এক সপ্তাহ পেরিয়েছে শুভ্রতা আর বেলি রৌদ্দুরের কোয়ার্টারে এসেছে যে।
নীলাঞ্জনা শাহনাওয়াজ সহ প্রত্যেকের সাথে ভিডিও কলে বেলি আর শুভ্রতার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে রৌদ্দুর। সবাই ওদের দুজন কে স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিয়েছেন। রৌদ্দুর যাতে শান্তি পায়। ওনারা তাতেই খুশি। শুভ্রতার জায়গায় অন্য কেউ হলে ও নীলাঞ্জনা আর তৈমুর মেনে নিতেন। ছেলে দুটো ছাড়া যে আর কেউ নেই ওনাদের। তাই ছেলেদের জীবন সঙ্গী বাছাই ক্ষেত্রে শেহরিশ আর রৌদ্দুরের মতামতকে প্রাধান্য দিয়েছেন দুজনে।
একই সাথে নীলাঞ্জনা আর তৈমুর শাহনাওয়াজ সামনের সপ্তাহের মধ্যে দেশে ফিরবেন বলেছিলেন। দেশে ফিরে ছেলের বউ আর নাতনির সাথে কিছুদিন থেকে যাবেন। সেই থেকে রৌদ্দুর বেশ খুশি।
ডিউটিতে জয়েন করেছে সে। সারাদিন ডিউটি শেষ করে রাতে বাসায় ফেরে রৌদ্দুর। অতঃপর খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এই রুটিনে চলছে ওদের জীবন। শুভ্রতা নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইছে। রৌদ্দুর তাকে বেশ সার্পোট করছে। নিজের বিবাহিত স্ত্রী হওয়া শর্তে ও শুভ্রতার কাছে স্বামীর অধিকার চায়নি।
এমন না যে শুভ্রতা তাকে নিষেধ করেছে। কিন্তু রৌদ্দুর নিজেই শুভ্রতা কে সময় দিচ্ছে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য। সারাজীবন তো পড়েই আছে। এই দিন গুলোর উপর নির্ভর করবে তাদের সামনের দাম্পত্য জীবন। শুভ্রতার ব্রেইন এফেক্ট পড়বে বর্তমানে রৌদ্দুরের করা প্রতিটা আচরণের। রৌদ্দুর বিশ্বাস করে।
--" নারীরা হচ্ছে ফুল। তাদের ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখলে মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়ায়। আর পায়ে পিষে দিলে বাজে গন্ধ ছড়ায়।"
--------------------
আজ শুক্রবার।
তাই সন্ধ্যার আগে, আগে রৌদ্দুর কোয়ার্টারে ফিরে এলো। কলিং বেল বাজতে দ্রুত পায়ে এসে শুভ্রতা দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই শুভ্রতার পানে লাল গোলাপের বুকে বাড়িয়ে দিলো রৌদ্দুর। শুভ্রতা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মৃদ্যু কন্ঠে রৌদ্দুর সুধালো;-
--" ফুলের বুকে টা নাও শুভ্র জান।"
থতমত খেয়ে গোলাপের বুকে টা হাতে নিলো শুভ্রতা।
--" অনুগ্রহ করে আপনার বাড়িতে এই আমাকে প্রবেশ করতে দিবেন ম্যাডাম।"
শুভ্রতা দরজার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে থেকে আনমনে বললো;-
--" ভেতরে আসুন।"
রৌদ্দুর এগিয়ে এলো। শুভ্রতা কে পাঁজাকোলে তুলে; পা দিয়ে ঢেলে দরজা বন্ধ করে দিলো। অতঃপর কৈফিয়তের স্বরে আওড়ায়;-
--" আপনি সরছেন না। তাই আপনাকে কোলে তুলে নিতে বাধ্য হলাম ম্যাডাম। প্লিজ আপনার মেজর হাজবেন্ড কে বলবেন না। আমি তাকে ভয় পাই।"
রৌদ্দুরের মুখভঙ্গিমার দিকে তাকিয়ে এক ঝলক লাজুক হাসি ফুটে উঠলো শুভ্রতার ঠোঁটের কোণে। সেই হাসির রেশ গাঢ় হতে না হতেই রৌদ্দুর তাকে সমেত ড্রয়িং রুমের সোফায় এসে বসলো। সংকোচের মিশ্র এক চেষ্টায় শুভ্রতা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলো তার কোল থেকে। কিন্তু রৌদ্দুর তাকে যেতে দিলো না; বরং নিঃশব্দ এক দৃঢ়তায় তাকে আপন করে ধরে রাখলো।
শেষ বিকেলের আলোয় ঘরের পরিবেশ যেন আর ও মোহময় হয়ে উঠলো। রৌদ্দুর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সোফায় পিঠ এলিয়ে দিলো। মুহূর্তটা সময়ের স্রোত থেকে খানিকটা আলাদা হয়ে স্থির হয়ে থাকলো। আর সেই স্থিরতার মাঝে শুভ্রতার লাজুক লাজুক হাসি রৌদ্দুর কে উন্মাদ করে তুললো।
হুট করে শুভ্রতার গলার নরম ভাঁজে মুখ দাবিয়ে দিলো রৌদ্দুর। শক্ত হলো তার হাতের বাঁধন। ছোটো ছোটো ভালোবাসার পরশ এঁকে দিলো গ্রীবায় আর গলায়। শুভ্রতা কেঁপে উঠলো। পরক্ষণে নিজেকে সামলাতে চাইলো। কিন্তু বেহায়া চোখ জোড়া বাঁধ মানলো না। শ্রাবণ ধারা নামলো কোমল গাল বেয়ে। রৌদ্দুরের ঘাড়ের উন্মুক্ত অংশে শুভ্রতার আঁখি জল গড়িয়ে পড়তে ধ্যান ভাঙলো তার। শুভ্রতার গলা থেকে চোখ তুলে তাকালো তার মুখে।
ফর্সা হওয়ার নিমিত্তে কান্না না করতেই তার নাক লাল হয়ে উঠেছে। তির তির করে কাঁপছে গোলাপি অধর জোড়া। ব্যতিব্যস্ত হয়ে রৌদ্দুর বললো;-
--" কি হয়েছে শুভ্র জান? কাঁদছো কেন মেয়ে? আমার ছোঁয়া তোমার কাছে বাজে লাগছে? বলো?"
কান্না মাখা কন্ঠে ঠোঁট উল্টে শুভ্রতা সুধালো;-
--" আমায় কেউ কোনো দিন ভালোবাসেনি রৌদ্দুর।"
--" আমি সারা জীবন ভালোবাসবো শুভ্র জান।"
--" কেউ কোনো দিন আগলে রাখেনি রৌদ্দুর।"
--" আমার জীবন দিয়ে আমি তোমাকে আগলে রাখবো।"
--" আমায় সবাই ঘৃণা করে রৌদ্দুর।"
--" আমি ভালোবাসি তো শুভ্র জান।"
রৌদ্দুর শুভ্রতার গাল মুছে দিলো। শুভ্রতার কান্না থেমে গেছে। আঁচলে চোখ মুছে কিছু মনে করে; শুভ্রতা বললো;-
--" শুভ্র তো ছেলেদের নাম। তাহলে আপনি আমাকে শুভ্র ডাকেন কেন?"
রৌদ্দুর বিস্তর হাসলো। কপাল চুলকে আওড়ালো;-
--" শুভ্র মানে সাদা। সাদা মানে শান্তির প্রতীক। আর তুমি আমার শান্তির কারণ। তাই তোমাকে শুভ্র জান ডাকি, ভবিষ্যতে ও ডাকবো।"
শুভ্রতা জবাব দিলো না। রৌদ্দুর ফের বললো;-
--" আমার সোনা বাচ্চা কই? কোথায় লুকিয়ে রেখেছো তাকে? নাকি আবার পেটে রেখে দিয়েছো?"
নির্ঝরিণীর ন্যায় স্মিত হাসলো শুভ্রতা।
--" আপনার বাচ্চা ঘরে ঘুমোচ্ছে।"
--" আচ্ছা, আমার মাম্মাম কে দেখবো। তার সাথে ফ্রেশ হয়ে আসবো।"
--" আমি খাবার বাড়ছি।"
রৌদ্দুর সোফা ছেড়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো। শুভ্রতা সোফা ছেড়ে উঠলো। তার মধ্যে ল্যান্ড ফোন টা বেজে উঠলো। ঝুঁকে ফোন তুলে কানে চাপলো সে।
--" হ্যালো?"
অপর পাশের মানুষ টা জবাব দিলো না। শুভ্রতা বিরক্তি চেপে বললো;-
--" কে বলছেন?"
--" হ্যালো প্রিটি লেডি।"
মাহমুদের কন্ঠ কর্ণকুহরে প্রবেশ করতে ই ফোনটা হাত খসে পড়ে গেলো শুভ্রতার। মেঝেতে ফোন পড়ার শব্দে রৌদ্দুর ব্যলকনিতে দাঁড়িয়ে পড়লো। চোখ ঘুরে নিজে তাকালো। গলা ছেড়ে ডাকলো সে।
--" হোয়াট হ্যাপেন শুভ্র জান? আর ইউ ওকে?"
শুভ্রতা জবাব দিতে পারলো না। তার প্যানিক আট্যাক হচ্ছে। হাত কাঁপছে। কন্ঠ রোধ হয়ে আসলো। শুভ্রতার জবাব না পেয়ে দোতলা থেকে নেমে এলো রৌদ্দুর। শুভ্রতার এমন অবস্থা দেখে দ্রুত পায়ে তার পাশে এসে বসলো। রৌদ্দুরের অস্তিত্ব বুঝতে শুভ্রতা ঝাঁপিয়ে পড়লো তার বুকে। রৌদ্দুর ও ঝাপটে নিলো তাকে।