অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ৫

🟢

সকাল সকাল কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো ইয়াসমিন। তবে আজ ইমদাদের ওকে একা ছাড়তে ইচ্ছে করলো না। গতকাল ইমাদের সাথে যে ঘটনাটা ঘটল তার পরে মনের মধ্যে একটু হলেও ভয় ঢুকেছে। কেননা ইমদাদের প্রতিপক্ষরা তো মানুষ না, হিংস্র জা’নো’য়া’র। যেকোনো সময় হামলা করতেই পারে।

কলেজ যাওয়ার পথে অর্ধেকটা পথ ইয়াসমিন হেঁটে যায়, আর বাকি অর্ধেকটা পথ গাড়িতে যায়। তাহলে টাকা কম খরচ হয়। তবে আজ ইমদাদ ওকে হাঁটার সুযোগ দিলো না। একদম বাড়ির গেট থেকে বেরিয়েই একটা রিক্সা দাঁড় করালো। বোনকে নিয়ে যাচ্ছে কষ্ট করাবে নাকি ইমদাদ।

ইয়াসমিন যেমন শান্ত শিষ্ট, চুপচাপ স্বভাবের ইমদাদ তেমন গম্ভীর স্বভাবের। তাই গাড়ির মধ্যে আর দুজনের মাঝে তেমন কোন কথাবার্তা হলো না। একটু অস্বস্তি হলো ইমদাদের। ইমদাদই দু একটা কথা তাও যা বলল, ইয়াসমিন শুধু ছোট করে সেগুলোর উত্তর দিল।

এর পেছনেও একটা কারণ আছে। ইয়াসমিনের মনে রাগ জমেছে ইমদাদের প্রতি। ইমদাদ অবশ্য সেটা বুঝতেও পেরেছে, তবে কিছু বলছে না। এই কথাগুলো তুললেই ঝামেলা বাড়বে। বরং যেমন স্বাভাবিক যাচ্ছে তেমন স্বাভাবিকই যাক।

কিছুক্ষণ নিজে নিজে কথা বলার পর ইমদাদ যখন ইয়াসমিনের থেকে ঠিকঠাক সাড়া পেল না তখন ইমদাদ নিজেও থেমে গেল। ভাবলো বাড়ি ফিরে গিয়ে এই নিয়ে কথা বলা যাবে।

যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে হঠাৎ দুটো পরিচিত মুখ দেখলো ইমদাদ। সঙ্গে সঙ্গে রিক্সাওয়ালাকে রিকশা থামাতে বলল। ইয়াসমিন চমকে উঠে বলল,

“কি হয়েছে?”

ইমদাদ ইশারায় রাস্তার বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কলিকে দেখিয়ে বলল,

“ওই দেখ তোর ভাবি। আমার শালার মনে হয় বাইকটা নষ্ট হয়েছে। বউকে রেখে যাই কি করে। তুই বস, আমি আসছি।”

ইমদাদের কথাটা শুনে ইয়াসমিন সেদিকে তাকিয়ে কলির পাশে সাঈদকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। মুহূর্তের মাঝে ভয়ে চোখ মুখ নীল বর্ণ ধারণ করল। ইমদাদ নেমে যেতে ধরলে ওর হাত টেনে ধরে কম্পিত গলায় বলল,

“ভাইয়া যেও না। ওখানে কলির ভাই আছে।”

ইমদাদ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“ও কি করবে আমার?”

ইয়াসমিন অসহায় মুখ করে বলল,

“কি দরকার অযথা ঝামেলা বাড়ানোর? আমরা যেখানে যাচ্ছিলাম চলো যাই। ওরা যেখানে ইচ্ছে যাক।”

ইয়াসমিনের কথায় ইমদাদ আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না, বউয়ের সাথে কথা না বলে যাই কি করে। সাঈদের সাথেও অনেকদিন হলো কথা হয় না। যাই একটু কথাবার্তা বলে আসি। তুই যাবি? আয়।”

ইয়াসমিন দু দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না। আমি যাব না, তুমি যাও।”

“আরে তোর ভাই আছে না সাথে। ভয় পাচ্ছিস কেন? কি করবে তোর আমি সাথে থাকতে? চল যাই।”

ইয়াসমিন যেতে চাইলো না, তবে ইমদাদ জোর করে ওকে রিকশা থেকে নামালো। রাস্তা পার হয়ে কলিদের দিকে এগিয়ে গিয়ে সরাসরি আগে কলিকে উদ্দেশ্য করে ইমদাদ বলল,

“আরে কলি এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? রোদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছো, তোমার ফর্সা রংটা তো কালো হয়ে যাবে।”

এতক্ষণে কলি কিংবা সাঈদ কেউই খেয়াল করেনি ইমদাদদের। ওর কন্ঠটা পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকালো। ইমদাদের মুখটা দেখতেই কলির সর্বাঙ্গ বিরক্তিতে ছেঁয়ে গেল। কথা বলার রুচি হলো না। নিজের মুখ আবার ঘুরিয়ে নিল।

সাঈদ একবার ইমদাদের দিকে তাকিয়ে আবারো নিজের কাজে মনোযোগ দিল। ইমদাদ বুঝলো ওকে জোর করে ওদের মনোযোগ কেড়ে নিতে হবে।

ইয়াসমিনকে রেখে সাঈদের দিকে এগিয়ে গিয়ে হালকা করে ওর পিঠ চাপড়ে বলল,

“শালাবাবু কি খবর? দিনকাল কেমন কাটছে?”

ইমদাদের মুখ থেকে শালাবাবু সম্বোধনটা শুনতেই সাঈদের র’ক্ত টগবগ করে ফুটে উঠলো। বিরক্তি ভরা দৃষ্টিতে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে কটমটিয়ে বলল,

“আমাকে এই নামে ডাকবি না তুই। তোকে এখানে কে ডেকেছে? দেখছিস না আমরা নিজেদের মতন কাজ করছি। যা এখান থেকে।”

সাঈদের রাগী কন্ঠে বলা কথাগুলো শুনেই ইয়াসমিন কেঁপে উঠলো। আবারো গিয়ে ইমদাদের হাত টেনে ধরে বলল,

“ভাইয়া চল আমরা চলে যাই এখান থেকে।”

এতক্ষণে সাঈদ খেয়াল করলো ইয়াসমিনকে। ইমদাদকে প্রথমে দেখে এতটাই রাগ উঠে গিয়েছিল যে পাশে যে ইয়াসমিনও দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে খেয়াল করার কথা মনে ছিল না। তবে ইয়াসমিন কে দেখেও যে সাঈদের রাগ কমলো তেমনটা না। বরং ইয়াসমিনের এত কাপাকাপি দেখে তরতর করে রাগ বাড়লো।

ইমদাদ কে রেখে ইয়াসমিনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁত পিষে বলল,

“আমার কাছে আসলে তোর এতো যাওয়ার তাড়া শুরু হয় কেন? খেয়ে ফেলবো তোকে আর তোর ভাইকে? আর আমাকে দেখে সব সময় এত ভয় পাস কেন? আমি কি খু’নি নাকি তোর ভাইয়ের মতন গুন্ডা?”

সাঈদের বলা শেষের বাক্যে ইয়াসমিন একটু কেঁপে উঠলো। ভয় আরো বাড়লো। চুপচাপ ইমদাদের পিছনে লুকিয়ে পড়ল। যেন ভাইয়ের পেছনে দাঁড়ালে আর কারো ক্ষমতা নেই ইয়াসমিনকে কিছু করার।

এদিকে ইয়াসমিনের সাথে এত জোরে কথা বলা ইমদাদের মোটেও পছন্দ হলো না। বোনকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“গলা নিচু করে আমার বোনের সাথে কথা বলবি। আমিই কখনো আমার বোনকে ধমক দেই না, তুই কোন বা’ল।”

“আমার যার সাথে যেমন ভাবে ইচ্ছে হবে তেমনভাবেই কথা বলবো। তুই আমার বোনের সাথে কেমন ভাবে কথা বলবি সে বিষয়ে আমার কথা শুনিস?”

ইমদাদ হেসে উঠে বলল,

“তোর বোন আমার বউ। আমার বোন কি তোর বউ নাকি?”

সাইদ আড়চোখে একবার ইয়াসমিনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল,

“সে পরে দেখা যাবে কে কার বউ। আর তোকে নিষেধ করেছিলাম না আমার বোনকে নিজের বউয়ের পরিচয় দিবি না।”

ইমদাদ এবারে সরাসরি তাকালো কলির দিকে। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“আমি তোমাকে আমার বউয়ের পরিচয় দেবো না কলি? তুমি তোমার ভাইকে বলোনি যা আমরা বিয়ে করেছি? তোমার ভাই কেন আমাদের সম্পর্কের মাঝে ভিলেন হচ্ছে বলোতো?”

রাগে কলির শরীর শুধু জ্বলছে। মনে হচ্ছে ওর সারা গায়ে কেউ যেন মরিচ ডলে দিয়েছে। তবে তারপরও নিজের রাগ এখন প্রকাশ করলো না। যেহেতু সামনে সাঈদ আছে তাই। এখন সাঈদের মনে যেটুকু সন্দেহ আছে ওদের বিয়ে নিয়ে সেটুকু দূর করার চেষ্টা করতে হবে।

“ভাইয়া, তুমি এভাবে কথা বলছো কেন ওনার সাথে? সম্মান দাও ওনাকে। ইমদাদ ভাই তুমি কিছু মনে করো না। বুঝতেই তো পারছো আমাদের বিয়েটা কোন পরিস্থিতিতে হয়েছে। আর তুমিও আমার ভাইয়ার সাথে এত ঝগড়া করো না। আমার ভালো লাগেনা। তোমায় কেউ খারাপ বলুক এটা আমি মেনে নিতে পারি না। বোঝো না তুমি?”

ইমদাদ তব্দা খেয়ে গেল কলির কথায়। ইমদাদের তো উদ্দেশ্য ছিল কলিকে রাগানো। তারপরে রেগে যেন কলি স্বীকার করে সাঈদের সামনে যে ওদের বিয়েটা হয়নি, তবে তেমন কিছু তো হলো না। বরং ইমদাদের ভাবনার বিপরীত দিকে চলে গেল পুরো ব্যাপারটা।

এদিকে পুরো ব্যাপারটা মাথার উপর দিয়ে গেল ইয়াসমিন আর সাঈদেরও। ইমদাদ কে এভাবে কলির দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখেই সাঈদ যেন অনেক কিছু ধরে ফেলল, তবে তারপরও কিছু বলল না।

ইমদাদের মনে হলো এখানে আর বেশিক্ষণ থাকাটা ঠিক হবে না। ইয়াসমিন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“চল রিকশা দাঁড়িয়ে আছে।”

ইয়াসমিন তো যাওয়ার জন্য অনেকক্ষণ আগে থেকেই তৈরি। ইমদাদের কথায় আর এক মুহূর্ত দাঁড়ানোর ইচ্ছে হলো না। চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে কলি ইমদাদকে ডেকে উঠলো। নিজের সবটুকু বিরক্তি ভাব নিয়ন্ত্রণ করে পিছন ফিরে তাকিয়ে ইমদাদ ভ্রুঁ উঁচিয়ে বললো,

“কি সমস্যা?”

কলি গলা উঁচিয়ে বলল,

“আমায় কিছু টাকা পাঠিয়ে দিয়ো, হাত খরচের জন্য লাগবে। ভাইয়া আজ আমায় কলেজে ভর্তি করে দিয়েছে সেটার জন্যও টাকা পাঠিয়ে দিয়ো। বিয়ে হয়ে গেছে এখন কি আর বাবা ভাইয়ের থেকে টাকা চাওয়া যায় বলো? তোমার সম্মান থাকবে?”

ইমদাদ শুধু হাসলো কলির কথা শুনে। নিজেও গলা উঁচিয়ে বলল,

“কত টাকা লাগবে?”

“দিও পাঁচ-ছয় হাজার।”

“ঠিক আছে। বিকেলে বাড়ি এসো, দিয়ে দেব।”

বাড়িতে এসো কথাটা শুনে কলি ঘাবড়ে গেল। সাঈদের আর সহ্য হলো না এদের ন্যাকামি। ইমদাদের দিকে তেড়ে গিয়ে দুহাতে ওর কলার চেপে ধরে দাঁত পিষে বলল,

“কেন করছিস এসব আমার বোনের সাথে? কি লাভ তোর এসব করে? “

ইমদাদ এক ঝটকায় নিজের কলার থেকে সাঈদের হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে বেশ শান্ত গলায় বলল,

“সেটা তোর বোনকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর ওর কি লাভ এসবে। আমার জীবনে কোন লাভ ক্ষতি নেই। যা করি সবই অন্যের জন্য, তবে তোর বোন স্বার্থপর। ও যা করছে নিজের কথা ভেবেই করছে।”

সাঈদ আরো কিছু বলে উঠতে ধরলো, তবে তার আগেই ইমদাদের ফোনটা বেজে উঠলো। ওদের ঝামেলায় একটু ভাটা পড়লো। ইমদাদ পকেট থেকে ফোনটা বের করে কানে ধরে বলল,

বিজ্ঞাপন

“হ্যাঁ মামি, বলুন। ইকবাল ঠিক আছে তো? বিরক্ত করছে আপনাকে?”

ফোনের অপর পাশে থাকা মধ্যবয়স্ক শ্যামলী চিন্তিত গলায় বলল,

“বাবা, আমি ইকবাল কে বাড়িতে রেখে একটু পাশের বাড়িতে কাজ করতে গিয়েছিলাম। এসে দেখি ইকবাল নেই। আমার ছেলে বলল সরদার বাড়ি থেকে কে যেন এসে তোমার ভাইকে নিয়ে গিয়েছে।”

ভয়ে ইমদাদের অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল। উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কে নিয়ে গেছে ইকবালকে?”

“সে আমি বলতে পারছি না বাবা। আমার ব্যাপারটা ভালো লাগলো না। তুমি একটু গিয়ে দেখো। তোমার মামাও নেই বাড়িতে।”

ইমদাদ আর কোন কথা শোনার প্রয়োজন মনে করলো না। কলটা কেটে দিয়ে দৌড় লাগাতে ধরলো, তবে কি ভেবে যেন আবার থেমে গেল। পূর্বের জায়গায় ফিরে এসে সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে আঙুল উঁচিয়ে শাসিয়ে বলল,

“যদি আমার ভাইয়ের গায়ে একটা ছোট আচড়ও পড়েছে, তবে তোকে, তোর বোনকে আর তোর পুরো গুষ্টিকে এই ইমদাদ আজ সরদার বাড়িতে জ্যান্ত পুঁতে রেখে আসবে মনে রাখিস আমার কথাটা। ইকবাল শুধু আমার ভাই না, ও আমার সন্তানের মতন। সেই ছোট্টবেলা থেকে ওকে আমি মানুষ করেছি। ছেলেটা আমার মানসিক ভাবে অসুস্থ, আর তোরা এই নোংরা খেলায় ওকেও ছাড় দিলি না। আমার কথা মিলিয়ে নেস সাঈদ, বাঁচবি না তোরা কেউ।”

কথাটা বলে ইমদাদ চলে যেতে ধরলে সাঈদ ওর হাত ধরে নিজেও পাল্টা উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কি হয়েছে?”

রাগ আর অস্থিরতা সব মিলিয়ে ইমদাদ বলতেও পারছে না কথাগুলো। সাঈদ খেয়াল করল ইমদাদের চোখ দিয়ে পানিও গড়িয়ে পড়ছে। হয়ত ভয়ে, রাগে কিংবা চিন্তায়। সাঈদ একটু ধমক দিয়ে বলল,

“বলবি আমায় কি হয়েছে?”

“সরদার বাড়ি থেকে কে যেন এসে ইকবালকে নিয়ে গিয়েছে। কেন নিয়ে গিয়েছে ওরা? কি সম্পর্ক তোদের আমাদের সাথে? উদ্দেশ্য কি? আরে ও তো ছোট বাচ্চা। ও তো এসবের কিছু বোঝেও না। কেন ওকে এসবের মধ্যে টানছিস? ক্ষমতা থাকে তো আমার সাথে লেগে দেখা। শালা তোরা সবগুলো শু’য়ো’রে’র জাত।”

ইমদাদ এবারে ইয়াসমিন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোর ওই বাড়িতে যাওয়ার দরকার নেই। আমাদের বাড়ি চলে যা।”

ইয়াসমিন কে কথাটা বলে ইমদাদ সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার বোনটাকে ঠিক মতো বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসিস। দায়িত্ব দিলাম তোকে। ওর যেন কিছু না হয়।”

কথাটা বলে ইমদাদ না কিছু বোঝার আর না কিছু শোনার অপেক্ষায় রইলো। দৌড় দিল সরদার বাড়ির দিকে। সাঈদের মনে হলো ওরও যাওয়া দরকার। এদিকে ইয়াসমিন আর কলিও অস্থির হয়ে উঠেছে। সাঈদ কলিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তুই ইয়াসমিনকে নিয়ে ওদের বাড়িতে যা, আমি ইমদাদের সাথে যাই। দেখি ওই শু’য়ো’রে’র বাচ্চাগুলোর কি সমস্যা। ইকবালের যদি কিছু হয়েছে আজ সবগুলোকে আমিই শেষ করব।”

কথাটা বলে সাঈদও ইমদাদের পিছন পিছন দৌড় লাগালো। দৌড়াতে দৌড়াতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে নিজের বাবার নাম্বারে কল লাগালো। করিম সরদার ফোনটা রিসিভ করতেই সাঈদ হুমকি দিয়ে বলল,

“ইকবালের গায়ে যেন একটা ফুলের টোকাও না লাগে। সরদার বাড়িতে কিন্তু তাহলে র’ক্তে’র বন্যা বয়ে যাবে।”

__________

“ইকবাল! ভাই, কোথায় তুই?”

ইমদাদ ছুটতে ছুটতে সরদার বাড়িতে ঢুকলো। দরজাটা খোলাই ছিল, যেন ইমদাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। সদর দরজার চৌকাঠের সাথে পা লেগে হুমড়ি খেয়ে মেঝের উপরে পড়ে গেল ইমদাদ। আঘাত পেল পায়ে, তবে সেদিকে খেয়াল নেই ইমদাদের।

ইমদাদ আরো বেশ কয়েকবার ডাকল ইকবাল কে, তবে ওর সারা শব্দ পাওয়া গেল না। শুধু ইকবাল কেন, এই বাড়িতে যে এত মানুষ থাকে তাদের কারোরই দেখা পেল না ইমদাদ।

একটু পর সাঈদও সেখানে এলো। সাঈদ এগিয়ে গিয়ে চিন্তিত গলায় ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কোথায় ইকবাল?”

“সেটাই এখন জানবো। তোর বাপ, চাচা, দাদা, ভাই কে ডাক।”

কথাটা বলে ইমদাদ সাঈদের ডাকার জন্য অপেক্ষা করলো না। নিজেই চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“কোথায় সরদার বাড়ির সবগুলো জা'নো'য়া'র। নিচে নেমে আয়। ক্ষমতা থাকে তো ইমদাদের চোখে চোখ রেখে কথা বল। আজ আমি দেখে যাব তোদের শরীর মানুষের র’ক্ত বইছে নাকি পশুর।”

এত চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়ে উপর তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন কামাল সরদার আর সাথে তার দুই ছেলে। ইমদাদ কে এভাবে চেঁচামেচি করতে দেখে তিনি সরাসরি গম্ভীর গলায় ইমদাদ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোমার কি মনে হয় এখানে তোমার মতোন অসভ্য, গুন্ডা, বদমাশরা থাকে যে এভাবে দিন দুপুরে এসে চেঁচামেচি করছো? ভদ্রতা নেই তোমার? কোথায় কি ব্যবহার করতে হয় সেটা জানো না?”

কামাল সরদারের কন্ঠটা পেয়ে ইমদাদ সেদিকে তাকালো। ওনাদের তিনজনকে দেখে ঘৃনায় সারা শরীর রি রি করে উঠলো। ভদ্রতা দেখতে চাইছে কামাল সরদার। ইমদাদ মনে মনে ঠিক করলো আজ এদেরকে ভদ্রতা দেখাবে যদি ইকবালের কোন ক্ষতি হয়।

ইমদাদ নিজেই এগিয়ে গেলো কামাল সরদারের দিলে। শান্ত গলাই প্রশ্ন করলো,

“ইকবাল কোথায়?”

কামাল সরদার ইমদাদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নিজে পাল্টা প্রশ্ন করলেন,

“আমার নাতনি কে কেন নিয়ে গিয়েছিল ওর বিয়ের দিন? কেন আমাদের সম্মান এভাবে ধূলোয় মিশিয়ে দিলে? কেন তোমার মতন একটা গুন্ডার সাথে আমার নাতনির নাম জড়ালে?”

“আমি জানতে চেয়েছি আমার ভাই কোথায়। শেষবারের মতন বলছি আমার ভাই কে এনে দিন। নয়ত সরদার বাড়িতে কিন্তু আজ আ'গু'ন জ্ব'ল'বে। আমি কিন্তু ভাই, চাচা, দাদা কিচ্ছু মানবো না।”

“সে তুমি কবে মানো? শিক্ষার প্রচন্ড অভাব তোমার মাঝে। গুরুজনদের কি করে সম্মান দিতে হয় সেসব তুমি জানো?”

ইমদাদের রাগ তরতর করে বাড়লো। নিজেই দুহাতে নিজের মাথার চুল খামচে ধরলো। হাতের কাছে পেল একটা মাটির ফুলদানি। সেটাই তুলে মেঝেতে ছুড়ে মারলো। মুহূর্তের মাঝে টুকরো টুকরো হয়ে গেল ফুলদানিটা। উপস্থিত মানুষগুলো একটু ভয়ও পেল। ইমদাদ চিৎকার করে উঠে বলল,

“আমার ভাই কোথায়? ইকবাল কোথায়? কেন নিয়ে এসেছেন ওকে এখানে?”

সাঈদ বুঝলো পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। ইশারায় ইমদাদ কে শান্ত হতে বলে নিজেই কামাল সরদার কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ইকবালকে কেন নিয়ে এসেছেন এই বাড়িতে আপনারা? না নিজেরা শান্তিতে থাকবেন না কাউকে শান্তিতে থাকতে দেবেন তাই তো?”

সাঈদের কথার মাঝেই ইকবালের কন্ঠস্বর ভেসে এলো। ইকবালের কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে ইমদাদ উপরের দিকে তাকাতেই দেখলে সিঁড়ি বেয়ে ইকবাল নামছে। ইমদাদ যেন নিজের জীবন ফিরে পেল। ইকবাল ছুটে নেমে এসে দুহাতে ইমদাদের কোমর জড়িয়ে ধরলো।

ইমদাদ যে পাল্টা জড়িয়ে ধরবে ইকবাল কে সেই খেয়ালটাও নেই। শরীরে যেন বল শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। হাঁটু ভেঙে মেঝের উপরে বসে পড়লো।

বয়সের তুলনায় বুদ্ধির দিক দিয়ে অনেকটাই পিছিয়ে আছে ইকবাল। বয়স দশ বছর হিসেবে অনেক কিছুই বোঝার কথা, তবে এখনো সেই রকম বুদ্ধির বিকাশ ঘটেনি। ইমদাদ কে এভাবে বসে পড়তে দেখে ভাইয়ের জন্য চিন্তা হলো।

“ভাইয়া, কি হয়েছে তোমার?”

ইমদাদ ইকবাল কে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,

“আমি তোকে বলেছিলাম না তোর তিন ভাই বোন ছাড়া আর কারো সাথে কোথাও যাবি না। কেন এসেছিস এই বাড়িতে? আমিতো তোকে নিষেধ করেছিলাম এই বাড়িতে আসতে। ভাইয়ার কথা কেন শুনিস না?”

কথাটা বলে ইমদাদ ছেড়ে দিল ইকবাল কে। ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে চুমু খেল ইমদাদ। ইকবাল আলতো হেসে বলল,

“তুমিই তো আসতে বলেছিলে আমায় এখানে। আমায় ফুপি নিয়ে এসেছি। বলেছিলো তোমার আসতে নাকি অনেক দেরি হবে, সেজন্য তুমি নাকি বলেছো আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসতে। আমি তো সেজন্য এসেছি। কিন্তু তুমি এত তাড়াতাড়ি চলে এলে যে ভাইয়া?”

“রোকসানা ফুপি নিয়ে এসেছে তোকে এখানে? বলেছে আমি আনতে বলেছি?”

“হ্যাঁ। জানো, তুমি তো শুধু শুধু ভয় পেতে। এই বাড়ির সবাই খুবই ভালো। বড় আম্মু, ফুপি, দাদি, দাদু এরা সবাই আমায় অনেক ভালোবেসেছে। অনেক কিছু খেতেও দিয়েছে আমায়। বড় আম্মু বলেছে আমি যা যা খেতে ভালোবাসি দুপুরে সব রান্না করে দেবে। আমি তো এখন থেকে রোজ এই বাড়িতে আসবো। তোমরাও আমার সাথে এসো ঠিক আছে ভাইয়া?”

অনেক কিছুই বুঝলো ইমদাদ ইকবালের কথায়। সে সাথে এটাও বুঝলো ওর ভাইটাকে ছোট আর সরল পেয়ে সরদার বাড়ির লোকজন অভিনয় একবারে জমিয়ে ফেলেছে।

ওদের পিছন পিছন যে ইয়াসমিনও এই বাড়িতে আসবে সেটা জানতো না ইমদাদ। ইয়াসমিন কে এখন এই বাড়িতে আসতে দেখে একটু মনঃক্ষুণ্ন হলো, তবে কিছু বলল না। ইকবালকে ইয়াসমিনের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালো কামাল সরদারের। বেশ শান্ত গলায় বলল,

“আপনি তো আমাদের নিজের দাদু। আমরা তো আপনারই ছেলের র’ক্ত, আপনার নিজের নাতি নাতনি। তাহলে আমাদের প্রতি আপনার দয়া হয় না কেন? আমাদের প্রতি আপনার ভালোবাসা আসে না কেন বলতে পারেন?”

কামাল সরদার গম্ভীর গলায় উত্তরে বললেন,

“তুমি জানো তার কারণ।”

“কি ভেবেছেন আমার দুর্বলতায় আঘাত করে আমাকে নিজেদের গোলাম বানাবেন? ইমদাদ আপনাকে একবার ছাড় দেবে, সর্বোচ্চ হলে দুই বার ছাড় দেবে কিন্তু তিনবারের বার ছেড়ে দেবে না। আমার দুর্বলতা খুঁজতে আসবেন না, আমি সরাসরি আপনার হৃদপিণ্ডে আঘাত করবো। এমন অবস্থা করবো আপনার কামাল সরদার যে, ইমদাদের নাম মুখে নিতেও ভয় পাবেন আপনি।”

ইমদাদের মনে হলো ওর আর এখানে থাকার কোন প্রয়োজন নেই। ইকবাল আর ইয়াসমিনের হাত ধরে বেরিয়ে যেতে ধরলে পিছন থেকে কামাল সরদারের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে। যিনি ঠান্ডা কন্ঠে হুমকি দিলেন ইমদাদ কে।

“কলির পিছু ছেড়ে দাও। কলি সরদার বাড়ির একমাত্র মেয়ে, আমাদের সম্মান। ওর দিকে হাত বাড়িয়ো না। নয়তো আমাদেরও তোমার সম্মানের দিকে হাত বাড়াতে হবে।”

ইমদাদ পিছনে ফিরে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“ভেবেছিলেন আমায় ভয় দেখাবেন, অথচ আপনি আমার জেদ আরো দশ গুণ বাড়িয়ে দিলেন। খুব শীঘ্রই আপনার সম্মান আমার পায়ের নিচে থাকবে। বাকি রইল আমার সম্মান, গুন্ডাদের আবার সম্মান হয় নাকি? আমাকে গুন্ডা বানিয়েছেন, তবে গুন্ডাদের যে কাজ সেটাই করব। আপনাদের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে ছাড়বো।”

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প