অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ৪

🟢

“আরে বাহ! সময় মত চলে এসেছেন। গুড জব।”

আফসানার কথার প্রেক্ষিতে ইমদাদ ঘড়িতে একবার সময়টা দেখে নিয়ে মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলে আফসানা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমরা নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই চলে এসেছিলাম ম্যাডাম। কিন্তু আপনি এক ঘন্টা ছয় মিনিট তেরো সেকেন্ড লেট করেছেন। আসলে আপনার থেকেই তো জেনেছিলাম সময়ের মূল্য সম্পর্কে, সেজন্য আপনাকে মনে করিয়ে দিলাম।”

আফসানার বুঝতে বাকি রইলো না যে ইমদাদ ওকে সময়ের মূল্যটা বলল না, বরং খোঁচা দিলো। তূর্যও বোধহয় বুঝতে পারল ঠিকই, তবে এখানে আসার আগেই আফসানা ওকে কড়া গলায় বলে দিয়েছে যে আফসানা যখন কথা বলবে তখন তূর্য যেন একটা শব্দও উচ্চারণ না করে। বিশেষ করে ইমদাদকে অপমানিত করার মতন কোনো কথা যেন না বলে।

ইমদাদের সাথে আর কথা না বাড়িয়ে আফসানা গিয়ে চেয়ারে বসে বলল,

“প্রেজেন্টেশন তৈরি করেছেন নিশ্চয়ই?”

“ইয়েস ম্যাডাম।”

“তাহলে শুরু করুন।”

ইমদাদ ল্যাপটপটা অন করতে ধরলে আফসানা ওকে বাঁধা দিয়ে বলল,

“আচ্ছা প্রেজেন্টেশনটা শুরু করার আগে আমার কিছু প্রশ্ন ছিল। আপনাদের কোয়ালিফিকেশন কি?”

কোয়ালিফিকেশনের কথাটা শুনে ইমদাদের মুখটা শুকিয়ে গেল। নিজের পড়াশোনা নিয়ে ইমদাদের কখনো কোন সমস্যা ছিল না, তবে ইমদাদ বুঝতে পারছে আজ এইখানে সমস্যা হবে। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে সাদিক বলে উঠলো,

“ম্যাডাম আমি এমবিএ করছি।”

“ওকে, ভেরি গুড। আর আপনি?”

ইমদাদ একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল,

“রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্সে তিন বছর পড়া হয়েছে।”

“কিন্তু আমার জানা মতে অনার্স কমপ্লিট করতে তো তিন বছরে বেশি সময় লাগে রাইট?”

“একদম ঠিক বলেছেন। আমি পড়াশোনা শেষ করিনি। আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা এই অব্দি।”

“আপনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাবজেক্ট থেকে সরাসরি বিজনেস আইডিয়া নিয়ে এসেছেন আমার কাছে? আপনার আদৌও বিজনেস সম্পর্কে কোন নলেজ আছে, কোন এক্সপিরিয়েন্স আছে আপনার?”

ইমদাদ আলতো হেসে বলল,

“কোন কাজ শুরু না করলে অভিজ্ঞতা হবে কি করে? কেউ তো কোন কিছুর অভিজ্ঞতা নিয়ে জন্ম নেয় না তাই না?”

ইমদাদের কথায় যুক্তি খুঁজে পেল আফসানা। তবে এখনো একটা প্রশ্ন আফসানার মনে থেকেই গেল। সেটা হলো পড়াশোনা শেষ করেনি কেন।

“ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আপনি পড়াশোনা শেষ করেননি কেন জানতে পারি?”

মনের ভেতরে তো ইমদাদের আ'গু'ন জ্ব'ল'ছে, তবে সেটা প্রকাশ করতে পারলো না। আজ ইমদাদ বড়ই অসহায়। যথাসম্ভব শান্ত গলায় বলল,

“কারণটা না জানালে কি সমস্যা হতে পারে?”

“হতেই পারে।”

“আর্থিক সমস্যা ছিল। ছোট ভাই বোনদের পড়ানোর দায়িত্ব আমার কাঁধে। সারাদিন কাজ করে বাড়ি ফিরে আবার বই নিয়ে বসার মতন ধৈর্য আমার নেই। আর এমনিতেও পড়াশোনা করে এদেশে খুব বেশি কিছু করা যায় না। অনেক উচ্চশিক্ষিত ছেলে কেও দেখেছি ফুটপাতে দোকান দিয়ে বসতে। তাই আমি আর খুব বেশি আগ্রহ খুঁজে পাইনি এই বিষয়টার মাঝে।”

বেশ আশ্চর্য হলো আফসানা ইমদাদের কথাটা শুনে। ছোট ভাই বোনকে পড়ানোর জন্য নিজের পড়াশোনা ছেড়ে দিল। ছেলেটা তার মানে নিশ্চয় অনেক কষ্ট করে।

আফসানার মনে হলো আর ইমদাদ কে কোন প্রশ্ন করা ঠিক হবে না।

“আচ্ছা ঠিক আছে শুরু করুন।”

প্রেজেন্টেশনের মাঝেই ইমদাদের ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ করে। ফোনটা সাইলেন্ট করতে ভুলে গিয়েছিল। দুঃখ প্রকাশ করে কলটা কেটে দেওয়ার জন্য ফোনটা হাতে নিতেই দেখল ইয়াসমিনের নাম্বার থেকে কল এসেছে। এই কলটা তো কাটতে পারবে না ইমদাদ। ফোনটা রিসিভ করার আগে আফসানা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ম্যাডাম, দুই মিনিট সময় লাগবে। আমার বোন কল করেছে, রিসিভ না করে আমি থাকতে পারবো না।”

আফসানা ভেবেছিল ওর থেকে বোধহয় অনুমতি চাইছে ইমদাদ। অনুমতি দিতেও ধরেছিল, তবে খেয়াল করলো ওর অনুমতি পাওয়ার আগেই ইমদাদ একটু দূরে সরে দাঁড়িয়েছে। নিজের ভাবনার উপরে নিজেই বিরক্ত হলো আফসানা। সেই সাথে এটাও বুঝলো ছেলেটাকে যতটা ঘাড়ত্যাড়া ভেবেছিল তার থেকেও অনেক বেশি ঘাড়ত্যাড়া।

ইমদাদ ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,

“তাড়াতাড়ি বল ইয়াসমিন, ব্যস্ত আছি।”

অপর পাশ থেকে ইয়াসমিন ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“ভাইয়া ইমাদের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। তুমি তাড়াতাড়ি এসো। ওষুধ কেনার জন্য টাকা লাগবে। আমার কাছে যা ছিল শেষ হয়ে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি এসো তুমি ভাইয়া।”

ইমদাদ উদ্বিগ্ন গলায় বলল

“কিভাবে এক্সিডেন্ট হলো? কেমন আছে ও এখন?”

“আমি কিচ্ছু জানি না। তুমি আগে এসো। আমার মাথা কাজ করছে না।”

“তুই ফোন রাখ, আমি আসছি। আর শোন, আমি তোর নাম্বারে টাকা পাঠাচ্ছি। আমি না আসা অব্দি তুই ওই টাকা দিয়ে কাজ চালা।”

ইমদাদ ফোনটা রেখে সোজা বাইরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। সাদিক ওর হাত টেনে ধরে বলল,

“কোথায় যাচ্ছিস? আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি।”

“আমার ভাইয়ের এক্সিডেন্ট হয়েছে। যেতেই হবে এখন। তুই এদিকটা সামলা।”

“কিন্তু আমি তো প্রস্তুতি নেইনি। সব এলোমেলো করে ফেলব।”

ইমদাদ কিছু বলতে যাবে তার আগে আফসানা বলে উঠলো,

“আপনার কি মনে হয় আমি এখানে মজা করার জন্য এসেছি? আমি আপনাকে বিশ মিনিট সময় দিয়েছি আপনার অনুরোধে, আর আপনি সেই সুযোগ কাজে না লাগিয়ে চলে যাচ্ছেন? আপনার কি মনে হয় আবার এই সুযোগটা আপনি পাবেন? কালকেই তো বলছিলেন অনেকগুলো জীবনের ব্যাপার, এরপর সেই জীবন গুলোর কি হবে ভেবে দেখেছেন একবারও? আপনি প্রেজেন্টেশনটা কমপ্লিট করুন।”

ইমদাদ সরাসরি আপত্তি জানিয়ে বলল,

“আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আমার কাছে আমার ভাই আগে। যদি আমার এই ব্যবসার স্বপ্নটা চিরদিনের মতন নষ্ট হয়ে যায় তাতেও আমি রাজি। আর এখন আমার একটা কথা মনে হচ্ছে কি জানেন, আপনার সম্বন্ধে যা শুনেছিলাম সেই সব ভুল। আপনি নাকি খুব দয়ালু, ভালো মনের মানুষ অথচ আপনি এতটাই ভালো মনের মানুষ যে আমার ভাইয়ের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে সেই কথাটা শোনার পরেও আমাকে আপনার সময়ের জ্ঞান দিচ্ছেন। বড়লোক হবেন ভালো কথা, তবে তার আগে মানুষ হতে শিখুন। সাদিক চলে আয়। ওনার থেকে সাহায্য চেয়েছি, তাই বলে ভিক্ষে না।”

কথাটা বলে ইমদাদ আর সেখানে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না, চলে গেল। সাদিক পড়লো মহা বিপদে। কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। তবে সাদিকের পক্ষে এখন সবটা সামলানো সম্ভব না। আফসানা ওকে আর সময় দেবে কিনা তাও জানে না।

তাই ভাবলো অপমান করার আগে সম্মান নিয়ে বেরোনো ভালো এখান থেকে। ইমদাদের পিছন পিছন সাদিকও বেরিয়ে গেল।

এদিকে আফসানার এখনো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে ইমদাদ ওকে এভাবে অপমান করে রেখে গেল। যেখানে আফসানা এর অফিসে কারো সাহস নেই ওর চোখের চোখ রেখে কথা বলার, সেখানে একটা বাইরের ছেলে এভাবে অপমান করে গেল। অমানুষ বলে গেলে আফসানা কে। ছেলেটা শুধু ঘাড় ত্যাড়াই না, অত্যন্ত বেয়াদবও।

_________

“কাল থেকে আর সাইকেল নিয়ে যেতে হবে না। রিক্সা করে যাবি।”

ইমাদ দুর্বল গলায় ইমদাদ কে বলল,

“না ভাইয়া সমস্যা নেই, আমি চলে যাব সাইকেলে। আজ রাতের মধ্যেই সুস্থ হয়ে যাব আমি, তুমি চিন্তা করো না। শুধু শুধু আজ আমার জন্য অনেকগুলো টাকা নষ্ট হলো তাই না?”

ইমদাদ হালকা করে একটা ঝাড়ি মেরে বলল,

“তোকে আমি এসব ভাবতে বলেছি? দুদিন পরে পরীক্ষা, তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে পড়তে বস। রেজাল্ট খারাপ হলে কিন্তু মা'র'বো। আর এখন একটু আরাম কর। আমি আসি।”

ইমদাদ চলে যেতে নিয়েও আবার থেমে গেল। কি মনে করে যেন পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে ইমাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আচ্ছা ইমাদ, যে বাইকটা মে'রে দিয়েছিল তোকে তুই বাইকের নাম্বার দেখেছিলি বা লোকগুলোর চেহারা মনে আছে?”

হঠাৎ করে ইমাদ কেমন যেন ঘাবড়ে গেল। বোধহয় ভয় পেলো কিংবা চিন্তায় পড়ল। ইমাদ কে এভাবে ঘাবড়ে যেতে দেখে ইমদাদের কপালে সুক্ষ্ম ভাজ সৃষ্টি হলো। সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করল,

“কিছু লুকোতে চাইছিস নাকি আমার থেকে তুই?”

বিজ্ঞাপন

ইমাদের ধ্যান ভাঙল। তড়িঘড়ি করে বলল,

“না ভাইয়া। কি লুকোতে চাইবো? আমি আসলে দেখতে পাইনি বাইকের নাম্বারটা। বাইকে কে ছিল সেটাও জানি না।”

ইমদাদ সন্দেহি গলায় বলল,

“সত্যি জানিস না নাকি লুকােতে চাইছিস? আজ নয়তো কাল কিন্তু আমি ঠিকই খুঁজে বের করব ইমাদ।”

“সে তুমি খুঁজে বের করতেই পারো, তবে আমি চিনিনা ওদের সত্যি বলছি। আর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করেনি। ওদেরকে খুঁজে বের করারই বা কি দরকার।”

“সেসব আমি বুঝে নেব। তুই বিশ্রাম কর।”

কথাটা বলি ইমদাদ ইমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ভালোই বুঝতে পারল যে ইমাদ কিছু লুকোনের চেষ্টা করছে ওর থেকে।

নিজের ঘরে ফ্রেশ হতে গেল। ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই কলিং বেল বাজার আওয়াজ পেল। ইমদাদ জানে ইয়াসমিন রান্না ঘরে আছে ব্যস্ত, সে জন্য নিজেই গেল দরজা খুলতে।

দরজা খুলে কলির হাসি হাসি মুখটা দেখতেই ইমদাদ ভরকালো। চমকে উঠে বলল,

“তুই এখানে কেন এসেছিস?”

কলি হাস্যজ্জ্বল গলায় বলল,

“তোমায় দেখতে এলাম। আসলে সারাদিন তোমার কোন খোঁজ পাইনি তো তাই মনটা কেমন যেন করছিল। তাই ভাবলাম দেখা করে যাই।”

ইমদাদের মাথার উপর দিয়ে গেল কলির বলা কথাগুলো। ভাবলো মেয়েটার মাথার তার কেটে গেছে, নয়তো একেবারে পাগল হয়ে গেছে। ইমদাদ কে নিজের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে কলি ওর দিকে একটা টিফিন বক্স বাড়িয়ে দিয়ে ফের বলল,

“মা পায়েস রান্না করেছিল আমার জন্য, তবে আমার গলা দিয়ে নামছিল না খাবারটুকু। আসলে তুমি সারাদিন বাইরে কি খাচ্ছো না খাচ্ছো সেই চিন্তায় আমার রাতের ঘুম উড়ে গেছে। তাই তোমায় দিতে এলাম। স্বামী না খেলে কি স্ত্রীর গলা দিয়ে খাবার নামে বলো?”

ইমদাদ এবারে রাগী গলায় বলল,

“মাথা যদি খারাপ হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে পাগলা গারদে না গিয়ে আমার বাড়িতে এসেছিস কেন? অযথা আমার মাথা খাবি না। চোখের সামনে থেকে দূর হ।”

কথাটা বলে ইমদাদ দরজা বন্ধ করে দিতে ধরলো, তবে কলি ওকে দরজাটা বন্ধ করতে দিল না। বরং এবারে কলি ঘরের ভিতরে চলে এলো। ইমদাদের রাগ আরো বাড়লো। কলির দিকে তেড়ে এসে বলল,

“বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু কলি। তোকে আমি যেতে বলেছি।”

সবেমাত্র ইমদাদ হাত মুখ ধুয়ে বেরিয়েছিল। মুখটা এখনো ঠিক করে মোছাই হয়নি। কপালে বিন্দু বিন্দু পানির ফোটা দেখে কলি ভাবলো বোধহয় ঘেমে গেছে। ওড়না দিয়ে ইমদাদের কপালের পানিটুকু মুছে দিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

“তুমি তো ঘেমে গেছো। বাড়িতে তোমার যত্ন করার মতন কেউ নেই তাই না? হ্যাঁ গো, বলছিলাম খুব বেশি খাটাখাটনি করছো আজকাল। কেন এত কষ্ট করছো? তোমার বউয়ের তো অত বেশি চাহিদা নেই। তোমার বউ অল্পতেই খুশি।”

ইমদাদ কলির হাতটা সরিয়ে দিয়ে রাগে চিৎকার করে উঠে বলল,

“থাপ্পড় খাবি? চাইছিস কি আমি রেগে গিয়ে তোর গায়ে হাত তুলি? তখন তো ন্যাকা কান্না করে পুরো মহল্লা জড়ো করে ইমদাদের উপরে দোষ দিবি। তোকে আমি বলেছি আমার ঘাম মুছে দিতে? তোকে আমি বলেছি আমার জন্য চিন্তা করতে? কেন এসেছিস আমার বাড়িতে? এবার আমাকে মা'র'বি? তোর বাপ ভাইয়ের আমার ভাইকে মে'রে শান্তি হয়নি সেজন্য এবার তুই আমাকে মা'র'তে এসেছিস?”

ইমদাদের বলা শেষের কথাটায় কলি ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“কাকে মে'রে'ছে আমার বাপ ভাই?”

“কেন জানিস না? তোর বাপ ভাইয়ের তো ক্ষমতা নেই যে ইমদাদের সাথে এসে লড়বে, সেজন্য আঘাত করেছে আমার ছোট ভাইটাকে। ওদেরকে বলে দেস যদি সাহস থাকে তাহলে যেন ইমদাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলে। আমার ভাইয়ের ওপরে যেন চোখ না দেয়। চোখ উপড়ে ফেলে রেখে দেবো। আর তোকে শেষ বারের মতন বলছি চলে যা এখান থেকে।”

কলি ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

“কেন যাব? এটাতো আমার স্বামীর বাড়ি তাই না? তুমি তো সবার সামনে বলেছিলে যে বিয়ে করেছো আমাকে, তাহলে চলে যেতে বলছো কেন? আমার অধিকার আছে এই বাড়িতে থাকার।”

ইমদাদ দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,

“তুই খুব ভালো করেই জানিস আমাদের বিয়ে হয়েছে কি হয়নি।”

“জানি তো। কিন্তু তোমার সেই মিথ্যের জন্য আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল। আমার বিয়েটা ভেঙে গেল। এখন আমার বিয়ে দিতে চাইছে শাহিনের সাথে। তোমার মনে হয় আমি ওকে বিয়ে করবো? আর এই বিয়েটা থেকে বাঁচার জন্য আমার তোমাকে দরকার। সেজন্য বিয়েটা সত্যি হোক কিংবা মিথ্যে আমার এই অজুহাতটাই লাগবে। তুমি যদি এখন স্বীকার করে নাও আমি তোমার বউ তাহলে ভালো। চিন্তা করো না কোন একদিন তোমার পিছু নিশ্চয়ই ছেড়ে দেবো। আর যদি সবাইকে সত্যিটা বলার চেষ্টা করছো তাহলে কিন্তু ফেঁসে যাবে। বলে দেবো বিয়ে করে এখন অস্বীকার করছো।’

ইমদাদ তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“তোর এসব হুমকিতে ইমদাদ ভয় পায় না। যা ইচ্ছে কর।”

“যা ইচ্ছে সেটাই তো করছি। তোমাকে বলেছিলাম না তোমার জীবন ধ্বংস করব। একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো, তুমি আমার জীবন নষ্টের জন্য দায়ী। তাই আমার জীবনটা আবার গোছানোর জন্য তোমাকেই লাগবে। আমাকে তুমি সাহায্য করবে। হয় সাহায্য করবে নয়তো ফাঁসবে।”

ইমদাদ পাত্তাই দিল না কলির কথাকে, শুধু হাসলো। ইমদাদকে হাসতে দেখে কলি ফের বলে উঠলো,

“হালকা ভাবে নিও না আমায়। হঠাৎ করে তোমার বাড়িতে এসে যেদিন উঠবো, সেদিন মজা বুঝবে।”

কথাটা বলে কলি চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে ইমদাদ ওর হাত টেনে ধরলো। ইমদােদর স্পর্শ অনুভব করতেই কলির সারা শরীর যেন আ'গু'ন জ্ব'লে উঠলো। বিরক্তিকর গলায় বলল,

“হাত ছাড়ো আমার।”

“কেন ছাড়বো? তুই তো আমার বউ। তোকে স্পর্শ করার সম্পূর্ণ অধিকার আছে আমার। আরেকটা কথা কান খুলে তুই শুনে রাখ, শুধু বউ বউ বলে চেঁচালে কিন্তু হবে না। বউ হলে আমার ঘরে আমার সাথে থাকতে হবে। পারবি তো থাকতে?”

কলি একটু ঘাবড়ালো। খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে বলল,

“সরদার বাড়ির মেয়েকে তুমি সামলাতে পারবে কিনা সেটা আগে ভেবে দেখো। একবার যদি আমার পা এই বাড়িতে পড়ে, তবে আ'গু'ন লাগিয়ে ছাড়বো।”

_________

“তোর মাথা কি একেবারে খারাপ হয়ে গেছে কলি? ইমদাদ ভাইয়ের বউয়ের পরিচয় গ্রহণ করবি তুই? আর তুই যদি ইমদাদ ভাইয়ের বউ হয়ে যাস তাহলে আমার কি হবে?”

মাইশা হতাশার সাথে কথাগুলো বলল। কলি বিরক্তিকর গলায় বলল,

“ওই হনুমানের বৌ হওয়ার এত শখ তোর?”

মুহূর্তের মাঝে মাইশার অভিব্যক্তি বদলে গেল। চোখ মুখে রাগী ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,

“খবরদার আমার ইমদাদ ভাই কে কিছু বলবি না। সমস্যা তোর পরিবারের, আমার ইমদাদ ভাই যথেষ্ট ভালো।”

“কে কতটা ভালো সেটা আমার জানা হয়ে গেছে মাইশা। নতুন করে আমি আর কিছু জানতে চাই না। তার আগে তুই বল, তুই কি আমায় সান্ত্বনা দিতে এসেছিস নাকি আরো খোঁচাতে এসেছিস? ইমদাদের হয়ে কথা বলার হলে চলে যা এখান থেকে। দরকার নেই আমার কাউকে।”

মাইশা বুঝলো কলি রেগে গেছে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,

“আরে না না, আমি তো তোর দলেই। কিন্তু একটা কথা বলতো কলি, তুই তো ইমদাদ ভাইকে সহ্য করতে পারিস না। আবার তোদের বিয়েটাও নাকি হয়নি।”

মাইশা কথাটা বলতেই কলি ওর মুখ চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,

“একদম চুপ। এই কথাটা আর ভুলেও মুখে আনবি না। আমি একদিন বলেই ভুল করেছি।”

কথাটা বলে কলি মাইশার মুখ থেকে হাতটা সরিয়ে নিয়ে নিজেও ফিসফিস করে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে আর বলবো না। কিন্তু বলনা তুই কেন ইমদাদ ভাইয়ের বউ সাজার জন্য এত তাড়াহুড়ো লাগিয়ে দিয়েছিস?”

কলি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“শাহিনের থেকে বাঁচার এই একটা উপায়ই আছে আমার কাছে। ইমদাদ ভাইই আমায় বাঁচাতে পারে। আমি একটা কথা মানি মাইশা, ইমদাদ ভাই যেমনি হোক না কেন শাহিনের থেকে ভালো আছে। শাহিনের সাথে বিয়ে হলে আমি কোনদিনও মুক্তি পাব না, কিন্তু যেহেতু আমার আর ইমদাদ ভাইয়ের বিয়েটা হয়নি আমি এখন বউ বউ বললেও কোন একদিন ঠিক মুক্তি পেয়ে যাব। আর আমি জানি ইমদাদ ভাই জোর করে আমায় নিজের কাছে বেঁধে রাখবে না। কারণ ইমদাদ ভাই আমায় সহ্য করতে পারে না।”

“মানে মোটকথা শাহিনের হাত থেকে বাঁচার জন্য ইমদাদ ভাইয়ের বউ সাজতে হবে তাইতো? তার মানে সত্যি সত্যি তো তুই আর বিয়ে করছিস না?”

কলি কন্ঠে একরাশ অনীহা প্রকাশ করে বলল,

“কোনদিনও না। ওর বউ আমি হতে যাবো কেনো?”

মাইশা মুখ ভেঙচিয়ে বলল,

“দেখিস, বউ বলতে বলতে আবার যেন সত্যি বউ ভাবতে শুরু করিস না নিজেকে। আমার ইমদাদ ভাই এমনই, যে কেউ ভালোবেসে ফেলবে।”

কলি তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“কলির এতটাও খারাপ দিন আসেনি যে ইমদাদ কে ভালোবাসতে হবে। ইমদাদ কে কলি ভালোবাসবে এমন দিন কখনো আসবে না।”

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প