অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ১৯

🟢

রাতে খুব ভালো ঘুম না হলেও একেবারে যে খারাপ ঘুম হয়েছে তেমনটা না। শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত ছিল ইমদাদের। খুব সহজেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গিয়েছিল। তবে ঘুম ভাঙলো বেশ সকাল সকাল। উঠে দেখলো ঘড়িতে সময় তখন সকাল সাতটা বাজে।

ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখলো কলি সেখানে নেই। ইমদাদ তো ভেবেছিল সোফায় ঘুমিয়েছে বোধহয়। পরে ভাবলো নিশ্চয়ই ইয়াসমিনের সাথে ঘুমিয়েছে। তবে তারপরও একবার না দেখা অব্দি মন মানতে চাইলো না ইমদাদের।

ইয়াসমিনের ঘরের দিকে গেল। দরজায় করাঘাত করতে যাবে ঠিক তখনই ইয়াসমিন দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। সামনে ইমদাদ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মৃদু চমকে উঠে বলল,

“তুমি এত সকালে এখানে ভাইয়া? কোন দরকার ছিল?”

ইমদাদ একটু গম্ভীর থাকার ভঙ্গিতে বলল,

“না তেমন কোন দরকার ছিল না।কলি ঘুমোচ্ছে? এখনো ওঠেনি?”

ইয়াসমিন ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“সেটা আমি কি করে জানব। তুমিই জানো কলি ঘুমোচ্ছে নাকি উঠে গেছে।”

“কেন তোর ঘরে নেই ও?”

“অদ্ভুত তো! আমার ঘরে থাকতে যাবে কেন? তোমার ঘরে ঘুমিয়েছিল, উড়ে আসবে আমার ঘরে।”

কোন অজানা এক আতঙ্কে ইমদাদের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। ইয়াসমিনের কথা উপেক্ষা করে নিজে একবার ইয়াসমিন এর ঘরে উঁকি দিলো। ইমদাদের এমন আচরণে ইয়াসমিন মৃদু রাগী গলায় বলল,

“বললাম তো ঘরে নেই। তোমরা দুজনে নিশ্চয় আবার ঝামেলা করেছো তাই না? কোথায় কলি?”

“আরে আমি কি করে জানব। রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি তো ভাবলাম হয় ড্রয়িং রুমে ঘুমোবে নয়তো তোর সাথে ঘুমোবে।”

“বাহ! খুব ভালো করেছো। তোমার স্ত্রী ঘর থেকে বেরিয়ে কোথায় গিয়ে ঘুমোলো সেটুকু দেখার সময় তোমার নেই। এতই যখন অবহেলা করার ছিল, কলির জন্য যদি তোমার এতোটুকু চিন্তাও না থেকে থাকে তাহলে ওকে ওর বাড়ির লোকের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বিয়ে করে এ বাড়িতে এনেছিলে কেন বলতে পারবে আমায়?”

এখন এই মুহূর্তে ইয়াসমিন এই কথাগুলো তোলায় ভীষণ বিরক্ত হলো ইমদাদ। এখন তো ওদের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কলিকে খোঁজা তাই না? ইমদাদের কেন যেন মনে হচ্ছে যে কলি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে তো সরদার বাড়িতে আবার যাওয়ার কথা না। আর যদি সরদার বাড়িতে গিয়ে থাকে তাহলে এতক্ষণে সাঈদের কল চলে আসতো। ফোনে জবাবদিহি চাইতো ইমদাদের থেকে যে কেন ওর বোনকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।

আবার গতকাল ইমদাদ তো বলল বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা। মেয়েটাও তো তেজ দেখিয়ে বলল খুব বেশি দিন আর এখানে থাকবে না। তবে কি সত্যি চলে গেল? কিন্তু যাবে কোথায়? ওর তো যাওয়ার জায়গা নেই। ইমদাদ ছাড়া তো ওর কেউ নেই।

ইমদাদকে চুপ করে থাকতে দেখে ইয়াসমিন ফের বলে উঠলো,

“এখন এত কি ভাবছো? যাও গিয়ে ঘুমোও। ও কোথায় গেছে জানার কোন প্রয়োজন নেই তোমার।”

ইমদাদ এক হাতে মাথা চুলকে চিন্তিত গলায় বলল,

“কোথায় গেল রে ও ইয়াসমিন? আমি তো ভাবিনি তাই বলে সত্যি চলে যাবে।”

ইয়াসমিন তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“আজকাল তুমিও কেমন যেন বাকি পুরুষদের মতন আচরণ করো ভাইয়া। ওকে অসহায় দেখে, জানতে ওর যাওয়ার কোন জায়গা নেই সেজন্য বারবার বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দাও?”

ইমদাদ এবারে অসহায় দৃষ্টিতে ইয়াসমিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুই ভুল বুঝছিস আমায়। ওরই তাড়া ছিল বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার। যখনই ও বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার কথা বলতো তখনই আমার মাথা গরম হয়ে যেত। সেজন্য আমিও বেরিয়ে যেতে বলতাম। ওর কেউ নেই জন্যই তো আমি নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু ও তো বোঝেনা সেসব।”

“সেজন্যই তো ওকে সময় নিয়ে বোঝাতে হতো। তোমাকে তো বুঝতে হবে যে কোন পরিবেশে বড় হয়েছে কলি, কাদের শিক্ষায় বড় হয়েছে, কার আশেপাশে থেকেছে ও সারাজীবন। সেসব তুমি না করে তুমি নিজেও পাল্টা ওর সাথে রাগারাগি করো। কি যে করো না তোমরা আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। এখন যাও। খুঁজে দেখো পাও কিনা।”

ইমদাদের মনে হলো এখন সব থেকে জরুরি কলি কে খুঁজে বের করা। ভাবলো আগে সরদার বাড়িতে যাবে খোঁজ করতে। বলাতো যায় না হয়তো আবার হঠাৎ করে মনে হয়েছে যে ইমদাদের থেকে ওর দাদুই ভালো। সেই জন্য গিয়ে দাদুর কোলের ভেতরে বসে আছে।

দরজা খুলতে ধরে ইমদাদ দেখলো দরজা আগে থেকেই খোলা। এত সকালে তো দরজাটা খোলা থাকার কথা না। তার মানে সত্যি কলি বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে। এবারে আর কোন সন্দেহ রইল না। ইমদাদ গলা উঁচিয়ে ইয়াসমিন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কলি সত্যি চলে গেছে ইয়াসমিন। দরজাটা খোলা।”

ইয়াসমিন দৌড়ে সেখানে এসে বলল,

“তাহলে আর দেরি করো না। কখন বেরিয়ে গেছে সেটাও তো জানিনা। যদি মাঝরাতে আবার বেরিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে তো কোন বিপদও হতে পারে। তাড়াতাড়ি যাও। আর সম্ভব হলে কলির ভাই কেও জানিয়ো।”

ইমদাদ মাথা নাড়িয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। কিছুদূর যেতেই খলিলের সঙ্গে দেখা হলো। ইমদাদ কে দেখতেই খলিল ওকে থামিয়ে বলল,

“কোথায় যাচ্ছ ইমদাদ?”

ইমদাদ অস্থির গলায় বলল,

“কলিকে খুঁজতে যাচ্ছি মামা। রাতে রাগারাগি করে বলেছিলাম বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে। মেয়েটার এতই তেজ সত্যি বেরিয়ে গেছে।”

“সে কি! তার মানে সকালে যখন আমার সাথে দেখা হয়েছিল বাড়ি ছেড়েই চলে যাচ্ছিল। আমি তো জানতাম না। জানলে তো আটকাতাম।”

“দেখা হয়েছিল ওর তোমার সাথে?”

“এইতো ঘন্টা খানেক আগে দেখা হয়েছিল। দেখলাম এদিক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কোথায় যাচ্ছে, কোন উত্তর দিলোনা। আমি ভাবলাম হয়তো সকালের হাওয়া খেতে বেরিয়েছে।”

“এক ঘণ্টা আগে দেখেছো তার মানে বেশি দূর যেতে পারেনি। টাকা পয়সাও তো কিছুই নেই। পায়ে হেঁটে কতদূর যেতে পারে আমিও দেখব। আর একবার কাছে পেলে ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো।”

খলিলের দেখিয়ে দেওয়া রাস্তার দিকেই ইমদাদ ছুটে গেল। এইদিকেই সরদার বাড়ি পড়ে। ইমদাদের এখন মনে হচ্ছে কলি এখানেই গেছে। সত্যি যদি আজ ইমদাদ কলি কে সরদার বাড়িতে গিয়ে পেয়েছে, আগে দু'চারটে চ'ড় লাগবে। তারপর ওখানেই ফেলে রেখে আসবে। সঙ্গে করে কখনো নিয়ে আসবে না। ইমদাদ রাগের মাথায় নাহয় বলেছিল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। তাই বলে ওই মেয়ে কি এতটাই গাধা, এখনো কি এতটাই ছোট যে এতোটুকু বোঝার ক্ষমতা নেই কে ওর ভালো চায়। স্বামী স্ত্রীর মাঝে তো সামান্য মনোমালিন্য হতেই পারে। তাই বলে এভাবে রাগ করে বাপের বাড়ি চলে যাবে।

সরদার বাড়ির সামনে যেতেই দরজার বাইরে ইমদাদ কামাল সরদারের দেখা পেল। ইমদাদ ছুটে এসে ওনার সামনে গিয়ে থামল। হাপাচ্ছে এখনো। সঙ্গে সঙ্গে কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারল না।

এদিকে ইমদাদর মুখটা দেখে মুহুর্তের মাঝে কামাল সরদারের দু চোখ রাগে লাল হয়ে উঠলো। হুংকার ছেড়ে বলে উঠলেন,

“তোমার সাহস কি করে হলো আমার বাড়ির সামনে আসার? আরো কি চাইতে এসেছো? বাড়ির মেয়েকে তো দিয়েই দিয়েছি। মিথ্যে ভালোবাসার নাটক দেখিয়ে আমাদের বাড়ির মেয়েকে তো আটকে রেখেছো সম্পত্তির লোভে। এখন কি সেই সম্পত্তি হাতাতে এসেছো? তবে একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ, কিচ্ছু পাবে না তুমি। আর এক্ষুনি চলে যাও এখান থেকে। তোমার আর ওই মেয়ের পা যেন আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় না পড়ে।”

ইমদাদ কে আগবাড়িয়ে একবার জিজ্ঞেসও করতে হলো না যে কলি এখানে এসেছে কিনা। উনি নিজ থেকেই ইমদাদের মনের সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেন। ইমদাদ বুঝলো এ বাড়িতে কলি আসেনি। তারমানে এখন অন্যদিকে খুঁজতে যেতে হবে। কামাল সরদার কে কিছু না বলেই আবার যে পথে এসেছিল সে পথে দৌড় লাগালো।

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন কামাল সরদার। ছেলেটা এসেছিল কেন, আবার কোন কিছু না বলে চলেই বা গেলে কেন। এমনও তো কখনোই হতে পারে না যে ওনার কথা শুনে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে। তাহলে হলোটা কি? পুরো বিষয়টা ওনার মাথার উপর দিয়ে গেল।

ইমদাদ তখনও আশেপাশে খুঁজতে ব্যস্ত কলিকে। ফোনে একটা ছবিও নেই কলির যে কাউকে দেখিয়ে বলবে যে মেয়েটাকে কোন দিকে যেতে দেখেছে কিনা। খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ করে ইমদাদের ফোনে কল এলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলো খলিলের নাম্বার থেকে কল এসেছে। ইমদাদ তৎক্ষনাত ফোনটা রিসিভ করতেই অপর পাশে খলিল বলে উঠলো,

বিজ্ঞাপন

“ইমদাদ!”

“বলো মামা। পেয়েছো নাকি ওকে?”

“না, আমি পাইনি। কিন্তু তোমার মামি বলল কলিকে নাকি আবার বাড়িতে যেতে দেখেছিল। আমার মনে হয় বাড়িতেই আছে। তুমি একবার গিয়ে বাড়িতে খোঁজ নাও।”

ইমদাদ আর কোন উত্তরও দিল না। ফোনটা কেটে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আবার বাড়ির দিকে দৌড় লাগালো। খুব বেশি দূরে ছিল না বাড়ির থেকে। পাঁচ মিনিটের মতন লাগলো। দরজা খোলাই ছিল। ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে গলা উঁচিয়ে ইয়াসমিনকে ডাকলো,

“ইয়াসমিন, কলি এসেছে?”

ভেতর থেকে ইয়াসমিন ছুটে এসে বলল,

“না তো ভাইয়া।”

ইমদাদের চিন্তা আরো বাড়লো। গেল কোথায় মেয়েটা। খলিল বলল তো বাড়ির দিকে আসতে দেখেছে। তাহলে উধাও তো আর হয়ে যেতে পারে না একটা মেয়ে।

এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ করে ইমদাদের চোখ গেল সিঁড়ির দিকে। ওদের বাড়িতে যে ছাদও আছে সে কথা তো ভুলেই গিয়েছিলো ইমদাদ। এমনও তো হতে পারে যে মেয়েটা ছাদে আছে।

আগেপিছে আর কোন কিছু না ভেবে সিঁড়ি বেয়ে সোজা ছাদে গেল। আশেপাশে খুঁজতেই দেখলো ছাদের এক কোনার দিকে একটা ছোট কাপড় বিছিয়ে তার ওপরে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে কলি।

কলির মুখটা দেখতেই ইমদাদের এতটাই স্বস্তি অনুভূত হলো যেন মনে হচ্ছে নিজের জীবনটাই আবার ফিরে পেল। ধীর পায়ে কলির দিকে এগিয়ে গিয়ে দুই হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল কলির পাশে। তৎক্ষণাত কলির ঘুমটা ভেঙে গেল। পাশ ফিরে ঘুরে ইমদাদ কে দেখতেই তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। কলি কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইমদাদ দুহাতে জড়িয়ে ধরল কলিকে।

কেঁপে উঠল কলি। অনুভব করলো আজ আবারো হঠাৎ করে কলির হৃদ স্পন্দনের গতি বেড়ে গেছে। নিশ্বাসটাও কয়েক সেকেন্ডের জন্য আটকে গেছিল। বাধ্য হলো আবার নিঃশ্বাসের গতি স্বাভাবিক করতে। তবে হৃদ স্পন্দনের গতি আর স্বাভাবিক হচ্ছে না।

বুঝতে পারছে না কলি ইমদাদের কি হলো। হঠাৎ করে জড়িয়েই বা ধরল কেন।

এদিকে কলি যে কিছু জিজ্ঞেস করবে সেটাও পারছে না। মুখ দিয়ে তো শব্দ বের হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কথা বলাই ভুলে গেছে।

কিছুক্ষণ পর ইমদাদ নিজ থেকেই বলে উঠলো,

“কয়েক মুহূর্ত যখন তোকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না মনে হচ্ছিলো আমার গোটা পৃথিবী ওলট পালট হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল তুই নেই তো আমার আর কেউ নেই।”

কলি সত্যি বুঝতে পারলো না ইমদাদ জ্ঞানে আছে নাকি ঘুমের ঘোরে আবার ছাদে উঠে এসেছে। আদৌ কি ইমদাদ বুঝতে পারছে যে কলিকে জড়িয়ে ধরে আছে। নাকি আবার অন্য কাউকে কল্পনা করছে। না হলে কলি কে তো এই কথাগুলো বলার কথা না। কলিকে ছাড়া গোটা পৃথিবী ওলট পালট হবে কেন? অদ্ভুত!

“ইমদাদ ভাই আমি কলি। কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ নাকি? কি আজেবাজে কথা বলছো?”

কলি ইচ্ছে করেই ইমদাদ কে মনে করিয়ে দিতে চাইল যে ইমদাদ কাকে জড়িয়ে ধরে আছে। কলি ভেবেছিল ওর পরিচয়টা জানার পর অবশ্যই ওকে ছেড়ে দেবে। তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং ইমদাদ ওকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,

“ভুল হয়ে গেছে। আর কখনো তোকে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার কথা বলবো না। যখন তুই নিজে থেকে বলিস চলে যাবি তখন খুব রাগ হয়। সেজন্য মনে হয় কেন প্রয়োজনের সময় টুকু শুধু আমায় ব্যবহার করবি? রাখবই না তোকে। তবে আজ থেকে তুই যাই বলিস না কেন আর কখনো তোকে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার কথা বলবো না। আমায় ব্যবহার করবি তো ঠিক আছে, কর। সারা জীবন সবার প্রয়োজন মিটিয়েছে ইমদাদ, তোর আবার কেন মেটাবে না। প্রয়োজন শেষে ছুঁড়ে ফেলবি তো ঠিক আছে। তাও মেনে নিলাম। চলে যাবি তো তাও মেনে নিলাম। তবে কখনো না বলে যাস না।”

কলি এবারে কিঞ্চিত বিরক্তিকর গলাতে বলল,

“কি আজেবাজে কথা বলছো? দেখি আগে আমায় ছাড়ো তো। হয়েছেটা কি তোমার?রাতে তো অতগুলো ঘুমের ওষুধ খেতেও দেইনি। তাহলে নাহয় বুঝতাম মাথার তার কেটে গেছে।”

কলি সত্যি ইমদাদকে নিজের থেকে ছাড়ালো। তবে অদ্ভুত বিষয় হলো কলি ইমদাদের চোখদুটো ভেজা দেখলো। কাঁদছিল তার মানে ইমদাদ। কিন্তু কেন? কান্নার মত কোন কিছু তো হয়নি।

“এই ইমদাদ ভাই, কাঁদছো কেন?”

“আমি ভেবেছিলাম তুই কোথাও চলে গিয়েছিস। তোর চলে যাওয়ার কথাটা মনে হতেই কেমন কেমন যেন লাগছিল।”

“কেমন কেমন লাগছিল মানে?”

“মানে খালি খালি লাগছিল।”

“খালি খালি লাগার কি আছে? আমি তো কেউ না তোমার।”

“জানি তুই আমার কেউ না। তবে তাও তুই কেউ একটা। খালি খালি লাগার কথা না, তারপরও লেগেছে। কোথায় গিয়েছিলি সকালে? বাপের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল নাকি?”

কলি মাথা নিচু করে মিনমিনে গলায় বলল,

“সত্যি বলতে ইচ্ছে তাই ছিল। রাতে তোমার ব্যবহারে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, রাগও হয়েছিল। মনে হয়েছিলো সাহায্য করছো ঠিক আছে তাই বলে এভাবে গরম দেখাতে পারো না। সকালে সেজন্য বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম। তবে অর্ধেক রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফেরত এসেছি।”

“ফেরত এসেছিস কেন? চলে গেলেই পারতি। তোর দাদু খুব আদর করতো। শাহিন তো মনে হয় এখনো পাঞ্জাবি পরে, এক হাতে মালা নিয়ে বসে আছে।”

“সেজন্যই তো যাইনি। পরে মনে হলো তুমি যেমনই হও, ওদের থেকে ভালো আছো। অন্তত লুকিয়ে কিছু করো না।”

কলির আড়ালে ইমদাদ একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল। যাক মেয়েটা অন্তত বুঝেছে সরদার বাড়ির লোকজনের থেকে ইমদাদ ভালো। এতোটুকু বিশ্বাস যে ইমদাদের উপর আছে এটাই যথেষ্ট। ইমদাদ উঠে দাঁড়ালো। তাড়া দিয়ে বলল,

“নিচে চল। যথেষ্ট ঢং হয়েছে।”

কথাটা বলে ইমদাদ চলে যেতে ধরলে কলি ওর হাত টেনে ধরল। হাতে টান অনুভব করতেই ইমদাদ থামল। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে বলল,

“আবার নতুন করে কি ঢং করার ইচ্ছে হয়েছে?”

কলি তখনও বসে ছিল। এবার উঠে দাঁড়িয়ে ইমদাদের দিকে একটু এগিয়ে এসে বলল,

“আমায় না দেখে অমন অস্থির হয়ে গিয়েছিলে কেন? কাঁদছিলে কেন? উদ্দেশ্য কি তোমার? ভালো-টালো বাসলে নাকি আবার?”

কলির প্রশ্নটা শুনে ইমদাদ একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। আমতা আমতা করলো। ঠিকঠাক কোন উত্তর দিতে পারল না। ইমদাদের এমন বেহাল দশা দেখে কলি নিজেই হেসে উঠে বলল,

“আরে ধুর! ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো মজা করছিলাম। আমি তো জানি আমাদের মাঝে ভালোবাসা তৈরি হওয়া সম্ভব না। তুমি আর আমি হলাম দুজনে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। একেবারে জাত শত্রু। আমাদের মাঝে কি ভালোবাসা হওয়া সম্ভব নাকি!”

মুহূর্তের মাঝে ইমদাদের অভিব্যক্তি বদলালো। মেয়েটা বারবার একই ভুল করে। ঠিক যেই মুহূর্তটা ইমদাদ অনুভব করতে চায় যে ও কলিকে বোধহয় ভালোবেসে ফেলেছে সেই মুহূর্তে সব অনুভূতি নষ্ট করে দেয়।

কলির থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ইমদাদ চোখে মুখে কাঠিন্যতা ফুটিয়ে তুলে বলল,

“একদম ঠিক বলেছিস। যে অনুভূতির মূল্য দিতে জানে না তাকে ভালোবাসা যায়ও না।”

কথাটা বলে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ালো না ইমদাদ। চলে গেল।

কলি ভাবতে চাইল ইমদাদের বলা কথাগুলো নিয়ে, তবে আবার ভাবতে চাইলোও না। মনে হলো এই কথাগুলো নিয়ে যত ভাববে তত জটিলতার মাঝে পড়বে। কি দরকার এত জটিলতা তৈরি করার! যথেষ্ট জটিলতা এমনিতেই জীবনে আছে।

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প