ঘরের ভিতর চকিতে রৌদ্দুর আর শুভ্রতা পাশাপাশিই বসে আছে। বেলি বৃদ্ধের স্ত্রীর কোলে। বাচ্চা টা এখনো ঘুমাচ্ছে। বৃদ্ধের পাশে ওনার মেয়ে আর ছেলে বসা। বিয়ের সাক্ষী হিসেবে ওদের দুজন কে রাখা হবে। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে টা এখনো অবিবাহিত। বৃদ্ধ গলা পরিষ্কার করে সুধালেন;-
--" ছাড়াছাড়ি হইছে কবে তোমার? তিন মাসের ইদ্দত পালন করছো?"
শুভ্রতা নড়েচড়ে বসলো। ধীর কন্ঠে জবাব দিলো সে;-
--" আর কিছু দিন পর সাড়ে চার মাসে পড়বে।"
--" তাইলে এখন পোলাইছো কেরে?"
এইবারে উত্তর দিতে চাইলো না শুভ্রতা। কিছু টা গুটিয়ে বসলো সে। রৌদ্দুর বুঝলো শুভ্রতা বিব্রত বোধ করছে। সে মিষ্টি হেসে বৃদ্ধ লোকটির উদ্দেশ্যে বললো;-
--" চাচা আপনি দয়া করে বিয়ে পড়ান না। আমার হবু বউয়ের মত পাল্টে যেতে পারে আবার। আমি সেই রিস্ক নিতে পারবো না।"
--" বিয়া পাগল।"
এইবারে ও রৌদ্দুর হাসলো। বৃদ্ধ লোকটা কলম নিয়ে খসখস করে কাবিন নামায় লেখা শুরু করলেন।
--" তোমার পুরা নাম কও!"
--" রৌদ্দুর শাহনাওয়াজ। বাবা, তৈমুর শাহনাওয়াজ। মা, নীলাঞ্জনা শাহনাওয়াজ।"
--" এই ছেরি তোমার নাম কও?"
--" মাহিরা জাহান শুভ্রতা। বাবা, আনিস মৃধা। মা, জেনিফার মৃধা।"
সব তথ্য লেখা শেষে সোজা হয়ে বসলেন বৃদ্ধ। শুভ্রতা কে কবুল বলতে বললেন। কিঞ্চিত কেঁপে কেঁপে কবুল বললো শুভ্রতা। রৌদ্দুর কবুল বলতে গেলে তার চোখ জোড়া লাল বর্ণ ধারণ করলো। ধরা কন্ঠে কবুল বলে পকেট থেকে রুমাল নিয়ে চোখ মুছলো রৌদ্দুর। মনে মনে কেবল আলহামদুলিল্লাহ পড়ছে সে। মানুষ যখন তার কাঙ্খিত কিছু জয় করে নেয়।
তখন তার খুশির সীমা থাকে না। রৌদ্দুরের ও এখন তেমন দশা। শুভ্রতা তার অনেক শখের। শত অপেক্ষার পুরস্কার সে।
---------
মাটির ঘরে চেরাগ বাতির আলো আঁধারিতে বসে আছে রৌদ্দুর। বেলি কে একপাশে শুইয়ে তার পাশে শুয়ে আছে শুভ্রতা। বেলি কে ঘুম পাড়াচ্ছে সে।
রৌদ্দুর চেয়ারে বসা। সামনে বাতি জ্বলছে। কারেন্ট নেই। চেয়ার ছেড়ে বিছানায় এসে বসলো সে। বিছানা টা ছোটো; জানলার পাশ ঘেঁষে রাখা। দুজনের জন্য ঠিক আছে। কিন্তু তিনজন শুতে গেলে শরীরের সাথে শরীর লেগে যাচ্ছে। শুভ্রতা রৌদ্দুর আর বেলির মাঝে শুয়েছে। রৌদ্দুর শুতে গিয়েই বাড়ি খেলো মাথায়। শুভ্রতা ফিক করে হেসে উঠলো, ওর অবস্থা দেখে। পর পর থেমে ও গেলো সে।
রৌদ্দুর শুভ্রতার দিকে একবার তাকিয়ে; কপালের উপর হাত চেপে সটান শুয়ে পড়লো। রৌদ্দুর শুতেই শুভ্রতা আরেকটু চেপে শুলো বেলির দিকে। সরতে গিয়ে ও বুঝলো, ওপাশে আর জায়গা নেই। ফের কাত হয়ে শুলো শুভ্রতা। তবুও রৌদ্দুরের বাহুতে গিয়ে তার পিঠ ঠেকছে। রৌদ্দুর সবটা ই বুঝলো কিন্তু নড়লো না সে। বরং ধীর কন্ঠে সুধালো;-
--" কেউ কি আমাকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে?"
হঠাৎ রৌদ্দুরের কন্ঠ পেয়ে নড়চড় থামিয়ে দিলো শুভ্রতা। নীচু মস্তকে জবাব দিলো সে;-
--" আমি লজ্জা পেতে যাবো কোন দুঃখে ?"
শুভ্রতার জবাবে অধর কামড়ে হাসলো রৌদ্দুর। ধীর লয়ে আওড়ালো সে;-
--" নতুন বউ যে, লাল শাড়ি দেইনি বলে কি লজ্জারাও পালিয়েছে নাকি? বাই দ্য ওয়ে, তোমার ব্লাউজ আর শাড়ির সাথের সব কিছুর মাপ দিও তো।"
এইবারে সত্যিই লজ্জা পেলো শুভ্রতা।
--" কি... কি করবেন ব্লাউজের মাপ দিয়ে?"
--" এক শাড়ি পরেই জীবন পাড়ি দিবে নাকি?"
--" এখন আপনি শাড়ি পাবেন কোথায়?"
--" বাজারে,"
--" প্রয়োজন নেই আপনার আনার। আমি নিজেই কিনে নিতে পারবে।"
--" ওয়ান সেকেন্ড, চাচার কাছ থেকে ফিতে এনে আমি নিজেই মেপে নিচ্ছি। তোমাকে বলা লাগবে না। ক্যাম্পে কিন্তু আমাদের সব শেখায়।"
পাশ ফিরে তড়িঘড়ি করে রৌদ্দুরের হাত টেনে ধরলো শুভ্রতা। লাজুক কন্ঠে সুধালো সে;-
--" ছিঃ ছিঃ, কি বলছেন এসব? আপনি এখন আমার পোশাকের মাপ নিবেন নাকি?"
--" নিলে সমস্যা আছে নাকি?"
--" হু, "
--" কি সমস্যা?"
রৌদ্দুর এক ভ্রু উঁচু করে সন্দেহের চোখে তাকালো শুভ্রতার দিকে। শুভ্রতা চোখ নামিয়ে নিলো। তবুও সে বুঝলো রৌদ্দুর এখনো তার দিকে তাকিয়ে।
--" এভাবে তাকাবেন না মেজর সাহেব!"
--" কেন ?"
--"......."
--" আমার তাকানো তে কি তোমার অস্বস্তি হচ্ছে শুভ্রতা? তাহলে আর তাকাবো না। আর যদি...!"
--" আর যদি কি?"
--" আর যদি লজ্জা পাও! তবে আমি এভাবেই তাকিয়ে থাকবো।"
না চাইতে ও হেসে ফেললো শুভ্রতা। হাত বাড়িয়ে চেপে ধরলো রৌদ্দুরের চোখ জোড়া। এই চোখ জোড়া বড্ড জ্বালাচ্ছে তাকে। সে খেয়াল করেছে, সারাদিন রৌদ্দুর স্বাভাবিক ভাবে তাকালে ও! বিয়ের পর থেকে রৌদ্দুরের চোখ জোড়া ভারি দুষ্টুমি করছে। ঘুরে ফিরে এসে তার উপর নিবদ্ধ হচ্ছে। এই যে তখন; বসে ছিলো চেয়ারে। কিন্তু তাকিয়ে ছিলো তার দিকে। অধর জোড়া ও কম যায় না। সে বার বার হাসছে শুভ্রতা কে দেখে।
--" আমি লজ্জা পাচ্ছি। খুব লজ্জা পাচ্ছি, এই যে দেখুন।"
--" চোখে হাত চেপে ধরলো দেখবো কিভাবে??"
হাত সরিয়ে অন্য দিকে ফিরে গেলো শুভ্রতা।
--" তোমার হাত টা একটু ধরি শুভ্রতা?"
বিনা বাক্যে ব্যয়ে শুভ্রতা হাত এগিয়ে দিলো রৌদ্দুর দিকে। রৌদ্দুর খুব যত্নে নিজের দু'হাতের মাঝে শুভ্রতার হাত টা নিলো।
--" এই যে হাত টা ধরলাম। ইনশাল্লাহ, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ আমার থেকে তোমাকে কেড়ে নিতে পারবে না শুভ্র জান। শুনেছি, মানুষের ভালোবাসা যদি সত্যিই হয়। তবে আল্লাহ্ নাকি দু'জন কে এক করে দেন। তুমি আর বেলি ফুল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। আমার উনত্রিশ বছরের জীবনে তুমি ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো নারীর দিকে অন্য নজরে তাকাইনি। ফিলিংস ই আসেনি। আমি অপেক্ষা করেছিলাম সঠিক সময়ের। এবং এখন সেই সময় ও এসেছে।"
রৌদ্দুর থামে, আবার শীতল কন্ঠে বলতে শুরু করলো সে।
--" আমাদের সম্পর্কের সমীকরণ পাল্টেছে। অল্প সময়ে অপরিচিত থেকে পবিত্র সম্পর্কে জড়িয়েছি। আশা রাখি তুমি আমাকে সাহায্যে করবে সব কিছু স্বাভাবিক করতে। তোমার আগের সব কালো স্মৃতি কাটাতে। আমি আবারো বলছি, রৌদ্দুর আর মাহমুদ এক না মেয়ে। সে তোমাকে দিয়েছিলো আকাশ সমান দুঃখ আর অসম্মান। কিন্তু রৌদ্দুর বেঁচে থাকতে পৃথিবীর সব সুখ, সম্মান তোমার পায়ের কাছে এনে লুটিয়ে দিবো। কেবল একটা ই আবদার আমার হয়ে থেকে!"
রৌদ্দুর কথা শেষ করে চুমু খেলো শুভ্রতার হাতের উপর পিষ্ঠে। শুভ্রতার চোখ ছলছল করছে। কান্না পাচ্ছে তার। আচানক রৌদ্দুর কে অবাক করে শুভ্রতা জাপ্টে ধরলো তাকে। বুকে মুখ গুঁজে হেঁচকি তুলে বললো সে;-
--" মাহমুদের আগে কেন আপনি আমার জীবনে আসেননি। তাহলে তো এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার হতো না। কেন নিজের ভালোবাসা কে পাঁচ বছর আগে কেড়ে নিতে পারেননি। শক্ত কন্ঠে বাবার সামনে এসে দাঁড়াতেন। একবার আমার হাত টা চেয়ে দেখতেন! হয়তো আল্লাহ্ আপনাকে তখনো সুযোগ দিতো।"
শুভ্রতার অভিমান ঝরা কথা শুনে ঠোঁট কামড়ে বিস্তর হাসলো রৌদ্দুর। আলগোছে শুভ্রতার পিঠের উপর একহাত রেখে অপর হাত মাথায় রাখলো। চুলের মাঝে ধীরে ধীরে বিলি কাটলো সে।
--" অভিমান হচ্ছে আমার উপর?"
তেমন ভাবে রৌদ্দুরের বুকে থেকেই মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝালো শুভ্রতা।
--" অভিমান থেকেই কিন্তু ভালোবাসার শুভ পরিণয় হয় মিসেস শাহনাওয়াজ! আপনি কি তা জানেন? তবে কি আপনি এই অধম আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছেন?"
--" জানি না। ঘুমাবো, "
ঘোর লাগা কন্ঠে রৌদ্দুর আওড়ালো;-
--" প্রেমে পড়লে মানুষ প্রিয় মানুষটার থেকে পালাতে চায়। লাজুক লাজুক কন্ঠে কথা বলে। সব তোমার মধ্যে ধরা দিচ্ছে শুভ্র জান। তুমি শেষ,"