সবাই বলে কেবলমাত্র ছেলেরাই নাকি বাবা-মায়ের ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে পারে, তাদের দায়িত্ব নিতে পারে। তবে এই ধারনার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ধারনা পোষণ করতেন ইমদাদের বাবা ফরিদ সাহেব। তার বড় মেয়ের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস ছিল। ভীষণ ভরসা করতেন তিনি মেয়েকে। তার অন্ধবিশ্বাস ছিল তার মেয়ের প্রতি যে ইকরা এমন কোন কাজ করতে পারে না যাতে ফরিদ সাহেবের সম্মানহানী হতে পারে। কিংবা তিনি কষ্ট পেতে পারেন। তবে একদিন হঠাৎ করে তেমন একটা কাজই করে বসলো ইকরা।
করিম সরদারের বড় ছেলে কাফিলকে বিয়ে করে এসে দাঁড়িয়েছিল ফরিদ সাহেবের সামনে। কাউকে কিচ্ছু জানায়নি। মেয়ের এমন হঠকারিতায় নেওয়া সিদ্ধান্তে সেদিন ফরিদ সাহেব ভয় পেয়েছিলেন। তার থেকেও হাজার গুণ বেশি চিন্তিত ছিলেন মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। উনি খুব ভালো করেই জানতেন ওনার ভাই এই বিয়ে কোনদিনও মেনে নেবে না।
শুধু করিম সরদার কেন ওই বাড়ির কেউই মেনে নেবে না। যেখানে আজ পর্যন্ত ফরিদ সাহেবই কামাল সরদারের বংশধর হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি সেখানে ওনারই র’ক্ত কে ওনার নাতির বউ হিসেবে কোনোদিনও মেনে নেবেন না। এটাই হয়তো স্বাভাবিক।
ইমদাদদের বাড়ির দরজার দাঁড়িয়ে আছে ইকরা আর কাফিল। সদ্য বিয়ে করে এসেছে। দুজনে দুজনের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। যেন তাদের দুজনকে আলাদা করার সাধ্য এই পৃথিবীতে কারোর নেই।
ফরিদ সাহেব কে চুপ করে বসে থাকতে দেখে একটু ভয় হলো ইকরার। মুখ ফুটে যে কিছু বলবে সেই সাহসটাও হচ্ছিল না। ফরিদ সাহেবের দিকে তবুও তাকানোর সাহস হচ্ছিলো। কিন্তু মায়ের দিকে তাকানোর সাহসটা অবধি হলো না। অসহায় দৃষ্টিতে শুধু তাকালো ইকরা কাফিলের দিকে। চোখের ইশারায় কাফিল কে বোঝালো যেন ফরিদ সাহেবকে বোঝানোর চেষ্টা করে। যেন রাজি করায় ওদের বিয়েটা মেনে নিতে।
কাফিলও বুঝলো ইকরার ইশারা। ইকরার হাতটা ছেড়ে দিয়ে ঘরের ভিতরে এলো। ফরিদ সাহেব তখন সোফায় বসে ছিলেন। কাফিল ওনার মুখোমুখি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে বলল,
“চাচা, ইকরার কোন দোষ নেই। আমি ওকে বিয়ে করার কথা বলেছিলাম। তুমি তো আমার বাড়ির লোকজনকে চেনো। ওদেরকে বললে ওরা কখনোই বিয়েটা মেনে নিত না। তোমাকে বললে তুমিও হয়তো মেনে নিতে না। আমরা দুজনে কি করতাম বলো। আমি ভালোবাসি ইকরা কে। আমাদের দুই পরিবারের এত ঝামেলার জন্য আমাদের ভালোবাসা কেন পূর্ণতা পাবে না? আমাদের তো কোন দোষ নেই তাই না?”
কাফিল কথাটা বলতেই এক কোণার দিকে দাঁড়ানো ইকরার মা আঁখি মেয়ের দিকে হিংস্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,
“তোমরা কেন দোষ করতে যাবে? দোষ তো করেছিলাম আমি, এই মেয়েকে জন্ম দিয়ে
যার কাছে দুদিনের ভালোবাসা মা-বাবার সম্মান, বিশ্বাসের থেকে বড় হয়ে দাঁড়ালো। বিয়ে করার আগে যখন আমাদের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করোনি এখন কেন এসেছো?”
ইকরা কিছু বলে উঠতে ধরল তবে আঁখি ওকে সেই সুযোগটা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না। মেয়ের কোন কথা ওনার শোনার ইচ্ছেই হচ্ছে না। সোজা নিজের স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তোমার কি ওদের কে মেনে নেওয়ার কোন ইচ্ছে আছে? তবে একটা কথা শুনে রাখো। তুমি মেনে নিতে চাইলেও আমি কখনো মেনে নিতে দেব না। এই এক মেয়ের ভুলের জন্য আমার বাকি ছেলে মেয়ের জীবন নষ্ট হতে দিতে পারি না আমি। ভুল যেহেতু ও করেছে শাস্তি ওকেই পেতে হবে।”
ফরিদ সাহেবর বিরক্তি ভরা দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“থামো তো তুমি। আমাকে কথা বলতে দাও।”
ফরিদ সাহেব এবারে কাফিলকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বললেন,
“যে কথাগুলো আমাকে বললে সে কথাগুলো তোমার বাড়িতে গিয়ে তোমার অভিভাবক কে বলতে পারবে? আর তাছাড়া বিয়ের পর তো মেয়েরা শ্বশুর বাড়িতে যায়। তুমি আমার মেয়েকে নিয়ে আবার ওর বাপের বাড়িতে এসেছো কেন? তোমার বাড়িতে নিয়ে যাওনি কেন?”
কাফিল আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে চাচা তুমি তো চেনো আমার বাবাকে।”
“এখন আর আমতা আমতা করার সুযোগ নেই তোমার কাছে। আপাতত আমি আমার মেয়েকে আমার কাছে রাখছি। তোমাকে দুদিন সময় দিলাম। এর মধ্যে যদি তুমি আমার মেয়েকে তোমার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা না করতে পারো তাহলে আমি তোমাদের দুজনের তালাকের ব্যবস্থা করব। কথাটা মাথায় রেখো।”
তালাক শব্দটা শুনতেই আৎকে উঠলো ইকরা। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কাফিলের দিকে। কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে কাফিল অনুরোধের স্বরে বলে উঠলো,
“আমাকে আর একটু সময় দাও চাচা। এত তাড়াতাড়ি রাজি করানো সম্ভব হবে না।”
“ঠিক আছে। তিন দিন সময় দিলাম। আর একটা ঘন্টাও বেশি পাবে না তুমি। শোনো বাবা, আমার মেয়ে আমার কাছে ভীষণ প্রিয়। ভীষণ ভালোবাসি ওকে আমি। ও এত বড় একটা ভুল করা সত্ত্বেও ওকে আমি ভালোবাসি। কিন্তু আমার মেয়েটা বোকা। ও বুঝলো না বাবার ভালোবাসা। সেজন্যই তো একটা ভুল পথে পা বাড়ালো। শুধু চিন্তায় আছি মেয়েটাকে নিয়ে যেন ওকে আফসোস না করতে হয় এই ভুলের জন্য।”
হঠাৎ করে দুঃস্বপ্নটা ভেঙে গেল কাফিলের। হ্যাঁ, একসময়ের সুখকর মুহূর্তগুলো এখন কাফিলের জন্য দুঃস্বপ্ন। লাফ দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলো। ঘেমে অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। গায়ের টি-শার্ট সম্পূর্ণ ভিজে গেছে। ভয়ে আর আতঙ্কে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে।
ঘাড় কাত করে পাশে তাকাতেই দেখল একটা মেয়ে শুয়ে আছে। এক লাফে বিছানা থেকে নেমে পড়ল কাফিল। মেয়েটা কাফিলের স্ত্রী মুনমুন। তবে হঠাৎ করে চেহারাটা কেমন যেন ইকরার মত লাগল দেখতে।
কাফিল চোখ কঁচলে আবারও তাকালো মুনমুনের দিকে। এবারে তো মুনমুনের মতনই লাগছে দেখতে। তবে একটু আগে ইকরার মতন কেন লাগছিল?
গলাটা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে। বেড সাইডের উপর থেকে গ্লাসটা হাতে নিয়ে পানি পান করলো। তবে বেশিরভাগ পানি মেঝের উপরে পরলো। কেননা হাতটা তুমুল ভাবে কাঁপছে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল এভাবেই।
বেশ অনেকটা সময় কেটে গেল। তবে এখনো সেই দুঃস্বপ্নের রেশ কাটছে না। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে ইকরার মৃতদেহের ছবিটা।
এই ঘরেই তো ফ্যানের সাথে গলায় দড়ি দিয়ে আ’ত্ম’হ’ত্যা করেছিল ইকরা। অথচ কাফিল কি অনায়াসে প্রতিটা রাত নিশ্চিন্তে ঘুমোয় এই ঘরে। অবশ্য নিশ্চিন্তে বললেও তো ভুল হবে। এমন কোন রাত তো কাটেনি যখন এই দুঃস্বপ্নগুলো এসে কাফিলের ঘুমটা ভাঙিয়ে দেয়নি।
আর কিছু ভাবতে চাইলো না এই নিয়ে কাফিল। নির্লজ্জ বেহায়ার মতন আবারও চুপচাপ শুয়ে পড়লো। ঘুমোনোর চেষ্টা করলো। সেই সাথে খুব ভালো করে খেয়াল রাখলো যেন মুনমুন জেগে না যায়। কেননা ওকে তো আর জানানো যাবে না যে মাঝরাতে স্বপ্নে কাফিলের প্রথম স্ত্রী এসে ওর ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে।
________
হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরে একটা দিনের জন্যও বিশ্রাম করলো না আফসানা। রাতেই ডিসচার্জ হয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিল। সকাল হতে না হতেই অফিসে এসেছে। এমনিতেই একটা দিনে কাজের যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। তাই আর ক্ষতি করতে চাইলো না।
আজকে ইমদাদ একাই এসেছে। সাদিকের অন্য কোনো কাজ থাকায় আসতে পারেনি। দীর্ঘ দু'ঘণ্টার মতন মিটিং শেষে একটু বিরতি নিলো। আফসানা নিজেই বিরতি নিলো। শরীরটা একটু ক্লান্ত লাগছে। বিরতির সুযোগে ইমদাদ একটু বাইরে গেল। এখান থেকে গিয়ে জয়ের সাথে দেখা করতে হবে আজ। ইয়াসমিনের ব্যাপার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা সারতে হবে।
নিজের কেবিনে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছে আফসানা। হঠাৎ করে ফোনে মেসেজের একটা টুং শব্দ হলো। চেয়ার থেকে মাথাটা তুলে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল একটা নাম্বার থেকে কিছু ছবি এসেছে আফসানার ফোনে।
খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলো আফসানা ছবিগুলো। এর আগের দিন যে মেয়েটার
সাথে রওনাফের ছবি দেখেছিল তাকে খুঁজে বের করতে খুব একটা সময় লাগেনি আফসানার। মেয়েটাই ছবিগুলো পাঠিয়েছিল। এখনও ওই মেয়েটাই আরো কিছু ছবি পাঠিয়েছে।
প্রত্যেকটা ছবিতেই দুজন কে বেশ ঘনিষ্ঠ দেখা যাচ্ছে। ওদের দুজনের মাঝে হাওয়া কথোপকথনের কিছু স্ক্রিনশটও পাঠিয়েছে।
স্ক্রিনশট গুলোর মাঝে একটা স্ক্রিনশটে দেখল বেশ বড় একটা মেসেজ পাঠিয়েছে রওনাফ মেয়েটাকে। মনে হচ্ছে কোন কিছু নিয়ে রচনা লিখে পাঠিয়েছে। খুব মনোযোগ দিয়ে পড়লো আফসানা মেসেজটা।
সেই পুরো মেসেজ জুড়ে শুধু আফসানা কে নিয়েই কথা বলেছে রওনাফ। আফসানা কে বউ হিসেবে পেয়ে ঠিক কতটা অসুখী রওনাফ, একজন মানুষের কতটা দুর্ভাগ্য হলে আফসানার মত একজন স্ত্রী পেতে পারে, নিজের জীবনে রওনাফ ঠিক কতটা একা সেসবই বর্ণনা করেছে। আরো বলেছে যে রওনাফ নাকি কখনো আফসানাকে ভালোই বাসেনি। শুধু একটা ভুল করে বসেছিলো। আগে আফসানার প্রতি যে অনুভূতিটা ছিল সেটা কখনোই ভালোবাসা ছিল না। ওটা রওনাফের জীবনের সবথেকে বড় ভুল ছিল।
আর কিছু পড়তে পারলো না। আফসানা ফোনটা ডেস্কের উপর রেখে দিয়ে চেয়ারে আবারো মাথা এলিয়ে দিয়ে পুরোনো দিনের কথা মনে করতে লাগলো। কি সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো যখন নতুন নতুন রওনাফের সাথে আফসানার পরিচয় হয়। কত আলাদা একটা মানুষ ছিল রওনাফ তখন। সব সময় যত্ন করতো আফসানার। ওর ভালোলাগা, খারাপ লাগার দিকে খেয়াল রাখত। কত ভালোবাসতো। আর আজ সেই মানুষটা প্রেমিকাকে গল্প শোনায় যে সেইদিন গুলো মিথ্যে ছিল, সেই অনুভূতিগুলো মিথ্যে ছিল।
হঠাৎ করেই রাগ একেবারে আফসানার মাথায় উঠে গেল যেন। শরীরের র’ক্ত টগবগিয়ে ফুটে উঠলো। মনে হলো ওর বেঁচে থেকে কোন লাভই নেই। আবারো বাঁচার ইচ্ছেটাই হারিয়ে ফেলল। মনে হলো কার জন্য বাঁচবে। কেউ তো নেই আফসানার। না ও বেঁচে থাকলে কেউ খুশি হবে, আর না ম'রে গেলে কেউ ওর জন্য কাঁদবে। তবে এই অসহ্যকর জীবনটা রেখেই বা কি হবে!
এই ভেবেও আফসোস করলো যে সেদিন রাতে কেন হাত কাটার পর তূর্যকে কল করেছিল। ওখানেই ম'রে যেত ধীরে ধীরে। তাহলে তো আর আজকে এই ছবিগুলো, ওদের এই কথোপকথন গুলো দেখতে হতো না।
কথাগুলো মনে পড়তেই আফসানের চোখ গেল ওর হাতে থাকে ব্যান্ডেজটার দিকে। কাটার স্থানটা এখনো শুকোয়নি। হাতে এখনো ব্যথা আছে। সেসব কোন কিছুর তোয়াক্কা করলো না আফসানা। টেনে হাতের ব্যান্ডেজটা ছিঁড়ে ফেলল। অমনি কাটা স্থান থেকে আবারও র’ক্ত বেরোতে শুরু করলো।
আজকে মিটিংটা আফসানার কেবিনেই হচ্ছিল। শুধুমাত্র আফসানা আর ইমদাদের মাঝে। যতটুকু সময় আফসানা বিরতির জন্য বলেছিল সেই সময়টা শেষ হওয়ায় ইমদাদ আবার ওর কেবিনে ফিরে এলো। ওর সঙ্গে তূর্যও এলো। দরজাটা খুলতেই আফসানা কে র’ক্তা’ক্ত অবস্থায় দেখে তূর্য চিৎকার করে উঠলো।
ছুটে গেল আফসানার দিকে। আফসানার হাতটা ধরতেই এক ঝটকায় ওর থেকে হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তূর্য কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। নিজে যে পকেট থেকে ফোনটা বের করে ডাক্তারকে ডাকবে কিংবা অ্যাম্বুলেন্স ডাকবে সেই খেয়াল হলো না। পিছনে তাকিয়ে দেখলো ইমদাদ সটান দাঁড়িয়ে আছে। কোন হেলদোল দেখা যাচ্ছে না ওর মাঝে। ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ হলো না তূর্যর। রাগে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“আরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ডাক্তার ডাকুন। নয়তো অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন। ম্যাডামকে হসপিটালে ভর্তি করাতে হবে।”
ইমদাদ আফসানার ওপর থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে তূর্যর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“অ্যাম্বুলেন্স ডাকার মতন কিছুই হয়নি। ব্যান্ডেজ নিয়ে এসে হাতে আবার একটা পেঁচিয়ে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
“আরে অদ্ভুত তো! বলছি অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে। আপনি কি ডাক্তার নাকি যে বলে দিলেন শুধু ব্যান্ডেজ লাগালে হয়ে যাবে? এখান থেকে অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে। যদি ইনফেকশন হয়ে যায়!"
ইমদাদ এবারে গম্ভীর গলায় বলল,
“যদি ম্যাডামের ভালো চান তাহলে গিয়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে আসুন। আপনি যত দেরি করবেন আপনার ম্যাডামেরই কিন্তু সমস্যা হবে।”
আফসানার সমস্যা হবে কথাটা শুনতেই তূর্য আরো অস্থির হয়ে পড়লো। মনে পড়ে গেল আফসানার কেবিনেই ফার্স্ট এইড বক্স রাখা আছে। তাড়াহুড়ো করে সেটা বের করে এনে ইমদাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ধরুন। কি করবেন করুন।”
ইমদাদ বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তূর্যর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমাকে দিচ্ছেন কেন? ম্যাডামের ক্ষতস্থানটা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দিন।”
তূর্য কথা বাড়ালো না। তাড়াহুড়ো করে আফসানার দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসলো। আফসানাও আর বাঁধা দিলােনা। কেননা হঠাৎ করেই আবার হুঁশ ফিরেছে। আবার বুঝতে পেরেছে যে কাজটা ঠিক করেনি। কেননা হাতে এখন যন্ত্রণা হচ্ছে।
ইমদাদ দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছে তূর্যর কারবার। ছেলেটাকে খুবই সাধারণ একটা কাজ করতে পাঠিয়েছে। অথচ ছেলেটার হাত থরথরিয়ে কাঁপছে। হাতের র’ক্তই ঠিকঠাক করে পরিষ্কার করে দিতে পারছে না। ব্যান্ডেজ কি করে এই ছেলে করবে কে জানে।
ইমদাদ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সহ্য করার পর অবশেষে আর থাকতে পারলো না। তূর্যর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর হাত থেকে তুলো কেড়ে নিয়ে বলল,
“উঠুন এখান থেকে। পুরুষ মানুষ হয়ে যদি সামান্য এতোটুকু র’ক্ত দেখে এভাবে কাঁপা কাঁপি শুরু করেন তাহলে কি হবে আপনাকে দিয়ে।”
একটু অপমানিত হলো তূর্য। মিনমিনে গলায় বলল,
“পারবো আমি।”
“কত যে পারবেন আপনি সেটা আমার বোঝা হয়ে গেছে। উঠুন।”
আর কথা বাড়ালো না তূর্য। ওর জায়গায় ইমদাদ বসলো। খুব সাবধানতার সাথে ইমদাদ তুলো দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করে দিল। পরিষ্কার করা শেষে হাতে ব্যান্ডেজটা লাগাতে লাগাতে আফসানা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এজন্য আমি মানুষকে জ্ঞান দিতে চাই না। দেখেছেন তো আপনাকে দিয়েছিলাম জ্ঞান। নিজের স্বভাবের বাইরে গিয়ে কাজটা করেছিলাম। কিন্তু আপনি সেটা শুনলেন না। মানলেনও না আমার কথাগুলো।”
কোন উত্তর দিলো না আফসানা। চুপচাপ শুধু শুনে গেল কথাগুলো। আফসানার যেকোনো অসুবিধায় বর্তমানে সবার আগে এগিয়ে আসে তূর্য। ছেলেটা খুব অস্থির হয়ে পড়ে আফসানার যে কোন অসুবিধায়। তাই তূর্যর অস্থিরতা কিংবা চিন্তা কোনটাই আফসানাকে নতুন করে ভাবালো না। কিংবা অবাকও হলো না।
তবে আফসানা অবাক হয়েছে ইমদাদের জন্য। ইমদাদ ওর জন্য চিন্তা করছে। আবার নিজ থেকেই আফসানার হাতে ব্যান্ডেজ করে দিলো ভাবা যায়! আফসানার মনে হলো ওর বাবা মা'রা যাওয়ার পর থেকে ওর এতটা যত্ন আর কেউ কখনো করেনি। কেউ নেই যে ওর একটু যত্ন করতে পারবে। ইমদাদের সামান্য যত্নেই যেন ওর প্রতি অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে পড়তে চাইলো আফসানার লোভী মন।
আফসানার এসব ভাবনার মাঝেই ইমদাদের ব্যান্ডেজ করা শেষ হয়ে গেল। ইমদাদের হাতেও একটু র’ক্ত লেগেছে। নিজের হাতটা পরিষ্কার করতে করতে আফসানা কে উদ্দেশ্য করে ফের বলল,
“আমি খুব ভালো করে জানি ম্যাডাম আপনি কোন একটা উদ্দেশ্যেই আমার সাথে এই ব্যবসাটা করতে রাজি হয়েছেন। আমাকে ছোট করার কোন না কোন উদ্দেশ্য তো আপনার মাঝে আছেই। আর আমি একটা তুমুল রিস্ক নিয়ে এই খেলায় নেমেছি। আমি ভেবেছিলাম আপনি বোধহয় প্রচন্ড জেদি। নিজের আত্মসম্মান নিয়ে খুবই সচেতন। কিন্তু আপনার এই বাচ্চাদের মতন বারবার নিজের ক্ষতি করা দেখে আমার খুব হাসি পাচ্ছে। আপনি নিজেকে সবার সামনে হাস্যকর করে তুলছেন।”
আফসানা চেয়ারে মাথাটা এলিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে রইল কিছুক্ষণ। দু চোখের কোনা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর নিজেই বলে উঠলো,
“যে একসময় আপনাকে ভীষণ ভালোবেসেছিল, আপনি একসময় যার জীবনের সব ছিলেন যদি কখনো হঠাৎ করে জানতে পারেন যে সে সবই মিথ্যে ছিল তাহলে কেমন হবে আপনার অনুভূতি? আপনি যার আগে পিছে কোন কিছু না দেখে, তার পরিবার, ক্যারিয়ার, সৌন্দর্য, যোগ্যতা কোন কিছু না দেখে শুধু মাত্র সেই মানুষটাকে ভালোবেসে ছিলেন। যদি কখনো জানতে পারেন দিনের পর দিন সে আপনাকে ঠকাচ্ছে কেমন অনুভূতি হবে আপনার?”
প্রশ্নটা শুনে ইমদাদ কে একটুও ভাবতে হলো না উত্তরটা দেওয়ার জন্য। আলতো হেসে বলল,
“মে’রে ফেলতাম।”
আফসানা চমকে উঠে তাকালো ইমদাদের দিকে। বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“কি যা তা বলছেন?”
ইমদাদ হো হো করে হেসে উঠে বলল,
“আপনার আর আমার দুজনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। আমার সাথে এমনটা ঘটলে কি করতাম সেই কথায় না যাই। তবে আপনি চাইলে অনেক কিছুই করতে পারেন। আর কতবার আপনাকে আমি ইঙ্গিত দেবো বলুন তো যে, যিনি আপনার বেঁচে থাকা মুশকিল করে তুলছে আপনি তাকে স্বেচ্ছায় মৃ'ত্যু'র পর পথ বেছে নিতে বাধ্য করুন। যে আপনার থেকে হাসির কারণ কেড়ে নিয়েছে তাকে কাঁদাতে কাঁদাতে তার চোখের জল শুকিয়ে ফেলুন। আর তা না করে আপনি নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন।”
“কিন্তু কিভাবে কি করবো? আমি এসব পারবোনা।”
“এত বড় একটা ব্যবসা সামলাচ্ছেন, ইমদাদের সাথে প্রতিশোধের খেলায় নেমেছেন। আর বলছেন সামান্য একটা চরিত্রহীনকে সোজা করতে পারবেন না! আপনার মুখে এই কথাগুলো মানায় না ম্যাডাম। নিজের উপর আত্মবিশ্বাস তৈরি করুন। মনে করুন তাকে কতটা ভালোবেসেছিলেন। কিভাবে তাকে আগলে রাখতেন। আর মনে করুন সে কিভাবে আপনাকে ঠকাচ্ছে। দেখবেন তাহলে মনের মাঝে যে ঘৃণা টা তৈরি হবে না, সেই ঘৃণার আগুনে তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিতে পারবেন।”
আফসানা সত্যি মনে করলো পুরনো কথাগুলো। সেই সাথে মনে করলো এখনকার কথাগুলো। যে তীব্র ঘৃণা তৈরি হলো রওনাফের প্রতি সেটা হয়তো কাউকে বলে বোঝানো সম্ভব না। আফসানা বুঝলো ইমদাদের কথা ঠিক। ওকে শক্ত হতে হবে। নিজের উপর আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে। আর কেনই বা রওনাফের মতন মানুষের জন্য নিজের জীবনটা শেষ করবে। বরং উল্টো রওনাফের জীবন শেষ করে দেবে।