ইমদাদের জ্বর তো রাতের মাঝেই সেরে গেছে। তবে বিপত্তি বাধলো এবার কলিকে নিয়ে। এবারে কলির গা কাঁপিয়ে জ্বর চলে এসেছে হঠাৎ করে। ইমদাদের নিজের শরীরটাই এখনো বেশ দূর্বল। তবে নিজের সেই শারীরিক অসুবিধার কথা গুলো ভুলে গেল। এখন কলির সেবা করা দরকার। কলি কে সুস্থ করে তোলা দরকার। চঞ্চল মেয়েটা যদি সারাদিন ইমদাদের সামনে ছোটাছুটি না করে তাহলে তো ইমদাদের ভালো লাগবেনা। কলি যদি বকবক করে ইমদাদের মাথা না খারাপ করে দেয় তাহলেও ভালো লাগে না। তাই নিজের জন্য হলেও ইমদাদের কলিকে সুস্থ করতেই হবে।
ইয়াসমিন রান্না করে প্লেটে খাবার বেরে ইমদাদ কে দিয়ে গেল। ইমদাদ নিজেই খাবার মেখে কলিকে খাইয়ে দিল। দু-তিনবারের বেশি খেতে পারল না কলি। ইমদাদ বেশি জোর করলো না। যতটুকু খেয়েছে ততটুকুই আপাতত যথেষ্ট। হাত ধুঁয়ে এসে আবার ওষুধও খাইয়ে দিল কলি কে। কিছুক্ষণ কলির শিয়রে বসে রইলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিল মেয়েটার।
বেশ কিছুটা সময় পর কলি চোখ মেলে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে দুর্বল গলায় ওকে একবার ডাকলো। ইমদাদ তখন বিছানার সাথে গা এলিয়ে দিয়ে বসেছিল। কলির ডাক শুনে তড়িঘড়ি করে চোখ মেলে তাকিয়ে কলির মুখের দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,
“সমস্যা হচ্ছে? কিছু লাগবে?”
“আমি অসুস্থ হলে এর আগে কেউ কখনো আমার এত সেবা করেনি। কেউ কখনো এভাবে আমার পাশে বসে থেকে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়নি।”
কিয়ৎক্ষনের জন্য ইমদাদের মুখটা চুপসে গেল। বুঝলাে কলি নিজের একটা আফসোসের কথা বলল। মনে জমে থাকা পাহাড় সমান কষ্ট থেকে একটা সামান্য অংশ ইমদাদ কে জানালো। তবে খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজেকে স্বাভাবিক করলো ইমদাদ। মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে কলির কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“এখন আমি আছি তো। এবার থেকে আমি হাত বুলিয়ে দেবো। তোমার পাশে বসে থাকবো। তুমি ঘুমোও।”
“তুমি তো তোমার জ্বর এলে আমায় না জড়িয়ে ধরে ঘুমোও না। বলো আমায় জড়িয়ে ধরলে নাকি ঘুম ভালো হয়। আমারও এভাবে ঘুম ভালো হচ্ছে না।”
ইমদাদ বুঝলো কলির দেওয়া ইঙ্গিতটা। এই সুযোগটা মোটেও হাতছাড়া করা যায় না। একেবারে লুফে নিল ইমদাদ এই সুযোগটা। তাড়াহুড়ো করে কলির গায়ে জড়ানো কম্বলের ভিতরে নিজেও ঢুকে পড়লো।
আজ আর ইমদাদ কে জোর করে কলি কে নিজের কাছে আনতে হলো না। কলি নিজেই ওর দিকে এগিয়ে এসে গুটিশুটি হয়ে ইমদাদের বুকের মাঝে মুখ গুঁজলো। ইমদাদ শক্ত করে নিজের বাহুডোরের মাঝে কলি কে আবদ্ধ করে নিয়ে চুলের ভাঁজে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“এভাবেই থেকো সারা জীবন। তুমিও তোমার জীবনে বড্ড একা ছিলে। আমিও আমার জীবনে বড্ড একা ছিলাম। এখন থেকে আমরা দুজনে দুজনের একাকীত্ব দূর করব। ভালোবেসে একে অপরের সব কষ্ট দূর করে দেবো আমরা।”
_________
সময়টা তখন বিকাল পাঁচটা। কলির জ্বর এখন নেই। ইয়াসমিন, কলি আর ইকবাল সোফায় বসে আছে। ইমাদ বরাবরের মতনই নিজের ঘরে পড়ছে। আর ইমদাদ গেছে রান্নাঘরে ওদের সবার জন্য চা বানাতে। চা বানানো শেষে বসার ঘরে এসে ইমদাদ ছোট্ট টেবিলটার উপরে চায়ের ট্রে টা রাখলো। তারপর নিজেই চায়ের কাপ বাকিদের দিকে বাড়িয়ে দিল। এবারে ইমদাদ একটু প্রশংসা শোনার অপেক্ষায় রইলো।
গরম চায়ে চুমুক না দিয়েই ইকবাল প্রশংসার সুরে বলল,
“সেই, সেই হয়েছে চা ভাইয়া।”
ইমদাদ হালকা করে ইকবালের মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল,
“আগে চুমুক তো দে।”
“আরে চুমুক দিতে হবে না। আমি জানিই আমার ভাইয়ার রান্না সুন্দর।”
এবারে ইমদাদের মুখে আপনাআপনি হাসি ফুটে উঠলো। একে একে কলি আর ইয়াসমিনও প্রশংসা করলো। ইমদাদ এবারে নিশ্চিন্ত মনে যেই না নিজেও চায়ে চুমুক দিতে যাবে অমনি কলিং বেল বেজে উঠলো। বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে ফেলল ইমদাদ। জীবনে একটু শান্তি নেই। একটু আরাম করে যে চায়ের কাপে চুমুক দেবে সেই ফুরসতও মেলে না। অমনি কেউ না কেউ চলে আসে বিরক্ত করতে।
ইমদাদ উঠে যেতে ধরলে ইয়াসমিন ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি থাকো। আমি দেখছি।”
সত্যিই এখন উঠে গিয়ে দরজাটা খুলতে ইচ্ছে করছে না ইমদাদের। ইয়াসমিন গিয়ে দরজাটা খুলতেই সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে চমকে উঠলো। এই মানুষটা তো কখনো ওদের বাড়িতে আসে না। কখনো কথাও হয় না। আর এলোই বা কোন সাহসে। ইমদাদ যদি এখন এখানে দেখে এই মানুষটাকে তাহলে তো কুরুক্ষেত্র বেধে যেতে পারে। ইয়াসমিনের এসব ভাবনার মাঝেই আগন্তুক মিনমিনে স্বরে ইয়াসমিনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ইমদাদ আছে?”
কন্ঠটা ইমদাদের কানেও গেল। পরিচিত লাগলো কন্ঠটা। তবে বিশ্বাস হলো না যে যাকে ইমদাদ সন্দেহ করছে সে এখানে আসতে পারে। গলা উঁচিয়ে ইয়াসমিন কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কে রে ইয়াসমিন?”
ইয়াসমিন পিছন ঘুরে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে কম্পিত গলায় বলল,
“কলির ভাই।”
“সাঈদ?”
“না, কাফিল ভাইয়া।”
মুহূর্তের মাঝে পরিবেশটা কেমন যেন থমথম হয়ে গেল। ইমদাদের চোখে ফুটে উঠলো তীব্র ক্রোধ। হাতে থাকা চায়ের কাপটা শব্দ করে টেবিলের উপর রেখে উঠে দরজার দিকে যেতে ধরলে কলি তাড়াহুড়ো করে গিয়ে ইমদাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“ঠান্ডা হও। রাগারাগি করোনা।”
“সেটা আমি বুঝে নেব।”
কথাটা বলে ইমদাদ যেতে ধরলে কলি ফের ওর হাত টেনে ধরে অনুরোধের স্বরে বলল,
“দেখো, আমি জানি ভাইয়া অন্যায় করেছে। তোমার রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। আমি বলছিও না ওকে ভালোবাসতে হবে। কিন্তু মা'রা'মা'রি করো না। তোমায় খারাপ বলবে লোকে।”
“লোকে কি বলবে না বলবে সেসবের তোয়াক্কা ইমদাদ করেনা। যার নাম শুনলেও আমার মাথায় র’ক্ত উঠে যায় সে এসেছে আমার বাড়ির দরজায়। আমি জানতে চাই ও আবার আমার পরিবারের কার জীবন নষ্টের জন্য এখানে এসেছে।”
কলি আর আটকে রাখতে পারলো না ইমদাদ কে। ইমদাদ কে আসতে দেখে ইয়াসমিন দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো। ইমদাদের ক্রোধান্বিত মুখটা দেখতেই কাফিলের গলা শুকিয়ে গেল। কাফিল জানে ইমদাদের ওর প্রতি জমে থাকা রাগের পরিমাণ কাফিলের আন্দাজেরও বাইরে। এতকিছু জানা সত্ত্বেও আজ অনেক সাহস করে কাফিল এসেছে ইমদাদের সাথে কথা বলতে। জানেনা ইমদাদ ওর কথা শুনবে কিনা। তবে তাও কাফিল বলার চেষ্টা করবে।
কাফিলের এসব ভাবনার মাঝেই ইমদাদের গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে।
“কেন এসেছিস এখানে?”
মৃদু কেঁপে উঠলো কাফিল। হালকা তুতলিয়ে বলল,
“তোর সাথে একটা কথা ছিল ইমদাদ।”
“তোর মনে হয় আমি তোর কথা শুনবো? তুই ভাবলিই বা কি করে যে আমি তোর কথা শুনবো? তার থেকেও বড় কথা তোর সাহস হলো কি করে আমার সামনে এসে দাঁড়ানোর তাও আবার আমারই বাড়ির দরজায়? তুই কি বুঝতে পারছিস যে আমার এখন কি করতে ইচ্ছে করছে? আমি পরিণতির চিন্তা করছি না। পরিণতি যা হওয়ার হবে। তবে আমার ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে এখানে তোর শরীর থেকে মাথাটা আলাদা করে দিতে।”
ইমদাদের বলা কথাটা শুনে ইয়াসমিন আর কলি দুজনেই আঁৎকে উঠলো। ভয় পেল ইকবালও। দৌড়ে এসে ইয়াসমিনকে জড়িয়ে ধরল। কলি তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে ইমদাদের হাত টেনে ধরে বলল,
“মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার। কি আজেবাজে কথা বলছো। ভিতরে চলো।”
ইমদাদ কে কথাটা বলে কলি এবারে কাফিলকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাইয়া, তুমি বাড়ি চলে যাও। যথেষ্ট অশান্তি তৈরি হয়েছে তোমাদের জন্য। দয়া করে আর আমাদের জীবনে অশান্তি বাড়িও না। একটু শান্তিতে থাকতে দাও।”
কথাটা বলে কলি ইমদাদেরর হাত ধরে টেনে ওকে ভেতরে নিয়ে যেতে ধরলে পিছন থেকে কাফিল বলে উঠলো,
“কলি, একটু সময় দে আমায়। আমার একটা কথা শুনে যা প্লিজ। আমি তোদের কারো কোন ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে আসিনি। আমি নিজে বিপদে পড়ে তোর কাছে এসেছি ইমদাদ।”
কলির মনে হলো কাফিলের যা হওয়ার হোক। তবে ইমদাদ কে এখন এখানে রাখা যাবে না। নয়তো আরো বেশি বিপদে পড়ে যাবে কাফিল। তবে ইমদাদ ভিতরে গেল না। কাফিল বিপদে পড়েছে এই কথাটা শুনেই মনের মাঝে কেমন যেন একটা অদ্ভুত আনন্দ হলো। কি বিপদে পড়েছে সেটা তো শুনতে হবে।
থেমে গেল ইমদাদ। কলির থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে আবারও পূর্বের জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে এবার শান্ত গলায় কাফিলকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বিপদে পড়েছিস? কি বিপদে পড়েছিস?”
কাফিল দুই হাঁটু ভেঙে ইমদাদের সামনে হাতজোড় করে বসে অপরাধী গলায় বলল,
“যার কাছে সব থেকে বড় অপরাধী তার কাছে তো ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ হবে না। চাচা চাচির কাছেও ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ হলো না। বাকি রয়েছিস শুধু তুই আর তোর ভাই বোন। আমি জানি সবথেকে বেশি তুই আমাকে ঘৃণা করিস। হয়তো আমাকে বদদোয়াও দেস। অস্বাভাবিকও নয়। কিন্তু তোর কাছে একটাই অনুরোধ। তুই আমার ক্ষতি চাস। তুই আমায় বদদোয়া দেস। কিন্তু আমার সন্তান তো কোন দোষ করেনি বল? ওকে বদদোয়া দেস না ইমদাদ।”
ইমদাদ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“তোর আবার সন্তান হলো কোন দিন?”
“হয়নি তো। এই নিয়ে তিন তিনটে সন্তান মা’রা গেল জন্ম নেওয়ার আগেই। আজ সকালে মুনমুনকে হসপিটালে ভর্তি করিয়েছিলাম। এই বাচ্চাটাও মা’রা গেছে। বিশ্বাস কর আমরা আর সহ্য করতে পারছি না। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। মুনমুন তো এর কারণটাও বুঝতে পারছে না। ও ভাবছে হয়তো ওরই কোন অপরাধ আছে। কিন্তু ও তো জানে না যে আমি নিজে কত বড় পাপী।”
ইমদাদ তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“শুধু পাপী না। তুই হলি কু’ত্তা’র বাচ্চা আর শু’য়ো’রে’র নাতি।”
কাফিল ইমদাদের করা অপমান গুলো চুপচাপ মাথা পেতে নিয়ে বলল,
“তুই যা বলবি আমি সেটাই মেনে নেব। শুধু একটাই অনুরোধ করছি আর বদদোয়া দিসনা। আমি জানি আমি অপরাধ করেছিলাম ইকরার সাথে। তার জন্য অনেকগুলো বছর তো শাস্তি পেলাম। এবার একটু শান্তিতে সংসার করতে দে।”
মুহূর্তের মাঝে ইমদাদের চোখ গুলো রাগে জ্বলজ্বল করে উঠলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো ইকরার মৃ'ত'দে'হে'র ছবি। অমনি মাথার তার কেটে গেল যেন। ওর পায়ের সামনে বসা কাফিলের কলার ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দাঁত পিষে বলল,
“শান্তিতে সংসার করবি? তাহলে আমার বোনকে এনে দে। বউ বাচ্চা নিয়ে সংসার করবি? তাহলে আমার বোন আর ওর বাচ্চাকে ফিরিয়ে এনে দে। এই কয় বছরে তুই শাস্তি পেয়েছিস? মশকরা করছিস আমার সাথে। আমার বোন মা'রা যাওয়ার তিন সপ্তাহের মাথায় তুই বিয়ে করে ঘরে বউ এনে রঙ্গলীলায় নেমেছিলি। সেই ঘরে তুই তোর নতুন বউয়ের সাথে ফুলশয্যা করেছিলি যে ঘরে আমার বোন গলায় দড়ি দিয়ে আ’ত্ম’হ’ত্যা করেছিল। তুই প্রত্যেকটা রাত সেই ঘরে তোর নতুন বউকে নিয়ে কাটাস। আর বলছিস তুই শাস্তি পেয়েছিস!”
কলি ইমদাদের থেকে কাফিলকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। তবে সফল হতে পারল না। ইয়াসমিন তাড়াহুড়ো করে গিয়ে ঘর থেকে ইমাদ কে ডেকে আনলো। শেষে কলি আর ইমাদের প্রচেষ্টায় ইমদাদের হাত থেকে কাফিল ছাড়া পেল। দুজন মিলেও ইমদাদ কে আটকে রাখা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। যেন সত্যি কাফিল কে খু’ন করার উদ্দেশ্য ইমদাদের। কাফিল ক্রন্দনরত গলায় হাতজোড় করে বলল,
“দয়া কর ইমদাদ। ক্ষমা করে দে আমায়। আর বদ দোয়া দিস না।”
ইমদাদ রাগে চিৎকার করে উঠে বলল,
“আরে আমি তোকে কি বদদোয়া দেব। আমার যে নিষ্পাপ বোনকে তোরা কবরে পাঠিয়েছিস সেই বোনের মৃ'ত'দে'হে'র বদদোয়া ঠিক লেগে গেছে তোর উপরে। আমার বোনের যে বাচ্চাটাকে তোরা এই পৃথিবীর আলো দেখতে দেসনি। যে তোরই রক্ত ছিল, তোরই কর্মের ফল ছিল ওই নিষ্পাপ রুহের বদ দোয়া লেগেছে। শালা জা'নো'য়া'রে'র বাচ্চা কোথাকার এখন এসেছিস আমার কাছে ন্যাকা কান্না কাঁদতে। শুনে রাখ, আমি কোনদিনও এটা চাইবো না যে তোর বাচ্চা ম'রু'ক। তবে এটা আমি সারাজীবন চাইবো যেন তুই কোনদিনও শান্তি না পাস। এক সেকেন্ডের জন্যও যেন তুই শান্তি না পাস। সব সময় যেন শুধু ছটফট করিস তুই।”
“এভাবে বলিস না ইমদাদ।”
“হাজার বার বলবো আমি। তুই তোর বাপ, দাদা, চৌদ্দগুষ্টি নিয়ে আয় তবুও ইমদাদের মুখ বন্ধ করতে পারবি না। সেই থেকেই আমার পরিবারের ধ্বংস শুরু হয়েছিল। সেই থেকে আমাদের পরিবারটা এলোমেলো হয়ে গেল। আর জোড়া লাগাতে পারিনি। একে একে হারিয়ে গেল সবাই। আমি মন থেকে চাইবো তুইও যেন তোর সবকিছু হারাস। মৃ'ত্যু'কা'লে আমার বোনটা যেমন একা ছিল তুই যেন তেমন একাই থাকিস। আমার মা, বাবা, বোন, পুরো পরিবার তোর আর তোর বংশের জন্য যে কষ্টটা পেয়েছে, আমি আজও তোদের জন্য যে কষ্টটা পাই সেই কষ্টের প্রত্যেকটা অংশ যেন তোরা ফেরত পাস। আর আমি চাই তোর একটা সন্তান হোক। আর সে যেন বড় হওয়ার পর তার বাবার কুকীর্তির কথা শুনে কখনো তোকে নিজের বাবা হিসেবে পরিচয় না দেয়। সে যেন চেঁচিয়ে নিজের বাবাকে অমানুষ বলে পরিচয় দেয় আমি এটাই চাই। বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে। আর কোনদিন যদি তোকে আমার বাড়ির সীমানায় দেখেছি সেদিন কেউ আমায় আটকাতে পারবে না। শা’লা শু’য়ো’রে’র বাচ্চা।”
ইমদাদ কথাগুলো বলা শেষ করতেই কলি আর ইমাদ ওকে টেনেই ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। কাফিল অসহায়ের মতন সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো। আফসোস হচ্ছে কাফিলের। এটা ভেবে আফসোস হচ্ছে যে কেন সেদিন ইকরার হাতটা শক্ত করে ধরতে পারেনি। কেন সেদিন ইকরার পাশে দাঁড়াতে পারেনি। কেন ইকরাকে দেওয়া কথাটা রাখতে পারেনি। আফসোস হচ্ছে এটা ভেবে যে কেন সেদিন নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেনি। কেন কাপুরুষের মতন চুপচাপ সবার কথা মেনে নিত, নিজের স্ত্রীকে অপমানিত হতে দিত।
যদি নিজের দেওয়া সেই কথাগুলো রাখতে পারতো তবে আজ কাফিলকে আফসোস করতে হতো না। এত হাহাকার থাকত না। এত অস্থিরতায় কাটাতে হতো না দিনগুলো।
আসলে পাপের শাস্তি পেতেই হয় মানুষকে। কোনো না কোনো এক সময় ঠিক পেতেই হয়। তবে সেই শাস্তির কি কোন সমাপ্তি নেই? কাফিলের এই শাস্তি কি কোন দিনও শেষ হবেনা? মৃ'ত্যু'র আগ পর্যন্ত কি পেতেই থাকবে সেই শাস্তি?