অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ২৭

🟢

রাতে ঘুমোতে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল কলির। সেজন্য ভেবেছিল সকালে ঘুম থেকেও দেরি করে উঠবে। তবে কলির সেই ইচ্ছে আর পূরণ হলো না। সকাল ছয়টার দিকে ওর কানে ইমদাদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। জোরে জোরে ডাকছে। কলি বাধ্য হয়ে টেনে চোখদুটো খুলে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কি হয়েছে?”

“কিছুই হয়নি। হাত মুখ ধুঁয়ে আয়। এক জায়গায় যাবো।”

“আরেকটু ঘুমিয়ে নেই তারপর যেখানে যাওয়ার যাব।”

ইমদাদ শুনলো না কলির কথা। জোর করেই টেনে তুলে বাথরুমে পাঠালো।

কলি কে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সরদার বাড়ির সামনে এলো ইমদাদ। নিজের বাড়িটা দেখে কলির অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। এত সকাল সকাল ওকে এখানে কেন নিয়ে এলো ইমদাদ? আবার নতুন করে কোন ঝামেলা করবে নাকি? নাকি কলি কে এই বাড়িতে রেখে যাবে? নিশ্চয়ই তাই হবে। অবশ্য ঠিকই আছে। এটাই হওয়ার কথা। কলি তো নিজেই সারাদিন আগ বাড়িয়ে বলে যে থাকবে না ইমদাদের বাড়িতে। চলে যাবে। এজন্য এখন ইমদাদ নিজেই লাথি দিয়ে বের করে দিল।

কলির অসহায় মুখটা দেখে ইমদাদ বুঝতে পারলো ওর মনের ভেতরে চলতে থাকা কথাগুলো। সেইজন্য ওকে আশ্বস্ত করে নিজেই বলল,

“চিন্তা করিস না। তোকে রেখে যেতে আসিনি এখানে। একটা কাজে এসেছি। চল ভিতরে যাই।”

কথাটা বলে ইমদাদ বাড়ির ভিতরে পা বাড়াতে ধরলে কলি ওর হাতটা টেনে ধরে ভয়ার্ত গলায় বলল,

“যেও না ইমদাদ ভাই। অযথা অশান্তি বাড়বে। চলো বাড়ি ফিরে যাই।”

“ভয় পাচ্ছিস কেন? নিয়ে যাবো তো তোকে ওই বাড়িতে। আর আমি আছি তো। কিসের ঝামেলা হবে?”

“তুমি আছো জন্যই তো ভয় হচ্ছে। আমি একা এলে হয়তো ঝামেলা হতো না। যেও না ভেতরে।”

ইমাদাদ শুনলো না কলির কথা। ওর হাত ধরে টেনে জোর করে ভিতরে নিয়ে গেল। অনেকগুলো দিন পর কলি আবার নিজের বাড়িতে পা রাখল। সদর দরজায় পা রাখতেই বিশাল বড় বসার ঘরটা চোখে পড়ল কলির। কলি জানে বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য এতক্ষণে উঠে পড়েছে। এত দেরি অবধি ঘুমোনোর অভ্যাস সরদার বাড়িতে কারো নেই। ওইতো সোফায় নিজের বাবা, চাচা, দাদা সবাই বসে আছে।

কলির একবার ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে সবার সাথে কথা বলতে। পরক্ষণেই আবার মনে পড়ে গেল করিম সরদারের বলা কথাগুলো। মুহূর্তের মাঝে আবার ঘৃণা তৈরি হলো মনের মাঝে নিজের বাড়ির লোকদের প্রতি।

বসার ঘরের সোফায় বসে তখন কামাল সরদার তার ছেলে আর নাতিদেরকে নিয়ে চা খাচ্ছেন আর গল্প গুজব করছেন। এর মাঝে দরজায় দাঁড়ানো ইমদাদ আর কলির দিকে দৃষ্টি গেল তার। মুহূর্তের মাঝে ওনার দু চোখ রাগে জ্বলজ্বল করে উঠলো। চায়ের কাপটা সামনে থাকা ছোট টেবিলটার উপরে রেখে ওদেরকে উদ্দেশ্য করে রাগান্বিত গলায় বলল,

“তোমরা আমার বাড়িতে পা রেখেছো কোন সাহসে?”

একযোগে সবার দৃষ্টি দরজার দিকে গেল।

যেহেতু ওদেরকে সবাই দেখেই ফেলেছে তাই ইমদাদ ভাবলো আর দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে কোন কাজ নেই। কলি কে নিয়ে ভিতরে আসতে আসতে সবাইকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিল। তবে আলাদা করে সালাম দিলো করিম সরদার কে উদ্দেশ্য করে।

“আসসালামু আলাইকুম শ্বশুর আব্বা। ভালো আছেন তো? শরীর স্বাস্থ্য ঠিক আছে তো?”

শ্বশুর আব্বা ডাকটা শুনতেই করিম সরদারের সর্বাঙ্গে যেন আগুন জ্বলে উঠলো। তেঁতে উঠে বললেন,

“এই বেয়াদব ছেলে, কে তোমার শ্বশুর? আমি কারো শ্বশুর না।”

“তাহলে কে চাচা?”

“আমি তোমার কেউ না। ভুলেও আমাকে শ্বশুর, চাচা এসব নামে ডাকবে না। আর কোন সাহসে তোমরা এসেছো আমার বাড়িতে? বেরিয়ে যাও এখান থেকে।”

কলি ভয়ে জড়োসড় হয়ে ইমদাদের পিছনে গিয়ে লুকোলো। আগে থেকেই এই মানুষগুলোকে দেখে ভয় পেত। তবে এখন যেন আরেকটু বেশি ভয় হচ্ছে। কলিকে ভয় পেতে দেখে ওর হাতটা আরেকটু শক্ত করে ধরল ইমদাদ। তারপর কামাল সরদার কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“দেখুন সম্মানিত কামাল সরদার মানে আমার দাদু, আমি এখানে কোন ঝামেলা করতে আসিনি। জামাই হওয়ার সম্মান আদায় করতেও আসওনি। আমি একটা শুভ সংবাদ দিতে এসেছি আপনাদের।”

কামাল সদর কপাল কুঁচকে বললেন,

“কিসের শুভ সংবাদ? তুমি আবার কোন শুভ সংবাদ আনতে পারো নাকি!”

“ঠিক আছে তাহলে ধরে নিন অশুভ সংবাদ। কিন্তু তবুও শুনুন। আমার বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়ের দিন তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। হলে সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের কে জানিয়ে দেবো। আসলে আপনারা তো আমার পরম আত্মীয় সেজন্য আগেভাগে জানিয়ে রাখলাম। বিয়েতে কিন্তু অবশ্যই আসতে হবে। কোনরকম কোন বাহানা করলে চলবে না। দরকার পড়লে যেদিন আপনাদের কারো ব্যস্ততা থাকবে না সেই দিনই আমি বিয়ের তারিখটা ঠিক করবো।”

ইমদাদের দেওয়া সংবাদটা সত্যিই ভালো লাগলো কামাল সরকারের। যাক একটা আপদ নিজে নিজেই রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ালো। ওনাদের কষ্ট করে কিছুই করতে হলো না।

এদিকে রান্নাঘর থেকে ইমদাদের কণ্ঠস্বর পেয়ে শাম্মি বসার ঘরে এলেন। ওনাকে দেখে কলি আর নিজেকে আটকাতে পারল না। বাকিরা যেমনই হোক না কেন ওর মা তো কিছু করেনি। এগিয়ে গেল শাম্মির দিকে। শাম্মি কে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“ভালো আছো মা?”

কোনো উত্তর দিলেন না শাম্মি। ওনার থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে কলি ওনাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,

“চুপ করে আছো কেন মা? কথা বলবে না আমার সাথে?”

শাম্মি চুপচাপ কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার পর জিজ্ঞেস করলো,

“তুই খুব সুখে আছিস তাই না? খুব শান্তিতে সংসার করছিস ইমদাদের সাথে? খুব ভালো আছিস তুই তাই না?”

“হ্যাঁ মা। আমি ভালো আছি। চিন্তা করো না তুমি আমাকে নিয়ে।”

হঠাৎ করেই শাম্মির কি হলো কে জানে। মেয়ের দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অনুরোধের স্বরে বললেন,

“এই বাড়িতে ফিরে আয় মা। কোন অশান্তি হবে না। ওই ছেলেটা ভালো না। ওর জন্য এত অশান্তি। আমি তোকে বলছি ফিরে আয় তোর নিজের বাড়িতে। শাহিনকে বিয়েটা করে নে। সারা জীবন আমার চোখের সামনে থাকতে পারবি তুই। আমাকে দেখতে পারবি। যখন ইচ্ছে হবে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরতে পারবি।”

কলি তড়িৎ গতিতে দু দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“কি আজেবাজে কথা বলছো মা। আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আমি ইমদাদ ভাইয়ের সাথে ভালো আছি।”

“দরকার নেই ওর সাথে ভালো থাকার। তুই এই বাড়িতে চলে আয়। আমি বলছি সব ঠিক হয়ে যাবে। তোর বাবা দাদু কেউ কিছু বলবে না। তুই শুধু শাহিনকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যা। তুই শাহিনের সাথে অনেক ভালো থাকবি।”

শাম্মি আরো কিছু বোধহয় বলতেন। তবে ইমদাদ ওনাকে সেই সুযোগটা দিলােনা। ওনার হাতের মুঠোয় থাকা কলির হাতটা বের করে কলি কে নিজের দিকে টেনে নিল। কলি কে আড়াল করে দাঁড়িয়ে শাম্মির দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“আপনার এই নোংরা খেলাটা বন্ধ করুন। কলি বোকা সেজন্য আপনার আসল রূপটা বুঝতে পারে না। কিন্তু ইমদাদের চোখে ফাঁকি দিতে পারবেন না আপনি। কার রাগ কার উপর ঝাড়ছেন সেই হুঁশ আছে? এমন একটা মেয়ের উপর প্রতিশোধ নিতে চাইছেন যে আপনাকে নিজের মায়ের থেকেও বেশি ভালোবাসে। বন্ধ করুন আপনার এই নোংরামি।”

হঠাৎ করে শাম্মির অভিব্যক্তিতে বদল ঘটলো। তিনি নিজেও পাল্টা রাগী গলায় ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোমার সাহস কি করে হলো আমার সম্বন্ধে আজেবাজে কথা বলার। আমার মেয়ের মাথায় আমার নামে বাজে ধারণা ঢোকাচ্ছো?”

“চিন্তা করবেন না। ওর মাথায় কিছু ঢোকাতে চাইলেও ঢোকবে না। ও এতটাই সহজ সরল। তবে আমি আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি আপনি যদি আর দ্বিতীয়বার ওকে এই কথাগুলো বলেছেন খুব খারাপ হয়ে যাবে। ও আমার কাছে আছে, আমার কাছেই থাকবে।”

শাম্মি জোর গলায় বললেন,

“থাকবে না ও তোমার কাছে। আমার মেয়ে আমার কথা শুনবো। কলি, তুই শুনবি না আমার কথা? দেখ তোর সামনে আমার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছে। তুই চলে আয় মা। শাহিনের সাথে বিয়ে হলে তুই অনেক ভালো থাকবি। আমি তোর মা। আমার থেকে বেশি ভালো তোর আর কেউ চাইতে পারবে না।”

ইমদাদ কে কিছু বলতে হলো না। কলি নিজেই ছলছল দৃষ্টিতে শাম্মির দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি কেমন ভালো চাইলে আমার মা যে শাহিনের সাথে বিয়ে দিতে চাইছো? তুমি জানানো শাহিন কেমন ছেলে? আর ইমদাদ ভাইই বা হঠাৎ আজ তোমার সম্বন্ধে এই কথাগুলো কেন বলল? তোমার কোন রূপ আমি বুঝি না? তোমরা সবাই আর কত মিথ্যে বলবে আমাকে? আর কত কিছু লুকোবে তোমরা আমার থেকে?”

স্তব্ধ হয়ে গেলেন মেয়ের এমন কথা শাম্মি। কলি ওনার থেকে জবাবদিহি চাইছে! কলি ওনাকে পাল্টা প্রশ্ন করছে ভাবতেই পারছেন না। এই কদিনের মাঝে কলি এতটা বদলে গেল!

শাম্মির এসব ভাবনার মাঝে ইমদাদ বলে উঠলো,

“ভাবছেন তো যে মেয়ের এতো অধঃপতন কি করে হলো? আসলে আমার সাথে থাকতে থাকতে আপনার মেয়ের বুদ্ধি ধীরে ধীরে খুলছে। আর যেদিন একেবারে বুদ্ধি খুলে যাবে সেদিন ও বুঝতে পারবে যে আপনি ঠিক কতটা নিচু মন মানসিকতার মানুষ। যে আসল অপরাধী তাকে শাস্তি দেওয়ার তো ক্ষমতা নেই। প্রতিশোধের নেশায় পড়ে আছেন একটা নির্দোষ মেয়ের পেছনে। না নিজের স্বামীর কিছু করতে পেরেছেন, না নিজের সতীনের কিছু করতে পেরেছেন। আসলে আপনার সমস্যাটাই জটিল। আপনি আপনার মনের মাঝে এমন এক প্রতিশোধের ছক এঁকে রেখেছেন যার কোন যৌক্তিকতাই নেই। ফালতু মহিলা। চল কলি।”

কথাটা বলে কলির হাত ধরে টানতে টানতে জোর করে নিয়ে চলে গেল। তব্দা খেয়ে রইলেন শাম্মি। ইমদাদ ওনাকে এভাবে অপমান করে গেল অথচ ওনার মেয়ে একটা কথাও বলল না ইমদাদকে।

বিজ্ঞাপন

বাড়ির বাকি কেউও ওনাকে কিছু বলল না। সবাই যে যার কাজে চলে গেল। রোকসানা শাম্মির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। রোকসানা ভেবেছিল কিছু বলবে না। তবে আবার কিছু না বলে থাকতেও পারলো না। শাম্মির দিকে এগিয়ে এসে একটু খোঁচা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বললেন,

“ধরা পড়ে গেলে তো। আমি জানতাম এটা হওয়ারই ছিল। আর কেউ না জানলেও জানাে তো ভাবি আমি এটা খুব ভালোভাবেই জানতাম যে তুমি কলির ভালো চাও না। আর সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত কবে হয়েছিলাম জানো? সেদিন যখন শাহিন কলির ঘরে ঢুকে ওর সাথে অসভ্যতামি করার চেষ্টা করছিল আর তুমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে চুপচাপ দেখছিলে সবটা। তবে তুমি বোধহয় খেয়াল করোনি যে তোমার পেছনে আমিও দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন তোমায় কিছু বলতে পারিনি। তার কারণ সাঈদকে ডাকতে গিয়েছিলাম। নয়তো ধরা তো তুমি সেদিনই পড়ে যেতে বাড়ির সবার কাছে।”

শম্পা চমকে তাকালো রোকসানের দিকে। এত বড় একটা ব্যাপার ধরতে পারলেন না। সেদিন তবে ঘরের মাঝে তামাশা দেখতে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে ওনার পেছনে যে রোকসানা দাঁড়িয়েছিল সেই ব্যাপারে খেয়ালই করেননি।

রোকসানা আর কথা বাড়ালো না। ঠোঁট বাকিয়ে হেসে চলে গেল সেখান থেকে। যেন কোন এক বিরাট যুদ্ধ জয় করে ফেলেছে। দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে শম্পা। আজ সবার কাছে তিনি যেন হেরে গেলেন। ধীরে ধীরে সবাই জেনে যাচ্ছে তার আসল রূপটা। ধীরে ধীরে সবাই জেনে যাচ্ছে যে কলির প্রতি দেখানো তার ভালোবাসাটা সত্যি না। সেই সবই নাটক।

_________

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষে তখন যে যার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে। হঠাৎ করে সদর দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দেওয়ার শব্দ হলো। ইমদাদ তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বাড়িতে তখন ইমদাদ বাদে ইয়াসমিন আর কলি আছে৷ ওরাও এলো।

ইমদাদ দরজাটা খুলতেই দেখল সামনে সাঈদ দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখের একেবারে বেহাল দশা করেছে ছেলেটা। দেখে মনে হচ্ছে বোধহয় ঘুম হয়নি ঠিকঠাক করে অনেকদিন। চুলগুলো এলোমেলো। জামা কাপড়ে ধুলো ময়লা লেগে আছে। চোখে মুখে এক আকাশ উদ্বিগ্নতা। দুচোখ আবার টকটকে লাল রং ধারণ করেছে। সেখানে যেন হালকা হালকা জলের দেখাও পাওয়া যাচ্ছে। সাঈদের এই অবস্থা দেখে ইমদাদ চমকে উঠে বলল,

“কি হয়েছে তোর?”

সাঈদের চোখ গেল ইমদাদের পিছনে দাঁড়ানো ইয়াসমিন এর দিকে। ইমদাদের প্রশ্নটা যেন ওর কানেই যায়নি। ইমদাদ কে পাশ কাটিয়ে ইয়াসমিনের দিকে ছুটে গিয়ে অনুনয়ের স্বরে বলল,

“দয়া কর ইয়াসমিন। এই বিয়েটা করিস না। বিশ্বাস কর আমি বাঁচবো না। তুই কেন ভয় পাচ্ছিস বলতো? কি করবে ইমদাদ। ও তোকে মা'র'তে পারবে না। আমাকেও মা'র'তে পারবে না। তুই শুধু একবার বল তুই আমার সাথে যাবি। আমি কারোর পরোয়া করবো না। এই মুহূর্তে তোকে এখান থেকে নিয়ে চলে যাব।”

ইয়াসমিন ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো ইমদাদের দিকে। দেখলো ইমদাদ বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাঈদের দিকে। ইয়াসমিনের খুব ভয় হলো। কে জানে কখন ইমদাদ আবার রেগে যায়। কম্পিত গলায় সাঈদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“দয়া করে চলে যাও তুমি এখান থেকে। তোমার সাথে আমি যাব না। আমি তো এর আগেও বলে দিয়েছি তোমায়।”

সাঈদ মানলো না ইয়াসমিনের কথা। আবারো আকুতি ভরা কন্ঠে বলল,

“ফিরিয়ে দেস না আমায় ইয়াসমিন। আজ যদি তুই আমায় ফিরিয়ে দিয়েছিস তাহলে কিন্তু আর কখনো দেখতে পাবি না আমায়। তুই কেন বুঝতে চাইছিস না বলতো যে আমার ভালোবাসাটা সত্যি! আমার অবস্থা দেখ। তোর জন্য আমার কি অবস্থা হয়েছে। তুই ইমদাদের ভয়ে আছিস তো? ভাবছিস তুই আমার সাথে যেতে চাইলে ও কি না কি করবে? কিচ্ছু করতে পারবে না।”

সাঈদ ইয়াসমিনকে কথাটা বলে এবার ইমদাদের দিকে তেড়ে গিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,

“তুই ওকে ভয় দেখিয়েছিস তাই না? কেন আমার জীবনটা শেষ করে দিচ্ছিস? শুধু আমার না, ইয়াসমিনের জীবনটাও শেষ হয়ে যাবে। বুঝতে পারছিস না তুই? এই তোর বোনের প্রতি ভালোবাসা? ভালোভাবে বলছি যেতে দে আমাদেরকে।”

ইমদাদ বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“যদি ইয়াসমিন যেতে চায় তবে নিয়ে যা। আমি বাঁধা দেবো না। দেখ আমি দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি। তোকে কথা দিচ্ছি আমি কোন ঝামেলা করবো না। কিন্তু ইয়াসমিনকে চাইতে হবে। যদি ইয়াসমিন তোর সাথে যেতে চায় তবে যা।”

সাঈদ সন্দেহী গলায় বলল,

“সত্যিই?”

“হ্যাঁ। সত্যি কথা দিচ্ছি তোকে যদি ইয়াসমিন যেতে চায় তোর সাথে আমি বাঁধা দেব না। তুই সেদিন আমায় চ্যালেঞ্জ করেছিলি না যে আমার বোন আমার কথার অবাধ্য হয়ে নাকি তোর সাথে চলে যাবে? তো ওকে নিয়ে যা।”

একটা আশার আলো খুঁজে পেল সাঈদ। যেহেতু ইমদাদ বলেই দিয়েছে যে বাঁধা দেবে না তাহলে এবারে হয়তো ইয়াসমিন রাজি হবে। আবারো ইয়াসমিন কে গিয়ে বলল,

“এই ইয়াসমিন শুনলি ইমদাদ কিছু করবে না। এবার তো আর কোন ভয় নেই। চল আমরা আজই বিয়ে করে নেব।”

কথাটা বলে সাঈদ ইয়াসমিনের হাত ধরে ওকে নিয়ে যেতে ধরলে ইয়াসমিন এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে রাগী গলায় বলল,

“কি পাগলামো শুরু করেছো তুমি? আমি কি তোমাকে কখনো বলেছিলাম ভাইয়া রাজি হলে আমি তোমার সাথে যাব। আর কতবার আমি তোমায় বলবো যে আমি তোমাকে পছন্দ করি না। কেন বারবার এসে অশান্তি তৈরি কর। আর তোমার কোন আত্মসম্মান নেই? এতবার আমি নিষেধ করা সত্ত্বেও বারবার কেন আসো? অপমানিত হতে খুব ভালো লাগে?”

সাঈদ অসহায় দৃষ্টিতে ইয়াসমিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তোর সবকিছুই আমার ভালো লাগে। বিশ্বাস কর তুই অপমান করলে আমার একটুও খারাপ লাগে না। কিন্তু তুই অবহেলা করলে খারাপ লাগে। চল না আমার সাথে ইয়াসমিন। তোর আফসোস হবে না এই সিদ্ধান্তের জন্য। আমি তো তোকে বলেছি তোর জন্য আমি সব ছেড়ে দেবো।”

ইয়াসমিনের মন একটুও নরম হলো না। কিংবা হলেও সেটা দেখালো না। কাটকাট গলায় বলল,

“যাব না আমি তোমার সাথে। তোমার সাথে আমি কোনদিনও যাবো না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি যে আমি আমার ভাইয়ের পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করবো। আমার ভাইয়া যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই হবে।”

সাঈদ ব্যথিত নয়নে তাকিয়ে রইল ইয়াসমিনের দিকে। দেখলো পাশেই কলি দাঁড়িয়ে কাঁদছে। ভাবলো কলি হয়তো ওদের কে রাজি করালেও করাতে পারে। তাই এবার নিজের বোনের দিকে এগিয়ে গিয়ে কলির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ক্রন্দনরত ভঙ্গীতে বলল,

“কলি, তুই তো আমাকে বিশ্বাস করিস? তোর তো ভরসা আছে তোর ভাইয়ার প্রতি তাই না? বোঝা না ওদেরকে। বোঝানা ইয়াসমিনকে যেন আমায় বিয়েটা করে নেয়!”

কলি সত্যি কাঁদছে। কলি চেনে ওর ভাইকে। সাঈদ খারাপ না। তবে কলি যে এখন নিজের বাড়ির লোকদেরকে আর বিশ্বাস করতে পারছে না। বিয়ের পর তো ইয়াসমিন কে ওই বাড়িতেই উঠতে হবে। ওরা বাঁচতে দেবে না মেয়েটাকে।

সাঈদের হাতের মুঠো থেকে কলি নিজের হাতটা বের করে নিয়ে দু দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“পারবো না ভাইয়া। আমাদের বাড়ির লোকজন ইকরা আপুর জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। ইয়াসমিন আপুকে আবার সেই একই জায়গায় যেতে রাজি করাতে পারবো না আমি। ক্ষমা করে দিও আমায়।”

শেষ আসার আলোটাও যেন নিভে গেল। সাঈদ এবারে একেবারে শান্ত হয়ে গেল। কেউ নেই যে সাঈদের কষ্টটা বুঝবে। সবাই সাঈদের ভালোবাসাটা কে খুব হালকাভাবে নিল। তবে হাল ছাড়ার আগে আরেকবার শেষ চেষ্টা করতে চায় সাঈদ। শেষ ভরসা তো এখন ইমদাদই। কেননা সাঈদ জানে যদি ইমদাদ একবার নিজের সিদ্ধান্ত বদলায় তবে সবকিছু বদলে যাবে।

পিছন ঘুরে ইমদাদের সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ করে ইমদাদের সামনে দুই হাটুঁ ভেঙে বসে বলল। ইমদাদের সামনে দুই হাত জোড় করে আকুতির স্বরে বলল,

“নিজের আত্মসম্মান, অহংকার সবকিছু বিসর্জন দিলাম শুধুমাত্র ইয়াসমিনের জন্য। আমি জানিনা এর থেকেও নিচু হওয়া যায় কিনা। তবে যদি এর থেকেও নিচু হওয়ার কোন উপায় থাকে আর সেটা করলে তুই আমায় ইয়াসমিনকে দিয়ে দিবি বলিস তবে আমি সেটাই করবো। তুই আমায় যা করতে বলবি তাই করব। শুধু ইয়াসমিনকে দিয়ে দে। দিয়ে দে ইমদাদ। ভিক্ষে চাইছি তোর থেকে। ওকে ছাড়া বাঁচবো না। আমার ওকে লাগবেই। করুণা কর।”

কথাটা বলে সাঈদ এবারে আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না। শব্দ করে কেঁদে উঠলো। সাঈদ কে এভাবে কাঁদতে দেখে কলির কান্নার বেগও বাড়লো। ইমদাদ ইয়াসমিনের দিকে তাকাতেই দেখল ইয়াসমিন নিজেও কাঁদছে। এবারে ইমদাদ পড়লো মহা ঝামেলায়। আজকে ইমদাদের মনও সাঈদ কে কেন যেন ফিরিয়ে দিতে সায় জানাচ্ছে না। মন বলছে যে আজ যদি সাঈদ কে ফিরিয়ে দেয় তাহলে ইমদাদ ভুল করবে।

বেশ অনেকটা সময় এভাবেই অতিবাহিত হলো। সবশেষে ইমদাদ এবার একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল। নিজের সিদ্ধান্তটা জানানোর আগে আরো একবার তাকালো ইয়াসমিন এর মুখের দিকে। মেয়েটা এখনও কাঁদছে। ইয়াসমিন তো বলেছিল সাঈদের প্রতি ওর একটা মায়া আছে। কে জানে হয়তো মেয়েটার অজান্তেই সেই মায়া বাড়তে বাড়তে ভালোবাসায় গিয়ে ঠেকেছে। তবে ইয়াসমিন কখনো সেটা বুঝে উঠতে পারেনি। আজ প্রথমবারের জন্য হয়তো সেটা প্রকাশ পেল।

“সরদার বাড়ি আর সরদার বাড়ির লোকজনকে ছাড়তে পারবি ইয়াসমিনের জন্য?”

সাঈদ চমকে উঠে তাকালো ইমদাদের মুখের দিকে। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কি বললি? আরেকবার বল।”

“সরদার বাড়ি আর সরদার বাড়ির লোকজনকে ছাড়তে পারবি? ওই বাড়ির লোকজনের সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ রাখা যাবে না। আমার বোন এক সেকেন্ডের জন্য ওই বাড়িতে যাবে না। পারবি এটা করতে?”

সাঈদের উত্তর দিতে এক সেকেন্ডও ব্যয় করতে হলো না। তড়িঘড়ি করে করে বলল,

“পারবো। সব ছেড়ে দেবো। ওকে নিয়ে আমি আলাদা শহরে চলে যাব। কেউ আর কখনো জানতেই পারবে না যে আমি সরদার বাড়ির ছেলে।”

“আলাদা শহরে যে যাবি সংসার চালাবি কিভাবে? যা উপার্জন করিস সব তো পারিবারিক ব্যবসা থেকে। আলাদা করে তোর যোগ্যতা কি?”

“তুই চিন্তা করিস না। কিছু একটা করে নেব৷ তুই ভাবছিস আমি ইয়াসমিনকে ভালো রাখতে পারব না তাইতো? তুই দেখিস আমি ওকে খুব ভালো রাখবো। আমি অনেক কাজ করব। অনেক টাকা উপার্জন করবো। ওর জীবনে কোন কিছুর অভাব রাখবো না। ও কোন কিছু চাওয়ার আগেই ওর সামনে সেটা হাজির করবো। সরদার বাড়ির কারো ছায়াও পড়বে না ওর জীবনে। আমি তোকে কথা দিচ্ছি।”

“আমি কথায় না কাজে বিশ্বাসী। আগে নিজের আলাদা করে কোন একটা উপার্জনের ব্যবস্থা কর। তারপরে আলাদা করে একটা থাকার জায়গা জোগাড় করে আমার কাছে আসিস আমার বোনকে চাইতে। হাসিমুখে তুলে দেবো তোর হাতে কথা দিলাম। তবে তার আগে না।”

কলি আর ইয়াসমিন দুজনেই বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো ইমদাদের দিকে। হঠাৎ করে কি হলো ইমদাদের। এই লোকটার সিদ্ধান্ত বদলাতে তো একটুও সময় লাগে না।

এদিকে সাঈদের এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না ইমদাদের বলা কথাটা। একবার ভাবছে স্বপ্ন দেখছে। হ্যাঁ, এটা তো সাঈদের কাছে স্বপ্নের মতন যে ও ইয়াসমিন কে পাবে৷ নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরেকবার ইমদাদকে জিজ্ঞেস করল,

“সত্যিই ইয়াসমিনের সাথে বিয়ে দিবি আমার? এটা আবার কোন ষড়যন্ত্র করছিস না তো আমাকে ইয়াসমিনের থেকে দূরে সরানোর জন্য?”

“কথা যখন তোকে দিয়েছি সেই কথা আমার জীবন দিয়ে হলেও রাখবো। তবে তোকেও আমায় কথা দিতে হবে আমার বোনকে কোন কষ্ট দিবি না। কখনো যেন ওর চোখে জল না আসে। খুব আদর যত্নে আর ভালোবাসায় আমি ওকে বড় করেছি। আমার থেকে বেশি ভালোবাসা না দিতে পারলি। কিন্তু তার থেকে যেন কমও না হয়।”

আনন্দে দিক দিশা হারিয়ে ফেলল যেন সাঈদ। নিজের আনন্দটা ঠিক কিভাবে প্রকাশ করবে বুঝে উঠতে পারছে না। কিভাবে প্রকাশ করলে সবাই বুঝবে ওর আনন্দটা জানেনা। আপাতত কোন কিছু না ভেবে সামনে দাঁড়ানো ইমদাদের গলা জড়িয়ে ধরে কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,

“তোর ভরসা আমি ভাঙবো না। সারা জীবন তোর কাছে কৃতজ্ঞ থাকব আমি তোর এই করুণার জন্য। তুই দেখিস আমি তোর ভরসা ভাঙবো না।”

কথাটা বলে সাঈদ ছেড়ে দিল ইমদাদ কে। সাঈদ আবার কিছু বলে উঠতে ধরলে ইমদাদ ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“তবে একটা কথা মনে রাখিস অতীতের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। তোর ভাইয়ের মতন যেন দুদিন পর ভালোবাসা গায়েব না হয়ে যায়। তোর ভাই আমার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু তুই আর বাঁচবি না। আমার বোনের গায়ে যদি একটা ছোট্ট আঁচও এসেছে আমি নিজে তোকে শেষ করে দেবো কথাটা মাথায় রাখিস।”

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প