অলিতে গলিতে প্রেম

পর্ব - ১

🟢

“ব্যথা পাচ্ছি আমি ইমদাদ ভাই। দয়া করে ছেড়ে দাও আমায়। তুমি কিন্তু অন্যায় করছো আমার সাথে। এই সমাজে মুখ দেখাবো কি করে আমি? কেন অযথা আমায় কলঙ্কিত করছো?”

ইমদাদ আরও একটু চাপ প্রয়োগ করলো কলির হাতে। ফলস্বরূপ আরো একটা চুড়ি ভাঙ্গার শব্দ হলো। ভাঙ্গা চুড়ির টুকরোটা যেন কলির চমড়ার মাঝে গেঁথে গেলো। ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো কলি। তবে ইমদাদের সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। সিগারেটে শেষ টানটা বসিয়ে অবশিষ্ট অংশ ফেলে দিলো। ধোঁয়াটা ছাড়লো একেবারে কলির মুখের সামনে।

বিরক্তিতে কলি নাক মুখ কোঁচকালো। সিগারেটের এই সামান্য ধোঁয়াটুকুও সহ্য হলো না কলির, যার ফলে কাশি উঠে গেল। ইমদাদকে কোনো কালেই পছন্দ করতো না কলি, তবে আজ সেই অপছন্দের মাত্রাটা চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে ঠেকলো। কাশি থামিয়ে ইমদাদকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ই’ত’র, জা’নো’য়া’র কোথাকার, কিসের বদলা নিচ্ছিস আমার ওপর? আজ আমার জায়গায় যদি তোর বোন থাকতো তাহলে পারতি ওর জীবনটা এভাবে নষ্ট করতে?”

ইমদাদ বেশ গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,

“একদম ঠিক বলেছিস, পারতাম না। তুই তো আর আমার নিজের বোন না। তুই হলি আমার সবথেকে বড় দুই শত্রুর মেয়ে আর বোন। তোকে যদি এখন এই চলন্ত টোটো থেকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেই তাতেও আমার আফসোস হবে না।”

কলি এবারে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“কেন এমন করছো আমার সাথে? বরপক্ষের লোকজনেরা এতক্ষণে নিশ্চয়ই সবাই চলে এসেছে। এখন যদি আমায় খুঁজে না পায় তাহলে আমার বাবার মানসম্মান থাকবে না।”

ইমদাদ দৃষ্টি ঘুরিয়ে কলির দিকে তাকিয়ে প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“বরপক্ষের লোকজন এসে গেছে?”

“হ্যাঁ, এতক্ষণে অবশ্যই এসে গেছে।”

ইমদাদ আপন মনে কিছুক্ষণ কি যেন একটা ভাবলো। ভাবনা শেষে মধ্যবয়স্ক টোটো চালক খলিলকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মামা, গাড়ি ঘোরাও। আজ আর ঘুরতে যাওয়া হলো না। করিম সরদার কে তার কলঙ্কিত মেয়ে ফেরত দিয়ে আসি। আজ থেকে পাড়ায় তোর নাম হবে কলঙ্কিত কলি।”

কথাটা বলেই ইমদাদ হো হো করে হেসে উঠলো। কলি ঠিকঠাকভাবে রেগেও যেতে পারলো না। কেননা বাড়ি ফেরার কথাটা শুনেই ভয়ে বুক কাঁপছে। কে জানে বাড়ির কি অবস্থা। এতক্ষণে তো নিশ্চয়ই সবাই জানতে পেরেছে যে কলি বাড়িতে নেই। কে জানে কলির জন্য কি অপেক্ষা করছে আজ বাড়িতে।

________

সরদার বাড়ির একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা, আয়োজন যে জাকজমকপূর্ণ হবে এটাই তো স্বাভাবিক। যদিও সরদার বাড়ির আরো দুজন মেয়ে আছে, তবে সেই স্বীকৃতি তারা পায়নি। আশেপাশের সবাই জানে যে, কথাকলি সরদার ছাড়াও সরদার বাড়ির আরো দুজন মেয়ে আছে, তবে যেহেতু বাড়ির সদস্যরাই তাদের নিজেদের মেয়ে হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না তাই আশেপাশের মানুষজনও আর তাদের নাম মাথায় রাখার প্রয়োজন মনে করেনি।

বিয়ে সম্পন্ন করার জন্য কাজী সাহেব যখন পাত্রীকে নিয়ে আসতে বললেন তখনই বাধলো বিপত্তি। সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও কলিকে পাওয়া গেল না। নিচতলা, দোতলা, ছাদ, সামনের খোলা জায়গা, পিছন দিকের বাগান সব জায়গায় কলিকে খোঁজা হলো, তবে কোথাও পাওয়া গেল না।

বাড়ির মহিলারা যখন হন্যে হয়ে খোঁজার পরও কলির খোঁজ পেলেন না তখন সবাই ভাবলেন এবারে বিষয়টা বাড়ির ছেলেদের জানানো উচিত।

করিম সরদার তখন অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। বাড়ির প্রত্যেক পুরুষই তখন ছেলের বাড়ির লোকজনদের খাতির যত্নে ব্যস্ত। এই ভিড়ের মাঝে এসে করিম সরদার কে ডেকে নিয়ে যাওয়াও বিরাট বড় ব্যাপার। মাথায় ঘোমটা টেনে সেই ভিড়ের মাঝেই করিম সাহেব কে ডাকলেন ওনার স্ত্রী শাম্মি।

করিম সাহেব গেলেন স্ত্রীর সাথে একটা ফাঁকা জায়গায়, যেখানে লোকজনের উপস্থিতি খুবই কম। শাম্মি কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই করিম সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,

“তোমাকে বলেছিলাম না এত লোকজনের মাঝে আসবেনা। তাও এমন জায়গায় এসেছো যেখানে শুধুমাত্র পুরুষ মানুষ।”

শাম্মি দৃষ্টি মেঝের উপরে নিবদ্ধ করে নম্র সুরে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“একটা দরকারি কথা বলার ছিল সে জন্যই আপনাকে ডাকা।”

“মেয়ের বিয়ের থেকেও বেশি এমন কি দরকারি কথা আছে এখন?”

শাম্মি কম্পিত গলায় বললেন,

“কলিকে খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও। পুরো বাড়ি খুঁজেছি, তবুও কোথাও পাইনি। ওর ফোনটাও ঘরে পড়ে আছে।”

কিছু সময়ের জন্য থমকালেন করিম সরদার। স্ত্রীর কথার মানেটা তিনি বোঝার চেষ্টা করলেন। এদিকে ভয়ে ততক্ষণে শাম্মির কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। তিনি কাঁপছেন ভয়ে। কেননা তিনি জানেন কলিকে খুঁজে না পাওয়ার সম্পূর্ণ রাগটুকু প্রথম এসে তার উপরে পড়বে।

বেশ কিছুটা সময় চুপ করে থাকার পর করিম সরদাদ প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“খুঁজে পাচ্ছো না মানেটা কি? পার্লার থেকে ফেরেনি?”

“পার্লারে তো যায়নি। পার্লারের মেয়েদেরকে বাড়িতে ডাকা হয়েছিল। আসলে বিয়ে বাড়িতে অনেক মানুষজন বারবার কলির ঘরে গিয়ে বিরক্ত করছিল জন্য ওরা দরজাটা বন্ধ করে ওকে সাজাচ্ছিল। একটু আগে যখন আপনি কলিকে ডেকে পাঠালেন তখন ওর ঘরে গিয়ে আমরা পাইনি ওকে। আসলে কোথায় গেল…...”

শাম্মি কে নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতে দিলেন না করিম সরদার। নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে কষিয়ে একটা চ'ড় বসালেন। তাল সামলাতে না পেরে নিজের জায়গা থেকে একটু সরে গেলেন শাম্মি, তবে খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজেকে স্বাভাবিক করে মাথা নিচু করে দাঁড়ালেন।

করিম সরদার রাগে চেঁচিয়ে উঠে বললেন,

“একটা কাজ তোমাদের দিয়ে হয় না। শুধু বলেছিলাম মেয়েটাকে দেখে রাখতে সেটাও পারো না তোমরা করতে, তবে তোমাদের দিয়ে হবেটা কি? ওখানে পাত্র বসে আছে বিয়ের আসরে, আর তুমি আমায় বলছো মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছো না। মশকরা করছো আমার সাথে। মেয়ে বেরোলো কি করে বাড়ি থেকে?”

শাম্মি মিনমিনে গলায় বললেন,

“আমরা তো কেউ ভাবিনি যে ও এমন একটা দিন বাড়ি থেকে বের হবে। আর তাছাড়া ওর তো বিয়েতে তেমন কোন আপত্তি ছিলো না। খুশি ছিল সবকিছু আয়োজন নিয়ে।”

করিম সরদার ফের রাগে চেঁচিয়ে উঠে বললেন,

“যদি খুশিই ছিল তাহলে গেল কোথায়? কারো সাথে সম্পর্ক ছিলো তোমার মেয়ের? তার সাথে পালিয়ে গেছে আমাদের মুখ কালো করে তাই না? নিশ্চয়ই তুমি পালাতে সাহায্য করেছো।”

শাম্মি আঁৎকে উঠে বললেন,

“কি বলছেন এসব? কলির কারো সাথে সম্পর্ক ছিল না। ও পালায়নি। আমার মনে হয় কোন দরকারি কাজে কোথাও একটা গেছে, ঠিক চলে আসবে।”

“ছেলে কি বসে থাকবে তোমার মেয়ের জন্য? ওরা তাড়া দেওয়া শুরু করেছে। শিগগিরি তোমার মেয়েকে খুঁজে নিয়ে এসো। নয়তো তোমার মেয়ে স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছে, আর তুমি বাড়ি ছাড়বে তোমার মেয়ের ভুলের কারণে।”

করিম সরদার কথাটা বলতেই বসার ঘর থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ এলো ওনাদের কানে। সেই সাথে পরিচিত এক মেয়েলি কন্ঠের কান্নার আওয়াজও এলো। সে কি হা হুতাশ করে গলা ছেড়ে কান্না জুড়েছে। করিম সরদারের কানে স্পষ্ট এলো যে সেই মহিলা আবার কেঁদে কেটে কেটে চিৎকার করে করে সবাইকে জানাচ্ছেন যে কলি পালিয়েছে।

মাথাটা ঘুরে উঠল করিম সরদারের। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। আগে মনে হলো ওনার সর্ব প্রথম ওই মহিলা কে থামানো উচিত। শাম্মির দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে আদেশের স্বরে বললেন,

“রোকসানা কে গিয়ে থামাও।”

শাম্মি একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না, শুধু মাথা নাড়িয়ে স্বামীর আদেশ পালন করতে চলে গেলেন।

গিয়ে দেখলেন বিরাট বড় বসার ঘরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে রোকসানা কান্নাকাটি জুরে দিয়েছে। আর গলা ছেড়ে বারবার একটাই কথা বলছে কলি পালিয়েছে।

শাম্মি তাড়াহুড়ো করে রোকসানার দিকে এগিয়ে গিয়ে ওকে নিজের দিকে ঘুরে দাঁড় করিয়ে ধীর গলায় বললেন,

“চুপ কর রোকসানা। অযথা নিজের ভাই এর ওপর জমে থাকা রাগের বদলা আমার মেয়ের ওপর নিচ্ছিস কেন? চল এখান থেকে।”

শাম্মি আশা করেছিলেন এবার হয়তো রোকসানা থামবে, তবে তেমন কিছুই হলো না। পূর্বের গলাতেই বললেন,

“এ কেমন শিক্ষা দিয়েছো মেয়ে কে ভাবি যে বিয়ের দিন পরিবারের কথা না ভেবে পালিয়ে গেল? তোমার মেয়ে তো এখন সুখে শান্তিতে ঘর সংসার করবে, কিন্তু আমরা এই পাড়ায় টিকবো কিভাবে সেটা ভেবেছো একবারও?”

শাম্মি মুখ চেপে ধরলেন রোকসানার। ফিসফিসিয়ে বললেন,

“দয়া করে চুপ কর। আমার মেয়েটাকে রেহাই দে।”

কি ভেবে যেন থামলো রোকসানা। এদিকে পাত্রপক্ষের লোকজনের কানে ততক্ষণে চলে গেছে মেয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা। করিম সরদারসহ বাড়ির বাকি পুরুষরা তাদেরকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, সেই সাথে আশ্বস্ত করলেন যে মেয়ে পালায়নি। ঘরে আছে, তৈরি হচ্ছে, তবে তারা বিশ্বাস করলো না। মেয়েকে তৎক্ষণাৎ দেখতে চাইলেন তারা। তবে তারা পারলো না মেয়েকে সামনে আনতে, ফলস্বরূপ তাদের বিশ্বাস করতেও পারলো না।

একজন মানুষও মেয়ে পক্ষের লোকজনকে কথা শোনাতে ছাড়লো না। যে যা পারলো তাই বলল, আর সরদার বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্যকে চুপচাপ মাথা নত করে সব অপমান সহ্য করতে হলো। জীবনে প্রথমবার বোধ হয় সরদার বাড়ির লোকজন কারো সামনে মাথা নিচু করলো, কারো করা অপমান চুপচাপ সহ্য করতে হলো। কেননা যারা অপমান করছে তারা এতটাও সাধারণ যে না সরদার বাড়ির লোকজন তাদের মুখে মুখে তর্ক করবে আর তারা চুপচাপ শুনবে।

বিজ্ঞাপন

এমনই বিশৃঙ্খল একটা পরিবেশে যখন সবাই দিক-দিশা হারিয়ে ফেলেছে, কে কি করবে, কে কি বলবে কেউ কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না ঠিক তখনই সদর দরজায় পা রাখল ইমদাদ আর কলি। ইমদাদ এখনো কলির হাতটা শক্ত করে ধরে আছে। বলা যায় কলি কে এক প্রকার জোর করে টেনে আনছে।

বসার ঘরে বিশৃঙ্খল পরিবেশটা দেখে ইমদাদের পৈশাচিক আনন্দ হলো, কিন্তু বুক কেঁপে উঠল কলির। কলির বুঝতে বাকি রইলো না কি ঝড় উঠতে চলেছে আজ সরদার বাড়িতে।

“সরদার বাড়ির সম্মানকে সসম্মানে বাড়ি ফিরিয়ে এনেছি সম্মানিত করিম সরদার। একবার মাথা তুলে সদর দরজার দিকে তাকান। দেখুন, বাড়ির নতুন জামাই দাঁড়িয়ে আছে।”

একটা বড় বিস্ফোরণ ঘটলো বসার ঘরে। করিম সরদার চমকে তাকালেন সদর দরজার দিকে। কনের সাজে লাল টকটকে শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে কলি। গায়ে কোন গয়না নেই, হয়তো সেগুলো পরার সময় পায়নি। চোখ মুখ লাল টকটক করছে, আর সেটা কান্নার কারণেই। কেননা কলি এখনো কাঁদছে।

কলির পাশেই ছাই রংয়ের শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে ইমদাদ। চুলগুলো এতটাই কোকরা যে আঁচড়েছে নাকি এলোমেলো হয়ে আছে বোঝা যাচ্ছে না। দু গাল ভর্তি দাঁড়িগুলো বেশ অনেকটাই বড় হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা শখ করে দাঁড়ি বড় করেনি, বরং অবহেলার কারণে দাঁড়ি কাটার ঠিক সময় হয়নি, এতটাই ব্যস্ত তিনি। শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা। একটা বোতামের অস্তিত্ব সেখানে টের পাওয়া যাচ্ছে না, আর আরেকটা বোতাম ইচ্ছাকৃতভাবে খোলা রেখেছে। হাতের আঙ্গুলের ভাঁজে আবার একটা আধপোড়া সিগারেটও দেখা যাচ্ছে। এইসব মিলিয়ে সরদার পাড়ার সবচেয়ে সুন্দরী, ভদ্র, কথাকলির পাশে ওর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে পাড়ার কুখ্যাত গুন্ডা কিংবা বখাটে যাই বলা হোক না কেন ইমদাদ।

তার নামের আগে পিছে কিছুই নেই। একসময় নামের শেষে সরদার পদবীটা ব্যবহার করত, তবে এখন এই পদবীটার উপরে ঘৃণা জমেছে। আর যা কিছুর উপর ইমদাদের ঘৃণা জমে তার অস্তিত্ব ইমদাদ নিজের জীবনে রাখে না। তাই পদবীটাও সরিয়ে ফেলেছে। এখন সে শুধুই ইমদাদ।

ইমদাদ সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতে ধরল, তবে ঠিক তখনই ওর কানে করিম সরদারের হুংকার ভেসে এলো। থেমে গেল ইমদাদ। ভেতরে আর পা রাখা হলো না। ভিড়ভাট্টা ঠেলে করিম সরদার এগিয়ে গেলেন ইমদাদ আর কলির দিকে।

করিম সরদার কলির চোখে চোখ রাখতেই কলি মাথা নামিয়ে নিল। তা দেখে করিম সরদার ইমদাদের দিকে তাকালেন, তবে ইমদাদ মাথা নামালো না। চোখের পলক অবধি পড়লো না তার। নির্বিকার ভাবে তাকিয়ে আছে করিম সরদারের চোখের দিকে। হাতে থাকা আধ পোড়া সিগারেটটায় আর টান দেওয়া হলো না। মেঝের উপরে ফেলে পায়ে পিষে ফেলল সেটা। ইমদাদের এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে করিম সরদারের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে,

“তুমি নিয়ে গিয়েছিল আমার মেয়েকে? সরদার বাড়ির সম্মানে তুমি হাত রেখেছিলে?”

ঘাড় ঘুরিয়ে করিম সরদারের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ইমদাদ বলল,

“আপনার কথাটা একটু ভুল, একটু ঠিক। আমি যেমন নিয়ে গিয়েছিলাম কলিকে, ঠিক তেমনি কলি গিয়েছিল আমার সাথে। ভালোবাসি একে অপরকে। আপনি চাইলেন আর অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে গেল কলির এটা তো হতে পারে না।”

কলি চমকে তাকালো ইমদাদের দিকে। কিছু বলতেও পারলো না। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। কলিকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে ইমদাদ ওর দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল,

“ভয় পেয়ো না, আমি আছি তো তোমার পাশে। আর তুমি কাঁদছো কেন? আমায় হারিয়ে ফেলবে এতক্ষণ তো সেই ভয়ে কাঁদছিলে, এখন তো আমি তোমার। তাহলে এখনো কেন কাঁদছো?”

কলি অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“কি আজেবাজে কথা বলছো? তোমায় না পাওয়ার জন্য কাঁদতে যাব কেন আমি? হাত ছাড়ো আমার।”

কথাটা বলে খুব চেষ্টা করলো কলি ইমদাদের থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর, তবে সফল হতে পারল না। ইমদাদ ফের বলে উঠলো,

“আরে এখন তো বিয়েটা করে নিয়েছি তারপরও ভয় পাচ্ছ কেন? কেউ আলাদা করতে পারবে না আমাদের।”

কলি বুঝলো ইমদাদকে বলে কোন লাভ হবে না। সরাসরি করিম সরদার কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“বাবা, বিশ্বাস করো আমি ইমদাদ ভাইয়ের সাথে পালাইনি। আমাকে তো পার্লারের মেয়েগুলো বলেছিল যে ওরা নাকি সাজানোর যে জিনিসপত্র গুলো আছে সেই ব্যাগটা আনতেই ভুলে গেছে। তাই আমি যেন ওদের সাথে পার্লারে গিয়ে একেবারে সাজগোজ করেই ফিরি, নাহলে দেরি হয়ে যাবে। আমি যেতে চাইনি কিন্তু ওরা আমায় একপ্রকার জোর করে নিয়ে গিয়েছিলো। আমি এসব কিছু জানতাম না বাবা।”

কলি কথাটা বলতেই পিছনে দাঁড়ানো রোকসানা ওর দিকে তেড়ে এসে বলল,

“একদম মিথ্যে বলবি না কলি। তুই তো স্বেচ্ছায় গিয়েছিলি, নিজের পায়ে হেঁটে। তার সাক্ষী আমি। তুই বলতো, যাওয়ার সময় আমায় এই মিথ্যে অজুহাতটা দিয়ে যাসনি? আর যদি তুই সাজতে গিয়েছিলি তাহলে ইমদাদের সাথে ফিরলি কি করে? বলে দিলেই হয় যে তোর পালানোর পরিকল্পনাই ছিল।”

“বললাম তো ওরা আমাকে জোর করে ছিল জন্য আমি রাজি হয়েছিলাম। আমি না হলে যেতে চাইনি।”

রোকসানা মুখ ভেংচিয়ে বললেন,

“অমতে যাচ্ছিলি জন্যই বুঝি বাড়ির পিছনের গেট দিয়ে গেলি? আবার গেলি ভালো কথা, বাড়ির গাড়ি নিয়ে গেলি না কেন? সবার চোখের আড়ালে ওই মেয়েগুলোর গাড়িতে গেলি। কি ভেবেছিস বুঝি না আমরা কিছু? তাহলে এই কারণেই প্রায়ই ইমদাদের বাড়িতে যেতি। কে জানে আর কি করে বেরিয়েছিস। শুধু প্রেম প্রেম খেলাই খেলেছিস নাকি এর থেকেও.....”

আজ প্রথম রোকসানা এত বড় একটা কথা বলে দিল তারপরও ওকে কেউ থামালো না। কলি করিম সরদার কে উদ্দেশ্য করে ক্রন্দনরত গলায় বলল,

“বাবা আমি......”

কলি কথাটা বলতেই করিম সরদার ওকে চ'ড় মা'রার জন্য উদ্যত হলেন। ভয়ে কলি দুচোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল। তবে সৌভাগ্যক্রমে চ'ড়টা কলির গালে পড়লো না, তার আগেই ইমদাদ করিম সরদারের হাতটা ধরে ফেলল। কলি কে আড়াল করে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় করিম সরদার কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“গায়ে হাত তুলতে আসবেন না। মুখ আছে, যা বলার মুখে বলুন। আমিও মুখেই বলছি। নাহলে একবার যদি হাত চলা শুরু হয় তাহলে এখানে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে। আর আমি কিন্তু বয়সের তোয়াক্কা করবো না। যে বেশি বেয়াদবি করবে সেই বেশি মা'র খাবে। আর সেই তালিকায় যে আপনার নামটা প্রথমে থাকবে সেটা নিশ্চয়ই আপনি নিজেও খুব ভালো করেই জানেন ।”

ইমদাদ যে কলি কে মা'র খাওয়ার হাত থেকে বাঁচালো, তার জন্য কলির মাঝে বিন্দু পরিমাণ কোন কৃতজ্ঞতাবোধ দেখা গেল না। রাগান্বিত গলায় বলল,

“আমাদের বাবা মেয়ের মাঝখানে তুমি কেন কথা বলছো? বাবা, তুমি আমাকে মা'রাে, যত ইচ্ছা মা'রো শুধু আমার কথা বিশ্বাস করো।”

এ পর্যায়ে ইমদাদের অভিব্যক্তির পরিবর্তন ঘটল। হঠাৎ করে চোখ দুটো একটু ছলছল করে উঠলো। কলির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুহাতের আজলায় কলির মুখটা নিয়ে ব্যাথাতুর গলায় বলল,

“যদি আমাকে সবার সামনে ছোট করারই ছিল তাহলে বিয়ে করলে কেন কলি? শুরুতেই বলে দিতে পারতে আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা নেই। আমি তোমার জন্য এত কিছু করলাম, নিজের জীবনের তোয়াক্কা করলাম না আর তুমি কিনা এখন আমার ভালোবাসা অস্বীকার করছো এটা কি সত্যি আমার প্রাপ্য?”

কলি এবারে সত্যি বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কি বলছে এসব ইমদাদ বুঝে উঠতে পারছে না। কলি তো এখন এটাও বুঝতে পারছে না ইমদাদ সজ্ঞানে এই কথাগুলো বলছে নাকি মাথার কোন সমস্যা হয়েছে।

এদিকে ইমদাদ আর কলির বিয়ে হোক বা না হোক সেটা বড় ব্যাপার না পাত্রপক্ষের লোকজনের কাছে। মেয়ে তো সত্যি পালিয়ে ছিল। আবার বাড়ি ফিরেছে সেই ছেলের সাথেই। দুটো অল্প বয়সী ছেলে মেয়ের মাঝে নিশ্চয় স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল না। আবার ছেলেটা তো জোর গলায় ভালোবাসার কথা বলছে। তার মানে ব্যাপারটার মাঝে নিশ্চয়ই ঘাপলা আছে।

আরো যতটুকু অপমান করা বাকি ছিল সেটুকুও তাড়া করে নিল। বাড়ি ছাড়ার আগে কলির হবু বর কলির বাবা দিকে ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকালেন এবং তার সেই ঠান্ডা দৃষ্টির মাঝেই যেন তিনি হুমকি দিয়ে গেলেন কলির বাবাকে। করিম সরদার কিছুই বলতে পারলেন না। চলে গেল পাত্র-পক্ষের লোকজন, একে একে অতিথিরাও সবাই চলে গেল।

বাড়িতে তখন কেবল সরদার বাড়ির লোকজন উপস্থিত আর বাড়ির চাকর বাকর। কলির হাতটা তখনও ইমদাদের হাতের মুঠোয়। বাড়িটা যখন একেবারে অতিথি শূন্য হয়ে পড়লে তখন হঠাৎ করেই ইমদাদ কলির হাতটা ছেড়ে দিয়ে এক প্রকার ছুঁড়ে মা'রলো কলিকে। কলি হুমরি খেয়ে পড়লো মেঝের উপরে, করিম সরদারের ঠিক পায়ের কাছে।

করিম সরদার যেন অনেক কিছুই আন্দাজ করতে পারলেন। তবে তারপরও তিনি আগে আগে কিছু বললেন না। মেয়েকে উঠতে সাহায্যও করলেন না। শাম্মি এগিয়ে এসে মেয়েকে তুললেন।

ইমদাদ এগিয়ে গেল করিম সরদারের দিকে। ওনার ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে করিম সরদারের চোখে চোখ রেখে বলল,

“কষ্ট হচ্ছে করিম সরদার? কিসের জন্য কষ্ট হচ্ছে? নিজের সম্মান হারানোর জন্য নাকি মেয়ের কপাল পোড়ার জন্য? মনে পড়ে আজ আপনার মেয়ে যেমন একটা লাল রংয়ের শাড়ি পড়ে আছে ঠিক তেমনি একটা লাল রঙের শাড়ি পরে আমার তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা বোন আ’ত্ম’হ’ত্যা করেছিল? মনে পড়ে সেদিন আমার বাবার আহাজারির কথা? মনে পড়ে সেদিন আমাদের ভাই বোনদের কান্নার কথা? মনে পড়ে সেদিন ঠিক কিভাবে আমার বোনের গর্ভে থাকা আপনার ছেলের সন্তানকে অবৈধ বানিয়েছিলেন আপনারা সবাই মিলে?”

ঘরের এক কোনার দিকে দাঁড়িয়ে আছে কাফিল। ইমদাদের বলা কথাটার প্রভাব সব থেকে বেশি কাফিলের উপরেই পড়ল। তবে কাফিল সেটা ওর পাশে দাঁড়ানো স্ত্রী মুনমুনকে বুঝতে দিতে চাইলো না।

এদিকে করিম সরদার কে চুপ করে থাকতে দেখে ইমদাদ ফের বলে উঠলো,

“এক কথাতেই মুখ বন্ধ হয়ে গেল? আর আপনার পিতা কোথায়? আমার সম্মানিত দাদা মশাই কোথায়? ওনাকে একবার ডাকুন। ওনার এক নাতনির জীবন নষ্ট হওয়ার পর ওনার অনুভূতিটা কেমন আমি জানতে চাই। তারপর আমি জানতে চাইবো আমার বোনের জীবন নষ্ট করার পর ওনার অনুভূতিটা কেমন ছিল।”

“তোকে যদি আজ এখানে জ্যান্ত পুঁতেও ফেলি তাও কেউ আমার কিছু করতে পারবে না, জানিস তুই এই কথাটা খুব ভালো করে।”

ইমদাদ হো হো করে হেসে উঠে বলল,

“একবার আমার গায়ে হাত দিয়েই তো দেখুন আপনার নিজের ছেলে আপনার শত্রু হয়ে দাঁড়াবে। সে হয়তো এখন আমার সঙ্গে কথা বলে না, এখন আমরা দুজনে শত্রু, তবে আমি জানি আজও যদি ইমদাদের শরীর থেকে রক্ত ঝরে তবে সবার প্রথমে আপনার ছেলের চোখ দিয়েই জল বেরোবে।”

করিম সরদার কে কথাটা বলে ইমদাদ তাকালো কলির দিকে। কলি তখনও কাঁদছে। ইমদাদ ঠাট্টার ছলে বলল,

“এখনো কাঁদছো কেন কলি? দেখো তোমার বিয়ে ভেঙে গেছে। সবাই জেনে গেছে তুমি ভালোবাসার টানে তোমার প্রেমিকের সাথে পালিয়েছিলে। তুমি যেমন বলতে যে আমার বোন জোর করে তোমার ভাইকে বিয়ে করেছিল, আমি কিন্তু তেমনটা করিনি। আমরা দুজন তো একে অপরকে ভালোবেসে বিয়েটা করেছি। কিন্তু এখন তুমি আমাকে কেন ঠকাচ্ছো?”

কথাটা বলে ইমদাদ আবারও হো হো করে হেসে উঠলো। ইমদাদের মনে হলো ওর আর এখানে থাকার কোন দরকার নেই। সব কাজ তো শেষ, তবে এবারে যাওয়া যাক।

পকেট থেকে লাইটার বের করে সিগারেটে আগুন ধরালো। মনের সুখে একটা টান দিলো। কলি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইমদাদের দিকে। ইমদাদ ঘুরে দাঁড়িয়ে আবারো দরজার দিকে হাঁটা ধরলে পিছন থেকে কলি বলে উঠলো,

“কেন করলে আমার সাথে এমনটা? আমি কি ক্ষতি করেছিলাম তোমার?”

ইমদাদ পিছন ফিরে তাকালো কলির দিকে। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। সেই চোখ দুটোর মাঝে যেমন রাগ আর ক্ষোভ জমে আছে, তেমনি জমে আছে একরাশ হাহাকার, জমে আছে কিছু ব্যর্থতার কষ্ট। ইমদাদ বেশ শান্ত গলায় কলি কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এটা তোর শাস্তি। তোকে শুধু বোঝালাম যে সব সময় যাকে দোষ দেওয়া হয় সে অপরাধী হয় না। তোকে শুধু বোঝালাম যে, মেয়েরা অপরাধী না হয়েও সব অপরাধের দায় তাদের কাঁধেই গিয়ে পড়ে। শুধু এতোটুকু বোঝালাম যে সব সময় আমরা চোখের সামনে যা দেখতে পাই সেগুলো সত্যি হয় না। আমাদের আড়ালে অনেক কিছু ঘটে, যে সত্যি শুনলে আমাদের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে।”

বিজ্ঞাপন
অলিতে গলিতে প্রেম গল্পটি খুশবু আকতার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও সামাজিক গল্প