অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ৩৮

🟢

“আজ আমার বিয়ে দাদু। চাইলে আপনি আসতে পারেন।”

কামাল সরদার মাথা তুলে সাঈদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

“নিমন্ত্রণ করছো?”

“তেমনই বলতে পারেন।”

“আমার নাতির বিয়েতে আমাকেই নিমন্ত্রণ করছো? তোমাকে এত ভালোবেসেছি আজ তার এই প্রতিদান দিচ্ছো? একবারও আমার থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলে না?”

সাঈদ তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“আপনার অনুমতি নিতে গিয়ে তো আপনার ছেলের জীবন শেষ হয়ে গেছে। আবার আমি সেই একই ভুল করবো নাকি? আপনাকে নিমন্ত্রণ করাটাও হয়তো বাড়াবাড়ি। ইমদাদ যদি শোনে তাহলে রেগে যাবে হয়তো। কিন্তু তাও করলাম। যতই হোক আমায় ভালোবেসেছেন। আমিও আপনাকে ভালোবেসেছি কোনো এক সময়। আপনার ইচ্ছে হলে আসবেন নয়তো আসবেন না।”

করিম সরদার তখন কামাল সরদারের পাশেই বসে ছিলেন। ওদের মাঝে কথোপকথনটা হচ্ছে বসার ঘরে। নয়তো করিম সরদার আজকাল আর তার বাবার সাথে কথা বলেন না। সাঈদ কামাল সরদার কে কথাটা বলে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে করিম সরদার বলে উঠলেন,

“বিয়েটা করার আগে আরেকবার ভেবে দেখো। পরে যেন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আফসোস না করতে হয়। এটা কিন্তু তোমার জীবনের অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত। একা একাই নিয়ে নিলে? বড়দের থেকে পরামর্শ নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করলে না?”

সাঈদ এবারে পিছন ফিরে তাকিয়ে করিম সরদারকে উদ্দেশ্য করে ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“কার থেকে পরামর্শ চাইবো যে নিজের জীবনেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি তার থেকে?”

অপমানিত হলেন করিম সরদার। গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,

“ভদ্রভাবে কথা বলো।”

“ভদ্রলোকদের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলতে হয়। যেখানে আমার আপনার সাথে কথা বলারই রুচি হয়না সেখানে আবার ভদ্রভাবে কথা বলবো!”

পাশ থেকে কামাল সরদার রাগী গলায় বলে উঠলেন,

“আজ যে এভাবে আমাদের অপমান করে চলে যাচ্ছো বউ নিয়ে তো এই বাড়িতেই আসতে হবে। ভুলে গেলে সে কথা?”

“কে বলেছে আপনাদের আমি আমার বউকে নিয়ে এই বাড়িতে আসবো? আমায় পাগল কুকুরে কামড়েছে নাকি যে ইয়াসমিনকে একটা সুন্দর জীবন উপহার দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই নরকে এনে ফেলবো। তার থেকেও বড় কথা ইমদাদ শর্তই দিয়েছে আমাকে ইয়াসমিনকে পেতে হলে আপনাদের সবাইকে ছাড়তে হবে। ছেড়ে দিলাম আপনাদের সবাইকে। এমনিতেও ধরে রাখার মতন মানুষ আপনারা না।”

বাপ ছেলে দুজনেই বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলেন। কামাল সরদার নিজের জায়গা থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বললেন,

“তুমি ছেড়ে যাবে আমাদের সবাইকে ঐ মেয়ের জন্য? তুমি ফিরবে না আর এই বাড়িতে?”

সাঈদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“কার টানে ফিরব? কার কাছে ফিরবো? কি কারণে ফিরবো? এই বাড়িতে কোন সুখ আছে? এই বাড়িতে কারো মনে শান্তি আছে? এই বাড়িটা শ্মশান মনে হয় আমার কাছে আজকাল। মাঝে মাঝে শুধু কিছু ঘর থেকে মানুষের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়।”

করিম সরদার বুঝলেন রাগারাগি করে কোন লাভ হবে না। সাঈদের গুণ তো অনেকটাই ইমদাদের মতনই, ত্যাড়া। রাগারাগি করলে আরো বিগড়ে যাবে। কামাল সরদার নরম হলেন। সাঈদ কে অনেক ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। আদর করলেন, স্নেহ করলেন, নিজের ভালোবাসার কথাগুলো মনে করিয়ে দিলেন। তবে কোন কিছুতেই কোন লাভ হলো না। ওনার এত প্রচেষ্টার পরেও সাঈদ নিজের কথাতে অনড় থাকলো। নিজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা কামাল সরদার কে জানিয়ে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে কামাল সরদার বলে উঠলেন,

“মনে রেখো, একবার এই বাড়ি থেকে বেরোলে আর কিন্তু কখনো এই বাড়িতে প্রবেশ করতে পারবে না। এই বাড়ি, ব্যবসা, সম্পত্তি কোনোকিছুতেই আর তোমার অংশ থাকবে না। যা করবে বুঝে শুনে করো।”

সাঈদ এবারে থামলো ঠিকই তবে পিছন ঘিরে তাকালো না। তাচ্ছিল্যে হেসে বললো,

“আমার ইয়াসমিন পবিত্র। আমাদের সম্পর্কটা পবিত্র। এই অপবিত্র বাড়িতে ওকে আনবোনা। আপনাদের হারামের টাকায় আমাদের সংসার শুরু করব না। আর চিন্তা করবেন না, সাঈদ যখন একবার এই বাড়ি থেকে নিজ ইচ্ছেয় বের হচ্ছে তখন দ্বিতীয়বার তখনই বাড়িতে আসবে যখন সাঈদের ইচ্ছে হবে। আর হয়তো সে ইচ্ছে কোনদিন হবেও না।”

__________

বিয়েতে মেরুন রংয়ের কাতান শাড়ি পড়েছে ইয়াসমিন। বেশ ভারী সাজগোজ করেছে আজ। গয়না হিসেবে সোনার পরেছে সবকিছু। ওর মায়ের কিছু ছিল, আর বাকি টুকটাক ইমদাদ যা পেরেছে তা কিনে দিয়েছে। ইমদাদের দেওয়ার মাঝে এক জোড়া কানের দুল আর একটা সোনার টিকলি কিনে দিয়েছে। আর বাকি আপাতত যা ওর মায়ের ছিল সেই পরেছে। পার্লার থেকে মেয়েরা এসে সাজিয়ে দিয়ে গেছে ইয়াসমিনকে। ইয়াসমিন কে সাজানো শেষে কলিও সাজগোজ করে নিল।

ওদের দুজনেরই সাজগোজ তখন শেষ। ইমদাদ ঘরে এলো দেখার জন্য যে ওদের সাজগোজ হয়েছে কিনা। ঘরে এসেই ইয়াসমিনকে তাড়া দিয়ে বলল,

“হলো তোদের সাজগোজ ইয়াসমিন?”

ইমদাদের কন্ঠটা পেতেই ইয়াসমিন ঘাড় ঘুরিয়ে ইমদাদের দিকে তাকে স্মিত হেসে বলল,

“হ্যাঁ ভাইয়া হয়ে গেছে।”

ইমদাদ এগিয়ে গেল বোনের দিকে। খুব ভালোভাবে ইয়াসমিনকে দেখলো। কি মিষ্টি লাগছে দেখতে ইমদাদের বোনটাকে। ইমদাদ ভেবেই পাচ্ছে না যে কখন ওর ছোট বোনটা এত বড় হয়ে গেল যে বিয়ে দিয়ে দিতে হচ্ছে।

হঠাৎ করে ইমদাদের নিজের মা-বাবার কথা মনে পড়ে গেল। ওনারা থাকলে আজ ভীষণ খুশি হতেন তাই না? ওর মা নিশ্চয়ই এতক্ষন কান্নাকাটি শুরু করে দিত মেয়ের বিদায়ের কথা ভেবে। ওর বাবা হয়তো বিয়ের তোরজোরে ব্যস্ত থাকত। হয়তো আরো ধুমধাম করে ইয়াসমিনের বিয়েটা দিত।

কথাগুলো ভাবতেই আপনাআপনি ইমদাদের চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। ইমদাদের চোখে জল দেখে ইয়াসমিন উঠে দাঁড়িয়ে ব্যতিব্যস্ত গলায় বলল,

“কি হয়েছে ভাইয়া? কাঁদছো কেন? কেউ কিছু বলেছে নাকি আবার?”

ইমদাদ তাড়াহুড়ো করে নিজের চোখ দুটো মুছে নিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল,

“না। তোর ভাইকে কিছু বলবে এত সাহস আছে নাকি কারো। তুই চলে যাবি সেটা ভেবে চোখে জল চলে এসেছিল। সে যাই হোক, খুব সুন্দর লাগছে তোকে দেখতে। চোখ ফেরানো যাচ্ছে না আমার বোনের উপর থেকে।”

ইয়াসমিনের চোখ দুটোও ছল ছল করে উঠলো। ইমদাদ কে জড়িয়ে ধরে মৃদু ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“তুমি তো জোর করে পাঠিয়ে দিচ্ছো। আমি তো যেতে চাইনি। কি দরকার ছিল আমার বিয়ে দিয়ে দেওয়ার? আমি তো এখানে ভালোই ছিলাম। বেশি হয়ে গেছি তোমার কাছে তাই না? বোঝা হয়ে গেছি আমি?”

ইয়াসমিন কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে হাতের আজলায় ইয়াসমিন এর মুখটা নিয়ে ইমদাদ বলল,

“কি ভুলভাল বলছিস? তুই আমার কাছে বোঝা হয়ে যাবি এটা হতে পারে?”

“তাহলে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছো কেন আমার?”

ইমদাদ আলতো হেসে বলল,

“এটা তো আমার দায়িত্ব। বাবা মা এই দায়িত্বটা আমার কাঁধে দিয়ে গিয়েছিল সেটা পালন করতে হবে না। তুই আমার বোন, আমার কলিজার একটা অংশ। তোকে কি পরের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে আমার কষ্ট হচ্ছে না? কিন্তু এটা তো করতেই হবে। আজ নাহয় আমি আছি। কাল যদি আমি না থাকি আমার অবর্তমানে তোর দায়িত্ব তো নিতে হবে কাউকে।”

বিজ্ঞাপন

ইয়াসমিন এবারে কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

“একদম আজেবাজে কথা বলবে না। তুমি সব সময় থাকবে। আমার সব সময় তোমায় প্রয়োজন।”

“আচ্ছা ঠিক আছে আর বলবো না। এখন কাঁদিস না। সাজগোজ নষ্ট হয়ে যাবে।”

ইয়াসমিনের সাথে আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা শেষে ইমদাদ ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ওর পিছন পিছন কলিও বেরিয়ে এলো। পিছন থেকে একবার ডাকলো ইমদাদ কে।

“শোনো!”

ইমদাদ থামলো। পিছন ফিরে তাকিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গীতে বলল,

“হ্যাঁ বলো।”

কলি অভিমানি গলায় বলল,

“শুধু তো বোনেরই প্রশংসা করলে। একবারও তো আমার দিকে তাকালে না। আমায় কেমন লাগছে সেটাও তো বললে না।”

কথাটা বলে কলি মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।

কলির এমন বাচ্চামো দেখে ইমদাদ হেসে ফেলল। ওর কানের কাছে মুখ নামিয়ে নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

“তোমার সঙ্গে তো আমার রাতে দেখা হবে। রাতে কথা হবে তোমার সঙ্গে। রাতে আমাদের ঘরে একাকি তোমায় খুঁটিয়ে খুটিয়ে দেখবো। তখন মন ভরে প্রশংসা করবো। বাড়িতে আজ একটা বিয়ে বিয়ে ভাব তো। তাই নতুন করে বাসর করতে ইচ্ছে করছে তোমার সাথে। আমাদের বিয়ের পর তো সময়মতো বাসরটা করতে পারিনি। সেটা না হয় আজই করে নেব।”

ইমদাদের কথাগুলো শুনে কলির কান গরম হয়ে গেল। লজ্জায় মিইয়ে গেল। ইমদাদ আশেপাশে একবার দেখে নিল কেউ আছে কিনা। কেউ নেই। এই সুযোগে কলির গালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে সেখান থেকে চলে গেল।

________

ইমদাদের শহরেই একটা ছোটখাটো একতলা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে সাঈদ। ইয়াসমিনের ইচ্ছে ছিল এই শহরেই থাকার। তাই এখানেই বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। বিয়ের পরে ইয়াসমিনকে নিয়ে সেই বাড়িতেই উঠেছে। ইমদাদ অবশ্য নিষেধ করেছিল। বলেছিল অন্তত আজকের দিনটা যেন ওদের বাড়িতেই থেকে যায়।

তবে সাঈদ শোনেনি ইমদাদের কথা। এক মিনিটও আর ইয়াসমিনকে কারো কাছে রাখবে না, কারো বাড়িতে থাকবে না। ওদের নিজের ঘরে নিয়ে যাবে। সাঈদ কত সুন্দর করে সাজিয়েছে নিজেদের ঘরটা। এত সুন্দর করে সাজানো ঘরটাতে ইয়াসমিন কে এনে তুলবে না!

ইয়াসমিন তখন পাশের ঘরে গিয়েছে জামা কাপড় বদলাতে। ইয়াসমিন এখনো এই ঘরে আসেনি। সাঈদ বুঝে উঠতে পারছে না আরো কি করলে ভালোভাবে ইয়াসমিনকে স্বাগত জানানো যাবে। আরো কি করলে ইয়াসমিন বুঝতে পারবে ও সাঈদের কাছে ঠিক কতটা বিশেষ।

একবার ফুল দিয়ে সাজানো বিছানার দিকে তাকালো সাঈদ। বিছানার চাদরের উপর গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়ে রাখা। সাঈদের একবার মনে হলো এসব যদি ইয়াসমিনের পছন্দ না হয়! ইয়াসমিন তো নিশ্চয়ই ঘুমোবে। এগুলোর উপর ঘুমোবে কি করে। অসুবিধা হবে তো।

সাঈদ তাড়াহুড়ো করে গিয়ে বিছানার চাদরের উপর থেকে গোলাপের পাপড়ি গুলো সরিয়ে একেবারে টানটান করে রাখল বিছানাটা। বালিশও ঠিকঠাক করে দিল। মেঝের উপরে পড়ে থাকা ফুলের পাপড়ি গুলো তুলে বাইরে ফেলে দিল। একবার ভালো করে পুরো ঘরটা দেখে নিল সাঈদ। একদম ঠিকঠাক আছে সবকিছু।

খুব বেশি আসবাবপত্র নেই। একটা খাট আর ড্রেসিং টেবিল। তাও আপাতত ইমদাদের থেকে টাকা ধার নিয়ে কিনেছে। ইয়াসমিন যে জামা কাপড় রাখবে তেমন একটা আলমারিও নেই। কিনবে অবশ্য আলমারি। সেটাও ইমদাদের থেকে টাকা ধার নিয়েই কিনবে। ইমদাদ লোন তুললে সেই টাকা ধার নেবে। টাকাটা একবার পেয়ে গেলেই ইয়াসমিনের যাবতীয় প্রয়োজনীয় সব কিছুই কিনে এনে দেবে সাঈদ।

সাঈদের এসব ভাবনার মাঝেই ইয়াসমিন ঘরে এলো। হালকা একটু কেশে সাঈদের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। সাঈদ দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো ইয়াসমিন দাঁড়িয়ে আছে। লাল টকটকে একটা শাড়ি পড়েছে। গলায় সোনার চিকন মালা আর কানে একটা ছোট সোনার দুল পরেছে। নাকে ছোট্ট একটা নাক ফুল চকচক করছে। কি স্নিগ্ধ লাগছে দেখতে ইয়াসমিনকে। সাঈদ তাকিয়েই রইল তো তাকিয়েই রইল। কতটা সময় ধরে তাকিয়ে রইল তার হিসেব জানে না। আদৌও চোখের পলক ফেললো কিনা সেও জানে না।

সাঈদ কে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অস্বস্তি হলো। ইয়াসমিন আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলো না। ঘরের ভিতরে চলে এলো। শাড়ি গুলো কোথায় রাখবে বুঝতে পারল না। শেষে ব্যাগের ভেতরেই আবার ঢুকিয়ে রাখলো। গয়নাগাটি যা ছিল সেগুলো ড্রেসিং টেবিলের উপর খুলে রাখল। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো সাঈদ এখনও ওর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে।

ইয়াসমিনের মনে হলো এবারে সাঈদের ধ্যান ভাঙানো দরকার। হালকা একটু কেঁশে বলে উঠলো,

“তুমি জামা কাপড় বদলাবে না?”

ধ্যান ভাঙলো সাঈদের। একটু নড়ে চড়ে উঠে বলল,

“হ্যাঁ বদলাবো। তোর কিছু প্রয়োজন? আরে না মানে তোমার কিছু প্রয়োজন? ক্ষুধা লেগেছে? কিছু এনে দেবো? খাবে?”

“না ঠিক আছে কিছু লাগবে না। খেয়েই তো এসেছি।”

কেউই আর বলার মতন কোন কথা খুঁজে পাচ্ছে না। এতদিন সাঈদ হাঁসফাঁস করতো একটু ইয়াসমিনের সাথে কথা বলার জন্য। একটু সুযোগ পেলেই মনে হতো কত কথা যেন জমে আছে।

বেশ অনেকটা সময় নীরবতা পালন করার পর সাঈদই আগে বলে উঠলো,

“তুমি চাইলে ঘুমিয়ে পড়তে পারো।”

“তুমিও ঘুমিয়ে পড়ো। সারাদিন অনেক খাটাখাটনি হয়েছে।”

“হ্যাঁ। ফ্রেশ হয়ে এসে ঘুমোবো। তুমি ঘুমোও।”

বলার মতন আর কোন কথা খুঁজে পেলো না ইয়াসমিন। তাই বাধ্য হয়ে বিছানার দিকে যেতে ধরলে সাঈদ পিছন থেকে একবার ডেকে উঠলো।

“ইয়াসমিন!”

ইয়াসমিন থামলো। তড়িৎ গতিতে পিছন ফিরে তাকিয়ে বলল,

“হ্যাঁ বলো।”

কিছুক্ষণ আমতা আমতা করলো সাঈদ। বেশ অনেকটা সময় পর আকুতির স্বরে বলল,

“একবার জড়িয়ে ধরতে পারি তোমায়?”

ইয়াসমিন চমকে উঠে বলল,

“হ্যাঁ?”

সাঈদ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলল,

“বললাম তোমার অসুবিধা না থাকলে একবার জড়িয়ে ধরি? খুব ইচ্ছে করছে জড়িয়ে ধরতে। আসলে মাঝে মাঝে তো বিশ্বাসই হতে চায় না যে তোমাকে পেয়ে গেছি আমি। ভাবতে অবাক লাগে যে তুমি এখন সারা জীবনের জন্য আমার, তোমার উপর সব থেকে বেশি আমার অধিকার। আসলে খুব ভালোবাসি তো তোমায়। তাই কেমন যেন পাগল পাগল লাগে নিজেকে। আর কিছু চাইবো না শুধু একটু জড়িয়ে ধরতে দিলেই হবে।”

সাঈদ বোধহয় আরো কিছু বলতো। হয়তো এবারে ইয়াসমিনকে বোঝাতো যে কেন ওকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। একটা বার জড়িয়ে ধরলে যে সাঈদ ঠিক কতটা শান্তি পাবে সেটা বলতো। তবে এত কিছু আর বলতে হলো না সাঈদ কে। ইয়াসমিন নিজেই সাঈদোর দিকে এগিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে সাঈদের বুকে নিজের মাথা রেখে বলল,

“আমার মতন তুচ্ছ একটা মানুষকে পাওয়ার পর কেউ যে এতটা খুশি হতে পারে সেটা আমি কখনো ভাবিনি। কেউ আমায় পাওয়ার খুশিতে যে নিজেকে পাগল বলবে সেটাও আমি কখনো ভাবিনি। তোমার ভালোবাসায় বরাবরই সন্দেহ ছিল আমার। বরাবরই ভয় হত। তবে এখন না আমি আর সন্দেহ করতে চাই, আর না আমি চাই ভয় পেতে। এবারে তোমায় ভালোবেসে আমি নিশ্চিন্ত হতে চাই। একটা নির্ঝঞ্ঝাট, নির্ভেজাল ভালোবাসাময় সংসার সাজাতে চাই।”

সাঈদ পাল্টা দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ইয়াসমিনকে। ইয়াসমিনের চুলের ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে বলল,

“দেবো। সব সাজিয়ে দেবো। তুমি যা চাইবে তোমায় সব দেব। তুমি যদি কখনো আমার থেকে আমার প্রাণটাও চাও। সেটাও হাসিমুখে তোমার হাতে এনে রেখে দেব। এতটাই ভালোবাসি তোমায় আমি।”

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প