রাতে সাঈদ এলো ইমদাদোর বাড়িতে ওর সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার জন্য। ইমদাদকে নিয়ে সোজা ছাদে গেল। ঘরে আর ঢুকলো না। ইয়াসমিনের একটু চিন্তা হলো। ভাবলো আমার কোন ঝামেলা হলো কিনা।
ইমদাদ বুঝতে পেরেছে সাঈদ কেন এসেছ ওর কাছে। সাঈদ বোধহয় ভাবছে যে ইমদাদই হয়তো খুঁজে খুঁজে ছন্দাকে বের করেছে। আবার ইমদাদই হয়ত ইচ্ছাকৃতভাবে অশান্তি তৈরি করার জন্য ছন্দাকে সরদার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। নয়তো এত বছর পর তো ছন্দার আবার ফেরার কথা ছিল না। ফেরার হলে তো চলেই যেত না তাই না! ফিরে এলেন তো এলেনই ওর মায়ের সংসারটা আরো এলোমেলো করে দিলেন। সে সংসারের কোন ভিত্তি ছিল না ঠিকই। তবে সবকিছু যেন একেবারে ওলোটপালট করে চলে গেলেন।
বেশ কিছুক্ষণ হলো ছাদে এসে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। তবে এখনো সাঈদ কিছু বলেনি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে শেষে পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করে তাতে আগুন ধরলো ইমদাদ। ইমদাদ কে সিগারেট টানতে দেখে সাঈদেরও মনে পড়ে গেল সিগারেটের কথা। কিন্তু পকেট হাতড়ে সিগারেট পেল না। ইমদাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আমায় একটা সিগারেট দে তো।”
ইমদাদ ধোঁয়া ছেড়ে বলল,
“টাকা লাগবে। সিগারেটের দাম অনেক। এভাবে জনগণের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে নষ্ট করতে পারবোনা।”
ইমদাদ ভেবেছিল সাঈদ বোধহয় রেগে যাবে। ইমদাদ সাঈদ কে রাগানোর জন্যই কথাটা বলেছিল। তবে সাঈদ রাগলো না, বিরক্তও হলো না। বরং নিজের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা চুপচাপ আবার গুটিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ইমদাদ বুঝলো এই ছেলে আজ ঝগড়া করার মন-মানসিকতায় নেই। গুরুতর কোন কথাই বলতে এসেছে।
প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তাতে আগুন ধরিয়ে সাঈদের দিকে বাড়িয়ে দিলো ইমদাদ। সাঈদ কোন কথা না বলে সিগারেটটা হাতে নিয়ে তাতে টান বসালো। খুব তাড়াতাড়ি সিগারেটটা শেষ হয়ে গেল। যেন সাঈদ তাড়াহুড়ো লাগিয়েছিল সিগারেটটা শেষ করার জন্য। একটা সিগারেট শেষ করে ইমদাদের থেকে আরেকটা চাইলো। ইমদাদ কোন কথা না বাড়িয়ে দিলো দ্বিতীয় সিগারেটটা। এবারেও সাঈদ খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে যখন তৃতীয় সিগারেটটা চাইলো তখন ইমদাদ রাগান্বিত গলায় বলল,
“মাতলামো করছিস? একসাথে কতগুলো গিলবি? এটা খুব ভালো কোন খাবার না, পুষ্টিকরও না।”
“আজ বাড়িতে যেটা হলো সেটা হওয়া উচিত হয়নি ইমদাদ।”
“আমাকে কেন বলছিস? তোর বাপ, মা আর দাদাকে গিয়ে বল সেটা। ওনারা অতীতে যে ঘটনাগুলো ঘটিয়েছিল সেগুলোই তো আজ বের হয়েছে। সবকিছু সারাজীবন মাটি চাপা দিয়ে রাখা যায় না বুঝলি। পঁচে গিয়ে একসময় গন্ধ ঠিকই বের হয়।”
“তুই কেন ওনাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে গেলি? তুই জানিস ঐ সংসারে আমার মা কতটা অশান্তিতে থাকে। আমি জানি বাবার সাথে মায়ের সম্পর্কটা কখনোই ভালো ছিল না। আজকের পর থেকে যে একটা সূক্ষ্ম বন্ধন ছিল ওদের মাঝে সেটাও আর থাকবে না।”
হাতে থাকা আধপোড়া সিগারেটটা ইমদাদ ফেলে দিয়ে সাঈদের দিকে ঘুরে দুহাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে বলল,
“তোর কি মনে হয় আমি পুরো বাংলাদেশ জুড়ে হন্নে হয়ে খুঁজে কলির মা কে বের করেছি যেন তোর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তোর মায়ের সংসারে আগুন লাগাতে পারি? আর তোর মায়ের সাথে যেটা হয়েছে সেটা ওনার কর্মফলেরই একটা অংশ। চোখের সামনে দুটো মেয়ের সংসার নষ্ট হয়ে যেতে দেখেও উনি চুপচাপ ছিলেন। তৃতীয় একটা মেয়ের সংসার নষ্ট করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। তার নিজের সংসার হবে ভাবিস কি করে?”
“কার সংসার নষ্ট করেছে আমার মা?”
ইমদাদ ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বললল,
“কেন তুই জানিস না? নতুন করে তোকে বোঝাতে হবে সব? বিয়ে করেছিল তোর বাবা। দুজনকেই না জানিয়েই করেছিল। দোষটা তোর মায়েরও ছিল না, কলির মায়েরও ছিল না। কিন্তু শাস্তিটা শুধুমাত্র পেয়েছে কলির মা। তোর মায়ের উচিত ছিল তোর বাপকে শাস্তি দেওয়া। তা না করে উনি কলির মাকে সংসার থেকে ভাগিয়েছেন। কলি কে সামনে পেলেই আমার বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ওর কানে সমানে বিষ ঢালতে থাকে আমার নামে। কারণ কি জানিস? কারণ কলি আমার কাছে ভালো আছে আর সেটা তোর মা সহ্য করতে পারেন না। আরেকজনের কথা কি আমার মনে করিয়ে দিতে হবে? আশা করছি এখনো তোর স্মৃতিশক্তির এতটা সমস্যা হয়নি যে আমার বোনের কথা ভুলে যাবি।”
সাঈদ এবার মৃদু তুতলে বলল,
“তুই জানিস আমার বাড়ির লোকদের সাথে মা পেরে উঠতো না। এতে মায়ের কোন দোষ নেই।”
ইমদাদ ফের ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠলো,
“ওই তো, দিন শেষে সব ঝড় আমার পরিবারের উপর দিয়ে গেছে। তোরা কেউ কাউকে হারাসনি। হারিয়েছি শুধু আমি আমার সবকিছু। আসলে তুই বুঝবি না সাঈদ আমার কষ্ট। তোর এত অবাধ্যতা, এত অবহেলা, এত বেয়াদবির করা সত্ত্বেও খুব অনায়াসে তোর বাপ, দাদা, সবার ভালোবাসা পেয়েছিস। কখনো টাকা-পয়সা নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হয়নি। কখনো এই পরিস্থিতিতে পড়িসনি যে একদিন কাজে না গেলে হয়তো খেতে পারবি না। তুই বুঝবি না এসব। সবসময় পকেট গরম থাকে তো সেজন্য তুই আমার কষ্ট বুঝবি না।”
কথাটা বলে ইমদাদ চলে যেতে ধরলো সেখান থেকে। পিছনে থেকে সাঈদ বলে উঠলো,
“সরদার বাড়িতে অশান্তি হতে দেখলে তুই খুব শান্তি পাস তাই না?”
ইমদাদ থামলো। ঠোঁটে আপনাআপনি একটা হাসি ফুটে উঠলো। লম্বা একটা শ্বাস টেনে বলল,
“ভীষণ আনন্দ পাই। ইচ্ছে করে একেবারে সবার জীবন ছারখার করে দিতে। ওই বাড়ি, ওই বাড়ির মানুষগুলো আমার থেকে সব কেড়ে নিয়েছে।”
“আমি আর কলিও তো ওই বাড়িরই সদস্য। তাহলে আমাদের প্রতি দয়াটা কেন করছিস? নাকি আবার মনে মনে কোন ষড়যন্ত্র করছিস ইমদাদ? ভালোবাসার লোভ দেখিয়ে আবার হঠাৎ করে দূরে চলে যাবি না তো? আমাদের দুজনের থেকে আমাদের ভালোবাসা কেড়ে নিয়ে আমাদের জীবনটা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নেই তো তোর?”
ইমদাদ হো হো করে হেসে উঠে বলল,
“তোর মাঝে আসলেই সরদার বংশের র’ক্ত বইছে। না হলে তুই শালা এখনও ইমদাদকে বিশ্বাস করতে পারিস না! তুই আর তোর বোন দুজনের জীবন শেষ করা কোন ব্যাপারই না। আমি এখনো গিয়ে যদি ইয়াসমিনকে বলি এই বিয়েটা থেকে সরে আসতে ও দ্বিতীয়বার ভাবার প্রয়োজন মনে করবে না। আমি আজই যদি তোর বোনকে ছেড়ে দেই, ও পা'গ'ল হয়ে যাবে। কিন্তু আমি কেন এমনটা করবো না জানিস?”
সাঈদ কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কেন?”
“তার কারণ কলি এখন আর সরদার বাড়ির মেয়ে না। আমার স্ত্রী। তুইও কিছুদিন পর আমার বোনের স্বামী হবি। আর তার থেকেও বড় কথা আমার শরীরে মানুষের র’ক্ত বইছে। আর তোদের শরীরে কার র’ক্ত বইছে সেটা তোরাই বুঝে নে।”
___________
আজ জীবনের প্রথম কলি নিজে কিছু রান্না করেছে। ইয়াসমিন দিক নির্দেশনা দিয়েছে আর কলি রান্না করেছে মুরগির মাংস। কলি খুব আগ্রহ নিয়ে বসে ছিল যে ইমদাদ ওর রান্না খেয়ে প্রশংসা করবে। তবে তেমন কিছুই হলো না। ইমদাদ চুপচাপ খাওয়া-দাওয়া শেষে উঠে চলে গেল।
ইয়াসমিন একবার নিজেই বলল যে রান্নাটা কলি করেছে। ইমদাদ ছোট্ট করে বলেছিল ভালো হয়েছে। এর থেকে বেশি আর কিছু না। কিন্তু কলিতো আরো অনেক বেশি কিছু আশা করেছিলো।
খাওয়া-দাওয়া শেষে কলি ঘরে গিয়ে দেখলো ইমদাদ শুয়ে পড়েছে। ব্যাপারটা কলির ঠিক ভালো লাগলো না। এত তাড়াতাড়ি তো ঘুমোও না ইমদাদ। আজ সারা দিন কলির সাথে তেমন একটা কথাও হয়নি। কলি তো ভেবেছিল এখন একটু গল্প করবে দুজনে।
দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে ইমদাদের পাশে বসলো কলি। ইমদাদ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। কলি ইমদাদের কপালে হাত রাখলো বোঝার জন্য যে জ্বর এসেছে কিনা।
কলির সন্দেহ একদমই ঠিক। আবারো জ্বর এসেছে ছেলেটার। আসবেই তো। অসুস্থ শরীর নিয়ে এত লাফালাফি করলে তো জ্বর আবার ফেরত আসবেই। শরীরটাকে তো সুস্থ হওয়ার সময় দিতে হবে।
কলি ডাকলো ইমদাদ কে। ইমদাদ সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিল। শরীরটা বড্ড দুর্বল। তার উপরে আবার অসুস্থ। কয়েকবার ডাকার পর ইমদাদের ঘুম ভাঙলো। চোখে মেলে কলির দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি হয়েছে?”
“জ্বর এসেছে তোমার। ওষুধ তো নিশ্চয়ই খাওনি?”
ইমদাদ কন্ঠে একরাশ অনীহা প্রকাশ করে বলল,
“প্রয়োজন নেই।”
কলি কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“প্রয়োজন নেই বললেই হলো। উঠে বসো। আমি ওষুধ আনছি।”
“বললাম তো লাগবে না। একটু ঘুমােলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
কলি শুনলো না ইমদাদের কথা। উঠে গিয়ে ওষুধ নিয়ে এসে ইমদাদ কে টেনে তুলল। জোর করেই ওষুধটা খাওয়াতে হলো ছেলেটাকে। ছোট বাচ্চাকে ওষুধ খাওয়াতেও বোধহয় কাউকে এত কষ্ট করতে হয় না যতটা কলিকে ইমদাদকে ওষুধ খাওয়াতে কষ্ট করতে হলো।
ওষুধটা খাওয়া শেষে সঙ্গে সঙ্গে আবার শুয়ে পড়লো ইমদাদ। মাথাটা ভনভন করে ঘুরছে। বসে থাকতে শরীর একটুও সায় দিচ্ছে না। কলি তাড়াহুড়ো করে গিয়ে পানি আর একটা কাপড় নিয়ে এলো। জলপট্টি দিয়ে দিল কিছুক্ষণ। একটু পর জ্বরটা কমলো। এখন ইমদাদের এতটাই গরম লেগে গেল যে চেঁচিয়ে উঠে কলিকে ফ্যান ছাড়তে বলল। কলি তাড়াহুড়ো করে গিয়ে ফ্যান ছাড়লো।
ইমদাদের যাবতীয় সেবা-যত্ন করা শেষে কলি ভাবলো এবার একটু দুজনেই ঘুমােনো যাক। রাত তো অনেক হয়েছে। ইমদাদের জ্বরটাও কমে গেছে। কিন্তু ইমদাদের দুচোখ থেকে ততক্ষণে ঘুম পালিয়েছে। কলি পাশে গিয়ে ঘুমোতে চাইলো। তবে যেতে দিল না ইমদাদ। কলি কে নিজের সামনে বসিয়ে রাখলো। কলি প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু বলবে?”
ইমদাদ শুধু উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর জানালো। কলি অপেক্ষা করে রইল ইমদাদ কি বলবে সেটা শোনার জন্য। তবে বেশ অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও ইমদাদ কিছুই বলল না। কলি ফের জিজ্ঞেস করল,
“সত্যি কিছু বলবে?”
এবারে আর মাথাও নাড়ালো না ইমদাদ। কলি মৃদু বিরক্তিকর গলায় যেইনা কিছু বলে উঠতে ধরবে অমনি ইমদাদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে।
“তোমার মা কে কখনো তুমি দেখোনি তাই না? কখনো দেখতে ইচ্ছে করেনি? মনে পড়ে না মায়ের কথা?”
চুপসে গেল কলির মুখটা। আনমনে কিছু একটা ভেবে উত্তরে বলল,
“আমার যখন পনেরো বছর বয়স তখন প্রথম জানতে পেরেছিলাম যে যাকে এতদিন মা ডেকে এসেছি সে আসলে আমার নিজের মা না। জেনেছিলাম আমি হওয়ার কয়েক মাস পরেই নাকি আমার মা অন্য কারো সাথে চলে গিয়েছিল। তুমিই বলো না, পনেরোটা বছর যাকে নিজের মা হিসেবে ভালোবেসেছি হঠাৎ করে সত্যিটা জানার পরে কি আবার নিজের মা কে ভালোবাসা সম্ভব? তাও যখন জানলাম আমার নিজের মা আমাকে রেখে গিয়েছিল অন্যের জন্য। কেনই বা তার কথা মনে পড়বে? কখনো তো প্রয়োজন হয়নি।”
“ভুল জানো তুমি।”
কলি ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কি ভুল জানি?”
ইমদাদ কলির দিকে ঘুরে বসে কলির হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল,
“আমায় বিশ্বাস করো তো তুমি?”
কলি তৎক্ষণাত উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ। কিন্তু হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”
“দেখো আমি ভেবেছিলাম তোমায় এই কথাটা আর কিছু দিন পরে বলব। তবে আমার মনে হচ্ছে এখনই বলে দেওয়া উচিত। আমায় বিশ্বাস করো। আমি মিথ্যে বলব না তোমায়।”
ইমদাদের কথা বলার ভঙ্গিটা বেশ গুরুতর লাগলো কলির কাছে। এবার একটু চিন্তাই হলো। কি হলো আবার কে জানে।
“ঠিক আছে বলো। আমি বিশ্বাস করি তোমায়।”
ইমদাদ একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“আজ দুপুরে যে ভদ্রমহিলা আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। আমি যে বললাম উনি আমার পরিচিত। উনি আসলে কে জানো?”
“তোমার পরিচিত কেউই হবে।”
“তোমার পরিচিত। তোমার খুব আপন, কাছের কেউ। তোমার নিজের মা ছিলেন উনি কলি।”
কলি চমকে উঠে বলল,
“আমার মা?”
“হ্যাঁ তোমার মা। উনি তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্যই এসেছিলেন। কিন্তু আমি ওনাকে তখন নিজের পরিচয়টা দিতে দেইনি। কারণ আমি জানি তোমার মনে ওনার জন্য খারাপ ধারণা তৈরি হয়ে আছে। হয়তো তুমি এমন কোন আচরণ করে ফেলতে যাতে উনি কষ্ট পেতেন। আমি সেজন্য চেয়েছিলাম আমি নিজে আগে তোমায় এই ব্যাপারে বোঝাবো।”
কলি তৎক্ষণাত কোন উত্তর দিল না। মনে পড়ার চেষ্টা করলো দুপুরে যে মহিলা এসেছিল তার চেহারা। কলির কখনো নিজের মায়ের আসল মুখটা দেখার সুযোগও হয়ে ওঠেনি। কেউ কখনো দেখায়নি কলি কে। আর না কলি কখনো দেখতে চেয়েছে। যবে থেকে জানতে পেরেছিল যে শাম্মি ওর নিজের মা না। সেই দিন সেই মুহূর্ত থেকে কলির মনে ওর মায়ের জন্য ভীষণ খারাপ ধারণা তৈরি করা হয়েছিল। সে কাজটা অবশ্য শাম্মিই করেছিল। এতগুলো বছর ধরে নিয়ম করে তিনি এই কাজটাই করে এসেছেন।
সেই সাথে কলি কে বুঝিয়েছেন উনি সৎ মা হওয়া সত্ত্বেও কলিকে নিজের মেয়ের মতন ভালোবাসেন। নিজের ছেলেদের থেকে কোন অংশে কম আদর করেন না কলিকে। কলিও বোকার মতন সেই কথায় বিশ্বাস করেছে। বিশ্বাস না করার কোন কারণ ছিল না।
কলি কে চুপ করে থাকতে দেখে ইমদাদের একটু চিন্তা হলো। হালকা করে কলির কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“কিছু তো বলো।”
ইমদাদ ভেবেছিল কলি হয়তো কাঁদবে। কিংবা অস্থির হয়ে পড়বে। এমনও হতে পারে হয়ত রেগে যাবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। বেশ নির্জীব দেখালো কলি কে। খুব ঠান্ডা আছে। শান্ত গলায় ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি বলবো? কি বলা উচিত আমার?”
“যা ইচ্ছে তাই বলো। তোমার নিজের মায়ের দেখা পেয়েছো তুমি কলি। একটুও আনন্দ হচ্ছে না? একবার ওনার সাথে দেখা করতে ইচ্ছে করছে না? ছুটে গিয়ে একবার মা বলে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে না?”
কলি নির্জীব কন্ঠে বলল,
“না।”
ইমদাদ আশ্চর্যান্বিত গলায় বলল,
“সত্যিই? একটুও ইচ্ছে করছে না? মিথ্যে বলো না।”
এবারে কলি আলতো হেসে বলল,
“বিশ্বাস করো কোন অনুভূতিই কাজ করছে না আমার মাঝে। আমার তো ওনার কথা কখনো ভুলেও মনে পড়তো না। ব্যাপারটা তোমার কাছে অস্বাভাবিক লাগলেও এটাই সত্যি। যে মানুষটাকে আমি কখনো দেখিনি, কখনো আমার কাছে পাইনি, যাকে আমি কখনো ছুঁতে পারিনি তার প্রতি টানটা কি করে তৈরি হবে বলতে পারো আমায়? আমি সব সময় আমার মা হিসেবে যাকে ভেবেছি তার সঙ্গেই বড় হয়েছি। আমি তাকে এখনো আমার মা ভাবি। আর যার কথা বলছো আমার নিজের মা তার কথা আমার কখনো মনে পড়ে না।”
“সাঈদের মা ই তোমার মাকে চলে যেতে বাধ্য করেছিল।”
“আমাকে কেন সঙ্গে করে নিয়ে যাননি তাহলে?”
“উনি ভেবেছিলেন তোমায় একটা ভালো ভবিষ্যৎ দিতে পারবেন না। ওনার নিজের জীবনের কোন নিশ্চয়তা ছিল না। উনি ভেবেছিলেন হয়তো তোমার বাবা ওনাকে ঠিক খুঁজে বের করবেন। এদিকে তোমার দাদু ছিল ওনার বিপক্ষে। কেননা উনি তোমার বাবার জীবনে আসার পর থেকে তোমার বাবা তোমার দাদুর হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সেজন্য তোমার দাদু তোমার প্রানের ভয় দেখিয়ে তোমার মাকে বাড়ি ছাড়া করেছিলেন। আর তোমার মা এই ভয়ে ছিলেন যদি তোমার বাবা ওনাকে আবার খুঁজে বের করে তাহলে হয়তো তোমার দাদু তোমাদের দুজনের কোন ক্ষতি করে দিতে পারে। সেজন্য তোমার ভবিষ্যৎ, তোমার জীবন নিশ্চিত করার জন্য আর যাতে তুমি বাবা-মা দুজনের ভালোবাসা পাও সেই ব্যবস্থা করেই তোমার মা বাড়ি ছেড়েছিলেন।”
কলি চুপচাপ শুনো গেল ইমদাদের বলা কথাগুলো। সবকিছুই ইমদাদ বলল কলি কে। কিন্তু তাও কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। কলি চাইছে ওর মাঝে ওর মায়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হোক, একটু দুর্বলতা তৈরি হোক। সেই সাথে শাম্মির প্রতি একটু যেন ঘৃণা তৈরি হয়।
অনেক কিছুই তো শুনেছে কলি ইমদাদের থেকে শাম্মির ব্যাপারে। সেদিন শাহিন যখন কলির ঘরে ঢুকে ওর সাথে জবরদস্তি করছিল আর শাম্মি বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিল সেই ঘটনাটাও শুনেছে কলি। তারপর থেকে শাম্মির প্রতি ভালোবাসাটা উঠে গেছে। এখন আর কলির নিজের মা হিসেবে কাউকেই মনে করতে ইচ্ছে করে না। দুজন মা কে পেয়েছিল কলি নিজের জীবনে। অথচ একজন ওকে ছেড়ে চলে গিয়েছে আর একজন সঙ্গে থেকে মিথ্যে মায়ের ভালোবাসা দেখিয়ে কলির ক্ষতি করে গেছে। আদৌ কি এদের কারো প্রতি ভালোবাসা থাকা উচিত?