বোতলের চিপি টা খুলতে খুলতে নির্দ্বিধায় রৌদ্দুর জবাব দিলো;-
--" সে আমার আপনজন।"
একটু ও ভাবলো না রৌদ্দুর। যেনো উত্তর টা তার মুখস্ত ই ছিলো।রৌদ্দুরের এহেন উত্তরে চমকে তাকালো শুভ্রতা। গমগমে কন্ঠে দোকানীর দিকে তাকিয়ে সুধালো সে;-
--" মিথ্যা কথা, আমি ওনার কিছুই হয় না। আমরা অপরিচিত মানুষ।"
রৌদ্দুর এক ঢোক পানি খেয়ে মুচকি হাসলো। আজ কি তার হাসির রোগ হয়েছে নাকি? এতো হাসছে কেন, রৌদ্দুর নিজে ও বুঝলো না। সচরাচর রৌদ্দুর এতোটা হাসি না। বহু কষ্টে শুধু ঠোঁট টা বাঁকায়।
--" ভাবির সাথে ঝগড়া হইছে ভাই?"
--" এই আমি আপনাকে চিনি না, বলুন আপনি!"
রৌদ্দুর আরেক চোট হাসলো। গালের পানি টুকু গিলে সে মাথা দোলালো। যার অর্থ হ্যাঁ ও হতে পারে আবার না ও হতে পারে। শুভ্রতা তার মাথা নাড়ানো দেখে রাগে পুষে উঠলো। কিছু বলতে নিয়ে ও বললো না সে।
--" মাম্মাম তুমি পানি খাবে?"
রৌদ্দুর মাথা নামিয়ে কোলে থাকা বেলি কে প্রশ্ন করতেই সে ফিচফিচে কন্ঠে বললো;-
--" খাবু "
বোতলের চিপিতে পানি নিয়ে বেলির মুখে দিলো রৌদ্দুর। শুভ্রতা গজগজ করতে করতে রৌদ্দুরের পাশে এসে দাঁড়ালো। শাড়ির আঁচল টা টেনে ঢেকে
নিলো নিজের শরীরের অনাবৃত অংশ গুলো।
--" পানি খাবেন?"
--" না "
শুভ্রতার না শুনে বাকি পানিটুকু ও রৌদ্দুর নিজে খেয়ে নিলো। পর পর বোতল টা বিনে ফেলে সুধালো সে;-
--" ভাইয়া বাচ্চাদের ডায়পার দিন তো।"
--"আপনাদের বাচ্চা টা মাশাল্লাহ ভাই। দুজন ই সুন্দর মানুষ তো তাই।"
রৌদ্দুর ফের হাসলো। লোকটা তাক থেকে দুটো কোম্পানির ডায়পার বের করে রাখলো ওদের সামনে। রৌদ্দুর প্যাকেট দুটো বিচক্ষণ চোখে তাকিয়ে দেখলো। কিন্তু তার কাছে কোনো পার্থক্য ই লাগছে না। শুধু ছবির বাচ্চা দুটোর ছবি ছাড়া।
--" দুটো ই তো এক। এখানে পার্থক্য কি?"
--" একটা একটু কম দামী। আরেকটা বেশী দামী।"
--" ওও এই ব্যাপার? তাহলে আমাকে দামি প্যাকেটটাই দিন। দামিটা ই ভালো হবে।"
--" ভাই কি নতুন বাচ্চার বাবা হয়েছেন নাকি?"
দোকানির কথায় কেঁশে উঠলো রৌদ্দুর।
--" হু হু "
--" এই জন্যই তো বুঝতে পারছেন না।"
--" উনি কোনো বাপ টাপ না। এই বাচ্চা আমার, আমি ওর মা। আর আপনি এতো কথা জেনে কি করবেন? ডায়পার দিয়ে মুখ বন্ধ করুন।"
শুভ্রতার কঠিন কন্ঠের ধমকে লোকটা থেকে গেলো। বাকি টা সময় আর একটা কথা ও সে বললো না। টাকা মিটিয়ে শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে দাঁড়ালো রৌদ্দুর। শুভ্রতা এক প্রকার হেঁচকা টানে বেলি কে নিয়ে নিলো তার কাছ থেকে।
--" এমন করছেন কেন?"
--" আপনার কোলে বাচ্চা দেখে সবাই ও কে আপনার বাচ্চা ভাববে।"
--" তো?"
--" ও তো আপনার বাচ্চা না।"
ভেঙচি কাটলো রৌদ্দুর। শুভ্রতার পিছন পিছন হাঁটতে হাঁটতে বললো সে;-
--" এমন ভাব করছেন, যেনো কোনো ডাক্তার আপনাকে সার্টিফিকেট দিয়েছে। যে আমি কোনো দিন বাবা হতে পারবো না।"
--" আমি তা কখন বলেছি?"
--" আপনার কথার মিনিং তো তেমনি ঠেকলো আমার কাছে।"
--" একদম তর্ক করবেন না।"
--" ওকে তাহলে প্রেমের কথা বলি, বলবো বলি? শুনবেন?"
--" আপনিইই...."
কথা শেষ করতে পারলো না শুভ্রতা। তার আগেই শাড়িতে পা পেঁচিয়ে হোঁচট খেলো সে। দ্রুত পায়ে এগিয়ে রৌদ্দুর তার কনুই চেপে ধরলো।
--" অপরিপক্কতা নিয়ে একা দায়িত্ব নিতে যান কেন? পাশে তো একজন আছে। একবার হাত বাড়িয়ে দেখলেই পারেন।"
--" আপনি যান এখান থেকে।"
--" তাড়িয়ে দিচ্ছেন? কিন্তু আমি যাবো না।"
--" কেনো?"
--" কারণ তানভি দায়িত্ব ছেড়ে পালায় না।"
--" কে আপনার দায়িত্ব?"
--" আপনি আর বেলি ফুল।"
--" বললেই হলো?"
--" বাস মিস করতে চান?"
--" মানে?"
--" চলুন তাড়াতাড়ি।"
শুভ্রতার কোল থেকে বাচ্চাটাকে নিয়ে দ্রুত পায়ে রেস্টুরেন্টের দিকে এগিয়ে গেলো রৌদ্দুর। শাড়ির উপরে তুলে দ্রুত পায়ে রৌদ্দুরের পেছনে দৌড় দিলো শুভ্রতা।
রেস্টুরেন্ট এ ঢোকার মুখেই কাউন্টার। কাউন্টারে বসা লোকটাকে জিজ্ঞেস করে ওয়াশরুমের সামনে এসে থামলো রৌদ্দুর। মহিলা ওয়াশরুমের পাশেই পুরুষদের ওয়াশরুম।
--" বেলির ডায়পার একা চেন্জ করতে পারবেন? আমি হেল্প করবো ?"
--" পারবো।"
শুভ্রতার শক্ত কন্ঠের উত্তর পেয়ে বেলি আর শপিং ব্যাগ দুটোই শুভ্রতা কে দিয়ে দিলো রৌদ্দুর। শুভ্রতা ওয়াশরুমে ঢুকতেই; পর পর রৌদ্দুর নিজে ও ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো।
চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে পুরুষদের ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে মহিলাদের ওয়াশরুমের সামনে এসে দাঁড়ালো সে। কিছুক্ষণ পেরোতেই শুভ্রতা মেয়ে কে কোলে নিয়ে বেরিয়ে এলো।
--" সব ঠিকঠাক?"
--" হো হো আংকেল যাবু।"
শুভ্রতার জবাব দেওয়ার আগে জাপ্টে গিয়ে রৌদ্দুরের গলা চেপে ধরলো বেলি। ছোটো হাত জোড়া দিয়ে রৌদ্দুরের গাল চেপে শব্দ করে চুমু দিলো সে। বাচ্চা টা চুমু দিতে গিয়ে থুথু ও মেখে দিলো রৌদ্দুরের গালে।
--" তোমি কুব ভালু ভালু।"
--" তুমি ও মাম্মাম, পৃথিবীর সেরা বাচ্চা তুমি। আমার জান বাচ্চা।"
বেলি কে কোলে নিয়ে চেয়ারে গিয়ে বসলো রৌদ্দুর। শুভ্রতা তার সামনের চেয়ারটাতে বসলো। ওয়েটার আসতেই অর্ডার দিয়ে, বেলি কে নিজের সামনে টেবিলের উপর বসিয়ে দিলো রৌদ্দুর। বেলি হাত বাড়িয়ে রৌদ্দুরের কপালের চুল গুলো টেনে ধরলো দুহাতে; রৌদ্দুর মাথা নামিয়ে নিলো। মুঠো ভর্তি রৌদ্দুরের চুল ধরে আওড়ালো সে;-
--" তোমালে আমাল ভালু লেগেছে।"
--" তাই নাকি মামানি?"
--" হো হো, বেলি তোমাল কাতে থাকবে। ভালু আংকেল, তোমি কুব ভালু।"
শুভ্রতা ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলো। দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে তার চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো। শুভ্রতার একটাই আফসোস। মেয়েটা কোনো দিন বাবার ভালোবাসা পেলো না। মাহমুদ জন্মের পর থেকেই বেলি কে সহ্য করতে পারে না। বেলি মেয়ে কি না; তার তো অঢেল পয়সা। মেয়ে দিয়ে তার কাজ কি? সেই রেশ ধরেই মেয়ে কে ঘৃণা করতো মাহমুদ। সাথে সকাল দুপুর শুভ্রতার উপর অত্যাচার লেগেই থাকতো। বেলির আদুরে মুখটা ও সে কোনো দিন সুন্দর করে দেখেনি।
--" হারিয়ে গেলেন নাকি?"
--" পারলে হারাতাম ই, কিন্তু সামর্থ্য নেই যে।"
--" কে বললো? মানুষ চাইলেই সব সম্ভব।"
--" আমি তো শুধু মানুষ না। একজন মা ও, আমার যে অনেক দায়িত্ব।"
--" মায়েরা অনেক শক্তিশালী হয়।"