অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ২৩

🟢

ইমদাদ কলি কে একটা বাটন ফোন কিনে দিয়েছে। একটা নতুন সিম কার্ডও এনে দিয়েছে। ইমদাদ বাড়িতে থাকলে তো ওর ফোন দিয়ে কাজ চলে যায়। কিন্তু ইমদাদ বাড়িতে না থাকলে যেন কারো সাথে যোগাযোগ করতে কোন অসুবিধা না হয় সেজন্যই এই ব্যবস্থা। বেশি দামি ফোন ইচ্ছাকৃতভাবে কিনে দেয়নি। কেননা অ্যান্ড্রয়েড ফোন হাতে পেলেই শেষে দেখা যাবে ইমদাদ বাড়িতে থাকা অবস্থাতেও ইমদাদকে ফেলে রেখে সম্পূর্ণ মনোযোগ ফোনের ওপরে দিয়ে রাখবে। সেটা তো আর ইমদাদ হতে দিতে পারেনা। ঝগড়া করার জন্য হলেও কলিকে প্রয়োজন।

ইয়াসমিনের সাথে সাঈদের যোগাযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। ইয়াসমিন আর ইমদাদের থেকে নিজের ফোনটা নেয়নি। ইমদাদ দিতে চেয়েছিল তবে ইয়াসমিন স্বেচ্ছায় আবার সেটা ফেরত দিয়েছে। ইমদাদও আর জোর করেনি ফোনটা দেওয়ার জন্য। আর ইমদাদের ফোনে কল করলে যে ইয়াসমিনের সাথে যোগাযোগ অসম্ভব সেটাও খুব ভালো করেই জানে সাঈদ। সেজন্য বাধ্য হয়ে কলি কে কল করেছিল। কলিকে বলতে পারছিলো না ইয়াসমিনকে ফোনটা দেওয়ার কথা। কেননা কলি যদি কারণ জিজ্ঞেস করে তাহলে কি বলবে।

এদিকে ইয়াসমিনের সাথে কথা বলতে চাওয়ার আগেই সাঈদ কলির থেকে আরেকটা খবর পেল। সেটা হলো ইমদাদ বাড়িতে নেই। হয়তো দু-একদিন পর বাড়ি ফিরবে। এই সুযোগটাই সাঈদ কাজে লাগাতে চাইলো। সাঈদ জানে ইমদাদের সামনে ইয়াসমিনের সাথে কথা বলা সম্ভব না। যদিও বা কথা বলার সুযোগ পেয়েও যায় তাও ইয়াসমিন ইমদাদের ভয়েই হয়তো কিছু বলতে পারবে না। তাই আগে গিয়ে আলাদাভাবে ইয়াসমিনের সাথে কথা বলে ওকে বোঝাতে হবে। রাজি করাতে হবে। যে করেই হোক ইয়াসমিনকে ইমদাদের বিরুদ্ধে নিয়ে যেতেই হবে। ইয়াসমিনকে পাওয়ার এই একটাই উপায় আছে এখন সাঈদের কাছে।

তাই দেরি না করে চলে এলো ইমদাদের বাড়ি। কলিং বেল বাজাতেই ভেতর থেকে ইয়াসমিন এসে দরজা খুলে দিল। দরজার সামনে সাঈদ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠলো ইয়াসমিন। ওকে দেখে মনে হচ্ছে কোথায় যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। হয়তো কলেজ যাবে।

“তুমি কেন এসেছো?”

ইয়াসমিনের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সাঈদের সরল স্বীকারোক্তি,

“তোমার জন্য।”

ইয়াসমিন খুব একটা পাত্তা দিলো না সাঈদের কথা। বরং ঘরের ভিতরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়ে বেশ স্বাভাবিক গলায় বল,

“কলিকে ডেকে দিচ্ছি আমি।”

ইয়াসমিন কথাটা বলে চলে যেতে নিলে সাঈদ ওর সামনে গিয়ে পথ আটকে দাঁড়ালো। ইয়াসমিন চমকে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে মৃদু বিরক্তিকর গলায় বলল,

“কি সমস্যা? বললাম তো আমি কলিকে ডেকে দিচ্ছি।”

“আমি তো বললাম তোমার জন্য এসেছি।”

“আমি কি আসতে বলেছিলাম?”

সাঈদ দুদিকে মাথা দাঁড়িয়ে না বোধক উত্তর জনাতেই ইয়াসমিন আবারো বলে উঠলো,

“তাহলে আমার জন্য কেন এসেছো? আমার তোমার সঙ্গে কথা বলার না কোন ইচ্ছে আছে আর প্রয়োজন। যদি কলির সঙ্গে কথা বলার থাকে তাহলে বলতে পারো। নয়তো চলে যাও। যদি ভাইয়া এসে তোমায় এখানে দেখে তাহলে কিন্তু সমস্যা হবে। আমি চাইনা অযথা কোন ঝামেলা হোক।”

“আসবেনা ও এখন। সেই খোঁজ নিয়েই আমি এসেছি৷ কিন্তু তুমি আমার সাথে এমন করছো কেন? আমি জানি ইমদাদ কে তুমি অনেক ভালোবাসো। কিন্তু তাই বলে আমার প্রতি কি বিন্দুমাত্র কোন মায়া জন্মায়নি তোমার মনে? তুমি শুধু একবার বলো তুমি আমায় ভালোবাসো, আমায় বিয়ে করতে চাও। আমি ইমদাদ কেন পুরো পৃথিবীর সাথে লড়াই করব শুধু তোমাকে পাওয়ার জন্য।”

ইয়াসমিন হাত উঠিয়ে সাঈদ কে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“কোন প্রয়োজন নেই আমার জন্য এত লড়াই করার। আমার জন্য এত কষ্ট না করে আমাকে বিরক্ত করা ছেড়ে দাও। তাহলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব তোমার কাছে সারা জীবন। আর দয়া করে আমার পথ ছাড়ো। কলেজ যেতে হবে আমার। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

কথাটা বলেই ইয়াসমিন সাঈদ কে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলে সাঈদ ওর হাত টেনে ধরল। একটানে আবার নিজের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে ইয়াসমিনের দুই বাহু চেপে ধরে বলল,

“অনেক অবহেলা সহ্য করেছি। এমন একটা মুহূর্তে কিন্তু আর অবহেলা সহ্য হবে না। বিয়ে দিয়ে দেবে তোমার ভাই অন্য কারো সাথে। তুমি পারবে অন্য কারো সাথে সংসার করতে?”

ইয়াসমিন এবারও বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,

“না পারার তো কিছু নেই। আমি জানি আমার ভাইয়া আমার জন্য যেটা ভালো হবে সেটাই করবে। আমার ভাইয়ার প্রতি আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে।”

নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না আর সাঈদ। ইমদাদের প্রতি ইয়াসমিনের এই তীব্র ভক্তি, বিশ্বাস আর ভালোবাসা একদমই সহ্য হচ্ছে না। এর কিঞ্চিৎ পরিমাণ ভালোবাসা যদি সাঈদের প্রতি থাকতো তাহলে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেত! তাই বলে এতটাই অযোগ্য সাঈদ ইয়াসমিনের ভালোবাসা পাওয়ার। রাগে দাঁত পিষে বলল,

“সারাক্ষণ খালি ভাইয়া ভাইয়া ভাইয়া ভাইয়া করে চেঁচাস কেন? আমাকে চোখে পড়ে না? আমার ভালোবাসা তোর চোখে পড়ে না? কেন বিয়ে করবি না আমাকে? কেন আমার সাথে সংসার করবি না? একবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতো। তোর মনে হচ্ছে আমি ছলনা করছি? আমার বুকের মাঝে যে তোলপাড় চলছে তুই টের পাচ্ছিস না সেগুলো? আমি যে তোকে ঠিক কতটা ভালোবাসি সেটা বোঝার মতন তোর বুদ্ধি নেই?”

ইয়াসমিন তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“এতোটুকুতেই তুমি থেকে আবার তুই তে চলে এলে! কোথায় গেলো তাহলে তোমার সম্মান? আমার যথেষ্ট বুদ্ধি আছে। সে জন্যই তোমাকে ভালোবাসার মতন ভুলটা আমি করবো না। আর একটা কথা শুনে রাখো, আমার ভাইয়াই আমার গোটা পৃথিবী। আমার পুরো পৃথিবীর কোন এক কোণাতেও তোমার কোন স্থান নেই। এখন তুমি যদি চাও যে আমার ভাবির ভাই হিসেবে তোমাকে আমি যতটুকু সম্মান করি ততটুকু যেন নষ্ট না হয় তাহলে দয়া করে আমার হাত ছেড়ে দাও।”

কলি তখন নিজের ঘরে শুয়েছিল। ইমদাদ বাড়িতে না থাকলে সময় কাটতে চায় না। আসলে এখন ইমদাদের সাথে ঝগড়া করা, মা'রা'মা'রি করা এসব একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনের নিয়ম হয়ে গেছে ঝামেলা করা। সেই নিয়মের যদি হেরফের ঘটে তাহলে তো সমস্যা হবেই।

শুয়ে শুয়ে কলি ভাবছিল যে ইমদাদ এখন কোথায়, কি করছে। নিশ্চয়ই আফসানা নামক মেয়েটার সাথে দেখা করতে গেছে। তাই হবে। কলির এসব ভাবনার মাঝেই সাঈদের কন্ঠ ভেসে এলো ওর কানে। কলি লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলো। সেই সাথে ভয়ও পেল। ভাবলো সাঈদ আবার ইয়াসমিনের সাথে কিছু করছে নাকি। ওকে আবার তুলে নিয়ে যাবে না তো! তাহলে তো ইমদাদ এসে কলিকে আচ্ছা মতো ঝাড়ি দেবে।

তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে কলি বসার ঘরে ছুটে এসে দেখলো সাঈদ ইয়াসমিনের দুই বাহু চেপে ধরে ঝাঁঝালো গলায় কি সব যেন বলে যাচ্ছে। প্রত্যুত্তরে ইয়াসমিনও বেশ কড়া কথাই শোনালো সাঈদকে। কলির মনে হলো ওদের দুজনকে থামানো দরকার।

তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গিয়ে সাঈদের বাহু টেনে ধরে বলল,

“ভাইয়া ছাড়ো ইয়াসমিন আপুকে। কি করছো? তুমি কি গুন্ডা নাকি যে এভাবে গুন্ডামি করছো?”

সাঈদ ছেড়ে দিল ইয়াসমিনকে। এদিকে কলি কে দেখে একটু অপ্রস্ত হয়ে পড়েছে ইয়াসমিন। অস্বস্তির মাঝেও যেন পরলো। সাঈদকে আর কিছু বলতে ইচ্ছে করলো না। কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কলি, তোমার ভাইকে ভালো করে বুঝিয়ে দাও বাড়ি বয়ে যেন আর গুন্ডামি না করে। আমি যদি এই খবরটা ভাইয়ার কানে দেই তাহলে কি হবে নিশ্চয় বুঝতেই পারছ। ভালোভাবে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দাও।”

কথাটা বলেই ইয়াসমিন আবারও সাঈদ কে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে সাঈদ আবারো হাত টেনে ধরল। তবে এবার আর সাঈদ রাগারাগি করল না। কঠিন কোন কথাও বলল না। বরং চোখমুখে ফুটে উঠলো অসহায়ত্ব।

তবে ইয়াসমিন মোটেও দুর্বল হলো না। নিজের চোখে মুখে কাঠিন্য ভাব ফুটিয়ে রাখল। সাঈদ ইয়াসমিনের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়িয়ে কাতর গলায় বলল,

“নিজের জন্ম, বংশ পরিচয় তো আর মুছে ফেলতে পারব না। আমি কি করবো বলতো যদি আমার শরীরে সরদার বংশের র’ক্ত থাকে? সে তো তোদের শরীরেও একই বংশের র’ক্ত। এখন আমার বাপ যদি করিম সরদার হয় আমি কি করবো? এতে কি আমার কোন হাত ছিল? তুই শুধু একবার বল আমি বংশ পরিচয়, সরদার বাড়ি সবকিছু ত্যাগ করবো। তোর এক কথাতে সব ত্যাগ করব আমি। নিজের নামের পাশে থেকে সরদার পদবীটাই সরিয়ে ফেলবো। তোর জন্য আমি শুধু সাঈদ হয়ে যাবো ইয়াসমিন। তোর সাঈদ। আমায় একটা সুযোগ দে।”

ভাইয়ের মুখ থেকে এমন অসহায়ের মতন বাক্যগুলো শুনে কলির দুচোখ ছল ছল করে উঠলো। সেই সাথে কলি মনে মনে এটাও ঠিক করলো ইমদাদ বাড়ি ফিরলে দরকার পড়লে ওর পায়ে পড়ে যাবে। তবুও ওকে রাজি করাবে যেন ইয়াসমিনের বিয়েটা সাঈদের সাথে দেয়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সাঈদের করুন বাক্য শোনার পরও ইয়াসমিনের মাঝে বিন্দু পরিমাণ কোন দুর্বলতা দেখা গেল না। বরং তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“তুমি হয়তো ভুলে গেছো কিন্তু আমার এখনো মনে আছে। কোন একদিন ঠিক এভাবেই তোমার বড় ভাই আমার বাবার থেকে আমার বোনকে চেয়ে নিয়ে গিয়েছিল। পরিণতি কি হয়েছিল নিশ্চয়ই জানো? বিশ্বাস করো আমি এতটা সাহসী নই যে সেই সব কিছু ভুলে গিয়ে তোমার হাত ধরবো। আর সব থেকে বড় কথা আমি তোমাকে ভালোবাসি না।”

“এভাবে বলিস না। কষ্ট হয় আমার। আচ্ছা মানলাম আমাকে ভালোবাসিস না। তোর ভাই যার সাথে বিয়ে ঠিক করবে তাকেও তো নিশ্চয়ই হুট করে ভালোবাসাতে পারবি না। তবু তো তাকে বিয়ে করতে চাইছিস। তাহলে তার বদলে আমাকেই বিয়ে কর। বিয়ের পর ভালোবাসিস।”

সাঈদের ঘুরে ফিরে একই ভালোবাসার প্রলাপগুলো ইয়াসমিনের আর ঠিক সহ্য হচ্ছে না। কিংবা হয়তো ভয় পাচ্ছে যদি দুর্বল হয়ে পড়ে। ইয়াসমিন বুঝলো সাঈদ কে এখন কোন কিছু বলেই লাভ হবে না। তাই রাগান্বিত গলায় কলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কলি, যদি তোমার ভাইয়ের ভালো চাও তাহলে ওকে বেরিয়ে যেতে বলো। আর তোমাকেও একটা কথা বলছি। যদি তোমার তোমার ভাইয়ের সাথে দেখা করার কিংবা কথা বলার ইচ্ছে থেকে থাকে তাহলে ওকে এই বাড়িতে ডাকবে না। বাইরে গিয়ে দেখা করে আসবে। তোমার ভাইয়ের চরিত্র দোষ আছে। মেয়েদের থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। যখন তখন হাত ধরে টানাটানি শুরু করে। একটা মেয়ে ক্রমাগতভাবে বলছে যে সে তাকে ভালোবাসে না কিন্তু তারপরেও তিনি নিজের ভালবাসার গল্প শুনিয়ে মেয়েটাকে অস্বস্তিতে ফেলছে। কথাটা তুমি আর তোমার ভাই মাথায় রেখো। নাহলে আমাকে আমার ভাইয়ের কানে কথাটা তুলতে হবে।”

জোর করে সাঈদের থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর আর প্রয়োজন পড়লো না। বরং সাঈদের হাতের বাঁধনটা আপনা আপনি হালকা হয়ে গেল। ছেড়ে দিলে ইয়াসমিনের হাতটা। সাঈদের থেকে ছাড়া পেতেই ইয়াসমিন নিজের ঘরে চলে গেল। ঘরে গিয়ে নিজের ব্যাগটা নিয়ে এসে স্যান্ডেল পরে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।

মুহূর্তের মাঝে সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। সাঈদের আত্মবিশ্বাস মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে গেল ইয়াসমিন। কত ভরসা করে এসেছিল আজ সাঈদ ইয়াসমিনের কাছে। সাঈদ কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি যে ইয়াসমিনের বিয়ে হয়ে যাবে শুনেও ও সাঈদ কে ফিরিয়ে দেবে। সাঈদ তো ভেবেছিল ইয়াসমিনের মনে ওর প্রতি একটু হলেও ভালোবাসা আছে। কিন্তু আজ তো মনে হলো সে সব মিথ্যে ছিল। বরং ইয়াসমিন ঘৃণা করে সাঈদকে।

________

যেহেতু আফসানা অসুস্থ তাই আর তেমন কোন কাজ হতো না অফিসে। সেইজন্য ইমদাদ আবার বাড়ি ফিরে এলো। ঘরে এসে দেখল কলি বিছানার ওপর আধশোয়া হয়ে বসে আছে। হাতে একটা বই। ইমদাদ কে ঘরে ঢুকতে দেখে একবার তাকালো ওর দিকে। ইমদাদও তাকালো। চোখাচোখি হলো দুজনের। তবে ইমদাদ খেয়াল করলো কলির চোখ দুটো জ্বলছে। লাল টকটকে হয়ে আছে। ইমদাদ ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না যে আবহাওয়া গরম হওয়ার কারণ টা কি। ইমদাদের যতদূর মনে আছে ও তো কিছু করেনি। কথাই তো হয়নি সকাল থেকে।

তবে ইমদাদ আগেই কিছু বলল না। আগুনে ঘি ঢালার কোন মানেই হয় না। যদি সত্যিই কলির ইমদাদের প্রতি কোন রাগ থেকে থাকে তাহলে এখন না হোক দু মিনিট পরে হলেও সেই রাগ ঝাড়বেই ঝাড়বে। আলমারি থেকে টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে নিয়ে ইমদাদ ওয়াশরুমের দিকে যেতে ধরলো। আর তখনই পিছন থেকে ভেসে এলো কলির গম্ভীর কণ্ঠস্বর।

“সব সময় তো শুধু অভিযোগ করো আমি, আমার ভাই, আমার বংশই নাকি তোমাদের সবার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছো তুমিও আমার আর আমার ভাইয়ের জীবন নষ্ট করে দিয়েছো?”

থেমে গেল ইমদাদ। ঘাড় ঘুরিয়ে কলির দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বলল,

“কিভাবে নষ্ট করলাম? তোদের কোন পাঁকা ধানে আমি মই দিয়েছি?”

কলি এবার একটা পাকাপোক্ত সুযোগ পেয়ে গেল ইমদাদের সাথে ঝগড়া বাঁধানোর।বিছানা থেকে নেমে ইমদাদের দিকে তেড়ে এসে রাগান্বিত গলায় বলল,

“ছোট বাচ্চা তুমি? তুমি বুঝতে পারো না কিভাবে কার জীবন নষ্ট করেছো? আমাকে জোর করে বিয়ে করেছো, আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করেছো। আবার বিয়ে যখন করেই ফেলেছো সংসার করার কোন ইচ্ছে নেই তোমার। বাইরে প্রেমিকাকে রেখে দিয়েছো। দুদিন পরপর তার সাথে দেখা করতে যাও। কে জানে আরো কি কি করে আসো।”

কলি কথাটা বলতেই ইমদাদন

আঙুল উঁচিয়ে কলিকে শাসিয়ে বলল,

“মুখ সামলে কথা বল৷ তোকে এতটা অধিকার দেইনি আমি যে তুই আমার চরিত্রের উপর আঙুল তুলতে পারিস।”

“অবশ্যই পারি। আইনত আমি এখনো তোমার স্ত্রী। তোমার প্রতিটা কর্মকান্ডের উপর প্রশ্ন তোলার অধিকার আছে আমার। আর তুমি আমাকে জবাব দিতেও বাধ্য। সে যাই হোক আমার কথায় পরে আসছি। আমার ভাইয়ের জীবনটা এখন নষ্ট করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছো কেন? কি সমস্যা তোমার বোনের সাথে বিয়ে দিলে? আমার ভাই কোন দিক দিয়ে অযোগ্য ইয়াসমিন আপুর? আমার ভাইয়ের থেকে ভালো পাত্র তুমি খুঁজে পাবে?”

“খুঁজে পেয়েছি আমি তোর ভাইয়ের থেকে ভালো পাত্র। যাই হোক। তোকে এত কৈফিয়ত কেন দিচ্ছি আমি। তুই এতটাও গুরুত্বপূর্ণ কেউ না যে তোকে সবকিছুর জবাব দিতে হবে।”

কথাটা বলে ইমদাদ আবারো ওয়াশরুমের দিকে যেতে ধরলে কলি ইমদাদের বাহু টেনে ধরে ওর দিকে ঘুরিয়ে চেঁচিয়ে উঠে বললল,

“আমাকে জবাব দেবে না তো কাকে জবাব দেবে? আফসানাকে? ঘরে বউ রেখে প্রেমিকার সঙ্গে গিয়ে দেখা করে আসে সে আবার আমার ভাইয়ের খুঁত ধরছে। তোমার থেকে তো আমার ভাই হাজার গুণ ভালো শুধুমাত্র তোমার বোনকেই ভালোবাসে। প্রথম এবং শেষবারের মতন বলছি তোমার বোনের সাথে আমার ভাইয়ের বিয়েটা দিয়ে দাও। নয়তো খুব খারাপ হয়ে যাবে।”

ইমদাদের মনে হলো এবার কিছু একটা বলা দরকার। মেয়েটার অতিরিক্ত সাহস বেড়েছে। এতটাই সাহস বেড়েছে যে ইমদাদকে ভয় দেখাচ্ছে। আগেই কিছু বলল না। শুধু সূচালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কলির দিকে। একটু ভয় পেল কলি। ইমদাদ এবারে এক পা দু পা করে কলির দিকে এগোতে লাগলো। কলি ঠিক করেছিল ভয় পাবে না, কিন্তু ভয় পেল ইমদাদকে নিজের দিকে এগোতে দেখে। কলি পেছাতে পেছাতে সাবধানী গলায় বলল,

“একদম এগিয়ে আসবে না। ভয় পাচ্ছি না আমি।”

“ভয় না পেলে স্থির হয়ে দাঁড়া। পিছিয়ে যাচ্ছিস কেন?”

কলি তোতলানো গলায়,

“তততো তুমি এগিয়ে এলে আমি পিছাবো না? নইলে তো গায়ের উপর উঠে যাবে। তুমি থেমে যাও আমিও থেমে যাবো।”

কলি কথাটা বলতেই ‘আহ’ করে চেঁচিয়ে উঠে বিছানায় পড়ে গেল। খেয়ালই করেনি যে কলির কাছে আর পেছনের মতন জায়গা নেই। কলি কে বিছানা থেকে উঠতে দিলো না ইমদাদ। বরং নিজে কলির উপরে ঝুকে গিয়ে দুহাতের মাঝখানে কলিকে বন্দী করে বলল,

“তোর দৌড় এত দূর অব্দিই। আমি তোকে প্রথম এবং শেষবারের মতন বলছি ইয়াসমিন আর সাঈদের বিয়ে নিয়ে দ্বিতীয়বার তুই আমাকে কিছু বলবি না। বউ তুই আমার। সেই জন্য ছেড়ে দিলাম। আর বাকি রইল প্রেমিকার কথা। ঘরের বউ ভালো না বাসলে তো প্রেমিকার কাছে ছুটতে হবেই তাই না?”

সব ঠিক ছিল কিন্তু এই প্রেমিকার প্রসঙ্গটা উঠতেই আবারো কলির মাথাটা গরম হয়ে গেল। রাগের দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,

“তাহলে বাড়ি ফিরেছিস কেন? প্রেমিকার কাছেই যা। ভালোবাসা দিয়ে একেবারে সব ভরিয়ে দেবে।”

ইমদাদ যেই না কিছু বলতে চাইলো অমনি ওর ফোনটা বেজে উঠলো। সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“বেঁচে গেলি। নয়ত এখানেই কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলতাম আজ।”

কথাটা বলে ফোনটা বের করে দেখলো স্ক্রিনে আফসানা নামটা ভেসে উঠেছে। ইমদাদের ইচ্ছে হলো কলিকে আরেকটু বিরক্ত করার। ফোনের স্ক্রিনটা কলির দিকে ঘুরিয়ে বলল,

“এই দেখ আফসানা কল করেছে। আমার সাথে কথা না বলে এক মুহূর্ত থাকতে পারে না। দাঁড়া ওর সাথে একটু কথা বলে নেই।”

কথাটা বলে ইমদাদ কলটা রিসিভ করতে নিয়েও থেমে গেল। কলির দিকে তাকালো। কলি তখনও বিছানায় পড়ে আছে। ইমদাদ হাত ধরে কলি কে টেনে তুলে জোর করে দরজার দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল,

“আফসানার সাথে কথা বলবো আমি। তুই ঘরে থাকলে সমস্যা হবে। বেরিয়ে যা।”

কলি বেরোতে চাইলো না তবে ইমদাদ বের করে দিল। কলিকে বের করে দিয়ে মুখের উপর ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। কলি বাইরে থেকে অনেক চেঁচালো, গালাগালি করল, দরজায় ধাক্কাধাক্কিও করল কিন্তু কোন লাভ হলো না। কলির মনটা আনচান আনচান করছে। কে জানে কি কথা বলছে ভেতরে দুজন।

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প