অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ২০

🟢

“আরে চাচা, এভাবে হুট করে বললেই দোকান ছেড়ে দেওয়া যায় নাকি? মগের মুল্লুক পেয়েছেন? আপনি বললেন আর আমি ছেড়ে দিলাম!”

গফুর আহমেদ পান চিবোতে চিবোতে ইমদাদের কড়া কথা গুলো হজম করার চেষ্টা করলো। তবে ঠিকঠাক হজম করতে পারল না। পানের পিক টুকু ফেলে নিজেও রাগী গলায় ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“দোকান আমার। তুমি ছাড়বে না বললেই হলো। পুলিশ ডাকবো আমি।”

“আপনার কোন বাপকে ডাকবেন ডাকুন। আর তাছাড়া আমি তো বলিনি আপনার দোকান ছাড়বই না। সময় তো দিতে হবে। আজকেই বলছেন ছেড়ে দিতে হবে, আজকেই বলছেন দোকান ফাঁকা করতে হবে মানেটা কি এসবের? সত্যি করে বলুন তো সমস্যা কি আপনার? সরদার বাড়ির লোকদের থেকে টাকা খেয়েছেন তাই না?”

কথাটা ভীষণ আত্মসম্মানে লাগল গফুর আহমেদের। উনি টাকা খেয়েছেন সেটা ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে সেই কথা ইমদাদ জনসম্মুখে বলবে। ওনার কি মান সম্মান নেই নাকি? সবাই তো ওনাকে ঘুষখোর ভাববে। ইমদাদের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বললেন,

“এই ছোকরা, মুখ সামলে কথা বলো। তোমার সাথে করা চুক্তি শেষ হয়েছে আরো দশ দিন আগেই। নতুন করে আমি আর কোন চুক্তি করবো না। দোকান আমার ভাড়া হয়ে গেছে। শিগগিরই ফাঁকা করো। নয়তো জিনিসপত্র কি করে বের করে ছুঁড়ে ফেলতে হয় আমি জানি সেসব।”

ইমদাদ আর নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। এমনিতেই সকাল থেকে মন মেজাজটা খারাপ ছিল কলির কারণে। তার উপরে এখন আবার এই উটকো ঝামেলা। শেষমেষ সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো গফুর আহমেদের প্রতি। দুহাতে ইমদাদ ওনার পাঞ্জাবির কলার ধরে দাঁত পিষে বলল,

“দোকানের জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলার আগে তোর ব্যবস্থা আমি করবো। যদি দোকান থেকে একটা কিছু বের করেছিস আমার অনুমতি না নিয়ে তোকে এখানেই পুঁতে রেখে দেব। ঝামেলা করার ইচ্ছে নেই এজন্য তুই বেঁচে গেলি। এক সপ্তাহ সময় লাগবে আমার। এর মাঝে যদি দাঁতের ফাক দিয়ে একটা শব্দ বের করেছিস তবে তোর বাড়িতে গিয়ে তোর ব্যবস্থা করে রেখে আসবো। শা’লা শু’য়ো’রে’র বাচ্চা কোথাকার।”

কথাটা বলে ইমদাদ গফুর আহমেদকে ছেড়ে দিল। রাগে হিশহিশ করে উঠে গফুর আহমেদ কিছু বলতে চাইলেন। তবে ইমদাদের রক্তচক্ষু দেখে থেমে গেলেন।

মূলত ইমদাদের এই দোকানটা চালাতো ওর বাবা। স্টেশনারির জিনিসপত্রের দোকান। ওর বাবা মা'রা যাওয়ার পর ইমদাদ চালাতো। পরে কর্মচারী রেখেছিল। ওদের দোকানের পাশের দোকানটাই ছিল করিম সরদারের। প্রথমে সেখানেই কর্মচারী হিসেবে থাকতেন ইমদাদের বাবা। তবে তারপরে নিজেই দোকানটা ভাড়া নিয়েছিলেন।

একসময় এই পুরো মার্কেটের সবগুলো দোকানই ছিল কামাল সরদারের। পরে একসময় তিনি সেগুলো বিক্রি করে দেওয়ার পর কিনে নেয় গফুর আহমেদ। তার কাছ থেকে ইমদাদের বাবা একটা দোকান ভাড়া নিয়েছিল। মানুষটা খারাপ ছিল না। একটু কিপটে ছিল বটে। ভাড়া বিষয়ে অত্যাধিক সচেতনও ছিল। মাসের এক তারিখ পেরোতে দিত না। প্রত্যেক মাসের এক তারিখে সকাল বারোটার মধ্যেই তাকে ভাড়া দিয়ে দিতে হতো।

ইমদাদের রাগ বেশি জন্য ওর সাথে মেপে কথা বলতো। তবে কে জানে হঠাৎ করে কি হয়ে গেল। ইমদাদের সন্দেহ যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে এই সবটাই সরদার বাড়ির লোকজনেরই কাজ। ওরা তো আর জানে না যে ইমদাদ অন্য ব্যবসার সাথেও যুক্ত আছে। ভেবেছে যে এই দোকানটাই তো ইমদাদের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। এটাও যদি কেড়ে নেয় তাহলে না খেতে পেয়ে ম’র’বে।

ইচ্ছে তো করছে গিয়ে সবগুললর গলা টিপে ধরতে। ওরা বোধহয় এখনো বোঝেনি যে ইমদাদ কে না খাইয়ে মা'রা'র ক্ষমতা সরদার বাড়ির লোকজনের নেই। মনে করিয়ে দিতে হবে ওদের কে আবার এই কথাটা।

তবে ইমদাদ এখন কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এত তাড়াতাড়ি তো অন্য একটা দোকানও খোঁজা সম্ভব না। আবার সে দোকানটাও জায়গামতো পাবে কিনা সেটাও তো একটা ব্যাপার। এখানে কাস্টমাররা পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। নতুন জায়গায় গেলে সেটারও একটা সমস্যা হবে।

দোকানের কর্মচারীকে দোকানটা বন্ধ করতে বলে ইমদাদ সেখান থেকে চলে এলো। একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলো। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। অনেক ভাবনা চিন্তা করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে নিজের এক বন্ধুকে কল করতে চাইলো। নাম্বারটা ডায়াল করতে ধরেও আবার থেমে গেল ইমদাদ।

বেশ অনেকদিন ধরে এই বন্ধুর সাথে যোগাযোগ নেই। তারও একটা বিশেষ কারণ আছে। আজ হঠাৎ করেই যদি আবার কল করে নিজের প্রয়োজনের কথা বলে তাহলে ব্যাপারটা কেমন যেন একটা হয়ে যায় না! ইমদাদ তো স্বার্থপর না। কিন্তু আজ তো ইমদাদ স্বার্থপরের মতনই আচরণ করতে যাচ্ছে।

আগে পিছে অনেক কিছু ভাবনা চিন্তা করে আর কলটা করা হলো না। চা খাওয়া শেষে চায়ের বিলটা দিয়ে চলে যেতে ধরলে হঠাৎই কানে একটা পরিচিত কন্ঠস্বর ভেসে এলো। কেউ একজন ইমদাদ বলে ডাকলো। ইমদাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই একটা হাস্যজ্জ্বল চেহারা দেখতে পেল।

কি অদ্ভুত! এই ছেলেটাকেই তো ইমদাদ কল করতে যাচ্ছিল। আর এখন সেই ছেলেটারই দেখা পেয়ে গেল। একেই কি বলে ভাগ্য! সৃষ্টিকর্তা তাহলে সহায় হলো। ইমদাদের দিকে তবে তিনি মুখ তুলে তাকিয়েছে।

এদিকে ইমদাদ কে এভাবে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জয় ভাবলো অনেক দিন পর দেখা হওয়ার কারণে বোধহয় চিনতে পারেনি। নিজ থেকে এগিয়ে এসে বলল,

“কিরে চিনতে পারলি না আমায়? আমি জয়।”

ইমদাদের ধ্যান ভাঙ্গলো। একটু হেসে উঠে বলল,

“চিনতে পারব না কেন? আসলে অনেকদিন পর হঠাৎ তোকে দেখলাম তো সেজন্য অবাক হয়েছি।”

“আমিও হঠাৎ তোকে এখানে দেখে ভীষন অবাক হয়েছি। যাকগে সেসব কথা, দেখা যে হয়েছে এটাই অনেক। এতদিন পর তোকে দেখে খুব ভালো লাগলো। তা কি করছিস এখন?”

“আপাতত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি। পড়াশোনা শেষ করিনি সেসব তো জানিসই নিশ্চয়ই?”

ইমদাদের কথাটা শুনে জয় চমকে উঠে বলল,

“কি বলছিস? পড়াশোনা শেষ করিসনি মানে? আমি তো জানি না কিছু। শেষ করিসনি কেন? পাগল তুই! এই যুগে পড়াশোনা ছাড়া কিছু হয়!”

ইমদাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেঞ্চের উপরে বসে জয়ের হাত টেনে ধরে জয়কেও নিজের পাশে বসিয়ে বলল,

“হয় তো। এই যুগে পড়াশোনা ছাড়াও অনেক কিছুই হয়। বরং পড়াশোনা করা মানে সময় নষ্ট। আমাকে দেখ না, দিব্যি সংসার চলছে। ভাই বোনকে লেখাপড়া করাচ্ছি, দুটো সংসারের যাবতীয় খাওয়া-দাওয়া সহ সব খরচ চালাচ্ছি। বিয়ে অবধি করেছি। দুদিন পর বাচ্চাকাচ্চাও হবে হয়ত।”

“আরে তাই নাকি। আমি তো কিছুই জানিনা। আসলে তোর সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে কারো সাথেই যোগাযোগ রাখিনি। ভাবিকে নিয়ে একদিন বাড়িতে আসিস।”

“সেসব পরে দেখা যাবে। তুই তোর খবর বল। বিয়ে করেছিস? পড়াশোনা তো শেষ। চাকরি-বাকরি পেয়েছিস নাকি?”

“হ্যাঁ চাকরি পেয়েছি। তিন মাস হলো ব্যাংকে চাকরি পেয়েছি। আর বিয়ে এখনো করা হয়নি।”

আরও বেশ অনেক কথাই হলো দুজনের মাঝে। কথায় কথায় ইমদাদ জয়কে আজকের ঘটনাটাও বলল। ঘটনাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে জয় একটা প্রস্তাব দিল ইমদাদকে।

“শহরে আমাদের যে চারটে দোকান আছে তার মধ্যে একটা দোকান ফাঁকাই পড়ে আছে। বাকি তিনটে ভাড়া হয়ে গেছে। তুই চাইলে ওটা নিতে পারিস। আমি বাবার সাথে কথা বলে নেব। নিবি?”

ইমদাদ সন্দেহী গলায় বলল,

“নিশ্চিত তুই? ব্যবস্থা করতে পারবি?”

জয় ইমদাদ কে নিশ্চয়তা দিয়ে বলল,

“অবশ্যই পারবো। না পারার কি আছে? বাবা তো তোকে চেনে। তোর কথা বললেই আর না করবে না। তোর বিশ্বাস না হলে দাঁড়া আমি এক্ষুনি কথা বলছি বাবার সাথে।”

কথাটা বলে জয় ফোনটা বের করে নিজের বাবাকে কল দিতে চাইলো। তবে ইমদাদ বাধা দিল। জয় যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলেছে। এতোটুকুই ইমদাদের জন্য যথেষ্ট।

একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো ইমদাদ। ইচ্ছে করলো সরদার বাড়ির লোকজনের কানের কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে বলে আসতে যে ওরা ইমদাদকে হারাতে চাইলেও ইমদাদের সৃষ্টিকর্তা ওকে হারতে দেয়নি। ওরা একটা পথ বন্ধ করে দেবে ইমদাদের জন্য তো ইমদাদের সৃষ্টিকর্তা ওর জন্য হাজারটা পথ খুলে দেবে।

সবশেষে ইমদাদ জয়ের দুটো হাত ধরে কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বললো,

“তোর এই উপকারের কথা আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না জয়। তুই কল্পনাও করতে পারবি না তুই আজ আমার কত বড় উপকার করলি।”

আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা শেষে এবারে যে যার পথে যাওয়ার জন্য উদ্দ্যত হলো। ইমদাদই আগে চলে যেতে ধরলে জয় ওকে পিছন থেকে একবার ডাকলো নাম ধরে। ইমদাদ পিছন ফিরে তাকিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কিছু বলবি?”

জয় একটু আমতা আমতা করে বলল,

"হ্যাঁ মানে একটা কথা জানার ছিল।”

ইমদাদ ভ্রুঁ উঁচিয়ে বলল,

“কি?”

জয় ফের আমতা আমতা করলো। তবে কি জানতে চাইছি সেটা বলতে পারল না। ইমদাদ সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো জয় কে। নিজেই যেন বুঝতে পারল যে জয় কি জানতে চাইছে। অমনি ইমদাদের অভিব্যক্তি গম্ভীর হয়ে উঠল। গম্ভীর গলাতেই বলল,

“তুই আমার উপকার করেছিস তার জন্য আমি তোর কাছে চির কৃতজ্ঞ। তাই বলে সেই উপকারের বদলে আবার ইয়াসমিনকে চেয়ে বসিস না।”

জয় তড়িঘড়ি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না না। সে কথা বলছি না। আমি তো শুধু জানতে চাইছিলাম ইয়াসমিন কেমন আছে। অনেকদিন হলো তো দেখা-সাক্ষাৎ হয় না, কথাও হয়না। আর ওর কি বিয়ে হয়ে গেছে?”

“না। পড়াশোনা শেষ করলে বিয়ে দেব আমার বোনের। ভালো আছে ইয়াসমিন। আর কিছু?”

জয় অস্বস্তি জড়ানো গলায় বলল,

“হ্যাঁ মানে আসলে আমি সেদিনের ব্যবহারের জন্য খুব লজ্জিত। আমি আসলে বুঝিনি যে ওকে ভালোবাসি কথাটা বলতেই ওভাবে ভয় পেয়ে যাবে। বিশ্বাস কর ইমদাদ আমি ওর সাথে খারাপ কোন ব্যবহার করিনি। শুধু বলেছিলাম ওকে ভালোবাসি, এতোটুকুই। তারপর জানিনা ওর কি হলো। ও তো একদম কান্নাকাটি করে ছুটে পালালো। আমি যদি জানতাম ও এতটা ভয় পেয়ে যাবে আমি কখনোই ওকে এই কথাটা বলতাম না বিশ্বাস কর।”

“বলেছে আমাকে ইয়াসমিন সব। যাইহোক বাদ দে সেসব কথা। আসছি।”

কথাটা বলে ইমদাদ সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে জয় ফের ওকে ডেকে উঠলো। ইমদাদ এবারে বিরক্তিকর গলায় বলল,

“আবার কি হলো?”

জয় আবারও আমতা আমতা করে বলল,

বিজ্ঞাপন

“আসলে আমি বেশ কয়েকদিন থেকেই তোর নাম্বারটা খুৃজছিলাম। সরাসরি বাড়িতে যাওয়ার সাহস হয়নি। ভেবেছিলাম আগে তোর সাথে কলে কথা বলবো। দেখ ভাগ্যক্রমে আজ তোর দেখাও পেয়ে গেলাম।”

“কোন দরকার ছিল?”

জয় ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ কি যেন একটা ভাবলো। হয়তো ভাবলো এই কথাটা ইমদাদ কে বলা এখনই উচিত হবে কিনা। পরক্ষণেই আবার মনে হলো আজ না বললে যদি আবার দেরি হয়ে যায়। যদি আবার হুট করে কোন কারণে সম্পর্কটা খারাপ হয়ে যায়। তার থেকে বরং একটা সুযোগ পেয়েছে বলে দেয়াই ভালো।

তবে ইমদাদের দিকে মাথা তুলে তাকানোর সাহস হলো না। সেই কলেজ জীবন থেকে ইমদাদ কে দেখে বড্ড বেশি ভয় পায় জয়। জয় যেমন শান্ত শিষ্ট ভদ্র স্বভাবের ইমদাদ তেমনি গুন্ডা স্বভাবের। জয় যেখানে সারাদিন ব্যস্ত থেকেছে পড়াশোনা নিয়ে সেখানে ইমদাদ ব্যস্ত থেকেছে অধিকাংশ সময়ই মা'রা'মা'রি নিয়ে। সেই সাথে কার কোথায়, কার সাথে, কি নিয়ে ঝামেলা হলো সে বিষয়গুলো মীমাংসা করা নিয়ে পড়ে থেকেছে। তারপরও বন্ধুত্বটা হয়ে গিয়েছিল দুজনের কিভাবে যেন। তবে সাঈদের জন্যই তেমন একটা টেকেনি। সেই পুরনো ভয়টা এখনও রয়ে গেছে জয়ের মাঝে। তাই আজও মাথা নিচু করে ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে মিনমিনে গলায় বলল,

“আসলে বলছিলাম যে আমি তো একটা ভালো চাকরিও পেয়ে গেছি। আর তুই তো আমার বাবা-মাকে চিনিস। আমার মা খুব ভালো। ঝগড়াঝাটি পছন্দ করেনা। আমার আর কোন ভাই বোনও নেই। মানে বলছিলাম যে ইয়াসমিন ভালো থাকতো আমার সাথে। তুই ওর জন্য যে সিদ্ধান্ত নিবি ও তো সেটাই মেনে নেবে। একবার ভেবে দেখ না। কারো না কারো হাতে তো বোনকে তুলে দিবিই। সেই মানুষটা না হয় আমিই হলাম। তোর পরিচিত, তোর বিশ্বস্ত বন্ধু। সত্যি বলছি ভালো রাখবো ওকে।”

ইমদাদ কোন উত্তর দিলো না। শুধু তাকিয়ে রইল জয়ের দিকে। ইমদাদেরর থেকে কোন উত্তর না পেয়ে জয় ফের বলে উঠলো,

“আবার ভাবিস না তোর উপকার করলাম বলে প্রতিদানে তোর থেকে ইয়াসমিনকে চাইছি। তোর উপকার করেছি তুই আমার বন্ধু জন্য। আর তোর থেকে ইয়াসমিনকে চাইলাম তুই ইয়াসমিনের ভাই জন্য। আমি জোর করব না কখনো। তুই না চাইলে আমি কখনোই ইয়াসমিনের সামনেও দাঁড়াবো না। এতগুলো বছর মাঝে কেটে গেছে কিন্তু তবুও আমার জীবনে কাউকে আসতে দেইনি আমি। নিজেই নিজেকে সময় দিয়েছি যেন আমি জীবনে কিছু একটা করতে পারলে তারপরে তোর সামনে গিয়ে ইয়াসমিনকে তোর থেকে চাইতে পারি। সেই কারণেই দূরে ছিলাম। এখন আমি একটা চাকরি পেয়েছি। সেই জন্য তোর সাথে যোগাযোগ করতে চাইছিলাম। তুই ভেবে দেখিস। আর এই ব্যাপারটার সাথে আমাদের বন্ধুত্ব থাকা না থাকার কিংবা তোর উপকার করার কোন সম্পর্ক নেই।”

কথাটা বলে জয়ই আগে সেখান থেকে চলে গেল। একেই তো জীবনে ঝামেলার অভাব নেই ইমদাদের তার উপরে আরো একটা নতুন ঝামেলা এসে জুটলো। এক ভয়ঙ্কর দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে গেল ইমদাদ। তাৎক্ষণিক মনে পড়ে গেল সাঈদের কথা।

সাঈদ যদি এই কথাটা জানতে পারে নির্ঘাত জয় কে খুঁজে বের করে যেখানে পাবে সেখানে গিয়ে পি'টি'য়ে রেখে আসবে। তবে ইমদাদের তো আগে সাঈদের কথা ভাবলে চলবে না। ইমদাদ কে ভাবতে হবে ইয়াসমিনের কথা, ইয়াসমিনের সুখের কথা।

সরদার বাড়িতে গেলে যে ইয়াসমিন কোনদিনও ভালো থাকবেনা এই ব্যাপারে তো ইমদাদ নিশ্চিত। আবার সাঈদের ভালোবাসাটাও সত্যি বলে মনে হয়। কিন্তু তবুও সব ভাবনা শেষে যে একটা কথাই বারবার ইমদাদের মাথায় ঘোরে। সাঈদের শরীরে করিম সরদারের র’ক্ত বইছে।

__________

সন্ধ্যের দিকে বাড়ি ফিরলো ইমদাদ। ঘরের দিকে যেতে যেতেই ইয়াসমিনকে বললো এক কাপ চা পাঠাতে। কলি তখন ইকবালকে পড়াচ্ছিল। দুদিন হলো নতুন একটা কাজ পেয়েছে কলি। সেটা হলো ইকবালকে পড়ানো। বেশ ভালোই সময় কাটে এতে। ছেলেটাও খুব বেশি দুষ্টুমি করে না।

ইয়াসমিন চা বানিয়ে কি ভেবে যেন চায়ের কাপটা কলির হাতে দিয়ে ইমদাদকে দিয়ে আসতে। কলি বলল যে ইকবালকে পড়াচ্ছে কিন্তু ইয়াসমিন তাও শুনলো না। ইকবালকে পড়ানোর দায়িত্বটা নিজে নিয়ে কলিকে একপ্রকার জোর করেই সেখান থেকে পাঠিয়ে দিল। কলি বুঝল না এতো জোড়াজুড়ির কি আছে। এক কাপ চা-ই তো দিয়ে আসার কথা বলেছে। একজন দিয়ে এলেই হয়।

কলি চায়ের কাপে ঘরে নিয়ে উঁকি দিতেই দেখলো ইমদাদ কোথাও নেই। গলা উঁচিয়ে ডাকলো ইমদাদ কে তবে কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। কলি একটু অবাকই হলো। উড়ে গেল নাকি ঘর থেকে! নাকি আবার কোথায় লুকিয়ে বসে আছে হয়তো কলিকে ভয় দেখাবে বলে! হতেই পারে। মানুষটার তো কোন বিশ্বাস নেই। মাথার তারও কাটা।

কলি ভাবল চলে যাবে। ইমদাদ যেখানে ইচ্ছে যাক। তবে যেইনা যেতে ধরলো অমনি বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। কলি পিছন ফিরে তাকাতেই দেখল ইমদাদ এই অসময়ে গোসল করে বেরিয়েছে। পরনে শুধু একটা ট্রাউজার। কোন টি শার্টও পড়েনি। দেখে তো মনে হচ্ছে কোনমতে শুধু গোসল করে বেরিয়েছে। গা মোছার সময়ও নেই তার। চুল দিয়েও টপটপ করে পানি ঝরছে। ইমদাদের এমন উন্মুক্ত শরীর দেখে কেমন যেন ঘাবড়ে গেল কলি। চটপট ইমদাদের দিকে পিঠ করে দাঁড়ালো। তাড়াহুড়ো করে বলল,

“তাড়াতাড়ি চা নাও। আমি ইকবাল কে পড়াতে যাব।”

ইমদাদ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“টেবিলে রেখে যা।”

ইমদাদের কথা মত কলি টেবিলেই রাখতে যেতে চাইলো। তবে তার জন্যও ইমদাদের দিকে ঘুরতে হবে। আপাতত আর অত কিছু না ভেবে কলি যেই না পিছনে ঘুরলো অমনি দেখল ওর ঠিক মুখোমুখি ইমদাদ দাঁড়িয়ে আছে। ঠাস করে কলির হাত থেকে চায়ের কাপটা পড়ে গেল। কলি নিজেই চমকালো। সেই সাথে ইমদাদও চমকে উঠে বলল,

“ভাঙলি কেন কাপটা? হাত থেকে পড়লোই বা কেন? কোন একটা কারণ তো দরকার।”

কলি আমতা আমতা করে বলল,

“এএএমনি পড়ে গেছে। আমি এখন আসছি।”

কথাটা বলে কলি চলে যেতে ধরলে ইমদাদ ওর হাত টেনে ধরে একটা হ্যাচকা টান দিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। কলির দুহাত তখন ইমদাদের দুই কাঁধে আর ইমদাদের দুহাত তখন কলির কোমরে। কলি কেঁপে উঠলো। ইমদাদের দিকে তাকিয়ে থাকার ক্ষমতাও হলো না। দু চোখ খিঁচে বন্ধ করে রাখলো।

ইমদাদ যেন এখন একটু একটু বুঝতে পারছে কলির এমন উদ্ভট আচরণের কারণ। ইচ্ছে করলো কলি কে আরেকটু বেশি বিরক্ত করতে।

কলির কানের কাছে মুখ নামালো। ইচ্ছে করে কলির গালে নিজের দাড়ির ঘষা লাগালো। কলি আরো একবার কেঁপে উঠে তোতলানো গলায় বলল,

“ছাড়ো আমায়। তুমি না বলেছিলে তোমার আমায় দরকার নেই। তাহলে আবার যখন তখন এভাবে জাপটে ধরো কেন? অসভ্য, চরিত্রহীন ছেলে কোথাকার।”

ইমদাদ কলির কানের কাছে মুখ নিয়ে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আমি যখন অসভ্যদের মতন আচরণ করি তুই তো আমাকে সভ্যতা শিখিয়ে দিতে পারিস। দু'চারটে চড় লাগিয়ে, গালাগালি করে তো দূরে সরে যেতে পারিস। কিন্তু তুই তো সেসব করিস না। তুই তো প্রশ্রয় দিস আমায়। তাহলে এখন আমায় একা চরিত্রহীন বানাচ্ছিস কেন? তুইও চরিত্রহীন তাহলে।”

কলি জোর গলায় বলল,

“আমি মোটেও চরিত্রহীন না। আমি কখনো তোমার কাছে নিজ থেকে গিয়েছি? সবসময় তুমি এগিয়ে এসে আমাকে ধরো। তোমার এই বিরাট একটা শরীরের সাথে আমি পারি!”

“তুই তো বোকা! আমি তোকে ধরলে যেমন তুই জমে যাস ঠিক তেমনই যদি তুই নিজে পাল্টা আমায় ধরিস তাহলে তা আমিও জমে যাব।”

কলি এবারে চোখ খুলে তাকালো ইমদাদের দিকে। মুখ ভেংচিয়ে বলল,

“তোমাদের যে কত লজ্জা আছে সেসব আমার জানা আছে। তোমরা তো সবসময় মেয়েদেরকে ছোঁয়ার ধান্দাতেই থাকো।”

কলি এই কথাটা বলতেই ইমদাদ নিজের আঙ্গুল কলির ঠোঁটের উপরে রেখে বলল,

“মেয়েদের কে না, বউদের ছোঁয়ার ধান্দায় থাকি।”

কলি নিজের ঠোঁটের উপর থেকে ইমদাদের আঙুলটা সরিয়ে বলল,

“হ্যাঁ ঠিক বলেছো। সে হোক নিজের বউ বা অন্যের বউ। বউ হলেই হলো। আমি জেনে গেছি তোমার শহরে যাওয়ার কেন এত তাড়া থাকে সব সময়। দেখা করতে যাও তো একজনের সাথে। কালকেও যাবে দেখা করতে তাই না?”

ইমদাদ ভ্রুঁ কুচকে বলল,

“তুই কি করে জানলি? আমার ফোন চেক করেছিস তুই? ছিঃ লুকিয়ে লুকিয়ে অন্যের ফোন চেক করতে লজ্জা করে না? বেয়াদব কোথাকার।”

কলি খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“অন্যের ফোন চেক করেছি নাকি আমি। তোমার ফোনই তো চেক করেছি।”

ইমদাদ চোখ ছোট ছোট করে কলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি তোর নিজের মানুষ নাকি? আমি তো তোর কেউ না। আমার ফোন চেক করার কোন অধিকার তোর নেই।”

হঠাৎ করে কলির তেজটা কেমন যেন কমে গেল। ইমদাদের কাঁধ থেকে হাতটা নামিয়ে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলল,

“ঠিক বলেছো। অধিকার নেই আমার। ইচ্ছে করে দেখিনি। যখন মেসেজ এসেছিল তখন ফোনটা আমার সামনে রাখা ছিল। চোখে পড়ে গেছে। তোমার আফসানা ম্যাসেজ দিয়েছিল।”

ইমদাদের খুব হাসি পেল কলির কথাটা শুনে। একবার ভাবল কলির ভুল ধারণাটা দূর করা দরকার। তবে পরক্ষণেই মনে হল কেন দূর করবে। যা ইচ্ছে ভাবুক তাতে ইমদাদের কি। বরং এই নিয়ে একটু বিরক্ত করা দরকার কলিকে।

“ও হ্যাঁ। কালকে আবার যেতে হবে দেখা করতে ওর সাথে। ব্যস্ত হয়ে গেছে আমার সাথে দেখা করার জন্য। কিচ্ছু করতে পারে না আমাকে ছাড়া।”

কলির রাগ তরতর করে বাড়লো। কে বলে কলির গায়ে জোর নেই। ইমদাদ কে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,

“তো বাড়ি ফিরেছো কেন? ওর কাছেই থাকতে। তোমাকে ছাড়া নিশ্চয় ঘুমোতেও পারে না রাতে। যাও যাও ওর কাছে গিয়ে ঘুমোও। ফালতু ছেলে কোথাকার।”

কথাটা বলে কলি চলে যেতে ধরলে ইমদাদ পিছন থেকে বলে উঠলো,

“শোন, আজ রাতেও দরকার পড়লে ছাদে গিয়ে ঘুমোস। ঘরে যেন ঘুমোস না। রাতে আফসানার সাথে কথা বলতে হবে। তুই থাকলে অসুবিধা হবে।”

থেমে গেল কলি। পিছন ফিরে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“এই ঘরেই ঘুমোবো আমি। এই বিছানায় তোমার পাশেই ঘুমোবো আমি। তোমার সমস্যা হলে তুমি অন্য ঘরে চলে যাও।”

“এটা আমার ঘর। আমি কেন যাব? তুই আসবি না এই ঘরে।”

কলি রাগে হিশহিশিয়ে বলল,

“এই ঘরেই আসবো আমি। এটা আমারও ঘর। ঘুমোনোর সময় যেন ঘরে কোন শব্দ না হয়। কথা বলার হলে বাইরে গিয়ে কথা বলবে।”

কথাটা বলে কলি চলে যেতে ধরলে ইমদাদ পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“ঠিক আছে। এই ঘরে ঘুমােলে কিন্তু সেদিনের মতো আবারো জড়িয়ে ধরে ঘুমোবো মনে রাখিস। মনে রাখিস কিন্তু।”

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প