অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ২৬

🟢

রাতে খাবার টেবিলে ইমদাদ কে কোথাও দেখতে পাওয়া গেল না। ইয়াসমিন কলিকে জিজ্ঞেস করলো কিন্তু কলি বলল ও নাকি জানেনা। ইয়াসমিনের ব্যাপারটা ঠিক লাগলো না। একদিকে ইমদাদ কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কলিকেও কেমন মনমরা দেখাচ্ছে। সন্ধ্যে থেকে তো খোঁজই ছিল না মেয়েটার। নিশ্চয়ই দুজনের মাঝে আবার বেশ ভালোই ঝামেলা হয়েছে।

ইয়াসমিন কলি কে জিজ্ঞেস করেই বসলো,

“ভাইয়ার সাথে তোমার কি কোন ঝামেলা হয়েছে কলি?”

কলি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না।”

“তাহলে তোমাকে এমন মনমরা দেখাচ্ছে কেন?”

“এমনিতেই।”

ইয়াসমিনের বিশ্বাস হলো না কলির কথাটা। ফের জিজ্ঞেস করলো ইয়াসমিন,

“সত্যি করে বলো কলি কি হয়েছে? আর ভাইয়া কোথায়? রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়নি তো?”

“আমি সত্যি জানি না আপু কোথায় গেছে ইমদাদ ভাই। আমায় তো বলে যায় না। যেখানে ইচ্ছে সেখানে চলে যায়। আমাদের দুজনের মাঝে সম্পর্কটা এমন না যে আমরা একজন আরেকজনকে বলে কিছু করবো। আমরা শুধু নামেই স্বামী স্ত্রী। নয়তো আমাদের মাঝে যে জঘন্য সম্পর্ক সেটা শত্রুদের মাঝেও থাকে না।”

কথাটা বলে কলি উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। ইয়াসমিন ডাকলো পেছন থেকে। খেয়ে যেতে বলল তবে মেয়েটা শুনলো না। কোন জবাবও দিল না। এবারে তো ইয়াসমিন আরো নিশ্চিত হয়ে গেল যে কলি যতই বলুক কিছু হয়নি। কিন্তু কিছু তো নিশ্চয়ই হয়েছে।

ঘরে গিয়ে নিজের ফোনটা নিয়ে ইমদাদকে কল করলো। তবে নাম্বারটা বন্ধ দেখাচ্ছে। ইয়াসমিনের চিন্তা আরো বাড়লো। বেশ কয়েকবার ইমদাদের নাম্বার ডায়াল করলো। তবে সেই একই অবস্থা। বন্ধ দেখাচ্ছে।

অস্থিরভাবে নিজের ঘরে পায়চারি করতে লাগল ইয়াসিন। আর ভাবতে লাগলো ইমদাদ কোথায় যেতে পারে। কার কাছে কল করলেই বা ইমদাদের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। ইয়াসমিনের এসব ভাবনার মাঝেই ওকে অবাক করে দিয়ে ওর ঘরে ইমদাদই প্রবেশ করলো। ওকে দেখে ইয়াসমিন চমকে উঠে বলল,

“তুমি কোথা থেকে এলে?”

ইমদাদ দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় বসে বলল,

“ছাদে ছিলাম। ভালো লাগছিলো না নিচে।”

ইয়াসমিন ইমদাদের পাশে বসে ওর কাঁধে হাত রেখে চিন্তিত গলায় বলল,

“কলির সাথে ঝামেলা করেছো? কলিরও তো দেখলাম মন খারাপ। কেন তোমরা অযথা ঝামেলা করো বলতো? সম্পর্কটা কি স্বাভাবিক করা যায় না?”

“আমাদের কথা বাদ দে। আমি তোর থেকে কিছু শুনতে এসেছি। আমি বিয়ে দিতে চাই তোর। আমার পছন্দের ছেলের সাথে। করবি?

হঠাৎ করে ইমদাদের মুখ থেকে বিয়ের কথাটা শুনতেই কিঞ্চিত অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো ইয়াসমিন। আশেপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে অস্বস্তি জড়ানো গলায় বলল,

“এখনই বিয়ের কথা কেন বলছো ভাইয়া? আমি পড়াশোনাটা শেষ করি।”

“নিশ্চয়ই করবি। কিন্তু আমি চাইছি বাদবাকি পড়াশোনা সহ তোর যা করার ইচ্ছে সব বিয়ের পর করবি। চিন্তা করিস না তোর পড়াশোনার ওপরে কোন নিষেধাজ্ঞা আসবে না।”

“সে তো বিয়ের আগে সবাই বলে ভাইয়া। তুমি দেখো বিয়ের পর আর জীবনেও পড়তে দেবেনা। তখন সংসারের কাজে লাগিয়ে দেবে।”

ইমদাদ ইয়াসমিনের মাথায় হাত রেখে আদূরে গলায় বলল,

“তোর ভাইয়ের প্রতি বিশ্বাস নেই? আমার বোনকে কি আমি নদীতে ভাসিয়ে দেবো নাকি! দেখে শুনে অনেক কিছু ভাবনা চিন্তা করে আমি তোর বিয়ে ঠিক করেছি। আর তারপরও যদি বিয়ের পর কোন অসুবিধা হয়, যদি তোর ও বাড়িতে থাকতে কোন সমস্যা হয় তাহলে আমি আছি না। তোর ভাই কি ম’রে গেছে নাকি? একবার শুধু ডাকবি। যতটা ধুমধাম করে তোর ভাই তোকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠাবে তার থেকেও ধুমধাম করে আবার নিজের বাড়িতে নিয়ে আসবে।”

ইমদাদ আশ্বস্ত করলো ঠিকই তবে ইয়াসমিন তাও ব্যাপারটা মেনে নিতে পারলো না কেন যেন। ইমদাদের দিকে ঘুরে বসে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

“ভাইয়া, তাও এখন বিয়ে দিও না। আমার খুব ভয় হয়। আর তাছাড়া তোমাদের কে ছেড়ে আমি থাকবো কি করে? আর আমি চলে গেলে এই বাড়ি সামলাবে কে বলতো? ইকবাল এখনো ছোট। ইমাদের পড়াশোনা চলছে। তুমি বাইরে থাকো সারাদিন। রান্নাবান্না কে করবে? কলি তো নিজেও ছোট। আর তোমাদের যা সম্পর্কের অবস্থা দেখছি কলি আজ আছে তো কাল হয়ত থাকবে না।”

ইমদাদ বোন কে আশ্বস্ত করে বলল,

“তোকে এত কিছু নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি ওদের ব্যবস্থা ঠিক করে নেব। দরকার পড়লে ইমাদেরও বিয়ে দিয়ে দেব। আর তা না হলে নিজে আরেকটা বিয়ে করে নেব। দুই বউ মিলেও সংসার সামলাতে পারবেনা!”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইমদাদের কথাটা শুনে ইয়াসমিন হেসে উঠে বলল,

“তখন সারাদিন সংসারে ঝামেলা লেগে থাকবে। দুই বউ মিলে তোমার মাথার একটা চুলও আর আস্ত রাখবে না। সে যাই হোক, এখন এসব মজা করার মুডে আমি নেই ভাইয়া। তবে আমি এখন বিয়েটা করব না। আমাকে আর একটু সময় দাও।”

“পিছুটানটা কি সাঈদ?”

ইমদাদের প্রশ্নটা শুনে হঠাৎ করে কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল ইয়াসমিন। হঠাৎ করে ইমদাদ এই প্রশ্নটা করবে সেটা বুঝে উঠতে পারেনি। কি উত্তর দেবে ইয়াসমিন সেটাও বুঝতে পারলো না। আসলে ওর পিছুটানটা কিসের? সাঈদকে তো ভালোবাসে না। তাহলে সাঈদ ওর পিছুটান হতে যাবে কেন? অন্য কিছু ইয়াসমিনের পিছুটান। কিন্তু কি, সেটাও খুঁজে পেল না।

ইয়াসমিনের থেকে তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর না পেয়ে ইমদাদের কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ সৃষ্টি হলো। ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হলো? উত্তর দিলি না যে! পিছুটান কি সাঈদ?”

ধ্যান ভাঙলো ইয়াসমিনের। একটু নড়ে চড়ে উঠে বলল,

“না ভাইয়া। উনি কেন পিছুটান হতে যাবে। তুমি ভুল ভাবছো।”

“তাহলে তৎক্ষণাৎ উত্তর দিতে পারলি না কেন? এত ভাবতে হলো কেন?”

ইয়াসমিন এবার আমতা আমতা করে বলল,

“আসলে ভাবছিলাম হঠাৎ তুমি এই প্রশ্নটা কেন করলে।”

ইয়াসমিন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিল। ইমদাদ ইয়াসমিনের মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে ইয়াসমিনের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল,

“সত্যি করে বল তুই কি সাঈদ কে ভালোবাসিস? এক শব্দে হ্যাঁ অথবা না উত্তর দিবি। আমি সাঈদ কে পছন্দ করি কিনা, আদৌ তোদের বিয়ে হবে কিনা, আরো যা ঝামেলা আছে সেই সব বিষয় মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে শুধু আমায় একটা কথা বল তুই ওকে ভালোবাসিস কিনা।”

ইমদাদের কথাটা শুনে ইয়াসিন সত্যিই ভাবনায় পড়ে গেল। নিজেই নিজেকে বারংবার প্রশ্ন করতে লাগলো যে ও কি আসলে সাঈদকে ভালোবাসে। কই কখনো তো তেমন কিছু অনুভব করতে পারেনি। কখনো তো সাঈদের প্রতি সেই টানটাই অনুভব করতে পারেনি। তাহলে তো ভালোবাসে না ইয়াসমিন সাঈদ কে।

ইমদাদ অধীর আগ্রহে ইয়াসমিনের দিকে তাকিয়ে আছে। ইতোমধ্যে ওর কপালের ঘামের দেখাও পাওয়া গেছে। চিন্তায় আছে যে ইয়াসমিনের উত্তরটা আসলে কি হবে। ইমদাদ জানে না যদি ইয়াসমিন হ্যাঁ বলে তাহলে ও কি করবে। তবে জানে যদি না বলে তবে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়বে।

এসব ভাবনার মাঝে ইয়াসমিন দু দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না ভাইয়া। আমি ওনাকে ভালোবাসি না।”

তৎক্ষণাত ইমদাদ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। মনে হলো বুকের উপর থেকে একটা পাথর নেমে গেল। কি যে চিন্তায় ছিল তা বলে বোঝাতে পারবে না। তবে ইমদাদের স্বস্তিটা বেশিক্ষণ টিকলো না। ইয়াসমিন আবারো বলে উঠলো,

“কিন্তু ভাইয়া হয়তো একটা মায়া ছিল। আমি বলবো না ওনার প্রতি আমার ভালোবাসা ছিল। কেননা সেটা সত্যিই ছিল না। এখনো নেই। তবে বারংবার ওনার পাগলামি দেখে, ওনার স্বীকারোক্তি গুলো শুনে আমার মন দুর্বল হতে চাইতো। কিন্তু আমি কখনো তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি। সেজন্য আমি নিজেকে খুব কঠিনভাবে সামলেছি। জানিনা তুমি আমার এই কথাটা শুনে রাগ করলে কি না তবে আমি যেটা সত্যি সেটাই তোমায় বলেছি। ওনার প্রতি ভালোবাসা ছিল না। তবে একটা মায়া ছিল। তবে তোমায় আমি তার থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসি। তুমি আমার কাছে সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাইনা এই নিয়ে তোমার মনের মাঝে কোন সন্দেহ তৈরি হোক। আমি চাইনা আমায় নিয়ে তুমি আর আলাদা করে কোন কিছু চিন্তা করো। তাই আমি আমার মত দিয়ে দিলাম এই বিয়েতে।”

“তুই যে বললি তোর সময় লাগবে?”

“বলেছিলাম। কিন্তু আবার নিজের সিদ্ধান্ত বদলেছি। আমিতো জানি ভাইয়া তুমি এমন কিছু করবে না যেটা আমার জন্য খারাপ হতে পারে। সারা জীবন আমাদেরকে ভালো রাখার জন্য, আমাদের খুশির জন্য অনেক কিছু করেছো। আর আমি তোমার কথায়, তোমার উপর ভরসা করে বিয়েটা যদি না করতে পারি তাহলে তো তোমায় অপমান করা হয়ে যায়। আমি তোমায় কথা দিচ্ছি এই নিয়ে আমি আর তোমায় একটা প্রশ্নও করব না। তোমার বিশ্বাসের উপর আমার বিশ্বাস আছে। তুমি যাকে, যখন বিয়ে করতে বলবে আমি তখনই রাজি।”

___________

বিজ্ঞাপন

রাত তখন প্রায় এগারোটা বাজে। কলি নিজের ঘরে পায়চারি করে যাচ্ছে। ছটফট করছে একপ্রকার। কেননা এখনও ইমদাদ ঘরে আসেনি। খাবার খেতে বসে তখন ইয়াসমিন তো বলল ও নাকি জানে না। তাহলে গেল কোথায় ইমদাদ? কলির উপরে রাগ করে কি বাড়ি ছেড়ে চলে গেল? আবার নিজের কোন ক্ষতি করল না তো কিংবা কোন বিপদ হলো না তো? আচ্ছা কলির বাড়ির লোক আবার ইমদাদের কোন ক্ষতি করে দিল না তো?

কথাগুলো ভাবতেই ভয়ে আর চিন্তার দুচোখ ছলছল করে উঠলো কলির। এদিকে ছেলেটার ফোনটাও বন্ধ। আর কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে কলি ইয়াসমিনের ঘরে ছুটে এলো। ইয়াসমিন তখন ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কলি কে এভাবে কাঁদো কাঁদো হয় ছুটে আসতে দেখেই ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,

“কি হয়েছে কলি? কাঁদছো কেন?"

কলি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

“আপু, ইমদাদ ভাই তো এখনও এলো না। আমার মনে হয় কি জানো ইমদাদ ভাই আমার ওপরে রাগ করে চলে গেছে বাড়ি ছেড়ে। আমি এখন কি করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আমায় তো ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটাও দিলোনা আপু। আমি এখন কি করবো?”

কথাটা বলে মেয়েটা কেঁদে দিল। ইয়াসমিন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তড়িঘড়ি করে মেয়েটাকে আগলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,

“আরে ভাইয়া যায়নি তো রাগ করে বাড়ি ছেড়ে। ছাদে আছে। এই পাগলি কাঁদছো কেন? ভাইয়া ছাদে আছে। কিছু হয়নি।”

মুহূর্তের মাঝে কলির কান্না থেমে গেল। প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে ইয়াসমিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ছাদে আছে? তুমি জানো?”

“হ্যাঁ। একটু আগে ছাদ থেকে নেমে এসে আমার সাথে কথা বলে আবার ছাদে গেছে। তুমি ছাদে যাও। আর বলছিলে না ক্ষমা চাওয়ার আছে। ছাদে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নাও। আর শোনো, বড় বোন হিসেবে একটা উপদেশ দিচ্ছি। ভাইয়ার সাথে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করো। সম্পর্কে এমন কোন ফাঁক তৈরি করো না যেন সেখানে তৃতীয় কোন ব্যক্তি অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে। সম্পর্কে এতটা দূরত্ব তৈরি করো না কলি যে আর কখনো কাছেই না আসতে পারো। যাও। ভাইয়ার সাথে কথা বলে এসো।”

কলি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেল।

ইমদাদ তখন ছাদের রেলিং এর সাথে পিঠ এলিয়ে দিয়ে মনের সুখে সিগারেট টানছে। আশেপাশে কয়েকটা পোড়া সিগারেট পরেও আছে। বোধহয় এক প্যাকেট সিগারেট শেষ করে ফেলেছে। হাতে বর্তমানে যেটা আছে সেটাও প্রায় শেষের পথে। হঠাৎ করেই কারো পায়ের আওয়াজ পেল। বুঝলো কেউ একটা খুব তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। ইমদাদের মনই বলল এটা কলি ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না।

ইমদাদের সেই ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করে দিয়ে কলি এলো ছাদে। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা চোখ মুখ এই অল্প সময়ের মাঝে লাল করে ফেলেছে। ইমদাদ উদ্বিগ্ন হলো কলির কান্নারত মুখটা দেখে। কিন্তু তারপরও নিজের উদ্বিগ্নতার সামান্যটুকু প্রকাশ করল না। মনের মাঝে হঠাৎ করেই প্রশ্নের তুমুল ঝড় উঠে গেল যে কেন কলি এভাবে ছুটে এলো ওর কাছে? কোন উত্তর খুঁজে পেলো না ইমদাদ। মুখ ফুটে কলিকে জিজ্ঞাসাও করা হলো না।

ইমদাদের এসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ করে কলি ওর দিকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো ইমদাদ কে। দুহাতে ইমদাদের পিঠের শার্ট খামচে ধরে ক্রন্দনরত গলায় হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,

“তুমি তো জানোই আমি একটু বোকা। তুমি তো বলো আমার বুদ্ধি নাকি হাঁটুতে থাকে। তাহলে আমার কথা ধরে রাগ করে বসে থাকো কেন? মানছি আমার বাবা ভালো না, আমার পরিবারের সবাই খারাপ কিন্তু সেটা আমার বিশ্বাস করতে একটু হলেও কষ্ট হবে তো নাকি? তোমার মতন এত কঠিন হৃদয় আমার না। আমি এতগুলো বছর ওই পরিবারে বড় হয়েছি। চোখের সামনে সব সময় ওই মানুষগুলোকে দেখেছি, ওদেরকে ভালোবেসেছি। হঠাৎ করে তাদের এই ভয়ঙ্কর রুপ চোখের সামনে এলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে না আমার? এত তাড়াতাড়ি কিভাবে ঘৃণা করবো? একটু তো সময় দিতে হবে আমায়।”

ইমদাদ পাল্টা জড়িয়ে ধরেনি কলি কে। মনের সুখে তখনো সিগারেট টানছিল। হাতে থাকা সিগারেটটাও শেষ হয়ে গেল। সেটা ফেলে দিয়ে গা ছাড়া ভঙ্গিতে কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তো তোকে কি আমি ঘৃণা করতে বলেছি নাকি? যা গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে বসে থাক তোর বাপ দাদার।”

“আমি কি সেটা বলেছি? তোমার পরিবারের লোকদেরকে খারাপ বললে তোমার যেমন কষ্ট লাগে আমারও তেমন কষ্ট লাগে। হ্যাঁ মানছি আমার পরিবারের লোকজন আসলেই খারাপ। কিন্তু তাও আমার কষ্ট লাগে। সবাই শুধু সবসময় আমায় বোকাই বানিয়েছে। আমায় ভুলই বুঝিয়েছে। এখন যে যেটা আমাকে বোঝাবে সেটাই তো আমি বুঝবো তাই না?”

“তাহলে আমি যেটা বোঝানোর চেষ্টা করি সেটা বুঝিস না কেন? তখন এত বুদ্ধি কোথা থেকে চলে আসে?”

এবারে কোনো উত্তর দিতে পারল না কলি। চুপচাপ শুধু কেঁদেই গেল। কিছুক্ষণ নীরবতা পালনের পর ইমদাদ বলে উঠলো,

“ঝোঁকের বসে কি আমায় জড়িয়ে ধরেছিস না ইচ্ছে করে? হুঁশ ফিরলে ছেড়ে দিবি আবার?”

ইমদাদ কথাটা বলার সাথে সাথে কলি ওকে ছেড়ে দিল। আসলেই ঝোঁকের বসে জড়িয়ে ধরেছিল। এখন ইমদাদ সরাসরি কথাটা বলায় অস্বস্তির মাঝে পড়ে গেল। লজ্জাও পেল খানিকটা। ভাবলো এভাবে এসে বোধহয় জড়িয়ে ধরাটা উচিত হয়নি ইমদাদ কে। ইমদাদ নিশ্চয়ই খারাপ ভাবলো ওর সম্বন্ধে।

কলির এসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ করে ইমদাদ ওর কোমর পেঁচিয়ে ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিজের শরীরের সাথে একেবারে মিশিয়ে নিল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল কলি। হতভম্ব দৃষ্টিতে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে যেই না কিছু বলতে গেল অমনি ইমদাদের মুখ থেকে সিগারেটের উটকো গন্ধ ভেসে এলো। বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে কলি বলল,

“ছিঃ! কি বাজে গন্ধ। মনে হচ্ছে সিগারেট না গোবর খেয়েছো।”

কলি নিজের মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে কথাটা বলেছিলো। ইমদাদ ওর কথার কোন উত্তর দিল না। এক হাতে কলির চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে ওর মুখটা নিজের দিকে ঘোরালো। মৃদু গম্ভীর গলায় বলল,

“চোখ বন্ধ কর।”

“এ্যাঁহ! চোখ বন্ধ করব কেন?”

“ক্ষমা চাস তো আমার থেকে? চোখ বন্ধ কর না হলে ক্ষমা করবো না।”

“অদ্ভুত তো! এটা আবার কেমন নিয়ম? আজগুবি এক নিয়ম বানালেই হলো।”

ইমদাদ রাগে কটমটিয়ে বলল,

“চোখ বন্ধ করতে বলেছি আমি। আবার কিন্তু রাগ তুলছিস আমার।”

কলি অসহায় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপরে বাধ্য হয়ে সত্যি চোখ দুটো বন্ধ করলো। ভেসে এলো কলির কানে ফের ইমদাদের একটা সাবধানী বার্তা।

“ছটফট করবি না। চুপচাপ শুধু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবি। ধাক্কাধাক্কিও করবি না। আমার কাজে যেন কোন অসুবিধা না হয়।”

কলি এবারে বিরক্তিকর গলায় বলে উঠলো,

“অদ্ভুত তো! ক্ষমা আমি চাইবো। তাহলে মুখ দিয়ে অন্তত......।”

নিজের কথা সম্পন্ন করতে পারল না কলি। তার আগেই আরো প্রবল ভাবে অনুভব করতে পারলো সিগারেটের উটকো গন্ধটা। সেই সাথে নিজের ঠোঁটের ওপর ইমদাদের ঠোঁটের স্পর্শও অনুভব করতে পারলো। মুহূর্তের মাঝে কলির গা শিউরে উঠলো। ইমদাদের সাবধান করার দরকার ছিল না। কেননা কলি এমনিতেই নড়াচড়া করার শক্তি হারিয়েছে।

খুব বেশিক্ষণ কলির ঠোঁটের ওপর ইমদাদ জুলুম চলল না। মুক্তি দিল কলির ঠোঁট জোড়া কে। তবে কলি মুক্তি পেল না ইমদাদের বাঁধন থেকে।

দুজনেরই শ্বাস প্রশ্বাসের গতি তুমুল ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কলি ইমদাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর মতন অবস্থাতে নেই। তবে ইমদাদের মাঝে কোনো অস্বস্তি, অনুশোচনা কিচ্ছু দেখা গেল না। বরং এবারে ইমদাদ নিজে দুহাতে কলি কে জড়িয়ে ধরলো। আরেক দফা চমকালো ইমদাদ। কলির চুলের মাঝে নাক ডুবিয়ে সম্মোহনী গলায় বলল,

“যেটা করলাম সেটা অন্যায় ছিল কিনা জানিনা। তোর অনুমতি নেওয়ার দরকার ছিল কিনা সেটাও জানিনা। তোর তিরতির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট দেখে নিজেকে সামলাতে পারিনি। মনে হয়েছিল আমার তোর ঠোঁট এখনি দরকার। তাই দখল করে নিয়েছিলাম। আর এর জন্য আমার কোনো আফসোস নেই।”

কলির অস্বস্তি বাড়লো। ইমদাদের থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করে বলল,

“অনেক রাত হয়ে গেছে। নিচে চলো।”

ইমদাদ আরেকটু শক্ত করে কলি কে জড়িয়ে ধরে আকুতির স্বরে বলল,

“মনে আছে কলি তোকে আমি বলেছিলাম তোর শরীর-মন কোনোটারই দরকার নেই আমার? কিন্তু বিশ্বাস কর আমার তোর থেকে এই দুটোই দরকার। আমাকে একটু কাছে টেনে নে না কলি! একটু ভালোবাসবি আমায়! আমায় একটু ছুঁতে দিবি তোকে! একটু আমার কাছে আসবি! এই কলি, একবার একটু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি! তুই বোকা, চালাক যাই হোস না তাও আমি তোকে কিভাবে যেন ভালোবেসে ফেলেছি কলি। তুই একটু আমার শান্তির কারণ হতে পারবি না?”

স্তব্ধ হয়ে গেল কলি। বিস্ময়াবিভূত কন্ঠে বলল,

“তুমি ভালোবাসো আমায়?”

“হ্যাঁ। খুব ভালো......”

থেমে গেল ইমদাদ। চটপট কলি কে ছেড়ে দিয়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে গম্ভীর গলায় বলল,

“রাত অনেক হয়েছে। নিচে চল।”

ইমদাদ আর কলি কে কিছু বলার সুযোগই দিল না। একপ্রকার পালালো যেন সেখান থেকে। কলির এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে একটু আগে ওই কথাগুলো ইমদাদ ওকে বলেছে। বিশ্বাসই করতে পারছে না যে ইমদাদ ওকে ভালোবাসে। কবে ভালোবাসলো? কিভাবেই বা ভালোবাসলো? পরিণতিই বা কি এই ভালোবাসার?

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প