সকাল সাড়ে আট টা বাজে।
কুয়াশা কেটে সূর্য উদয়মান হচ্ছে পৃথিবীতে। বেড সাইড টেবিলে এর্লাম ঘড়িটা বাজতেই রৌদ্দুর জেগে গেলো। দুইস্তরের পর্দার ফাঁক গলিয়ে রোদ হাতছানি দিচ্ছে রুমের মেঝে জুড়ে। শরীরের উপর থেকে কম্পোটার সরিয়ে উঠে বসলো রৌদ্দুর। পাশে তাকিয়ে শুভ্রতা আর বেলি কে একবার দেখে নিলো সে। দুজনে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। বেলি ওদের মাঝে শুয়ে ছিলো। কম্পোটার ঠিক করে রৌদ্দুর নেমে পড়লো বেড থেকে।
কাল সন্ধ্যায় খেয়েছিলো তিনজনে। তারপর আর খাওয়া হয়নি। তাই রাতে ঘুমানোর আগে এর্লাম সেট করে রেখেছিলো রৌদ্দুর। যাতে শুভ্রতার আগে উঠতে পারে সে। জানলার কাছটায় এগিয়ে গিয়ে পর্দা ঠিক করে টেনে দিলো রৌদ্দুর। যাতে রোদের হাতছানিতে, শুভ্রতা বা বেলির ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটে।
পর্দা ঠিক করে ওয়াশরুমে ঢুকলো রৌদ্দুর। ওয়াশরুমে গিয়ে কালকের ওদের তিনজনের ছেড়ে রাখা পোশাক গুলো ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে। কাপড় গুলো ওয়াশ হওয়ার সময়ে সে শাওয়ার নিয়ে নিলো। পর পর পোশাক গুলো বালতি তে নিয়ে ছাদে এলো রৌদ্দুর।
রশিতে জামা - কাপড় গুলো মেলে ছাদ থেকে নেমে পড়লো রৌদ্দুর। রুমে ফিরে টাওয়াল ছেড়ে ট্রাউজার আর র্টি-শার্ট পরে নিলো সে। পারফিউমের তাক থেকে বেলি ফুলের পারফিউম টা নিয়ে শরীরে স্প্রে করে নিলো রৌদ্দুর।
শুভ্রতা তখনো উঠেনি। তা দেখে নিশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সে।
-----------
সদ্য ঘুম ভেঙেছে শুভ্রতার। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো সে। রৌদ্দুর কে পাশে না দেখে কিঞ্চিত থম মেরে বসে রইলো শুভ্রতা। অতঃপর দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেয়াল ঘড়ি খুঁজলো। বেডের পেছনের দেয়ালে মাঝারি আকারের একটা ঘড়ি আছে। তবে ভাগ্যে ক্রমে তা এখন বন্ধ। ব্যাটারি শেষ।
বেড থেকে নেমে ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরোলো শুভ্রতা। উপর থেকে ড্রয়িং রুমের চোখ বুলোয় সে। রৌদ্দুর কে কিচেনে দেখে নিচে নেমে এলো।
--" আমাকে ডাকেননি কেন?"
হঠাৎ শুভ্রতার কথায় পেছনে তাকালো রৌদ্দুর। শাল গায়ে জড়িয়ে কিচেনের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে শুভ্রতা। রৌদ্দুর মিষ্টি হাসলো।
--" তুমি ঘুমাচ্ছিলে। তাই ডির্স্টাব করিনি।"
--" কি করতে হবে বলুন? আমি সাহায্য করছি আপনাকে।"
দরজা থেকে সরে রৌদ্দুরের পাশে এসে দাঁড়ালো শুভ্রতা। উঁকি দিয়ে তাকালো চুলায় বসানো কড়াইয়ের দিকে। আলু ভাজি প্রায় হয়ে এসেছে। পাশেই হটপট রাখা। তার মানে রুটি ছ্যাকা শেষ। রৌদ্দুরের পাশ কাটিয়ে গিয়ে হটপট টা খুলে দেখলো শুভ্রতা।
--" আপনি পরোটা বানাতে পারেন?"
--" ওগুলো ফ্রোজেন।"
--" চা টা আমি করি?"
--" অবশ্যই!"
রৌদ্দুর চুলোর পাশ থেকে সরে দাঁড়ালো। শুভ্রতা পাতিলের করে পানি বসালো চুলাতে। রৌদ্দুর এগিয়ে গিয়ে উপরের কাউন্টার থেকে চা - পাতা, দুধ, চিনি নামিয়ে রাখলো কাউন্টারে।
--" আপনার চায়ে কতটুকু চিনি দিবো?"
--" তোমার হাতের মিষ্টতার ছোঁয়া থাকতে। আলাদা করে আবার চামচ গুণে চিনি দিতে হবে নাকি?"
শুভ্রতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো রৌদ্দুরের পানে। লোকটা মজা করছে নাকি তার সাথে? তেমন বয়স আছে নাকি এখন আর তাদের? জোর পূর্বক হাসলো শুভ্রতা।
--" মজা নিচ্ছেন?"
--" ভালোবাসার মানুষের সাথে মজা নেওয়ার মানুষ আমি না। তবুও তোমার কি মনে হলো?"
ব্যস্ত হাতে ফুটন্ত গরম পানিতে চা-পাতা ছেড়ে আনমনে জবাব দিলো শুভ্রতা।
--" জানি না।"
রৌদ্দুর কিচেন থেকে বেরিয়ে গেলো। শুভ্রতা সেদিকে একবার তাকিয়ে। সবজির চুলা বন্ধ করে বাটিতে সবজি বেড়ে নিলো। পর পর অভিজ্ঞ হাতে চা বানিয়ে দুজনের জন্য দুটো কাপে ঢেলে নিলো।
----------
ওয়াশরুম থেকে বেলি কে মুখ ধুইয়ে এনে বাচ্চাটাকে বেডের উপর দাঁড় করিয়ে দিলো রৌদ্দুর।
ব্যালকনিতে নেড়ে দেওয়া নিজের টাওয়াল টা এনে বেলির মুখের আর হাতের পানি মুছে নিয়ে; ভেজা টাওয়াল টা বেডের একপাশে রেখে দিলো সে। রৌদ্দুরের কাজগুলো ছোটো ছোটো চোখে দেখলো বেলি। টাওয়াল টা বিছানায় রেখে বেলি কে কোলে তুলে নিলো রৌদ্দুর। বাচ্চাটার কি হলো কে জানে? হঠাৎ রৌদ্দুরের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে।
আচমকা বেলি কে কাঁদতে দেখে অবাক হলো রৌদ্দুর। ঘাড় থেকে তুলে নিজের দিকে ফেরালো তাকে। মোলায়েম কন্ঠে রৌদ্দুর সুধালো;-
--" কাঁদছো কেনো মাম্মাম?"
--" আমাল বাবাল কতা মলে পলছে। বাবা আমালে আদল কলতো না।"
বেলির কথায় মুখ কালো হয়ে গেলো রৌদ্দুরের। তার বুঝতে বাকি রইলো না। মেয়ে টা মাহমুদের করা অবহেলার কথা মনে পড়তেই কাঁদছে। ছোটো বাচ্চাদের ব্রেইন সার্ফ থাকায় সহজেই কিছু ভোলে না। তেমনি এখন রৌদ্দুরের ভালোবাসা, স্নেহ দেখে মাহমুদের অবহেলার কথা মনে পড়ছে তার। রৌদ্দুর আলতো হাতের বেলির চোখের পানি মুছে দিলো।
--" আমি তোমারই বাবা সোনা মা! তুমি কাঁদলে তো বাবার কষ্ট হবে মা।"
রৌদ্দুরের কথায় এক মূহুর্তের জন্য থামলো বেলি। নাক টেনে ফের রৌদ্দুরের গলা জড়িয়ে ধরলো সে।
--" তোমি ত্ততিই আমাল বাবা? আমালে ভালুবাসবে তোমি?"
--" অবশ্যই মাম্মাম। তুমি আর তোমার মাম্মাম কে ভালোবাসার জন্যই তো আমার বেঁচে থাকা। তোমাদের না ভালোবেসে কাকে ভালোবাসবো?"
--" কাঁতলে বুকবে না তু? তাহুলে বেলি মাম্মা আবাল তলে যাবে।"
--" একদম না সোনা। তোমার মন খারাপ হলেই তুমি কাঁদবে। আর বাবা তোমাকে কোলে নিয়ে ক্যান্ডি কিনে দেবে। খুশি?"
--" এখল খুতি। কেন্তু পলে আবাল বেলি কাঁতবে।"
মেয়ের আহ্লাদি কন্ঠের কথায় মুচকি হাসলো রৌদ্দুর। নিজের কপালের সাথে চেপে ধরলো বেলির কপাল। নরম তুলতুলে শরীরের ছোট্ট মেয়েটি দুদিনেই কেমন রৌদ্দুরের সাথে মিশে গেছে। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেই তার মনে হয়। এইতো রৌদ্দুরের র*ক্ত। তার সন্তান। কে বলে, সন্তান হতে হলে নিজের আপন সন্তান হতে হবে?
এইতো তার শুভ্রতার গর্ভে ধারণা করা বাচ্চাটি তো তার ও।
-------------
বাগানে বসে খেলা করছে রৌদ্দুর আর বেলি।
শুভ্রতা কিচেনে দাঁড়িয়ে দুপুরের রান্না করছে। টমেটো দিয়ে ইলিশ মাছ আর পাঁচ মেশালি সবজি। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে জানলা দিয়ে রৌদ্দুর আর বেলি কে দেখছে শুভ্রতা। দুজনে ফুল গাছ রোপণ করছে বাগানে। তুষার গাছ গুলো নিয়ে এসেছিলো রৌদ্দুরের কথায়। সব শুভ্রতা কে ব্যস্ত রাখার প্রচেষ্টা।
যাতে মেয়ে টা সারাদিন বোরিং ফিল না করে। তুষার রৌদ্দুরের বন্ধু। এই কোয়ার্টারেই থাকে দুজনে। কাল যখন রৌদ্দুররা বাড়ি ফিরেছিলো। তখন তুষার ডিউটিতে ছিলো। সকালে এসেছিলো সে। নাশতা করে গাছ গুলো দিয়ে আবার ডিউটিতে চলে গেছে তুষার।
গাছ রোপণ করা শেষ রৌদ্দুর আর বেলির। কাদা মাখা হাতে বেলি কে কোলে নিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলো রৌদ্দুর। বেলি কে সোফায় বসিয়ে কিচেনে এলো রৌদ্দুর। শুভ্রতা কোমরে আচঁল গুঁজে খুন্তি দিয়ে তরকারি নাড়ছে। হঠাৎ রৌদ্দুরের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেলো।
কাদা সুদ্ধু হাতে পা টিপে শুভ্রতার পেছনে এসে দাঁড়ালো সে। ঝুঁকে অধর বাড়িয়ে টুপ করে চুমু খেলো রৌদ্দুরের বুক সমান শুভ্রতা ঘাড়ে। রৌদ্দুরের পুরুষালি ওষ্ঠের ছোঁয়ায় কেঁপে উঠলো শুভ্রতা। তরকারি নাড়তে থাকা হাত থেমে গেলো তার।
--" পাপা তোমি মাম্মা কে তুমু দিয়েতো। আমি দেকে পেলেতি।"
বেলির আধো কন্ঠে বলা কথায় চট করে পেছনে তাকালো শুভ্রতা, রৌদ্দুর দুজনে। চোখে হাত চেপে তাদের পেছনেই মেয়ে টা দাঁড়িয়ে। গাল জুড়ে দুষ্টু হাসি। মেয়ে কে হাসতে দেখে লজ্জা পেলো শুভ্রতা। রৌদ্দুর নিজেও হাসলো। উঁচু গলায় বললো সে,-
--" হ্যাঁ মাম্মাম, আসো তোমাকে ও চুমু দেই।"
--" আমালে দুটু তুমু দেভে। মাম্মাল থেকে বেতি।"
--" ওকে প্রিন্সেস।"