বেশিরভাগ সময়ে ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরা হয় আফসানার। সালোয়ার কামিজ কিংবা শাড়ি খুব একটা পরা হয় না। বিশেষত শাড়ি তো পরাই হয় না। বহু আগে ভার্সিটিতে পড়ার সময় হয়তো পরেছিল কখনো। শেষ বোধহয় পরেছিল বিয়ের সময়। শাড়ি পরলে অস্বস্তি হয়। চলাফেরাও করতে পারতো না ঠিক ভাবে সেজন্য পরা বন্ধ করে দিয়েছিল।
তবে আজ আফসানার একটু শাড়ি পরতে ইচ্ছে হলো। মন মেজাজটা ভীষণ ভালো। অনেকদিন হলো ঠিক মতো একটু সাজগোজও করা হয় না। ভাবলো আজকে একটু নিজেকে সময় দেবে। আজ একটু অন্যরকম ভাবে অফিসে যাবে।
আলমারির গোটা একটা তাক ভর্তি শুধু শাড়িই পড়ে আছে। সবগুলোই নতুন। একবারের জন্যও কখনো পরা হয়নি। এগুলোর বেশিরভাগই উপহার পেয়েছে। নিজে কিনেছে এমন শাড়ির সংখ্যা খুবই কম। বেশিরভাগ শাড়ি জর্জেটের ভারী কাজ করা। সেগুলো পরতে ইচ্ছে করলো না। বেশ অনেকটা সময় অফিসে কাটাতে হবে তাই একটা আরামদায়ক শাড়ি খুঁজলো।
বেছে বেছে হালকা আকাশী রঙের একটা কটনের শাড়ি বের করলো। শাড়িটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজেকে অন্য রকম লাগলো আফসানার। মনে হলো অন্যান্য পোশাকের থেকে শাড়িতে যেন ওকে একটু বেশি মানিয়েছে। আজ নতুন করে আফসানা নিজেকে দেখে মুগ্ধ হলো।
শাড়ির সাথে মিলিয়ে চুড়িও পরলো। কানে দুল কিংবা গলায় মালা পরার আর ইচ্ছে হলো না। চুলগুলো কিভাবে বাঁধবে ভাবতে ভাবতে আর কোনোভাবে বাধাই হলো না, ছেড়ে রাখলো। না কোন মেকআপ করলো, না লিপস্টিক লাগালো। শুধু একটা ছোট টিপ পরলো। ব্যস এতটুকুতেই নিজের কাছে নিজেকে দারুন লাগছে আফসানার।
সাজগোজ শেষে নিচে নামলো। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে তখন টিভি দেখছে আফসানার স্বামী রওনাফ। আফসানা নিজ ইচ্ছেতেই রওনাফের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“কেমন লাগছে আমায়?”
আফসানার বলা কথাটা হয়তো রওনাফের কানেই গেল না। কিংবা কানে গেলেও উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। আফসানা ফের জিজ্ঞেস করলো,
“কেমন লাগছে আমায়?”
রওনাফ এবারে বিরক্তিকর গলায় বলল,
“দেখছো তো একটা জিনিস দেখছি টিভিতে। তোমায় তো পরেও দেখা যাবে।”
আফসানা তাকালো টিভির দিকে। কোন একটা ইংলিশ মুভি দেখছে রওনাফ। আফসানা চুপচাপ সোফার উপর থেকে রিমোটটা হাতে নিয়ে টিভিটা বন্ধ করে দিলো। হঠাৎ করে টিভি বন্ধ হওয়ার কারণটা খুঁজতে আশে পাশে তাকাতেই রওনাফ দেখলো আফসানার হাতে রিমোট। বুঝতে আর বাকি রইল না আফসানা ইচ্ছাকৃতভাবে টিভিটা বন্ধ করে দিয়েছে।
রওনাফ আফসানার হাত থেকে রিমোটটা কেড়ে নিতে চাইলো, তবে পারলো না। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“সকাল সকাল ঝামেলা না করে চলছে না তোমার?”
“এক সেকেন্ডের জন্য কি আমার দিকে তাকিয়ে বলতে পারতে না কেমন লাগছে? অনেকতো মিথ্যে বলো, তাহলে একটু নাহয় মিথ্যে প্রশংসাই করতে। তাহলে তো আমায় ঝামেলা করতে হতো না।”
“তোমায় আজ আবার আলাদা করে দেখার কি আছে? এমনিতেও রোজ তোমার এই মুখ দেখতে দেখতে আমি বিরক্ত হয়ে গেছি।”
“নিজের বউকে দেখতে ভালো লাগে না তাই না? অন্যের বউ হলে তোমার এই বেহায়া চোখ দুটো ঠিকই তার ওপর পড়তো।”
“আগে বউয়ের মতন বউ হতে শেখো। বউ মানে স্বামীর কথা শোনে, স্বামী কে ভালোবাসে, স্বামীর খেয়াল রাখে, স্বামী কি খেতে ভালোবাসে সেসব রান্না করে খাওয়ায়, স্বামী কি করতে ভালোবাসে সেসব করে। বউ মানে তোমার মত না যে সংসার ফেলে রেখে সারাদিন অফিসে পর পুরুষদের সাথে বসে থাকে। বউ মানে তোমার মতন মেয়ে না যে স্বামীকে সময় না দিয়ে অফিসে গিয়ে পরপুরুষদের নিজের শরীর দেখিয়ে বেড়ায়।”
রওনাফ কথাটা বলতেই আফসানা ঠাস করে ওর গালে একটা চ'ড় বসালো। রওনাফ তড়িৎ গতিতে বিস্ফোরিত নয়নে আফসানার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি গায়ে হাত তুললে আমার?”
আফসানা আঙ্গুল উঁচিয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে শাসিয়ে বলল,
“আর একটা শব্দ উচ্চারণ করলে এক্ষুনি সিকিউরিটি ডেকে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব। আমি না হয় স্ত্রী নামের কলঙ্ক তুমি কি স্বামী হিসেবে নিজেকে আদর্শ ভাবো? কেন আমি তোমার সংসার রেখে সারাদিন অফিসে পড়ে থাকি সেই প্রশ্ন কখনো নিজেকে করেছিলে? তোমার মতন একটা ই'ডি'য়ে'ট, বা'স্টা'র্ড কে বিয়ে করে নিজের জীবন নিজে ধ্বংস করেছি। তোমাকে যে এখনও আমি খাইয়ে দাইয়ে পালছি তোমার চৌদ্দ গুষ্টির কপাল ভালো।”
রওনাফ নিজেও পাল্টা আঙুল উঁচিয়ে দাঁত পিষে বলল,
“একদম আমাকে দয়া দেখানোর ভাব দেখাবে না। ভুলে যেও না এই কোম্পানিতে আমারও অংশ আছে।”
“লজ্জা করে না তাই না? দয়া করে দিয়েছিলাম। ভুলে যেও না কোম্পানিটা আমার। দুধ কলা দিয়ে কাল সাপ পুষছি আমি।"
“আরে তো তালাক নিয়ে নাও। কে নিষেধ করেছে।”
আফসানা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
“আমি তোমার থেকে তালাক নিয়ে নেই আর তুমি আমার কোম্পানির টাকায় বসে তোমার প্রেমিকাকে নিয়ে ফুর্তি করবে তাই তো? আমার জীবন যখন তুমি শেষ করেছো তোমার জীবনও শেষ করেই ছাড়বো। আর এটা আফসানা চৌধুরীর প্রমিস।”
__________
“আজ রাতে বাড়ি নাও ফিরতে পারি। হয়তো দু-তিন দিন পর বাড়ি ফিরব।”
ঘড়ি পরতে পরতে ইমদাদ কলিকে কথাটা বলল। কলি তখন ইমদাদের ফোনে গেম খেলছে। এই বাড়িতে বর্তমানে সময় কাটানোর মতন কলির কাছে দুটো কাজই আছে। এক ইমদাদের ফোনে গেম খেলা আর দুই ইমদাদের সাথে ঝগড়া করা। এর বাইরে সময় কাটানোর মতন কোন কাজ খুঁজে পায় না। ইমদাদের কথাটা শুনে ফোনের ওপর থেকে দৃষ্টি তুলে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমাকে কেন বলছো?”
ইমদাদ আয়নার ভিতরে রাগী দৃষ্টিতে কলির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোকে বলিনি তো। আমি নিজের সাথে নিজেই কথা বলছিলাম।”
কলি ছোট্ট করে ‘ওহ’ বলে আবারও গেম খেলায় ব্যস্ত হয়ে গেল। ইমদাদ শুধু চুপচাপ দেখে গেল কলির অবহেলা, কিছু বলল না। একটু পর কলির হাত ধরে ছো মেরে নিজের ফোনটা নিয়ে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে কলি একবার ডেকে উঠলো।
ইমদাদ মোটেও আশা করেনি যে কলি ওকে ডাকতে পারে। যদিও থামার ইচ্ছে ছিল না তবুও থামতে বাধ্য হলো৷ নিজে নিজে কিন্তু থামেনি ইমদাদ, কিছু একটা থামালো ওকে। পিছন ফিরে তাকিয়ে ভ্রুঁ উঁচিয়ে কলি কে বলল,
“কি?”
“কেন বাড়ি ফিরবে না আজ?”
ইমদাদ ত্যাড়াব্যাকা কোন উত্তর দিতে চাইলো তবে দিতে পারলো না। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“অনেক কাজ আছে। ব্যস্ত থাকবো। শহরের বাইরে যাচ্ছি।”
“একা একা ভালো লাগবে না বাড়িতে। ঝগড়া করার জন্য হলেও তোমায় লাগবে। আর তাছাড়া যদি বাবা, দাদু আসে। ওরা তো জোর করে নিয়ে যেতে চাইবে আমায়।”
ইমদাদ একটু হলেও শান্তি পেল। এর আগে ইমদাদের বাড়ি ফেরার কোনো তাড়া থাকতো না। তবে এখন ইমদাদের বাড়ি ফেরার তাড়া আছে। কলির বাড়িতে ভালো লাগবে না। ইমদাদ কে ছাড়া একা একা থাকতে পারবে না। তবে নিজের ভালোলাগা, আবেগ, অনুভূতির কোন কিছুই প্রকাশ করলো না। বরং কন্ঠে কাঠিন্যতা বজায় রেখে বলল,
“আসবেনা ওরা। সাঈদ আছে এখন বাড়িতে। আর যদি ওরা এসে জোর করে তোকে নিয়ে যায়, অন্য কোথাও বিয়ে তো আর দিতে পারবে না। আমি ফিরে এসে আবার নিয়ে আসব। যদি ওরা আসে চলে যাস। ঘুরে আসিস একটু বাপের বাড়ি থেকে।”
কথাটা বলে ইমদাদে চলে যেতে ধরলে কলি ছুটে গিয়ে ইমদাদের সামনে দাঁড়ালো। ইমদাদ থেমে গেল। মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আবার কি হলো?”
কলি কাচুমাচু করে বলল,
“না মানে বলছিলাম যে রাতে ফিরে এসো। বিছানায় ঘুমোতে দেব, বিরক্ত করব না। ফিরে এসো কেমন? ভালো লাগবে না বাড়িতে একা একা। তুমিও বাড়ির বাইরে থেকে কি করবে। খাওয়া-দাওয়ার সমস্যা, ঘুমোনোর সমস্যা। নিজের ঘরের কথাই আলাদা তাই না?”
“ঘরে ফেরার তাড়া আমার কোন কালেই ছিল না। শান্তি আমি কোথাও পাই না। নিজের ঘর আর পরের ঘরের মাঝে কোন পার্থক্য কখনো খুঁজে পাইনি। যেখানেই যাই মাথার উপর চাপ থাকেই, মনে কষ্ট থাকেই।”
কলি মুখ ভেংচিয়ে বলল,
“ঠিক আছে ঠিক আছে ফিরতে হবে না। যাও যেখানে ইচ্ছে। বুঝতে পেরেছি আমি, বাইরে নিশ্চয়ই প্রেমিকা আছে। তার সাথেই সময় কাটাবে তাই তো? যা ইচ্ছে করো। পারলে আসার সময় একটা বউ নিয়ে ফিরে এসো। কিছুদিন পর তো এমনিতেও আমি চলে যাব।”
কলি কথাটা বলতেই হঠাৎ করে ইমদাদের অভিব্যক্তি কেমন বদলে গেল। বোধহয় রেগে গেল। খপ করে এক হাতে কলির চোয়াল চেপে ধরে বলল,
“মুখে কোন লাগাম নেই তোর? মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে থাপড়ে তোর দাঁত ভেঙে দেই। এর থেকে তুই যদি বোবা হতি ভালো হতো। অন্তত এসব আজেবাজে কথা বলতে পারতি না।”
নিজেই আবার কলির চোয়াল ছেড়ে দিয়ে গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেল। কলি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ইমদাদ যে কোন কথাটার জন্য রেগে গেল সেটাও তো বুঝতে পারলো না। অদ্ভুত ছেলে।
________
আলমারি গোছাতে গিয়ে হঠাৎ কাপড়ের ভাজ থেকে একটা কাগজের মতন কি যেন মেঝের উপর পড়লো। শাম্মি সেটা হাতে নিতেই দেখল এক অপূর্ব সুন্দরী তরুণীর ছবি। যেমন ধবধবে তার গায়ের রং, তেমনি আঁকানো তার চোখ, নাক। সাজগোজ, পোশাক-আশাকের ধরণও ভীষণ মার্জিত।
শাম্মির চিনতে একটুও ভুল হলো না এই ভদ্র মহিলাকে। বরাবর যাকে ঈর্ষা করে এসেছে, যাকে দেখলে ভেতরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে, যার প্রতি মনে সীমাহীন ঘৃণা জমে আছে সেই মানুষটাকে চিনতে কি ভুল হতে পারে!
শাম্মি একটানে ছিড়ে ফেলল ছবিটা। টুকরো টুকরো করে ফেললো। যেন সমস্ত রাগ সেই ছবির উপরে গিয়ে পড়ল। শান্তশিষ্ট্য শাম্মির এই ভয়ঙ্কর রূপটা দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে পারতো না। সরদার বাড়িতে হয়তো কেউ জানেই না যে শাম্মিও রাগ করতে পারে।
দরজার পাশ দিয়ে তখন রোকসানা যাচ্ছিল। হঠাৎ করে ঘরে চোখ পড়তেই দেখলো কোন একটা কাগজ টুকরো টুকরো করছে শাম্মি। কৌতূহল আটকাতে না পেরে ঘরের ভিতর উঁকি দিয়ে বলল,
“এটা কি ভাবি, যে এভাবে রাগ ঝারছো কাগজের উপরে?”
কাগজের টুকরোগুলো শাম্মি মেঝের উপরে ফেলে সেগুলো পায়ে পিষে বলল,
“এক বেহায়া মেয়ে মানুষের ছবি এটা। এক কাল না'গি'নী'র ছবি এটা।”
রোকসানা ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“ও মা সে আবার কে?”
“তোমার ভাইয়ের ভালোবাসার মানুষ। তোমার ভাইয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী রূপবতী, গুণবতী সেই সাথে ভাগ্যবতী ছন্দার ছবি।”
রোকসানা আঁৎকে উঠে বলল,
“ওর ছবি এভাবে ছিড়লে কেন? আর ওর ছবি পেলেই বা কোথায়? ভাইজান যদি এসে দেখে তাহলে কি হবে ভাবতে পারছো?”
“যা হয় হবে, তবে ওর ছবি আমার ঘরে থাকবে না।”
রোকসানা ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“ঘর থেকে দূর করে আর কি করবে। তোমার স্বামীর মনেই তো তার বাস। মন থেকে তো দূর করতে পারলে না। ঘর থেকে দূর করেই বা কি করবে? তুমি একটা ছবি ছিড়ছো গিয়ে দেখো তোমার স্বামীর কাছে হয়তো তার হাজারটা ছবি আছে এখনো। এসব পাগলামি করে লাভ নেই ভাবি। তোমার স্বামীকে কখনো তুমি বাঁধতেই পারোনি। সংসার কিভাবে করতে হয় তুমি জানো না।”
শাম্মি তেঁতে উঠে বলল,
“তুমি যদি এতই সংসার কিভাবে করতে হয় জানো তাহলে তোমার সংসার হয়নি কেন? তোমার স্বামী কোথায়, তোমার শ্বশুর বাড়ি কোথায়? কখনো তো তাদের চোখে দেখারও সুযোগ পেলাম না।”
শাম্মি কষ্ট দেওয়ার জন্য রোকসানাকে কথাটা বলল, তবে রোকসানা একটুও কষ্ট পেলো না। বরং মলিন হেসে বলল,
“যতদিন এই দুনিয়ায় কিছু পিশাচ বেঁচে থাকবে ততদিন কেউ শান্তি পাবে না ভাবি। তুমি কখনো বাঁধতে পারোনি তোমার স্বামীকে আর আমি বেঁধেও ধরে রাখতে পারিনি। তোমার সংসার হয়েও হয়নি আর আমার সুখের সংসার হারিয়ে গেছে। পার্থক্য আমাদের মাঝে এতোটুকুই তুমি কখনো ভালোবাসা পাওনি আর আমার কপালে ভালোবাসা সয়নি।”
__________
ব্যবসা সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য আজ ইমদাদ আর সাদিক কে অফিসে ডেকেছিল আফসানা। ওরা সময় মতনই এসে গেছে। এবারে আর আফসানার সাথে দেখা করার জন্য মাসের পর মাসের ঘুরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার জন্য সময় নষ্ট করতে হয়নি।
বরং আজ অফিসে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে আফসানার সেক্রেটারি নিজে এসে ইমদাদদের নিয়ে গেছে। বেশ ভালোই খাতির যত্ন করেছে। চেয়ারে বসিয়ে চা কফির অফার এসেছে। এমনকি এও বলা হয়েছে যে যা খেতে চাইবে সেটাই নাকি ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। তবে সেসব কিছু গায়ে লাগায়নি ইমদাদ। সাদিক শুধু এক কাপ কফি নিয়েছে।
ঘড়িতে সময় দেখলো একবার ইমদাদ। আফসানা যে সময়ে আসার কথা বলেছিল এখনও সে সময় হতে পাঁচ মিনিট বাকি আছে। ইমদাদের মনে হলো ওরা বোধহয় একটু বেশিই আগে এসে গেছে। এতটা আগে আসা উচিত হয়নি। হয়তো আফসানা ওদের হ্যাংলা ভেবে নিল। আরেকটু কঠিন ব্যক্তিত্বের হওয়া উচিত ছিল ইমদাদের। সব দোষ সাদিকের। ঐ তো টেনে টেনে নিয়ে এলো। না নিজের কোন আত্মসম্মানবোধ আছে না ইমদাদের আত্মসম্মান ঠিক রাখতে দিচ্ছে।
ইমদাদের এসব ভাবনার মাঝেই হিলের গটগট আওয়াজ তুলে আফসানা প্রবেশ করলো। আফসানা কে প্রবেশ করতে দেখে সাদিক আর ইমদাদ উঠে দাঁড়িয়ে একটু সম্মান জানালো। আফসানা আলতো হেসে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে ইমদাদদেরও বসতে ইশারা করলো।
বেশ লম্বা একটা সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হলো। এক পর্যায়ে গিয়ে আফসানার একটু বিরক্ত লাগলো। মনে হলো একটু বিরতি নেওয়ার প্রয়োজন। ইমদাদরাও সম্মতি জানালো আফসানের প্রস্তাবে। আফসানা ওর সেক্রেটারি তূর্য কে ইমদাদের নাস্তার ব্যবস্থা করতে বলে নিজে বেরিয়ে গেল মিটিং রুম থেকে।
প্রায় আধা ঘন্টা পর আফসানা আবারও কেবিনে ফিরে এলো। চেয়ারের দিকে এগিয়ে যেতে ধরে শাড়ির সাথে পা বেঁধে পড়ে যেতে ধরলো, তবে নিজেই আবার নিজেকে সামলে নিল। তূর্য ছুটে এলো সাহায্য করার জন্য। আফসানা হাত উঠিয়ে তূর্য কে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি নিজেই নিজেকে সামলাতে পারি।থ্যাংকস ফর ইউর কনসার্ন তূর্য।”
তূর্য চিন্তিত গলায় বলল,
“আপনি যে কেন এসব পরতে গেছেন ম্যাডাম। রোজ যা পরেন তাতেই তো বেশ মানায় আপনাকে। আপনার সাথে কি আর এসব শাড়ি যায়!”
আফসানা রাগান্বিত দৃষ্টিতে তূর্যর দিকে তাকিয়ে বলল,
“জাস্ট শাট আপ। যা বোঝো না তা নিয়ে কথা বলো না। সবাই প্রশংসা করেছে আজ আমার। সবাই আমাকে বলেছে আমাকে শাড়িতে বেশি মানায়। তোমার চোখের ট্রিটমেন্ট করাও।”
সাদিক ভাবলো একটা সুযোগ পাওয়া গেছে আফসানা কে খুশি করার। সাদিকের মনে হলো কেউ আফসানের প্রশংসা করলে আফসানা ভীষণ খুশি হয়। তাই আগ বাড়িয়ে প্রশংসার সুরে আফসানা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“একদম ঠিক বলেছেন ম্যাডাম। এর আগে আপনাকে যতবার দেখেছি অন্যরকমের পোশাক পরে দেখেছি। কিন্তু আজ প্রথম আপনাকে শাড়িতে একদম অন্যরকম লাগছে। খুব সুন্দর লাগছে আপনাকে।”
আফসানা সাদিকের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আপনার থেকে শুনতে চেয়েছি কেমন লাগছে আমায়? মাইন্ড ইউর ওন বিজনেস। যা করতে এসেছেন চুপ চাপ সেটা করুন। এন্ড ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট।”
আফসানার করা অপমানে মুখটা একেবারে বন্ধ হয়ে গেল সাদিকের। এই জন্যই বলে ভালো করতে নেই। আগ বাড়িয়ে গেল একটু খুশি করার জন্য, উল্টো অপমান করে ছেড়ে দিলো।
এদিকে তূর্য এখনো আফসানা কে বলেই যাচ্ছে শাড়ির থেকে অন্যান্য দিন যেমন পোশাক পরে আসে তাতেই ভালো লাগে। একপর্যায়ে গিয়ে আফসানার নিজের মনেও সন্দেহ তৈরি হলো। সন্ধিহান গলায় তূর্য কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সত্যি আমাকে শাড়িতে ভালো লাগছে না?”
“না না ম্যাডাম ভালো লাগছে। তবে অন্যান্য দিন আপনার মাঝে যেই একটা আলাদা ব্যাপার থাকে। মানে আপনাকে আজকে আফসানা চৌধুরীর মতন লাগছে না। আপনাকে দেখতে আজকে রওনাফ স্যারের……..।”
রওনাফের নামটা উচ্চারণ করতেই আফসানা চোখ গরম করে ওর দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল তূর্য। অপরাধী গলায় বলল,
“সরি ম্যাডাম।”
আফসানা আর তূর্যর সাথে কোন কথা বাড়ালো না। আবারো আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে গেল। আরো প্রায় দেড় ঘন্টার মতন আলোচনা চলল।
ওদের তিনজনের আলোচনার মাঝেই পরবর্তীতে আরো বেশ কয়েকজন যোগ দিলো। এই পুরো আলোচনার সময়টা আফসানা একটা বিষয় বেশ ভালোভাবে লক্ষ্য করেছে মিটিং রুমে উপস্থিত কেবলমাত্র তূর্য আর ইমদাদ বাদে প্রত্যেকটা ছেলে বারবার আড়চোখে আফসানের দিকে তাকিয়েছে। এর মাঝে কারো কারো দৃষ্টি যে খারাপ ছিল সেটাও আফসানার বুঝতে বাকি নেই। আবার কেউ কেউ মুগ্ধ দৃষ্টিতেও তাকিয়ে ছিল। তূর্য যে তাকায়নি এমনটা না। তবে তূর্যর দৃষ্টি আর বাকি সবার দৃষ্টি কে এক করা যায় না।
আফসানার ভাবার বিষয় হলো ইমদাদ। ইমদাদও তো পুরুষ মানুষ। এমন আড় চোখে নানা অজুহাতে মেয়েদের দিকে তো তাকানো এদের স্বভাব। এরা তো সুযোগই খোঁজে কি করে মেয়েদেরকে একটু মন ভরে দেখা যায়। তাহলে ইমনাদ কেন তাকালো না?
সবাই প্রশংসা করলো, সাদিক অব্দি প্রশংসা করার জন্য অপমানিতও হলো অথচ ইমদাদ একবারও প্রশংসা করলো না। এমনটাও না যে ইমদাদ তাকায়নি আফসানার দিকে। তাকিয়েছে, বেশ অনেকবারই তাকিয়েছে। আফসানার চোখে চোখ রেখে কথা বলেছে। তবে সেই দৃষ্টির মাঝে কোন মুগ্ধতা ছিল না, কোন অস্বস্তিও ছিল না।
আফসানার একবার মনে হলো তখন কি সাদিক কে ওভাবে অপমান করার জন্য ইমদাদ আর প্রশংসা করার সাহস পায়নি? যদি তখন সাদিকের প্রশংসায় খুশি হতো তবে কি ইমদাদও ওর প্রশংসা করতো আফসানা কে খুশি করার জন্য? হ্যাঁ হতেই পারে এমনটা।
মিটিং রুম থেকে সবাই চলে গেল। রইলো শুধু ইমদাদ, সাদিক, আফসানা আর তূর্য। ইমদাদদেরও এবার বিদায় নেওয়ার পালা। তবে ওরা বিদায় নেওয়ার আগে আফসানা সাদিক কে উদ্দেশ্য করে অপরাধী গলায় বলল,
“সাদিক, তখন আসলে আমার আপনার সাথে ওভাবে কথা বলা উচিত হয়নি।’
সাদিক অবুঝের মতন বলল,
“কিসের কথা বলছেন ম্যাডাম?”
“আরে ওই যে তখন আপনি আমার প্রশংসা করলেন অথচ আমি আপনাকে অপমান করলাম। আসলে তূর্যর কথা শুনে মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিলো। আমি বেশ কনফিডেন্ট ছিলাম যে আমাকে শাড়ি পরে ভালো লাগছে, তবে তূর্য আমার কনফিডেন্সটা একেবারে ভেঙ্গে দিয়েছিল। সেই জন্য ওর রাগটা গিয়ে আপনার উপর পড়েছে। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আমার প্রশংসা করার জন্য। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।”
সাদিক কে কথাগুলো বলার মাঝে আফসানা আড়চোখে বেশ কয়েকবার ইমদাদের দিকে তাকালো। ইমদাদের কানে যেন কথাগুলো ঢুকলোই না। ইমদাদ তখন ফোন স্ক্রল করছে। মনে হলো কিছু একটা দেখছে ফোনে।
নিজের অজান্তেই আফসানার খুব হিংসে হলো এটা ভেবে যে ফোনে কি এমন আছে যার সৌন্দর্য আফসানার থেকেও বেশি। কি এমন আছে ফোনের মাঝে যা ইমদাদকে ওর দিকে তাকাতে দিচ্ছে না।
ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও প্রশ্নটা আর জিজ্ঞেস করা হলো না। আফসানার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল ইমদাদরা।
আফসানা জানে না কেন তবে মনের মাঝে একটা ভয়ংকর অস্থিরতা তৈরি হলো। ইমদাদের প্রতি রাগ, ক্ষোভ না বিরক্তি কোন অনুভূতিটা কাজ করছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
মনে হচ্ছে আবার অপমান করলো আফসানা কে। বারবার এই ছেলে কোনো না কোনো ভাবে আফসানা কে হারিয়ে দিচ্ছে। আফসানার জেদ আরো বাড়াচ্ছে। আর এর মূল্য ইমদাদ কে দিতেই হবে।