“এত টাকা কামানোর নেশা কেন তোমার? অসুস্থ শরীর নিয়েও যেতেই হবে কাজে? টাকার টানে যাচ্ছ নাকি অন্য কারো টানে?”
ইমদাদ হাতে ঘড়ি পরতে পরতে মৃদু হেসে বলল,
“এই দুটোর কোনটার টানেই যাচ্ছি না। যেতে হচ্ছে তোর অকর্মা ভাইয়ের জন্য।”
“অমনি আমার ভাইয়ের দোষ! কি করেছে আমার ভাই?”
ইমদাদ এবারে বিছানায় কলির পাশে এসে বসলো। কোন এক গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে বলল,
“বোনের বিয়ে দেওয়া কি সহজ কাজ নাকি! কত খরচ হবে জানিস। বিয়ের আয়োজনে খরচ হবে, ওকে গয়না দিতে হবে। তোর কি মনে হয় তোর ভাই কাজ খুঁজে পাবে? চাকরি তো জীবনেও করতে পারবে না। কারো হুকুম পালন করা ওর স্বভাবে নেই। একটা ব্যবসা দাঁড় করানোর জন্য টাকা লাগে, পরিশ্রম লাগে, সময়ের ব্যাপার। ওদের নতুন সংসারটাও গুছিয়ে দিতে হবে আমায়। অনেক টাকার ধাক্কা আছে সামনে।”
“আমার ভাইয়া যৌতুক নেবে না। তোমাকে এত ভাবতে হবেনা। আর দেখো ভাইয়া ঠিক কোন না কোন চাকরি পেয়েই যাবে। ইয়াসমিন আপুর জন্য ভাইয়া সব করতে পারে।”
“কিন্তু আমারও তো কিছু দায়িত্ব আছে আমার বোনের প্রতি।”
“তাই বলে অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজে যেতে হবে! একদিন কাজে না গেলে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে? তুমি যদি নিজে ঠিক না থাকো তাহলে আমাদের সবার খেয়াল রাখবে কি করে বলতো আমায়?”
ইমদাদ ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“আজ প্রথম একজন ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং আছে একটা ডিল নিয়ে। সাদিকও আজ যেতে পারবে না। তাই আমাকে যেতেই হবে। কোন উপায় নেই।”
কলির এবার রাগ উঠলো। কলি যাই বলুক না কেন যাই বোঝেক না কেন সব শেষে ঘুরে ফিরে ইমদাদ একটাই উত্তর দিচ্ছে যেতেই হবে। রাগান্বিত গলায় বলে উঠলো,
“ঠিক আছে যাও। যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকেই চলে যাও। এজন্যই বলে মানুষের ভালো করতে নেই। রাতে নিজে কোলে বসিয়ে বলে যত্ন করতে। সকাল হলে যখন আমি যত্ন করতে চাই অমনি উনি বেঁকে বসেন। শুরু হয়ে যায় ওনার ত্যাঁড়ামি। আসলে তোমার সমস্যা খুব জটিল। তুমি শুধুমাত্র রাত হলে বউকে চেনো। আর দিনে ছুটে যাও ওই আফসানার কাছে। চরিত্রহীন ছেলে কোথাকার।”
ইমদাদ চোখ জোড়া সংকুচিত করে কলির দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করার পর বলে উঠলো,
“বলি তো আমি অনেক কিছু কিন্তু তুই শুনিস ক’টা? আর আমি বললাম বলে হঠাৎ করে আমার যত্ন নেওয়ার ইচ্ছে হলো কি ভেবে? সারা জীবনের জন্য আবার এই বাড়িতে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিস না তো?”
কলি আমতা আমতা করে বলল,
“না তো। আমার ভাইয়াকে আলাদা বাড়ি নিতে দাও। তারপর চলে যাবো আমার ভাইয়ার বাড়িতে।”
ইমদাদ আশাহত হলো কলির উত্তরে। ভেবেছিল হয়তো কলি বলবে যে ও সারা জীবন এই বাড়িতে থাকার পরিকল্পনা করেছে। ইমদাদকে ছেড়ে যাবে না। ইমদাদকে জ্বালিয়ে মা'রা'র জন্য হলেও ওকে রেখে যাবে না। কিন্তু না, মেয়েটা এখনও সেই একই কথা ধরে বসে আছে চলে যাবে। তবে নিজের সে আফসোসটুকু আর দেখাতে চাইলো না কলিকে। ঠাট্টার ছলে বলল,
“আমাকে জ্বালিয়ে শান্তি হচ্ছে না। আবার আমার বোনকেও জ্বালাতে যাবি। ওসব আমি হতে দেবো না। তোর ভাইকে বলবি তোকে রাখার হলে যেন আলাদা বাড়িতে রাখে। আমার বোনের সংসারে তোকে নাক গলাতে যেন না দেখি।”
কথাটা বলে ইমদাদ উঠে চলে যেতে ধরলে কলি ওকে পিছন থেকে একবার ডাকলো। কলির কন্ঠটা একটু অন্যরকম শোনালো। ইমদাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে ভ্রুঁ উঁচিয়ে বলল,
“কি?”
“তুমি কি সত্যি চাও যে আমি চলে যাই এখান থেকে?”
“না চাইলে থেকে যাবি?”
“আগে আমি প্রশ্ন করেছি।”
“কে আগে প্রশ্ন করেছে সেটা বড় কথা না। উত্তর আমার আগে চাই।”
“নিজের ভুলটা উপলব্ধি করতে পারো? অনুশোচনা হয়?”
ইমদাদ ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কিসের ভুল?”
“আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করার ভুল। আমি তো স্বেচ্ছায় বিয়ে করিনি তোমায়।”
থতমত খেল ইমদাদ। বুঝতে পারছে না ঠিক কি উত্তর দেয়া উচিত। এক দিক থেকে অনুশোচনা হয় আবার আরেক দিক থেকে অনুশোচনা হয় না। ওভাবে জোর করে বিয়ে করার জন্যই তো কলির মনে ইমদাদের প্রতি খারাপ ধারণা জন্মেছিল। আবার ওভাবে জোর না করে তো কোন উপায় ছিল না। এই মেয়ে এত ভালো মানুষ নাকি যে স্বেচ্ছায় বিয়ে করতো ইমদাদ কে।
আবার আফসোসও হয় না কলিকে বিয়ে করার জন্য। কিন্তু মনে হয় জোর করা সেদিন উচিত হয়নি। আবার জোর না করেও তো কোনো উপায় ছিল না। কলি কে ওভাবে নিয়ে এলে বাড়িতে রাখতে পারত না। তাহলে ইমদাদের কোন অধিকারই থাকতো না কলিকে আটকে রাখার।
ইমদাদের এসব ভাবনার মাঝে কলি আবারো জিজ্ঞেস করলো,
“অনুশোচনা হয়?”
“তোর আফসোস হয়?”
“তোমার অনুশোচনা হলে আমার আফসোস হবে না। আর তোমার অনুশোচনা না হলে আমার আফসোস হবে।”
“তাহলে বলবো আমার উত্তর হ্যাঁ না দুটোই। এবার তোর উত্তর বল?”
“আমার উত্তরও হ্যাঁ না দুটোই।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো ইমদাদ। কিছুক্ষণ কলির দিকে ওভাবেই তাকিয়ে থেকে বেরিয়ে গেল। কেননা বুঝল এই মেয়ে এখন ত্যাড়ামো করার মানসিকতায় আছে। অবশ্য ইমদাদ নিজেও যে খুব সোজা উত্তর দিয়েছে তেমনটা না। দুজনে একসঙ্গে ত্যাড়ামো করলে ব্যাপারটা জটিল হয়ে উঠবে। সেই জন্য ইমদাদ হাল ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল।
___________
নতুন ব্যবসায় আজ প্রথম ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং ছিল ইমদাদের। সেই মিটিংটা এক ঘন্টা পিছিয়ে গেছে। প্রেজেন্টেশন ইমদাদই তৈরি করেছে। এখন তৈরি করা প্রেজেন্টেশনটা আফসানা কে দেখাচ্ছে।
কাজের মাঝে ইমদাদ পর পর কয়েকবার হাঁচি ফেলল। প্রথম দফায় আফসানা শুধু আড়চোখে একবার তাকালো ইমদাদের দিকে। কিন্তু কিছু বলল না। খেয়াল করলো ইমদাদের চোখ নাক লাল হয়ে উঠেছে। একটু বিরতি নিয়ে ফের পর পর বেশ কয়েকটা হাঁচি ফেলল ইমদাদ। এবারে আর আফসানা চুপ করে থাকতে পারলো না। ল্যাপটপটা বন্ধ করে চিন্তিত গলায় ইমদাদ কে বলল,
“অসুস্থ আপনি ইমদাদ? জ্বর এসেছে নাকি?দেখি।”
কথাটা বলে আফসানা ইমদাদের কপালের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই ইমদাদ নিজের মাথাটা একটু পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে বলল,
“ঠিক আছি আমি ম্যাডাম। সামান্য জ্বর। এর থেকে বেশি কিছু না।”
ইমদাদের কপালের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা আফসানা আবারও গুটিয়ে নিলো। একটু অপমানিত হলো ঠিকই। তবে তাও ফের চিন্তিত গলায় বলল,
“অসুস্থ যখন আজকে অফিসে আসার কি দরকার ছিল?”
“ভুলে গেলেন নাকি মিটিং আছে?”
“তো একদিন পরে হতো মিটিং। আগে আপনার শরীর তার পরে সবকিছু।”
ইমদাদ আলতো হেসে চেয়ারের সাথে গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
“এত বড় বড় মাপের মানুষ কি আর আমার মতন চুনোপটির অসুস্থতার জন্য নিজেদের কাজ আটকে রাখবে ম্যাডাম!”
“আরে এই একটা ক্লায়েন্টই আছে নাকি পৃথিবীতে। আপনি ব্যবসা নিয়ে এত ভাবছেনই বা কেন? আমি আছি তো আপনার সাথে। আপনাকে কেউ না চিনলেও আফসানা চৌধুরীর সাথে ব্যবসা করার জন্য সবাই মুখিয়ে থাকে। চিন্তা করবেন না ধীরে ধীরে আপনিও অনেক পরিচিতি পেয়ে যাবেন।”
কথাটা বলে আফসানা ইমদাদের দিকে তাকিয়ে আলতো হাসলো। আজ কেন যেন আফসানা কে একটু অন্যরকম মনে হলো ইমদাদের। আবভাব অন্যরকম লাগছে। হ্যাঁ সামনাসামনি খারাপ ব্যবহার করে না আফসানা ইমদাদের সাথে। কেননা জানে যতটুকু অপমান করবে তার দ্বিগুন অপমান ফেরত পাবে। কিন্তু আজ যেন আরেকটু বেশি ভালো ব্যবহার করছে। ইমদাদ একটু ভাবনায় পরে গেল আফসানা কে নিয়ে। মতিগতি ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
ইমদাদের এসব ভাবনার মাঝে আবারও আফসানার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ওর পাশে দাঁড়ানো তূর্যকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তূর্য, ইমদাদের জন্য ওষুধ আর চা নিয়ে এসো তো। ইমদাদ, আপনার আর কিছু লাগবে? নিঃসংকোচে বলতে পারেন। একবার বলুন কি লাগবে আমি ব্যবস্থা করে দেব।”
“আরে দাঁড়ান দাঁড়ান ম্যাডাম। এত ব্যস্ত হতে হবে না। আমার খেটে খাওয়া শরীর। সামান্য জ্বর কিছু করতে পারবে না। আসার সময় বাড়িতে বউও বারবার আটকাচ্ছিল। আসলে বেশি ভালোবাসল তো সেজন্য বাড়াবাড়ি চিন্তা করে। বুঝতে চায় না যে সামান্য জ্বর ইমদাদের কিছু করতে পারবে না।”
চমকে উঠলো আফসানা। ঠোঁটে জোর করে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে প্রশ্নাত্নক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি বিবাহিত?”
ইমদাদ আলতো হেসে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“হ্যাঁ। এই কয়েক মাস আগে করেছি বিয়ে। আপনাকে মনে হয় জানানো হয়নি তাই না?”
“না। আমি জানতাম না। সিরিয়াসলি আপনি বিবাহিত ইমদাদ? আমার কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছে না। প্লিজ এই বিষয়টা নিয়ে অন্তত মজা করবেন না। সত্যি করে বলুন আপনি বিবাহিত?”
“আরে ম্যাডাম আপনার আমাকে দেখে এমন মানুষ মনে হয় যে বিয়ে নিয়ে আমি আপনার সাথে মজা করবো? কত কষ্টে বিয়ে করেছি জানেন! কত শখের বউ আমার তাকে নিয়ে আমি মজা করবো আপনার সাথে!”
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আফসানা ফের অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“আমি বিশ্বাস করি না। আপনাকে দেখে বোঝাই যায় না। আপনি বিবাহিত হতে পারেন না।”
“আচ্ছা দাঁড়ান আপনাকে একটা জিনিস দেখাই।”
কথাটা বলে ইমদাদ পকেট থেকে ফোনটা বের করলো। কলির নাম্বারটা ইমদাদের ফোনে বউ দিয়ে সেভ করা। বোকা মেয়েটা সেদিন শুধু আফসানার নাম্বারটা কি দিয়ে সেভ করে সেটাই দেখেছিল। নিজের নাম্বারটা দেখেনি।
ফোনে সেভ করা কলির নাম্বারটা বের করে আফসানার দিকে ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“দেখুন, আমার বউয়ের নাম্বার বউ দিয়ে সেভ করে রেখেছি। আসলে পালিয়ে বিয়ে করেছি তো খুব বেশি মানুষ জানে না। অনুষ্ঠানও করা হয়নি যে আপনাকে দাওয়াত দেব। তবে সামনে আমার বোনের বিয়ে। সেখানে নিশ্চয়ই আপনাকে দাওয়াত দেব। আপনার পুরো পরিবারসহ, আপনার হাসবেন্ড কে নিয়ে আসতে হবে কিন্তু। ভুলে যাবেন না ম্যাডাম যে আপনার হাজব্যান্ডও আছে। ওনাকে নিয়ে আসবেন।”
ইমদাদের শেষের কথাটা বলার ধরন আফসানার ঠিক ভালো লাগলো না। কেন যেন মনে হলো ইমদাদ ওকে মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো যে আফসানা বিবাহিত। হয়তো সেই জন্য আজকে নিজেও বিবাহিত সে পরিচয়টা দিল। না হলে এতদিন তো দেয়নি। হঠাৎ করেই বা কেন বউয়ের এত ভালোবাসার কথা তুলল।
তারমানে আফসানা কি একটু বেশি হ্যাংলামো করে ফেলেছে? অভিব্যক্তিতে কি ইমদাদের প্রতি কোন দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে?
হঠাৎ করে আফসানার কি হলো কে জানে। কারো সাথে কোন কথা না বলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। তূর্য পিছন থেকে কয়েক বার ডাকলো আফসানাকে। তবে আফসানা সাড়া দিল না। ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি হলো ম্যাডামের বলুন তো? আপনি তো অপমানজনক কিছু বলেননি। আমিও তো চুপচাপ ছিলাম।”
ইমদাদ আবারও পূর্বের মতো চেয়ারের সাথে গা এলিয়ে দিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে বলল,
“স্বামীর কথা মনে করিয়ে দিয়েছি তো তাঔ বোধ হয় স্বামীর সাথে কথা বলতে গেল। ভালোবাসাতেন খুব স্বামীকে। হঠাৎ করে মনে করিয়ে দেওয়ায় বোধহয় ভালোবাসাটা আরো বেড়ে গেছে।”
“ধুর। ম্যাডাম রওনাফ স্যারের নাম শুনতেও পছন্দ করেন না। কি যে বলেন না আপনি। আর ওরকম মানুষকে ভালোবাসা যায় নাকি। ম্যাডাম তো বোকা জন্য রওনাফ স্যারকে বিশ্বাস করে বিয়ে করেছিল। নাহলে শালা ব্যাটা আস্ত একটা শয়তান।”
ইমদাদ একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“বোকা তো সবাইরে ভাই। ভালোবাসার কাছে সবাই বোকা। আমি বোকা, আমার বউ বোকা, আফসানা ম্যাডামও বোকা। হয়ত তুমিও কোনোদিন বোকা হয়ে যাবে। বোকা দিয়ে পৃথিবীটা ভরে গেছে। অথচ সবাই বলে এই পৃথিবীতে নাকি ভালোবাসা বলতে কিচ্ছু নেই।”
___________
আহসানার অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে ইমদাদের বিকেল হয়ে গেল। মিটিং রুম থেকে বের হতেই পেছন থেকে আফসানার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সেই যে কেবিন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল তারপরে আর দেখা পাওয়া যায়নি তার। মিটিংয়েও ছিল না। কে জানে কোথায় গিয়েছিল।
ইমদাদকে তাকাতে দেখে আফসানা ওর দিকে এগিয়ে এলো। ইমদাদই আগে জিজ্ঞেস করলো,
“কোথায় চলে গিয়েছিলেন ম্যাডাম? অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন নাকি আবার?”
“না ঠিক আছি আমি। আসলে আপনাকে একটা কথা বলার ছিল। বলতে পারেন এক রিকুয়েস্ট করব। রাখতে হবে কিন্তু।”
ইমদাদ একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,
“আগেই কথা দেবো না। রাখার মতন হলে রাখবো নয়তো রাখবো না।”
আফসানা হার মেনে নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। তাহলে আগে বলি। পরশু আমার সপ্তম বিবাহ বার্ষিকী।”
ইমদাদ একটু অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
“সে কি সাত বছর হয়ে গেল বিয়ের! এত ছোট বয়সে বিয়ে করেছিলেন!”
“হ্যাঁ। বয়স কম ছিল বলেই তো ভুল করেছিলাম। এত তাড়াতাড়ি বিয়েটা করে নেওয়া উচিত হয়নি। আরো কয়েকটা বছর অপেক্ষা করতে হত। সে যাই হোক, অনুষ্ঠান করার কোন ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করে মনে হলো একটু দিনটা সেলিব্রেট করা উচিত। সবার প্রথমে আপনাকে ইনভাইট করছি। আপনার ওয়াইফকে নিয়ে কিন্তু অবশ্যই আসবেন।”
“দেখুন ম্যাডাম আগেই বলেছি কথা দিতে পারব না। আমার ওয়াইফ কে জিজ্ঞেস করতে হবে।”
“আমি কোন কথা শুনবো না। আপনার ওয়াইফ কে নিয়ে আসতেই হবে। আপনি না এলেও আপনার ওয়াইফকে পাঠাবেন। আমি পরিচিত হতে চাই ওনার সাথে। ধরে নিন আমার বিবাহ বার্ষিকীতে আমি এই উপহারটা আপনার থেকে চেয়ে নিলাম। খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না কিন্তু। আপনাকে আসতেই হবে। আমি অপেক্ষায় থাকবো আপনাদের।”
কি যেন ভেবে ইমদাদ আর না করলো না। আলতো হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“ঠিক আছে আসবো। আর আপনাকে অগ্রিম শুভেচ্ছা।”
ইমদাদের কথার প্রেক্ষিতে আফসানা আলতো হেসে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। হাই হিল পরেছে। হঠাৎ করে ঘুরতে ধরে পা মচকে পড়েই গেল। ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো। ইমদাদ তাড়াহুড়ো করে গিয়ে আফসারের সামনে বসে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“ঠিক আছেন ম্যাডাম? বেশি লেগেছে?”
আফসানা চোখমুখে ব্যথার ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
“পা টা বোধহয় গেল।”
“যাবেই তো। হিল পড়ার কোন মানে হয়? আপনি কি খাটো যে লম্বা দেখাতে হবে নিজেকে? আর মানুষকে এত দেখানোরই বা কি আছে। এই আপনাদের মেয়েদের নিয়ে এক জ্বালা। পারেন না কোন কিছুই অথচ করতে যান সব। এমন ভাব দেখান যেন দুনিয়া উল্টে ফেলবেন। উঠুন এখন।”
কথাটা বলে ইমদাদ উঠে দাঁড়িয়ে আফসানার দিকে হাত বাড়ালো। আফসানা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ইমদাদের হাতের দিকে।
আজকাল যে আফসানার কি হচ্ছে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। কেন যেন বারবার শুধু ইমদাদের সাথে রওনাফের তুলনা করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কেন ইচ্ছে করে বোঝে না। দুজন মানুষ তো সম্পূর্ণ আলাদা। দুজনের আফসানার জীবনে জায়গাও আলাদা তাহলে। কেন ঘুরে ফিরে এদের তুলনা করতে যায়?
এই যে এখন ইমদাদ এতগুলো কথা শোনালো ঠিকই। তবে সেগুলো তো আফসানার জন্য চিন্তা হয় বলেই বলল, আফসানার ভালোর জন্যই বলল। আবার এতগুলো কথা শোনানো শেষে আফসানা কে তোলার জন্য হাতটা ঠিকই বাড়ালো। কিন্তু রওনাফ হলে এমনটা করত না। হয়তো আফসানা কে কষ্ট পেতে দেখে খুশি হত। ওকে এড়িয়ে চলে যেত পাশ কেটে।
এদিকে অনেকটা সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও যখন আফসানা নিজের হাতটা দিলো না তখন ইমদাদ বিরক্তিকর গলায় বলল,
“হাতটা ধরবেন নাকি ধরবেন না? তূর্যকে ডাকবো?”
আফসানা তড়িৎ গতিতে বলল,
“না, কাউকে ডাকতে হবে না। উঠছি।”
কথাটা বলে ইমদাদের হাত ধরে উঠলো। পা টা সত্যি বোধহয় মচকে গেছে। হাঁটতে ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে। এই অবস্থায় আফসানা কে একা ছাড়তে পারল না ইমদাদ। ওকে ধরে ধরে আফসানার কেবিনে নিয়ে গেল।
কেবিনে নিয়ে যেতে না যেতেই কোত্থেকে যেন তূর্য হাজির হলো। কোত্থেকে যেন খবর পেয়েছে যে ওর ম্যাডাম পড়ে গিয়েছিল। কেবিনে ঢুকেই ব্যস্ত গলায় আফসানার দিকে ছুটে এসে বলল,
“ম্যাডাম ঠিক আছেন আপনি? ডাক্তার ডাকবো নাকি হাসপাতালে যাবেন?”
ইমদাদ বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তূর্যর দিকে তাকিয়ে বলল,
“পাসপোর্ট ভিসা ঠিক করুন। দেশে চিকিৎসা সম্ভব না। বিদেশ নিয়ে যেতে হবে। মেডিকেল বোর্ড বসান। যত্তসব পাগল ছাগল।”
তূর্যর মুখটা ছোট হয়ে গেল। আবারও আফসানা কে উদ্দেশ্য করে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“ম্যাডাম ঠিক আছেন আপনি?”
আফসানা তখন তাকিয়ে ছিল ইমদাদের দিকে। ইমদাদও ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল। সেজন্যই তো এমন ভাব দেখাচ্ছিল যে পুরো কেবিনে অন্যান্য জিনিস দেখতে ইমদাদ ভীষণ ব্যস্ত। তূর্যর ডাকে আফসানার ধ্যান ভাঙলো। উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছি।”
আফসানা কথাটা বলতেই ইমদাদ ঘড়িতে সময় দেখে তূর্যকে উদ্দেশ্য করে ব্যস্ত গলায় বলল,
“ম্যাডামের খেয়াল রাখবেন। আমি আসছি। দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার।”
কথাটা বলে ইমদাদ চলে যেতে ধরলে আফসানা পিছন থেকে ফের বলে উঠলো,
“পরশু কিন্তু অবশ্যই আপনার ওয়াইফকে নিয়ে আসবেন ইমদাদ। মনে থাকে যেন। আপনার ওয়াইফ কে নিয়ে আসবেন। আমি দেখতে চাই ওনাকে।”
ইমদাদ আলতো হেসে বলল,
“নিশ্চয়ই নিয়ে আসবো।”