অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ২

🟢

কলিংবেলের আওয়াজ পেতেই দরজা খোলার জন্য ছুটে গেলো ইকবাল। তবে দুঃখের বিষয় হলো ছিটকিনি খোলার সাধ্য তার নেই। ইকবাল গলা উঁচিয়ে ছোট ভাইয়া বলে ডাকলো।

ইমাদ তখন ঘরে বসে পড়ছে। ইমাদের কাছে একটুও সময় নেই যে এদিক ওদিক তাকাবে। কিন্তু তবুও ইকবাল এত জোরে ডাকছে যে ডাকটা ওর কানে গেল এবং পড়া থামাতে বাধ্য হলো। নিজেও গলা উঁচিয়ে ইকবাল কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আপুকে বল খুলে দিতে। আমি এখন পড়ছি, যেতে পারবো না।”

ইকবাল বাধ্য হয়ে গলা উঁচিয়ে আপু আপু বলে ইয়াসমিনকে ডাকলো। ইয়াসমিন তখন রান্নাঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত। কিন্তু যেহেতু ইকবাল দরজা খুলতে পারবে না, তাই বাধ্য হয়ে দরজা খোলার জন্য আসতে হলো।

দরজা খুলে ইমদাদের মুখটা দেখতেই ইকবাল খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। ইকবালের হাস্যজ্জ্বল মুখটা দেখে মুহূর্তের মাঝে ইমদাদের মন মেজাজ সব ভালো হয়ে গেল।

এই বাড়ির সবথেকে ছোট সদস্য ইকবাল। বয়স মাত্র দশ বছর। সব থেকে বেশি চঞ্চলও সে। আর তার এসব গুণ মিলিয়ে বাড়ির সবথেকে আদরের সদস্য ইকবালই।

ইমদাদ জুতোটা খুলে একপাশে রেখে ভিতরে ঢুকতেই ইকবাল গিয়ে দুহাতে কোমর জড়িয়ে ধরলো ইমদাদের। ইমদাদও পাল্টা জড়িয়ে ধরল ভাইকে। সঙ্গে সঙ্গে ইকবাল একে একে সেই সবকিছু আবার মনে করিয়ে দিলো ইমদাদ কে যেগুলো আনতে বলেছিলো। ইমদাদ খুব মনোযোগ দিয়ে সব কিছু শোনার পর একটা বড় শপিং ব্যাগ ইকবালের দিকে বাড়িয়ে বলল,

“যা যা চেয়েছিলি সব এর ভেতরে আছে। ঘরে গিয়ে মিলিয়ে নে। আর যদি ভুলক্রমে কিছু আনতে ভুলে গিয়ে থাকি, তবে কাল এনে দেবো আবার।”

ইকবালের কোন কিছু শোনার সময় হলো না আর। দৌড়ে চলে গেল ঘরে। দরজাটা খুলে দিয়ে ইয়াসমিন আবার রান্না ঘরে চলে গিয়েছিলো। ইমদাদ নিজের ঘরে যাওয়ার আগে রান্নাঘরে গেল দেখার জন্য যে ইয়াসমিন কি করছে।

“এজন্য বলি একটা লোক রেখে দেই। একা এতো কিছু রান্না করা যায়!”

ইমদাদের কথাটা শুনে ইয়াসমিন আলতো এসে বলল,

“এজন্যই তো আমি বলি তুমি একটা বিয়ে করে নাও। তাহলে আমার ঘরের কাজ করারও একজন সাথী হয়ে যায়, গল্পগুজব করে সময় কাটানোরও একটা সঙ্গী পেয়ে যাই। আর সারাদিন শেষে বাড়ি ফিরে তুমিও মন মেজাজ ভালো করার জন্য একটা মানুষ পেয়ে যাও।”

কথাটা বলে ইয়াসমিন ইমদাদের দিকে তাকিয়ে ফের একটু হাসলো। ইমদাদ কন্ঠে একরাশ অনীহা প্রকাশ করে বলল,

“মেয়ে মানুষ মানে আজগুবি ঝামেলা। সবাই তো আর আমার বোনের মতন শান্ত, ভদ্র না যে সব পরিস্থিতিতে আমায় বুঝবে। তাই অন্যের বোনকে আমি আমার ঘরে তুলবো না। আমার ঘর আলো করে আমার বোনই থাকুক।”

“বোনকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে নেই নাকি? একদিন তো আমাকে পরের ঘরে পাঠাতে হবে।”

ইমদাদ ইয়ামিনের কথায় আপত্তি জানিয়ে বলল,

“উঁহু। এই ভুল ইমদাদ করবে না। রাস্তা থেকে একটা অনাথকে কুড়িয়ে এনে বিয়ে দিয়ে ঘর জামাই করে রেখে দেবো। আমার বোনের সংসার আমার চোখের সামনেই হোক। এক বোনকে চোখের আড়াল করে তো হারিয়ে ফেললাম।”

হঠাৎ করে পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে উঠলো। ইমদাদ কোন একটা ভাবনার মাঝে হারিয়ে গেল। ইয়াসমিনের রান্নার হাতটাও থেমে গেল, তবে খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজেকে স্বাভাবিক করলো। পরিস্থিতিটা সামাল দেওয়ার জন্য ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে এসে খেতে বসো। আমার রান্না শেষ।”

ইমদাদের ধ্যান ভাঙলো। চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে ইয়াসমিন ভাইয়া বলে ডেকে উঠলো। ইমদাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ইয়াসমিন জিজ্ঞেস করল,

“ওই বাড়িতে গিয়েছিলে? কলি শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছে এতক্ষণে নিশ্চয়ই তাই না?”

ইমদাদ থমকালো। কিছুক্ষণ ভাবলো কি উত্তর দেওয়া যায়। ইমদাদকে চুপ করে থাকতে দেখে ইয়াসমিন ফের বলে উঠলো,

“কি হলো, জানো না তুমি কিছু? যাওনি?”

“না, সময় হয়ে ওঠেনি। বিয়ে যেহেতু ছিল গেছেই হয়তো শ্বশুরবাড়ি। আর কপাল যদি পোড়ে তাহলে বাপের বাড়িতে পড়ে আছে। তোর আমার সেই সব ভেবে কাজ নেই। ও শ্বশুর বাড়িতে গেলে যাক, বাপের বাড়িতে থাকলে থাক, নয় তো রাস্তায় পড়ে ম'রুক গে। এইসব গিরগিটিদের নিয়ে কথা বলতেই আমার বমি পায়।”

কথাটা বলে ইমদাদ চলে গেল নিজের ঘরে। ইয়াসমিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার নিজের রান্নায় মনোযোগ দিল।

রান্নাবান্না শেষে টেবিলে খাবারগুলো বেড়ে তিন ভাইকে ডাকলো। ইকবাল আর ইমদাদ এসে বসলো ঠিকই, তবে ইমাদের দেখা পাওয়া গেল না। সামনের ফাঁকা চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে ইমদাদ প্রশ্নাত্মক গলায় ইয়াসমিন কে জিজ্ঞেস করল,

“ইমাদ খেয়ে নিয়েছে নাকি?”

“না। তোমার ভাই তো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বংশধর। এক রাতের মধ্যে পুরো বই শেষ করতে হবে। এমনি দিনেই তো ঘুমোয় না, কালকে আরো পরীক্ষা। দেখো গিয়ে আনতে পারো কিনা।”

ইয়াসমিনের কথাটা শুনে ইমদাদ ইমাদ কে ডেকে উঠে বলল,

“ইমাদ, ভাত খেতে আয়। পড়াশোনা পরে হবে। আগে তোকে বাঁচতে হবে।”

ইমাদ গলা উঁচিয়ে বলল,

“পড়া আমার কিচ্ছু হয়নি ভাইয়া। গলা দিয়ে খাবার নামবে না। তোমরা খেয়ে নাও, আমি ঘুমোনোর আগে খেয়ে নেব।”

ইমদাদ এবার একটু কড়া গলায় বলল,

“আমি খেতে আসতে বলেছি তোকে। দুই মিনিটের মধ্যে আমি তোকে এখানে দেখতে চাই।”

এবারে আর ইমাদের উত্তর পাওয়া গেল না। ইমদাদ ইয়াসমিনকে খাবার বেড়ে দিতে বলল প্লেটে। একটু পর ইমাদ এসে চেয়ারে বসে ইয়াসমিনকে তাড়া দিয়ে বলল,

“আপু, তাড়াতাড়ি খেতে দাও। সময় চলে যাচ্ছে।”

ইয়াসমিন এবারে রাগান্বিত গলায় ঝারি মেরে বলল,

“চুপ করে খেতে বস তো। সব সময় এত পড়া পড়া করে মাথা খেতে হবে না আমাদের।”

থেমে গেলে ইমাদ। আপাতত পড়াশোনা নিয়ে কোন কথা তুলল না। সবাই খাওয়া দাওয়া করে যে যার মত নিজেদের ঘরে চলে গেল।

ইমদাদ ঘরে গিয়ে আগে ল্যাপটপটা খুলে বসলো। কয়েকটা দরকারি ইমেইল চেক করলো। একটু পরে মনে হলো আসল কাজটাই তো এখনো করা হয়নি। তাড়াহুড়ো করে ল্যাপটপটা বন্ধ করে ফোনটা হাতে নিয়ে নিজের এক বন্ধুকে কল লাগালো।

কয়েকবার রিং হতেই সাদিক ফোনটা রিসিভ করলো। ইমদাদ উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছিস?”

সাদিক ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“না রে ভাই, পাইনি। ভদ্র মহিলা নাকি বিরাট ব্যস্ত। আগামী সপ্তাহেও আমরা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাবো না। আমার তো এখন মনে হচ্ছে আমরা বোধহয় কোনদিনই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাবো না। অযথাই প্রশংসা শুনেছি ওনার।”

“না, ভুল শুনিনি আমরা। আমি নিজে খোঁজ নিয়েছি। ওনার প্রশংসা আছে জন্যই তো এত ব্যস্ত। সবাই ওনার সাথে দেখা করতে চায়। শোন, একটা কাজ করি। এভাবে কল এ হবেনা, আমরা কাল সোজা ওনার অফিসে যাব।”

“আচ্ছা ঠিক আছে, তাই হবে।”

“আর শোন, ওদিকের খবর কি? ঠিকঠাক ভাবে চলছে তো সবকিছু?”

সাদিক ইমদাদ কে আশ্বস্ত করে বলল,

“সব ঠিক আছে, চিন্তা করিস না। তুই ঘুমো এখন। সারাদিন অনেক ছোটাছুটি হয়েছে।”

ইমদাদ “ঠিক আছে” বলে ফোনটা রেখে দিল।

সত্যি আর কোন কাজে হাত দিতে ইচ্ছে করলো না। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত লাগছে। তবে ইমদাদ বুঝতে পারছে না এতটা ক্লান্ত লাগছে কেন। অন্তত মন মেজাজটা তো ফুরফুরে থাকার কথা ছিল। আজকে একটু হলেও নিজের প্রতিশোধ পূরণ করতে পেরেছে, তারপরও শান্তি পাচ্ছে না। কেমন যেন একটা অস্থিরতা কাজ করছে ভেতরে। মাঝে মাঝে তো মনে হচ্ছে অপরাধবোধ কাজ করছে। ভেতর থেকে কেউ যেন একটা বলছে ইমদাদকে যে ও ঠিক করেনি।

সঙ্গে সঙ্গে আবার ইমদাদের মনে পড়লো কলির বলা কিছু বাক্য। মুহূর্তের মাঝে মনের ভেতরে যে অপরাধবোধ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে ধরেছিল তাকে দমিয়ে দিল। সেই সাথে নিজেই নিজেকে বোঝালো, যা করেছে ঠিক করেছে। সরদার বাড়ির মেয়ের এমন অপমানই প্রাপ্য।

________

আজ দুপুর থেকেই কামাল সরদার একটু অসুস্থ ছিলেন। বাড়িতেই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সারাদিন মিলিয়ে যতোটুকু সুস্থ হয়েছিলেন নাতনির বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় শরীরটা আবারো খারাপ করেছে।

এখন তার ঘরে একটা আলোচনা সভা বসেছে বাড়ির সব পুরুষদের নিয়ে। সেখানে কোন মেয়ের স্থান হয়নি। এবং এটাই সরদার বাড়ির নিয়ম, বাড়ির কোন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মেয়েদের থাকতে নেই। তাদের কাজ ঘর গোছানো, রান্নাবান্না করা আর বাড়ির পুরুষদের যেন কোন বিষয়ে অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কিংবা নিজেদের মতামত প্রকাশের অধিকার তাদেরকে দেওয়া হয়নি।

করিম সরদার গুরু গম্ভীর ভঙ্গিতে কামাল সরদার কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“কিছু পরামর্শ দিন আব্বা কি করা যায়? এই মেয়েকে নিয়ে কি করবো এখন আমি? অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়া সম্ভব বলে তো আমার মনে হয় না।”

বিজ্ঞাপন

কামাল সরদার উত্তর দেওয়ার আগেই পাশ থেকে করিম সরদারের ছোট ভাই কালাম বলে উঠলো,

“অন্যত্র বিয়ে দেয়ার কথা তুমি ভাবছোই বা কি করে? তোমার মেয়ে তো বিয়ে করে এসেছে, বলে গেল তো ইমদাদ। এখন মেয়ের সংসারের ব্যবস্থা করে দাও।”

করিম সরদার অগ্নিদৃষ্টিতে নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে সাবধানী গলায় বললেন,

“একবার এই কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেছো ছেড়ে দিলাম, দ্বিতীয়বার আর এই কথা মুখেও আনবে না। আমার জামাই হিসেবে ওই ছেলেকে কোনদিনও মেনে নেব না। দরকার পড়লে মেয়েকে জ্যান্ত নদীতে ভাসিয়ে দেব, তবুও ওই ছেলের সাথে সংসার করতে পাঠাবো না।”

কালাম তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“এইসব যে তোমার মুখের কথা সেটা খুব ভালো করে আমার জানা আছে। এখন রাগের মাথায় বলছো মেয়েকে নদীতে ভাসিয়ে দেবে, কিন্তু ভাসানোর সময় এলে ঠিকই থেমে যাবে। তখন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওই ছেলের বাড়িতেই পাঠাতে হবে। তাছাড়া কে ঘরে তুলবে তোমার মেয়েকে? নিজের জীবনটা তো নষ্ট করলো করলোই সেই সাথে আমাদের সম্মানও শেষ করলো। এর থেকে যদি জন্মের পরে গলা টিপে মা’র’তে তবে আজকে এই দিন দেখতে হতো না।”

করিম সরদার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁত পিষে বললেন,

“ভুলটা তো ওখানেই করেছি।”

এতক্ষণে কথা বলে উঠলেন কামাল সরদার। কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বললেন,

“আহ! থামো তোমরা। করিম, এটা মাথা গরম করার সময় না। আমাদের বাড়ির মেয়ে, আমাদের বাড়ির সম্মান। আর কিসের বিয়ে? যে বিয়ের কোন প্রমাণ, কোন সাক্ষী নেই সে বিয়ে আমরা মানি না। খুব শীঘ্রই মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করো করিম।”

“এটা অসম্ভব আব্বা। কোন উঁচু পরিবারে মেয়ের বিয়ে দেওয়া সম্ভব না। আপনার কি মনে হয় সেলিম সাহেব এত বড় অপমানের বদলা নেবেন না? ওনার কথা বাদ দিন, যাওয়ার সময় ওনার ছেলে যেভাবে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে আমারতো রুহ কেঁপে উঠেছিল।”

“বাড়ির বাইরে তাে আমি তোমায় খুঁজতে বলিনি। বাড়ির ভেতরেই তো তোমার মেয়ের জন্য উপযুক্ত ছেলে আছে।”

করিম সরদার ঠিক বুঝলেন না যে ওনার বাবা কার কথা বলছেন। ফলস্বরূপ জিজ্ঞেস করলেন,

“কার কথা বলছেন আপনি?”

“কেন তোমার ভাইয়ের ছেলে শাহিন আছে তো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর সাথে বিয়ের ব্যবস্থা কর।”

উপস্থিত প্রত্যেকেই চমকে উঠল। শাহিন তখন সেখানে উপস্থিত নেই। যদি ও থাকতো তবে চমকানোর সাথে সাথে খুশিও হতো। তবে শাহিনের দুর্ভাগ্য। কলির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে সেই শোকেই আজ বাড়ি ছেড়েছে।

পরিস্থিতি কিছুক্ষণের জন্য থমথমে হয়ে গেল। হঠাৎ করেই কালাম কামাল সরদারের কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“কি বলছেন আব্বা? এসব হয়না। কলি এখন আমার ছেলের উপযুক্ত নেই।”

কামাল সরদার ছেলের দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গম্ভীর গলায় বললেন,

“নিজেকে প্রশ্ন করো তোমার ছেলে কলির যোগ্য কিনা। কলির বাবা যদি এই বিয়েতে রাজি হয় তবে তোমার ছেলের কপাল ভালো। কলির জন্য ছেলে পেলেও পেতে পারি, তবে তোমার ছেলের জন্য কোনো ভালো পরিবার থেকে মেয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। যে ছেলে দিনরাত মদ গাঁজার নেশায় ডুবে থাকে, সেই ছেলেকে মেয়ে দেবে কোন ভালো পরিবার? আর যদি কোন ছোট পরিবার থেকে মেয়ে আনার ইচ্ছে থাকে তবে আপত্তি জানাতে পারো এই বিয়েতে। সে ক্ষেত্রে যৌতুকের টাকা-পয়সাও ছোট অংকেরই পাবে। আর এখানে কলির সাথে ছেলের বিয়ে দিলে অর্ধেক সম্পত্তি পেয়ে যাবে।”

থেমে গেল কালাম। কামাল সরদার এবারে বড় ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তুমি কি বলছো এ ব্যাপারে? রাজি শাহিনের সাথে বিয়ে দিতে কলির?”

করিম সরদার বললেন,

“আপনার কথা ফেলার সাধ্য নেই আমার আব্বা। তবে শাহিন হয়তো একটু বেশি অনুপযুক্ত।”

“কেন? হ্যাঁ মানছি ওর মাঝে খুঁত আছে ঠিকই, তবে তারপরও নিজের সম্মান বাঁচানোর একমাত্র উপায় হিসেবে তোমার কাছে শাহিনই আছে। আর তাছাড়া বিয়ের পর মেয়ে চোখের সামনেই থাকবে। সমস্যা কি? ইমদাদের কাছে যদি হারতে না চাও তাহলে শাহিনের সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। আমার কথা শোনো। তোমার আব্বা তোমাদের খারাপ চায় না।”

চুপ করে গেলেন করিম সরদার। অনেক কিছু ভাবনা চিন্তার পর বুঝলেন তার আব্বার কথাই ঠিক। নিজের সম্মান বাঁচানো, সেই সাথে ইমদাদ কে হারানোর একটা উপায়ই আছে ওনার কাছে।

করিম সরদার জানেন না সত্যিই ইমদাদ আর কলির বিয়েটা হয়েছে কিনা, তবে যদি হয়েও থাকে তাতেও যায় আসে না। দরকার হলে মেয়ের বিয়ে লুকিয়ে দেবেন।

হ্যাঁ, কলির বিয়ে দিয়ে দেবেন শাহিনের সাথে। তবেই তো হয়ে গেল ইমদাদের হার।

__________

বেশ সকাল সকাল ইমদাদ ঘুম থেকে উঠে পড়লো। আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে শহরের বাইরে যেতে হবে। রাতে বাড়িতে ফিরবে কিনা জানেনা।

মাঝে মাঝেই এমন হয়। হুট করে একদিন শহরের বাইরে চলে যায়, দু-তিনদিনে আর ফিরতে পারে না। কোথায় যায়, কি কাজে যায় কেউ জানে না। ইমদাদের ভাই-বোন কখনো ওর থেকে জবাবদিহি চায়নি। ওদের বিশ্বাস আছে ইমদাদের উপরে।

ইমদাদ যে সকালে বেরোবে সেই খবর রাতেই ইয়াসমিন জেনেছিল। তাই সে নিজেও তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে রান্না করে ভাইকে খেতে দিলো।

খাওয়া-দাওয়া শেষে তৈরি হয়ে ইমদাদ বেরোনোর প্রস্তুতি নিলো। দরজা খুলতেই চমকে উঠলো ইমদাদ। সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং কলি। কলিও হয়তো এখনই কলিং বেল বাজাতো, তবে তার আগেই ইমদাদ দরজা খুলেছে।

ইমদাদের সাথে তখন ইয়াসমিনও আছে। এই সময়ে কলিকে এখানে দেখে ইয়াসমিন চমকালো। বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল,

“কলি, তুমি এখানে কি করছো?”

ইয়াসমিনের প্রশ্নটা কলির কানে গেল না। অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইমদাদের দিকে। ইমদাদও সূচালু দৃষ্টিতে কলির দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে ওর অভিব্যক্তি।

রাগে কলির চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। মনে হচ্ছে ভস্ম করে ফেলবে ইমদাদ কে।

ইমদাদ কিছু বলে ওঠার আগেই কলি নিজের কোমল হাত দিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ইমদাদের গালে কষিয়ে একটা চড় বসালো। ইয়াসমিন আঁৎকে উঠে বলল,

“মা’র’ছো কেন কলি? এটা কেমন ব্যবহার?”

কলি এবারে ইয়াসমিনের প্রশ্নের কোন উত্তর দিলো না। ইমদাদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে রাগে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,

“তোর জন্য আমার জীবন নষ্ট হয়েছে। ঐ শাহিনের মতন একটা চরিত্রহীন, লম্পট এর সাথে আমার বাবা বিয়ে ঠিক করেছে আমার তোর জন্য। এই বিয়েতো আমি কোন মতেই করব না, সেই সাথে তোকেও একটা কথা বলে যাচ্ছি, তোর জীবন ধ্বংস করে ছাড়বো। আমি নিজের হাতে তোর জীবন যদি ছারখার না করেছি তবে আমার নাম কথাকলি সরদার না।”

ইমদাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো কলির দিকে। শান্ত গলায় বলল,

“যার সাথে তোর বাপ তোর বিয়ে ঠিক করেছিল সেও শাহিনের থেকে কোন অংশে কম না। কৃতজ্ঞ থাক তোকে বাঁচিয়ে নিয়েছি।”

“আমাকে বাঁচানোর জন্য তো তুলে নিয়ে যাসনি তুই। নিয়ে গিয়েছিলি তো প্রতিশোধ পূরণ করার জন্য। আজ আমার মনে হচ্ছে জানিস তো আমার পুরো পরিবার একদম ঠিক বলে, তোরা মানুষই না। আমি জানিনা তোর বোনের…....”

নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করার আগে ইমদাদ হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে সাবধানী গলায় বলল,

“আমার বোন সম্পর্কে কিছু বললে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে কলি।”

“অন্যের বোনের জীবন নষ্ট করার আগে হুশ ছিল না?”

“এটা তোর ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর, তোর বাপ আর চৌদ্দগুষ্টিকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর যে অন্যের বাড়ির মেয়ের জীবন নষ্ট করার সময় ওদের হুঁশ কোথায় ছিল। এখন যেই নিজেদের বাড়ির মেয়ের দিকে আঙুল উঠেছে অমনি সবার টনক নড়েছে। অথচ এই মানুষগুলোই নিজ হাতে আমার বোনের জীবন শেষ করেছিল। তখন কোথায় ছিলি তুই আর তোর চৌদ্দগুষ্টি?”

কলি ফের ইমদাদের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল,

“আমি আবারো বলছি তোরা কেউ মানুষই না। তোরা পারিসই জোরজবরদস্তি চালিয়ে নিজেরা দোষ করে অন্যদেরকে অপরাধী বানাতে। ঠিক যেভাবে তোর বোন আমার ভাইকে বানিয়েছিল আর কাল তুই আমায় বানালি।”

“কলি!”

ইমদাদ চ’ড় মা’রা’র জন্য হাতটা তুলল তবে ইয়াসমিনকে আটকালো ওকে। রাগে থরথর করে কাঁপছে ইমদাদ। কলি খুব অল্প সময়ের জন্য ভয় পেল। তারপরে নিজেকে স্বাভাবিক করলো। কেননা ইমদাদের সামনে ভয় পেলে চলবে না।

ইয়াসমিন ক্রন্দনরত গলায় ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভাইয়া শান্ত হও। যার যা ইচ্ছে বলুক তাতে সত্যিটা বদলে যাবে না। সবাই জানে কে অপরাধী। দয়া করে চুপ কর তুমি।”

ইমদাদ দাঁত পিষে কলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যা। নয়তো আমি কি করবো আমি নিজেও জানিনা। যদি প্রাণের মায়া থেকে থাকে তবে চলে যা কলি। আর একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ, তোর চৌদ্দগুষ্টি শয়তানের আরেক রূপ। আর আজ আমার বোনের নামে তুই আবারো যে অপবাদটা দিলি তার মাশুল তোকে দিতে হবে। তুই পস্তাবি।”

কলি তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“আমি পস্তাবো কিনা সেসব পরে দেখা যাবে, তবে তুই আমার সাথে যা করেছিস তার জন্য তুই অবশ্যই পস্তাবি। কথা দিচ্ছি, যে অপবাদ তুই আমায় দিয়েছিস সেই অপবাদ দিয়েই ধ্বংস করবো তোকে আমি। এটা কথাকলি সরকারের প্রতিজ্ঞা।”

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প