সে আমার আপন জন

পর্ব - ৭

🟢

--" প্রেমে পড়লে মানুষ প্রিয় মানুষটার থেকে পালাতে চায়। লাজুক লাজুক কন্ঠে কথা বলে। সব তোমার মধ্যে ধরা দিচ্ছে শুভ্র জান। তুমি শেষ,"

রৌদ্দুরের ঘোর লাগা কন্ঠের কথায় কেঁপে কেঁপে উঠলো শুভ্রতা। রৌদ্দুরের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু রৌদ্দুর ছাড়লো না। বাঁকা হেসে আরেকটু নিজের সাথে চেপে ধরলো শুভ্রতা কে।

--" ছা..ছাড়ুন,"

--" যদি না ছাড়ি?"

--" ....... "

শুভ্রতা জবাব দিলো না।

--" এই ভাবে চেপে ধরে বুকের ভেতরে গুম করে দেই? বেলি কে বলবো তার মাম্মা চাঁদের দেশে ঘুরতে গেছে। তোমার অবগতির জন্য বলছি যে, সে কিন্তু তানভি কে খুব ট্রাস্ট করে।"

রৌদ্দুরের কথা শুনে ফিক করে হেসে দিলো শুভ্রতা। রৌদ্দুর ও হাসলো। কেমন বাচ্চা, বাচ্চা কথা বলছে মানুষ টা। হাসির মাঝেই রৌদ্দুরের শীতল হাত শুভ্রতার পিঠের খালি অংশে লাগতেই সে লাফিয়ে উঠলো।

--" আহ শীতইই।"

শুভ্রতা কে কাঁপতে দেখে যেনো মজা পেলো রৌদ্দুর।

--" আরেকটু ঠান্ডা হাত ছোঁয়াই তোমার পিঠে? তোমার পিঠ কিন্তু খুব উষ্ণ।"

শুভ্রতা ধড়মড়িয়ে সরে গেলো। সে সরতে যেতেই বিছানা টা কটমটিয়ে শব্দ করে উঠলো। রৌদ্দুর এইবারে শব্দ করেই হেসে ফেললো। ওদের দুজনের কাণ্ডে বেলি জেগে গেলো। চোখে হাত ঠলে মেয়ে টা হামাগুড়ি দিয়ে উঠে বসলো। ঘুম ঘুম চোখে বিরক্ত হয়ে বললো সে।

--" এমল হাসতো কেনু? বেলি ঘুমাত্তে দেখছু না?"

--" ভুল হয়ে গেছে প্রিন্সেস। এই নগন্য প্রজা কে ক্ষমা করা যায় না?"

--" তোমি হাসতিলে কেনু? আমালে ও বলু?"

রৌদ্দুর টেনে কোলে নিয়ে নিলো বেলি কে। উপরের দিকে ছুঁড়ে মেরে। ফের নিজের দু'হাতের মাঝে ধরে নিলো বেলি কে। শুভ্রতা শাড়ির আঁচল ঠিক করে বসলো।

--" তোমার মাম্মা চাঁদের দেশে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু সেই চেষ্টা করতে গিয়ে রকেট মিস হয়ে গেছে।"

বিচক্ষণ চোখে এদিক ওদিক তাকিয়ে রকেট খুঁজলো বেলি। কিন্তু ঘরে তারা ছাড়া শুধু একটা চেয়ার - টেবিল আছে। তা দেখে হতাশ ই হলো বেলি।

--" রকিট পেলে কোতায়? আমালে ডাকোনি কেনু?"

--" ওটা তোমার মাম্মার স্পেশাল রকেট মামনি। তোমাকে তো দেখানো যাবে না।"

বেলি এবার মায়ের দিকে তাকালো। শুভ্রতা চুপচাপ বসে আছে।

--" তোমাল রকিটে আমালে উইত্তে দিবে না তাম্মু?"

শুভ্রতা লজ্জা পেলো। বজ্জাত লোক টা কি সব শিখাচ্ছে মেয়েটাকে। এখন সে কি জবাব দেবে তার অবুঝ মেয়ে কে। যে রৌদ্দুর তার বক্ষবিভাজন কে ই রকেটের সাথে তুলনা করেছে? তাকে সেখানেই পাঠানোর ফন্দি ফিকির আটছিলো সে। উপায়ান্তর না পেয়ে গম্ভীর কন্ঠে সুধালো শুভ্রতা;-

--" এতো কথা বলো কেন? ঘুমোও রাত কয়টা বাজে দেখেছো?"

--" ঘুম ভেগে গেছু।"

--" এদিকে আসো আম্মু ঘুম পাড়িয়ে দিবো।"

শুভ্রতার আদেশ পেয়ে লক্ষী বাচ্চার মতো হামাগুড়ি দিয়ে তার কোলে চলে এলো বেলি। শুভ্রতা কম্বল সরিয়ে; বালিশ ঠিক করে মেয়ে কে শুইয়ে নিজে ও শুয়ে পড়লো। ওদের দুজন কে শুতে দেখে রৌদ্দুর ও শুয়ে পড়লো।

কড়া নিয়মে বাঁধা রুটিনে জীবন যাপন করার জন্য তার ঘুমে চোখ খুলে রাখা দায় হচ্ছে। বিছানায় পিট এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে পড়লো রৌদ্দুর। শুভ্রতা বেলি কে ঘুম পাড়িয়ে পাশ ফিরে রৌদ্দুরের দিকে তাকালো। কম্বল টা রৌদ্দুরের বুক থেকে গলা অব্দি টেনে দিয়ে নিজে ও ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিলো সে।

-------------

সকাল সাত টা বাজে। শীতের সকালের কোমল রোদ এসে তেচ্ছা ভাবে পড়লো রৌদ্দুর চোখে মুখে।

বিরক্তি নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বুকের উপর থাকা কোলবালিশ টা জড়িয়ে ধরলো সে। আচানক কিছু মনে পড়তেই রৌদ্দুর চোখ মেলে তাকালো। তার বুকের উপর এসে শুয়ে আছে শুভ্রতা। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে শুভ্রতার মুখের উপর পড়ে আছে। রৌদ্দুর ঘুম ঘুম চোখে মুচকি হাসলো। বেলি শুভ্রতার পিঠের নিচে এসে গালের নিচে হাত চেপে ঘুমিয়ে আছে।

রৌদ্দুর তৃপ্ত চোখে এই মনোরম দৃশ্য খানা পরোখ করলো। এই দৃশ্য দেখার জন্য পাক্কা পাঁচ বছর ধরে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। শুভ্রতার উপর কড়া নজর, পাশাপাশি মস্তিষ্ক আর হৃদয়ের কড়া যুদ্ধে। হৃদয় জয়ী হওয়ার পর আজ এই সুন্দর সকাল পেয়েছে সে। শুভ্রতা কে বুকের উপর থেকে সরানোর মতো বোকামি রৌদ্দুর করলো না।

বরং, সে আলগোছে শক্ত করে জড়িয়ে নিলো শুভ্রতা কে। শুভ্রতা নড়েচড়ে উঠলো। রৌদ্দুর দ্রুত চোখ বন্ধ করে নিলো। শুভ্রতা চোখ মেলে তাকালো। পিঠের উপর আড়াআড়ি ভাবে রৌদ্দুরের হাতের অস্তিত্ব টের পেতেই তড়িৎ বেগে মুখ তুলে, সরতে চাইলো শুভ্রতা। রৌদ্দুর ছাড়লো না। উপায় না পেয়ে রৌদ্দুর কে ডাকলো সে;-

--" এই যে শুনছেন? ছাড়ুন আমাকে।"

ঘুম জড়ানো কন্ঠে রৌদ্দুর আওড়ালো;-

--" কী হয়েছে?"

--" ছাড়ুন, "

রৌদ্দুর কথা না বাড়িয়ে হাত সরিয়ে নিলো। শুভ্রতা সরে উঠে বসলো। মেয়ে কে ঠিক করে শুইয়ে বিছানা থেকে নেমে গেলো সে। শুভ্রতা নামতেই রৌদ্দুর বেলির কাছে এসে শুলো। ডান হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে নিজের দিকে টেনে নিলো সে। বেলি ও ঘুমের মাঝে রৌদ্দুরের হাত জড়িয়ে ধরলো। শুভ্রতা ততক্ষণে দরজা খুলে রুম থেকে বেরিয়ে পড়েছে। যাওয়ার আগে দরজা টা ভেজিয়ে দিলো সে। রুম থেকে বেরোতেই বৃদ্ধের স্ত্রীর মুখোমুখি হলো শুভ্রতা।

--" তুমি উইঠা পড়ছো মা? জামাই উঠছে?"

--" না চাচি, সে এখনো ঘুমে।"

শুভ্রতা ধীর কন্ঠের কথায় তার দিকে তাকালো মহিলাটি। একবার পরোখ করে নিচু স্বরে বললেন ওনি;-

--" গোসল দিবা? নাকি হাত মুখ ধুইবা?"

--" না না, হাত মুখ ধুবো। চাপ কল পাড় টা কোনদিকে যদি একটু বলতেন?"

--" আমার সাথে আহো।"

--" আপনার নাম টা কি চাচি?"

--" তুমি আমারে তাইয়্যেবা চাচি ডাকতে পারুন।"

শুভ্রতা মিষ্টি হেসে ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো। কথার মাঝেই তারা দুজনে চাপ কল পাড়ে এসে দাঁড়ালো। কলের চার পাশে কাপড় দিয়ে বেড়া দেওয়া। শুভ্রতা কাপড় সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো। কল চেপে জগে পানি নিয়ে মুখে পানি ছিটিয়ে দিলো সে। পানির ছোঁয়া মুখে লাগতেই ঠান্ডায় চোখ মুখ কুঁচকে এলো শুভ্রতার। মুখ ধুয়ে কল পাড় থেকে বেরিয়ে শুভ্রতা যারপরনাই অবাক ই হলো। তাইয়্যেবা এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

--" আপনি এখনো দাঁড়িয়ে আছেন যে চাচি। আমি নিজেই তো ঘরে চলে যেতে পারতাম।"

--" সমিস্যা নাই আহো।"

কথা শেষে তাইয়্যেবা রসুই ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। শুভ্রতা ঘরের দিকে এলো। বাড়ির বাকি সবাই এখনো ঘুমে। বৃদ্ধ উঠেছে কিনা তা অজানা শুভ্রতার। দরজার পাশ থেকে সরে রৌদ্দুরের পাশে এসে বিছানায় বসলো সে।

--" এই যে শুনছেন? উঠুন। আমাদের বেরোতে হবে তো?"

--" মেজর সাহেব?"

দু'হাত দুদিকে উঠিয়ে আড়মোড়া ভেঙে রৌদ্দুর উঠে বসলো। শুভ্রতা সরে দাঁড়ালো। রৌদ্দুর বিছানা থেকে নেমে পড়লো। শুভ্রতা এগিয়ে এসে মেয়ে কে টেনে নিলো। কোলে নিয়ে আদুরে কন্ঠে ডেকে চুমু খেলো বেলির গালে।

--" মামনি, উঠে পড়ো। মাম্মাদের বেরোতে হবে তো সোনা।"

শুভ্রতার ডাকে নড়লো বেলি। ঘুম চোখে দু'হাত ঠলতে ঠলতে মায়ের দিকে তাকালো বাচ্চাটা। পর পর ফিচফিচে কন্ঠে সুধালো সে;-

--" কুথায় যাবো আম্মো তাম্মো?"

--" তোমার রৌদ্দুর আংকেলের সাথে মামনি।"

--" তানভিল সাতে কেনু যাবু?"

--" কারণ তানভির মামণি তুমি। মা কে তো ছেলের সাথে যেতেই হবে।"

রৌদ্দুরের মিষ্টি কন্ঠে হাত তালি দিয়ে উঠলো বেলি। শুভ্রতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো রৌদ্দুরের দিকে। লোকটা খুব ভালো। তার ভাবনার চেয়ে ও কয়েক গুণ ভালো সে। শুভ্রতার কোমল মন পিঞ্জরে প্রশ্নের খোঁচা লাগলো। তবে সারাজীবন কি এমন ভালো থাকবে রৌদ্দুর? নাকি মাহমুদের মতো পাল্টে যাবে। বাংলাতে, একটা প্রবাদ আছে। দুধ খেতে গিয়ে মুখে ছ্যাক লাগলে; মানুষ দধি ও ফুঁ দিয়ে মুখে নেয়। শুভ্রতার ও এখন তেমনি দশা। রৌদ্দুর কে ভালোবাসতে ও তার ভয় হচ্ছে। কান পাশে কেউ মন্ত্রণা দিচ্ছে।

--" মানুষ বদলায়। রৌদ্দুর ও তার বাইরে হতে পারে না। ও ওতো মানুষ।"

সে আমার আপন জন পর্ব ৭