রাতের খাবার খাওয়ার জন্য নিচে নামলো কলিও। দেখলো ইতোমধ্যে কলি বাদে বাকি সবাই এসে পড়েছে। অবশ্য কলি দেরিতে আসার জন্য যে কারো কিছু যায় এসেছে, বা কেউ ওর জন্য অপেক্ষা করছে তেমনটা না। কেননা আগে ছেলেরা খাবে তারপরে মেয়েরা খেতে বসতে পারবে।
কলি যখন নিচে নামলো তখন কামাল সরদার খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে তিনি নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য উদ্যত হচ্ছিলেন। কলিকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলে কলি বলে উঠলো,
“ইকবাল কে কেন নিয়ে এসেছিলে আজ তোমরা?”
কলির প্রশ্নটা কানে যেতেই থেমে গেলেন কামাল সরদার। উপস্থিত বাকিদের মনোযোগও এসে পড়লো কলির ওপরে। কামাল সরদার ঘাড় ঘুরিয়ে কলির দিকে তাকিয়ে একটু অবাক এর সুরে বললেন,
“আমার কাজের কৈফিয়ত কি এখন আমি তোমায় দেব? তুমি কৈফিয়ত চাইছো আমার থেকে কোন সাহসে? করিম, তোমার মেয়ে কি এ বাড়ির শিক্ষা ভুলে গেছে?”
কলি নিজেকে যথা সম্ভব শান্ত রেখে ফের কামাল সরদার কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এখানে শিক্ষা ভুলে যাওয়ার তো কিছু নেই দাদু। আমি একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন করেছি তোমাকে যে কেন ইকবাল কে ডেকেছিল এই বাড়িতে।”
কামাল সরদার এবার একটু চটে উঠে বললেন,
“সেই কৈফিয়ত তোমাকে দেবো না আমি।”
কথাটা বলে তিনি চলে যেতে ধরলে কলি ফের বলে উঠলো,
“গতকাল ইমাদের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল জানো? ইমদাদ ভাই বলছিল সেই অ্যাক্সিডেন্টের পেছনে নাকি আমার বাপ, চাচাদের হাত আছে কথাটা কি সত্যি?”
বসার ঘরে আরেক দফা বিস্ফোরণ ঘটলো। কলির থেকে দূরে দাঁড়ানো শাম্মি ভয়ে গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়ের দুঃসাহস দেখে তিনি তব্দা খেয়ে যাচ্ছেন। হুট করে যে মেয়েটার কি হয়ে গেল কে জানে। বড়দের মুখেমুখে তর্ক করেই যায়।
এতক্ষণ চুপ ছিলেন করিম সরদার, তবে এবার আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। মেয়ের দুঃসাহসিকতায় তিনি অবাক না হয়ে পারছেন না। বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হুঙ্কার ছেড়ে কলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“নিজের বাপ চাচা কে কি তোমার ওই ছেলের মতন গুন্ডা বদমাশ মনে হয়?”
কলি সন্দেহী গলায় প্রশ্ন করল,
“তাহলে ইমদাদ ভাই এতটা নিশ্চিত হয়ে কি করে আমায় কথাগুলো বলল? কেন বারবার তোমাদেরকেই দোষারোপ করছিলো?”
“তার কারণ ওর স্বভাব আমাদেরকে দোষারোপ করা। সরদার বাড়ির সম্পদের একটা কানা কড়িও যে ও পাবে না, সেজন্য হিংসায় জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই ভাবছে আমাদেরকে দোষারোপ করে আমাদের বেকায়দায় ফেলে হয়তো কিছু লুটে নেবে।”
করিম সরদারের কথাটা কলির ঠিক পছন্দ হলো না। ইমদাদ যেমনই হোক না কেন, যত খারাপ গুণই থাকুক না কেন ওর মাঝে, কিন্তু সম্পত্তির লোভে কোন কিছু করতে পারেনা ইমদাদ। ও খুবই পরিশ্রমী একটা ছেলে। এবাড়ির এক দানা ভাতও যেখানে গ্রহণ করেনা, সেখানে কিনা সরদার বাড়ির সম্পত্তির লোভে ওদেরকে অযথা দোষারোপ করবে এটা হতে পারে না।
আবার নিজের পরিবারকে কি করেই বা ভুল বুঝবে কলি। ইমদাদও যে একেবারে ধোয়া তুলসি পাতা তেমনটা তো না। বিনা অপরাধে তো কলির জীবনটা শেষ করে দিল, তবে তো বিনা কারণে বাকিদেরকেও দোষারোপ করতেই পারে।
কলির এসব ভাবনার মাঝে কামাল সরদার বলে উঠলেন,
“তোমায় এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। মেয়েদের এসবের মাঝে নাক গলানোর প্রয়োজন নেই। নিজের বিয়ের কথা ভাবো। বিয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো।”
হঠাৎ করে বিয়ের কথাটা শুনে চমকে উঠলো কলি। বিয়ের কথা তো ভুলেই গেছিলো। ডাইনিং টেবিলে তখন শাহিনও উপস্থিত। বিয়ের কথাটা শুনে ওর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। কলি তাকালো শাহিনের দিকে। দেখলো শাহিনও ওর দিকেই তাকিয়ে হাসছে। ওর হাসিটা দেখে কলির কেমন যেন রাগ হলো।
পৃথিবীতে মনে হয় শাহিনই একমাত্র ছেলে যাকে দেখলেই কলির কোন কারণ ছাড়া রাগ উঠে যায়। কি করে কলির বিয়ে শাহিনের সাথে ঠিক করতে পারে ওর পরিবার?
তবে কলি ঠিক করেছে ওর পরিবার যাই বলুক না কেন ও শাহিনের সাথে বিয়েটা মেনে নেবে না। অন্য কারো সাথে যদি বিয়ে দেওয়ার কথা বলতো, তবে না হয় একবার ভেবে দেখতো। তবে শাহিনের সাথে বিয়ে অসম্ভব।
কামাল সরদারের কথায় আপত্তি জানিয়ে বলল,,
“অসম্ভব। আমি তোমাদেরকে আগেও বলেছি, এখনো বলছি আর ভবিষ্যতেও এটাই বলবো যে আমি শাহিনকে বিয়ে করব না। ওকে বিয়ে করার থেকে আমার ম’রে যাওয়া ভালো।”
কলি কথাটা বলতেই করিম সরদার এবারে মেয়ের গায়ে হাত তোলার জন্য উদ্যত হলেন। তবে কামাল সরদার ওনাকে থামিয়ে দিলেন। ইশারায় ছেলেকে শান্ত হতে বলে নিজে কলির মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়িয়ে বেশ শান্ত গলায় বললেন,
“তবে একটা কথা মনে রেখো, যদি তোমার জন্য আমাদের বাড়ির সম্মান নষ্ট হয় তবে তোমার ইচ্ছাটাই পূরণ হবে। যেই মেয়ে নিজের পরিবারের সম্মানের কথা ভাবেনা তাকে নিজের হাতে মা’র’তেও আমায় দু বার ভাবতে হবে না।”
কথাটা বলে কামাল সরদার নিজের ঘরে চলে গেলেন। একে একে ওনার পেছনে করিম সরদার, কালাম সহ বাড়ির বাকি ছেলেরাও চলে গেল সেখান থেকে।
ছেলেরা সেখান থেকে চলে যেতেই শাম্মি এগিয়ে এসে কলির দুই বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে ভয়ার্ত গলায় বললেন,
“কেন মুখে মুখে তর্ক করিস? আমি নিষেধ করেছি না তোকে? নিজের জীবনের ভয় নেই তোর?”
কলি মলিন হেসে বলল,
“যে জীবন তোমরা আমায় বেছে নিতে বলছো এমনিতেও সে জীবন রাখার কোন ইচ্ছে আমার নেই মা।”
“কি সমস্যা শাহিনকে বিয়ে করলে? সারা জীবন আমার চোখের সামনে থাকবি তুই। পুরুষ মানুষ এমনই হয়। তোর বাপ, চাচাদের দেখছিস না? তাই বলে কি ওদের ঘর করছি না আমরা।”
কলি নিজের বাহু থেকে শাম্মির হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি ঘর করছো তার কারণ তোমার কাছে হয়তো আর কোন উপায় নেই, কিংবা তুমি এই জীবনটাই বেছে নিয়েছো। তুমি ব্রত করেছো এই বাড়ির মাটি কামড়ে পড়ে থাকার, কিন্তু আমি করিনি। আমার কাছে আরও অনেক উপায় আছে। আমি স্বেচ্ছায় এমন জীবন কোনদিনও গ্রহণ করবোনা। আর বাকি রইল শাহিনকে বিয়ে করার কথা, তো তোমাদেরকে শেষবারের মতন বলে দিচ্ছি আমি এমন একজন পুরুষকে বিয়ে করতে চাই যার ব্যক্তিত্ব আছে। শাহিনের মতন কাপুরুষ কে না।”
____________
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে কলি। মাথার ভেতর হাজারো চিন্তারা ঘুরপাক খাচ্ছে। ভয় আতঙ্ক সব জেকে বসেছে। ধীরে ধীরে যেন দিক দিশা হারিয়ে ফেলছে কলি। কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। কাকে বিশ্বাস করা উচিত, কাকে বিশ্বাস করা উচিত নয় সেই দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে খুব বাজে ভাবে ভুগছে। কে কলির বন্ধু আর কে কলির শত্রু সেই হিসেব যেন গুলিয়ে ফেলছে বারবার।
কলির এসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ করে তীব্র ব্যাথা অনুভব করলো। মনে হলো কেউ যেন খুব শক্ত করে ওর চুলের মুঠি ধরেছে।
ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো কলি। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখল শাহিন রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে এবং খেয়াল করলো ওর চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে আছে। কলি ব্যাথায় নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার? গায়ে হাত তুলছো আমার কোন সাহসে?”
শাহিন দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“নিচে সবার সামনে কি বলেছিলি আমি কাপুরুষ তাই না? আজকে তোকে সেটাই দেখাবো আমি পুরুষ নাকি কাপুরুষ?”
কথাটা বলে শাহিন কলিকে বিছানার উপর এক প্রকার ছুড়ে মা’র’লো। শাহিনের উদ্দেশ্যে যে ঠিক কতটা বিচ্ছিরি সেটা বুঝতে বাকি রইলো না কলির। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো দরজাটা খোলাই আছে। কলির মনে হলো এখন বাঁচার একটাই উপায়, যে করেই হোক বাইরে বেরোতে হবে।
বিছানা থেকে নেমে দৌড় দিতে ধরল, তবে সফল হতে পারল না। শাহিন খপ করে ওর হাতটা ধরে ফেলল। পাশের দেয়ালের সাথে কলিকে চেপে ধরে রাগে কটকটিয়ে বলল,
“আমায় বিয়ে করবি না? তোর এত বড় সাহস যে তুই আমায় প্রত্যাখ্যান করিস। আজ এমন ব্যবস্থা করব যে তুই আমাকে বিয়ে করার জন্য আমার পায়ে এসে পড়বি। তোর সম্মান, ইজ্জত সবকিছু আমার পায়ের নিচে থাকবে।”
ভয়ে কলির রুহ কেঁপে উঠলো। কলি চিৎকার করলো সাহায্যের জন্য, ভাইয়া বলে সাঈদ কেও ডাকলো। ওকে চেঁচাতে দেখে শাহিন ওর মুখ চেপে ধরলো।
কলি যখন সাঈদ কে ডাকল ঠিক তখনই দরজার সামনে থেকে একটা ছায়া সরে গেল। বলা যায় না সাঈদ যেকোনো সময় চলে আসতেও পারে। যদি এসে দরজার সামনে সেই ব্যক্তি কে সবকিছু দেখেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাহলে সমস্যা হয়ে যেতে পারে। যা হচ্ছে হতে থাক। তিনি চলে গেলেন।
ভয়ে কলির চোখ মুখ নীল বর্ণ ধারণ করলো। বুঝতে পারলো কলি, ও বোধহয় আর সাহায্য পাবে না। বাড়িতে সাঈদ আছে কিনা কে জানে। বাকিরা হয়তো কলির চিৎকারের আওয়াজ শুনেও আসবে না। কেউ হয়তো তেমন একটা পাত্তাও দেবে না।
কলির গাল বেয়ে দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। কলিকে কাঁদতে দেখে শাহিন পৈশাচিক আনন্দ পেল। ঠোঁটে ফুটে উঠল পৈশাচিক হাসি।
শাহিনের নজর পড়লো কলির গায়ের ওড়নার উপরে। নিজের নোংরা হাতের থাবাটা যেই না কলির ওড়নায় দিতে ধরলো অমনি কেউ একজন এসে শাহিনের হাত ধরে ফেলল।
শাহিন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলো সাঈদ দাঁড়িয়ে আছে। সাঈদের রক্ত চক্ষু দুটো দেখতেই শাহিন একটা শুষ্ক ঢোক গিললো। আপনা আপনি কলিকে ছেড়ে দিল।
শাহিনের থেকে ছাড়া পেয়ে কলি গিয়ে সাঈদের পিছনে নিজেকে আড়াল করে দাঁড়ালো। শাহিন নিজের হয়ে কিছু সাফাই গাইতে চাইলো তবে সাঈদ ওকে সেই সুযোগ দিল না। নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে শাহিনের নাক বরাবর একটা ঘুসি মা’র’ল। এক ঘুষিতেই শাহিনের নাক দিয়ে গলগল করে র’ক্ত বেরিয়ে এলো।
শাহিনের শার্টের কলার ধরে সাঈদ ওকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে আরো দু চারটে চ’ড় মা’র’লো। সামান্য কয়েকটা মা'রেই শাহিনের যেন অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। তারপরেও সাঈদের বিন্দুমাত্র কোন মায়া হলোনা। শাহিনকে মেঝের উপরে ফেলে বেশ কয়েকটা লা’থিও মা’রলো।
অবাক করার বিষয় হলো শাহিনের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে খুব তাড়াতাড়ি বাড়ির লোকজন চলে এলো সেখানে। অথচ কলি এতক্ষণ ধরে চেঁচাল একটা মানুষও এলোনা।
কাফিল গিয়ে সাঈদ কে আটকানোর চেষ্টা করলো। কালাম গিয়ে ছেলেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলো। কাফিলের একার পক্ষে সাঈদ কে আটকানো বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছিল বলে করিম সরদারও এসে ছেলেকে থামানোর চেষ্টা করলেন। যখন তিনি পারলেন না রাগারাগি করলেন, গালাগালি করলেন, ছেলেকে ধমক দিয়ে থামানোর চেষ্টা করলেন। একপর্যায়ে গিয়ে সাঈদ থামলো। করিম সরদারের দিকে তাকিয়ে রাগে চিৎকার করে উঠে বলল,
“এখন কেন এসেছেন এই ঘরে? ভাইয়ের ছেলের প্রতি দরদ উতলে পরছে আপনার, আর নিজের সন্তানের প্রতি মায়া মমতা নেই? কলি যখন চিৎকার করছিল তখন কোথায় ছিলেন আপনারা?”
করিম সরদার আমতা আমতা করে বললেন,
“কোন চিৎকার আমাদের কানে যায়নি। আর তাছাড়া আমরা ভেবেছিলাম এমনি হয়তো…...”
করিম সরদার কে নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে সাঈদ চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“কি এমনি? কলি কে কি আপনাদের পাগল মনে হয় নাকি ছোট বাচ্চা মনে হয় যে এমনি চেঁচামেচি করবে, কান্নাকাটি করে সাহায্যের জন্য আপনাদের ডাকবে? নাকি আমাকে ছোট বাচ্চা ভেবেছেন যে যা ইচ্ছে তাই বুঝিয়ে ছেড়ে দেবেন? দোষ ছিল আপনার। আপনি কলির মাকে ঠকিয়ে নিজের প্রথম স্ত্রীর কথা না জানিয়ে বিয়ে করে বাড়িতে এনেছিলেন। আর সবকিছু জানার পর আপনার দ্বিতীয় স্ত্রী যখন স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে তাহলে তার শাস্তি কলিকে কেন দিচ্ছেন? কলির প্রতি এত কিসের ঘৃণা আপনার?”
করিম সরদার চোখ গরম করে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলো সাঈদ।”
সাঈদ হুঙ্কার ছেড়ে বলে উঠলো,
“আমার মুখ সামলানোর আগে আপনি নিজেকে শোধরান। আর এই বাড়ির মুরুব্বি কোথায়? শ্রদ্ধেয় কামাল সরদার কোথায়? বাড়ির সম্মান নিয়ে যে উনি সারাদিন লাফালাফি করেন, চেঁচামেচি করে বেড়ান আর আজ যে বাড়ির সম্মানে হাত পড়ছিল ওনার টনক নড়েনি তাও? নাকি আজরাইল এসে ওনার জানটা বের করে নিয়ে চলে গেছে? নাকি উনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছেন নিজের ঘরে?”
রোকসানা বুঝলো পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে যাচ্ছে। সাঈদ রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। আর যদি বেশি কিছু বলে তাহলে সমস্যা হয়ে যেতে পারে। উনি গিয়ে সাঈদ কে চুপ করতে বললেন।
ওনাদের এসব তর্ক বিতর্কের মাঝেই হঠাৎ করে কানে শাম্মির আহাজারীর কণ্ঠ ভেসে এলো। সবাই একটু ভরকালো। তাকিয়ে দেখলে শাম্মি কলি কে ধরে আহাজারি করছে। কেউ কোন কারণ বুঝতে পারল না। কলি নিজেই আহাম্মক বনে গেছে। অবুঝের মতন প্রশ্ন করলো,
“কাঁদছো কেন এভাবে মা?”
শাম্মি আহাজারি করে বললেন,
“তোর মা বেঁচে থাকতে এটা তোর সাথে কি হয়ে গেল রে কলি? আমি বাড়িতে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তোর সম্মান বাঁচাতে পারলাম না। বাড়িতে এতগুলো মানুষ থাকার পরেও জা'নো'য়া'রটা তোর সম্মান এভাবে নষ্ট করলো।”
কলি চটপট দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“কি আজেবাজে কথা বলছো? তুমি যেসব ভাবছো তেমন কিছু হয়নি। ভাইয়া আগেই চলে এসেছিল।”
শাম্মি বিশ্বাস করলেন না মেয়ের কথা। আহাজারি করতে করতেই বললেন,
“আমি জানি মা তুই নিজের সম্মান বাঁচানোর চেষ্টা করছিস। কিন্তু মেয়ে মানুষের সম্মান যে খুবই হালকা। একটু টোকা লাগলেই যে সেটা নষ্ট হয়ে যায়। আমি কথা দিচ্ছি তোকে, এই কথা এই ঘরের বাইরে বের হবে না। কেউ জানবে না যে তোর সম্মান নষ্ট হয়েছে। তোর মা জানতে দেবে না কাউকে।”
“কি আজেবাজে কথা বলছো এসব? আমি বলছি তো তেমন কিছু হয়নি।”
শাম্মির কানে যেন কলির বলা কথাগুলো গেলোই না। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলেন। মেয়েকে জড়িয়ে ধরেই তিনি ক্রন্দনরত গলায় বললেন,
“এই বংশের উপর কারো অভিশাপ আছে রে মা। এই বাড়ির মেয়ে বউদের কপাল কখনো ভালো হয় না। কারো সম্মান নষ্ট হয়, নয়তো কারো জীবন নষ্ট হয়। তোর মায়ের জীবনটা শেষ হয়ে গেছে, তবে আমি কখনো ভাবিনি আমার মেয়ের সম্মানটা নষ্ট হয়ে যাবে এভাবে। তবে যাই হয়ে যাক না কেন, তুই যেন কখনো নিজের ক্ষতি করার কথা ভাবিস না। আমি জানি মেয়েদের কাছে নিজের জীবনের থেকেও নিজের ইজ্জতের মূল্য অনেক বেশি। তারপরও তোকে বলবো কখনো আ’ত্ম’হ’ত্যা’র কথা ভাবিস না।”
সাঈদের মাথাটা গরম হয়ে গেল শাম্মির কথাগুলো শুনে। রোকসানার থেকে হাত ছাড়িয়ে কলিদের দিকে এগিয়ে গিয়ে শাম্মির বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরে দাঁড় করিয়ে দাঁত পিষে বলল,
“আর একটা শব্দ উচ্চারণ করবে না তুমি। বেরিয়ে যাও ঘর থেকে।”
উপস্থিত প্রত্যেকে একটু ভরকালো সাইদের এমন ব্যবহারে। তবে বিশেষ কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না শাম্মির মাঝে। তিনি ফের ক্রন্দনরত গলায় সাঈদ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আজ আমার নিজেকে সত্যি ব্যর্থ মনে হচ্ছে রে বাবা। এই পরিবারে যে মেয়েই আসে না কেন তার কপালেই…...”
শাম্মি নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই সাঈদ ধমক দিয়ে বলে উঠলো,
“বেরিয়ে যেতে বলেছি তোমায়। এক্ষুনি চলে যাবে তুমি। যাও এখান থেকে।”
শাম্মি আবারো কিছু বলে উঠতে ধরলে সাঈদ ফের ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি যদি এক্ষুনি ঘর থেকে না বেরিয়েছো তবে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে মা। আর শুধু তুমি কেন সবাই বেরিয়ে যাবে এই ঘর থেকে।”
মেঝেতে তখনও শাহিন পড়ে আছে। জ্ঞান হারিয়েছে। কালাম আর তার স্ত্রী মিলে ছেলের জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছে। রোকসানা শাম্মি কে নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। এদিকে অনেক চেষ্টা করেও যখন কালাম ছেলের জ্ঞান ফেরাতে পারলেন না তখন নিজের বড় ভাইকে উদ্দেশ্য করে হুমকির স্বরে বললেন,
“যদি আমার ছেলের কিছু হয়েছে ভাই তবে তোমার ছেলে মেয়েদেরও কিন্তু আমি ছেড়ে কথা বলব না। একবার যখন এই বাড়ির ছেলের শরীর থেকে র’ক্ত ঝরেছে, তাহলে আবার ঝরবে।”
করিম সরদার কোন উত্তর দিতে পারলেন না। সাঈদ নিজের বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনার ভাইকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিন ওই জা'নো'য়া'রের পা যেন এই বাড়িতে আর না পড়ে। এবার ছেড়ে দিয়েছি, পরেরবার যদি ওকে আমি বাড়িতে দেখেছি প্রাণে বাঁচবে না কিন্তু।”
করিম সরদার চোখ গরম করে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এই বাড়ির ছেলে শাহিন। কোথায় যাবে ও? পাগলামি বন্ধ করো। তোমার বোনের জন্য পরিবারের মাঝে ফাটল ধরাতে চাইছো?”
“কিসের বা’লে’র পরিবার? স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছি আপনাকে ওর পা এই বাড়িতে পড়লে হয় ওর ঠ্যাং ভাঙবো নয়তো একেবারে কেটে ফেলে দেবো। এটা সাঈদের প্রতিজ্ঞা ওর নিজের কাছে আর নিজের বোনের কাছে।”
কথাটা বলে সাঈদ কলির হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে শাহিনের মা সুলতানা ওকে উদ্দেশ্য করে ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“সৎ বোনের জন্য আবার এত দরদ কিসের নাকি এর পেছনে তোরও কোন স্বার্থ লুকিয়ে আছে? বোনকে হাত করে বোনের অংশের সম্পত্তিটুকু নিজের করতে চাইছিস তাই তো?”
থেমে গেল সাঈদ। নিজেই মনে মনে কি যেন ঠিক করলো। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে করিম সরদার কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এই বাড়ির মুরুব্বী, আপনার শ্রদ্ধেয় পিতা মশাই কামাল সরদার কে বলে দেবেন, হয় এই বাড়িতে শাহিন থাকবে নয়তো এই বাড়িতে সাঈদ আর কলি থাকবে। সিদ্ধান্তটা নেওয়ার জন্য উনি শুধু আজ রাতটুকু সময় পাবেন। আর আমি এটা খুব ভালোভাবে জানি কু'লা'ঙ্গা'র শাহিনের আগে উনি সাঈদ কে প্রাধান্য দেবেন। আর সাঈদ কে বাড়িতে রাখতে গেলে কলি কে প্রাধান্য দিতে হবে।”
কথাটা বলে সাঈদ কলিকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে ধরলে করিম সরদার উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কোথায় যাচ্ছো এখন?”
“বলেছি তো হয় শাহিন বাড়িতে থাকবে নয়তো আমরা দুজন। ওকে আগে বাড়ি থেকে বের করুন তারপর আমাকে সংবাদ দেবেন চলে আসবো। তার আগে এই বাড়িতে থাকব না। চল কলি।”