সে আমার আপন জন

পর্ব - ১০

🟢

দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়েছে বেলি আর রৌদ্দুর।

শুভ্রতা কিছুক্ষণ শুয়ে আবার উঠে পড়লো। শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে না তার। বাবা - মায়ের কথা মনে পড়ছে। হাতে স্মার্ট ফোনটাও নেই। যে বাবা কে একটা কল দিবে। মাহমুদ বাড়ি গিয়ে কোনো ঝামেলা করেছে কিনা কে জানে?

ধীর পায়ে উপর তলা থেকে নেমে এলো শুভ্রতা। পুরো বাড়ি শুনশান নীরবতায় নিমজ্জিত। আবছা রোদ এসে পড়েছে ড্রয়িং রুমে। তুষার সন্ধ্যায় ফিরবে বলেছিলো। সে নিচ তলায় থাকে। সোফায় বসে ল্যান্ড ফোন সামনে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো শুভ্রতা।

মন, মস্তিষ্কের দোলাচলে বাবা কে কল দিবে নাকি দিবে না। বুঝতে পারছে না। রৌদ্দুর কে তো বিয়ে করে নিয়েছে। কিন্তু বাবা মা কে কি বলবে। কথাটা শুনে ওনারা কেমন রিয়েক্ট করবেন?

সব মিলিয়ে মাথা কাজ করছে না শুভ্রতার। দোনামনা নিয়ে আনিস মৃধার নাম্বার তুলে কল দিলো সে। মূহুর্তের মধ্যে কল রিসিভ হলো। শুভ্রতা দাঁত খিচেঁ চোখ বন্ধ করে নিলো। ভয়ে তার অন্তর আত্মা শুকিয়ে আসছে।

--" হ্যালো? কে বলছেন?"

জেনিফার মৃধার কন্ঠে নড়েচড়ে বসলো শুভ্রতা। দু'হাতে ল্যান্ড ফোন কানে চেপে ধরা গলায় বললো;-

--" আমি আম্মু।"

মেয়ের কন্ঠ পেয়ে অবাক হলেন জেনিফার। আজ দুই দিন থেকে তার মেয়ে আর নাতনি নিখোঁজ। শত খুঁজে ও ওদের হদিস পাননি তারা। সেখানে এখন শুভ্রতার কল! চিন্তিত কন্ঠে জেনিফার সুধালেন;-

--" শুভ্রতা?"

--" বলো আম্মু?"

কথাটুকু শেষ করতে গিয়ে কেঁদে দিলো শুভ্রতা। বড্ড অসহায় লাগছে নিজেকে।

--" তুই কোথায় মা? বেলি কেমন আছে? বেলি কে টিকা দিতে গিয়ে হঠাৎ কোথায় চলে গেলি মা? তোর বাবা আর আমি তোকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান।"

--" আমি সিলেট আম্মু। বেলি ভালো আছে।"

--" সিলেট মানে? ওখানে কি করছিস তুই? কার সঙ্গে গেলি আম্মু। বেলি নানু ভাই কোথায়? ওকে ফোনটা দে তো।"

শুভ্রতা নিজেকে সামলালো। চোখ মুছে গলা পরিষ্কার করে শান্ত স্বরে বললো।

--" মাহমুদ আমাকে খুঁজছে আম্মু। তাই বাধ্য হয়ে পালিয়ে এসেছি। আমি চাই না আমার আর বেলির জন্য তোমাদের কোনো বিপদ হোক।"

--" কি বলছিস এসব? তুই আর বেলি আমাদের আপন জন মা। তোরা দুজন ছাড়া আর কে আছে আমাদের?"

--" ওই জানোয়ার টা আমার উপর নজর রাখছিল।"

মেয়ের কথায় আঁতকে উঠলেন জেনিফার মৃধা। জলদি বেডে বসে পড়লেন তিনি।

--" কেনো? তোকে তো ও নিজের ইচ্ছেতে ডির্ভোস দিয়েছে। তবে?"

শুভ্রতা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো;-

--" মাহমুদের বাবা ঢাকার ফ্ল্যাট টা বেলির নামে লিখে দিয়েছেন।"

--" কি বলছিস?"

--" ওর আঠারো বছর হওয়ার আগ পর্যন্ত আমার আর আমার স্বামীর নামে থাকবে। উকিলের পেপার এসেছিলো এক সপ্তাহ আগে। ডির্ভোসের আগে ই নাকি উইল করে ছিলেন উনি। সেটা দেখেই পাগল হয়ে গেছে মাহমুদ।"

--" তাহলে তোদের খুঁজে পেলে মাহমুদ কি করবে?"

--" কি আর করতো। আবার মিথ্যা বিয়ের নাটক করে আমাকে আর বেলি কে আটকে রাখতো। মেরে ফেলতে ও ভাবতো না। টাকার জন্য সব করতে পারে বদমাইশ টা।"

দীর্ঘ শ্বাস চাপলেন জেনিফার মৃধা। মেয়েটার বুঝি এই জন্মে আর শান্তি হলো না। পরক্ষণে কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে তিনি বললেন;-

--" ভালো কথা, তুই সিলেট কার কাছে আছিস। হোটেলে উঠেছিস নাকি?"

মায়ের প্রশ্নে ঢোক গিললো শুভ্রতা। চোখ বন্ধ করে এক দমে বললো।

--" আমি বিয়ে করেছি আম্মু।"

--" কি??"

--" হুমমম।"

--" কাকে?"

--" মেজর রৌদ্দুর শাহনাওয়াজ কে।"

রৌদ্দুর যে মাহমুদের বন্ধু তা চেপে গেলো শুভ্রতা। মায়ের চিন্তা বাড়তে পারে। কিন্তু সে এই দুই দিনে বুঝেছে। রৌদ্দুর আলাদা।

--" রৌদ্দুর? নাম টা শোনা শোনা লাগছে শুভ্রতা। তোর বাবার পরিচিত কেউ?"

--" মেজর তো, হয়ত সংবাদ পত্রে বা টিভিতে শুনেছো।"

--" কে জানি!"

--" আচ্ছা রাখছি আম্মু। বেলি উপরে ঘুমাচ্ছে। উঠে আমাকে না পেলে কাঁদতে পারে।"

--" বাড়ি আসবি কবে? তোর বাবা বেলির জন্য অস্থির হয়ে আছেন। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে।"

--" রৌদ্দুর কে বলে দেখবো। দেখি উনি কি বলেন!"

কল রেখে দিলো শুভ্রতা। সোফা ছেড়ে কিচেনে এসে চুলা জ্বালালো। মাথার বাম পাশ টা ব্যথা করছে। এক কাপ আদা চা পান করলে মাথা টা ছেড়ে আসতে পারে। পাতিলে করে পানি বসালো শুভ্রতা। ঘুম চোখে রৌদ্দুর কিচেনে প্রবেশ করে কাউন্টারে উঠে বসলো। শুভ্রতা তা দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলো।

--" আপনার হাতের এক কাপ চা দিবেন মিসেস শাহনাওয়াজ। মাথাটা ধরে আছে খুব।"

--" লেবু চা বানাচ্ছি।"

--" চলবে!"

শুভ্রতা ব্যস্ত হাতে কাপ নিলো। রৌদ্দুর গলা খেকাড়ি দিলো। পরিবেশ শীতল করতে সুধালো সে।

--" তোমার পরার শাড়ি টা কার জানো?"

--" না।"

--" জানতে চাও না কার?"

--" আপনার পার্সোনাল ম্যাটার।"

--" শাড়ি টা যেহেতু তুমি পরেছো। তাই তোমার জানার প্রয়োজন আছে।"

--" কার?"

--" বউয়ের, একদম নতুন শাড়ি। তুমি ই প্রথম পরেছো।"

ভ্রু - দ্বয় কুঁচকে নিলো শুভ্রতা। নিজের পরণের শাড়িটার দিকে তাকালো। লালের মধ্যে সোনালী জুরি সুতোয় কাজ করা জামদানি শাড়ি। রৌদ্দুর মুচকি হেসে শুভ্রতার আরেকটু পাশ ঘেঁষে বসলো। শুভ্রতা না পারতে প্রশ্ন করলো;-

--" আপনার বউ?"

শুভ্রতার প্রশ্নে লাজুক হাসলো রৌদ্দুর।

--" প্রশ্ন করলে কেনো? তুমি না বলছো আমার পার্সোনাল ম্যাটার।"

রৌদ্দুরের বাঁকা কথায়, কিচেন ছেড়ে চলে যেতে নিলো শুভ্রতা। ঠিক তখনই রৌদ্দুর তার হাতের কবজি টেনে ধরলো— অপ্রত্যাশিত, দৃঢ় এক টানে। শুভ্রতা থমকে গেলো। এক মুহূর্তের নীরবতা কাটিয়ে, ধীরে পেছনে ঘুরে তাকালো সে। চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে জমে থাকা না-বলা প্রশ্ন। হৃদয়ের গভীরে অদ্ভুত কাঁপুনি।

রৌদ্দুর বললো,

--" চলে যাচ্ছো যে?"

--" বেলির কাছে যাবো।"

--" বেলি ঘুমে, এখানে দাঁড়াও।"

--" কাজ আছে আমার।"

--" কার্বাডের শাড়ি গুলো মা আমার বউয়ের জন্য কিনেছিলেন। ভাবির জন্য প্রতিবার শাড়ি নেবার সময় আমার ওয়াইফের জন্য ও নেন। অনেক নিষেধ করেছি। কিন্তু মা শুনেনি। আর অদ্ভুত ভাবে শাড়ি গুলো তোমার ভাগ্যে চলে এলো।"

সে আমার আপন জন পর্ব ১০