কামাল সরদার ঘরে তখন তার দুই ছেলের সাথে কোন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসেছেন। সাঈদ নিজের বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে দাদুর ঘরে গেল। দরজাটা হালকা করে চাপানো ছিল। একেবারে ছিটকিনি লাগানোর কোন প্রয়োজন নেই। কেননা এই বাড়িতে কারোর এতটা সাহস নেই যে কামাল সরদারের ঘরের দরজায় এসে আড়ি পাতবে কিংবা বিনা অনুমতিতে ঘরে প্রবেশ করবে।
তবে এসব অনুমতি নেওয়ার কিংবা ভদ্রতার ধার সাঈদ কোনকালেই ধারেনা। ফলস্বরূপ ঘরের দরজা হালকা চাপানো দেখেও থামার প্রয়োজন মনে করলো না। কিংবা অনুমতি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করারও প্রয়োজন মনে করলো না। সোজা ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলো। এক বিকট শব্দ হলো দরজা দুটো দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে।
বিকট একটা শব্দ হতেই তিন জনে একযোগে চমকে উঠে দরজার দিকে তাকালেন। দেখলেন সাঈদ এসেছে। সাঈদের এমন অদ্ভুত আচরণ কামাল সরদারের মোটেই পছন্দ হলো না। কিঞ্চিত রাগী গলায় বললেন,
“এসব কেমন আচরণ সাঈদ? তুমি দেখছো না আমরা এখানে আলোচনা করছি কিছু।”
সাঈদ কামাল সরদারের কথার কোন উত্তর না দিয়ে সরাসরি চেয়ারে বসা নিজের বাবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ইয়াসমিন সম্পর্কে অসম্মানজনক কোনো কথা কি আপনি ইমদাদকে বলেছেন?”
সাঈদ কে ঘরে আসতে দেখে করিম সরদার আন্দাজ করতে পেরেছিলেন যে ছেলেটা এই কারণেই এসেছে। যতই হোক কম বয়সী ছেলে প্রেমে পড়েছে। সেই প্রেমের উপর আঘাত এলে তো রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। ব্যাপারটাকে তিনি খুব স্বাভাবিক ভাবে নেওয়ার চেষ্টা করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“যার যেমন কথা প্রাপ্য তার উদ্দেশ্যে তেমন কথাই বলে এসেছি। তুমি আমার থেকে কৈফিয়ত চাওয়ার কে?”
করিম সরকার কথাটা বলতেই সাঈদ রাগে চিৎকার করে উঠে বলল,
“আপনি ইয়াসমিনের সম্বন্ধে খারাপ কথা বলার কে? আপনি আমার জীবনে নাক গলানোর কে? শুধুমাত্র আপনার সঙ্গে আমার বাপ ছেলের সম্পর্ক বলে আজ বেঁচে গেলেন। নয়তো ইয়াসমিনের সম্বন্ধে যদি কেউ নিজের মনে খারাপ ধারণাও আনে তবে তার বুক চিরে তার কলিজা বের করে নিতাম আমি।”
করিম সরদার এবারে নিজেও গর্জে উঠে বললেন,
“বেয়াদব ছেলে। বাবার মুখে মুখে তর্ক করছো সাহস তো কম না। বেয়াদবির একটা সীমা থাকে। কি শুরু করেছো তোমরা দুই ভাই বোন? পৃথিবীতে আর কোন ছেলে মেয়ে পেলেনা। মেয়ে গিয়ে বিয়ে করলো ইমদাদকে আবার তুমি বিয়ে করতে চাইছো সেই ইমদাদেরই বোনকে। আর কি কোন মেয়ে নেই দুনিয়াতে।”
“দুনিয়াতে আর মেয়ে আছে কিনা সে সব জেনে আমার কোন কাজ নেই। আমার ইয়াসমিনকেই লাগবেই। বুঝতে পেরেছেন আমার কথা? আমার ইয়াসমিনকেই চাই। ইয়াসমিনের ভাইই আটকাতে পারবেনা সেখানে আপনি কে।”
কথাটা বলে সাঈদের আর সেখানে দাঁড়ানোর ইচ্ছে হলো না। চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে করিম সরদার ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠলেন,
“এত সহজ নাকি! না আমরা কেউ মানবো আর না ইমদাদ ওর বোনকে তোমার হাতে তুলে দেবে। আর যদিও বা তুলে দেয় আর তুমি ওকে এই বাড়িতে নিয়ে আসো তাহলে ওর সাথে কি করতে হবে সেসব আমাদের সবার খুব ভালোভাবেই জানা আছে।”
করিম সরদার কথাটা বলতেই সাঈদ পিছন ঘুরে অগ্নিদৃষ্টিতে ওনার দিকে তাকালো। হঠাৎ করে ছেলের চোখ দুটো দেখে মৃদু কেঁপে উঠলেন তিনি। তার ভয় পাওয়ার কথা ছিল না ছেলের চোখ দুটো দেখে কিন্তু তারপরও তিনি ভয় পেলেন।
সাঈদ এগিয়ে গেল ওনার দিকে। করিম সরদার শুকনো একটা ঢোক দিলে গম্ভীর গলায় বলার চেষ্টা করলেন,
“ছেলে হয়ে বাবাকে ভয় দেখাতে চাইছো। মা’র’বে নাকি আমায়?”
সাঈদ অল্প বিস্তর হাসলো করিম সরদারের কথাটা শুনে। বেশ ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন আপনি আর আপনার বাবা। আপনারা যেমন স্বার্থপর আমাকেও কিন্তু তেমন স্বার্থপর ভাবেই তৈরি করেছেন। ইয়াসমিন আমার জান, আমার বেঁচে থাকার কারণ। যদি ওর দিকে হাত বাড়ান তাহলে তো আমি বেঁচে থাকতে পারবো না। আর আমি বাঁচতে চাই। ইয়াসমিনের সঙ্গে বাঁচার জন্য খুব খারাপ হতে পারি আমি। চরম পর্যায়ের স্বার্থপর হয়ে উঠতে পারি। মনে রাখবেন কথাটা।”
কথাটা বলে চলে গেল সাঈদ। রাগে দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললেন করিম সরদার। কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করতেই দেখলেন কালাম দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ভাইকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,
“ধৈর্য ধরুন ভাইজান। হঠকারিতায় কিছু করলে হবে না। আমাদেরকে ভাবনা চিন্তা করে পদক্ষেপ নিতে হবে।”
কালামের সুরে তাল মিলিয়ে বিছানার উপরে বসা কামাল সরদারও বলে উঠলেন,
“কালাম একদম ঠিক বলেছে করিম। সাঈদ কে কোন কিছু বুঝিয়ে লাভ নেই। ও এখন এই ধান্দাতে আছে যে করেই হোক ওই মেয়েকে বিয়ে করবে। আমাদের যা করার ইমদাদের সঙ্গে করতে হবে। ওকে খুব ভালোভাবে বোঝাতে হবে তোমায় যে ওর বোন এ বাড়িতে পা রাখলে কি পরিণতি হতে পারে। অতীত মনে করিয়ে দিয়ো ওকে।”
____________
রাতে খাবার টেবিলে এসে ইমদাদ ইয়াসমিন কে দেখতে পেল না। টেবিলে বেশ কয়েক পদের খাবার সাজানো। তার মানে রান্নাবান্না তো ইয়াসমিনই করেছে। তাহলে পরিবেশনের সময় নেই কেন? চেয়ারে বসা ইমাদকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“ইয়াসমিন কোথায়?”
“ঘরে আছে মনে হয়।”
“খেতে ডাকলো কে তোদের?”
“আপু গিয়ে ডাকলো।”
ইমদাদ ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“ও খাবে না?
“সেসব তো জানিনা। আমায় শুধু বলল রান্না হয়ে গেছে, খেতে আসতে।”
ইমাদ কথাটা বলতেই কলি মুখ ভেংচিয়ে বলল,
“আসবে না ইয়াসমিন আপু খেতে। কথা শুনিয়েই তো পেট ভরিয়ে দিয়েছো। আগামী এক মাসেও আর খেতে হবে না কিছু। অসভ্য বেয়াদব লোক কোথাকার। কথা বলতে বলতে কোন হুশ থাকে না। মানুষের খাওয়া দাওয়ার রুচি কেড়ে নেয়।”
ইমদাদ বিরক্তিকর দৃষ্টিতে কলির দিকে তাকিয়ে বলল,
“ইয়াসমিন তোকে বলেছে যে ও আমার উপর রাগ করে খাবে না?”
কলি একটু নড়েচড়ে বসে বলল,
“আলাদা করে বলার কী আছে। এটাই তো স্বাভাবিক। আমি হলেও এটাই করতাম। তোমার নিজের মনে নেই তুমি কেমন ব্যবহার করেছ? আমি জানি আপু তোমার উপর রাগ করেই খাবেনা। এটাই ঠিক আছে। তোমাকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার।”
“আমার বোন তোর মতন উজবুক না। ইয়াসমিন আমার উপর রেগে থেকে খেতে আসবে না এই শিক্ষা ওকে আমি দেইনি। নিশ্চয়ই অন্য কোনো কারণ আছে না আসার। তুই শুধু চুপচাপ দেখ আমি আমার বোনকে ডাকছি।”
কথাটা বলে ইমদাদ গলা উঁচিয়ে ইয়াসমিনকে একবার ডাকলো। সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসমিনের জবাব ভেসে এলো।
“ভাইয়া, দু মিনিট দাঁড়াও। আসছি আমি।”
একেবারে স্বাভাবিক ইয়াসমিনের কণ্ঠস্বর। মনে হচ্ছে কোন কাজ করছে, বেশ তাড়াহুড়ো কণ্ঠে জবাবটা দিল। ইয়াসমিনের জবাবটা পাওয়ার পর ইমদাদ কলির দিকে তাকিয়ে বলল,
“কানের মধ্যে গেছে তো ইয়াসমিনের জবাবটা?”
কলি বুঝলো ওর ধারণাটা বোধহয় ভুল। তবে তারপরও এত তাড়াতাড়ি তো হেরে যাওয়া যাবে না। জোর দিয়ে বলল,
“সে তো ভয়ে কিছু বলতে পারল না। এমনিতেই তোমার যা ব্যবহার ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। সবার তো আর কলির মতন সাহস নেই যে তোমার মুখে মুখে তর্ক করবে।”
ভীষণ বিরক্তিকর মুখ ভঙ্গি করে কলির দিকে শুধু তাকিয়ে রইল ইমদাদ। কিছু আর বলল না। কেননা এই মেয়েকে কোন কিছু বলা আর না বলা দুটোই সমান। কিছুক্ষণ পরেই ইয়াসমিন এলো। কিছু জিজ্ঞাসা করতে হলো না ইমদাদ কে। ইয়াসমিন নিজেই বলে উঠলো,
“আসলে ভাইয়া বাসন ধোঁয়ার সময় পানির ছিটা লেগে জামাটা ভিজে গিয়েছিল। সেজন্য বদলাতে গিয়েছিলাম। খাওয়া শুরু করোনি কেন এখনো? দাঁড়াও আমি বেড়ে দিচ্ছি খাবার।”
কথাটা বলে ইয়াসমিন সবার প্লেট নিয়ে খাবার বেড়ে দিয়ে নিজেও বসে পড়লো খেতে। ইমদাদ আর এই নিয়ে কোন কথা তুলল না। কলি বোধ হয় কিছু কথা তুলতে চেয়েছিল। তবে ঠিক সাহস হয়ে উঠল না। যদি ইমদাদ আগে আগে তুলতো তাহলে তর্ক করা যেত। কিন্তু কেন যেন আগে আগে আর নতুন করে কোন ঝামেলা পাকানোর সাহস হলো না।
____________
কোন এক অচেনা ঠিকানা থেকে একটা পার্সেল এসেছে আফসানার নামে। পার্সেলের ভিতর থেকে একটা খাম পেল। বেশ বড়সড়ো। কোন চিঠি তো নিশ্চয়ই এতে নেই। তবে কি আছে সেটাও বুঝতে পারছে না। খামটা খুলতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো বেশ কিছু ছবি।
খুব মনোযোগ দিয়ে আফসানা ছবিগুলো দেখলো। দুজন ছেলে মেয়ের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি। মেয়েটাকে আফসানা চেনেনা। তবে ছেলেটা আফসানার ভীষণ পরিচিত। কোন এক সময়ের আফসানার ভালোবাসা, সেই মানুষটা যাকে নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করতো। বর্তমানে অবশ্য সেই মানুষটার সাথে একটা সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ রয়েছে। আর সম্পর্কটা হলো স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক। হ্যাঁ ছবিতে যে পুরুষকে দেখা যাচ্ছে সে আর কেউ না আফসানের স্বামী রওনাফ।
অবাক করার বিষয় হলো আফসানা যখন বিছানায় বসে ছবিগুলো দেখছে তখন রওনাফ সেই বিছানারই অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে আছে। হাতে ফোন। আঙুলের গতিবিধি দেখে বোঝা যাচ্ছে টাইপ করছে। কারো সাথে মেসেজে কথা বলছে হয়তো। হয়তো ছবিতে যার সঙ্গে দেখা যাচ্ছে তার সঙ্গেই কথা বলছে।
তবে আফসানা এটা বুঝতে পারছে না যে এই ছবিগুলো ওর কাছে পাঠালো কে। রওনাফ তো আর নিশ্চয়ই পাঠাবে না। চোর কি আর চুরি করে ধরা দিতে চাইবে! তবে কি ছবির এই মেয়েটা পাঠিয়েছে? হতেই পারে। হয়তো আফসানা কে ছবিগুলো পাঠিয়ে রওনাফের আসল চেহারাটা দেখানোর চেষ্টা করছে যেন আফসানা নিজ থেকেই ওদের রাস্তা থেকে সরে যায়।
ছবিগুলো আর রওনাফ কে দেখালো না আফসানা। এই নিয়ে আর কোন কিছু বলার ইচ্ছেও হলো না। খামসহ ছবিগুলো আলমারিতে রেখে বিছানায় শোয়ার জন্য গেলো। তবে শুতে পারল না। রওনাফ কে দেখতেই গা ঘিন ঘিন করে উঠলো। মনে হচ্ছে যে পুরো ঘরটাই যেন নোংরা হয়ে গেছে। যখনই মনে পড়ে যাচ্ছে যে এই লোকটা কোন এক সময় আফসানা কে ছুঁয়েছিল তখন আফসানার মনে হচ্ছে ও নিজেও নোংরা হয়ে গেছে, অপবিত্র হয়ে গেছে। থাকতে পারলো না সেই ঘরে। যাওয়ার সময় ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ কানে যেতেই রওনাফ একটু কেঁপে উঠে দরজার দিকে তাকালো। দেখলো ঘরে আফসানা নেই। বুঝলো বেরিয়ে গেছে। মনে মনে খুশিই হলো। ভালো হয়েছে চলে গেছে। অন্তত এখন সারারাত শান্তি মত কথা বলতে পারবে নিজের প্রেমিকার সাথে।
__________
আজ আবার দু-একদিনের জন্য শহরের বাইরে এসেছেন ইমদাদ। সবার প্রথমে গন্তব্য আফসানার অফিস। তবে সেখানে গিয়ে আজকে আফসানা কে পেল না। তূর্যর থেকে জানতে পারলো আফসানা নাকি গুরুতর অসুস্থ। হসপিটালে এডমিট করা হয়েছে গতকাল মাঝরাতে।
একটু চিন্তিত ভাব দেখালো ইমদাদ। তবে অতিরিক্ত চিন্তিত ভাব দেখালো সাদিক। একেবারে অস্থির হয়ে উঠলো যেন। ওর এতো অস্থিরতা দেখে ইমদাদ বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
“তোর কি মনে হয় তোর এসব আলগা পিরিতে ম্যাডাম গলে গিয়ে তোর জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবেন? চৌধুরী বংশের সম্পত্তি হাতানোর ধান্দায় এত পিরিত দেখাচ্ছিস? বলদের মতন কাজ করিস না। চুপচাপ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাক।”
একটু অপমানিত বোধ করলো সাদিক ইমদাদের কথায়। চোখ মুখ গম্ভীর করে মৃদু রাগী গলায় বলল,
“এসব আবার কেমন কথা ইমদাদ। তুই জানিস না আমার প্রেমিকা আছে?”
“তাহলে প্রেমিকা থাকতেও পর নারীর জন্য এত দরদ উতলে পরে কেন তোমার? তোমার চরিত্র কেমন আমি জানি না। মেয়ে দেখলে যে তোমার সব কিছু নড়ে চড়ে ওঠে সেসব কি আমায় নতুন করে বোঝাতে হবে।”
এবারে অপমানে একেবারে মুখ বন্ধ হয়ে গেল সাদিকের। আর একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। এদিকে আফসানা যেহেতু অফিসে নেই তার মানে আজকে কোন কাজও হবে না। কেননা আসল কাজটা আফসানার সঙ্গেই ছিল। তাই ইমদাদ ভাবলো অপেক্ষা করে বসে থেকে তো কোন লাভও নেই। চলে যেতে চাইলো। তবে সাদিক ওকে বাঁধা দিয়ে বলল,
“এই কোথায় যাচ্ছিস? চল একবার আফসানা ম্যাডামকে গিয়ে দেখে আসি হসপিটালে। যতই হোক উনি আমাদের এত বড় উপকার করলেন। মনুষ্যত্ব বলতেও তো একটা ব্যাপার আছে। চল গিয়ে দেখে আসি।”
ইমদাদ সাদিকের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“তোর যখন এত বেশি ফাটছে তুই গিয়ে দেখে আয়। এখন ওনাকে দেখতে গেলে সবাই কি বলবে জানিস? বলবে তেলওয়ালা মাথায় তেল ঢালছি। ওনার পা চাটার মতন হয়ে যাবে ব্যাপারটা। তোর যখন এত চাটার শখ হয়েছে গিয়ে চেটে আয়। আমাদের জন্য ওনার কোনোকিছুই আটকে নেই।”
“আরে ধুর। মানুষের কথা এত কান দিলে হয় নাকি। মানুষটা অসুস্থ একবার দেখে আসবো না! ধর যদি হঠাৎ ম'রে টরে যায়। তখন কিন্তু আফসোস হবে বলে দিলাম আমি।”
ইমদাদ কিছু বলে উঠতে ধরলো তবে তার আগেই সেখানে তূর্য চলে এলো। ওদেরকে এখনও এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“আপনারা এখনো যাননি কেন? কোন দরকার ছিল কি?”
ইমদাদ কে কোন উত্তর না দিতে দিয়ে সাদিক বলে উঠলো,
“আসলে আমরা আফসানা ম্যাডামকে দেখতে যাবো ভাবছিলাম। কোন হসপিটালে উনি এডমিট আছে সেটা যদি একটু বলতেন তাহলে আমরা যেতাম।”
তূর্য তড়িৎ গতিতে বলে উঠলো,
“না না। আপনাদের যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।”
তূর্যর ব্যবহারটা ঠিক হজম হলো না ইমদাদের। কপাল কুঁচকে বলল,
“কেন? আমরা গেলে কি সমস্যা?”
“আরে বাবা বললাম তো প্রয়োজন নেই। ম্যাডাম এখন সুস্থ আছেন।”
“একটু আগেই তো বললেন গুরুতর অসুস্থ। কাল মাঝরাতে এডমিট করা হয়েছে হাসপাতালে। আপনার আবভাব দেখে তো মনে হলো জীবন ম'র'ণে'র ব্যাপার। এখনই আবার সুস্থ হয়ে গেল!”
তূর্য তোঁতলানো গলায় বলল,
“হ্যাঁ হয়ে গেছে। আপনি ওসব বুঝবেন না। অনেক বড় বড় ডাক্তার চিকিৎসা করছে ম্যাডামের।”
“হয়েছিল কি ম্যাডামের? দেখতে তো ওনাকে সুস্থই মনে হয়। হঠাৎ করে কি এত গুরুতর অসুস্থতা হয়ে গেল?”
এবারে তূর্য পড়লো মহাবিপদে। কি অসুস্থতার কথা বলবে। ধরা পড়ে যাবে তো। আবার যে সে অসুস্থতার কথা বললে পরে তো আফসানার কাছেও ঝাড়ি খেতে হবে। এদিকে আফসানা বলেছে কাউকে না জানাতে আসল কথাটা।
তূর্য কে চুপ করে থাকতে দেখে ইমদাদের ব্যাপারটা কেমন যেন খটকা লাগলো। মনে হলো কোন একটা রহস্য নিশ্চয় আছে আফসানার অসুস্থতার মাঝে। কখনো আফসানার কোন বিষয় একটুও কৌতূহল না থাকলেও ইমদাদের আজ কৌতূহল জন্মালো। সেই সঙ্গে এটাও ঠিক করলো যেহেতু তূর্য বলেছে ওদের যাওয়ার প্রয়োজন নেই তাহলে যাবেই।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন তূর্যর থেকে কোন উত্তর পেল না তখন ইমদাদ বলে উঠল,
“ঠিক আছে আপনাকে কিছু বলতে হবে না। কোন হসপিটালে আছে সেটা আমি জানি।”
তূর্য বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,
“আপনি কি করে জানলেন?”
“পুরো অফিসে এই একটা কথাই ঘুরছে। কিন্তু সমস্যা হলো কাউকেই আপনারা দেখা করতে যেতে দিতে চাইছেন না। যাই হোক, আমি দেখা করতে যাচ্ছি। যা জিজ্ঞেস করার ম্যাডামকেই করব।”
কথাটা বলে ইমদাদ সাদিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোকে নিয়ে যাবো তবে একটা শর্তে। আলগা পিরিত দেখাবি না। যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থেকে থাকে তবে আমার সাথে যাবি। নাহলে আলাদা ভাবে গিয়ে দেখে আসবি। বল পারবি নিজেকে সামলাতে?”
সাদিক চুপচাপ বাধ্য ছেলের মতন ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো। সাদিকের থেকে সম্মতি পেতেই ইমদাদ ঘুরে হাঁটা দিল। পিছন থেকে তূর্য অনেক বার করে ডাকলো, যেতে বারণ করলো তবে ইমদাদ তো কারো কথা শোনার পাত্র না। ও যখন একবার ঠিক করেছে যাবে তার মানে যাবেই।
_________
আফসানার কেবিনে যাওয়ার অনুমতি খুব বেশি কেউ পাচ্ছে না। তূর্য একবার গিয়ে দেখা করে আসতে পেরেছে। খুব বেশিক্ষণ না। ওই এক মিনিটের মতন ভেতরে থাকার অনুমতি পেয়েছিল আফসানার থেকে। তাও নিজে আর কি খোঁজখবর নেবে, ইমদাদরা দেখা করতে এসেছে সেই খবরটা দিতেই সময় চলে গেছে।
ইমদাদ দেখতে এসেছে খবরটা শুনে বেশ চমকালো আফসানা। সাদিক কে অবশ্য কেবিনের ভেতরে যাওয়ার জন্য অনুমতি দেয়নি। শুধু ইমদাদকেই অনুমতি দিয়েছে।
কেবিনের ভিতরে গিয়ে আফসানার বেডের পাশে একটা স্টুল টেনে বসল ইমদাদ। ওকে দেখতেই আফসানার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। দুর্বল কণ্ঠে বললো,
“আপনার যে আমাকে দেখতে আসার সময় হবে আমি সত্যি ভাবিনি। যাইহোক ব্যস্ততার মাঝে থেকে সময় বের করে আসার জন্য ধন্যবাদ।”
ইমদাদের দৃষ্টি তখন ছিল আফসানার হাতের কব্জিতে। শরীরের কোথাও কোন ক্ষত নেই, কোথাও কোন ব্যান্ডেজ নেই শুধু হাতের কব্জিতে ব্যান্ডেজ বাধা। আফসানার অবশ্য এই জিনিসটা আড়াল করার ইচ্ছে ছিল, তবে ভুলে গিয়েছিল। যখন বুঝলো ইমদাদের দৃষ্টি ব্যান্ডেজের দিকে সঙ্গে সঙ্গে হাতটা লুকোনার চেষ্টা করলো। তবে এখন আর লুকিয়ে কি হবে। যার দেখার সে তো দেখে নিয়েছে।
আফসানা আবারও জোরপূর্বক একটু হাসার চেষ্টা করে বলে উঠলো,
“চিন্তা করবেন না। খুব বেশি দিন হসপিটালে থাকতে হবে না। আজকের মাঝেই সুস্থ হয়ে যাব। আর আজকে যা কাজ করার ছিল সেগুলো কাল সেরে নেব।”
ইমদাদ নিজেও আলতো হেসে বলল,
“এখন কাজের কথা না হয় থাক। একটা উপদেশ দিতে চাই, নেবেন?”
এই প্রথম বোধহয় ইমদাদ নিজ থেকে বাড়তি কোন কথা বলতে চাইছে। তাও আবার সরাসরি উপদেশ দিতে চাইছে। তাই সুযোগটা মোটেও হাতছাড়া করতে চাইলো না আফসানা। ইমদাদ যথেষ্ট বিচক্ষণ মানুষ। ওর উপদেশ কাজে লাগতে পারে।
“হ্যাঁ বলুন।”
“আমাদের জীবনের মূল্য অনেক। ভালো, খারাপ, সুখ বা দুঃখ যাই থাকুক, যেমনই হোক জীবন একবারই পাবো আমরা। খুব অল্প সময় পাই আমরা জীবনটা উপভোগ করার জন্য। যতদিন বাঁচবেন জীবনটা উপভোগ করুন। একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী বাদে আপনার কাছে সবই আছে। কেন অন্যের জন্য অযথা নিজের জীবন শেষ করবেন বলুন তো আমায়? এটা কি কোন বিচক্ষণ মানুষের কাজ হতে পারে?”
বেডের উপর তখন হেলান দিয়ে বসে ছিল আফসানা। ইমদাদের কথাটা শুনে সোজা হয়ে বসল। ভীষণ চমকেছে। এই ছেলে এত কাহিনী বুঝলো কি করে? একে বললোই বা কে? তূর্য? কিন্তু আফসানার অনুমতি ছাড়া তো তূর্য কিছু করবে না।
আফসানা কন্ঠে তীব্র কৌতূহল সমেত জিজ্ঞেস করলো,
“আপনাকে এসব কে বলল?”
“বেশ অনেকক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছিলাম আপনার সাথে দেখা করার জন্য। রিসিপশনের কাছে এক ভদ্রলোক কে দেখলাম ফোনে বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ কারো কারো কাছে নিজের বউয়ের নামে ভীষণ নিন্দা করছিল। তার বউ নাকি আ’ত্ম’হ’ত্যা করার চেষ্টা করেছে। আর সেটা নিয়ে তার চিন্তা নেই। তার চিন্তা যে আবার আ’ত্ম’হ’ত্যা করার আগে তার বউ কোন চিঠিতে তার নাম লিখে রেখে গেছে কিনা। আর আফসোস করছিল তার স্ত্রী প্রাণে বেঁচে যাওয়ায়।”
“তো?”
“তো মানে কিছুক্ষণ পর তূর্য এসে সেই লোকটাকেই স্যার স্যার বলা শুরু করলো। লোকটাও খুব গরম দেখালো তূর্যর উপরে। তারপরে লোকটা সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর আমি তূর্য কে ধরলাম। বোঝেনই তো ছেলেটা বোকাসোকা, সহজ সরল। ও কিছু বলতে চায়নি কিন্তু অনেক কিছু বলেছে। আর বাকিটা আমি বুঝে নিয়েছি। এখানে এসে দেখলাম শুধু আপনার হাতে ব্যান্ডেজ। বুঝলাম অনেক কিছু। তবে আফসানা চৌধুরীর থেকে এমন একটা বোকামো আশা করা যায় না।”
একটু লজ্জায় পড়ে গেল আফসানা। কাজটা করার পর তো নিজেরই উপলব্ধি হয়েছিল যে আসলেই বোকামি করেছে। সেজন্যই তো জ্ঞান হারানোর আগে তূর্য কে কল করেছিল। আফসানাই বোধহয় প্রথম যে নিজে আ’ত্ম’হ’ত্যা করে আবার বাঁচার জন্য সাহায্য চেয়েছিল।
আফসানার এসব ভাবনার মাঝেই ইমদাদ ফের বলে উঠলো,
“আমার একজন বড় বোন ছিল। সেও আপনার মতন সুন্দরী, শিক্ষিত ছিল। তবে ভালোবেসেছিল ভুল মানুষকে। শেষে সংসারের স্বপ্ন দেখতে দেখতে তিন মাসের অন্তঃসত্তা অবস্থায় আ’ত্ম’হ’ত্যা করেছিল। আর তার প্রাক্তন স্বামী এখন দ্বিতীয় বিয়ে করে সুখে শান্তিতে ঘর সংসার করছে। আসলে ক্ষতিটা কার হলো বলুন তো? আমার বোনের আর আমার পুরো পরিবারের। ওই ছেলে কিন্তু দিব্যি ভালো আছে। আপনারা মেয়েরা যে এত বোকা কেন হন আমি বুঝি না। ভালোবাসবেন ঠিক আছে। তাই বলে একটু তো ফাঁকফোঁকর রাখবেন না।”
“এত নিয়মকানুন মেনে ভালোবাসা যায় না। আমি যাকে ভালোবাসি কোন ফাঁকফোঁকর রেখে ভালোবাসি না। সবটা উজাড় করে দিয়েই ভালোবাসি।”
ইমদাদ ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“তাহলে তো বাঁশ খাবেনই। যেখানে গোটা দুনিয়াটাই স্বার্থের উপরে চলে সেখানে আপনি নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে সুখে থাকবেন এই স্বপ্নটা দেখেনই বা কিভাবে? আপনাদের চিন্তা ভাবনাতেই বোকামি থাকে। আমরা স্বপ্ন দেখি শুধু রাতে কিন্তু আপনারা মেয়েরা দিনরাত মিলিয়েই স্বপ্ন দেখেন। ভাবেন আপনারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারবেন স্বপ্নে। তবে জীবন স্বপ্নের মত নয় ম্যাডাম।”
কথাটা বলে ইমদাদ উঠে দাঁড়ালো। আফসানা মাথা তুলে ওর দিকে তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে বলল,
“চলে যাচ্ছেন?”
ইমদাদ একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“হ্যাঁ চলে যাচ্ছি। বহুত জ্ঞান দিয়েছি। এখন আপনি দেখুন যা ভালো বোঝেন তাই করুন। আমি জানিনা আপনাদের মধ্যে সমস্যা কি, আর জানতেও চাইনা। তবে আপনার হাজবেন্ডের কথা শুনে এতোটুকু বুঝেছি তিনি আপনার উপরে চরম লেভেলের বিরক্ত। এখন শেষ সিদ্ধান্তটা আপনার যে আপনি এমন একটা মানুষের জন্য নিজের জীবন শেষ করবেন নাকি তাকে তার জীবন শেষ করতে বাধ্য করবেন। নাও দ্যা চয়েজ ইজ ইওরস।”