রৌদ্দুরের মিষ্টি কন্ঠে হাত তালি দিয়ে উঠলো বেলি। শুভ্রতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো রৌদ্দুরের দিকে। লোকটা খুব ভালো। তার ভাবনার চেয়ে ও কয়েক গুণ ভালো সে। শুভ্রতার কোমল মন পিঞ্জরে প্রশ্নের খোঁচা লাগলো। তবে সারাজীবন কি এমন ভালো থাকবে রৌদ্দুর? নাকি মাহমুদের মতো পাল্টে যাবে। বাংলাতে, একটা প্রবাদ আছে। দুধ খেতে গিয়ে মুখে ছ্যাক লাগলে; মানুষ দধি ও ফুঁ দিয়ে মুখে নেয়। শুভ্রতার ও এখন তেমনি দশা। রৌদ্দুর কে ভালোবাসতে ও তার ভয় হচ্ছে। কান পাশে কেউ মন্ত্রণা দিচ্ছে।
--" মানুষ বদলায়। রৌদ্দুর ও তার বাইরে হতে পারে না। ও ওতো মানুষ।"
--" তলো মা, মুক ধুবো।"
বেলির ফিচফিচে কন্ঠে ধ্যান ভাঙলো শুভ্রতার। মেয়ে কে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো সে। রৌদ্দুর ফের এসে বিছানায় বসলো। বালিশের পাশ থেকে ফোন টা নিলো সে। কাল থেকে আর ফোন ধরেনি রৌদ্দুর। তাই ফোনে চার্জ আছে ষাট পার্সেন্ট। অনলাইনে সিলেটের বাসের দুটো টিকেট কেটে নিলো রৌদ্দুর। শুভ্রতা আর বেলি কে নিয়ে আজ কোয়ার্টারে ই উঠবে সে।
রৌদ্দুরের বাবা তৈমুর শাহনাওয়াজ আর মা নীলাঞ্জনা শাহনাওয়াজ আপাতত দেশের বাইরে আছেন। ব্যবসায়ের কাজে বছরের অর্ধেক সময় ই রৌদ্দুরের বড় ভাই, বাবা - মা দেশের বাইরে থাকেন। শেহরিশ কানাডায় পরিবার নিয়ে সেটেল। পাঁচ বছরের একটা ছেলে ও আছে তার। রৌদ্দুর কে ও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন ওনারা। কিন্তু নিজের প্রপোশন, দেশ, আর শুভ্রতার মায়া কাটিয়ে সে বিদেশ পাড়ি জমাতে পারেনি। পারেনি শুভ্রতা কে ভুলে দ্বিতীয় কোনো নারী কে সঙ্গীনি বানাতে।
গত বছর দেশে ফিরে ও রৌদ্দুর কে নীলাঞ্জনা বিয়ে করাতে চেয়ে ছিলেন। কিন্তু রৌদ্দুরের জেদের কাছে হার মেনে ফিরে গিয়ে ছিলেন তিনি। সেই রৌদ্দুর হুট করে শুভ্রতা কে বিয়ে করে নিয়েছে। এই কথা শুনলে মায়ের রিয়েকশন কেমন হবে তাই ভাবছে রৌদ্দুর। বেলি কে নিয়ে চিন্তা নেই তার। নীলাঞ্জনা সেকেলে মানুষ হলে ও ওনার মধ্যে ওতো মার প্যাঁচ নেই। শুভ্রতার দ্বিতীয় বিয়ে বা বাচ্চা নিয়ে ঝামেলা করবেন না তিনি। রৌদ্দুরের সুখ ই ওনাদের কাছে বড়। রৌদ্দুর যদি শুভ্রতার সাথে ভালো থাকে তাহলে নীলাঞ্জনা আর ওদের সংসারে নাক গলাবেন না।
--" তোমি কি ভাবছু তানভি?"
বেলি শুভ্রতার কোল থেকে নেমে ঠান্ডা হাত চেপে ধরলো রৌদ্দুরের দুই গালে। রৌদ্দুর তাকালো বাচ্চাটার দিকে। বেলি ও হাসি হাসি মুখে রৌদ্দুর কে দেখছে। দুষ্টু হেসে বেলির পেটে নাক দিয়ে গুঁতো দিলো রৌদ্দুর।
--" আমার প্রিন্সেস কে কিভাবে তার রাজত্বে স্বাগত জানানো যায় তাই ভাবছি।"
--" কে তোমাল প্রিছেন্স?"
--" তুমি।"
দু'হাত নেড়ে বেলি বললো;-
--" তা ভেভে কি পেলে?"
--" প্রিন্সেস আর কুইন কে তো কড়া নিরাপত্তায় রাখতে হয়। তাই তোমাকে আর তোমার মাম্মাম কে সেনানিবাসে নিয়ে যাবো।"
--" ওতা আবাল কি?"
--" গেলেই দেখতে পাবে।"
--" ওকানে কেন্ডি পাওয়া যায়?"
--" হ্যাঁ মাম্মা, অনেক ক্যান্ডি আছে। তোমার অনেক গুলো মিষ্টি আংকেল ও আছে।"
কথা শেষে বেলি কে কোলে নিয়ে শুভ্রতার নিকট এসে থামলো রৌদ্দুর। মুখ এগিয়ে শুভ্রতার কানের কাছে নিয়ে গেলো সে।
--" স্বামীর গৃহে যাবার জন্য কি আপনি প্রস্তুত মিসেস শাহনাওয়াজ? তবে বের হওয়া যাক?"
রৌদ্দুরের ধীর কন্ঠের কথায়; মাথা নুইয়ে নিলো শুভ্রতা।
--" চ...চলুন।"
-------------
উঠোনে বসে রোদ পোহাচ্ছেন বৃদ্ধ জয়নাল।
রৌদ্দুর বেলি কে কোলে নিয়ে ওনার সামনে এসে দাঁড়ালো। তার পেছন পেছন শুভ্রতা ও এলো। ওদের কে আসতে দেখে জয়নাল উঠে দাঁড়ালেন। রৌদ্দুর শান্ত স্বরে বললো;-
--" আমরা আসছি চাচা। কাল আশ্রয় দেওয়ার জন্য আমরা আপনার কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকবো।"
--" তোমরা এহনি চইলা যাইবা?"
--" জ্বি চাচা, না হয় বাড়ি ফিরতে ফিরতে মধ্যরাত হয়ে যাবে। আর বেলি কাল থেকে জার্নি করছে। আজ আবারো কুয়াশা ওর শরীরে লাগলে শরীর খারাপ করতে পারে। তাই এখনি বের হওয়া প্রয়োজন।"
শুভ্রতা ওনাদের কথোপকথনের মাঝে বললো:-
--" আমি চাচির সাথে দেখা করে আসছি। আপনি দাঁড়ান।"
শুভ্রতা রসুই ঘরের দিকে চলে গেলো। জয়নাল বেলির দিকে তাকালেন। কাল রাতে মেয়েটা আর ওর মার জন্য ই রৌদ্দুর কে থাকতে দিয়েছিলেন। নয়তো অপরিচিত কাউকে বাড়িতে রাখতে মোটেও ইচ্ছুক নন জয়নাল। পৃথিবীর মানুষ এখন বড় ই খারাপ। কাউকে সহজে বিশ্বাস করা বোকামির।
--" বাচ্চাটা আর ছেরিটারে ভালো রাইখো। দুখী মাইয়াটারে আর নতুন কইরা দুঃখ দিও না। কাল যেমনে জোর কইরা আপন করছো। ওমনে সারাজীবন বুকে বাঁইধা রাইখো। মাইয়া মানুষ ফুল গাছ। যত্ন পাইলে ডাল পালা বাড়ে। অযত্নে মরে যায়।"
রৌদ্দুর হাসলো, শুভ্রতা আর বেলি কে কষ্ট দেওয়ার মানেই হয় না। নিজের হৃদয়ে কেউ ছু*রির আঘাত করতে পারে নাকি? তার কাছে শুভ্রতা আর বেলি তার হৃদয়ের একপাশ। অপর পাশ বাবা - মা আর শেহরিশ। রৌদ্দুরের কাছে সম্পর্কের মানে খুবই দামী। যারা ভালোবাসার মানে বুঝে; তারা সম্পর্কের গুরুত্ব দিতে জানে। প্রতি টা সম্পর্ক কে আলাদা আলাদা ভাবে গুরুত্ব দেয়। রৌদ্দুর ও তেমন ই।
--" ওদের দুজন কে জীবন দিয়ে আগলে রাখবো চাচা। কথা দিলাম। এই নিয়ে চিন্তা করবেন না। সে আমার বহুকাঙ্খিত মানুষ। তার সন্তান কিংবা অতীত সেই ভালোবাসার বাঁধা হতে পারবে না। আমি হতেই দিবো না। আর বেলি আমার ই বাচ্চা। আমি তাকে খুবই ভালোবাসি।"
জয়নাল হাসলেন। ছেলেটা দায়িত্ব বান বটে। দেখে ও ভালো পরিবারের ছেলে ই মনে হচ্ছে।
--" নাশতা কইরা যাও। তোমার চাচি রে কইতাছি।"
--" না চাচা দোয়া করবেন। আজ আসি, আর আপনাদের বিরক্ত করতে চাইছি না।"
শুভ্রতা আসতেই তারা রওনা দিলো। জয়নালদের বাড়ি থেকে বাসস্ট্যান্ড এক ঘন্টার দূরত্বে। ভাগ্য ক্রমের ওরা একটু হাঁটতে ই রিকশা পেয়ে গেলো।
-----------
"জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট" শহরের ভেতরে আরেকটা শান্ত শহর।
ক্যান্টনমেন্টের গেট পেরোনোর সাথে সাথেই কোলাহল থেমে গিয়ে শুরু হয় এক অদ্ভুত প্রশান্তি। দু’পাশে সারি সারি উঁচু গাছ, ছায়ায় ঢাকা পরিষ্কার রাস্তা,
নিয়মিত চলাচল করা সেনা জীপ আর বাস। সবকিছুতেই শৃঙ্খলার আর শান্তির ছাপ। ডান দিকে অফিস ও ইউনিট এলাকা; বাম দিকে সৈনিকদের থাকার জন্য বিস্তৃত আবাসিক জোন।
রাত এগারোটা পেরিয়েছে। ক্যান্টনমেন্টের পরিবেশ একেবারে শান্ত। রৌদ্দুরদের গাড়ি টা গেটে এসে থামতেই একজন সিক্রিউরিটি গার্ড এগিয়ে এলো। রৌদ্দুর ওয়ালেট থেকে আইডি কার্ড দেখাতেই গেট খুলে দিলো সিক্রিউরিটি গার্ড। কার টা সোজা এসে থামলো রৌদ্দুরের দোতলা কোয়ার্টারের সামনে। ক্যাবের ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়লো ওরা।
বেলি কে এক হাতের বুকের সাথে চেপে ধরে দরজার তালা খুললো রৌদ্দুর। অন্ধকার হাতড়ে গিয়ে ড্রয়িং রুমের লাইট অন করতেই জ্বলজ্বল করে উঠলো সারা বাড়ি। শুভ্রতা বাম পা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। সে ভেতরে এসে দরজার ছিটকিনি টেনে দিলো। বাইরে অসম্ভব ঠান্ডা। হাত পা অবশ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রৌদ্দুর ততক্ষণে সিঁড়ির মাঝ বরাবর উঠে পড়েছে। পেছনে শুভ্রতা কে আসতে না দেখে ঘুরে তাকালো সে। শুভ্রতা এখনো দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করলো রৌদ্দুর;-
--" ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? উপরে আসো!"
--" আসছি।"
রৌদ্দুরের পিছন পিছন শুভ্রতা ও উপরে উঠে এলো। উপরে তিনটা রুম। দ্বিতীয় রুম টা রৌদ্দুরের। রৌদ্দুরের রুম টা ছিমছামের মধ্যে সাজানো। একটা দু পার্টের কার্বাড, ড্রেসিং টেবিল, স্টাডি টেবিল আর বিছানা। বিছানা টা রুমের মাঝে রাখা। রুমের উত্তর দিকে মাঝারি একটা বারান্দা। রৌদ্দুর এগিয়ে গিয়ে বেলি কে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে কার্বাড থেকে কম্পোটার নিয়ে গায়ের উপর টেনে দিলো তার।