অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ১৪

🟢

জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করতেই ইমদাদের ঘুম ভেঙে গেল। পিটপিট করে চোখ খুলে পাশে তাকাতেই দেখলো কলি হাত পা মেলে ঘুমোচ্ছে। একটুর জন্য কলির হাতটা ইমদাদের গায়ের উপর এসে পড়েনি। ইমদাদ লাভ দিয়ে উঠে বসলো। হঠাৎ করে কেমন যেন অস্বস্তি হলো। মনে হলো কে জানে ঘুমের মাঝে আবার ভুলে কখনো কলির গায়ের সাথে স্পর্শ লেগেছিল কিনা।

উঠে ওয়াশরুমে গেল ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখল কলি এখনো বিছানায় হাত পা মেলে ঘুমোচ্ছে। ইমদাদের কেন যেন সহ্য হলো না। মনে হলো ইমদাদের ঘুম যখন ভেঙেছে তখন কলিও শান্তিতে ঘুমোতে পারে না।

ইচ্ছে করে শব্দ করতে লাগলো ইমদাদ। কখনো চেয়ার সরাচ্ছে, তো কখনো আলমারি খুলছে। আবার কখনো জিনিসপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় শব্দ করে রাখছে।

একপর্যায়ে গিয়ে কলির ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে বিরক্তিকর গলায় ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমার মনের মাঝে এমন মেয়েদের মত শ’য়’তা’নি কেন? কি ভেবেছো আমি বুঝবো না যে তুমি ইচ্ছে করে শব্দ করছো যেন আমি ঘুমোতে না পারি।”

ইমদাদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“যাক তাহলে স্বীকার করলি যে মেয়েদের মনে শ’য়’তা’নি থাকে।”

“তোমার মতন ছেলেদের মনেও শ’য়’তা’নি থাকে। তোমার মন শ’য়’তা’নি দিয়ে ভরা। তুমি একটা আস্ত শ’য়’তা’ন।”

“তোর থেকে শিখেছি। তুই শুধু একা শ’য়'তা’ন না। তোর বাপ, দাদা, মা, ভাই, চাচা, চাচি সবাই শ’য়’তা’ন। তোর পুরো গুষ্টিই শ’য়’তা’ন। তোর নাম কথাকলি সরদার না হয়ে কথাকলি শ’য়’তা’ন হওয়া উচিত ছিল।”

কলি বুঝলো ঝামেলা এখন তুমুল পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। আর শুয়ে থেকে ঝগড়া করা যাবে না। উঠে ইমদাদের দিকে তেড়ে গেল কিছু বলার জন্য। শাসানোর চেষ্টাও করলো, তবে ইমদাদ ওকে খুব বেশিক্ষণ সময় দিলোনা। কলি ওর কাছাকাছি যেতেই ইমদাদ কলির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুহাতে কলির কোমর ধরে উঁচু করে ড্রেসিং টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল।

মুহূর্তের মাঝে কলি জমে গেল। ইমদাদকে শাসানোর জন্য যে আঙ্গুলটা তুলেছিল সেটা আপনা আপনি নেমে গেল। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোনো বন্ধ হয়ে গেল। চোখ দুটো মার্বেলের আকার ধারণ করল।

সবে মাত্র ঘুম থেকে ওঠার ফলে কলির চুল গুলো একেবারে এলোমেলো হয়ে আছে। দুচোখে এখনো ঘুমের লেস বিদ্যমান। যদিও এখন সেটা একটু কমই বোঝা যাচ্ছে। কলির এলোমেলো চুলগুলো ইমদাদ হাতের সাহায্যে একটু গুছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো। সামনের চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে কলির দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,

“তুই আমার থেকে বয়সে ছোট, উচ্চতায় ছোট, বুদ্ধির দিক থেকেও ছোট। তাই কথাবার্তা ভেবে চিন্তে বলবি আমার সাথে। হুট করে যদি আমার রাগ উঠে যায়, আর ফট করে যদি তোর গালে একটা চ'ড় লাগাই, তাহলে ধপ করে পরে গিয়ে তোর থোবড়াটাই বিগড়ে যেতে পারে।”

এত বড় একটা কথা বলে দিল ইমদাদ কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে কলি একটা টু শব্দ অব্দি করল না। ইমদাদের খুব হাসি পেল। কিন্তু তবুও কষ্ট করে নিজের হাসিটা নিয়ন্ত্রণ করলো। এই চুপচাপ শান্ত শিষ্ট কলি কে ইমদাদের বেশ ভালো লাগলো। কি সুন্দর দৃষ্টিতে একটু ভয় দেখা যাচ্ছে ইমদাদের জন্য। এমন কলিকেই তো দরকার ইমদাদের।

ইমদাদ কলির ঘাবড়ানোর আরেকটু সুযোগ নিতে চাইলো। আরেকটু ঝুঁকে গেল কলির দিকে। কলি চমকে পিছিয়ে গেল একটু, তবে খুব বেশি পেছাতে পারলো না। পিছনে আয়নার সাথে মাথাটা ধাক্কা খেলো। কলি ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো। ইমদাদ কলির সেই ব্যথা পাওয়া জায়গায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“অযথা কেন আমার থেকে দূরত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করিস? দিনশেষে তোকে আমার কাছেই ফিরতে হবে। আমি ছাড়া তোর আর কেউ নেই কলি।”

এবারে কলি মুখ খুলল। চোখে মুখে কাঠিন্যতা ফুটিয়ে তুলে বলল,

“তোমার থেকে দূরত্ব বাড়ানোর চেষ্টা আমি আজীবন করবো।”

“অযথা কষ্ট করে দূরত্ব বাড়ানোর কি দরকার? আমরা তো দূরেরই।”

কথাটা বলে ইমদাদ চলে গেল সেখান থেকে। এক মুহূর্তের জন্য কলির কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করলো মনের মাঝে। ইমদাদের মুখ থেকে কথাটা শুনতে খুব খারাপ লাগলো। অথচ একটু আগে তো কলি নিজেই বলল দূরত্ব বাড়াতে চায়। তাহলে ইমদাদ তো ভুল কিছু বলেনি। ওরা তো দূরেরই।

_______

বিকালের দিকে ইমদাদের বাড়িতে সাঈদ আর মাইশা এলো। দুজনের একসাথে আসার কোন ইচ্ছে ছিল না। আলাদা আলাদা ভাবেই আসছিল। তবে আসার সময়টা এক হওয়ার কারণে রাস্তার মাঝে দেখা হয়ে গিয়েছে তাই একসঙ্গে এসেছে।

কলিংবেলের আওয়াজ পেয়ে ইয়াসমিন গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। এমন অসময়ে সাঈদের সাথে মাইশা কে দেখে একটু চমকালো। মনের মাঝে একটু কৌতূহল তৈরি হলো জানার জন্য যে কেন ওরা একসাথে এসেছে। তবে প্রশ্নটা আর জিজ্ঞেস করা হলো না সাঈদ কে। কেননা ইয়াসমিনের মনে হলো এটা ওর এখতিয়ারের বাইরে।

ইয়াসমিন চুপচাপ দরজার সামনে থেকে সরে গেল ওদেরকে ভিতরে আসার জন্য রাস্তা ছেড়ে দিয়ে।

অন্যান্য দিন ইমদাদের বাড়িতে এলে মাইশার মুখ দিয়ে খই ফোটে, তবে আজ ওকে ভীষণ শান্ত আর চুপচাপ দেখালো। দেখে মনে হচ্ছে মন মেজাজ একটুও ভালো নেই। কোন একটা কারণে বিষন্নতায় ডুবে আছে যেন।মাইশার এই শান্ত ভাবটা ইয়াসমিনের ঠিক হজম হলো না। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে রে তোর মাইশা? এত চুপচাপ দেখাচ্ছে কেন আজ? ইমদাদ ভাই বাড়িতে নেই, ভয় পাস না। চেঁচামেচি করলে বকার মতন কেউ নেই।”

মাইশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আফসোস, যদি সারাজীবন ইমদাদ ভাইয়ের কাছে বকা খেতে পারতাম। এখন আর ইমদাদ ভাই বাড়িতে থাকলেই বা কি আর না থাকলেই বা কি। পর তো হয়েই গেছে।”

মাইশার কথার কিছুই বুঝতে পারলো না ইয়াসমিন। আর কিছু জিজ্ঞাসা করারও ইচ্ছে হলো না। সোজা ইমদাদের ঘরের দিকটা দেখিয়ে দিয়ে বলল,

“ওদিকে যা। ইমদাদ ভাইয়ের ঘরে কলি আছে।”

মাইশার বুক চিরে আবারো একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ধীর পায়ে হেঁটে ইয়াসমিনের দেখিয়ে দেওয়া ইমদাদের ঘরের দিকে চলে গেল।

ইয়াসমিন কিছুই বুঝতে পারলো না যে মাইশার কি হয়েছে। চুপচাপ নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য উদ্দ্যত হলো। আর ঠিক তখনই কানে ভেসে এলো সাঈদের কণ্ঠস্বর।

“ইয়াসমিন!”

ইয়াসমিন তো ভুলেই গিয়েছিলো যে মাইশার সাথে সাঈদও এসেছিল। তখন থেকে ওদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সেটা তো ভুলেই গিয়েছিলো। নয়তো কি আর মাইশার সাথে এত স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারতো ইয়াসমিন! কে জানে আবার সাঈদ হয়ত ভাবলো ইয়াসমিন ওকে এড়িয়ে যাচ্ছিলো। আর ইয়াসমিন জানে যদি ও এমনটা করে তাহলে সাঈদ আবার রাগারাগি করবে।

তবে আজ সাঈদের ডাকটা অন্যরকম শোনালো ইয়াসমিনের কাছে। এই প্রথম ইয়াসমিনের মনে হলো সাঈদ ওকে ভালোবেসে ডাকল। সাঈদের কন্ঠের মাঝে নম্রতা খুঁজে পেলো৷ সেই নম্রতার ছোঁয়ায় ইয়াসমিনের হৃদয়টাও যেন একটু নরম হতে চাইলো। তবে কি ভেবে যেন আবার হতে পারলো না।

এদিকে ইয়াসমিন থেমে যাওয়া সত্ত্বেও ওর থেকে কোন উত্তর না পাওয়ায় সাঈদ আশাহত হলো। ভাবলো বোধহয় রেগে আছে, সেই জন্য ঘুরে তাকিয়ে কথা বলছে না।

সাঈদ নিজেই ইয়াসমিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হঠাৎ করে সাঈদ কে নিজের সামনে দেখতেই ইয়াসমিন মৃদু কেঁপে উঠলো। ইয়াসমিনকে কেঁপে উঠতে দেখে সাঈদ যেন একটু আন্দাজ করতে পারলো যে ও আসলে রেগে নেই, কোন ভাবনার মাঝে ডুবে ছিল।

ইয়াসমিন একবার সাঈদের মুখের দিকে তাকালো। আবার সাথে সাথে নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল। কে জানে মেঝেতে কি সৌন্দর্য খুঁজে পেল যে চোখ দুটো মেঝের উপর থেকে এক মুহূর্তের জন্য সরালো না।

“আজ তো ভালোবেসে ডাকলাম, তবুও উত্তর দিলি না যে?”

ইয়াসমিন কি উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারল না, তাই চুপ থাকলো। ওর নীরবতার মাঝে সাঈদ ফের বলে উঠলো,

“সেদিন তোর অভিযোগগুলো শোনার পর আর তোর সামনে কেন আসিনি জানিস? নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করছিলাম। কখনো বুঝতে পারিনি আমি যে আমায় নিয়ে তোর এত অভিযোগ।”

“কিসের অভিযোগ? যে সম্পর্কের কোন নাম নেই, যে সম্পর্কে কোন অনুভূতি নেই, যে সম্পর্কের কোন পরিণতি নেই সেখানে অভিযোগ অর্থহীন।”

“আমাদের সম্পর্কের একটা নাম হবে, এই সম্পর্কে ভরপুর অনুভূতি আছে, এই সম্পর্কের একটা সুন্দর পরিণতি হবে। তাই তুই চাইলেই অভিযোগ করতে পারিস।”

বিজ্ঞাপন

ইয়াসমিন আলতো হেসে বলল,

“কোন অভিযোগ করতে চাই না আমি। আমি আমার মনে কারো জন্য কোন অভিযোগ, অভিমান, রাগ, ক্ষোভ কিচ্ছু পুষে রাখি না। আমার বাবা আমাকে ক্ষমা করতে শিখিয়েছে। আমার বাবা আমাকে শিখিয়েছে যারা আমাদের সাথে অন্যায় করে পাল্টা তাদের সাথে অন্যায় করতে নেই। তবে তো আর এই সমাজে মানুষই থাকবে না।”

সাঈদের অভিব্যক্তিটি এবার একটু বদলালো। ইয়াসমিনের একটা হাত নিজের দু হাতের মুঠোয় নিয়ে কাতর গলায় বলল,

“অন্যের অপরাধের শাস্তি আমায় কেন দিচ্ছিস? একবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখ, এখানে ভালোবাসা আছে তোর জন্য। আমার এই প্রশস্ত বুক তোর জন্য নিরাপদ আশ্রয়।”

ইয়াসমিন তাড়াহুড়ো করে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

“আমার এসব কিছুর দরকার নেই। আমার ভাইয়া আমার জন্য যা ঠিক করবে আমি সেটাই হাসিমুখে মেনে নেব। তুমি দয়া করে আমায় বিরক্ত করা ছেড়ে দাও। আমার ভাইয়া এমনিতে যথেষ্ট অশান্তি থাকে, তাই তোমার কথা আলাদা করে বলে আমি আমার ভাইয়াকে আরো অশান্তিতে ফেলতে চাইনা।”

ইমদাদের প্রসঙ্গ উঠতেই সাঈদের মাথাটা গরম হয়ে গেল। ইয়াসমিন শুধু ইমদাদের কথাই ভাবছে। কিন্তু কেন? সাঈদ কি কেউ না? একটু কি সাঈদের কথা ভাবা যায় না? রাগে কটমটিয়ে বলল,

“তোর ভাইয়ার থেকে অনেক বেশি অশান্তিতে আমি আছি। ওকে তো মানসিক শান্তি হিসেবে আমার বোনটাকে দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ও তো নিজের বোনকে আমায় দিচ্ছে না।”

ইয়াসমিন কিছু বলতে চাইলো সাঈদ কে তবে তার আগেই কারো পায়ের শব্দ পেয়ে দরজার দিকে তাকালো। দেখলো ইমদাদ দাঁড়িয়ে আছে। হাতে বাজারের ব্যাগ। ইয়াসমিন সাঈদের থেকে দূরে সরে দাঁড়ালো। ইমদাদ ঘটনাটা দেখেও না দেখার ভান করলো। জুতো খুলে ভেতরে প্রবেশ করে সাঈদের দিকে তাকিয়ে হাস্যোজ্জ্বল গলায় বলল,

“আরে আমার সম্বন্ধি যে। কাল এলি না কেন? আজ তো বিয়ের খাবার সব শেষ। এখন কি হাওয়া খাবি?”

“খেতে আসিনি আমি এখানে। দেখতে এসেছি আমার বোন কেমন আছে।”

ওদের কথাবার্তার মাঝে কলিও সেখানে চলে এলো। সাথে মাইশাও এসেছে। ইমদাদ কে দেখতেই মাইশার বুক চিরে আবারো একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। কলি সাঈদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

“ভাইয়া, বাড়ি থেকে জামা কাপড় গুলো এনে দিও প্লিজ। আরো কিছু দরকারি জিনিসপত্র লাগবে। মা কে বলো, মা গুছিয়ে দেবে। তুমি একটু নিয়ে এসো। আমার এখানে খুব সমস্যা হচ্ছে।”

সাঈদ যেই না মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতে চাইলো অমনি ওদের কানে ভেসে এলো ইমদাদের গম্ভীর কণ্ঠস্বর।

“একদম না। ভুলেও যেন ওই বাড়ির কোন কিছু আমার বাড়িতে প্রবেশ না করে।”

কলি ইমদাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু রাগী গলায় বলল,

“তাহলে আমার দরকারি জিনিসগুলো আমি কোত্থেকে পাবো?”

ইমদাদ বাজারের ব্যাগ গুলো ততক্ষণে রান্না ঘরে গিয়ে রেখে এসেছে। বেসিন থেকে হাত মুখটা ধুঁয়ে কলির দিকে এগিয়ে এলো। কলি ভেবেছিলো বোধহয় ওর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসছে। কিংবা ভয় দেখাতে চাইছে। তবে কলি কে অবাক করে দিয়ে ইমদাদ ওর ওড়নায় নিজের ভেজা মুখটা মুছে নিল। কলি তিরিং বিরিং করে উঠে বলল,

“আমার ওড়নায় মুখ মুছছো কেননন? বাড়িতে কি গামছা-তোয়ালের অভাব পড়ে গেছে?”

ইমদাদ কলির দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে হালকা হাসি ঝুলিয়ে বলল,

“বউয়ের ওড়নায় মুখ মোছার তৃপ্তিই আলাদা।”

রাগে কলির সারা শরীর দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো, তবে কিছু বলতে পারলো না তাও।

কলি কে পাত্তা না দিয়ে ইমদাদ সাঈদ কে বলল,

“যেটা বললাম মনে থাকে যেন। ও বাড়ি থেকে যেন কিছু না আসে। আর কলি, তোর কি এমন দরকারি জিনিস আছে? পড়াশোনাও তো করিস না যে বই পত্র আনতে বলবি।”

“জামা কাপড় তো লাগবে আমার। নাহলে নতুন কিনে দাও।”

ইমদাদ সরাসরি কলির কথায় আপত্তি জানিয়ে বলল,

“একদমই না। জামা কাপড় কেন কিনতে হবে? জামা ছাড়া আছিস কি? ইয়াসমিন দেয়নি তোকে জামা পরতে?”

ইয়াসমিন মিনমিনে স্বরে ইমদাদকে বলে উঠলো,

“কিন্তু ভাইয়া আমার জামাগুলোতো সব পুরনো। ব্যবহার করেছি ওগুলো। সেগুলোই কলিকে দিতে হচ্ছে।”

ইমদাদ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“তো? ওর বিয়ে কোন বড়লোক বাপের ছেলের সাথে হয়নি। ওর বিয়ে হয়েছে একটা নিম্নবিত্ত পরিবারের খেটে খাওয়া ছেলের সাথে। ওকে ওর স্বামীর সামর্থ্য বুঝে চলতে হবে। এমনটা তো না যে জামা কাপড়ের অভাবে একেবারে অচল হয়ে পড়েছে। আর কলি তোকেও বলছি, ইয়াসমিনের জামায় তো তোকে বেশ মানিয়েছে। আপাতত এগুলো দিয়ে চল। যখন তোর স্বামীর সামর্থ্য হবে তখন তোকে নতুন কিনে দেবে। আর তখনই নতুন পরবি।”

কলি বুঝলো এই ছেলের সাথে পেরে ওঠা সম্ভব না। পাশে যেহেতু সাঈদ দাঁড়িয়ে আছে তাই একটু সাহস পেল। সাঈদ কে অভিযোগ করে বলল,

“ভাইয়া তুমি কিছু বলবে না? তোমার সামনে তোমার বোনের সাথে এই অসভ্য ছেলেটা কি বাজে ব্যবহার করেছে দেখেছো?”

সাঈদ ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে কলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“তোর ওপর এখন আমার থেকে ইমদাদের অধিকার বেশি। ইমদাদের কথা তোকে শুনতে হবে কলি। তোদের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে আমি যখন তখন কথা বলার অধিকার রাখি না। এটা অনধিকার চর্চা হবে আমার জন্য।”

“তাই বলে ভাইয়া তুমি কিছুই বলবে না ওকে?”

“নিশ্চয়ই বলবো। ওর অন্যায় দেখলে একশো বার বলবো। তবে তোকে একটা কথা বলি কলি, কোন কিছু চাওয়ার আগে কোন কিছু দিতে হয়। কোন সম্পর্কে তুই স্বাধীনতা তখনই পাবি যখন বিপরীত পাশের মানুষটাকে তুই স্বাধীন থাকতে দিবি। তুই ভালোবাসা তখনই পাবি যখন বিপরীত পাশের মানুষটাকে তুই নিজে ভালোবাসবি। তার বিশ্বাস তুই তখনই অর্জন করতে পারবি যখন সে তোকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে পারবে। আর সে তোর কথা তখনই শুনবে যখন তুই তার কথা শুনবি। একটা সময় গিয়ে দেখবি তুই এক বিন্দু জল চাইলে সে তোকে গোটা একটা সাগর দিয়ে দেবে। তুই একটা ফুলের পাপড়ি চাইলে সে তোকে গোটা একটা বাগান বানিয়ে দেবে। তুই তার পাশে অদৃশ্য ছায়ার মতন থাকতে চাইলে সে তখন নিজের সবকিছুতে জড়িয়ে রাখবে তোকে। আর ছোট খাট কথা যেগুলো মজার ছলে বলা হয় সেগুলো বুঝতে শেখ। আর বোঝার পর সেগুলো তুইও মজার ছলেই নেওয়ার চেষ্টা কর।”

কলি হা করে সাঈদের বলা কথাগুলো শুনলো। খুব কঠিন লাগলো সাঈদের বলা কথাগুলো কলির কাছে। মনে হলো এত কঠিন বাক্য এর আগে কখনো শোনেনি। অর্থ বুঝেছে কিনা কে জানে। তবে বোঝার চেষ্টা করছে।

কলির ভাবনার মাঝেই ইমদাদ ওর মাথায় বেশ জোরেশোরে একটা গাট্টা মেরে সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এই কথাগুলো বোঝার জন্য মাথার মাঝে মগজ নামক একটা বস্তু থাকতে হয়, যেটা তোর বোনের নেই। অযথা নিজের সময় নষ্ট করছিস।”

কলি ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে রাগী দৃষ্টিতে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ঠিক করলো এই ছেলেকে বুঝিয়েই ছাড়বে যে কলির মাথায় মগজ আছে কি নেই। সেই সাথে কলি কে মা'রা'র প্রতিশোধও নেবে।

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প