“একটা রিক্সা নাও না! আর হাঁটা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে আমার শাড়ি খুলে যাবে।”
খুব অসহায় গলায় কলি ইমদাদ কে কথাগুলো বলল। ইমদাদ কানেই নিল না সেই কথাগুলো। ইমদাদের থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে কলি ফের বলে উঠলো,
“ওই ইমদাদ ভাই, শুনছো আমার কথা! একটা রিক্সা নাও না গো। আর হাঁটতে পারছি না। ইমদাদ ভাই!”
কলি কথাটা বলার সাথে সাথে ইমদাদ খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“বা’লের ভাই লাগিয়েছিস! তোর কোন দিকের ভাই, কোন জনমের ভাই লাগি আমি? তোর বাপের ছেলে আমি যে নিয়ম করে তিন বেলা ভাই ডাকতে হবে? কথার আগে এক ভাই, পরে এক ভাই। নিজের ভাই নেই তোর? আর একবার ভাই বলে ডাকলে গলা টিপে এখানেই মে'রে রেখে যাবো। ফাজিল মেয়ে কোথাকার!”
কলির মুখটা ফাটা বেলুনের মতন চুপসে গেল। এই সামান্য একটা কথার জন্য তাই বলে বউ কে এভাবে গালাগালি করবে! আসলে ছেলেটার কোন সভ্যতাই নেই। আবার খু’ন করারও হুমকি দিল। বেয়াদব কোথাকার!
বিড়বিড় করে কলি আরো অনেক গালাগালি করলো ইমদাদ কে। তবে মুখে আর কোন কিছু বলার সাহস হলো না। চুপচাপ হাঁটতেই থাকলো ইমদাদের সাথে। সেই সাথে ঠিক করলো আর একটা কথাও বলবেনা। রিক্সা নেওয়ার কথাও বলবে না। নিজের অসুবিধার কথাও বলবে না।
মিনিট দুয়েক এভাবে চুপচাপ হাঁটার পর ইমদাদ যেন বুঝতে পারলো কলি গাল ফুলিয়ে আছে। সাথে এটাও বুঝতে পারলো রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে একটু বেশি গালাগালি করে ফেলেছে। বউকে কেউ এত গালাগালি করে নাকি!
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য ইমদাদ একবার নরম সুরে কলিকে নাম ধরে ডাকলো।
“কলি!”
কোন উত্তর এলো না কলির পাশ থেকে। একটু সময় নিয়ে ইমদাদ আবারো নিজ উদ্যোগে বলে উঠলো,
“জানিস আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি? আচ্ছা ঠিক আছে আমি বলে দিচ্ছি। বড় আম্মুর বাড়িতে যাচ্ছি। খাদিজাকে চিনিস না? ওদের বাড়িতে যাচ্ছি। এত রাতে তো আর বাড়ি ফিরতে পারবো না। সেজন্য রাতটা ওখানেই থাকবো।”
কলির থেকে এবারেও কোন উত্তর ভেসে এলো না। ইমদাদ এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুঝলো মেয়েটা ভালোই পণ করেছে কথা না বলার।
কিন্তু ইমদাদ যে কেন রিকশায় উঠতে চাইছিলো না সেটা তো মেয়েটা বুঝবে না। বুদ্ধি আছে নাকি অত! ইমদাদ তো রাতের নিরিবিলি রাস্তায় কলির পাশাপাশি একটু হাঁটতে চায়। দুটো কথা বলতে চায় মেয়েটার সাথে। কথার মাঝে হঠাৎ করে কলি কে খিলখিলিয়ে হাসতে দেখতে চায়। খুব বেশি দূর তো হাঁটিয়ে নেবে না কলি কে। আর একটু হাঁটলেই খাদিজাদের বাড়ি পেয়ে যাবে। এতোটুকু পথ হাঁটতেও মেয়েটারও আপত্তি।
এদিকে কলি এখন এই আশায় আছে যে ইমদাদ একটু খাটাখাটনি করে ওর রাগ ভাঙ্গাবে। তবে দু একটা কথা বলার পর যখন ইমদাদ থেমে গেল তখন আশাহত হলো। ভাবলো বোধহয় আর কিছু বলবে না। হয়তো নিজেও ভাব দেখিয়ে এখন চুপ করে থাকবে।
কলির এসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ করে নিজের হাতে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করলো। সেদিকে তাকাতেই দেখলো ইমদাদ ওর হাতটা শক্ত করে ধরেছে। কলি কিছু বলে উঠতে ধরলো। তবে তার আগেই ইমদাদ অন্য হাতের সাহায্যে কলির খোঁপাটা খুলে দিল। গাজরাটা পড়ে গেল রাস্তার উপরে। কলি হা হুতাশ করে উঠে বলল,
“কি করলে এটা! পড়ে গেল তো!”
“আবার কিনে দেব। এখন এভাবেই সুন্দর লাগছে দেখতে।”
কলি কিঞ্চিত বিরক্তিকর গলায় বলল,
“কিন্তু এভাবে গরমের মাঝে চুল খুলে রাখতে আমার বিরক্ত লাগছে। তোমার তো ছোট ছোট চুল। তুমি কি করে বুঝবে আমার জ্বা'লা। ইশশ জ্বা’লিয়ে মা’রলো আমায়।”
“তুই আমাকে কম জ্বা'লা'স নাকি!”
কলি চোখ ছোট ছোট করে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি কখন জ্বা'লা'লা'ম তোমায়? আমার মতন ভদ্র মেয়ে আর দু-একটা দেখেছো?”
“ভদ্র মেয়ে দেখেছি কিনা জানিনা। তবে তোর মতন বোকা আর গাধা দুটো দেখিনি। সারাদিন রাত আমাকে জ্বা'লা'তে থাকিস সেটাও বুঝিস না।”
কলির ঝগড়ার মন-মানসিকতা তৈরি হলো। ভাবলো ভদ্রভাবে কথা বলে এই ছেলের সাথে পেরে ওঠা যাবে না। মৃদু রাগী গলাতেই বলল,
“তাই? কখন আমি জ্বা'লা'লা'ম তোমাকে বোঝাও আমায়? দিনরাত তো তুমি আমাকে বিরক্ত করো।”
ইমদাদ স্মিত হেসে বলল,
“চঞ্চল পায়ে যখন সারা বাড়ি ছোটাছুটি করিস তখন আমি বিরক্ত হই। গোসল করে ভেজা চুল নিয়ে যখন বাইরে বেরোস তখন তোর সেই রূপটা দেখে আমি বিরক্ত হই। কথা বলতে বলতে হুট করে যখন তুই হেসে ফেলিস কিংবা হুট করে রেগে যাস তখন তোর মুখটা দেখে আমি বিরক্ত হই। আমার কথার মানে যখন ঠিকঠাক বুঝিস না তখন আমি বিরক্ত হই। এই যে এখন তুই আমার এত কাছে আছিস, পাশাপাশি আছিস অথচ আমি কিছু করতে পারছি না তোর বোকামির কারণে। এতে আমি বিরক্ত হই।”
কলির মাথার মধ্যে ঠিক গেল না ইমদাদের বলা কথাগুলো। একহাতে মাথা চুলকে বলল,
“আর তোমার এই হেঁয়ালি করে বলা কথাগুলোতে আমি বিরক্ত হই। সোজাসুজি একটা কথা বলতে পারো না? জানোই তো আমার মাথা কম কাজ করে। যদি ভালোবাসো সেটাও ঠিক ভাবে বলে দাও, যদি ভালো না বাসো সেটাও ঠিক ভাবে বলে দাও। এত চিন্তা নিয়ে আর থাকা যায় না।”
ইমদাদ শুধু হাসলো মেয়েটার কথা শুনে। আরো কি করে বোঝালে এই মেয়েটা বুঝবে। আর কতটা স্পষ্ট ভাবে বললে ওর মাথার মধ্যে এই কথাটা গেঁথে যাবে যে ইমদাদ ওকে ভালোবাসে।
__________
সবেমাত্র খাদিজাদের বাড়িতে এসে বিছানায় গা টা এলিয়ে দিলো ইমদাদ। কলি ঘরে আসেনি। খাদিজার সঙ্গে কথা বলছে। এর মাঝেই পকেটে থাকা ইমদাদের ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠল।
পকেট থেকে ফোনটা বের করে হাতে নিতেই দেখল আফসানা কল করেছে। ইমদাদের কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো। তবে সময় ব্যয় না করে কলটা রিসিভ করে কানে ধরে বলল,
“এনি প্রবলেম ম্যাডাম? এত রাতে হঠাৎ কল করলেন যে?”
অপর পাশ থেকে আফসানার অস্থির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। মনে হলো যেন কাঁদছে। কিংবা কোন বিষয় নিয়ে ভীষণ হতাশায় ভুগছে।
“ইমদাদ প্লিজ হেল্প মি! আমি পারছিনা। আমি... আমি আবার সু'ই'সা'ই'ড করে নেব। প্লিজ ইমদাদ হেল্প মি!”
ইমদাদ লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“হলোটা কি? আবার সু'ই'সা'ই'ড করতে যাবেন কেন? পা’গল আপনি! ভুলে গেছেন আমার বলা কথাগুলো?”
“আমি জানি সু'ই'সা'ই'ড করাটা ভুল হবে। কিন্তু আমি নিজের মনকে মানাতে পারছি না। আমার এখন আপনার মোটিভেশন প্রয়োজন। প্লিজ ইমদাদ আরেকবার কষ্ট করে আসবেন আমার বাড়িতে! আমি আপনাকে একা আসতে বলছি না। প্রয়োজন হলে আপনার ওয়াইফ কে নিয়ে আসুন। শুধু আমাকে একটু বুঝিয়ে রেখে যান। আমি পারছি না নিজেকে সামলাতে। আমি যে কোনো সময় সু'ই'সা'ই'ড করে নিতে পারি। ভুল হবে জেনেও আমি এটা করে ফেলব।”
ইমদাদ বুঝতে পারলো না যে আফসানার মাথা খারাপ হয়ে গেছে কিনা। শুধু এতোটুকু বুঝলো যে এখন আফসানার মানসিক অবস্থা ভীষণ খারাপ। তড়িঘড়ি করে বলল,
“আধা ঘন্টা সময় দিন, আমি আসছি। দয়া করে এর মাঝে খারাপ কিছু করবেন না। শুনছেন আমার কথা? হ্যালো, আফসানা ম্যাডাম? শুনছেন? আমি আসছি।”
আফসানা অস্থির গলাতেই বলল,
“প্লিজ ইমদাদ তাড়াতাড়ি আসুন। আই নিড ইওর হেল্প।”
কলটা কেটে দিয়ে দৌড়ে রুম থেকে বেরোলো ইমদাদ। বসার ঘরে তখন কলি খাদিজা আর ওর মায়ের সাথে বসে কথাবার্তা বলছে। ইমদাদকে ছুটে বাইরে বেরিয়ে যেতে কলি উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে? দৌড়াচ্ছো কেন?”
ইমদাদ তাড়াহুড়ো করে বলল,
“আমি একটু পরে ফিরছি। একটা জরুরী কাজ আছে। তুই এখানেই থাকিস। আর মাতব্বরি করে যেন বেরিয়ে যাস না। খাদিজা, দেখিস যেন ও ঘর থেকে বেরোতে না পারে। আর যদি কথা না শোনে দু চারটে চ'ড় থা'প্প'র মে'রে বসিয়ে রাখবি। ওর কিন্তু কোন বিশ্বাস নেই। দেখবি আমার পিছন পিছন বেরিয়ে গেছে।”
আর কাউকে কোন কিছু বলার সুযোগই দিল না ইমদাদ। দৌড়ে বেরিয়ে গেল। কলি বুঝতে পারলো না এখানে ওকে মা'রা'র প্রসঙ্গ কেন এলো। কলি কি একবারও বলেছিল যে ও বেরিয়ে যাবে। আর কলি কি ছোট বাচ্চা। আর এ কেমন স্বামী যে যাকে তাকে বউকে মা’রার আদেশ দিয়ে চলে যায়।
__________
বিছানায় মাথা নিচু করে বসে আছে আফসানা। ইমদাদ ওর মুখোমুখি দুহাত বুকে গুঁজে বসে আছে চেয়ারে। ইমদাদ দেখলো মেঝেতে একটা ধারালো ছুরি পড়ে আছে। বোধহয় ইমদাদ আসার আগে আফসানা কয়েকবার চেষ্টা করেও ফেলেছে সু'ই'সা'ই'ড করার। তবে ভাগ্য ভালো যে কিছু হয়নি।
“আপনার হাসবেন্ড কোথায়?”
আফসানা চোখ তুলে তাকালো ইমদাদের দিকে। মেয়েটার দুচোখ ভরতি জল। তবে কন্ঠ শুনে বোঝা গেল না যে কাঁদছে। নিজেকে যথাসম্ভব শক্ত রাখার চেষ্টা করে বলল,
“আপনাকে কল করার আগে ওকে কল করছিলাম। পাইনি ফোনে। পরে ওর প্রেমিকার নাম্বারে কল করি। আমায় কি বলল জানেন? আমার স্বামী ওই মেয়ের পাশে ঘুমিয়ে আছে।”
“আপনিও সেজন্য একেবারে ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন? আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি ঠিক কতটা স্টুপিড। এক চিমটি বুদ্ধিও নেই আপনার মাথায়।”
আফসানা তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“ভালোবাসায় যখন আপনি হেরে যাবেন না ইমদাদ তখন আপনিও স্টুপিড হয়ে যাবেন। আমার পরিস্থিতিতে যদি কখনো আপনি পড়তেন আপনার মাথাতেও এক চিমটি বুদ্ধিও থাকতো না। একবার কল্পনা করে দেখুন তো আপনার স্ত্রী অন্য পুরুষের পাশে ঘুমিয়ে আছে। সহ্য করতে পারবেন তো?”
“আপনারও মনে রাখা উচিত আমি কি বলেছিলাম। আমাকে ঠকিয়ে যদি আমার স্ত্রী অন্য কারো হওয়ার চেষ্টা করে সেটা আমি কোনমতেই মেনে নেব না। দুটোকেই খু’ন করবো। আর আপনি সেটা না করে নিজেকে শেষ করার পরিকল্পনা করছেন? কোন মানে হয় এসবের।”
অনেকক্ষণ আটকে রাখা কান্নাটা এবারে আর আটকাতে পারলো না আফসানা। দুহাতে মুখ ঢেকে শব্দ করে কেঁদে উঠে বলল,
“আমি পারছিনা ইমদাদ। জানেন আপনাকে আর কলিকে দেখে আমার খুব হিংসা হচ্ছিলো। আমার কলিকে দেখে খুব হিংসা হচ্ছিলো। যেকোনো মেয়েকে যদি তার স্বামীর সাথে আমি সুখে দেখি আমার খুব হিংসা হয়। আমি জানি এটা অন্যায়। কিন্তু কি করবো নিজেকে সামলাতে পারি না। আমারও সংসার করার ইচ্ছে হয়। আমারও স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার ইচ্ছে হয়। সবাই পায় শুধু আমিই পেলাম না। আমার কাছে সবকিছু আছে শুধুমাত্র আমার স্বামীর ভালোবাসা ছাড়া। আর সেটার জন্যই আমার এত কিছু থেকেও নেই।”
আফসানার কষ্ট বুঝতে পারছে ইমদাদ। কিন্তু নিজেকে শেষ করে দেওয়াটাই তো সমাধান না। আর আফসানা কে এই ব্যাপারটা এখন খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে তারপরে যেতে হবে। নয়তো এই মেয়ের ভরসা নেই। সকালে উঠে দেখা যাবে ইমদাদ খবর পাচ্ছে যে মেয়েটা আ'ত্ম'হ'ত্যা করেছে।
একটু সময় নিয়ে ইমদাদ আফসানাকে বলল,
“ডিভোর্স দিয়ে দিচ্ছেন না কেন?”
আফসানা আবারও ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“আমার কেউ নেই ইমদাদ। আমি এখনো চাই যেন রওনাফ আমার কাছে ফিরে আসে। আমি ওকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই। বিশ্বাস করুন ও যদি একবার এসে আমার কাছে মন থেকে ওর ভুলের জন্য ক্ষমা চায় আমি ওকে ক্ষমা করে দেব। একটা স্বাভাবিক সংসার চাই আমি আমাদের দুজনের। আর ছেড়ে দেওয়ার জন্য কি ওকে ধরেছিলাম নাকি।”
ইমদাদ এবারে রাগান্বিত গলায় বলল,
“তাহলে আর কি? ধরেই বসে থাকুন। আপনি এখানে ওনার সাথে সংসার করার স্বপ্ন ধরে বসে থাকুন। আর উনি ওনার প্রেমিকার সাথে ওখানে সংসার করুক। এটাই তো চাইছেন আপনি তাই না? ওনার কাছে নিজেকে বারবার দুর্বল প্রমাণ করতে চাইছেন। দেখাতে চাইছেন ওনার বিরহে আপনি কাতর। ওনার ভালোবাসা না পাওয়ার শোকে পাথর। আসলে দোষটা আপনার স্বামীর না। দোষটা আপনার। আপনি ওনাকে সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছেন।”
আফসানা কিছু বলতে চাইল। তবে ইমদাদ ওকে সেই সুযোগ না দিয়ে আবারো নিজেই বলল,
“আমি যা বলছি সেটা চুপচাপ শুনুন। উনি এত গরম দেখাতে পারছেন তার কারণ ওনার পকেটে টাকা আছে। ওনাকে টাকা দেওয়া বন্ধ করুন। পা ধরে এসে যদি ভিক্ষেও চায় তাও দেবেন না। বুঝতে পেরেছেন?”
আফসানা অসহায় গলায় বলল,
“কি করে না দিয়ে থাকবো। কোম্পানির ফিফটি পার্সেন্ট শেয়ার ওর নামে।”
ইমদাদ চমকে উঠে বলল,
“মানে? এটা কিভাবে হলো?”
আফসানা আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে রওনাফ আমাদের কোম্পানিতে জব করত। ওর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে কিছু জানিনা। অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে। ও খুব সৎ, দায়িত্ববান ছেলে ছিল। খুব তাড়াতাড়ি প্রমোশন পাচ্ছিল। ধীরে ধীরে কাজের সূত্র ধরেই ওর সাথে আমার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। তারপরে সেটা বিয়ে অব্দি গড়ায়। আমি আমার বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। আমার বাবার সব সম্পত্তি আমার। কিন্তু রওনাফের কিচ্ছু ছিল না। ও মেসে থাকতো। আমি কখনো চাইনি যেন ওর নিজেকে আমার সামনে ছোট মনে হয়। আমি সমান সমান হতে চেয়েছিলাম ইমদাদ। তাই মাতব্বরি করে ফিফটি পার্সেন্ট শেয়ার বাবাকে দিয়ে ওর নামে করিয়েছিলাম।”
ইমদাদ বিম্ময় ভরা দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আফসানার দিকে। বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হলো ইমদাদের যে এই মেয়ের মাথায় বুদ্ধি নামক কোন বস্তু আছে। কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকার পর অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“এতটা নির্বোধ কেউ হতে পারে? আরে ম্যাডাম সে যখন আপনার কোম্পানির শেয়ার হাসিমুখে নিয়ে নিয়েছিলো তখনই আপনার বোঝা উচিত ছিল ও কিসের জন্য আপনাকে বিয়ে করেছে। যদি সত্যিই আপনার রওনাফ একজন সৎ, আত্মসম্মানী ছেলে হতো তাহলে কখনোই এই সম্পত্তি নিতো না। আরে তাহলে তো ও বিয়ের পরে শ্বশুর বাড়িতে এসে উঠতই না। ওর যা সামর্থ্য তেমন বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আপনাকে রাখতো। আসলে আপনি বাঁশ খাওয়ার ব্যবস্থাটা নিজে নিজেই করে নিয়েছেন। আপনি নিজেই গর্ত করেছেন। তারপরে স্বেচ্ছায় হাসতে হাসতে সেই গর্তে লাফ দিয়েছেন। আর এখন আমাকে ডেকেছেন টেনে তোলার জন্য। বিশ্বাস করুন আমার ইচ্ছে করছে আপনাকে মাটি চাপা দিয়ে যেতে।”
আফসানা চোখে মুখে একরাশ কাতরতা ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আপনি আমাকে বোঝাতে এসেছেন নাকি আমাকে ডিপ্রেশনে ফেলতে এসেছেন? সাহায্যের জন্য আপনাকে ডেকেছি। কিছু তো হেল্প করুন!”
ইমদাদ ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“আপনার ব্যাপারটা এখন কেমন দাঁড়িয়েছে জানেন? আপনি আজরাইলের বাড়িতে ইনভিটিশন কার্ড পাঠানোর পর আজরাইল যখন আপনার বাড়িতে চলে এসেছে তখন বাঁচার জন্য আমাকে বলছেন দরজা লাগিয়ে দিতে যেন আজরাইল ভিতরে না আসতে পারে। যাইহোক, আমি কিভাবে সাহায্য করতে পারি সেটা বলুন। আমার হাতে কোন ক্ষমতা নেই, আমি গুন্ডাও না তাহলে কি করবো? সারাদিন রাত চব্বিশ ঘন্টা এখানে বসে থেকে আপনাকে বুঝিয়ে যাবো এত সময়ও নেই। কারণ আমাকে আমার সংসার চালাতে হবে।”
“কিছু করতে হবে না। আপনি যে আমার এক ডাকে এসেছেন এটাই আমার জন্য যথেষ্ট ইমদাদ। আসলে কেউ নেই যার সাথে এই কথাগুলো শেয়ার করতে পারতাম। সেজন্য আপনাকে ডাকলাম। মাঝে মাঝে একটু আমাকে এভাবে বোঝাবেন তাহলেই হবে।”
ইমদাদ আনমনে কিছুক্ষণ কি যেন একটা ভাবলো। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“জানেন ম্যাডাম পরকীয়া ব্যাপারটা অত্যন্ত জঘন্য। আপনি স্বেচ্ছায় করুন কিংবা অনিচ্ছাই করুন দোষ আপনারই। আপনার পার্টনার আপনাকে ঠকাচ্ছে জন্য আপনাকেও যে তাকে ঠকাতে হবে এমন না। আপনাকে অবশ্য আলাদা করে এসব বোঝানোর কোন প্রয়োজন নেই। আপনি শিক্ষিত, মার্জিত, রুচিসম্পন্ন মানুষ।”
একটু নড়েচেড়ে উঠলো আফসানা। ইমদাদ কি বোঝাতে চাইলো সেটা যেন বুঝতে পারলো। শুধু আলতো হাসলো।
ইমদাদ ভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে বলল,
“আপনি একটা কাজ করুন। ওই মেয়েকে টাইট দিন।”
“কিভাবে?”
“আচ্ছা আমায় একটা কথা বলুন তো ওই মেয়েটার কি এমন ঠ্যাকা পড়েছে যে একটা বিবাহিত ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়াবে? তাও যেখানে বুঝতে পারছে ছেলেটা কতটা জঘন্য। যে কোন সময় ওকেও ঠকাতে পারে। অবশ্যই এখানে টাকা ম্যাটার করছে। রওনাফের থেকে দ্বিগুণ টাকা দিয়ে আপনি ওকে নিজের দিকে টানুন। মেয়েদের হাতে কত ক্ষমতা এখন। কত রকমের কেস করা যায়। কেস করে ওকে ফাঁসিয়ে দিন। ওর তো চৌদ্দগুষ্টি তে কেউ নেই। ওকে জেল থেকে বের করবে কে। আপনাকেই কিছু একটা করতে হবে।”
“মানে আপনি বলতে চাইছেন আমি ওকে জেল থেকে বের করব না?”
“কি করবেন না করবেন সেটা আপনার ব্যাপার। একটু তো বুদ্ধি খাটিয়ে চলুন। সব আমি বললে পরে যদি উল্টোপাল্টা কিছু হয়ে যায় তাহলে তো দোষ আমার ঘাড়ে চাপাবেন। এত রিস্ক আমি নিতে পারবো না। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি।”
ইমদার একটু গুরুতর ভঙ্গিতে কথাটা বলল। আফসানা বেশ আগ্রহ খুঁজে পেল। কৌতুহলী গলায় বলল,
“কি?”
“নিজের ব্যক্তিত্ব কখনোই এমন করে তুলবেন না যেন সে দিকে কেউ আঙ্গুল ওঠাতে পারে। খুব বেশি হলে আমি আপনার বন্ধু হতে পারি ম্যাডাম। বিপদে আপদে আপনার পাশে দাঁড়াবো কথা দিচ্ছি। কখনো যদি আবারো সু'ই'সা'ই'ডের পথে পা বাড়ান আমাকে ডাকবেন আমি আসবো, আপনাকে বোঝাবো। কিন্তু দিন শেষে একটা কথা মনে রাখবেন আমার স্ত্রী আছে। ভীষণ ভালোবাসি ওকে। এতটাই ভালোবাসি যে কারো দিকে চোখ তুলে তাকানোর রুচিও হয় না আমার। রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটি তখন চোখ নামিয়ে হাঁটি যেন ভুলক্রমেও কোন মেয়ের দিকে আমার চোখ না যায়। মানুষের মন তো। বলা যায় না হয়তো হঠাৎ করে মনে হলো মেয়েটা ভীষণ সুন্দর দেখতে। তাহলে আমার স্ত্রীকে ঠকানো হয়ে যাবে তো। বাদবাকি আপনার দিকে বন্ধুত্বের হাতটা আমি বাড়িয়ে দিয়েই রাখলাম। কখনো প্রয়োজন হলে ধরবেন। কথা দিচ্ছি আমিও পাল্টা শক্ত করে ধরবো। তবে সম্পর্কটা শুধু ততটুকু অব্দিই সীমাবদ্ধ থাকবে। হাতটা শক্ত করে ধরে নিজের কাছে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার পর্যায়ে যাবে না।”
কথাগুলো বলে ইমদাদ উঠে দাঁড়ালো। আফসানা একটু লজ্জিত হলো নিজের আচরণের জন্য। সেই সাথে নিজের ভুলগুলো বুঝতেও পারলো। আসলে আফসানা ইচ্ছাকৃত ভাবে ইমদাদের উপরে নির্ভরশীল হতে চায়নি। এতদিন তো জানতোও না ইমদাদ বিবাহিত। এমন সময় জানতে পারলো ইমদাদের বউ আছে যখন অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ইমদাদের প্রতি।
আসলে অবহেলা পেয়ে অভ্যস্ত তো। সেজন্য ইমদাদের সামান্য যত্নেই মনটা কেমন দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। তবে আজ ইমদাদ ওকে যা বোঝালো তারপরে এই দুর্বলতা আর বাড়তে দেওয়া উচিত হবে না। সম্পর্কের মাঝে আসলেই একটা সীমা থাকা দরকার। নাহলে হয়তো যেই বন্ধুত্বের হাত ইমদাদ আগে আগে বাড়িয়ে দিল সেটাও একদিন গুটিয়ে নেবে। সেটা হতে দেবে না আফসানা। অন্য কিছু না হোক। অন্তত বন্ধুত্বই থাকুক ওদের মাঝে।