রাতে ইমদাদ দেরি করে ঘুমিয়েছিল সেজন্য ইমদাদের ঘুম থেকে উঠতেও দেরি হবে আজ। সাঈদ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েছিল, তাই আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়লো। রাতে কখন ইমদাদ ওর পাশে এসে ঘুমিয়েছে সে বিষয়ে খেয়ালই করেনি সাঈদ এতটাই গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল।
ঘুম থেকে উঠে পাশে তাকিয়ে দেখলো ইমদাদ বিছানার একদম শেষ প্রান্তে গিয়ে ঘুমিয়ে আছে এবং অবাক করার বিষয় হলো ওদের দুজনের মাঝে একটা বালিশও দেওয়া আছে। সাঈদ যে কাঁথাটা নিয়েছে ইমদাদ সেই কাঁথাটাও নেয়নি, অন্য একটা কাঁথা নিয়ে ঘুমিয়েছে।
সাঈদের একটু হাসি পেল। সেই সাথে এটাও ভাবলো যে ইমদাদ ঘুম থেকে উঠলে এই বলে খোঁচাবে যে এই ছেলে বিয়ে করলে কি অবস্থা হবে।
ঘড়িতে সময় দেখলো সাঈদ। সকাল সাতটা বাজে। সাঈদ তো ভেবেছিল বোধহয় দুপুর হয়ে গেছে এতক্ষণে, তবে এত তাড়াতাড়ি যে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে সেটা ভাবেনি। কিন্তু কি আর করার। একবার যখন ঘুম ভেঙে গেছে আর তো ঘুম ধরবেও না৷
ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বেরোলো। দেখলো বাকিরা কেউ তো ঘুম থেকে ওঠেনি, তবে রান্নাঘর থেকে বাসনপত্রের টুকটাক শব্দ সাঈদের কানে ভেসে হলো।
সাঈদ রান্নাঘরের দিকেই গেল। গিয়ে দেখল ইয়াসমিন রান্না করছে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে আগে ইয়াসমিনের মুখটা দেখতেই সাঈদের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। মনে হলো আজ সারাদিনটা বেশ ভালো কাটবে সাঈদের।
“একটা কাজের লোক রাখতে পারেনা তোর ভাই? এত খাটায় কেন তোকে দিয়ে?”
হঠাৎ করে কারো কন্ঠ পেতেই একটু চমকে উঠল ইয়াসমিন। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই দেখলো সাঈদ দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তের মাঝে ইয়াসমিনের অভিব্যক্তি বদলে গেল। গুটিশুটি হয়ে দাঁড়ালো। চোখ মুখটা কেমন যেন শুকনো শুকনো দেখালো।
ইয়াসমিনের থেকে কোন উত্তর না পেয়ে সাঈদ ওর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“কি হলো উত্তর দিলি না যে? তোর ভাই টাকা বাঁচানোর ধান্দায় তোকে দিয়ে এত খাটাচ্ছে। এত লোভী তোর ভাই!”
“আমার ভাইয়া লোভী না। ভাইয়া আমায় সাহায্য করার জন্য লোক রাখতে চায়, কিন্তু আমি রাজি হই না।”
ইয়াসমিন কথাটা বলতে বলতে সাঈদ ওর দিকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। ইয়াসমিনের কথাটা শেষ হতে সাঈদ ওর দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল,
“যেই ভাইয়ের বদনাম করেছি অমনি মুখ দিয়ে কথা বেরোলো। কন্ঠে আবার তেজও দেখা যাচ্ছে। বাহ্ ভালো। তা সব সময় এই তেজটা থাকে না কেন?”
“সব সময় তেজ দেখানোর প্রয়োজন হয় না তাই।”
“বাহ! ভালোই তো কথা ফুটেছে। আজ তোর ভাই নেই জন্য আমার সঙ্গে এখন কথা বলছিস নাকি? ভাই সঙ্গে থাকলে কথা বলিস না কেন? তোর ভাই নিষেধ করেছে নাকি আমার সাথে কথা বলতে?”
ইয়াসমিন মাথা তুলে সাঈদের দিকে তাকিয়ে তৎক্ষণাত দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না। আমার ভাইয়া এমন না।”
সাঈদ এবার একটু বিরক্তকর গলায় বলল,
“তোর ভাইয়া এমন না, তোর ভাইয়া তেমন না তাহলে তোর ভাইয়া কেমন বলতো? আমার বোনের সাথে কি করেছে জানিস?”
ইয়াসমিন এবারে মাথাটা নিচু করে নিল। কোন উত্তর দিলো না সাঈদের কথার। সাঈদ তাই ভাবল একটা সুযোগ পাওয়া গেল। বলা যায় ইয়াসমিনের দুর্বলতা খুঁজে পাওয়া গেল, যেটা দিয়ে এখন ইয়াসমিন কে ভালোভাবে খোঁচানো যাবে।
“তার মানে তুইও জানিস তোর ভাই অন্যায় করেছে তাইতো?”
“হয়তো করেছে আমার ভাইয়া অন্যায়। কিন্তু কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে করেছে সেটা তো তুমি জানো। আমার বোনের সাথে যেটা হয়েছিল সেটা কি ঠিক ছিল?”
এবারে সাঈদ চুপ হয়ে গেল। বুঝলো ইয়াসমিনও ওর দুর্বলতা খুঁজে পেয়ে সেখানেই খোঁচা দিয়েছে। আপাতত মনে হলো এই কথাগুলো বলে লাভ নেই। এগুলো এখন তুললেই একটা সুন্দর মুহূর্ত নষ্ট হয়ে যাবে।
ইয়াসমিনের থেকে দূরে সরে দাঁড়ালো সাঈদ। দুহাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলো,
“কি রান্না করছিস?”
ইয়াসমিন রান্নায় ব্যস্ত হয়ে গিয়ে বলল,
“কিছু একটা।”
“বাড়িতে যে মেহমান এসেছে সে দিকে খেয়াল নেই? একবার তো জিজ্ঞেস করতে হয় যে মেহমান কি খেতে পছন্দ করে। ভদ্রতা শিখিসনি?”
“আমার ভাইয়া বলেছিলো তোমায় যেন আমায় বিরক্ত না করো, ভুলে গেছো?”
মুহূর্তের মাঝে আবারও সাঈদের ভালো মেজাজটা বিগড়ে গেল। ইয়াসমিনের বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“ভয় পাই নাকি তোর ভাইকে আমি? তোকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেলেও তোর ভাই কিছু করতে পারবে না আমার। তোকে কেন এখনো তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করিনি জানিস? কারণ তোর চোখে আমি কখনো আমার জন্য ভালোবাসা দেখিনি। দেখেছি কেবল ভয়। ঘৃণাও দেখিনি কখনো। আসলে আমার প্রতি তোর অনুভূতিটা কি বলতো? বিয়ে-শাদী করার ইচ্ছে আছে আমাকে নাকি সারা জীবন এভাবে ঘোরাবি তোর পিছনে?”
সাঈদ খুব জোরে চেপে ধরেছে ইয়াসমিনের বাহু। ইয়াসমিন একবার সেদিকে তাকালো। দৃষ্টি আবারো সাইদের দিকে নিবদ্ধ করে বলল,
“কোন ইচ্ছে নেই তোমায় বিয়ে করার। আর আমি না কখনো চাই যে তুমি আমার পিছনে ঘোরো। তোমার প্রতি ভালোবাসাটা জন্মাবে কি করে বলতে পারো আমায়? যখনই আমাদের দেখা হয়েছে তুমি তখনই আমার উপরে চিৎকার চেঁচামেচি করেছো, রাগারাগি করেছো, সবসময় হুকুম চালানোর চেষ্টা করো আমার উপরে। একবার ভেবে দেখো তো কখনো কি নরম গলায় কথা বলেছো আমার সাথে? কোনদিনও কি ভালোবেসে ইয়াসমিন বলে ডেকেছো আমায়? তাহলে তোমার প্রতি ভালোবাসা আসবে কি করে? আদৌ কি তোমার মতন মানুষকে ভালোবাসা যায়?”
সাঈদ আরেকটু জোরে চেপে ধরলো ইয়াসমিনের বাহু। ইয়াসমিন এবারে ব্যাথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো, তবে সাঈদের সেদিকে কোন খেয়াল নেই। ইয়াসমিন কে আরেকটু নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল,
“শুধু এতটুকুই কারণ আমায় না ভালোবাসার?”
“না। শুধু এটাই কারণ না। সব থেকে বড় কারণটা কি জানো? আমার ভয় হয় তোমায় দেখে। কারণ তুমি সেই বাড়ির ছেলে যেই বাড়ির কারণে আমাদের সবার জীবন নষ্ট হয়েছে। আমার ভয় হয় তোমায় দেখে কারণ তুমি সেই ছেলের নিজের ভাই যার কারণে আমার বোন মা’রা গেছে। তোমার রাগ, জেদ, অহংকার এসবের মাঝে আমি সরদার বাড়ির ছাপ দেখতে পাই যেটা তোমাকে অপছন্দের সব থেকে বড় কারণ। আর তুমি কখনো আমাকে সেভাবে ভালোবাসতে পারবেই না যেরকম ভালোবাসা আমি চাই।”
ইয়াসমিন কথাটা বলতেই সাঈদ ওর হাতটা ছেড়ে দিল। নিজের থেকে একটু দূরে ছুঁড়েই মা’রলো। আর কিচ্ছু বলল না, আর না কিছু শোনার ইচ্ছে হলো। গটগট পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল রান্নাঘর থেকে।
সাঈদ কোথায় গেল কে জানে। ইয়াসমিনের ওর পিছু পিছু যাওয়ার না ইচ্ছে হলো আর না কোন প্রয়োজন মনে করল। চুপচাপ নিজের কাজে মনোযোগ দিলো।
_______
ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ইমদাদ ফোনের চার্জার খুঁজছিল, তবে পেল না। ভাবলো ইয়াসমিন নিশ্চয়ই জানবে। সরাসরি রান্না ঘরে গেল, তবে সেখানেও ইয়াসমিনকে পেলো না। যেহেতু রান্নাঘরে নেই তাহলে ওর ঘরেই থাকবে।
ইয়াসমিনের ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল। ঘরের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে ইমদাদ গলা উঁচিয়ে ইয়াসমিন বলে ডাকলো।
সামনে কলিকে দেখে থমকালো ইমদাদ। আয়নার সামনে কলি দাঁড়িয়ে আছে। পরনে ইয়াসমিনেরই একটা জামা।
ইমদাদের কন্ঠ পেয়ে কলি তড়িৎ গতিতে পিছন ফিরে তাকালো। সদ্য গোসল করে বেরিয়েছে কলি। না কোন অলংকার আছে, না কোন সাজ সরঞ্জাম। অগোছালো ভেজা চুল দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে পড়তে পিঠের কাছে জামার কিছুটা অংশ ভিজে গেছে। টুপটুপ করে পানি মেঝের উপরেও পড়ছে।
পাতলা ঠোঁটটা শুষ্ক দেখাচ্ছে। ধবধবে ফর্সা মুখে একটা ছোট্ট সোনার নাকফুল চিকচিক করছে। কলির চোখের পাপড়িও যেন ভেজা। কলি কে দেখে মনে হচ্ছে সদ্য কোনো মালি বাগানের সবথেকে সুন্দর ফুলকে তাজা রাখার জন্য যেন সেই ফুল গাছটায় পানি ছিটিয়ে দিয়ে গেছে। জানালা দিয়ে আসা হালকা রোদের আলোয় সেই বিন্দু বিন্দু পানির কণা চিকচিক করছে।
ইমদাদের থমকানোর কথা ছিল না, তবে থমকালো। ইমদাদের চোখের পলকটুকু ফেলার ইচ্ছে হলো না। ওকে নিজের দিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে কলির একটু অস্বস্তি হলো। নিজেই আগ বাড়িয়ে বলল,
“ইয়াসমিন আপু ঘরে নেই।”
ইমদাদের ধ্যান ভাঙলো। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো, তবে খেয়াল করল পারছে না। কলির ওপর থেকে চোখ দুটো সরাতেই পারছে না। তবুও বহু কষ্টে টেনে হিঁচড়ে নিজের চোখ দুটো সরালো। কলিকে জিজ্ঞেস করতে চাইলো যে ইয়াসমিন কোথায়, তবে খেয়াল করলো কথাগুলো কেমন যেন গুলিয়ে ফেলছে। ইমদাদ তো তোঁতলা না, তবে তাও আজ তোতলামি করছে। কলি নিজেই বিরক্ত হয়ে বলল,
“ঠিকঠাক করে বলো কি বলবে। অযথা সময় নষ্ট করছ কেন আমার? তোমার পিছনে নষ্ট করবো এত সময় আমার হাতে নেই।”
ইমদাদ নিজের দৃষ্টি নামিয়ে ফেলেছিল। তবে আবারো তাকালো কলির দিকে। একটু রাগই হলো। ইমদাদের সাথে কথা বললে সময় নষ্ট হয়।
হঠাৎ করে ইমদাদের মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। চোখে মুখে ফুটিয়ে তুলল এক রহস্যময় হাসি। ধীর পায়ে কলির দিকে এগিয়ে গেল।
ইমদাদ কে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে কলি একটু ঘাবড়ালো। তবুও নিজেকে কঠিন রাখার চেষ্টা করে বলল,
“কি সমস্যা? এদিকে কি ইয়াসমিন আপু আছে নাকি যে আসছো?”
ইমদাদ কোন উত্তর দিল না কলির প্রশ্নের। এদিকে ইমদাদ যখন কলির অনেকটাই কাছাকাছি এসে গেল তখন কলি ধীরে ধীরে নিজেও পেছাতে লাগলো। পেছাতে পেছাতে এক সময় গিয়ে দেওয়ালের সাথে ধাক্কা খেল। কলি বুঝলো ওর কাছে পেছানোর মতন আর জায়গা নেই। এখন উপায় একটাই, ইমদাদকে থামানো। কলি আঙুল উঁচিয়ে ইমদাদ কে শাসিয়ে বলল,
“ভুলেও আমার কাছে আসবেনা। ভালো হবে না কিন্তু।”
ইমদাদ পাত্তাই দিল না কলির কথাকে। এগোতে এগোতে একেবারে কলির কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। কলি পাশ দিয়ে চলে যেতে চাইলো, তবে সফল হতে পারল না। ইমদাদ দেওয়ালের দুপাশে দু হাত রেখে কলিকে নিজের দু’হাতের মাঝখানে বন্দি করলো। কলি এবারে রাগান্বিত গলায় বলল,
“বাড়াবাড়ি করছো কিন্তু তুমি। ভাইয়াকে ডাকতে বাধ্য করো না। সেই সাথে আমাকে তোমার তুলনা শাহিনের সাথে করতেও বাধ্য করো না।”
ইমদাদ মুচকি হেসে বলল,
“আমার তুলনা তুই শাহিনের সাথে করবি? পার্থক্য তুই জানিস না?”
“জানি। সেদিন তোমার সাথে অনেকটা সময় কাটানোর পরেও তুমি একবারও কোন অজুহাতে আমায় ছোঁয়ার চেষ্টা করোনি। আমি গাড়ি থেকে নেমে যাবো বলে শুধু হাতটা ধরে ছিল। সেদিন চাইলে তুমি আমার সাথে অনেক কিছুই করতে পারতে, তবে করোনি। এর আগেও অনেকবার তুমি অনেক সুযোগ পেয়েছো কিন্তু তবুও কখনো আমাকে বাজেভাবে স্পর্শ করার চেষ্টা করোনি। সেই জন্যই আমি ভাবতাম অন্তত শাহিনের থেকে তুমি একটু হলেও ভালো আছো। তাই বলছি আমার সেই ধারণাটা ভুল প্রমাণ করে দিও না। অন্তত আমার চোখে নিজেকে চরিত্রহীন বানিয়ো না।”
ইমদাদ শব্দ করে হেসে উঠলো। ইমদাদকে হাসতে দেখে কলি ভরকালো। ছেলেটা আসলেই অদ্ভুত। কখন কি করে, কি বলে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না কলি।
ইমদাদ হাসতে হাসতে নিজেই আবার থামল। কলি কখন থামাবে সে অপেক্ষায় রইলো না। কলির ভেজা চুলগুলো কপালের উপর পড়ে আছে। ইমদাদ আলগোছে সেগুলো কলির কানের পিঠে গুজে দিয়ে বলল,
“স্বামীর বাড়িতে প্রথম রাত কাটানোর পরেই সকাল সকাল ভেজা চুল নিয়ে ঘর থেকে বেরোলো মানুষজন কি বলবে ভেবে দেখেছিস? আমি তোর সাথে কিছু করি বা না করি কিন্তু লোকে তো ভাববে আমাদের মাঝে সব হয়ে গেছে। তোর কি লজ্জা করবে না?”
“কেউ জানুক আর না জানুক তুমি আর আমি তো জানি যে আমাদের মাঝে সম্পর্কটা ঠিক কেমন। অন্যের কথায় আমার যায় আসে না। আমার মাথা ব্যথা করছিল জন্য আমি গোসল করেছি।”
ইমদাদ আফসোসের সুরে বলল,
“কিন্তু লোকে তো সেটা মানবে না। সবাই তো ভাববে সত্যি সত্যি তুই ইমদাদের বউ। বলা যায় না কিছুদিন পর হয়তো তোর কাছে এসে সুখবরও জানতে চাইবে। কামাল সরদার, করিম সরদার এনাদের সম্মান থাকলো?”
কলি বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে ইমদাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ইমদাদের স্বভাব আসলেই বুঝে উঠতে পারেনা কলি। মানুষটা মাঝে মাঝে ত্যাড়ামো করে, আবার মাঝে মাঝে এমন গা ছাড়া স্বভাবের হয়ে যায়। মাঝে মাঝে আবার নিজেকে খুব বিচক্ষণ দেখায়। কিছু কিছু সময় তো মনে হবে মশকরা তার পছন্দই না। অথচ নিজে সারাটা দিন আজেবাজে কথা বলে যায়। আসলে যে মানুষটা কেমন কলি বুঝে উঠতে পারে না।
কলি কে নিজের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইমদাদ ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“আমার প্রেমে-টেমে পড়ে গেলি নাকি? এভাবে হা করে তাকিয়ে আছিস কেন?”
কলির ধ্যান ভাঙলো। দুহাতে ধাক্কা দিয়ে ইমদাদ কে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“জন্ম তো একবারই হয়। আর এই এক জনমে তোমার প্রেমে আমি পড়বো এটা অসম্ভব।”
কথাটা বলে কলি চলে যেতে ধরলে ইমদাদ কলির হাত টেনে ধরলো। একটা হেচকা টানে কলিকে একেবারে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ধরলো। সরাসরি চোখ রাখলো কলির চোখে।
কলি বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না ইমদাদের চোখের দিকে। ফলস্বরুপ দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে বলল,
“বারবার এভাবে আমার হাত ধরে টানবে। না। আমার ভালো লাগেনা। “
ইমদাদ কলির থুঁতনি ধরে আবারো কলিকে নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য করে বলল,
“এতটা নিশ্চিত হয়ে বলিস না কখনো যে আমার প্রেমে পড়া অসম্ভব। বলা যায় না কখনো হয়তো দেখা গেল তুই বাঁচার জন্য আমার ভালোবাসা ভিক্ষে চাইছিস!”
“তুমি চাও এটাই হোক তাই না? আমি তোমার কাছে ভালোবাসা ভিক্ষে চাইবো আর তুমি আমায় ছোট করবে এটাই তো তোমার উদ্দেশ্য? আমাকে সবার সামনে অপমান করেই তো তুমি শান্তি পাও তাই না?”
ইমদাদ কলির তুলনায় অনেকটাই লম্বা। কলি ইমদাদের কাঁধ সমান। কলির কানের কাছে ফিসফিসিয়ে কথাটা বলার জন্য ইমদাদকে একটু ঝুঁকতে হলো। ইমদাদের তপ্ত নিঃশ্বাস কলির গালে পড়তেই কলি একটু শিউড়ে উঠলো। ইমদাদ সেসব বুঝলো কিনা কে জানে। ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমি আবার দয়ালু মানুষ। সব সময় যে খালি হাতে তোকে ফিরিয়ে দেব এমনটা না। বলা যায় না, ভিক্ষে চাইলে হয়তো ভিক্ষে দিয়েও দিতে পারি।”