বিরতিহীন ভাবে আফসানার ফোনটা বেজেই চলেছে। কিন্তু রিসিভ করার ইচ্ছে হচ্ছে না। সব সময় তো সবার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না। আর যে এখন কল করেছে তার সাথে তো আফসানার কোন প্রয়োজন নেই। তাহলে অযথা আফসানার মূল্যবান সময় তাকে কেন দেবে?
এইসব ভাবনা চিন্তা করেই এতক্ষণ ফোনটা রিসিভ করছিলো না। তবে সাদিক নাছোড়বান্দা। ছেলেটার শরীরে না আছে কোন ভয়, না আছে কোন লজ্জা। শেষে বাধ্য হয়ে আফসানা ডেস্কের ওপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে রিসিভ করে কানে ধরে মৃদু রাগী গলাতে বলল,
“কোন ম্যানার্স নেই আপনার? আমাকে কি নিজের মতন বেকার মনে করেন নাকি ভাবেন আমি সারাদিন আপনার কলের অপেক্ষাতেই থাকি? যখন দেখছেনই কলটা রিসিভ করছি না তারপরও বারবার কেন বিরক্ত করছেন?স্টুপিডিটিরও একটা লিমিট থাকে।”
সাদিক বিড়বিড় করে কিছুক্ষণ গালাগালি করলো আফসানা কে এত তেজ দেখানোর জন্য। তবে মুখে আর সেসব বলার সাহস হলো না। মিনমিনে গলায় বলল,
“আসলে ম্যাডাম অনেকদিন থেকে আপনার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। কিন্তু যোগাযোগই তো করতে পারছি না। সেজন্যই এমন করলাম। দুঃখিত ম্যাডাম আর কখনো হবে না।”
“কি প্রয়োজন সেটা বলুন?”
সাদিক কিছুক্ষণ সময় নিয়ে একটু হেসে বলল,
“ইয়ে মানে ম্যাডাম বলছিলাম যে আপনার কথা অনুযায়ী আমার বন্ধুদের কে বলেছিলাম যেন ইমদাদ কে আমাদের ওই ব্যবসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। ওরা তাই করেছে। তো আমি যেহেতু আপনার কথা অনুযায়ী কাজ করেছি এবার যদি আপনি আমার ব্যবস্থাটা করতেন তাহলে কৃতজ্ঞ থাকতাম।”
“যদি ইমদাদ কখনো এই ব্যাপারে জানতে পারে তাহলে একটুও লজ্জা করবেনা ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে? ওর চোখে চোখ মেলাতে পারবেন?”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য সাদিক একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“এত কিছু ভাবলে তো আর জীবন চলে না ম্যাডাম। মাথার উপরে অনেক চাপ সংসারের। এত কম উপার্জন দিয়ে সংসার চলে না ঠিকঠাক।”
“তাই বলে বন্ধুকে ধোকা দেবেন?”
“আরে রাখুন তো ম্যাডাম বন্ধু। ও আমাকে বন্ধু ভাবে নাকি। ভাবে তো চাকর। সারাদিন শুধু হুকুম করতেই থাকে। কষ্টতো আমিও কম করি না। আমি ওর চাকর নাকি! ওর টাকায় খাই, না পরি যে ওর হুকুম মত চলবো। ম্যাডাম আপনি একটু ব্যবস্থাটা করে দিন হ্যাঁ।”
আফসানা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“পরে জানাচ্ছি।”
কথাটা বলে আফসানা ফোনটা কেটে দিল। তৎক্ষণাৎ কেবিনের দরজায় ইমদাদ এসে দাঁড়িয়ে ভিতরে আসার জন্য অনুমতি চাইলো। আফসানা অনুমতি দিল ভিতরে আসার জন্য। ভিতরে এসে আফসানার বিপরীত পাশে চেয়ার টেনে নিয়ে বসতেই আফসানা বলে উঠলো,
“কোন খোঁজ খবর ছিল না যে আপনার। অনেকদিন পর এলেন।”
ইমদাদ ক্লান্ত শরীরটা চেয়ারের সাথে এলিয়ে দিয়ে বলল,
“অশান্তির মাঝে ছিলাম। তারপরে আবার অসুস্থ হলাম। আবার আমি সুস্থ হলাম তো আমার বউ অসুস্থ হলো। এইভাবে দিন কাটছে।”
“ও আচ্ছা। তার মানে এতদিন বউয়ের সেবা করলেন।”
“তা তো করতেই হবে। বউও তো আমার সেবা করেছে।”
কথাটা বলে ইমদাদ চুপ করে গেল। শরীরটা ক্লান্ত লাগছে। সেজন্য একটু আরাম করছে। আফসানা একটু আমতা আমতা করছে। বুঝতে পারছে না যে সাদিকের কথাটা ইমদাদ কে বলা ঠিক হবে কিনা। এখন পুরো দোষটা তো একা সাদিকের ঘাড়েও চাপানো যায় না।
আফসানার তো উদ্দেশ্য ভালো ছিল না। আফসানা প্ররোচনা না দিলে তো সাদিক এমনটা করত না। অবশ্য সাদিক যদি সত্যি ভালো হতো তাহলে আফসানা প্ররোচনা দিলেও তেমনটা করত না। সাদিক হয়তো এমন কোন সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল।
“কিছু বলবেন মনে হচ্ছে।”
হঠাৎ ইমদাদের এমন প্রশ্নে আফসানা মৃদু কেঁপে উঠলো। তবে বুঝতে পারলো না ইমদাদ কি করে বুঝলো যে আফসানা কিছু বলতে চাইছে। বিস্মিত গলায় বলল,
“আপনি কি করে বুঝলেন?”
ইমদাদ সোজা হয়ে বসে আফসানার দিকে তাকিয়ে বলল,
“বোঝা যাচ্ছে আপনাকে দেখে। যাইহোক বলে ফেলুন কি বলবেন।”
আফসানা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলল,
“আপনার ভালো লাগবে না শুনতে।”
ইমদাদ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“চিন্তা করবেন না। রোজই আমি এমন সংবাদ শুনি যেগুলো শুনতে আমার ভালো লাগে না। যে, যেদিক থেকে পারে আমায় বাঁশ দিয়ে দেয়। আমি অভ্যস্ত এসবে। আপনি নিশ্চিন্তে বলতে পারেন। শুনতে ভালো না লাগলেও আমি হেসে হেসেই শুনবো।”
তৎক্ষণাৎ কথাটা বলতে পারলো না আফসানা। আরো কিছুক্ষণ নিজেই নিজের সাথে যুদ্ধ চালালো। সবশেষে সিদ্ধান্ত নিল যা হওয়ার হবে। ইমদাদ ওকে ভুল বুঝলে বুঝবে। তবে সত্যিটা জানিয়ে দেওয়া দরকার। ইমদাদেরও জানা উচিত ও কাদেরকে বন্ধু ভাবে। তবে একটু কৌশলে বলতে হবে।
“আপনার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এর বিজনেসের কি হলো? ওটা কেমন চলছে?”
হঠাৎ করে আফসানার মুখে এই প্রশ্নটা শুনে ইমদাদের কপালে সন্দেহী ভাঁজ সৃষ্টি হলো। ঠিকঠাক হয়ে বসে সন্দেহী দৃষ্টিতে আফসানার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনার হাত ছিল নাকি এর পিছনে?”
থতমত খেল আফসানা। এদিক ওদিক এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
“কিসের কথা বলছেন? কিসের পিছনে আমার হাত ছিল? আমি তো কিছু জানি না।”
“যখন বলছেন জানেন না তার মানে জানেন। আপনি করিয়েছেন এই সবটা?”
“আরে বাবা কি করিয়েছে সেটাই তো বুঝতে পারছি না। বলতে তো হবে আমায় কিসের জন্য দোষারোপ করছেন?
ইমদাদ দৃষ্টি আরেকটু সূঁচালো করে বলল,
“হঠাৎ করে কাউসার কেন আমাকে কর্মচারী বানিয়ে দিল? বেরই বা করে দিল কেন? ও নিজেও খুব ভালো করে জানতো আমি ছাড়া ওর ব্যবসা চলবে না। আপনি কি আশ্বস্ত করেছিলেন ওকে যে, আমি ছাড়া ওদের ব্যবসা আপনি ঠিক চালিয়ে নেবেন?”
আফসানা তাকিয়ে থাকতে পারলো না ইমদাদের দিকে। অন্যদিকে দৃষ্টি ঘোরালো। এখন তো আফসানার ভয় করছে ইমদাদকে সাদিকের কথাটা বলতে। হয়ত ইমদাদ ওকে ভুল বুঝবে। চুপ করে থাকলেও তো আরো ব্যাপারটা সন্দেহজনক হয়ে যাবে। আমতা আমতা করলো। কিন্তু কিছু বলতেও পারল না। কি এক জ্বালার মাঝে পড়লো।
আফসানা কে আমতা আমতা করতে দেখে ইমদাদ যেন অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেল। বুঝলো কাউসার কেন এই কাজটা করেছিল, কার প্ররোচনাতে করেছিল। সত্যি বলতে আফসানার উপরে রাগ হলো না ইমদাদের। ইমদাদ তো একটা ঝুঁকি নিয়েই আফসানার সাথে ব্যবসাটা করতে এসেছিল। ইমদাদ জানত আফসানা কে ও যতটা অপমান, অবজ্ঞা, অবহেলা করেছে তার প্রতিশোধ আফসানা কোনো না কোনোদিন কোনো না কোনোভাবে ঠিক নিয়েই ছাড়বে। সেটাই করেছে। ইমদাদ কে হয়তো নিজের ক্ষমতা দেখাতে চেয়েছে।
তবে রাগটা ইমদাদের হলো নিজের বন্ধুদের উপর। আফসানা কে ক'দিন হলো চেনে? কখনো আফসানার কোন উপকারও করেনি। আফসানা তো ঠিকভাবে চেনেও না ইমদাদকে। ওর সাথে শত্রুতা করাটা স্বাভাবিক। কিন্তু ওর বন্ধুরা! ওর বন্ধুরা তো চেনে ইমদাদ কে। কত বছরের পুরনো বন্ধুত্ব। কত বিপদে পাশে থেকেছে, সাহায্য করেছে। সেই বন্ধুরা কি করে ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারলো!
ইমদাদের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। আজ আরো একবার প্রমাণ পেল এই স্বার্থের দুনিয়ায় কেউ আপন না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পূর্বের মতন আবারো চেয়ারে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বলল,
“দোষ আপনার না। এক্ষেত্রে দোষটা আমারই। ভুল মানুষদের বিশ্বাস করে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। সেজন্যই আপনার সামান্য প্ররোচনায় ওরা নিজেদের আসল রূপটা দেখিয়েছে। বরং এর জন্য আপনার কাছে কৃতজ্ঞ রইলাম। যে সারা জীবন এই মানুষরূপী গিরগিটি গুলোর সাথে আমায় সম্পর্ক রাখতে হলো না।”
আফসানা বুঝতে পারলাে আর মিথ্যে বলে লাভ নেই। ধরা পড়ে গেছে। তড়িঘড়ি করে অপরাধী গলায় ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আই এম রিয়েলি সরি ইমদাদ। আসলে এই প্ল্যানগুলো অনেক আগেকার ছিল। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি এসব করে রেখেছি। ট্রাস্ট মি এখন আমি আপনার কোন ক্ষতি চাই না। প্লিজ ইমদাদ আমায় ভুল বুঝবেন না।”
ইমদাদ আলতো একটু হেসে উঠলো,
“না, সমস্যা নেই। ভুল বুঝতে যাব কেন। বললাম না আমায় যে যেদিক থেকে পারে বাঁশ দিয়ে দেয়। সুযোগ পেয়ে না হয় আপনিও দিয়ে দিয়েছেন। তবে একটা কথা বলি ম্যাডাম?”
“হ্যাঁ বলুন।”
“সামনে আমার বোনের বিয়ে। আমার বাবা মায়ের ইচ্ছে ছিল অনেক ধুমধাম করে ওর বিয়ে দেওয়ার। আমারও তেমনি ইচ্ছে আছে। একমাত্র বোন আমার। অনেক আয়োজন করতে হবে, ওকে অনেক কিছু দিতে চাই। ওর পুরো সংসার একদম সাজিয়ে দিতে চাই। আর এসবের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন আমার। তাই দয়া করে আর কোন ক্ষতি করবেন না।”
আফসানার অপরাধবোধ আরো তীব্র হলো। না জেনে, না বুঝে কি করে ফেলল এটা। এমনটা করা মোটেও উচিত হয়নি। ইমদাদের না জানি কত ক্ষতি হয়ে গেল। অপরাধী গলায় বলল,
“ক্ষমা করে দিন আমায় ইমদাদ। আমি আসলে বুঝতে পারিনি। আমি নিজে তো কখনো টাকা পয়সার কোন অভাবের মধ্যে দিয়ে যাইনি। সেজন্য আমি বুঝতেও পারিনি আপনার এতটা সমস্যা হতে পারে। আই এম রিয়েলি সরি। বাট আই প্রমিস আমি যেমন আপনার ক্ষতি করেছি তেমন আপনার ক্ষতিটা পুষিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করব।”
“তার প্রয়োজন হবে না। যতটুকু করছেন অতটুকুই যথেষ্ট। আজ একবার কারখানায় যেতে হবে। আপনি গেলে আসুন। আমি যাই।”
কথাটা বলে ইমদাদ উঠতে ধরলে আফসানা তাড়াহুড়ো কণ্ঠে বলে উঠলো,
“একসঙ্গে যাই।”
ইমদাদ আফসানার কথায় আপত্তি জানিয়ে বলল,
“প্রয়োজন নেই। আপনার এসি ওয়ালা গাড়িতে উঠলে আমার আবার এলার্জি হয়ে যাবে। আমার চামড়া এসির ঠান্ডা হাওয়ার থেকে সূর্যের প্রখর তাপে অভ্যস্ত।”
কথাটা বলে ইমদাদ দরজার কাছাকাছি যেতেই আফসানা আবার ওকে ডেকে উঠে বলল,
“আরো একটা কথা জানানোর আছে আপনাকে ইমদাদ। এটা শুনলে আপনি কষ্ট পাবেন।”
ইমদাদ কষ্ট পাবে। তার মানে ব্যাপারটা সত্যিই বেশ গুরুতর। কেননা সহজে কোন কথাতে কষ্ট পায় না ইমদাদ। নিজের পূর্বের জায়গায় ফিরে এসে চেয়ার টেনে বসে পড়লো আফসানার সামনে। কৌতুহলী গলায় বলল,
“কি কথা?”
আফসানা মনে মনে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বলা শুরু করল,
“প্রথম যখন আপনার বিজনেস আইডিয়াটা শোনার জন্য আমি আপনাকে অফিসে ডাকি। আর আপনি আপনার ব্যস্ততা দেখিয়ে আমায় অপমান করে চলে যান। ব্যাপারটা আমার আত্মসম্মানে লেগেছিল। আমি সেজন্য চেয়েছিলাম আপনাকে সাফল্যের খুব কাছাকাছি এনে আপনার থেকে সব কেড়ে নেব ভেবেছিলাম। আপনাকে আপনার আসল জায়গাটা দেখিয়ে ছাড়বো ভেবেছিলাম। আফসানা চৌধুরীকে অপমান করার যোগ্য জবাব আপনাকে দেব ভেবেছিলাম।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। তারপর?”
“তারপর আর কি। আপনাকে তো রাজি করানো সম্ভব ছিল না সেজন্য আমি সাদিককে ব্যবহার করি।”
ইমদাদ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কিভাবে?”
“আমি ওনাকে একটা অফার দিই। উনি যদি আপনাকে আমার সাথে বিজনেস করাতে রাজি করাতে পারেন, আমার কথা মত কাজ করেন। তাহলে এক সময় গিয়ে পুরো বিজনেস থেকে আমি আপনাকে সরিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ দায়িত্বটা ওনাকে দেব। মানে লাভের সম্পূর্ণ অংশ সাদিক পাবে। আর উনি রাজি হয়ে যান। আপনি আমার কেবিনে আসার আগেই কল করেছিল। বলছিলেন যে আমি কবে এই কাজটা করবো। আমি তখন আপনার ক্ষতি চাইতাম কিন্তু এখন চাই না। আমি এখন মন থেকে চাই আপনি অনেক বড় হন, অনেক উন্নতি করুন। সত্যি বলছি। প্লিজ ট্রাস্ট মি ইমদাদ।”
ইমদাদের পক্ষ থেকে তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর ভেসে এলো না। আফসানা এসির মধ্যে বসে থাকা সত্ত্বেও ভয়ে ঘামছে। এখন এটা ভেবে ভীষণ ভয় হচ্ছে যে ইমদাদ না আবার ওকে ভুল বুঝে বসে। অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও যখন ইমদাদের থেকে কোন উত্তর পেল না তখন আফসানা কম্পিত গলায় বলল,
“কিছু বলুন ইমদাদ।”
ইমদাদ মাথা তুলে আফসানার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে শব্দ করে হেসে উঠে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ভালো করেছেন। যা করতে চেয়েছিলেন করুন।”
“সিরিয়াসলি? কি বলছেন আপনি বুঝতে পারছেন? মাথা ঠিক আছে আপনার?”
ইমদাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“মাথা না ঠিক থাকার কি আছে। আপনার যেমন পরিকল্পনা ছিল আপনি তো সেভাবেই চলবেন তাই না? দেখুন আপনি কতটা কি করতে পারেন করুন। আমি বাধা দেব না আপনাকে।”
কথাটা বলে ইমদাদ চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে আফসানা অবিশ্বাস্য গলায় বলে উঠলো,
“আপনি সত্যি আমাকে কাজটা করতে বলছেন ইমদাদ? সাদিকের কথাটা শুনে আপনার খারাপ লাগলো না? আমার উপরে রাগ হচ্ছে না? এখনো কি বিশ্বাস করেন আমায়?”
ইমদাদ থেমে গিয়ে পিছন ঘুরে আফসানার দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল,
“এতদিন বিশ্বাস করতাম না আপনাকে। তবে আজকের পর থেকে করবো। তার কারণ আপনি ইমদাদ কে ঠিক চিনেছেন। ইমদাদের বাড়িয়ে দেওয়া বন্ধুত্বের হাতটা আপনি আঁকড়ে ধরেছেন। আপনি বুঝেছেন আপনার এই বন্ধু কখনও আপনাকে ঠকাবে না। সেজন্য আপনি নিজের কর্মের জন্য অনুতপ্ত। আপনি নিজের ভুলগুলো খুব অনায়াসে স্বীকার করছেন। আজ আপনার মাঝে আফসানা চৌধুরীর অহংকারটা দেখতে পেলাম না। আর একবার যেহেতু আপনি অনুতপ্ত হয়েছেন, বুঝতে পেরেছেন নিজের ভুলটা, চিনতে পেরেছেন ইমদাদকে। তাই আপনাকে আর অবিশ্বাস করার কোন মানেই হয় না।”
আফসানা অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। আপনাকে আমি বিশ্বাস করবো আজ থেকে। সেই সাথে আমি কৃতজ্ঞ থাকবো আপনার প্রতি যে কয়েকটা শয়তানের আসল চেহারা দেখিয়েছেন। এবার যা করার তা তো ওই শয়তানগুলোর সাথে করবো। সামনে পড়লে থাপড়িয়ে ওদের চোখমুখের আকৃতি বদলে দেব।”
কথাটা বলে ইমদাদ বেরিয়ে গেল আফসানার কেবিন থেকে। আফসানা বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দরজার দিকে। এই ছেলেটা কখন কি বলে, কি করে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। আফসানার কাছে এখন এই পৃথিবীর সবথেকে কঠিন কাজটা মনে হয় ইমদাদ কে বোঝা।
_________
হসপিটালে ছন্দার কেবিনের বাইরে বসে আছে ইমদাদ আর কলি। কেবিনের ভেতরে ডাক্তার ছন্দাকে দেখছেন। উনি বেরিয়ে যাওয়ার পর ইমদাদরা দেখা করতে যাবে।
কলি আপাতত বসে থেকে ওড়নায় আঙ্গুল প্যাঁচাচ্ছে। চোখ মুখের অবস্থা খুবই খারাপ। কলি ঘাবড়ে আছে। অস্বস্তিও হচ্ছে হালকা। একটু বোধহয় চিন্তাও হচ্ছে। ইমদাদ বুঝলো কলির এতো অস্বস্তির কারণ। স্বাভাবিক অস্বস্তি হওয়া। ছন্দার সাথে এর আগে একবার মাত্র দেখা হয়েছে কলির। তাও তখন কলি জানতো না যে ছন্দা ওর নিজের মা। নিজের এত বছরের জীবনে আজ প্রথম কলি নিজের মায়ের সামনে যাবে। অস্বস্তি তো হবেই। না আছে কোন ভালোবাসা, না আছে দুজনের মাঝে কোন মায়া, মমতার বন্ধন। সবটাই কেমন যেন অদ্ভুত। ঠিক যেমন শুরুতে ইমদাদ আর কলির সম্পর্কটা অদ্ভুত ছিল তেমনই।
কেবিন থেকে ডাক্তার বেরিয়ে যাওয়ার পর নার্স ওদেরকে ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দিল।ইমদাদ উঠে দাঁড়ালো ভিতরে যাওয়ার জন্য। তবে কলি উঠলো না। ওকে এখনো বসে থাকতে দেখে ইমদাদ ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“এত ঘাবড়ানোর কি আছে? তোমারই তো মা।”
কলি মাথা তুলে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সেজন্যই তো অস্বস্তি হচ্ছে। অপরিচিত কাউকে দেখতে এলে এতটা অস্বস্তি হতো না। আমার মনে হয় ওনার সাথে দেখা করতে আসাটা ঠিক হলো না।”
ইমদাদ কপাল কুঁচকে বলল,
“কেন?”
“তুমি বুঝতে পারছো না কেন আমার ওনার প্রতি কোন ভালোবাসা নেই। কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না। কিন্তু উনি হয়তো আশা করে বসে আছেন যে আমি একটু ওনাকে ভালোবাসবো। ভালোবেসে মা বলে ডাকবো। ওনার শরীরের এই অবস্থা দেখে তো আমার কান্না অব্দি পাচ্ছে না। কিন্তু হয়তো উনি ভাবছেন আমি কেঁদে কেটে চোখমুখ লাল করে ফেলেছি। উনি আমার থেকে একটু সহানুভূতি আশা করবেন যেটা আমি ওনাকে দিতে পারবো না। এর থেকে উনি আরো অসুস্থ হয়ে যাবেন না কি?”
ইমদাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“প্রয়োজন হলে একটু অভিনয় করো। কিন্তু তাও ওনাকে বোঝাও যে তুমি একটু হলেও ওনাকে ভালোবাসো। ওনার শরীরের অবস্থা কিন্তু ভালো না। এই নিয়ে দুবার হার্ট অ্যাটাক হলো।”
আর কোন কথা বাড়ালো না কলি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইমদাদের হাত ধরে কেবিনের ভিতর গেল।
বেডের উপর তখন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন ছন্দা। ইমদাদরা কোনরকম শব্দ না করে কেবিনে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করলো। ছন্দার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। একটা স্টুল টেনে দিয়ে কলিকে সেখানে বসালো। তারপর ধীর গলায় ছন্দা কে একবার ডাকলো। ঘুমোয়নি ছন্দা। শুধু চোখ দুটো বন্ধ করেছিল।
চোখ দুটো টেনে খুললেন তিনি। প্রথমে চোখের সামনে অস্পষ্ট লাগলো কলি আর ইমদাদের মুখ দুটো। ফলস্বরূপ চিনতে পারলেন না। ধীরে ধীরে মুখ দুটো পরিষ্কার হলো। কলিকে দেখতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো। মুহূর্তের মাঝে মনে হলো উনি যেন অর্ধেক সুস্থ হয়ে গেছেন কলি কে দেখে।
“তুমি এসেছো মা! তুমি আমায় দেখতে এসেছো! আমি খুব খুশি হয়েছি। আমার খুব ভালো লাগলো তুমি এসেছো বলে।”
কলি কোন উত্তর দিল না ছন্দার বলা কথাগুলোর প্রেক্ষিতে। চোখ তুলে ঠিকভাবে ছন্দার মুখের দিকে তাকাতেও পারছে না। কেন যেন কলির মনে হচ্ছে দূরে থাকা অবস্থায় যে দুর্বলতা গুলো কলিকে ছুঁতে পারছিলো না। কাছে আসার পর সেই দুর্বলতা গুলোই কলিকে ছুঁতে চাইছে। হয়তো ছন্দার অসুস্থ মুখটার দিকে তাকালে কলির খারাপ লাগবে। মায়ায় পড়ে যাবে। নাড়ির টান বলতে তো একটা কথা থাকে। হয়তো সেই টানটাই হঠাৎ করে অনুভব করতে পারবে কলি।
কলিকে চুপ করে থাকতে দেখে ইমদাদ ছন্দা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এখন শরীর ভালো লাগছে?”
ছন্দা জোর পূর্ব হাসার চেষ্টা করে দূর্বল গলায় বললেন,
“ভালো আছি বাবা। তোমায় অনেক ধন্যবাদ আমার মেয়েটাকে আমার কাছে নিয়ে আসার জন্য। আমার কখন কি হয়ে যায় সেটা তো বলতে পারছি না। তবুও শেষ মুহূর্তে এসে মেয়েটা পাশে থাকলে অন্তত একটু শান্তি পাব। না মেয়েটাকে ভালোবাসার সুযোগ পেলাম, না মেয়ের থেকে ভালোবাসা পাওয়ার সুযোগ পেলাম। শেষ সময়ে যদি একটু মেয়ের থেকে ভালোবাসা পাই আর কি।”
ইমদাদ কে কথাগুলো বলে ছন্দা আবারো কলির দিকে তাকালেন। নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা কলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কলির হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বললেন,
“মা, তোমার সঙ্গে হয়তো আমি ছোটবেলা থেকে থাকতে পারেনি। কখনো তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারিনি। তোমায় আদর করতে পারিনি। কিন্তু আমি দূরে থেকে তোমায় খুব ভালোবেসেছি মা। আমি স্বার্থপরের মতন নিজের জীবনটা নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য তোমায় একা ফেলে রেখে আসিনি। আমি তোমার কথা চিন্তা করে, তোমার প্রাণের ভয়ে তোমায় রেখে এসেছিলাম মা। আমায় ভুল বুঝোনা তুমি। আমার উপর রেগে থাকো, অভিমান করো কিন্তু ভুল বুঝোনা।”
শেষের দিকে ছন্দার গলাটা কেমন যেন ধরে এলো। তবে তিনি কাঁদতে চাইলেন না। কলির সামনে হয়তো ওনার এই কান্নাটা কলির কাছে নাটক মনে হতে পারে তাই।
কলি ভেবেছিল কোন উত্তর দেবে না। কিন্তু মনে হলো এভাবে একেবারে চুপচাপ থাকাটা ঠিক না।
“রাগ অভিমান সবটাই করা যায় নিজের মানুষের উপর। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার দেখলাম আপনাকে। আমার মা হিসেবে প্রথম দেখলাম। আপনার উপর এত রাগ অভিমান করা সাজে না আমার। আর আপনি হয়তো আমার ভালো চেয়েই আমাকে রেখে গিয়েছিলেন আমার বাড়িতে। তবে আপনার এই চাওয়াটা আমার ভালো করতে পারেনি। এর থেকে যদি আমি আপনার সঙ্গে থাকতাম হয়তো ভালো থাকতে পারতাম।”
ছন্দার অপরাধবোধ বাড়লো। এবারে তিনি নিজের কান্না কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বললেন,
“আমার অসহায়ত্বটা যদি তোমায় বোঝাতে পারতাম মা তাহলে তুমি তোমার মাকে দোষারোপটা করতেই না। যদি তোমাকে আমি বোঝাতে পারতাম ঠিক কতটা বাজে ভাবে আমি ঠকে গিয়েছিলাম। যদি তোমাকে আমি আমার তখনকার পরিস্থিতিটা দেখাতে পারতাম তবে তোমার আমার প্রতি মায়া হত। কিন্তু আফসোস আমি তা পারব না। তবে একটা কথা মনে রেখো, তোমার মা তোমায় ভীষণ ভালোবেসেছে। দূরে থেকে প্রতিটা দিন তোমার সুস্থতা কামনা করেছে। তোমার ভালো থাকার জন্য দোয়া করেছে। তুমি পারলে তোমার অপরাধী মাকে ক্ষমা করে দিও। ইহকালে তো তোমার সঙ্গে থাকার সুযোগ হলো না। আমি চাইবো পরকালে যেন আমার মেয়ের সাথে একটি বার হলেও আমার দেখা হয়। একটু যেন আমার মেয়েটার সাথে সময় কাটাতে পারি।”
কথাটা বলে ছন্দা এবারে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কলির নিজের চোখ দুটোও কেমন যেন ছলছল করে উঠেছে। হাতের উলটো পিঠে চোখ দুটো মুছে নিয়ে কি যেন ভেবে ছন্দার হাতটা আঁকড়ে ধরে বলল,
“আমিও তো আমার এই জীবনে সত্তিকারের মায়ের ভালোবাসা কেমন হয় সেটা বুঝতেই পারলাম না। তবে এবারে যেন বুঝতে পারি। আমি আপনার সুস্থতা কামনা করি। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন মা। যদি এই জীবনে আর একটু সময় পাই, সেই সময়টুকু আপনার সাথেই কাটাতে চাই।”