অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ২৮

🟢

বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই ইমদাদের শরীরটা খারাপ করলো। আগে থেকেই একটু ঠান্ডা লেগেছিল। তবে অসুস্থটা বাড়াতে জ্বরও চলে এলো। তবে ইমদাদ কে দেখে সেসব বোঝার কোন উপায় নেই। সটান বসে আছে। হাতে কি সব যেন কাগজপত্র। কে জানে কি আছে কাগজপত্রে।

বিছানায় বসে অনেকক্ষণ থেকে কলি ইমদাদ কে দেখছে। মাথার মধ্যে এখনো ঘুরছে সেই দুপুরের ঘটনাটাই। বারবার শুধু একটা প্রশ্নই মাথায় আসছে কেন ইমদাদ সাঈদ কে মেনে নিল? সত্যি কি মেনে নিয়েছে? নাকি এর পেছনে আবার কোন ষড়যন্ত্র আছে?

“শোনো!”

কলির ডাকটা কানে যেতেই ইমদাদ কাগজপত্রের উপর থেকে চোখ তুলে কলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“এত মিষ্টি করে ডাকার মানে? ইমদাদ ভাই ডেকে হুশ পাস না আজ আবার শোনো! মনে হচ্ছে আমার বউ হওয়ার চেষ্টা করছিস।”

কলি মুখ ভেংচিয়ে বলল,

“আমি না হয় শুধু শোনো বলে ডেকেছি। নিজে কি কি করেছো সেসব খেয়াল নেই? নিজের দোষ কেউ দেখেনা।”

একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো ইমদাদ। বুঝলো নিজের কথার জালে নিজেই ফেঁসে গেছে। সেই জন্য আপাতত আর এই নিয়ে কোন কথা তুলতে চাইলো না।

“ডাকছিলি কেন সেটা বল।”

কলি সন্দেহী দৃষ্টিতে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“আমায় সত্যি করে বলোতো তোমার উদ্দেশ্য কি? কথা দিচ্ছি কাউকে বলবো না। ভাইয়ার সাথে ইয়াসমিন আপুর বিয়েটা মেনে নিলে কেন?”

“যা বলার সবার সামনেই বলেছি। তোকে আলাদা করে বলার মতন কিছুই নেই। আর এমন না যে তোকে আলাদা করে বললে তুই কিছু বুঝবি। তুই গরু, গরুর মতনই থাকার চেষ্টা কর।”

কলির মোটেই পছন্দ হলো না ইমদাদের কথা বলার ধরনটা। তেঁতে উঠে বলল,

“সব সময় আমার সঙ্গে এমন করে কথা বলাে কেন? ফোনে যখন কথা বলো তখন তো খুব সুন্দর করে কথা বলো। দেখে মনে হয় কত ভদ্র ছেলে তুমি। কি বলে এত ফোনের ওপাশ থাকে যে তোমার কন্ঠ এত নরম শোনায়?”

কোন উত্তর দিল না ইমদাদ। কিছুক্ষণ শান্ত দৃষ্টিতে কলির দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলল,

“আমি তোকে বলেছি আফসানা আমার প্রেমিকা না। এক কথা বারবার বলতে আমার ভালো লাগেনা।”

কথাটা বলে ইমদাদ আবারো নিজের কাজে মনোযোগ দিল। কলি ভেংচি কেটে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকলো। কিছুক্ষণ পর কি যেন ভেবে ইমদাদ আবার কলি কে জিজ্ঞেস করলো,

“তুই সত্যি কি কিছু বুঝিস না কলি? নাকি বুঝতে চাস না? নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করে বসে থাকিস?”

কলি ইমদাদের দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো,

“কি বোঝার কথা বলছো?”

ইমদাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“কিচ্ছু না।”

“বলোনা কি বোঝার কথা বললে?”

“বললাম তো কিছু না।”

“আরে ধুর! বলোতো। না বললে আমার পেটের ভাত হজম হবে না। আমার বদহজম হয়ে যাবে কিন্তু।”

“হোক। বেশি সমস্যা হলে ওষুধ এনে খাইয়ে দেবো।”

কলি কোনমতেই নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারলো না। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে সোফায় ইমদাদের পাশে বসলো। চোখে মুখে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলে বলল,

“বলোনা ইমদাদ ভাই। কি বোঝার কথা বলছিলে সেটাই তো বুঝলাম না। আচ্ছা একটু ইঙ্গিত দাও।”

“ইঙ্গিত বোঝার ক্ষমতা তোর মতন গরুর নেই। যা তো এখান থেকে। সমস্যা হচ্ছে আমার।”

কলি গেল না। বরং আরেকটু ইমদাদের গা ঘেষে বসে ওর বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,

“বলো না ইমদাদ ভাই!”

কলি ইমদাদের এতটা কাছাকাছি এসে বসায় সত্যি ইমদাদের অসুবিধা হচ্ছে। ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে। মনে হচ্ছে শরীরের তাপমাত্রা যেন আরো বেড়ে যাচ্ছে। ইমদাদ একটু রেগে উঠে কলির থেকে সরে বসলো। সেই সাথে ধমক দিয়ে উঠে যেতেও বলল। তবে কলি নাছোড়বান্দা। এখন তো জেদ উঠে গেছে। না শুনে ছাড়বেই না।

আবারো ইমদাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর গা ঘেষে বসে সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করল। ইমদাদের কাছে আর সরে বসার মতন জায়গা নেই। এদিকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাও ধীরে ধীরে কষ্টকর হয়ে উঠছে। শেষে দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে কলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“একবার সীমা পার করে গিয়েছিলাম। এবারে কিন্তু আর অসুবিধা হবে না তেমন একটা৷ সংকোচ, জড়তা, লজ্জা সবই কেটে গেছে। তাই তোর ভালোর জন্য বলছি আরেকবার সীমা পার করতে বাধ্য করিস না আমায়। নয়তো গতকাল ছাদের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে কিন্তু।”

মুহূর্তের মাঝে চুপ হয়ে গেল কলি। এক লাফে ইমদাদের থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে বসে তোতলানো গলায় বলল,

“অসভ্য কোথাকার! খালি একটা অসহায় মেয়ের সুযোগ নেওয়া তাই না। থাকবোই না এখানে।”

কথাটা বলে উঠে চলে যেতে নিয়েও আবার কি ভেবে যেন থেমে গেল কলি। পিছন ঘুরে তাকিয়ে ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমার শরীর এত গরম লাগলো কেন? অসুস্থ তুমি? জ্বর এসেছে?”

“তোকে ভাবতে হবে না। তুই এখন ঘর থেকে বেরিয়ে যা৷ পরে আমি যখন ডাকবো তখন আসিস।”

কলি শুনলো না ইমদাদের কথা। আবারো ইমদাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে ইমদাদের কপালে হাত রাখলো। মৃদু কেঁপে উঠলো ইমদাদ। কলির দিকে মোটেও তাকানোর চেষ্টা করল না। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখল। কলি ইমদাদের কপালে গালে হাত রাখতেই বুঝল বেশ ভালোই জ্বর উঠেছে ইমদাদের গায়ে। চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

“তোমার তো জ্বর এসেছে। বলোনি কেন আমায়? ওষুধও তো খাওনি মনে হয়।”

“আমি খেয়ে নেব। তোকে যেতে বললাম তো।”

কলি এবারে রাগী গলায় বলল,,

“সব সময় এত বের করে দেবে না তো আমাকে ঘর থেকে। এটা আমারও ঘর। দাঁড়াও ওষুধ আনি।”

কথাটা বলে কলি ওষুধ আনতে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। ইমদাদের কোন উদ্দেশ্য ছিল না কলি কে আটকানোর। বরং চাইছিল যেন কলি তাড়াতাড়ি চলে যায়। কিন্তু হঠাৎ করে কি হলো কে জানে। কলির হাতটা টেনে ধরল। একটানে কলিকে নিজের হাঁটুর উপরে বসালো।

কলি চমকে উঠে বলল,

“টানাটানি করছ কেন?”

কথাটা বলে বিরক্তিকর মুখ ভঙ্গিতে যেই না ইমদাদের দিকে তাকালো ওমনি ইমদাদের অভিব্যক্তি দেখে কলি নিজেই দমে গেল।

আজকাল কলিকে দেখলেই ইমদাদের কি যেন হয়ে যায়। কলি যেন আজকাল ইমদাদের জন্য একটা নেশার মতন। যাকে দেখলেই কেমন যেন একটা মাদকতা ছড়িয়ে যায়। ইমদাদের ইচ্ছে করে শুধু তাকিয়েই থাকতে। মাঝে মাঝে একটু ভুল ভাল কিছু করতে ইচ্ছে করে। এই যেমন এখন ইচ্ছে করছে।

এদিকে কলি একটু নড়েচড়ে উঠল ইমদাদের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য। তবে ছেলেটা দুই হাতে শক্ত করে কোমর জড়িয়ে ধরে বসে আছে। কলি ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করে বলল,

“ছেড়ে দাও। ওষুধ আনতে যাব, জ্বর বেড়ে যাবে কিন্তু।”

ইমদাদ কন্ঠে মাদকতা মিশিয়ে বলল,

“জ্বর তো তুই বাড়িয়ে দিলি। তাহলে ওষুধ কমাবে কেন? তুই কমিয়ে দে।”

“ও মা! আমি আবার জ্বর কমাবো কি করে? মাথা গেল নাকি তোমার। ছাড়াে তো। তোমাকে আগে ওষুধ খাইয়ে সুস্থ করি।”

কথাটা বলে কলি ওঠার চেষ্টা করলো কিন্তু উঠতে পারল না। এবারে বিরক্ত হয়ে বলল,

“সব সময় এমন জোরাজোরি ভালো লাগে না কিন্তু আমার। আমাকে বললেই তো ভালো করে বসতাম। পাশে তো জায়গা আছে। এখানে বসানোর কি আছে।”

ইমদাদ হেসে ফেলল কলির কথা শুনে। ওকে হাসতে দেখে কলি ভরকালো। যেই না মুখ ফুটে কিছু বলতে নিল অমনি কলির ঠোঁটের ওপরে ইমদাদ নিজের আঙুল রেখে বলল,

বিজ্ঞাপন

“হুঁশশশ। জানি হয়তো বাড়াবাড়ি কিছু চাইবো। কিন্তু তবুও চাইবোই। বেশি না শুধু একবার তোর ঠোঁট আমার কপালে ছোঁয়াবি! একবার আমায় জড়িয়ে ধরবি! একটু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি কলি। জানিস, আমি সচরাচর অসুস্থ হই না। হয়তো আমার অসুখও জানে যে আমার যত্ন নেওয়ার মতন কেউ নেই। তবে আজ তোকে দেখে অসুস্থ হয়ে গেলাম। একটু যত্ন নিবি আমার!”

একটু মায়া হলো কলির ইমদাদের জন্য। এই কথাটা একেবারেই মিথ্যক না যে ইমদাদের যত্ন নেওয়ার মতন কেউ নেই। ইয়াসমিন একা আর কতই বা করে। মেয়েটা তো নিজেও ছোট। তাও তো পুরো সংসারটা ওই সামলায়।

কলি ভাবলো ইমদাদের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেওয়াই যায়। তবে হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল এর আগের দিন রাতে হঠাৎ করে ইমদাদের ছাদ থেকে পালানোর কথাটা৷ ভালোবাসি বলে পালিয়ে ছিল কেন? সৎ সাহস নেই নাকি। আর যদি ভালো নাই বেসে থাকে তাহলে বলেছিল কেন?

মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার থেকে যত্ন আশা করোই বা কেন তুমি? আমি তো আর তোমাকে ভালোবাসি না। আর না তুমি আমাকে ভালোবাসো।”

ইমদাদ আলতো হেসে বলল,

“কে কাকে কতখানি ভালোবাসে সেটা বোঝার ক্ষমতা তোর নেই।”

“তাই নাকি? তাহলে পালিয়েছিলে কেন গতকাল ছাদ থেকে? আমি না হয় ঝোঁকের মাথায় জড়িয়ে ধরেছিলাম। তারমানে তুমিও ঝোঁকের বশেই ভালোবাসি কথাটা বলেছিলে?”

ইমদাদ পলকহীন দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল কলির দিকে। কলি অপেক্ষা করলো ইমদাদের উত্তরের। তবে কোন উত্তর পেল না। হঠাৎ করে বাঁধনটা হালকা হয়ে গেল। ইমদাদ কলিকে ছেড়ে দিয়ে বলল,

“যা ওষুধ নিয়ে আয়।”

যেহেতু ইমদাদ কথাটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে গেল, ঠিকঠাক কোন উত্তর দিল না। তাই কলি ধরে নিল যে ইমদাদ সত্যি ভালোবাসে না। তাই আর এই নিয়ে কোনো কথা বাড়ানোর ইচ্ছে হলো না। ইমদাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার ইচ্ছেও হলো না৷ উঠে গিয়ে ওষুধটা নিয়ে এসে ইমদাদের হাতে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বর্তমানে ইমদাদের মুখটাও দেখতে ইচ্ছে করছে না।

_________

বেশ অনেকক্ষণ ইয়াসমিনের সাথে কথাবার্তা বলল কলি। দুজন মিলে আলোচনা করলো হঠাৎ করে ইমদাদ সাঈদের ব্যাপারে রাজি হলো কেন। অনেকক্ষণ গল্প গুজব শেষে কলি যখন ঘরে এলো দেখল ইমদাদ ঘুমিয়ে পড়েছে। এত তাড়াতাড়ি তো ঘুমোয় না মানুষটা। কে জানে আজ কি হলো। কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। বোধহয় জ্বর বেশি এসেছে।

কলি পা টিপে টিপে ইমদাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর পাশে বসে কপালে হাত রাখলো। জ্বর তো সত্যি বেড়েছে। কিন্তু ওষুধ খেলে তো জ্বর কমে যাওয়ার কথা ছিল। কে জানে ওষুধটা আদৌও খেয়েছিল কিনা। কলি দেখল ইমদাদ কাঁপছে। আলমারি থেকে একটা কম্বল বের করে এনে ইমদাদের গায়ে জড়িয়ে দিল।

কিছুক্ষণ সেভাবে ইমদাদের পাশে বসে রইলো৷ আজকাল কেন যেন ইমদাদের প্রতি কলির রাগ হয় না তেমন একটা। আর হলেও সেই রাগ ইমদাদের প্রতি ঘৃণা থেকে জন্ম নেয় না। বরং অন্য কোন কারণে। কলিকে অবহেলা করলে হয়, কলির থেকে অন্য কাউকে বেশি প্রাধান্য দিলে রাগ হয়, কলির সাথে ভালোভাবে কথা না বললে রাগ হয়, কলিকে সময় না দিলে রাগ হয়।

আজকাল কলি বুঝতে পারে ও ইমদাদকে যতটা খারাপ ভাবতো ততটাও খারাপ না। ইমদাদের এমন কাঠখোট্টা রগচটা স্বভাবের পেছনেও যথেষ্ট কারণ ছিল। হয়তো এমন স্বভাবের না হলে একা একা এতগুলো ভাই বোনকে নিয়ে টিকতে পারত না। হয়তো সবাইকে সামলাতে গিয়ে ইমদাদ কে বয়সের আগেই অনেক বড় হয়ে যেতে হয়েছে৷ সেই কবে মা-বাবা দুজনেই মা'রা গেছে। আর আজ এতগুলো বছর ধরে ইমদাদকে পুরো সংসারের দায়িত্ব বহন করতে হচ্ছে।

হঠাৎ করে কলির মনে একটু অপরাধবোধ সৃষ্টি হলো। তখন তো ইমদাদ মুখ ফুটে বলল যেন একটু ওর যত্ন নেয়। আর কলি কিনা রেগে মেগে বেরিয়ে গেল। কাজটা ঠিক করেনি কলি।

নিজের অপরাধবোধটা কমানোর জন্য ইমদাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল কিছুক্ষণ। ইমদাদের ঘুম ভাঙলো না। কলি ভাবলো এই সুযোগটা কাজে লাগানো যায়। ইমদাদের চোখের সামনে কিছুক্ষণ হাত নাড়লো বোঝার জন্য জেগে আছে কিনা না। জেগে নেই। চোখ একটুও নড়ছে না। এই সুযোগে কলি টপ করে ইমদাদের কপালে একটা চুমু খেয়ে নিল। তারপরে যেই না উঠে চলে যেতে ধরল অমনি কম্বলের ভেতর থেকে হাত বের করে ইমদাদ ওর হাতটা টেনে ধরল৷

ভয়ে কলি কেঁপে উঠল। চোখ বড় বড় করে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি ঘুমোওনি!”

ইমদাদ ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“অপেক্ষা করছিলাম তুই কি করিস সেটা দেখার জন্য। রোজ আমি ঘুমিয়ে গেলে কি এসব করিস? লজ্জা করেনা একটা ঘুমন্ত ছেলের সুযোগ নিতে?”

কলি সত্যি লজ্জায় পড়ে গেল। তড়িঘড়ি করে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“কোনদিন করি না। বিশ্বাস কর আজকে প্রথম করলাম। সত্যি বলছি আমি এমন না।”

নিজের এই অসুস্থ শরীরেও কলির কথা শুনে ইমদাদ হেসে ফেলল। বরাবর যেমন কলিকে টেনে নিজের কাছে আনতে হয় এবারও তাই করতে হলো। একটানে কলিকে নিজের পাশে আনলো। কলি হুমড়ি খেয়ে পড়লো। সেই সাথে বিড়বিড় করে বলল,

“অসুস্থ হলেও গায়ের জোর কমেনি। রাক্ষস একটা।”

কলির বিড়বিড় করার মাঝেই ইমদাদ নিজের গায়ে থাকা কম্বল দিয়ে কলি কেও ঢেকে দিল। তারপরে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আজকে আবারো কলির গলার ভাজে মুখ ডুবিয়ে সাবধানী গলায় বলল,

“শরীর ভালো না আমার। একটু ঘুম দরকার। আশা করছি নাড়াচাড়া করে আমার ঘুমের সমস্যা করবি না।”

কলি ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল,

“আমাকে ছেড়ে দিয়ে ঘুমোও। আমি এভাবে সটান শুয়ে থাকতে পারিনা। আর তাছাড়া আমার গরম লাগছে।”

“তোর স্বামীর জ্বর এসেছে। তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাক। দেখছিস না আমি কাঁপছি। একটু উষ্ণতা দে আমায়। ভালোবাসা না হয় নাই দিতে পারলি উষ্ণতাও দিতে পারবি না! এখন ঘুমো।”

ইমদাদ আর কলির থেকে কোন কিছু শোনার প্রয়োজন মনে করলো না। ঘুমিয়ে পড়লো। কলি কিছুক্ষণ ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করতে করতে একসময় নিজেই থেমে গেল। বুঝলো আজ রাতেও ওর আর ভালো ঘুম হবে না। এভাবে কেউ আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে শুয়ে থাকলে ঘুমোনো যায় নাকি!

________

প্রায় এক ঘন্টা যাবত ইয়াসমিনের কলেজের বাইরে দাঁড়িয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছে সাঈদ। কাল দুপুর থেকে সাঈদের মুখ থেকে হাসি সরছেনা। এখন আর লুকিয়ে লুকিয়ে ইয়াসমিনের সাথে দেখা করার কোন প্রয়োজন নেই। ওদেরকে একসঙ্গে দেখলেও কেউ কিছু বলতে পারবেনা।

দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পর অবশেষে ইয়াসমিনকে গেট দিয়ে বের হতে ওর দেখল। ওর সাথে ইমাদও আছে। দুজন একই কলেজে পড়ে। হঠাৎ করে সাঈদ ইয়াসমিনের সামনে দাঁড়ানোয় ইয়াসমিন চমকে উঠলো। সাঈদ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিঞ্চিত অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো।

বরাবরই ইমাদ সাঈদ কে দেখে একটু ভয় করে। আর সেটা সাঈদের রগচটা স্বভাবের জন্য। ইমাদের সাথে খুব একটা ভালো সম্পর্কও না। তবে আজ ইমাদ কে দেখে সাঈদ নিজেই ওকে জিজ্ঞেস করল,

“ভালো আছিস?”

ব্যাপারটা চমকানোর মতনই ইমাদের জন্য। তবুও উত্তর দিল,

“হ্যাঁ ভালো আছি ভাইয়া। তুমি ভালো আছো?”

“কাল থেকে খুব ভালো আছি।”

“আচ্ছা ঠিক আছে তোমরা কথা বলো। আপু, আমি আমার বন্ধুদের সাথে একটু কথা বলি। তুমি এসো।”

ইয়াসমিন ডাকলো ইমাদ কে পিছন থেকে কিন্তু ইমাদ দাঁড়ালো না। ইয়াসমিনের সাঈদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। কাল অব্দি যাকে বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছিল অপমান করে, বারবার যাকে বলছিল ভালোবাসেনা, বিয়ে করতে চায় না। এখন তার সাথেই ইয়াসমিনের বিয়েটা একেবারে নিশ্চিত প্রায়। অস্বস্তি কি হবে না! একটা অপরাধবোধও তো কাজ করছে মনের ভেতরে। ইয়াসমিনের এসব ভাবনার মাঝে সাঈদের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে।

“ভালো আছিস ইয়াসমিন?”

ইয়াসমিন রাস্তার উপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অস্বস্তি জড়ানো গলায় বলল,

“ভালো আছি।”

“আমি খুব খুশি ইয়াসমিন। তুই যে রাজি হয়েছিস আমাকে বিয়ে করতে এতে আমি ভীষণ খুশি। আর এভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন তুই আমার সামনে? তুই কোন অপরাধী না।”

কোন উত্তর দিল না ইয়াসমিন। সাঈদ ভাবল এখন আবার এসব পুরনো কথা না তোলাই ভালো। বরং যে কাজে এসেছে সেটা বলা উচিত।

“আচ্ছা এসব কথা এখন বাদ দে। তুই বলতো তোর কেমন বাড়ি পছন্দ? আসলে বাড়ি ভাড়া নিতে হবে তো। তোর যেমন পছন্দ তেমন বাড়ি খুঁজবো। আর তার থেকেও বড় কথা তুই কোথায় থাকতে চাস? মানে কোন শহরে থাকতে চাস? তুই যে শহরে থাকতে চাইবি সেই শহরে আমি একটা কাজ খোঁজার চেষ্টা করব। তুই যদি বলতি তোর পছন্দ তাহলে আমার সুবিধা হতো।”

ইয়াসমিন এবারে তাকালো সাঈদের দিকে। বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“তুমি কি ভুলে গেছো আমার এই বিয়েতে আপত্তি ছিল? এখনো যদি ভাইয়া একবার বলে আমি কিন্তু সরে যাব। আমি তোমায় ভালোবাসি না। তারপরও শুধুমাত্র ভাইয়ার কথায় বিয়েতে রাজি হয়েছি। এত কিছু জানা সত্ত্বেও কেন আমায় বিয়ে করতে চাও? আমার থেকে অনেক ভালো মেয়ে পাবে তুমি যে তোমায় ভালোবাসবে। আমাকে কি তোমার স্বার্থপর মনে হচ্ছে না? আমার যখন ইচ্ছে হচ্ছে তোমাকে ব্যবহার করছি। আবার যখন ইচ্ছে হচ্ছে তোমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি। একটু তো ঘৃণা করো আমায়।”

সাঈদ আলতো হেসে বলল,

“ভালোবেসেই তো মন ভরে না। আবার ঘৃণা কখন করবো! আমি তো তোকে বলেছিলাম ভালো না বাসতে পারলে করুণা কর। তুই সেটাই করেছিস। আমার জন্য তোর করুনাই যথেষ্ট। আমি শুধু তোকে আমার কাছে রাখতে চাই আজীবন। আমি শুধু তোকে ভালোবাসতে চাই। বিনিময়ে তুই না ভালোবাসলি। তবুও আমার কাছে তো থাকবি।”

“পাগল তুমি? কেন বুঝতে পারছো না আমি মেয়েটা স্বার্থপর। আমার নিজের যেখানে নিজেকে বিরক্ত লাগছে তোমার কেন লাগবে না? আমার নিজের ভেতরে অপরাধবোধ কাজ করছে। বারবার শুধু মনে হচ্ছে আমি তোমাকে ব্যবহার করছি। আমি তোমার যোগ্য না।”

হঠাৎ করে কেমন অস্থির হয়ে পড়ল ইয়াসমিন। সাঈদ ইয়াসমিনের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,

“কে কার যোগ্য, কে কার অযোগ্য এই কথাগুলো থাক। আর তুই স্বার্থপর না। সেই সময় বুঝতে না পারলেও আমি এখন বুঝতে পারি ইয়াসমিন তুই কেন বারবার আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিস। ইমদাদ তোদের জন্য যা করেছে সত্যি তাতে ইমদাদকে কষ্ট দেওয়া উচিত হতো না। আর না তুই কখনো আমাকে কোন আশা দেখিয়েছিস। বরং সব সময় আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিস তুই আমায় ভালোবাসিস না। তাই তোর কোন দোষ নেই।”

“কিন্তু....”

সাঈদ ইয়াসমিন কে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“পুরনো কথা ভুলে যা। দুদিন পর আমাদের বিয়ে হবে, সংসার হবে, বাচ্চা কাচ্চা হবে। কত ভালো দিন কাটবে আমাদের ভাবতো! এই পুরনো কথাগুলো মনে করে কি লাভ। তার থেকে বরং তুই আমায় একে একে জানিয়ে দে তোর নিজের সংসার নিয়ে তোর কি কি স্বপ্ন আছে। আমি আস্তে ধীরে সব পূরণ করবো।"

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প