সূর্য আকাশের বুক ছুঁই ছুঁই ওমন সময় বাস এসে থামলো কাউন্টারের সামনে। বাস আসতেই, বেলি কে কোলে তুলে বাসে উঠলো রৌদ্দুর।
তার পেছনে পেছনে উঠলো শুভ্রতা ও। মাঝের দিকটাতে তাদের সিট পড়েছে। শুভ্রতা কে জানলার পাশে বসতে দিলো রৌদ্দুর।
পর পর বেলি কে কোলে নিয়ে সে ও বসলো সিটে। দুজনের মাঝে জায়গা বাঁচিয়ে বসলো রৌদ্দুর। সিটে বসেই জানলা দিয়ে বাইরে তাকালো শুভ্রতা। একটু পরেই মাগরিবের আজান পড়বে। তার সাথে সাথে শুরু হবে বেলি কে নিয়ে তার জীবনের নতুন এক অধ্যায়। অথচ এই সময় তার ঘরে থাকার কথা ছিলো। দরজা - জানলা বন্ধ করে নামাজে দাঁড়াতো সে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মেয়ে কে বুকে নিয়ে অচেনা এক পুরুষের সাথে অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমিয়েছে সে।
বেলি জেগে উঠেছে। রৌদ্দুর তাকে কোলে বসিয়ে নিচু শব্দে কথা বলছে দুজনে। শুভ্রতা কান পাতলো সেদিকে। লোকটা কি কথা বলছে তা শোনার জন্য।
--" তোমি কে?"
বেলি কথায় ঠোঁট এলিয়ে হাসলো রৌদ্দুর। মেয়েটার চুল গুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে সুধালো সে;-
--" কে হতে পারি বলো তো?"
--" তানি না।"
--" আমি তানভি, তুমি?"
--" বেলি ফুল, মা ডাতে কেন্তু বাবাই বলে শতানের বাত্তা।"
বেলির আধো আধো কন্ঠের অভিযোগে বুকের বা পাশে চিন চিনে ব্যথা হলো রৌদ্দুরের। এতো মিষ্টি একটা বাচ্চা কে কেউ এসব ও ডাকতে পারে? তাও আবার নিজের বাচ্চা। আড় চোখে রৌদ্দুর তাকালো শুভ্রতার দিকে। মেয়ে টা মাথা নামিয়ে নিয়েছে। বেলি ফের কিছু বলার আগে শুভ্রতা রোদ্দুরের কোল থেকে নিয়ে নিলো তাকে। গরম কন্ঠে সুধালো সে;-
--" এতো কথা বলো কেন বেলি? ঘুমাও তুমি।"
--" আংকেল, আংকেল টা ভালু আম্মু। তোমি আমাকে বকতো কেনু?"
--" আর বকবো না মাম্মা। তুমি ঘুমাও।"
মায়ের কথায় আদুরে বিড়াল ছানার ন্যায় শুভ্রতার কোলে ঘাপটি মেরে শুয়ে পড়লো বেলি। শুভ্রতা শাড়ির আঁচল দিয়ে ঢেকে দিলো মেয়ে কে। রৌদ্দুর সবটা পরোখ করলো শান্ত চোখে। কিছুই বললো না সে।
--" ডির্ভোস হয়ে গেছে আপনার? নাকি ওই জাহান্নামে আবার ফেরার প্ল্যান আছে।"
--" আপনি জেনে কি করবেন? সঙ্গে এসেছি বলে কি মাথা কিনে নিয়েছেন?"
--" এখনো এতো ভালোবাসা হাজবেন্ডের প্রতি? বাহ, বেস্ট ওয়াইফ এওয়ার্ড টা আপনাকেই দেওয়া উচিত।"
--" একদম হিল্লে উড়াবেন না। আমি কিন্তু বাস থেকে নেমে যাবো।"
রৌদ্দুর হাসলো, শুভ্রতা কে রাগিয়ে দিতে তার ভালোই লাগছে। এমন খাঁটি সোনা ও নাকি কেউ পোড়া লাকড়ির গুঁড়োর ন্যায় উড়িয়ে দেয়।
--" ওকে, আই'ম সরি মিসেস....?
--" ...... "
--" নামটা অন্তত বলুন প্লিজ?"
--" মাহিরা জাহান শুভ্র..শুভ্রতা।"
--" আই'ম সরি মিসেস শুভ্রতা।"
--" মিসেস মিসেস করবেন না তো। কানে লাগছে।"
--" হাজবেন্ডের সাথে ডির্ভোস হয়েছে কিনা সেটা ও বলছেন না। আবার মিসেস ও কানে লাগছে। আমি কি করবো তাহলে?"
--" দিয়েছি ডির্ভোস, ডির্ভোস দিয়েই পালিয়েছি। শান্তি? এইবার দয়া করে চুপ করুন।"
রৌদ্দুর থেমে গেলো। শুভ্রতার মাথার উপর দিয়ে হাত এগিয়ে জানলা টা বন্ধ করে দিলো সে। ঠান্ডা বাতাস আসছে জানলা দিয়ে।
পর পর হুডির টুপি টা মাথায় দিয়ে সিটে পিঠ এলিয়ে দিলো সে।
------------
বাসের যাত্রীদের বিরতি দিতে; একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামলো বাস টা।
শুভ্রতা এতক্ষণ জেগেই ছিলো। মাথার উপর গুরু ভার নিয়ে কারো ঘুম আসে না। আসতে পারে না। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে একা একজন মেয়ে মানুষ বেঁচে থাকা কঠিন। শকুনের নজর পড়ে তার উপর। টাকা দিয়ে কিনে নিতে চায় সেই নারীর শরীর। শুভ্রতা সবটা জানে। কিন্তু কারো পায়ের জুতো হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো।
সব যাত্রীরা একে একে নেমে গেলো বাস থেকে। রৌদ্দুর কে এখনো জাগতে না দেখে শুভ্রতা আলতো হাতে চিমটি কাটলো তার বাহুতে। " আহহহ " করে চিৎকার করে হাত ডলতে ডলতে সোজা হয়ে বসলো রৌদ্দুর।
--" হোয়াট ওম্যান? চিমটি কাটছেন কেন?"
নিচু কন্ঠে শুভ্রতা সুধালো;-
--" যাত্রা বিরতি দিয়েছে।"
--" নামবেন?"
--" হু, বেলির ডায়পার চেন্জ করতে হবে।"
--" আচ্ছা চলুন, মাম্মাম আসো।"
রৌদ্দুর হাত বাড়াতেই চোখ ডলে রৌদ্দুরের কোলে ঝাঁপ দিলো বেলি। বেলি কে কোলে নিয়ে দাঁড়ালো রৌদ্দুর। শুভ্রতা শাড়ি টা ঠিক করে রৌদ্দুরের পেছন পেছন নেমে এলো। রৌদ্দুর এই দিক ওদিক তাকিয়ে দোকান খুঁজলো। সামনেই একটা ফার্মাসি খোলা। বেলি কে নিয়ে সেদিকে এগোলো সে। ফার্মাসির টুলটাতে গিয়ে বসলো রৌদ্দুর। পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো শুভ্রতা।
--" ওদিকে যাচ্ছেন কেনো? রেস্টুরেন্ট তো এই দিকে।"
--" আপনাকে চুরি করে নিবো যাবো।
তাই ওদিকে যাচ্ছি।"
--" আবার?"
--" বাবুর ডায়পার আছে আপনার কাছে?"
চুপসে গেলো শুভ্রতা।
--" ভাইয়া এক বোতল পানি দিন তো।"
লোকটা একটা পানির বোতল নিয়ে, রৌদ্দুর সামনে এগিয়ে দিয়ে সুধালো;-
--" উনি আপনার কি হয়?"
বোতলের চিপি টা খুলতে খুলতে নির্দ্বিধায় রৌদ্দুর জবাব দিলো;-
--" সে আমার আপনজন।"
একটু ও ভাবলো না রৌদ্দুর। যেনো উত্তর টা তার মুখস্ত ই ছিলো।রৌদ্দুরের এহেন উত্তরে চমকে তাকালো শুভ্রতা।