অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ৩৯

🟢

মাঝে বেশ অনেকগুলো মাস কেটে গেছে। ধরণীতে তখন আবির্ভাব ঘটেছে শীতের। সূর্যের দেখা আজ মেলেনি সকাল থেকে। চারিদিক কুয়াশায় ঢেকে আছে। ইমদাদ তখনও গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। এর মাঝে ওর ফোনটা বেজে উঠলো। ভীষণ বিরক্ত হলো ইমদাদ এই অসময়ে ফোন আসায়। ভাবলো রিসিভই করবেনা। সে অনুযায়ী আবার ঘুমোনোর চেষ্টা করলো। ফোনটা রিং হতে হতে কেটে গেল। একটু পরে আবারো শব্দ করে বেজে উঠল ফোনটা। এবারে ঘুমটা বেশ ভালো মতেই ভেঙে গেল। যে ফোন করেছে তার উপরে ভীষণ বিরক্ত হলো ইমদাদ।

হাতরে পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে দেখলোও না কল করেছে। রিসিভ করে কানে ধরে ঘুমুঘুমু কন্ঠে বলল,

“কে?”

অপর পাশ থেকে ভেসে এলো সাঈদের চিন্তিত কণ্ঠস্বর,

“দাদু স্ট্রোক করেছে ইমদাদ। হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি।”

ইমদাদ তড়িৎ গতিতে চোখ খুলে তাকালো। হঠাৎ করে খবরটা পাওয়ায় কিঞ্চিত চমকে ছিল। তবে মুহূর্তের মাঝে আবারও স্বাভাবিক হয়ে গেল। স্বাভাবিক গলাতেই বলল,

“তাে আমি কি করবো?”

“কিছু করতে বলছি না তোকে। শুধু খবরটা জানালাম। কলিকে জানাস।”

“ওকে জানানোর কি আছে? চিন্তা করিস না তোর দাদু ম’র’বে না। এখনো তো ওনার শাস্তি শুরুই হয়নি। এত সহজে ম'র'বে'ন না উনি। কই মাছের প্রাণ ওনার।”

“এখন অন্তত এভাবে বলিসনা। অসুস্থ উনি।”

“তো আমি কি করবো? তোর প্রিয় দাদার মৃ'ত্যু কামনা করি না আমি। ম'রে গেলে তো উনি শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যাবেন। আমি চাই উনি যেন তিলে তিলে ম'রে'ন। জীবনে যা পাপ করেছেন সেই পাপের শাস্তি পেতেই হবে।"

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সাঈদ। বুঝলো ইমদাদ কে খবরটা দেওয়া আর না দেওয়া দুটোই সমান। “রাখছি” বলে ফোনটা কেটে দিলো সাঈদ।

ইমদাদ ফোনটা রেখে পাশে তাকাতেই দেখলো কলি নেই। ঘড়িতে সময় দেখলো সকাল ন'টা বাজে। মেয়েটা আবার আগে আগে উঠে নিশ্চয়ই রান্না ঘরে চলে গেছে রান্না করার জন্য।

ইয়াসমিনের অনুপস্থিতিতে এই কয় মাসে কলির অনেক উন্নতি হয়েছে। পুরো সংসারের দায়িত্ব এখন কলির। কলি খুব সুন্দর ভাবে সংসারটা সামলায়। রান্নাবান্না নিয়ে যেটুকু সমস্যা ছিল সেটুকুও এখন আর নেই। ছন্দা ওদের সঙ্গেই থাকে। ওনার থেকেই কলি যাবতীয় রান্না বান্না সব শিখে গেছে।

ইমদাদ উঠে বসে গলা ছেড়ে কলির নাম ধরে ডাকলো। কলি হন্তদন্ত পায়ে ওড়নায় ভেজা হাত মুছতে মুছতে সেখানে এসে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,

“কি হয়েছে?”

ইমদাদ রাগী গলায় বলল,

“তোমায় আমি এত কাজ করতে নিষেধ করেছি না? তোমার নিজের জন্য না হলেও বাচ্চার জন্য তোমায় বিশ্রাম নিতেই হবে।”

কলি মুখ ভেঙচিয়ে বলল,

“বউ রেখে বাচ্চার দরদ দেখাচ্ছে। স্বার্থপর কোথাকার। টান শুধু নিজের রক্তের প্রতি তাই না? অন্যের মেয়ের দাম নেই।”

“অন্যের মেয়ে যদি এখন নিজের শরীরের আরাম না বোঝে তাহলে আমি কি করবো? শখ করে লাফাতে লাফাতে তো তুমিই রান্না ঘরে যাও। এই ঠান্ডার দিনে রান্নাবান্না করার কোন মানে হয়? আমি কাজের লোক রাখিনি?”

কাজের লোকের কথাটা শুনে কলি আমতা আমতা করে বলল,

“ওকে আমি আসতে নিষেধ করে দিয়েছি।”

ইমদাদ কপাল কুঁচকে বলল,

“কেন?”

কলি আবারও আমতা আমতা করে বলল,

“এই কয়জন মানুষেরই তো রান্না করতে হয়। কি এমন কাজ বাড়িতে যে আবার আলাদা করে কাজের মানুষ রাখতে হবে? শুধু শুধু টাকা নষ্ট।”

কলি বুঝলো এখন ইমদাদ রেগে মেগে গিয়ে ওকে আচ্ছা মত ঝাড়ি দেবে। তাই আগেভাগেই হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“শোনো, একদম আমার সংসারে বেশি মাতব্বরি করতে আসবে না। তুমি তোমার ব্যবসায় কি করো আমি সেসব নিয়ে কিছু বলি? তাই আমার সংসারে আমি কি করবো সেসব নিয়ে তুমি জ্ঞান দিতে আসবে না। আর আমি একদম ঠিক আছি। তোমার বাচ্চারও কিছু হবে না।”

কথাটা বলে কলি গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। ইমদাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে উঠে কলির দিকে এগিয়ে গেল। ইমদাদ কে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে কলি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ালো।

ইমদাদ হাসলো। দুদিন পর মেয়েটার বাচ্চা হবে অথচ এখনো নিজের বাচ্চামো গেলো না। ইমদাদ মাঝে মাঝে ভেবে পায় না যে দুটো বাচ্চাকে ও একসাথে সামলাবে কি করে। কলির প্রতি যদি ইমদাদের ভালোবাসার সামান্য একটু হেরফের হয় তাহলে তো এই মেয়েটাও কান্নাকাটি শুরু করে দেবে। একই ঘরে যদি দুটো বাচ্চা একসাথে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়, তাহলে কাকে ছেড়ে কাকে সামলাবে।

কথা গুলো ভেবে হাসলো ইমদাদ। হুট করেই আবার মনে হলো যে কলির মান ভাঙাতে হবে। মেয়েটা তো আবার গাল ফুলিয়ে বসে আছে।

কলিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করালো ইমদাদ। মেয়েটা এখনো গাল ফুলিয়ে মাথা নিচু করে রেখেছে। ইমদাদ কলির থুতনি ধরে মুখটা উঁচু করে বলল,

“আরে রাগ করলে তো আমার বউটাকে দেখতে আরো বেশি সুন্দর লাগে। আজ থেকে তো তাহলে রোজ নিয়ম করে তোমায় রাগাতে হবে। কি সুন্দর টমেটোর মত লাল হয়ে উঠেছে মুখটা। খেয়ে নেবো নাকি!”

কলি গম্ভীর গলায় বলল,

“প্রয়োজন নেই। একবার পেট থেকে তোমার বাচ্চাকে বের করে দেই তারপর ওকে খেয়ো।আজকাল তো বউকে ভালো লাগেনা। বউয়ের থেকে বেশি বাচ্চার প্রতি দরদ। অথচ একবারও এটা মাথায় আসে না যে বউ না থাকলে বাচ্চা কোথা থেকে পেতে।”

কলির রাগ মিশ্রিত কথাগুলো শুনে ইমদাদ হেসে উঠে বলল,

“আমি কি কখনো বলেছি যে বউ এর থেকে বাচ্চাকে আমি বেশি ভালোবাসি। তুমিই তো একাএকা এই কথাগুলো বলো। বউও আমার বাচ্চাও আমার। কেউই আমার পর না। বরং বাচ্চার থেকেও বেশি কষ্ট হয়েছে বউকে পেতে। কম সাধনার ফল নাকি তুমি আমার! তুমিতো গরু জন্য বোঝোনা যে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা কতটা পুরোনাে।”

কলির রাগটা একটু হলেও কমলো। কিন্তু তবুও সেটা বুঝতে দিতে চাইলো না ইমদাদকে। রাগী ভঙ্গিতেই বলার চেষ্টা করলো,

“না বোঝালে বুঝবো কি করে। তোমার এত সময় ছিল নাকি আমাকে বোঝানোর জন্য?”

“তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় পেয়েছি কখনো? সুযোগ হয়ে উঠেছে কখনো দুজনের একটু আলাদা করে কথা বলার? ওই তো স্কুল কলেজে যাওয়ার সময় পাড়ার অলিতে গলিতে একটু দেখা হয়ে গেছে মাঝে সাঝে। প্রেমের শুরু তো ওখানেই। আমার এখনো মনে পড়ে ছোট্ট একটা মেয়ে স্কুল ড্রেস পরে দুই বেণী করে কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে রোজ নিয়ম করে স্কুলে যেত। পাড়ার মোড়ে যখনই একটা কোণার দিকে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতো অমনি ভয়ে নিজের বন্ধুদের আড়ালে লুকোতো। ভুলেও যদি আমি তার সঙ্গে কথা বলার জন্য একটু তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম সে শুধু পারতো না অদৃশ্য হয়ে যেতে।”

“তা ভয় পাবো না তোমার মতন গুন্ডাকে দেখে? আমার এখনো মনে আছে সামান্য প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য তুমি ওই ছেলেটার কি অবস্থা করেছিলে। তুমি কি খারাপ। যাকে তাকে যেখানে সেখানে পেটাও। তোমায় আগেই বলে দিচ্ছি, যদি আমার ছেলে হয়েছে একদম ওকে এই খারাপ কাজগুলো শেখাবে না।”

ইমদাদ গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,

“আমি কেন শেখাতে যাব। ওর র'ক্তেই থাকবে এসব গুণ। আরে ছেলেমানুষ একটু মা'র'পি'ট না জানলে হয় নাকি। তাহলে ছেলে মেয়ের মাঝে পার্থক্য কি রইলো। আর তোমার ওই বন্ধুকে অনেক কম মে'রে ছিলাম আমি। ওর সাহস হয় কি করে তোমায় প্রেমপত্র দেওয়ার। ছোট মানুষ কে প্রেম পত্র দেয়। কোন ভদ্রতা ছিল না ওই ছেলেটার।”

“নিজে তো ছোট মেয়েটাকে সোজা বিয়ে করে এনেছো। আর অন্যরা প্রেমপত্র দিলেই দোষ। দেখি ছাড়াে তো আমায়। রান্নাঘরে আমার হাজারটা কাজ পড়ে আছে। তোমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করলে চলবে না।”

কথাটা বলে কলি চলে যেতে ধরলে ইমদাদ ওর হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নিলো। দুই হাতে কলির কোমর জড়িয়ে ধরে কলির কানের কাছে নাক ঘষতে ঘষতে বলল,

“আমার কাছ থেকে পালানোর এত তাড়া কেন তোমার?”

“তুমি খুব ভদ্র তো তাই।”

“আজকাল আমি কত ভদ্র হয়ে গিয়েছে বলোতো। আমি কি আর অভদ্রতা করি?”

“তোমার অভদ্রতা সহ্য করার মতন পরিস্থিতিতে কি আমি এখন আছি?”

ইমদাদ এবারে অসহায় গলায় বলল,

“এভাবে কেন কথা বলছো। আমারও তো একটু ইচ্ছে করে বউয়ের কাছে আসতে তাই না? বেশি কিছু না একটা চুমু দেবে!”

কথাটা বলার সাথে সাথে কলি এক ধাক্কায় ইমদাদকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিল। হঠাৎ করে কলির এমন অতর্কিত আক্রমণে ইমদাদ চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকিয়ে বিস্মিত গলায় বলল,

বিজ্ঞাপন

“ধাক্কা দিলে কেন?”

কলির বোধহয় তারটা কেটে গেছে। খেঁকিয়ে উঠে বলল,

“আমার জ্বা'লা'য় আমি ম'র'ছি উনি এসেছেন চুমু খেতে। সরে যাও তো। তোমার গায়ের গন্ধ ভালো লাগছে না। তোমাকে দেখতেও ইচ্ছে করছে না। ইশ ক'দিন হলো গোসল করো না তুমি? ড্রেন থেকেও এত বাজে গন্ধ বেরোয় না। ছিঃ। আমার কাছে আসবে না।”

কথাটা বলে ওয়াক ওয়াক করতে করতে কলি চলে গেল সেখান থেকে। ইমদাদ তাজ্জব বনে গেল। নিজেই একবার নিজের টি-শার্টের গন্ধ শুকলো। কই ঠিকই তো আছে। কোন কারণ ছাড়া মেয়েটি এভাবে অপমান করে গেল! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইমদাদ।

হুট করে মনে পড়ে গেল কামাল সরদারের কথা। কলিকে তো খবরটা দিতে ভুলেই গেছে। ইমদাদের কাছে নাহয় এই খবরের গুরুত্ব নেই। কিন্তু কলির কাছে তো অবশ্যই গুরুত্ব থাকবে। নিশ্চয়ই আবার কান্নাকাটি শুরু করে দেবে। তারপরও কিছু করার নেই। দিতেই হবে খবরটা। আবারও কলির নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ওর পিছন পিছন চলে গেল। দেখা যাক আর কিছু সময় কলি ইমদাদ কে সহ্য করতে পারে কিনা।

________

“ম্যাডাম এই নিন আপনার প্লেনের টিকিট। আমি হোটেল বুকিং করে দিয়েছি। আজ রাতে আপনার ফ্লাইট।”

তূর্যর কাছ থেকে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলো হাতে নিয়ে কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,

“থ্যাংক ইউ সো মাচ তুর্য। তোমার মতন একজন সেক্রেটারি পেয়ে মাঝে মাঝে নিজেকে আমার সত্যিই খুবই লাকি মনে হয়। আমি ভাবি তুমি না থাকলে আমার কি হতো। এখন তো আমার এটা নিয়েও টেনশন হচ্ছে যে বিদেশে গিয়ে তোমায় ছাড়া আমি একা একা সব সামলাবো কি করে। একটা বদ অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছো তুমি আমার।”

“তো থেকে যান ম্যাডাম। যাওয়ার কি দরকার।”

তূর্য আকুতি জানালো আফসানা কে থেকে যাওয়ার জন্য। খুব করে চাইছে তূর্য যেন আফসানা থেকে যায়। কোথাও না যায়। কিন্তু সেই জোর দিয়ে আর কথাটা বলতে পারলো না। সেই অধিকার নেই তূর্যর। আফসানা বুঝলোও না তূর্যর সেই কথাটা। ভাবলো বোধহয় মজা করে বলেছে। তূর্যর কথাটা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল,

“না। যাব তো অবশ্যই। কতদিন পর নিজেকে একটু মুক্ত মনে হচ্ছে। এবার একটু নিজেকে সময় দেওয়া দরকার তূর্য। নিজেকে একটু ভালোবাসা দরকার। সেই জন্য একটু ঘুরতে চাই। পুরো পৃথিবী ঘুরতে চাই আমি একা একা। সব ধরনের বন্ধন থেকে মুক্তি চাই আমি। সব ধরনের দায়িত্ববোধ থেকে মুক্তি চাই। তোমাকে ভরসা করে কিন্তু পুরো ব্যবসার দায়িত্বটা দিয়ে যাচ্ছি। ইমদাদ তো আছেই। সামলে নিও সবটা। আই ট্রাস্ট ইউ।”

তূর্য শুধু আলতু হাসলো। আফসানা কে আর আটকানোর কোন মানে হয় না। আর কোন বাক্য ব্যয় না করে চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল। তুর্য কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই ইমদাদ এলো। ইমদাদ কে দেখেই আফসানার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।

“আপনার অপেক্ষাই করছিলাম আমি ইমদাদ।”

ইমদাদ ভিতরে এসে আফসানার সম্মুখে চেয়ার টেনে বসে বলল,

“কিন্তু কেন? আপনার সমস্যার তো সমাধান হয়ে গেছে।”

“আরে আমি কি শুধু আপনাকে আমার সমস্যার সমাধান খুঁজে দেওয়ার জন্যই ডাকি নাকি?”

ইমদাদ একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,

“হ্যাঁ, তাইতো ডাকেন। মাঝরাতে হঠাৎ করে আ'ত্ম'হ'ত্যা'র কথা মনে হলে ডাকেন। স্বামীকে কিভাবে ডিভোর্স দেওয়া যায় সেই পরামর্শ নেওয়ার জন্য আমাকে ডাকেন। স্বামীকে কিভাবে জেলে তুলবেন সেই পরিকল্পনাটাও আমার থেকেই নিলেন। আবার আমার বলা কথাতেই আপনার স্বামী কে ব্যবসাটা থেকে বের করার উপায়ও পেলেন। তাহলে তো আমি আপনার প্রয়োজনের সময়ই প্রিয়জন তাই না?”

আফসানা হেসে উঠে বলল,

“কথাটা আপনি একদমই ভুল বলেননি। সত্যিই আপনি যদি না বলতেন তাহলে আমি কাগজপত্র গুলো দেখতাম না আর কখনো জানতেই পারতাম না যে বাবা এই ব্যবস্থা করে রেখে গেছে যে, যতদিন রওনাফ এর সাথে আমার সম্পর্ক আছে ততদিনই ও এই কোম্পানির অংশীদার। এটা যদি আমি আগে জানতাম কবে ওকে ডিভোর্স দিয়ে দিতাম।”

“যাক বাদ দিন সেসব কথা। পুরনো কথা ভুলে যান। কবে যাচ্ছেন ঘুরতে?”

“আজ রাতের ফ্লাইট। তূর্য সব ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছে। জানেন আমি ভীষণ নার্ভাস। এর আগে ব্যবসার কাজে অনেকবার দেশের বাইরে গিয়েছি। কিন্তু কখনও এভাবে একা একা ঘুরতে যাওয়া হয়নি। বিয়ের পরে দুবার গিয়েছিলাম রওনাফ এর সাথে। তবে একা কখনো ঘুরতে যাওয়া হয়নি। মনে হচ্ছে ওখানে গিয়ে একা একা কি করবো। ব্যবসার কাজে বাইরে গেলে তো তূর্য আমার সাথে সব সময় গিয়েছেই। আমার তো এবারও মনে হচ্চে তূর্য কে সঙ্গে করে নিয়ে যাই। কিন্তু আবার মনে হচ্ছে একা একা ঘুরব।”

ইমদাদ তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিলো না। একটু ভাবনা চিন্তা করে বলল,

“বন্ধু হিসেবে একটা পরামর্শ দেবো? দিচ্ছি মানেই যে গ্রহণ করতে হবে তেমনটা না। ইচ্ছে হলে গ্রহণ করবেন নয়তো ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন।”

“এভাবে কেন বলছেন? আপনার কোন পরামর্শ আমি কখনো ফেলেছি? আমি আপনাকে ভরসা করি ইমদাদ। আমি জানি আপনি আমার ভালো চান। বলুন না কি পরামর্শ দেবেন।”

ইমদাদ সোজা হয়ে বসে একটু গুরুতর ভঙ্গিতে আফসানার দিকে তাকিয়ে বলল,

“জীবনকে আরেকবার সুযোগ দিতে চান? পারবেন না আরেকবার নতুন করে জীবন সাজাতে?”

আফসানা কোন উত্তর দিল না। নির্জীব দৃষ্টিতে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে ভাবলো,

“আপনার মতন একটা মানুষ পেলে ভাবতাম। বিশ্বাস করুন ইমদাদ যদি আপনার সাথে জীবনটা সাজানোর সুযোগ থাকতো আমি একবারও ভাবতাম না। আমি আজও আপনার হাতটা ধরার জন্য মুখিয়ে আছি। কিন্তু আমি জানি এটা অন্যায়। আমি কখনো বলবোও না আমার এই অনুভূতির কথা আপনাকে। আপনি আমার বন্ধু হয়ে আছেন, বন্ধু হয়েই থাকুন।”

“কি হলো উত্তর দিন?”

ধ্যান ভাঙলো আফসানার। ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে এসে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,

“না না। এই জীবনে আর এই ভুল আমি করব না। মানুষের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গেছে আমার ইমদাদ। আমাকে দিয়ে আর এসব হবে না।”

“ভুল মানুষকে বিশ্বাস করলে তো পস্তাতে হবেই তাই না? তাই বলে তো জীবনে থেমে থাকলে হবে না। একটা পরামর্শ দেই, তূর্য কে নিয়ে ভাবুন।”

তূর্য নামটা শুনতেই আফসানার কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হলো। তূর্য কে নিয়ে কেন ভাববে? কি বা ভাববে? তূর্যকে নিয়ে ভাবার কি আছে?

প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“তূর্যকে নিয়ে ভাববো মানে? বুঝলাম না ঠিক আপনার কথার মানেটা।”

“আমি আপনার জীবনটা ওর সাথে সাজানোর কথা ভাবার কথা বলছি। আপনার প্রতি তূর্যর দৃষ্টিভঙ্গি ভাবার কথা বলছি। তূর্যর আপনার এত যত্ন নেওয়া, আপনার জন্য এত চিন্তা করা, আপনার বিপদে অস্থির হয়ে যাওয়া, সব সময় আপনার পাশে থাকা এই বিষয়গুলো আমি আপনাকে ভাবতে বলছি। এখন দয়া করে এটা বলবেন না যে আপনি এরপরও কিছু বুঝতে পারছেন না, এগুলো নিতান্তই স্বাভাবিক।”

আফসানা যেন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল। কি বলবে বুঝতে পারছে না। আসলে তো এই ব্যাপারগুলো আফসানার কাছে নিতান্তই স্বাভাবিক ছিল। তবে ইমদাদের কথা বলার ভঙ্গিটা হঠাৎ করে কেমন যেন অস্বাভাবিক ঠেকছে।

আফসানা কে ভাবনার জগতে নিমগ্ন থাকতে দেখে ইমদাদ আবারও বলে উঠলো,

“তূর্য পছন্দ করে আপনাকে। আমার কথা শুনুন ওকে একটা সুযোগ দিন।”

আফসানা অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“এটা হতে পারে না। তূর্যর চোখে কখনো আমি আমার জন্য ভালোবাসা দেখিনি। কি যা তা বলছেন বলুন তো।”

“দেখেননি তার কারণ আপনি কখনো দেখতে চাননি। তাদের পেছনে ঘুরে কি লাভ বলুন তো যারা আপনাকে কখনো ভালোবাসা দিতে পারবেনা। জীবনে একবার না জেনে ভুল করেছেন, দ্বিতীয়বার জেনে বুঝে ভুল করছেন। আবারও ভুল করবেন? তৃতীয় সুযোগটা তূর্য কে দিন।”

একটু থতমত খেলো আফসানা ইমদাদের কথাটা শুনে। দ্বিতীয় ভুল বলতে কি ইমদাদ আফসানা কে ওর ইমদাদের প্রতি থাকা অনুভূতির কথাটা বোঝাতে চাইলো? হতেই পারে। ঠিকই তো বলেছে ইমদাদ। আফসানা জেনে বুঝে ভুল করছে। কিন্তু তাই বলে তূর্যর ব্যাপারটা মেনে নেয়া যায় না।

আরো বেশ কিছুক্ষন দুজনের মাঝে তর্কাতর্কি চলল। সবশেষে ইমদাদ আফসানা কে বোঝাতে সক্ষম হলো যে ওর প্রতি তূর্যর একটা আলাদা অনুভূতি আছে। পুরনো অনেক কথাই ইমদাদ ওকে মনে করিয়ে দিল। আফসানার মনে পড়ে গেল একটু আগেও তূর্যর বলা কথাটা। ওকে যেতে বারণ করছিল। থেকে যেতে বলছিল।

সবশেষে ইমদাদ আফসানা কে ভাবার জন্য কিছুটা সময় দিল। বেশ অনেকটা সময় নিয়ে আফসানা ভাবলো। একটা নির্দিষ্ট সময় দিয়েছিল ইমদাদ ওকে ভাবার জন্য। সেই সময়টা শেষ হতেই আফসানা কে তাড়া দিয়ে বলল,

“আপনার সময় শেষ। নিজের সিদ্ধান্তটা জানান।”

আফসানা একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,

“আমার সময় দরকার। আমি জানিনা আমি তূর্যকে কখনো এই সুযোগটা দিতে পারবো কিনা। আমি কখনো তূর্য কে অপেক্ষাও করতে বলবো না। আমি যে তূর্যর অনুভূতি সম্পর্কে বুঝতে পেরেছি সেটাও কখনো ওকে জানাবো না। আমি এখনই কোন কমিটমেন্টের জন্য তৈরি না। খুব সম্ভবত আমি আর কোন সম্পর্কে জড়াতে পারবো না ইমদাদ।”

ইমদাদ বুঝলো আফসানা কে এতক্ষণ বোঝানো বৃথা গেল। মেয়েটার ভালোই তো চেয়েছিল, কিন্তু বুঝলো না। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“ঠিক আছে, যেমনটা আপনার ইচ্ছে। জোর করার সামর্থ্য আমার নেই। তবে আমি আবারো আপনাকে বলব যদি কখনো ইচ্ছে হয়, জীবনে এগোনোর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন তবে অবশ্যই তূর্যর কথাটা ভেবে দেখবেন। ছেলেটা ভালো। অন্তত লোভী না। ভালো থাকবেন। ও সংসার করার মতন ছেলে।”

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প