“আচ্ছা ইমদাদ ভাই, ওই আফসানা হঠাৎ করে আমায় দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল কেন?”
“তুই আমার বউ তাই।”
কলি বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“এটা কোন কারণ হলো? নিশ্চয়ই অন্য কোনো কারণ আছে যেটা তুমি বলতে চাইছো না তাই না? উদ্দেশ্য কি তোমাদের দুজনের বলতো? আমায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে গিয়ে আবার আমায় গুম করে দেবে না তো? তারপরে তোমরা দুজন বিয়ে করে নেবে?”
এবারে ইমদাদ বিরক্তিকর দৃষ্টিতে কলির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোকে এক কথা কতবার বলবো আমি যে আফসানা আমার প্রেমিকা নয়? আর যদি তোকে গুম করে দেওয়ার হয় কারো সাহায্য লাগবে না আমার। আমি একাই যথেষ্ট। দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্যও আমার তোকে রাস্তা থেকে সরানোর কোন প্রয়োজন নেই। এত ভীতু ইমদাদ না।”
কলি মুখ ভেঙচিয়ে আবারো নিজের সাজগোজে মনোযোগ দিল। এই বাড়িতে আসার পর কলির কাছে ভালো তেমন করে পোশাকই ছিল না। কিচ্ছু কিনে দেয়নি বিয়ের পর থেকে ইমদাদ। এতদিন অব্দি ইয়াসমিনের জামা কাপড় পরে আসছিল। ইয়াসমিন কতবার করে বলেছিলো এই লোকটাকে যেন কলিকে কিছু কিনে দেয়। কিন্তু কিচ্ছু কিনে দেয়নি। কলিও আর সেই জন্য মুখ ফুটে বলেনি কিছু। কলির কি কোন মান সম্মান নেই নাকি যে সামান্য একটা জামা কাপড়ও এই লোকটার থেকে চেয়ে চেয়ে নেবে!
তবে গতকাল ইমদাদ কলির জন্য একটা শাড়ি কিনে এনেছে। কালো আর খয়েরী রং এর মিশেলে তৈরি একটা জামদানি শাড়ি এনে দিয়েছে। কলির শাড়ির সাথে মিলিয়ে নিজের জন্য একটা কালো পাঞ্জাবিও কিনেছে। আরো একটা জিনিস এনেছে ইমদাদ গতকাল কলির জন্য। সেটা হলো একটা সোনার নাকফুল।
বিবাহিত মেয়েদের একটা অন্যতম চিহ্ন হলো নাকফুল। যা ছিল না কলির। ব্যাপারটা অনেকদিন আগেই খেয়াল করেছিলো ইমদাদ। কিন্তু একটা সোনার জিনিস কিনতে তো কম টাকা লাগে না। টাকা জোগাড় করে গতকাল কিনে এনেছে।
একটু পর আফসানার বাড়ি যাওয়ার জন্য বের হবে। সেই জন্যই সাজগোজ করছে কলি। বেশি সাজগোজ করতে পারে না। কখনো সাজগোজ করার প্রয়োজনও হয়নি তেমন করে। কেননা কলি এমনিই সুন্দর। আলাদা করে সেজেগুজে নিজেকে সুন্দর করে তোলার প্রয়োজন হয়নি কখনো।
আজও খুব বেশি সাজেনি। ইমদাদের দেয়া শাড়ি পরেছে, সোনার নাকফুলটা পরেছে। ইয়াসমিন একটা সোনার কানের ঝুমকো দিয়েছিল সেটাও পরেছে। মুখে একটু পাউডার লাগিয়ে ঠোঁটে একটা গাঢ় লিপস্টিক লাগিয়েছে।
কলি তখন ব্যস্ত চুল নিয়ে। এই চুলের সাথে কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সব সময় কলির সাথে এমনই হয়। সাজগোজ করা শেষে চুল বাধা নিয়ে পড়ে বিপাকে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে চুল গুলোই কেটে ফেলতে।
মুখ গোমড়া করে কলি কে আয়নার সামনে বসে থাকতে দেখে ইমদাদ বোধহয় ওর সমস্যাটা বুঝলো। হাতে কালো বেল্টের ঘড়ি পরতে পরতে কলির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“খোঁপা করতে পারিস?”
“না পারার কি আছে?”
“না পারার কিছু নেই। তবে তুই পারিস কিনা সেটা বড় ব্যাপার। তোর আক্কেল তো খুব বেশি সেজন্য জিজ্ঞেস করলাম। যাইহোক, হালকা করে একটা খোপা কর। যাওয়ার সময় গাজরা কিনে দেবো।"
কলি ভ্রুঁ কুঞ্চিত করে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এসব তো প্রেমিকরা প্রেমিকাদের কিনে দেয়। তুমি কেন আমাকে কিনে দেবে?”
ইমদাদ বেশ স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আফসানা ম্যাডামকে বোঝাতে হবে না তুই আমার শখের বউ! তোকে ভালোবাসি না ঠিক আছে কিন্তু ওনাকে বোঝাতে হবে তুই আমার কলিজা। নয়তো....।”
“নয়তো কি?”
ইমদাদ শুধু হাসলো। কিন্তু মুখে আর কিছু বলল না। কলিও আর এই নিয়ে কথা বাড়াতে চাইলো না। ইমদাদের কথা অনুযায়ী একটা খোঁপা করে নিলো।
ততক্ষণে ইমদাদ আবার ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করলো। পারফিউম লাগালো। আজ একটু বেশিই সাজগোজ করছে না ইমদাদ! অন্যান্য দিন তো এতই তাড়াহুড়ো করে দেখে মনে হয় যেন লুঙ্গি পরেই বেরিয়ে যাবে। আর আজকে সাজগোজই শেষ হচ্ছে না।
“এত সাজগোজের কি আছে। কাকে দেখাতে যাচ্ছো?”
ইমদাদ আরো একবার আয়নায় নিজেকে ভালোভাবে দেখে নিয়ে কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সুন্দরী বউকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। একটু তো সাজগোজ করতেই হবে। দেখতো ভালো লাগছে আমায়? কেউ যেন বলতে না পারে বরের থেকে বেশি বউ সুন্দর।”
ইমদাদের কথাটা শুনে কলি সত্যি একবার ভালোভাবে ওকে পর্যবেক্ষণ করলো। ম্যাচিং করে করে সবকিছু কালো রং এরই পরেছে ছেলেটা আজ। কালো পাঞ্জাবি, কালো পাজামা, হাতে কালো ঘড়ি, চুলগুলোও কালো। অদ্ভুত ব্যাপার হলো মোবাইলের ব্যাক কভারটা অব্দি কালো।
একটু বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দর লাগছে না কি? এই লোকটাকে এত ফর্সা হতে কে বলেছিল? গালে দাড়ি রাখতে হবে কেন? কেটে ফেললে কি হতো না? তাহলে হয়তো একটু বাজে লাগতো দেখতে। চুলগুলো এভাবে জেল দিয়ে সেট করার কি ছিল? এলোমেলো করে রাখলেই হতো। তার থেকেও বড় কথা এত সুন্দর চেহারা আর ফর্সা গায়ের রং নিয়ে আবার কালো রঙের পাঞ্জাবি কেন পরলো? এর জন্যই তো বেশি ভালো লাগছে দেখতে। এখন কি বাইরের মেয়েদের নজর পড়বে না? অবশ্যই পড়বে। আজকালকার যুগের যে মেয়ে। সুন্দর ছেলে দেখলেই তো হা করে তাকিয়ে থাকে।
কলি মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
“বুঝেছি। আফসানা কে পটানোর জন্য এত সেজেগুজে যাচ্ছো।”
কলির কথাটা শুনে ইমদাদ বেশ গর্বের সাথে বলল,
“মেয়েদেরকে পটানোর জন্য ইমদাদ কে আলাদা করে কোন চেষ্টা করতে হয় না। এমনিতেই পটে যায়। একবার ভালো করে আমায় দেখে বল তো এত সুন্দর ছেলে আগে কখনো দেখেছিস? স্বাভাবিক নয় কি যে মেয়েরা আমার উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়বে! আর তুই তোর কপালটা দেখ কোন কষ্ট না করেই আমাকে পেয়ে গিয়েছিস। একেবারে সোনা না হীরে দিয়ে বাঁধানো কপাল তোর কলি।”
“তুমি একবার তোমার বউয়ের দিকে তাকিয়ে দেখো এত সুন্দর মেয়ে কখনো দেখেছো? সব মেয়েরা তো সাজগোজ করে সুন্দর হয়। কিন্তু তোমার বউ শুধু পাউডার আর লিপস্টিক লাগিয়েই সুন্দরী। জানো স্কুলে সবাই আমায় আমার সৌন্দর্যের জন্য পরী বলে ডাকত। আর সেই পরীকে তুমি কত সহজে পেয়ে গেছো।”
কলি কথাটা বলতেই ইমদাদ ওর দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। এগিয়ে গেল কয়েক কদম কলির দিকে। ইমদাদের আবভাব কলির ঠিক ভালো লাগলো না। কেন যেন মনে হলো যে কোন সময় এসে আবারো কোমর জড়িয়ে ধরবে। সেজন্য আগেভাগেই ইমদাদ কে সাবধান করে দিয়ে বলল,
“অনেক কষ্টে আমি শাড়ি পরেছি। একদম টানাটানি কিংবা জড়াজড়ি করে আমার শাড়ি নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করবে না।”
কলি কথাটা বলার সাথে সাথেই ইমদাদ খপ করে ওর কোমর পেঁচিয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। কলি ইমদাদের বুকে কয়েকটা কিল মেরে বলল,
“খারাপ লোক কোথাকার! বললাম টানাটানি করো না। যদি আমার শাড়ি খুলে যাচ্ছে তোমাকে দিয়েই পরিয়ে নেব।”
ইমদাদ ঠোঁটে বক্র হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“তাহলে তো ইচ্ছে করেই খুলে দেবো। বউকে শাড়ি পরিয়ে দেওয়ার সুযোগ কজনই বা পায় বল। কি বলিস খুলবো?”
কলি থতমত খেল। অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুড়িয়ে নিয়ে বলল,
“মুখের লাগাম টানো। কি সব যা তা বলো আজকাল তুমি।”
ইমদাদের দিকে তাকানোর আর সাহস হলো না কলির। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়েই থাকলো। ফ্যানের বাতাসে কলির কপালের উপরে পড়ে থাকা কিছু ছোট ছোট চুল উড়ছো। ইমদাদ আলগোছে সেগুলো কলির কানের পিঠে গুঁজে দিল। ইমদাদের স্পর্শ অনুভব করতেই কলির গা শিউরে উঠলো। ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করলো তবে বরাবরের মতনই ব্যর্থ হলো। ইমদাদ কলির কানের কাছে মুখ নামিয়ে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাতে কে বলেছিল? ওটা লাগানোর জন্যই তো বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দর লাগছে। এখন আমি কিছু করলেই তো দোষ হয়ে যাবে।”
কলি বুঝলো না ইমদাদের কথার মানে। একটু ভাবুক হয়ে বলল,
“লিপস্টিক লাগানোর জন্য কি এমন করবে যে দোষ হয়ে যেতে পারে?”
ইমদাদ হেসে উঠে বলল,
“তুই আজ তোর বোকামির জন্য বেঁচে গেলি। যদি চালাক হতি তাহলে বাঁচতি না। তবে সত্যি করে একটা কথা বলি?”
কলি বেশ আগ্রহের সাথে বলল,
“বলো।”
“খুব সুন্দর লাগছে তোকে। যতটা সুন্দর লাগলে তোর দিক থেকে চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না ততটাই সুন্দর লাগছে। এই ফুলকে আর আলাদা করে কি ফুল কিনে দিবো সেটাই ভাবছি!”
কলি খুব খুশি হলো ইমদাদের মুখ থেকে প্রশংসা শুনে। সেইসাথে হালকা একটু লজ্জাও পেল। মুখটা নামিয়ে নিল। কলির লজ্জা রাঙা মুখটা দেখতে যেন আরো সুন্দর লাগলো ইমদাদের কাছে। মনের মাঝে যে কত ধরনের নিষিদ্ধ ইচ্ছে জাগলো তার হিসেব নেই। শুধু এখন বাইরে যাবে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে কলি ছাড়া পেল। নয়তো আজ ভয়ংকর কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলত ইমদাদ।
___________
“কোথায় তুমি রওনাফ? ভুলে গেলে আজ আমাদের বিবাহ বার্ষিকী? থাকতে বলেছিলাম তো তোমায়।”
আফসানার কথার প্রেক্ষিতে ফোনের অপর পাশ থেকে রওনাফের বিরক্তিকর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“খেয়ে দেয়ে কি আমার কাজ নেই যে তোমার সাথে ঢং করার জন্য যাব। আর বিবাহ বার্ষিকী? বউই ঠিক নেই কিসের বিবাহ বার্ষিকী পালন করব।”
আফসানা রেগে গেল না। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“কি করেছি আমি? কি দোষ তোমার বউয়ের? স্বামী পরকীয়া করে সেটা জানা সত্ত্বেও এই নিয়ে একটা প্রশ্ন করিনি তোমায়। এখনো অব্দি আমার বাড়িতে রাখছি, আমার টাকায় খাওয়াচ্ছি, পরাচ্ছি। তোমার গার্লফ্রেন্ড কে যেন উপহার দিতে পারো সেই জন্য আমার কোম্পানি থেকেই তোমার পকেটে টাকা ঢুকছে। তারপরও বউ খারাপ? হাতের ফোনটাও আমার টাকায় কেনা। আর কি করবো বলো? আরেকটা বিয়ে করার পারমিশন দেবো? তুমি কি চাইছো তুমি আরেকটা বিয়ে করে আনবে আর আমি তোমার আর তোমার দ্বিতীয় স্ত্রীর খেদমত করবো?”
“নিজের স্বামীরই আজ পর্যন্ত ঠিকঠাক খেদমত করতে পারলে না, আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর কি খেদমত করবে।”
“তাই? কি করতে বাকি রেখেছি আমি? বলো না কি করতে বাকি রেখেছি আমি? তোমায় ভালোবাসিনি? তোমায় বিয়ে করার জন্য নিজের পরিবারের সাথে যুদ্ধ করিনি? আমার সামনে দাঁড়াতে তোমার যেন নিজেকে ছোট মনে না হয় সেই জন্য আমার কোম্পানির ফিফটি পারসেন্ট শেয়ার তোমার নামে করে দেইনি? তুমি অসুস্থ হলে রাত জেগে তোমার পাশে বসে সেবা করিনি? জীবনে রান্নাঘরের ধারের কাছে না যাওয়া আমি তোমার জন্য হাত পুড়িয়ে রান্না করিনি? আরো কি করতে বলছো আমাকে?”
রওনাফ তাচ্ছিল্য গলায় বলল,
“শুধু নামেই ফিফটি পার্সেন্ট শেয়ার দিয়েছো। সম্মান কিছু দাওনি। এখনও আমি টাকা তুলতে চাইলে তোমার সাইন লাগে। তুমি সব সময় চেয়েছো যেন আমার মর্যাদা তোমার নিচে থাকে। সেজন্যই আমাদের মাঝে এত দূরত্ব তৈরি হয়েছে।”
আফসানা আবারও শান্ত গলায় বলল,
“তাহলে চাইছো কি তুমি?”
রওনাফ নিঃসংকোচে বলল,
“তোমার কোম্পানির পুরো দায়িত্ব আমায় দিয়ে দাও। সেখানে তোমার কোনো হুকুম চলবে না। সবকিছু আমার কথামতে চলবে। আমার কিছু প্রয়োজন হলে আমি তোমার থেকে চেয়ে নেব না। তোমার কিছু প্রয়োজন হলে তুমি আমার থেকে চেয়ে নেবে। তুমি শুধুমাত্র সংসার করবে। আমার সংসার করবে। আমি যা বলবো মুখ বন্ধ করে সেসব করবে।”
তৎক্ষণাৎ ফোনের অপর পাশ থেকে আফসানার কোন উত্তর ভেসে এলো না। রওনাফের মনে হলো যে কাজ হলেও হতে পারে। বলা যায় না হয়তো আবেগের বসে আফসানা আবারও অতীতের মতন ভুলটা করে বসবে। এর আগে কোম্পানির অর্ধেক দিয়েছিলো এবার হয়তো পুরোটাই দিয়ে দেবে।
রওনাফের এসব ভাবনার মাঝেই ফোনের অপর পাশ থেকে আফসানার হো হো করে হাসির শব্দ ভেসে এলো ওর কানে। ভরকালো রওনাফ। কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“হাসছো কেন?”
আফসানা হাসতে হাসতেই বলল,
“কোম্পানির পুরো দায়িত্ব নিবি? আমাকে বাড়িতে বসে তোর হাতের পুতুল বানাবি? তুই শুধু অপেক্ষা কর আর কয়েকটা দিন। দেখ তোর কি অবস্থা করি আমি। আমি আফসানা চৌধুরী নিজেকে নিজে কথা দিচ্ছি, তুই যদি আমার পায়ে ধরে ক্ষমা না চেয়েছিস নিজের নাম বদলে দেবো। আমি যদি তোকে তোর উপযুক্ত জায়গা না দেখাতে পেরেছি তাহলে আমার নাম আফসানা চৌধুরী না। তোর তেজ, তোর গরম, তোর পুরুষত্ব সব বের করে ছাড়বো। তুই কেঁদে কুল পাবি না। তখন দেখবো তোকে তোর কোন প্রেমিকা বাঁচায়।”
কথাটা বলে রওনাফের মুখের ওপরে কলটা কেটে দিলো আফসানা। রওনাফ কে খুব কড়া কণ্ঠে কথাগুলো বলল। কিন্তু ফোনটা কেটে দেওয়ার পরে ভেঙে পড়লো। কার সঙ্গে লড়াই করছে আফসানা, যাকে ভালোবাসত! যার সঙ্গে পাশাপাশি চলার কথা ছিল, যার সঙ্গে সারাটা জীবন কাটানোর কথা ছিল আজ তাকে শেষ করার প্রতিজ্ঞা করছে!
আফসানার এসব ভাবনার মাঝেই কলিং বেল বেজে উঠলো। আফসানা তখন ড্রইং রুমে বসে ছিল। সার্ভেন্ট দরজা খুলতে যেতে ধরলে আফসানা তাকে থামিয়ে দিয়ে নিজের কাজে যেতে বলল। আফসানা জানে এখন ইমদাদরাই এসেছে। আর কারো তো আসার কথা ছিল না। সেজন্য নিজেই গিয়ে দরজাটা খুলে দিল।
আফসানার ধারনা ভুল ছিল না। ইমদাদই এসেছে সাথে কলি। কলি আর আফসানা দুজনেই আগে দুজনকে ভালোভাবে দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। দুজনেরই দুজনকে নিয়ে তুমুল কৌতূহল। দুজনে এটা গণনা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে কে কার থেকে কোন দিক দিয়ে এগিয়ে আর কোন দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে।
তবে গণনা আগে আফসানার শেষ হলো। নিজ উদ্যোগেই এগিয়ে গিয়ে আন্তরিকতার সাথে কলিকে জড়িয়েও ধরল। কলি একটু চিন্তার মাঝে পড়লো যে পাল্টা তাকে জড়িয়ে ধরে উচিত কিনা। পাশে দাঁড়ানো ইমদাদের দিকে তাকিয়ে ইশারায় সেটা আবার জিজ্ঞেস করল। ইমদাদ হ্যাঁ বোধক উত্তর জানাতেই বাধ্য হয়ে কলিও জড়িয়ে ধরলো। কলিকে ছেড়ে দিয়ে আফসানা কলির খুব প্রশংসা করলো।
“আপনার ওয়াইফ তো ভীষণ মিষ্টি দেখতে ইমদাদ। উনি বোধহয় অনেক ছোট আমার থেকে?”
“হ্যাঁ ম্যাডাম। বাচ্চাকে বিয়ে করেছি। না বয়স বেড়েছে না বুদ্ধি।”
আফসানার সামনে কলি কে এভাবে অপমান করাটা কলির একদমই পছন্দ হলো না। তবে কিছু বলতেও পারল না। এখন তো বাইরের মানুষ সামনে আছে। ভদ্রতা বজায় রাখতে হবে। আবার ইমদাদ বারবার করে বুঝিয়ে এনেছে যে আফসানা কে বোঝাতে হবে ওদের মাঝে সম্পর্কটা খুবই ভালো। মা'রা'মা'রি তো দুর কখনো ঝগড়া অব্দি করে না। দুজন দুজনকে পাগলের মতন ভালোবাসে। যেন একজনকে ছাড়া আরেকজনের নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। যদিও ইমদাদ কথাগুলো না বললেও কলি এমন আচরণই করত। কিন্তু তারপরেও ইমদাদ বলাতে সুবিধা হয়েছে।
কলির এসব ভাবনার মাঝে আবারও আফসানার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে।
“বয়সে যেহেতু অনেকটা ছোট আবার ইমদাদ বললেন বাচ্চা। তাহলে আমি বরং তুমি করেই ডাকি। চলবে তো?”
কলি জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। আফসানা নিজেই আবার জিজ্ঞেস করল,
“তোমার নামটাই তো জানা হয়নি। কি বলে ডাকবো তোমায়?”
“কথাকলি সরদার। চাইলে ছোট করে কলি বলেও ডাকতে পারেন, কথা বলেও ডাকতে পারেন। কিংবা দুটো মিলিয়ে কথাকলি বলেও ডাকতে পারেন।”
“বাহ! চমৎকার নাম তো তোমার। এমন নাম আমি এর আগে কখনো শুনিনি। যেমন সুন্দর নাম তেমন সুন্দর তুমি দেখতে আর তেমনি সুন্দর তোমার কপাল। ভিতরে এসো। আমিও বোকা তখন থেকে বাইরে দাঁড়িয়ে রেখে কথা বলছি। ইমদাদ, আসুন।”
আফসানার ব্যবহারটা কলির বেশ ভালোই লাগছে। মেয়েটাকে বোধহয় যতটা খারাপ ভেবেছিল ততটা খারাপও না। যদি ততটাই খারাপ হত কিংবা ইমদাদের প্রতি খারাপ কোন নজর থাকতো তাহলে অন্তত কলির এত প্রশংসা করতো না।
বেশ অনেকক্ষণ গল্পগুজব করলো আফসানা ওদের সাথে। ইমদাদের সাথে আজ বেশি কথাবার্তা হলো না। কলির সাথেই কথাবার্তা হলো। ওদের প্রেম হলো কিভাবে, বিয়ে হলো কিভাবে সেসবই জানতে চাইলো। কলি খুব বেকায়দায় পড়ে গেল আফসানের প্রশ্নগুলো শুনে। প্রেম তো এখনো হয়নি তাহলে কি গল্প শোনাবে। আবার বিয়ে যে অবস্থায় হয়েছিল সেটা যদি বলে তাহলে তো ধরা পড়ে যাবে।
এদিকে আফসানা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কলির মুখ থেকে কথাটা শোনার জন্য। ইমদাদ বুঝলো যে এই বোকা মেয়েকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। সেজন্য নিজেই বলে উঠলো,
“ওর দিক থেকে আগে ভালোবাসা ছিল না। আমার দিক থেকেই ছিল। তাও অনেক আগে থেকে। আসলে ওর পরিবারের সাথে আমার পরিবারের শত্রুতা ছিল। এখনও ওর পরিবার আমাদের সম্পর্কটা মেনে নেয়নি। এজন্য ও আমাকে ভীষণ অপছন্দ করতো। বলা যায় ঘৃণাই করতো। গাধাটা বুঝতোই না যে ওর বাড়ির সবাইকে আমি অপছন্দ করলেও ওকে ভালোবাসতাম। গাধাটাকে বিয়েও জোর করে করেছি ভয় দেখিয়ে। নয়তো এতদিনে অন্য কারো বউ হয়ে বসে থাকতো।”
“ওয়াও। পুরো সিনেমা। কলি, তুমি ইমদাদ কে কেন ভালোবাসতে না বলোতো? এরকম একটা ছেলেকে ভালো না বেসে থাকা যায়? সিরিয়াসলি! তুমি গাধা। আসলে সমস্যাটা কি জানো, যে পায় না সে বোঝে। আর যে সহজে পেয়ে যে সে কদর করতে জানেনা। যার যে জিনিসটা নেই সেই একমাত্র সেই জিনিসটার অভাব আসলে কি সেটা বুঝতে পারে।”
শেষের দিকে আফসানার কন্ঠটা অন্যরকম শোনালো। আফসোস প্রকাশ পেল ওর কন্ঠে। ইমদাদ অনেক কিছুই বুঝতে পারল কিন্তু না বোঝার ভান করে বসে থাকলো।
এদিকে কলির কানে হয় তো আফসানার বলা কথাগুলো যায়ইনি। কেননা ও এখন ব্যস্ত ইমদাদের কাহিনীর গুলো বুঝতে। ছেলেটা অর্ধেক সত্যি বলল আর অর্ধেক মিথ্যে বলল। পুরোটাই তো সত্যি বললেই পারতো যে ও কলিকে ভালোবাসতো না। এতোটুকু আবার মিথ্যে বলার কি ছিল।
ইমদাদ আর কলিকে বসার ঘরে রেখে আফসানা রান্না ঘরে গেল দেখার জন্য যে রান্নাবান্না কতদূর। রান্না হয়ে গেছে। সার্ভেন্ট টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে। আফসানা ওদেরকে ডাকতে এলো।
বসার ঘরের কাছাকাছি আসতেই দেখল ইমদাদ কলির মাথায় ফুলের গাজরাটা ঠিক করে দিচ্ছে। খুলে পড়েছিল। ইমদাদ নিজেই আবার সেটা সংযত্নে ওর খোঁপায় আটকে দিচ্ছে।
দৃশ্যটা খুব সুন্দর লাগলো আফসানার কাছে। দারুন ভাবে উপভোগ করলো। কত সুখি ওরা। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক কত সুন্দর হয়! অনিচ্ছা সত্ত্বেও আফসানার দুচোখ জলে ভরে উঠলো। তবে সেগুলো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে দিল না। তার আগেই মুছে নিল। ঠোঁটে আবারো কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুলে ওদের দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“ইমদাদ, কলি চলো। ডিনার রেডি আছে।”
আফসানার কথাটা শুনে ইমদাদ একবার আশেপাশটা দেখে বলল,
“আপনি তো বলেছিলেন ছোট করে সেলিব্রেট করবেন ম্যাডাম। আমরা ছাড়া তো আর কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। রওনাফ স্যার কোথায়?”
আফসানা বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,
“ওর সময় হয়নি। আসলে সেলিব্রেশনটা আমি আমার মনের তৃপ্তির জন্য করছিলাম। আর যদি বলেন গেস্ট কেন নেই তাহলে বলবো আমার কাছের কেউ নেই। আত্মীয়-স্বজন যারা আছে তাদের সাথে আমার যোগাযোগ নেই বাবা মা'রা যাওয়ার পর থেকে। বিজনেস রিলেটেড কাউকে ডাকতে চাইনি। বাকি রইলেন শুধু আপনারাই।”
“তূর্যকে ডাকলেই পারতেন।”
“ইচ্ছে করেই ডাকিনি। ছেলেটা সারাদিন আমার পিছনে খাটাখাটনি করে। এখন এখানে এসে রওনাফ কে দেখতে না পেয়ে আমার জন্য আফসোস করতো। বেচারা মন খারাপ করে বসে থাকতো। তার থেকে বরং পরিবারের সাথে সময় কাটাক। ওকে আলাদা করে একটা ট্রিট আমি দিয়ে দেব। যাইহোক আপনারা আসুন।”
ইমদাদ আর কথা বাড়াতে চাইলো না। উঠে গেল আফসাসানার সাথে। তিনজনে একসাথেই খেতে বসলো। আর কেউ নেইও বাড়িতে। খাওয়ার মাঝেও আফসানা আড়চোখে বেশ কয়েকবার তাকালো ইমদাদ আর কলির দিকে। ইমদাদ সমানে খেয়াল করছে কলির অসুবিধা হচ্ছে কিনা।
খাওয়ার মাঝেই আবার একবার কলির কাশি উঠলো। ইমদাদ ব্যস্ত হয়ে পড়লো। যেন মনে হচ্ছে কি না কি হয়ে গেছে ওর বউয়ের। তাড়াহুড়ো করে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল।আফসানা এটা ভেবে হাসলো যে এখন যদি কলির জায়গায় ও, আর ইমদাদের জায়গায় রওনাফ থাকতো তাহলে রওনাফ বাড়ি থেকে পানিই উধাও করে দিত। যেন কাশতে কাশতে আফসানা ম’রে যায়।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আবার এসে ওরা সোফায় বসলো। এবারে সার্ভেন্টরা মিষ্টি জাতীয় পদ গুলো রেখে গেল। দুজনের কারো পেটেই আর জায়গা নেই। তবুও আফসানার জোড়াজুড়িতে ইমদাদ হাতে পায়েসের বাটিটা নিল। আফসানা খেয়াল করলো ইমদাদ পায়েস থেকে বাদাম গুলো বেছে বেছে রেখে দিচ্ছে। আফসানা কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“বাদাম পছন্দ করেন না আপনি?”
ইমদাদ নিজের হাতের বাটিটা কলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আমার না। ওর বাদামে সমস্যা। ওর কিন্তু এসব খেয়াল থাকে না। চুপচাপ খেয়ে পরে অসুস্থ হয়ে আমায় টেনশন দেবে।”
আফসানা শুধু শুনেই গেল ইমদাদের বলা কথাগুলো। এমন মানুষও পাওয়া যায়! এমন পুরুষ মানুষের অস্তিত্ব এখনো পৃথিবীতে আছে যারা বউকে এত ভালোবাসে, বউয়ের এত খেয়াল রাখে!
কেন এমন একটা মানুষ আফসানার ভাগ্যে জুটলো না? কেন এমন একটা সংসার আফসানার হলো না?