অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ৭

🟢

প্রতিদিনের তুলনায় ইমদাদের আজ বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হয়েছে। বাড়ি ফিরে দেখলো ইমাদ আর ইয়াসমিন এখনো খায়নি। ইকবাল কে শুধু খাইয়ে ঘুমিয়ে দিয়েছে। আর ওরা দুজন ইমদাদের জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে।

ইমদাদ একটু রাগারাগি করলো। সবাইকে এই বলে শাসালোও যেন আর কখনো ইমদাদের ফিরতে দেরি হলে না খেয়ে জেগে বসে না থাকে। ওরা চুপচাপ শুনলো ইমদাদের কথা, তবে মনে মনে ঠিক করলো মানবে না ইমদাদের কথা। ইমদাদ নিজেও খুব ভালো করেই জানে যে ওর কথাগুলো কেউ শুনবে না, তারপরও বলে গেল।

ইমদাদ হাত মুখ ধুয়ে আসতেই খেতে বসলো সবাই। যেই না প্রথম লোকমাটা মুখে দিতে যাবে ওমনি কলিং বেল বেজে উঠলো। এত রাতে কলিং বেল বাজায় বিরক্তি হলো ইমদাদ। যেই আসুক না কেন, যত দরকারি কাজেই আসুক না কেন অন্তত খাওয়াটা শেষ হলে কি আসতে পারতো না? এত রাতে যখন এসেছে নিশ্চয়ই দরকারি কোনো কাজেই এসেছে। কিন্তু একটু দেরিতে কি আসে যেতনা? সারাটা দিন পেটে কিছু পরেনি। কি এক অসহ্যকর জীবন ইমদাদের। শান্তি মতো দু মুঠো ভাতও খেতে পারে না।

ইয়াসমিন গিয়ে দরজা খুলতে চাইলো কিন্তু ইমদাদ ওকে বাঁধা দিয়ে নিজেই উঠে গেল। দরজাটা খুলে সামনে সাঈদ আর কলিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকালো ইমদাদ। দুই ভাই বোন যখন একসাথে এখানে এসেছে তার মানে নিশ্চয়ই কোন গোলমাল পাকানোর ইচ্ছেতেই এসেছে।

আপনা আপনি ইমদাদের ভ্রুঁ দ্বয়ের মাঝে ভাঁজ সৃষ্টি হলো। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“তোরা এখন এখানে কি করছিস? কি ঝামেলা পাকানোর উদ্দেশ্যে এসেছিস?”

সাঈদ গলাটা পরিষ্কার করে স্বাভাবিক গলায় বলার চেষ্টা করলো,

“ঝামেলা করতে আসবো কেন। থাকতে এসেছি তোর বাড়িতে।”

“কিই? থাকতে এসেছিস আমার বাড়িতে? কিন্তু কেন? তোদের বাড়ি কি হয়েছে? আর ভাবলি কি করে আমার বাড়িতে তোদের থাকতে দেবো? যেখান থেকে তোর বোনকে নিয়ে এসেছিস আবার সেখানেই ফেরত চলে যা।”

ইমদাদের কথাটা শুনে কলি খুব অপমানিত হলো। সাঈদের হাত টেনে ধরে বলল,

“ভাইয়া চলো এখান থেকে। এখানে থাকবো না। অতিথিদের কি করে সম্মান করতে হয় সেটা ও জানে না।”

“তোরা খুব জানিস তাই না? বাড়ির জামাই কে কি করে সম্মান করতে হয় সেটাও তো জানিস না। তোকে বিয়ে করে তোর বাড়িতে গেলাম কেউ একটু রাতে খাওয়ার কথা পর্যন্ত বলল না। তুই আবার আমায় এসেছিস অতিথিদের সম্মান কি করে সেটা শেখাতে। যা ভাগ এখান থেকে।”

সাঈদ আপাতত ওদের দুজনের ঝগড়ায় পাত্তা না দিয়ে কলির হাত ধরে ইমদাদকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে যেতে যেতে ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“রাখতে তো তোকে হবেই। তোর জন্য জীবনে আমার আর কোন বন্ধুও তৈরি হয়নি যে তার বাড়িতে যাব। সুতরাং তোর ভুলের মাশুল গুনতেই হবে তোকে।”

ইমদাদ শুধু হাসলো সাঈদের কথা শুনে। জোর জবরদস্তি করে বন্ধুত্বের ফায়দা লুটতে এসেছে ছেলেটা। ওহ্ ইমদাদ তো ভুল ভাবছে। সাঈদ তো এসেছে ইমদাদ কে নিজের ভুলগুলো বোঝাতে। বেশ ঠিক আছে, ইমদাদ না হয় আজ নিজের ভুলের মাশুল গুনবে।

এদিকে সাঈদ কে আসতে দেখে ইমাদ আর ইয়াসমিন নিজেদের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। ইমাদ আর ইয়াসমিনের চোখে মুখে একটু ভয়ের ছাপও পাওয়া গেল। সাঈদের নজর ইমাদের উপরে পড়লো না, তবে ইয়াসমিনের দিকে তাকিয়ে ওর ভয়ার্ত মুখটা দেখতেই শরীরের র’ক্ত টগবগ করে ফুটে উঠলো যেন।

সাঈদ কোনমতেই বুঝে উঠতে পারেনা এই মেয়েটা কেন ওকে দেখে এতটা ভয় করে। ভয়ে যেন থরথরিয়ে কাঁপছে। নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। কেন চোখ তুলে কি সাঈদের দিকে তাকানো যায় না? এতটাই কুৎসিত দেখতে সাঈদ? নাকি ওর দিকে তাকালে ঝলসে যাবে? আস্ত একটা বেয়াদব মেয়ে। অবশ্য দেখতে হবে না কার বোন। বেয়াদব তো হবেই।

নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সাঈদ ধমকে উঠে ইয়াসমিনকে বলল,

“কাঁপছিস কেন? তোর এই কাঁপাকাঁপি দেখলে কিন্তু আমার শরীর জ্বলে যায় ইয়াসমিন।”

সাঈদের ধমক শুনে ইয়াসমিন আবারো ভয়ে কেঁপে উঠলো। মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস হলো না। সাঈদ এবারে হাল ছেড়ে দিল। এই মেয়ের দ্বারা কিছু সম্ভব না। প্রেম ভালোবাসা তো দূরে থাক, সামান্য কেমন আছে, দিনকাল কেমন কাটছে এই প্রশ্নগুলোও মেয়েটাকে দিয়ে হবেনা।

সাঈদের এসব ভাবনার মাঝেই ইমদাদ এগিয়ে এসে ইয়াসমিন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ইয়াসমিন, খাওয়া-দাওয়া শেষে এখানে একটা চাদর বিছিয়ে আর দুটো বালিশ দিয়ে দেস ওদের ঘুমোনোর জন্য।”

ইমদাদের কথাটা শুনে সাঈদ বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“তুই আমায় আর কলি কে এখানে ঘুমোতে দিবি? তোরা বিছানায় ঘুমিয়ে আমাদেরকে মেঝেতে ঘুমোতে দিবি? সিরিয়াসলি!”

ইমদাদ বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

“ঘরের লোকদের জন্য ঘর বরাদ্দ। বাইরের লোকদেরকে যে এখানে ঘুমোতে দিতে চাইছি এটা তোর চৌদ্দ গুষ্টির কপাল ভালো। যদি সমস্যা হয় তাহলে বাইরে চলে যা। পুরো রাস্তা ফাঁকাই পড়ে আছে। আশা করছি তোদের ঘুমোতে সমস্যা হবে না।”

ইমদাদ কথাটা বলে চেয়ার টেনে খেতে বসলো। সাঈদ বুঝল ইমদাদ কে কিছু বলে লাভ নেই।

এদিকে ইমদাদ খেতে বসলেও এখনো ইমাদ আর ইয়াসমিন খেতে বসেনি। ইমদাদ খাওয়া থামিয়ে মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,

“তোদের কি সমস্যা? খেতে বসছিস না কেন? অতিথিদের দেখে কি পেট ভরে গেল?”

ইমদাদ কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে ইমাদ চেয়ার টেনে বসে পড়লো, তবে ইয়াসমিন বসতে পারলো না। কারণ চেয়ারটার একদম কাছেই সাঈদ দাঁড়িয়ে আছে। সাঈদ কে যে সরতে বলে ওখানে বসবে সেই কথাটুকুও ইয়াসমিনের মুখ দিয়ে বেরোচ্ছে না। সাঈদ বুঝতে পেরেও কিছু বলল না। বরং ইয়াসমিনের জায়গায় নিজেই বসে পড়লো।

সাঈদ কে সেখানে বসতে দেখে ইমদাদ আবারো খাওয়া থামিয়ে মাথা তুলে সাঈদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“গিলেও আসিসনি বাড়ি থেকে? আমার বাড়ির অন্নই ধ্বংস করবি? তা এই অন্নের টাকা কে দেবে, তোর বাপ না তোর দাদা? নাকি তুই দিবি? ও তুই তো আবার বেকার, ফকিন্নি। আচ্ছা ঠিক আছে খেয়ে নে। ফকির-মিসকিনকে ফিরিয়ে দেই না আর সেখানে তো তুই আমার শালা৷ আমার বউটা কিছু খেয়েছে?”

কথাটা বলে ইমদাদ কলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কলি, খেয়েছো কিছু তুমি? না খেলে আমার পাশে এসে বসো, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”

কথাটা বলে ইমদাদ একা একাই হাসলো। তাকিয়ে দেখলো সাঈদও ঠোঁট টিপে আসছে।

ইয়াসমিন সবে মাত্র ভাতের থালায় হাত দিয়েছিলো। এক লোকমাও খায়নি। সাঈদ সেই প্লেটেই খাওয়া শুরু করলো। ইয়াসমিন ব্যস্ত গলায় বলল,

“আরে ওটা আমার প্লেট। আপনি অন্য প্লেট নিন।”

সাঈদ কোন উত্তর দিলো না। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে ইমদাদ ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“খেতে দে ওকে। ভালোবাসা দেখাচ্ছে। একটু দেখাতে দে। চিন্তা করিস না, দুইদিন পর এমনি সব হাওয়া হয়ে যাবে।”

সাঈদের খাবার হাতটা থেমে গেল। চোখ গরম করে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল,

“মোহ হাওয়া হয়ে যায়, ভালোবাসা না। আগে দুটোর মাঝে পার্থক্য করতে শেখ।”

ইমদাদ আর কিছু বলল না। সবাই যে যার মত খেয়ে যাচ্ছে। কলি আর ইয়াসমিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ইয়াসমিন কলি কে বলল,

“কলি, তুমিও বসো। আমি খেতে দিয়ে দিচ্ছি।”

কলি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর জানালাে। ইয়াসমিন জোর করলো, তবে তাও খেতে রাজি হলো না কলি। আড়চোখে কয়েকবার শুধু তাকালো ইমদাদের দিকে। ইমদাদ একটা বারও ওকে খেতে বলল না।

একটু আগে যে খাবার নিয়ে খোঁটা দিচ্ছিল সেই খাবার কি করে গলা দিয়ে নামবে? ইমদাদ আর খেতেও বলল না। একবার শুধু মশকরা করে খাইয়ে দেওয়ার কথা বলল। ওতে তো কলির রাগ আরো বেড়েছে। তাই কলি ঠিক করলো খাবেনা। ধ্বংস করবে না ইমদাদের বাড়ির অন্ন।

ইতোমধ্যেই ইমদাদের খাওয়া শেষ। হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কোন যেন ঝামেলা করতে না দেখি। আর আমার বোনের থেকে দূরে থাকবি। তোর বোনকে আমার বোনের আশেপাশে রাখবি না। যতদিন ইচ্ছে থাকতে পারিস, তবে কোন ঝামেলা ছাড়া। যেই মুহূর্তে ঝামেলা করবি সঙ্গে সঙ্গে দুটো কে বের করে দেব।”

কথাটা বলে ইমদাদ চলে যেতে ধরলে পেছন থেকে কলি বলে উঠলো,

“নিজেদের বাড়ি ছেড়ে হঠাৎ করে এত রাতে তোমার বাড়িতে থাকতে এলাম কেন কারণটা জানতে চাইলে না যে?”

এই প্রশ্নটা অনেকক্ষণ থেকেই কলির মাথায় ঘুরছে। ইমদাদ কেন এখনো জিজ্ঞেস করল না যে ওরা কেন এভাবে হঠাৎ করে ইমদাদের বাড়িতে এসে থাকতে চাইছে। ইমদাদ তো এতটা ভদ্রও না যে ওদের ব্যক্তিগত বিষয় ভেবে নাক গলাতে চাইবে না। আবার কোন কিছু না জেনে যে থাকতে দেবে এটাও কলি আশা করেনি। তাহলে জিজ্ঞেস করলো না কেন?

এসব ভাবতে ভাবতেই শেষে প্রশ্নটা করেই ফেলল। ইমদাদ ঘাড় ঘুরিয়ে কলির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

“ইমদাদের কাছে সব খবর আগে থেকেই থাকে। আন্দাজ করেছিলাম যে তোরা আমার কাছে আসবি। ইমদাদ ছাড়া আর আছে কে তাদের। তবে একটা ব্যাপার কি জানিস কলি, তোর ভাই তোকে আমার থেকে কম ভালোবাসে।”

ইয়াসমিন আর ইমাদ চোখ বড় বড় করে তাকালো ইমদাদের দিকে। ভালোবাসা শব্দটা আবার কোথা থেকে এলো? ইমদাদ আবার কবে থেকে কলিকে ভালোবাসতে শুরু করলো।

ব্যাপারটা কলির মাথাতেও ঢুকলো না। তবে সাঈদকে খুব বেশি বিচলিত হতে দেখা গেল না। চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। কলি নিজেই প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“মানে?”

“মানেটা হলো তোর ভাই শাহিনকে দু চারটে চ’ড় আর ঘু’ষি মে’রে ছেড়ে দিয়েছে। আর আমি থাকলে এতক্ষণে শাহিনের জানাজার ব্যবস্থা করা লাগতো। তাহলে ভাব কে বেশি ভালোবাসলো তোকে।”

কথাটা বলে আবারো একটু হেসে ইমদাদ নিজের ঘরে চলে গেল। পুরো ব্যাপারটা সত্যিই কলির মাথার উপর দিয়ে গেল। এই ছেলেটা কে যে ঠিক কবে কলি ঠিকঠাকভাবে বুঝতে পারবে কে জানে। যে দিন এই ছেলেটাকে কলি বুঝতে শিখবে সেদিন হয়তো কলির জীবনের অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

_______

“হুম আমার এখানে এসেছে। ওই বাড়ির খবর কি?”

ইমদাদের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ফোনের অপর পাশে থাকা মানুষটা ফিসফিস করে বললো,

“তোমার দাদু এই বিষয়ে জানতো। উনিই শাহিনকে কলির ঘরে পাঠিয়েছিলেন কলিকে ভয় দেখানোর জন্য। যেন কলি বাধ্য হয়ে বিয়েতে রাজি হয়। আবার কলির বাবাও যেন সম্মানের ভয়ে হলেও আর অমত করতে না পারে। কিন্তু শাহিন দু লাইন বেশি বুঝেছিল।”

“আর কলির বাপ? ওর কানে কলির চিৎকার পৌঁছায়নি?”

“পৌঁছেছিল। কিন্তু সে তো পিতা ভক্ত। পিতৃ আদেশ উপেক্ষা করে সে যেতে পারেনি মেয়ের কাছে।”

ইমদাদ হাসলো। নিজেই আপন মনে কি সব যেন ভাবলো। হয়তো ভাবলো বাবা হিসেবে সবাই সমান হয় না।

যতটুকু জানার ছিল জেনে নিয়েছি ইমদাদ। আর কিছু জানার ইচ্ছে হলো না। ফোনটা রাখতে ধরলেই অপর পাশ থেকে তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলো

“শোনো, একটা কথা বলার আছে।”

ইমদাদ ফোনটা কাটলো না। কানে ধরে বলল,

বিজ্ঞাপন

“হ্যাঁ বলো।”

“আমি ইকবালের ক্ষতি হতে দিতাম না। ওদের ইকবালের ক্ষতি করার কোন উদ্দেশ্য ছিল কিনা এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত না। তবে যদি ক্ষতি করার উদ্দেশ্য থেকেই থাকতো তবে এভাবে প্রকাশ্যে ডেকে আনতো না। ইমাদকে যেমন লুকিয়ে মে'রে'ছে তেমন ভাবেই ইকবালকেও আঘাত করতো। এটা শুধু তোমায় ভয় দেখালো।”

“জানি। আমায় ভয় দেখানো ছাড়া ওরা আর কিছুই করতে পারবে না। ঠিক আছে এখন ফোনটা রাখো। ও বাড়ির কেউ দেখে ফেললে তোমার সমস্যা হয়ে যাবে। ধন্যবাদ আমার ভাইয়ের খেয়াল রাখার জন্য।”

________

রাতে সাঈদ গেলো ইমদাদের ঘরে ওর সাথে ঘুমোতে। ইমদাদ বারবার করে বলল সাঈদ কে নেবে না। ওকে ইমাদের ঘরে গিয়ে ঘুমোতে বলল, তবে সাঈদ শুনল না। ইমদাদের সকল কথা অগ্রাহ্য করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল।

ইমদাদের অভ্যাস নেই কারো সাথে বিছানা ভাগাভাগি করে ঘুমোনোর। কারো হাত পা যদি ওর শরীরের কোন জায়গায় স্পর্শ লাগে তবে ভীষণ বিরক্ত হয়। আর ইমদাদ খুব ভালো করেই জানে সাঈদ যখন ঘুমিয়েছে ওকে বিরক্ত করবেই। কারণ ইমদাদের সকল অভ্যাস সম্পর্কে সাঈদ খুব ভালোভাবেই অবগত, তবে কিছু করার নেই। ছেলেটা ওর মতনই অবাধ্য।

এদিকে অনেক চেষ্টা করেও ইমদাদ ঘুমোতে পারল না। যেই না একটু ঘুমোতে ধরছে অমনি মনে পড়ে যাচ্ছে যে ওর পাশে একজন শুয়ে আছে। আর অমনি বিরক্ত লাগছে।

এর মাঝে একবার আবার সাঈদ ঘুমের তালে ইমদাদের গায়ে হাত তুলে দিয়েছিল। ইমদাদ সঙ্গে সঙ্গে এক ঝটকায় হাতটা ছুড়ে ফেলেছে। তারপর থেকেই আরও বেশি অস্বস্তি হচ্ছে। সাঈদ কেমন যেন। ছেলেটার পাশে অন্যজন শুয়ে আছে অথচ নিজের হাত পায়ের উপরে কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। যেখানে সেখানে হাত রেখে দিচ্ছে।

বেশ অনেকটা সময় এপাশ ওপাশ ফেরার পরেও যখন ইমদাদের ঘুম ধরল না তখন উঠে বসলো। বালিশের পাশ থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা হাতে নিয়ে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। আর ঠিক তখনই ওর কানে ভেসে এলো সাঈদের কণ্ঠস্বর।

“আমার বোনকে সত্যি ভালোবাসিস? আমার থেকেও বেশি?”

থেমে গেল ইমদাদ। পিছন ফিরে তাকিয়ে বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“ঘুমোসনি তুই? তার মানে ইচ্ছে করে আমায় বিরক্ত করছিলি?”

সাঈদ শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“হ্যাঁ। কেউ আমার পাশে ঘুমোক সেটা আমারও পছন্দ না। তাই তোকে তুলে দিলাম।”

ইমদাদ রাগে কটমটিয়ে বলল,

“শা’লা হা’রা’মি কোথাকার।”

কথাটা বলে ইমদাদ চলে যেতে ধরলে সাঈদ ফের বলে উঠলো,

“উত্তর দিলি না তো আমার প্রশ্নের।”

ইমদাদ আবারও থমকালো, তবে তাকালো না সাঈদের দিকে। ইমদাদ নিজেই একটা ভ্যাবাচ্যাকার মাঝে পড়ে গেল। তৎক্ষণাৎ উত্তরটা দিতে পারল না। ইমদাদ তো জানে ইমদাদ কলিকে ঘৃণা করে, তাহলে সরাসরি বলে দিতে পারল না কেন? এক বাক্যে বলে দিলেই তো হয় যে ও কলিকে ঘৃণা করে। কিন্তু পারলো না বলতে।

আবার ইমদাদ যে কলি কে ভালোবাসে সেই কথাটাও নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারলো না। তাহলে অনুভূতিটা আসলে ঠিক কি? কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে ওদের সম্পর্কটা?

ইমদাদ এর নীরবতার মাঝে সাঈদ বলে উঠলো,

“হয়তো কোন অনুভূতি আছে, তবে আমার বোনের বোকামির জন্য সবটা নষ্ট হয়ে যায় তাই না?”

সাঈদের কথাটা শুনে ইমদাদের তৎক্ষনাৎ মনে পড়ে গেল কলির বলা ওর বোনকে নিয়ে কিছু কথা। মুহূর্তের মাঝে ইমদাদের মনে তৈরি হওয়া কলির জন্য সামান্যতম দুর্বলতা গুলো কেটে গেল। তৈরি হলো ভয়ংকর এক ঘৃণা।

দৃঢ়তার সাথে সাঈদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ভালোবাসার কোন অনুভূতি নেই। আছে শুধু তীব্র ঘৃণা। তোকে আমি যতটা ঘৃণা করি, তার থেকেও অনেক বেশি ঘৃণা করি তোর বোনকে।”

“তার মানে আমার থেকে বেশি আমার বোনকে ভালোবাসিস তাইতো?”

“বললাম না ঘৃণা করি তোর বোনকে। ভালোবাসার কথা আসছে কথা থেকে?”

“আমিতো জানি তুই আমাকে ভালোবাসিস, এখনো ঘৃণা করতে পারিস না। ঘৃণা করলে আমি তোর ঘরে, তোর বিছানায়, তোর পাশে থাকতাম না। আমিও তো বলি যে আমিও তোকে ঘৃণা করি, কিন্তু তারপরও তোর কাছে এসেছি। নিজের বাড়িতে আমি যতটা না নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি এখানে ততটা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবো। তার মানে ভালো আমিও তোকে বাসি এখনো।”

ইমদাদ কঠিন গলায় বলল,

“ভালোবাসি না তোর বোনকে আমি। ওকে ভালোবাসা যায় না।”

কথাটা বলে বেরিয়ে গেল ইমদাদ ঘর থেকে। সাঈদও আর বেশি কিছু ভাবলো না। ফাঁকা বিছানা পেয়েছে চুপচাপ শান্তি মত ঘুমিয়ে পড়লো।

______

কলির ঘুমোনোর কথা ছিল ইয়াসমিনের সাথে, তবে দুচোখে ঘুমের কোন দেখা পায়নি। কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছিল। বারবার শুধু চোখের সামনে শাহিনের মুখটা ভেসে উঠছিল। আর যতবারই সেই ভয়ানক স্মৃতি কলির মানস্পটে ভেসে উঠছিল ততবারই ভয়ে কুকড়ে যাচ্ছিল। এই অবস্থায় ঘুম আসা অসম্ভব ভেবে ছাদে গিয়েছিল।

ইমদাদও সাঈদের উপরে বিরক্ত হয়ে ছাদে এসেছে। দেখলো আগে থেকেই কলি উপস্থিত আছে। কলি কে দেখে ইমদাদের মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। যায় আসে না কলির উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতে। চুপচাপ গিয়ে ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে পড়লো। কারো উপস্থিতি টের পেয়ে কলি ঘাড় কাত করে পাশে তাকাতেই ইমদাদ কে দেখে সর্বাঙ্গ বিরক্তিতে ছেয়ে গেল।

বিড়বিড় করে বলল,

“শয়’তানটা মনে হয় আমি ম'র'লেও আমার পিছু ছাড়বে না। ক'ব'রে গিয়ে বসে থাকবে আগে থেকে।”

কথাটা বলে কলি চলে যেতে ধরলে ইমদাদ ওর হাত টেনে ধরে বলল,

“আমি না তোকে কিছু বলেছি, না কিছু করেছি তাহলে অযথা চলে যাচ্ছিস কেন? অন্যের জন্য নিজের ভালো লাগাকে কখনো বিসর্জন দিতে নেই।”

কি ভেবে যেন কলি থেমে গেল। শুধু ইমদাদের থেকে একটু দূরত্ব বাড়িয়ে দাঁড়ালো। ইমদাদ সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে সেটা ঠোঁটের ভাঁজে রেখে আগুন ধরালো। দুজনের মাঝে বেশ একটা সময় কোন কথা হলো না।

কলি খেয়াল করলো ইমদাদ পরপর তিনটে সিগারেট শেষ করলো। চার নম্বর সিগারেটে যখন আ’গুন ধরাতে গেল তখন আর কলি চুপ থাকতে পারলো না। একটু বিরক্তির সুরেই বলল,

“ম’রার যদি এতই ইচ্ছে হয় তাহলে তিলে তিলে না ম’রে একেবারে ম’রার ব্যবস্থা করলেই তো পারো। আরো অনেক উপায় আছে ম’রার। বি’ষ খাও, নয়তো ট্রেনের সামনে গিয়ে দাঁড়াও, নয়তো গলায় দড়ি দাও। বিরক্তিকর জিনিসটা খেয়ে ম’রার কোনো মানে হয়?”

ঠোঁটের ভাঁজ থেকে সিগারেটটা বের করলো ইমদাদ। কলির কথাটা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল,

“মাত্র তিনটে উপায় আছে তোর কাছে? তবে এগুলোর সবটাই কঠিন। কোন আনন্দ নেই এমন মৃ'ত্যুতে। আমি একটা সহজ উপায় বলি তোকে ম’রার?”

কলি কৌতূহলী গলায় বলল,

“কি?”

“কাউকে ভালোবেসে দেখ। খুব সহজভাবে তোর মৃ’ত্যুটা হবে এবং তুই খুব উপভোগ করবি সেই মৃ’ত্যুটা।”

কলি কন্ঠে অনীহা প্রকাশ করে বলল,

“আমাকে পাগল এ ধরেছে নাকি যে ভালোবাসবো। এর থেকে বিরক্তিকর কাজ এই দুনিয়াতে দুটো নেই।”

ইমদাদ শুধু বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কলির দিকে, কিছু বলল না। আবারও বেশ অনেকটা সময় নীরবতার মাঝে কাটলো।

কলি খেয়াল করলো একটু একটু ঘুম ধরছে। ভাবলল এখন নিচে যাওয়া যাক, তবে ইমদাদ কে কিছু বলে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। চলে যেতে ধরলে ইমদাদ পূর্বের মতনই আবারো কলির হাতটা টেনে ধরে বলল,

“চুপচাপ দাঁড়িয়েই তো আছি আমি তাহলে সমস্যা কি থাকতে?”

“ঘুমোতে যাচ্ছি আমি।”

“কি দরকার ঘুমোনোর? একটা রাত জেগে কাটালে কি এমন ক্ষতি হয়ে যাবে?”

“কিন্তু জেগে কাটাবো কেন যখন আমার ঘুম ধরেছে? তোমার কাছে তো সময় কাটানোর জন্য সিগারেট আছে।”

“আর তোর কাছে তো গোটা ইমদাদ আছে।”

কলি চমকালো ইমদাদের কথাটা শুনে। ঠিক বুঝে আসলো না ইমদাদ হঠাৎ করে এই কথাটা কেন বলল। কলির এসব ভাবনার মাঝে হঠাৎ করে ইমদাদ হো হো করে হেসে উঠলো। কলির হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলল,

“যা। যেখানে ইচ্ছে সেখানে যা। তোকে আটকে রাখার না আমার ইচ্ছে আছে, না সাধ্য।”

কথাটা শুনে কলি আলতো হেসে বলল,

“ইচ্ছের কথায় পরে আসি। আমাকে তো তুমি ঘৃণা করো। আমায় আটকে রাখার ইচ্ছে হবে না এটাই স্বাভাবিক। তবে আমায় আটকানোর সাধ্য তোমার হতে পারতো। তবে আমার বিয়ের দিন যা করলে তার কোনো ক্ষমা হয় না। হাজার হাজার অভিযোগ জমে আছে আমার মনে তোমায় নিয়ে। যতবার আমি চেষ্টা করেছি তোমায় ভালো ভাবার ঠিক ততবারই তুমি আমার ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করেছো।”

ইমদাদ একটা লম্বা শ্বাস টেনে বলল,

“ঠিক একই কাজটা তুইও বারবার আমার সাথে করেছিস। আমি যতবার তোর প্রত্যেকটা কাজকে বোকামি ভেবেছি, যতবার তোকে অবুঝ ভেবেছি, যতবার তোকে ক্ষমা করার চেষ্টা করেছি ঠিক ততবারই তুই প্রমাণ করেছিস যে তুই সরদার বাড়ির মেয়ে। ইমদাদের কেউ হওয়ার যোগ্যতা তোর নেই।”

“যোগ্যতা তো চাইলেই তৈরি করা যায়, তবে ইমদাদের কেউ হওয়ার ইচ্ছেই আমার নেই।”

কথাটা বলে কলি চলে গেল। দরজা অব্দি যেতেই কলির কানে একটা গান ভেসে এলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখলো ইমদাদ গান গাইছে।

❝যদি অভিযোগ কেড়ে নেয় সব অধিকার,

তবে অভিনয় হয় সবগুলো অভিসার,

যদি ঝিলমিল নীল আলোকে ঢেকে দেয় আঁধার,

তবে কী থাকে তোমার, বলো কী থাকে আমার?❞

কলি বুঝলো না ইমদাদের গানের মানে। গানটা গাওয়ার কারণ কি কলি সেটাও বুঝলো না। কলি বুঝলো না গানের বাক্যগুলোর অর্থ। ফলস্বরূপ আবারো ইমদাদ হয়ে উঠলো কলির কাছে রহস্যময় এক জটিল সমীকরণ, যার সমাধান কলির কাছে নেই।

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প