছে হলো না, আর না কিছু ভাবার ইচ্ছে হলো । ইমদাদ একটা কথাও ভুল বলেনি। সব ঠিক বলেছে। যে একদিন ছেড়ে চলেই যাবে তার এতটা পরোয়া করা সাজেনা।