সে আমার আপন জন

পর্ব - ১২

🟢

ডিসেম্বরের শীত। শেষ বিকেলের কুয়াশায় প্রকৃতি ঢেকে গেছে। মাত্র পাঁচ টা বাজলে ও মনে হচ্ছে মাগরিবের আজান পড়ে গেছে।

ক্যান্টনমেন্ট জুড়ে নীরবতা বিদ্যমান। এখানে যে এতো গুলো পরিবার আছে বোঝার তা উপায় নেই। মিনিট পনেরো কি বিশ পর এক দুই জন সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত নারী - পুরুষ দেখা যাচ্ছে। কেউ ডিউটি শেষে কোয়ার্টারে ফিরছে। তো কেউ ডিউটিতে যাচ্ছে। শুভ্রতার বেশ ভালো লেগেছে জায়গা টা। নিরিবিলি শান্ত সুন্দর জায়গা।

শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ কিছুই নেই। সবুজে ঘেরা এক অন্য জগত। চারপাশে দেয়ালের বেষ্টুনির উপর কাঁটা তারের বেড়া। পুরো এরিয়া জুড়ে গাছ পালা। রাস্তার দুই ধারে অসংখ্য বড় বড় গাছ সারিবদ্ধ ভাবে লাগানো।

ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্রতা। চোখ জোড়া সামনের বাগানে নিবদ্ধ। মুখ জুড়ে একরাশ ভয়। বেলি ছাদের মেঝেতে বসে খেলছে। রৌদ্দুর নিচে রুমে ঘুমাচ্ছে।

বাগান থেকে নজর ফিরিয়ে। চোখ বুঁজে, তখনকার ঘটনা টা আরেকবার মনে করার চেষ্টা চালালো শুভ্রতা। চোখের পাতায় ভেসে উঠলো এক ঘন্টা আগের ঘটনা গুলো।

------------

--" হ্যালো?"

অপর পাশের মানুষ টা জবাব দিলো না। শুভ্রতা বিরক্তি চেপে আবার বললো;-

--" কে বলছেন?"

--" হ্যালো প্রিটি লেডি।"

ফোনের অপর পাশ থেকে, মাহমুদের কন্ঠ কর্ণকুহরে প্রবেশ করতে ফোনটা হাত খসে পড়ে গেলো শুভ্রতার। মেঝেতে ফোন পড়ার শব্দে রৌদ্দুর ব্যলকনিতে দাঁড়িয়ে পড়লো। চোখ ঘুরে নিচে তাকালো। তবে এখান থেকে ড্রয়িং সাইট দেখা যায় না। তাই গলা ছেড়ে ডাকলো রৌদ্দুর।

--" হোয়াট হ্যাপেন শুভ্র জান? আর ইউ ওকে?"

রৌদ্দুরের ডাকে জবাব দিতে পারলো না শুভ্রতা। বহু দিন পর আজ আবার; তার প্যানিক আট্যাক হচ্ছে। হাত কাঁপছে। কন্ঠ রোধ হয়ে আসলো। শুভ্রতার জবাব না পেয়ে দোতলা থেকে নেমে এলো রৌদ্দুর। শুভ্রতার এমন অবস্থা দেখে দ্রুত কদমে তার পাশে এসে বসলো সে। রৌদ্দুরের অস্তিত্ব বুঝতে কোনো মতে শুভ্রতা ঝাঁপিয়ে পড়লো তার বুকে। আগলে ধরলো রৌদ্দুরের পিঠ।

রৌদ্দুর ও ঝাপটে নিলো তাকে। শুভ্রতা কে কিছুটা সময় দিলো রৌদ্দুর। কিছু নিয়ে বেশ ভয় পেয়েছে শুভ্রতা। বুঝতে পারলো সে। তাই আলতো হাত পিঠে বুলিয়ে কপালে চুমু খেলো। রৌদ্দুরের সান্নিধ্য পেতেই শুভ্রতার শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এলো। ধীরে ধীরে রৌদ্দুর কে ছেড়ে সোজা হয়ে বসলো সে। ট্রি - টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিলো শুভ্রতার পানে। এক ঢোক পানি খেয়ে বুকভরা শ্বাস টানলো। তবুও বুকের কাঁপুনি থামলো না। রৌদ্দুর সবটা শান্ত চোখে পরোখ করলো। পর পর আলতো কন্ঠে বললো;-

--" ভয় পেয়েছো কেনো শুভ্র জান?"

শুভ্রতা ঘাড় ঘুরিয়ে ভয়াতুর চোখে রৌদ্দুরের দিকে তাকালো। তার মুখাবয়ব স্বাভাবিক। অটল চোখে শুভ্রতাকেই দেখছে।

--" বলো?"

শুভ্রতা ঢোক গিললো। নিচু মস্তকে বলে উঠলো।

--" মা..মাহমুদ ক..কল করেছিলো।"

রৌদ্দুরের মুখশ্রী স্বাভাবিক থাকলো। যেনো সে জানে মাহমুদ কল দিবে। আর শুভ্রতা সেই কল দেখে খাবড়ে যাবে।

--" কি বললো?"

--" হ্যালো প্রিটি লেডি। এরপর, এরপর আর কিছু শুনতে পারিনি। আ..আমার ভয় করছে রৌদ্দুর।"

শুভ্রতার চোখে চোখ রেখে রৌদ্দুর মৃদ্যু হাসলো।

--" ফোন টা তুলে নাম্বারটাতে কল দাও।"

--" রৌদ্দুর?"

কাতর কন্ঠে রৌদ্দুর কে ডাকলো শুভ্রতা। সাথে কিছু টা পিছিয়ে বসলো সে। শুভ্রতার এমন কাজে রৌদ্দুর তার কপালের পাশের একটা চুল আঙুলে পেঁচিয়ে ধরলো। মুখ এগিয়ে শ্যাম্পুর ঘ্রাণ নিয়ে কোমল কন্ঠে সুধালো।

--" আমার উপর ভরসা নেই শুভ্র জান? এইটুকু কথা রাখবেন না মিসেস শাহনাওয়াজ?"

শুভ্রতা নড়েচড়ে বসলো। রৌদ্দুর উঠে গিয়ে ল্যান্ড ফোন তুলে নিলো। ল্যান্ডফোনের রিসিভারটা কানে রেখে ট্রান্সফরমার বাটনে চাপ দিলো। লাইনের ভেতর ক্ষণিকের জন্য যান্ত্রিক একটা শব্দ কেঁপে উঠলো। দ্রুত আঙুলে সে অন্য এক্সটেনশন নাম্বার টা ডায়াল করলো। ওপাশে কল ধরতে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে শুভ্রতার দিকে বাড়িয়ে দিলো ফোন।

শুভ্রতা ইস্তত হাতে ল্যান্ড ফোন কানে চাপলো। রৌদ্দুর অভয় দিলো তাকে শান্ত কন্ঠে কথা বলার। শুভ্রতা নিজেকে সামলে বলে উঠলো;-

--" হ্যালো?"

শুভ্রতার কথায় ক্ষীণ হাসলো মাহমুদ। তা স্পষ্ট বুঝলো শুভ্রতা। রৌদ্দুর ততক্ষণে তার পাশে এসে বসেছে। আড়ি পাতলো ফোনের কথায়।

--" হ্যালো, মিস বলবো? নাকি মিসেস শুভ্রতা বলবো?"

--" মানে?"

--" শুনলাম নতুন করে বিয়ে করেছো?"

--" কি বলতে চাইছেন?"

ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়লো মাহমুদ। ফোনটা কানের কাছ থেকে নামিয়ে মুখের সামনে আনলো। অতঃপর তাচ্ছিল্যের কন্ঠে বললো;-

--" রৌদ্দুর তোমাকে বিয়ে করেছে! কেনো? মেজর সাহেবের এখন আবার ঝুটা খাবার পছন্দ নাকি? তাও আবার নিজের বন্ধুর খাওয়া মাল?"

--" একদম মেজর সাহেব কে নিয়ে বাজে কিছু বলবেন না। তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না মিস্টার মাহমুদ।"

শুভ্রতার ঝাঁঝালো কন্ঠের প্রতি উত্তরে শব্দ করে হাসলো মাহমুদ। রৌদ্দুরের মুখের ভাব ও পরিবর্তন হলো।

--" খুব জ্বলছে বুঝি? দুদিনে এতো পরির্বতন? আমার থেকে বেশি সুখ দেয় নাকি?"

রৌদ্দুর এইবারে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। চোয়াল শক্ত করে শুভ্রতার কান থেকে ফোন টা কেড়ে নিলো। শক্ত কন্ঠে বাঁকা হেসে আওড়ালো সে;-

--" তোর মতো থার্ড ক্লাস নাকি সবাই? যে মেয়ে মানুষ দেখলেই কুকুরের মতো হামলে পড়বে?"

--" আরে বন্ধু যে!"

--" বন্ধুতের গুরুত্ব তুই বুঝিস?"

মাহমুদ কথা বদলে ফেললো। জবাব দিলো না রৌদ্দুরের প্রশ্নের।

--" কি যেনো বললি মাত্র? তবে কি বলতে চাইছিস? তুই পুরুষ না?"

রৌদ্দুর হাসলো,

--" যদি ভেবে থাকিস আমি গালি দিতে ভুলে গেছি। তবে তুই ভুল ভাবছিস! আমার শুভ্র জান পাশে বসা। মাম্মা ঘুমাচ্ছে। এখন আমি তো আর; এক বাচ্চার বাবা হয়ে সস্তা বস্তির মতো মুখের ভাষা খারাপ করতে পারি না। ইউ নো, আমার বউ টা শুধু শুধু খারাপ ভাববে।"

--" এক বাচ্চার বাপ? হাউ ফানি ওটা আমার বাচ্চা। বউ টাও আমার ছেড়ে দেওয়া।"

--" তোর বাচ্চা হলে সম্পত্তির লোভে, বউ বাচ্চা কে আটকে রাখতি না। শেষ বার ওয়ার্নিং করছি। সস্তা মুখে শুভ্রতা আর বেলি কে নিজের বলে দাবি করবি না। ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করে দিবো।"

রৌদ্দুর কথা শেষে কল কেটে দিলো। ফোন টা জায়গা মতো রেখে মুখে হাত চাপলো রৌদ্দুর। শুভ্রতা ভর্য়াত চোখে তাকে দেখছে। কি বলবে বুঝতে পারছে না।

--" রৌদ্দুর?"

মুখ তুললো না রৌদ্দুর। মাথা নামিয়ে রেখে ভরাট কন্ঠে সুধালো;-

--" সন্তান হতে হলে কি শুধু নিজের ঔরসের ই হতে হবে? ও তোমার অংশ; তুমি ও কে নয় মাস পেটে ধরেছে। স্তনের দুগ্ধ পান করিয়ে এতোটা করেছো। এটাই যথেষ্ট বেলি আমার সন্তান হওয়ার জন্য।"

সে আমার আপন জন পর্ব ১২