“কোথায় সরদার বাড়ির লোকজন?
বাড়ির জামাই এসেছে। আপ্যায়নের ব্যবস্থা করো।”
সময়টা তখন সন্ধ্যা। সোফায় বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে সবেমাত্র চুমুক বসিয়েছেন কামাল সরদার। পাশে বসে আছে ওনার বড় ছেলে করিম সরদার। টেবিলের উপর পড়ে আছে তার ভাগের ফাঁকা চায়ের কাপটা।
এমন সময় ইমদাদের কণ্ঠস্বর ওদের কানে ভেসে যেতেই সেদিকে তাকালেন দুজনে। কামাল সরদার চায়ের কাপটা টেবিলের উপর রেখে দিয়ে নিজের স্থান থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠে বললেন,
“আবারো কোন সাহসে তুমি এই বাড়িতে পা রেখেছো? প্রত্যেকবার অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় তারপরেও তোমার মাঝে কি বিন্দুমাত্র কোন লজ্জা নেই যে আবার চলে আসো?”
ইমদাদ হো হো করে হেসে উঠে কামাল সরদারের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“লজ্জা তো আজ আপনারা পাবেন দাদু। আর এই যে শ্বশুর আব্বা, আপনার জন্য তো আমি একটা চমৎকার উপহার নিয়ে এসেছি সঙ্গে করে। উপহারটা দেখলে আপনি খুশিতে লাফিয়ে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরবেন। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আজকে আপনাকে আমি এই উপহারটা দেওয়ার পর আমাদের শশুর জামাইয়ের সম্পর্কটা দারুন হয়ে যাবে।”
ব্যাপারটা ঠিক ভালো লাগলো না ওনাদের দুজনের কাছে। কি নিয়ে এসেছে ইমদাদ নিজের সাথে করে যে এভাবে বলছে? এই ছেলে যে ভালো কিছু উপহার দেবে না তা তো নিশ্চিত।
ভ্রুঁ কুঁচকে সন্দেহী গলায় করিম সরদার জিজ্ঞেস করলেন,
“আবার নতুন করে কি অশান্তি তৈরি করতে চাইছো তুমি? ছেলেমেয়ে দুজনকেই তো পর বানিয়ে দিয়েছো। আরো কি চাইছো আমাদের থেকে?”
করিম সরদার কথাগুলো বলতে বলতেই উপর থেকে সাঈদ নামলো। এই অসময়ে ইমদাদকে এখানে দেখে ভ্রুঁ কোঁচকালো। ইমদাদ তো কোনো কারণ ছাড়া এই বাড়িতে পা রাখেনা। যখনই এই বাড়িতে পা রাখে তখনই অশান্তি হবেই হবে। আজ আবার কেন এলো।
ইমদাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“তুই এখন এখানে? সব ঠিক আছে তো?”
ইমদাদ হেসে বলল,
“সব ঠিক আছে। তোর বাপের জন্য একটা উপহার আছে। সেটাই দিতে এলাম।”
“বাবার জন্য তুই উপহার এনেছিস? কি আবোল তাবোল বলছিস?”
“বুঝতে পেরেছি। আমার কথায় বিশ্বাস হবে না তোদের। আমি উপহারটাকে ডাকছি। কই আসুন। এতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভিতরে আসুন। আপনারই বাড়ি।”
ইমদাদের কথাটা শুনে তিনজনে একযোগে তাকালো দরজার দিকে। কাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে সেটা জানার জন্য তীব্র কৌতূহল নিয়ে তিনজন মানুষই দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
অপূর্ব সুন্দরী, মধ্যবয়স্ক ছন্দা সদর দরজায় পা রাখল। করিম সরদারের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। তিনি নিজেই নিজের দৃষ্টির প্রতি সন্দেহ পোষণ করলেন। নিজেই নিজেকে মনে মনে বোঝালেন উনি ভুল দেখছেন। উনি যাকে ভাবছেন সে এই মহিলা হতে পারেনা।
ধীরে ধীরে ছন্দা সদর দরজা পেরিয়ে বাড়ির ভিতরে চলে এলো। করিম সরদার এখনো হা করে তাকিয়ে আছেন ছন্দার মুখের দিকে। তিনি এখনো নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তার মনে হলো এত দূর থেকে বোধহয় তিনি ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছেন না। ছন্দার কাছে এসে দাঁড়ালো।
মুখোমুখি দাঁড়াতেই করিম সরদারের হৃদ স্পন্দনের গতি কয়েকগুণ বেড়ে গেল। এ তো সেই চেহারা যে চেহারার সৌন্দর্যে একসময় পাগল ছিলেন করিম সরদার। এই তো সেই চোখ দুটো, যৌবনকালে যে চোখের মায়ায় তিনি হারিয়ে যেতেন। এই তো সেই একই ঠোঁট, যে ঠোঁটের হাসি বারবার থাকে মাতাল করে তুলতো।
অস্পষ্ট গলায় তিনি বলে উঠলেন,
“ছন্দা!”
শব্দটা কানে গেল ছন্দার। ব্যঙ্গাত্মক গলায় স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“এত বছর পরেও চিনতে পেরেছেন আমায়! যাক একটু হলেও তাহলে বলতে হচ্ছে আপনি মানুষ। নয়তো আমি ভেবেছিলাম এতদিনে বোধহয় আমাকে ভুলে গিয়ে তৃতীয় বিয়েটাও করে নিয়েছেন।”
এত অপমান করিম সরদার এখন গায়ে মাখলেন না। তার সবথেকে বড় প্রশ্নের উত্তর এখন তিনি জানতে চান। আর তা হলো এতদিন ছন্দা কোথায় ছিল? যাওয়ার আগে যে চিঠিটা দিয়ে গিয়েছিল সেটা কি সত্যি ছিল? সত্যি কি অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জড়ানোর কারণে চলে গিয়েছিলেন?
“কোথায় ছিলে এতদিন? কার সঙ্গে ছিলে? তুমি তো নিজেই আরেকজনের সাথে সংসার করার জন্য আমার সংসার ছেড়ে চলে গিয়েছিল।”
ছন্দা ফের ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“সবাইকে নিজের মতন চরিত্রহীন ভাববেন না। এতদিনেও তাহলে আমায় চিনতেই পারেননি আপনি। সবার জীবনের উদ্দেশ্য লোক ঠকানো হয় না। একজনকে ছেড়ে আরেক জনের হাত ধরার স্বভাব আপনার, আমার না।”
“মানে? কি বলতে চাইছো তুমি? স্পষ্ট করে বলো। আমি কিছু বুঝতে পারছি না।”
“আপনার সঙ্গে পরে কথা হবে। আগে আমার আপনার স্ত্রীকে দরকার। কোথায় উনি?”
বসার ঘর থেকে এত কথাবার্তার আওয়াজ শুনে রান্নাঘর থেকে শাম্মি নিজেই ততক্ষণে সেখানে চলে এসেছেন। কাছাকাছি আসতেই তার চোখ গেল ছন্দার উপরে। অমনি তিনি থমকে গেলেন। তার মাথাটা যেন ঘুরে উঠল। তিনি পড়েও যেতে ধরলেন। কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে সিঁড়ির রেলিং আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেন।
ছন্দা নিজেই তখন শাম্মি কে আশেপাশে খুঁজছেন। এর মাঝে ওনার কানে ভেসে এলো শাম্মির বিস্মিত কণ্ঠস্বর।
“ছন্দা তুমি! তুমি কেন এসেছো এই বাড়িতে?”
সবার দৃষ্টি এবারে গিয়ে পড়লো সিঁড়ির কাছে দাঁড়ানো শাম্মির উপরে। এতক্ষণে ছন্দা নিজের কাঙ্খিত মানুষটাকে পেলেন। করিম সরদারকে পাশ কাটিয়ে তিনি শাম্মির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
“বিশ বছর আগে আমাদের মাঝে কি কথা হয়েছিল মনে আছে? আপনার মনে আছে কোন শর্তে আমি আপনার কথায় রাজি হয়েছিলাম? মনে আছে কোন শর্তে আমি সংসার ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম?”
গলাটা শুকিয়ে গেল শাম্মির। একটা শুকনো ঢোক গিলে গম্ভীর গলায় বলার চেষ্টা করলেন,
“সেসব বিশ বছর আগের কথা। তখনই আমাদের দুজনের মাঝে যা কথা হওয়ার হয়ে গিয়েছিল। তুমি এত বছর পর কেন ফিরে এলে সেই উত্তর দাও? এমন কথা তো ছিল না। যখন ফিরেই আসার ছিল তাহলে গিয়েছিলে কেন? আর যখন গিয়েছিলে ফিরে এলে কেন?”
“ফিরে এসেছিলাম আমার মেয়ের টানে। বয়স তো অনেক হলো। কে জানে কবে মা'রা যাব। তাই ভাবলাম শেষ বয়সে একটা বার অন্তত মেয়ের মুখটা দেখে মরলে শান্তি পাব। ভাগ্যিস এসেছিলাম। নাহলে তো জানতেই পারতাম না কেউ কতটা চাতূর্যতার সাথে আমাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে বাড়ি থেকে চলে যেতে বাধ্য করে নিজে নোংরা ষড়যন্ত্র করছিলো আমার মেয়ের সাথে।”
ওদের দুজনের কথার মানে কিছুই বুঝতে পারছে না করিম সরদার। হাঁসফাঁস করছেন। কি এমন কথা হয়েছিল ছন্দা আর শাম্মির মাঝে যা উনি জানেন না?
ওনাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে ছন্দাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কি জানার কথা বলছো তুমি ছন্দা? কি কথা হয়েছিল তোমাদের দুজনের মাঝে? আগে তোমার আমার সাথে কথা বলা দরকার। আমি তোমার স্বামী, উত্তর দাও আমায় কোথায় ছিল এত বছর তুমি? কার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পালিয়ে গিয়েছিলে?”
“বারবার একই কথার কেন পুনরাবৃত্তি করছেন? আপনি জানেন না ছন্দার চরিত্র কেমন? তাকে নিজের মত নিকৃষ্ট বানানোর অপচেষ্টায় নেমেছেন কেন? জীবনে আমি ভুল একবারই করেছিলাম আপনার ছলনায় বিশ্বাস করে, আপনার মিথ্যেগুলোকে ভালোবাসা মনে করে। সেই একই ভুল আমি আর দ্বিতীয়বার করিনি।”
মাথাটা যেন ঘুরে উঠলো করিম সরদারের। তিনি এতদিন কি ভেবে আসছিলেন আর আজ এসব কি শুনছেন। নিজের ভাবনার কোন কূলকিনারা খুঁজে পেলেন না। কোন উত্তর খুঁজে পেলেন না নিজের মনে তৈরি হওয়া হাজার হাজার প্রশ্নের। অস্থির গলায় ছন্দা কে জিজ্ঞেস করলেন,
“তাহলে চলে গিয়েছিলে কেন তুমি আমাকে ছেড়ে? তুমি তো যাওয়ার সময় আমাকে চিঠি দিয়ে গিয়েছিলে তুমি অন্য কারো সাথে সংসার করতে চাও জন্য চলে যাচ্ছো। তাহলে আজ এইসব কথার মানে কি ছন্দা।”
ছন্দা একবার তাকালো শাম্মির দিকে। মনে হলো এই ব্যাপারটায় তো শুধু শাম্মির একার দোষ ছিল না। শাম্মির একার পক্ষে এই কাজটা করার দুঃসাহস হতো না।
সোফার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন কামাল সরদার। এখন পর্যন্ত তিনি একটা শব্দও উচ্চারণ করেননি। এই পরিস্থিতিটা দেখে বিশেষ করে ছন্দাকে দেখে তিনি অবাক হয়েছেন, নাকি রেগে গেছেন সেটা এখনো তার অভিব্যক্তি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
ছন্দা এবার এগিয়ে গেল কামাল সরদারের দিকে। কামাল সরকারের মুখোমুখি দাঁড়াতেই এবারে ওনার অভিব্যক্তি দেখে বোঝা গেল যে ছন্দার উপস্থিতি উনি মোটেই পছন্দ করছেন না। মুহূর্তের মাঝে চোখে মুখে তুমুল রাগী ভাব ফুটে উঠলো। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললেন,
“কোন সাহসে তুমি আবার আমার বাড়িতে পা রেখেছো?”
“সাহস তখন ছিল না। সেজন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। আজ সাহস হয়েছে জন্যই তো বাড়িতে পা রাখলাম। আপনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। আপনার ছেলেকে বলবো নাকি আপনার আসল রূপের কথা?”
কামাল সরদার একটুও ঘাবড়ালেন না, তার চোখে মুখে একটুও ভয় দেখা গেল না বরং তিনি গর্জে উঠে বললেন,
“এক্ষুনি বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে নয়তো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব।ভুলে যেওনা আমি চাইলে তোমার সাথে কি কি করতে পারি।”
কামাল সরদারের হুমকিটা শুনে একটুও ভয় পেলো না ছন্দা। বরং শব্দ করে হেসে উঠলো। বিদ্রুপ করে হাসলো। ছন্দা কে এভাবে পাগলের মতন হাসতে দেখে কপাল কোঁচকালেন কামাল সরদার।
“হাসছো কেন?”
ছন্দা নিজের হাসি থামানোর চেষ্টা করলো। তবে থামতে চাইছে না হাসিটা। হাসতে হাসতেই বলল,
“চলে যেতে তো আসিনি। যে অধিকার ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম আজ আবার সেই অধিকারের দাবি নিয়ে এলাম আপনার কাছে বাবা। এখনো কিন্তু আইনত আমি আপনার পুত্রবধূ। এখনও আমি করিম সরদারের স্ত্রী। ভুলে যাবেন না আমাদের কিন্তু তালাক হয়নি।”
শাম্মি তখনও সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে। এবারে আর তিনি চুপচাপ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। ছন্দার দিকে তেড়ে এসে শক্ত করে ওর বাহু চেপে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে কটকটিয়ে বললেন,
“কেউ না। তুমি এ বাড়ির কেউ না। করিম সরদারের স্ত্রী আমি। শুধুমাত্র আমি। তুমি কেউ না।”
ছন্দা নিজের বাহু থেকে শম্পার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“জায়গাটা আমি আপনাকে ছেড়ে দিয়েই গিয়েছিলাম। আমিও চেয়েছিলাম করিম সরদারের স্ত্রী হিসেবে শুধু আপনিই থাকুন। আমি কিন্তু আমার কথা রেখেছিলাম। কিন্তু আপনি আপনার কথা রাখেননি। আমার মেয়েটাকে বোকা পেয়ে ওর জীবনটা জা'হা'ন্না'ম বানিয়ে ছেড়েছেন। সত্যি করে বলুন তো কি করেছেন যার কারণে ওর বাবা অব্দি ওর প্রতি এতটা বিরক্ত। কলি ছন্দার অংশ। আর যার মাঝে ছন্দার কোন অংশ থাকতে পারে তাকে কখনো করিম সরদার ঘৃণা করতে পারে না। আপনিও জানেন, আমিও জানি, এবাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ জানে করিম সরদারের কাছে ছন্দা কি ছিল।”
ছন্দার প্রতি করিম সরদারের ভালোবাসার কথাগুলো মনে পড়তেই রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল শাম্মি। বরাবর ছন্দার প্রতি তার তুমুল ঘৃণা। আর কিছু করতে না পারুক অন্তত একটা চড় মে'রে তো নিজের মনের ক্ষোভ একটু হলেও কমানো যায়।
রাগে কটমটিয়ে ছন্দাকে চ’ড় মারার জন্য উদ্যত হলেন। তবে সক্ষম হতে পারলেন না। তার আগেই ওনার হাতটা করিম সরদার ধরে ফেললেন। করিম সরদার অগ্নিদৃষ্টিতে শাম্মির দিকে তাকিয়ে রাগে কটমটিয়ে বললেন,
“তোমার দুঃসাহস হয় কি করে ছন্দার গায়ে হাত তোলার।”
শাম্মি করিম সরদারের দুই হাত ধরে ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে আমি ভুল করে ফেলেছি। কিন্তু তুমি একবার বলো তোমার স্ত্রী শুধুমাত্র আমি। এতগুলো বছর হলো তোমার সাথে আমি সংসার করছি। এই মেয়েটা ছিল না তোমার পাশে। সুখে দুখে বিপদে-আপদে সবসময় তুমি আমাকে পাশে পেয়েছো। তাহলে তোমার আমায় ভালোবাসা উচিত। আমি তোমার দুই ছেলের মা। আমি তোমার স্ত্রী।”
করিম সরদার এক ঝাটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন,
“তার আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। কি করেছিলে তুমি আর বাবা মিলে ছন্দার সাথে? ও কেন চলে গিয়েছিল?”
কোন উত্তর দিতে পারলেন না শাম্মি। চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে শুধু কাঁদলেন। শাম্মির নিরবতাই যেন ওনাকে অনেক কিছু বলে দিল। উনি আরো নিশ্চিত হয়ে গেলেন এই বিষয়ে যে ছন্দার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পেছনে শাম্মির হাত অবশ্যই ছিল। ছন্দা স্বেচ্ছায় চলে যায়নি। হয়তো ওকে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। করিম সরদার হুংকার ছেড়ে ফের জিজ্ঞেস করলেন,
“আমার প্রশ্নের উত্তর দাও শাম্মি? কি করেছিলে তুমি ছন্দার সাথে?”
এবারে আর চুপ থাকতে পারলেন না শাম্মি। হঠাৎ করে ওনার শরীর থেকে ভয়-ডর যেন উধাও হয়ে গেল। ক্রন্দনরত গলায় চিৎকার করে উঠে বললেন,
“বেরিয়ে যেতে বলেছিলাম ওকে। আমার সংসার আমাকে ফিরিয়ে দিতে বলেছিলাম। ও আমার সংসারে উড়ে এসে জুড়ে বসে ছিলো। এটা আমার সংসার ছিল তাই যেতে ওকেই হতো। আর ও ভালো মানুষি দেখাতে গিয়ে চলেও গিয়েছিল তোমায় ছেড়ে। আমি তোমায় বলছি, ও কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে না। নিজের অপরাধবোধ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য চলে গিয়েছিল আমার আর তোমার বাবার কথায়। তুমি তোমার বাবার হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলে সেজন্য তোমার বাবা তোমার মেয়ের জীবনের ভয় দেখিয়ে ওকে চলে যেতে বাধ্য করেছিল। শুনতে পেরেছো তুমি আমরা দুজন মিলে ওকে চলে যেতে বাধ্য করেছিলাম।”
বাড়ির প্রত্যেকেই তখন বসার ঘরে জরো হয়ে গেছেন এত চেঁচামেচের আওয়াজে। শাম্মি বুঝলেন হয়তো ওনার নিজের মুখে এই কথাগুলো স্বীকার করা উচিত হলো না। কিন্তু তারপরেও উনি ভয় পেলেন না। জীবন আর পরিস্থিতি ওনাকে আজ এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে যে ভয় পেলে চলবে না।
করিম সরদার শাম্মির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন,
“তোমার এত বড় দুঃসাহস আমার সাথে এই নোংরা ষড়যন্ত্রটা করলে। বুঝতে পারছো এবার আমি তোমার অবস্থা কি করতে পারি।ভয় করলো না আমার চোখে চোখ রেখে এই কথাগুলো বলতে?”
করিম সরদার এবারে যেই না শাম্মি কে কষিয়ে একটা চড় মা'রা'র জন্য উদ্যত হলেন অমনি ওনাকে থামালো ছন্দা। করিম সরদার ছন্দার দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,
“ছেড়ে দাও আমার হাত ছন্দা। ওর অন্যায়ের শাস্তি ওকে পেতেই হবে। আজ ওকে আমি একটা উচিত শিক্ষা দিয়েই ছাড়বো। ”
“আর আপনায় কে শিক্ষা দেবে? এত ন্যয় অন্যায়ের কথা আপনার মুখে মানায় না। আপনি কি ভুলে গেছেন এইসব সমস্যার শুরু আপনি করেছিলেন? বাড়িতে বিয়ে করা বউ রেখে গিয়ে দিনের পর দিন মিথ্যে কথা বলে আমার সাথে সম্পর্ক চালিয়ে গিয়েছেন। সে মিথ্যে সম্পর্কের জেরে আবার বিয়েও করেছিলেন আমায়। তখন আপনি আপনার প্রথম স্ত্রীর কাছে আসেননি, থাকেননি ওনার সাথে? দুই দিকেই আপনি সমানভাবে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। চরিত্র দোষ কি আপনার নেই? নিজেকে এখন ভালো প্রমাণ করতে চাইছেন?”
করিম সরদারের কন্ঠটা এবার একটু নরম হলো। ছন্দাকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“তোমাকে তো বলেছিলাম আমি পরিস্থিতির চাপে পড়ে সবটা করতে বাধ্য হয়েছি।’
ছন্দা তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“ছোট বাচ্চা আপনি যে আপনার বাবা আপনাকে দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করাতে পারলো? বাকি রইল আপনার বাবার কথা। উনি মানুষ না জানোয়ার সেটাই বুঝে উঠতে পারিনা। ওনার মতন নর্দমার কিট এই পৃথিবীতে আমি আর দুটো দেখিনি।”
কথাটা বলে ছন্দা শাম্মি কে দেখিয়ে বলল,
“ওনার আর কি দোষ দেব। নিজের স্বামীর ভাগ কেই বা দিতে চায়! আমিও হয়তো ছাড়তাম না। শুধু আমি আপনার জীবনে পরে এসেছি জন্য ছেড়ে দিয়েছিলাম। তখন ওনার সংসারে দুটো সন্তান ছিল যাদের শরীরে আপনারই রক্ত বইছিল। কি অদ্ভুত তাই না ভালোবাসতেন আপনি আমাকে অথচ এদিকে দুটো ছেলেও হয়ে গেল।”
কথাটা বলে ছন্দা ছেড়ে দিলে করিম সরদারের হাতটা। খুব অপমানিত হলেন উনি এত মানুষের সামনে এভাবে ছন্দা কথা বলায়। তবে পাল্টা ছন্দাকে কিছু বলতে পারলেন না। কেননা উনি উপলব্ধি করতে পারছেন ছন্দা নির্দোষ। কারো সাথে কোন অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে ওনাকে ছেড়ে চলে যাননি। বরাবরই তো এই মানুষটার প্রতি করিম সরদার দুর্বল। আজও তার দুর্বলতা রয়ে গেছে। সব সত্যিটা জানার পর যেন নতুন করে দুর্বলতা তৈরি হলো।
অনেকক্ষণ যাবৎ দূরে দাঁড়িয়ে শুধু ওদের পারিবারিক নাটকটা দেখছে আর উপভোগ করছে ইমদাদ। ভীষণ আনন্দ হচ্ছে ইমদাদের। সরদার বাড়িতে কোন অশান্তি হতে দেখলে ইমদাদের খুব আনন্দ হয়। কেননা এই বাড়ির কিছু মানুষজন ওর বাড়ির আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছে সবার জীবন।
ইমদাদের মতন সাঈদও অনেকক্ষণ থেকে চুপচাপ শুধু সবটা দেখে আসছিল। তবে এবারে আর চুপ থাকতে পারল না। শাম্মির দিকে এগিয়ে এসে একহাতে শাম্মি কে জড়িয়ে নিল। নিজের মা কে খুব একা মনে হলো সাঈদের। মনে হলো ওনার পাশে কেউ নেই।
ছেলেকে আসতে দেখে একটু যেন শক্তি পেলেন শাম্মি। সেই সাথে গলায় দলা পাকানো কান্নাগুলো এবারে শব্দ করে বেরিয়ে এলো। দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। সাঈদ মা কে আগলে নিয়ে ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে করিম সরদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই বয়সে এসে বাপের দুই বউ নিয়ে মা'রা'মা'রি দেখতে হচ্ছে। ছেলে হয়ে এর থেকে বড় লজ্জা আর কি হতে পারে বলতে পারেন? আর দাদু আপনাকেও বলি, আপনার জন্য কতগুলো মানুষের জীবন শেষ হয়েছে সে হিসাব আছে আপনার? পুরো দুনিয়াটা যেন আপনি একেবারে ওলটপালট করে ছেড়েছেন। কত পাপ করবেন আর! এবার থামুন। কেয়ামতের দিন তো আপনার বিচার করেই শেষ করা যাবে না।”
কামাল সরদার কিছু বললেন না। আজকে তিনি যেন সব কিছু শুধু শোনার মন-মানসিকতা নিয়ে আছেন। তবে করিম সরদার থেমে থাকলেন না। ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“মায়ের হয়ে যে কথা বলছো তোমার মা কি করেছে সে সব জানো না? শুনলে না কিভাবে ধোকা দিয়েছে?”
“আপনি দেননি? আপনি সাধু? আপনি ফেরেশতা? এসবের শুরু তো আপনি করেছিলেন। ভালোবাসলে একজনকে ভালোবাসতেন, একজনকেই নিজের জীবনে জায়গা দিতে হয়। দুজনকে নিজের জীবনে জায়গা দিয়ে কখনো ভালোবাসি ভালোবাসি বলে চেঁচাবেন না।”
করিম সরদার কে কথাটা বলা শেষে সাঈদ এবারে ছন্দা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দেখুন আন্টি, আমি বলছি না আপনার সাথে যা হয়েছে সে সব ঠিক হয়েছে। আমার মা যে আপনার সাথে অন্যায় করেনি সেটাও বলছি না। কিন্তু আমার মায়ের দিকটা একবার বোঝার চেষ্টা করবেন। যে সংসারটা উনি এত বছর ধরে করে যাচ্ছেন আজও সেই সংসারটা ওনার হয়ে ওঠেনি। আশা করছি একজন মেয়ে হয়ে আপনি এই কষ্টটা বুঝতে পারবেন। বাকি রইল কলির কথা। আমার মা ওকে যথেষ্ট ভালোবাসা দিয়েছে। জানি পরিপূর্ণভাবে ভালোবাসা দেয়নি। যথেষ্ট ষড়যন্ত্রও করেছে আড়ালে কলির সাথে। কিন্তু তখন কলিকে সেইসবের থেকে আমি বাঁচিয়েছি। আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে হলেও আমার মাকে ছেড়ে দিন। দয়া করুন। আপনি তো ভালো ছিলেন নিজের জীবনে। এমনিতেও এখানে ফিরে এলে আপনি শান্তি পাবেন না। এই বাড়িতে কোন মানুষ শান্তি পেতেই পারে না। তাই বলছি দয়া করে আপনি চলে যান। আর আমার মায়ের মতন বোকা মানুষকেই এই সংসারটা করতে দিন। শান্তি না থাকলেও উনি এই সংসারই করবেন।”
কথাটা বলে সাঈদ শাম্মি কে নিয়ে ঘরে চলে গেলেন। ছন্দারও মনে হলো ওনার আর এখানে থাকা উচিত হবে না। যতটুকু জানানোর ততটুকু তো জানিয়ে দিয়েছেন। আর যা জানানো হয়নি তা জানিয়েই বা কি হবে। বিশটা বছর পার হয়ে গেছে। এখন তো নতুন করে কোন কিছু শুরু করা সম্ভব না। পুরনো ভুলগুলো ঠিক করাও সম্ভব না। অধিকারের কথাটা তো এমনি বলেছিলেন।
তবে যাওয়ার আগে শেষ একবার করিম সরদার কে বললেন,
“নিজের স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা মানে পৌরুষত্ব না। শুধুমাত্র যে আপনার স্ত্রী অন্যায় করেছিল তেমনটাও না। নিজের বাবাকে গিয়েও প্রশ্ন করুন, কাঠগড়ায় ওনাকেও দাঁড় করান।”
কথাটা বলে ছন্দা সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে করিম সরদার উৎকণ্ঠিত গলায় বললেন,
“তুমি চলে যাবে ছন্দা?”
থেমে গেল ছন্দা। গম্ভীর গলায় বলল,
“থাকার জন্য আসিনি আমি।”
“কোথায় যাবে? কার কাছেই বা যাবে তুমি? তোমার পরিবারের তো কেউ ছিলনা। এখানে থেকে যাও। এই বাড়ি তোমারও।”
ছন্দা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“এই বাড়িটা তখনই আমার হতে পারতো যদি আপনি সম্পূর্ণভাবে আমার হতেন। নিজের অর্ধেকটা অংশ অন্যকে দিয়ে না আপনি আমার হতে পারবেন, না আপনার এই বাড়ি আমার হতে পারবে। আর যা সম্পূর্ণভাবে আমার না সেদিকে ছন্দা চোখ তুলেও তাকায় না। এমন জিনিসকে ছন্দা ঘৃণা করে।”