ক্যালেন্ডারের পাতায় একে একে দশটা বছর পার হয়ে গেছে। যেমন সময় পাল্টেছে তেমনি প্রত্যেকটা মানুষের জীবনের ধারাও পাল্টেছে। বদলেছে পরিস্থিতি, বদলেছে সম্পর্কের সমীকরণগুলো। ইমদাদের বাবার বানানো একতলা বাড়িটা বদলে এখন সেখানে একটা বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি তৈরি করেছে ইমদাদ। এখন আর ইমদাদ কে কাঠফাটা রোদের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে কোথাও যেতে হয় না। যেখানে যায় নিজের চার চাকার গাড়িতে করেই যায়।
ঠিক ঠিক দশ বছর পরেই আজ আবারও ইমদাদের পা পড়লো সরদার বাড়িতে। সরদার বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই ড্রাইভার এসে গাড়ির দরজাটা খুলে দিল ইমদাদের জন্য।
এক সময় পাড়ার গুন্ডা খ্যাত ইমদাদ আজ মস্ত বড় ব্যবসায়ী। বয়স বেড়েছে। পোশাক আশাকে, চলাফেরাতে এসেছে বিস্তর ফারাক। ইমদাদের রগচটা স্বভাবটাও একটু কমেছে। বেড়েছে গাম্ভীর্যতা। চোখে এখন একটা পাওয়ারওয়ালা চশমাও লাগিয়েছে।
দুহাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে একবার তাকালো সরদার বাড়ির দরজার দিকে। রং চটে গেছে, দেওয়ালে শ্যাওলা জমেছে, কয়েক জায়গা থেকে ইট খসে পড়েছে।
একটা লম্বা শ্বাস টেনে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো ইমদাদ। দরজা খোলাই ছিল। সদর দরজা পেরিয়ে বসার ঘরে পা রাখতেই একবার আশেপাশে চোখ বোলালো। একসময় যে বাড়িটা মানুষজনে ভরপুর ছিল এখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ থাকে। কোন সাড়া শব্দই পাওয়া যায় না। বাড়ির আসবাবপত্রের অবস্থা খারাপ। চারিদিকে মাকড়সার জ্বাল। অথচ পরিষ্কার করার মতন কেউ।
দশ বছর আগে কামাল সরদার স্ট্রোক করার পরেই তিনি সব সম্পত্তি সাঈদের নামে করে দেওয়ার চিন্তা ভাবনা করেন। সাঈদ যেমনই হোক না কেন তবুও কামাল সরদার ওকেই ভালোবাসতো। সেই খবরই কালাম আর শাহিন জানতে পেরে ওনার থেকে জোর করে সব সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নিয়েছিল। দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা হওয়ার পর করিম সরদার শাম্মি, কাফিল আর মুনমুন কে নিয়ে বেরিয়ে যায়। তখন থেকেই সরদার বাড়ির এই বেহাল দশা।
সোফার দিকে নজর যেতেই দেখলো সোফার উপরে হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে অচেতনের মতন অবস্থায় পড়ে আছে শাহিন। ইমদাদের বুঝতে বাকি রইলো না যে সারারাত নেশা করে এসে এখন এই অবস্থায় পড়ে আছে। নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল ইমদাদ। শাহিন কে নিয়ে ভাবলে চলবে না। ওর দরকার কামাল সরদার কে।
ইমদাদ কামাল সরদারের ঘরে গেল। দরজাটা খোলাই ছিল। ঘরের ভেতরে উঁকি দিতেই বিছানার ওপরে কামাল সরদারকে দেখলো। শুয়ে আছেন তিনি। শরীর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বিছানার সাথে শরীরটা লেপটে গেছে যেন। গায়ের ফর্সা রংটা একেবারে কালচে হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি জমেছে।
ইমদাদের আফসোস করা উচিত কিনা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। বুঝতে পারছে সবই কামাল সরদারের পাপের ফল যা গত দশ বছর যাবত উনি পেয়ে যাচ্ছেন। দশ বছর আগে স্ট্রোক করার পর প্যারালাইজড হয়ে গিয়েছিলেন। ডানপাশ সম্পূর্ণভাবে অবশ হয়ে গেছে ওনার। কথাটা কোনমতে বলতে পারেন, তাও অস্পষ্ট।
কামাল সরদারের দিক থেকে খুব বিশ্রী একটা গন্ধ ভেসে আসছে ইমদাদের নাকে। পুরো ঘর জুড়েই কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। ইমদাদের কাছে বিছানাটা কেমন যেন ভেজা ভেজা লাগলো দেখতে। কামাল সরদার তো উঠে দাঁড়াতেও পারেন না। বিছানাতেই মলমূত্র ত্যাগ করেন তিনি। ইমদাদের আর বুঝতে বাকি রইলো তেমনি কিছু ঘটেছে। আর সেই দুর্গন্ধটাই ওর নাকে এসে লাগছে।
ওনার দিকে এগিয়ে গিয়ে একবার ডাকলো ইমদাদ ওনাকে।
“জেগে আছেন?”
হালকে একটু যেন নড়ার চেষ্টা করলেন কামাল সরদার। অনেকটা সময় নিয়ে চোখ মেলে তাকিয়ে সামনে ইমদাদ কে দেখতেই চমকালেন।
ইমদাদ একটা চেয়ার টেনে ওনার পাশে বসে বলল,
“ভালো আছেন?”
করিম সরদার একটু নড়েচড়ে ওঠার চেষ্টা করলেন, তবে পারলেন না। অস্পষ্ট গলায় বললেন,
“ভালো আছি।”
“গাড়ি পাঠিয়েছিলাম তো। আসেননি কেন ইমাদের বিয়েতে?”
কামাল সরদার কিছু বলতে পারলেন না। শুধু ওনার চোখের কোণা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। ইমদাদ শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইলো ওনার দিকে। আর কিছু বলল না। হঠাৎ করে পিছন থেকে কানে রোকসানার কন্ঠ এলো।
ইমদাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলো রোকসানা দাঁড়িয়ে আছে। রোকসানারও বয়স হয়েছে। ওর মা মা'রা যাওয়ার পর একাই কামাল সরদারের সেবা করতে করতে যেন বয়স আরো বেড়েছে।
“ইমদাদ তুমি হঠাৎ? কোন দরকার ছিল?”
“ইমাদের বিয়েতে তোমরা এলেনা কেন? আমি তো গাড়ি পাঠিয়েছিলাম।”
“কি করে যেতাম বলো। ওনাকে নিয়ে কি কোথাও যাওয়া যায়? একেই তো ওনার শরীর, তারওপর অপরাধবোধ।”
কথাটা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো রোকসানা। ইমদাদ নিজেও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“কি আর করবে বলো। আচ্ছা ওনাকে ডাক্তার দেখাও না? কোন তো উন্নতি হয় না। ধীরে ধীরে তো শুধু অবনতি হচ্ছে।”
“রোগের চিকিৎসা না হয় ডাক্তার করবে, কিন্তু পাপের চিকিৎসা কে করবে? জীবনে যত পাপ করেছেন সেগুলোর শাস্তি থেকে কি আর ডাক্তার কিংবা ঔষধ ওনাকে মুক্তি দিতে পারবে? একবার ভাবো তো কত পাপই না উনি করেছিলেন যার শাস্তি গত দশ বছর ধরে পাচ্ছেন। চোখের সামনে আমি কখনো কাউকে এতটা শাস্তি পেতে দেখিনি। এত কঠিন মৃ'ত্যু যন্ত্রণা আমি কাউকে ভোগ করতে দেখিনি। উনি এতটাই কষ্টে আছেন যে এখন নিজেই নিজের মৃ'ত্যু কামনা করেন।”
ইমদাদ উঠে গিয়ে রোকসানার কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“চিন্তা করো না। আর ওনাকে কথা শুনিও না। কি আর করবে বলো। বয়স হয়েছে। আমারই রাগ ঠান্ডা হয়ে গেছে। এখন তো ওনাকে দেখে শুধু করুণাই হয়।”
রোকসানার চোখ দুটো ভিজে উঠলো। মিনতি ভরা কন্ঠে ইমদাদ কে বলল,
“আমার বাবা সব থেকে বেশি অন্যায় করেছে তোমার সাথে, তোমার পুরো পরিবারের সাথে। তুমি ক্ষমা করে দিও আমার বাবাকে। তোমার বাবাকে উনি কখনো নিজের ছেলে হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। প্রথম স্ত্রী কে সব সময় সন্দেহ করে গেছেন। তোমার বোনের জীবন শেষ করেছেন। তোমার পেছনে হাত ধুঁয়ে লেগেছিল। পারলে ক্ষমা করে দিও।”
দুই হাত জোর করে রোকসানা ক্ষমা চাইলো ইমদাদের কাছে। ইমদাদ তাড়াহুড়া করে রোকসানার হাত দুটো ধরে বলল,
“তুমি কেন ক্ষমা চাইছো ফুপি? তোমার কাছে আমার অনেক ঋণ জমা হয়ে আছে। এই বাড়িতে থেকে তুমি কত গুরুত্বপূর্ণ খবর আমায় দিয়েছো বলতো। কলিকে দেখে রেখেছো। সেদিন যদি তুমি কলিকে পালাতে সাহায্য না করতে তাহলে আমি তো ওকে পেতাম না। শাহিনের সাথে বিয়েটা হয়ে যেত। তোমার এত ঋণ আমি কি করে শোধ করবো! আর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাইছো তাও অন্যের জন্য।”
রোকসানা শুধু আলতো হাসলো। রোকসানার সাথে আরো টুকটাক কিছু কথাবার্তা শেষে বেড়িয়ে গেলো ইমদাদ।
_____________
একটা গুরুত্বপূর্ণ কল আসার কারণে সরদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার অফিস গেল ইমদাদ। বাড়ি যাওয়ার সময় হলো না। গাড়ি থেকে নেমে অফিসের ভিতরে ঢুকতে ধরলে হঠাৎ করে কানে কিছু পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
ইমদাদ আশেপাশে তাকাতেই দেখলো দুরে কয়েকজন ছেলে ওকে ডাকছে। মুখগুলো চেনা চেনা লাগলো ইমদাদের কাছে। তবে তৎক্ষণাৎ চিনতে পারলো না। পাশে দাঁড়ানো ইমদাদের সেক্রেটারি বলে উঠলো,
“স্যার চলুন। রোজ যেমন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া মানুষজন চলে আসে এরাও তেমন।”
ইমদাদ সেসব কথায় কান দিল না। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর চিনতে পারল। ওরা তো ইমদাদের বন্ধু। সাদিক, কাউসার সেই সাথে আরও দু তিনজন। ইমদাদকে নিজেদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাদিক হাত নাড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“ইমদাদ, আমি সাদিক।”
ইমদাদ আরো কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে রইল ওদের মুখের দিকে। অনেক বছর পর দেখলো আবার এদের কে। কতটা পার্থক্য তৈরি হয়ে গেছে ওদের মাঝে। একসময় ইমদাদ চাইতো ওদেরকে নিয়ে একসঙ্গে বড় হতে। কিন্তু ওরা সেটা চায়নি। ওরা ভেবেছিলো ইমদাদকে ছেড়ে বোধহয় একা একাই বড় হয়ে যাবে। দশ বছর আগে ওরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল আজও সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। শুধু উন্নতি হয়েছে ইমদাদের।
ইমদাদ ইশারায় সিকিউরিটি গার্ড কে ওদেরকে ছেড়ে দিতে বলে ওদেরকে কাছে ডাকলো। গার্ডরা সহ ওরা এলো। ইমদাদ গার্ড কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল,
“কি হয়েছে?”
“স্যার, ওরা প্রতিদিন এসে ঝামেলা করে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকে না কিন্তু তাও দেখা করতে চায় আপনার সাথে।”
ইমদাদ গম্ভীর গলায় বলল,
“ওরা আমার বন্ধু। আমার কাছের মানুষ। এরপর থেকে যদি কখনো আসে এই বিহেভিয়ারটা করবে না ওদের সাথে। সোজা আমার কেবিনে পাঠিয়ে দেবে। এখন যাও।”
গার্ডরা চুপচাপ ইমদাদের কথায় সম্মতি জানিয়ে চলে গেল সেখান থেকে। ওরা চলে যেতেই ইমদাদের বন্ধুরা কৃতজ্ঞতা জানালো। সাদিক বলে উঠলো,
“সেই কবে থেকে তোর সাথে দেখা করার জন্য চেষ্টা করছি, কিন্তু পাচ্ছিনা। তুই কত বড় হয়ে গেছিস, এখন কত ব্যস্ত। আমাদের সঙ্গে দেখা করার আর সময় নেই তোর।”
সাদিকের কথাটা শুনে ইমদাদ একটু হেসে উঠে বলল,
“সম্পর্ক শেষ করে বলছিস দেখা করার সময় আমার নেই? তোরা আমায় ছেড়ে চলে গেছিলি, আমি তোদের ছাড়িনি। আমি এখনো তোদের ছাড়িনি। এখনো তোদের ধরে বসে আছি। আর তোরা আমায় ছেড়ে সারা বাংলা ঘুরে যখন বুঝলি ইমদাদের মত কাউকে পাবিনা তখন আবার আমাকে ধরতে চলে এলি তাই না?”
সবার মুখটাই চুপসে গেল। ফুটে উঠলো তীব্র অপরাধবোধ আর লজ্জা। কাউসার ইমদাদের হাত দুটো ধরে অপরাধী গলায় বলল,
“ভাই ক্ষমা করে দে। সেদিন না বুঝে ভুল করে ফেলেছিলাম। তুই চলে আসার পর সত্যিই ব্যবসাটা ডুবে গেছে। আজ দেখ আমরা সবাই বেকার। অথচ যদি তোর সঙ্গে থাকতাম তাহলে জীবনে কিছু একটা করতে পারতাম। আমাদের ছাড়া তোর কোন ক্ষতি হয়নি। কিন্তু দেখ ভাই তোকে ছাড়া আমরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে পথে বসে গেছি।”
ইমদাদ আর খোঁচালো না। পুরনো কথাগুলো নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করলো না। বরং এখন ওরা কেন এসেছে সেটা জানতে চাইলো। সবাই কিছুক্ষন আমতা আমতা করে শেষে সাদিক অস্বস্তি জড়ানো গলায় বলে উঠলো,
“আসলে তুই তো জানিস এই সময় একটা চাকরি পাওয়া কত মুশকিল। যে চাকরিই করি তাতে সংসার চলে না রে ভাই। এখন বাচ্চাকাচ্চা হয়েছে, ওদের পড়াশোনার খরচ, সংসারের খরচ চলে না ওই টাকায়। তোর তো অনেক বড় ব্যবসা। একটু দেখ না যদি আমাদের কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারিস। কারোরই এখন আমাদের চাকরি নেই। তিনবেলা বউ-বাচ্চার মুখে খাবার তুলে দেওয়া মুশকিল হয়ে গেছে। একেবারে না খেতে পেয়ে ম'র'বো।”
একটা সংসারের খরচ খুব ভালোভাবে জানে ইমদাদ। একটা সংসার টানতে কতটা কষ্ট করতে হয় সেটাও ইমদাদ খুব ভালোভাবেই জানে। নিজের স্ত্রীর সন্তানদের মুখে যদি হাসি না দেখতে পাওয়া যায় সেই কষ্টটাও ইমদাদ খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারে। সেজন্যই বোধহয় বন্ধুদের কষ্টটাও খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারলো। পুরনো কথাগুলো তুলে ওদেরকে খোঁচানোর একটুও ইচ্ছে হলো না। ওরা কি ভুল করেছিল তার প্রতিশোধ নেওয়ারও ইচ্ছে হলো না। আলতো হেসে সাদিকের কাঁধে হাত রেখে ওকে ভরসা দিয়ে বলল,
“চিন্তা করছিস কেন এতো? আগে যেমন তোদের সামলেছি, এখনো সামলে নেব। আগে আসিসনি কেন? এত দেরি কেউ করে?”
সবাই ভীষণ অবাক হলো ইমদাদের এমন সহজ কথা শুনে। ওরা তো ভেবেছিলো ইমদাদ বোধহয় অপমান করবে। কিন্তু তবুও একটা ঝুঁকি নিয়ে এসেছিলো মান সম্মানের তোয়াক্কা না করে বউ বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে।
ইমদাদ ওদের নিরাশ করল না। আগে যেমন বন্ধু বলে বুকে আগলে নিত এখনো তেমনি করলো। প্রত্যেকের অপরাধবোধ কয়েক গুণ বাড়লো। যে ইমদাদ আজ ওদের কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, সংসার চালানোর ব্যবস্থা করে দিতে চাইছে। একদিন সেই ইমদাদের থেকে ওরা কাজ কেড়ে নিয়েছিল। অসহায় করতে চেয়েছিল। কত নিকৃষ্ট মানুষই না ছিল ওরা!
_______
ইমদাদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হলো। বাড়িতে আজ ইয়াসমিনরাও আছে। আবার ইমাদ বিয়ে করায় বাড়িতে একজন সদস্যও বেড়েছে। পুরো জমজমাট হয়ে আছে বাড়িটা। বাচ্চাদের হইহুল্লোড় তো আছেই।
ইমদাদ কলিংবেল বাজাতেই ওর ছয় বছরের মেয়ে ইতি ছুটে এলো দরজার দিকে। দরজার ছিটকিনি খোলার সামর্থ্য ওর নেই। তবুও কিছুক্ষণ লাফিয়ে ছিটকিনিটা খোলার চেষ্টা করলো। তবে ব্যর্থ হলো। একটু পর কলি এসে ওর পিছনে দাঁড়িয়ে বলল,
“পারবে না আম্মু তুমি। সরো, আমি খুলে দিচ্ছি।”
ইতি বাধ্য মেয়ের মতন চুপচাপ সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো। স্বভাবে ভীষণ শান্ত ইতি। একটু বোকা-সোকাও। বলা যায় একেবারে মায়ের মতন।
কলিকে দরজা খুলে দিতে দেখে মেয়ে আবার ছুটে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মেয়েকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ইমদার দুই হাতে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে গালে চুমু খেয়ে আদুরে গলায় বলল,
“আমার আম্মু আমার জন্য দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল!”
“হ্যাঁ বাবা। কিন্তু আমি তো দরজা খুলতে পারছিলাম না। সেজন্য আগে আম্মুর সাথে দেখা হলো তোমার।”
মেয়ের সাথে আরো টুকটাক খুনসুটি করতে করতে ইমদাদ ঘরে এলো। ইমদাদের কণ্ঠ পেতেই ঘর থেকে ইমদাদের বড় ছেলে ইহান ছুটে এলো। ইহানের পিছন পিছন সাঈদ আর ইয়াসমিনের ছেলে সাদাতও এলো। দুজনে প্রায় সমবয়সী। ইহান সাদাতের থেকে চার মাসের বড়।
ইমদাদ ফ্রেশ হয়ে এসে খেতে বসলো। খাবার টেবিলে সবার সাথে খেতে খেতে বেশ ভালোই গল্প গুজব করলো। বরাবর যেমন হাসি ঠাট্টা করে তেমনই করলো।
খাওয়া দাওয়া শেষে যে যার ঘরে চলে গেল ঘুমোতে। ইমদাদ মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘরে চলে গেল। ইহান আর সাদাত এক সঙ্গে অন্য ঘরে ঘুমোবে।
কলি রান্নাঘরের কাজ শেষ করে যখন ঘরে গেল দেখলো তখনও মেয়ে বাবার সাথে গল্প করতে ব্যস্ত। রাত অনেক হয়েছে। এখনো মেয়েকে ঘুমোতে না দেখে কলি মৃদু রাগান্বিত গলায় বলে উঠলো,
“এখনো ঘুমোওনি কেন তুমি ইতি? এক্ষুনি শুয়ে পড়ো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে যেন ঘুমোতে দেখি তোমায়। আর ইহানের বাবা, হয় তুমি নিজে ঘুমোও নয়তো ওকে ঘুমোতে দাও।”
কথাটা বলে কলি মেয়ের মাথার কাছে গিয়ে বসলো। ঘুম পাড়িয়ে দিলো ইতি কে।
ইমদাদের দুচোখে তখন ঘুমের লেশমাত্র নেই। উঠে গিয়ে জানালার সামনে দাঁড়ালো। আশেপাশে যেদিকেই তাকায় শুধু বাড়িঘরই চোখে পড়ে। তবে এই জানালা দিয়ে তাকালে একটু সবুজ গাছ গাছালি দেখা যায়। একটু খোলা প্রকৃতি দেখতে পাওয়া যায়। সেজন্য এই জায়গাটা ইমদাদের ভীষণ প্রিয়।
কতটা সময় ইমদাদ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকলো তার হিসাব নেই। বেশ অনেকক্ষণ পরে কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলো কলি দাঁড়িয়ে আছে।
“ঘুমোবে না?”
কলির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইমদাদ ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলো। কলির চুলের ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে বলল,
“ভালো লাগছে না ইহানের আম্মু। একদমই ভালো লাগছে না।”
ইমদাদের কথা বলার ভঙ্গিটা কলির যেন ঠিক ভালো লাগলো না। এত বছর ধরে সংসার করছে। এতোটুকু তো নিজের স্বামীকে চিনেছে। কখন ইমদাদ কি চায় বুঝতে পারে কলি।
“তোমার আবভাব আমার সুবিধার লাগছে না কেন? ঘরে মেয়ে আছে। ভুলে গেছো সে কথা?”
কলির কথাটা শুনে ইমদাদ শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“তুমি যখন বুঝেই গেছো তাহলে নতুন করে আর কি বলবো। তাহলে এখন যা চাইছি সেটা দাও।”
কলি জোরে ইমদাদের পিঠে একটা কিল বসালো। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো ইমদাদ। যেই না কিছু বলতে যাবে অমনি পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। কিছু সময়ের জন্য ওদের আলোচনায় বিঘ্ন ঘটলো। ইমদাদ পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলো আফসানা ফোন করেছে।
ভুল সময়ে কল দেওয়ার স্বভাব এই মেয়েটার গেল না। বিশেষ করে যখন ও বউয়ের সাথে সময় কাটাবে, একটু রোম্যান্টিক মুডে থাকবে ওমনি এই মেয়েটা কল করে।
ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে ইমদাদ বিরক্তিকর গলায় বলল,
“আপনার কল করার টাইমিং কবে ঠিক হবে বলুন তো? আপনাকে তো বুঝতে হবে আমি বিবাহিত মানুষ। রাতে বউয়ের সাথে আমার কাজ থাকে।”
ফোনের অপর পাশে থাকা আফসানা কিঞ্চিত লজ্জায় পড়ে গেল। এভাবে কেউ কথা বলে নাকি তাও আবার একটা মেয়ের সাথে। এদিকে কল করা সত্ত্বেও আফসানা কোন কথা না বলায় আবারো ইমদাদ বিরক্ত হয়ে বলল,
“চুপ করে থাকার জন্য কল দিয়েছেন?”
ধ্যান ভাঙলো আফসানার। আমতা আমতা করে বলল,
“না। মানে চুপ থাকার জন্য কল করিনি। এমনি খোঁজখবর নিচ্ছিলাম আপনাদের। আপনার ভাইয়ের বিয়ে হয়ে গেছে?”
“সে তো দুদিন আগেই হয়ে গেছে। আপনিতো উপহার দেওয়ার ভয়ে এলেনই না।”
আফসানা তড়িঘড়ি করে বলল,
“আরে না না। উপহার দেওয়ার ভয়ে কেন যেতে যাবো না। আমার মেয়েটা খুবই অসুস্থ। তূর্যও অসুস্থ। আমি একা একা কি করে যেতাম।”
“ও আচ্ছা ঠিক আছে। তা এত রাতে সংসার বাদ দিয়ে আমাকে কল করেছেন কেন? যান স্বামীর সেবা করুন।”
“আরে বললাম তো খোঁজখবর নেওয়ার জন্য কল করেছি। আপনি আচ্ছা মানুষ। এভাবে কেউ অপমান করে।”
“এমন পরিস্থিতির মাঝে আপনি নাক গলিয়েছেন মাথাটা তো এমনিই গরম হবে। কত সাহস করে দু কদম এগিয়েছিলাম। আপনি চার কদম পিছিয়ে দিলেন। আমায় এখন আবার সেই শুরু থেকে সবকিছু শুরু করতে হবে।”
আফসানার আর কথা বলার ইচ্ছেই হলো না। কেটে দিল ফোনটা। সেই সাথে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো এই নির্লজ্জ ছেলেকে জীবনেও কল দেবে না।
ইমদাদ ফোনটা কান থেকে নামিয়ে কলির দিকে তাকাতেই দেখলো কলি অগ্নিদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ইমদাদ অবুঝের মতন বলল,
“তোমার আবার কি হয়েছে?”
কলির রাগে মাথা গরম হয়ে গেছে। দুই হাতে ইমদাদের মাথার চুল খামচে ধরে বলল,
“কি চলছে আমাদের দুজনের মাঝে? কি এমন করছিলাম আমরা যে তুমি এভাবে বললে? তোমার কথার ইঙ্গিত কতটা জঘন্য ছিল সেটা একবার আন্দাজ করতে পারছো? বয়স হচ্ছে আর জ্ঞান বুদ্ধি কি সব তোমার লোপ পাচ্ছে?”
ইমদাদ হালকা একটু ব্যাথা পেল ঠিকই তবে সেসব গায়ে লাগালো না। কলির কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল,
“তোমায় দেখলে তো আমার জ্ঞান বুদ্ধি এমনিতেই লোপ পায়। তোমার শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ আমার নাকে এলে তো আমি পাগল হয়ে যাই। আজও তোমায় দেখলে সেই প্রথম দিনের মতনই আমার শরীরে শিহরণ জাগে।”
কলি আতঙ্কিত মুখে একবার বিছানায় ঘুমন্ত মেয়ের মদিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আস্তে কথা বলো। ছিঃ। মেয়ে আছে ঘরে।”
ইমদাদ কলির কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“তাহলে চলো পাশের ঘরে যাই।”
কলি চোখ গরম করে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে সাবধানী গলায় বলল,
“আর একটা আজেবাজে কথা বললে কিন্তু তোমাকে ঘর থেকে বের করে দেবো আমি।দিন দিন কি অধঃপতন হচ্ছে তোমার? দুদিন পর ছেলে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। আর ওনার বয়স যেন দিন দিন আরো কমছে।”
ইমদাদ শব্দ করে হেসে উঠলো কলির কথাটা শুনে। কলির কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“আমি চাই দিন দিন যেন আমার বয়স কমে যায়। বয়স কমে গেলে হয়তো আমি আরো বেশি কিছুদিন বাঁচতে পারব। তোমার সাথে আরও কিছুদিন সময় কাটাতে পারব। এই জীবনটা শেষ করতে ইচ্ছল হয় না শুধুমাত্র তোমার জন্য। মনে হয় ম'রে গেলে তো আর এভাবে তোমায় কাছে পাবো না।”
“যেতে তো হবেই। কে জানে তুমি আগে চলে যাবে না আমি আগে চলে যাব।”
কলি কথাটা বলতেই ইমদাদ ওর মুখ চেপে ধরে বলল,
“একদম এসব আজেবাজে কথা বলবে না। আমি অনেকদিন বাঁচতে চাই। তোমার সঙ্গে বাঁচতে চাই, একা একা না। তোমার থেকে বেশি এক সেকেন্ডও বাঁচতে চাই না আমি।”
“আমিও তোমার থেকে এক সেকেন্ডও বেশি বাঁচতে চাই না। তোমার ভালোবাসা পেয়ে পেয়ে আমি বড্ড লোভী হয়ে গেছি। এত ভালোবাসা ছেড়ে চলে যেতে চাই না আমিও। পুনর্জন্ম তো আর হবে না। তাই এই এক জনমটাই তোমার ভালোবাসায় কাটিয়ে দিতে চাই।”
কথাটা বলে কলি ইমদাদের বুকে আলতো করে মাথা রাখলো। ইমদাদ স্বযত্নে কলি কে দুহাতে আগলে নিয়ে বলল,
“আরেক জনম লাগবে না তোমার। এই এক জনমেই তোমায় এত ভালোবাসবো যেন কখনো ভালোবাসার কোনো কমতি না হয় তোমার। আমরা না থাকলেও আমাদের ভালোবাসা সারাজীবন থেকে যাবে। এই পাড়ার অলিতে গলিতে আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন রয়ে যাবে। আমাদের আয়ু নির্ধারিত হলেও, আমাদের ভালোবাসা সারাজীবন থাকবে।”