সে আমার আপন জন

পর্ব - ১৪

🟢

আজ ডিসেম্বরের সাত তারিখ!

আর পাঁচ টা দিনের মতোই নব এক ভোরের সূচনা হয়েছে শুভ্রতার জীবনে। প্রতিদিনের তুলনায় আজ আকাশ মেঘলা। শীত টা বেশ ঝাঁকিয়ে বসেছে ধরনীতে। ডিসেম্বরের শুরু বলে শীত বাড়ছে। কিন্তু আকাশ ও মেঘলা। শীতের মধ্যে ও বৃষ্টি হবে নাকি? কাল রাত থেকে আকাশ কেমন গুমোট বেঁধে আছে।

এমনকি সূক্ষ্ম চোখে তাকালে দেখা যাবে। আকাশ থেকে বিন্দু বিন্দু ফোঁটায় শ্রাবণ ঝরছে। কিচেনে দাঁড়িয়ে শীতের পিঠা বানাচ্ছে শুভ্রতা। তুষার সকাল সকাল বেরিয়ে তাকে; তাজা রস আর গুড় এনে দিয়ে ছিলো। শুভ্রতা কাল রাতে রৌদ্দুর বেরোনোর পর তাকে বলেছিলো রস, গুড় এনে দেওয়ার কথা।

চিতই পিঠা, গুড় আর দুধের মিশ্রণে ভিজিয়ে।

আরেকটা ভাপা পিঠা ভাপে দিলো শুভ্রতা। আজ দুপুরের মধ্যে রৌদ্দুর ফিরবে। তার জন্যই এতো আয়োজন। ভাপা পিঠা ভাপে দিয়ে দ্রুত পায়ে ড্রয়িং রুমে এসে ঘড়ি দেখলো শুভ্রতা। মাত্র আট টা বাজে। রৌদ্দুর ফিরবে কখন? দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে আবার চুলার ধারে এসে দাঁড়ালো সে। কাল রৌদ্দুর বাড়ি থেকে বেরোনোর পর থেকে তার মন ছটফট করছে।

এমন কি কাল রাতে শুভ্রতা ঘুমাতে পর্যন্ত পারেনি। একটু পর পর ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো। ফোন হাতে নিয়ে ঘড়ি দেখেছিলো সে। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর ঘটেছে আরেক বিপদ। সপ্তাহ দুই আগে রৌদ্দুর তাকে একটা ডায়মন্ড নোজপিন এনে দিয়েছিলো। এতোদিন ঠিক ছিলো। কিন্তু আজ সকালে মুখ ধোঁয়ার সময়; হুট করে নোজপিন টা খুলে হারিয়ে গেলো। তারপর, নোজপিন টা এতো খুঁজলো শুভ্রতা কিন্তু পেলোই না। অতঃপর মন খারাপ করে সেই নোজপিনের আশা ছেড়েছে সে।

সেই নিয়ে ও খুঁত খুঁত করছে তার মন। শুভ্রতা এসব কুসংস্কারে বিশ্বাসী না। তবুও বার বার মনে পড়ছে নোজপিন হারানোর কথাটা। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে এঁটো বাসন গুলো ধুয়ে নিলো সে। ড্রয়িং রুম গুছিয়ে পরিপাটি করলো। এমনকি শীতের মধ্যে কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে। রৌদ্দুরের রোপণ করা। বাগানের গাছ গুলোতে ও শুভ্রতা পানি দিয়ে এসেছে।

পিঠে বানানো শেষ। সময় আটটার কাঁটা পেরিয়ে নয়টাতে পৌঁছেছে। শুভ্রতা সব কাজ শেষ করে টিভি ছেড়ে সোফায় বসলো।

আচানক ব্যস্ত পায়ে নিজের রুম থেকে বেরোলো তুষার। চারদিকে এলোমেলো পলক ফেলে সোফার দিকটাতে গিয়ে তার দৃষ্টি থামলো। নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক করে শুভ্রতার দিকে এগিয়ে এলো তুষার। শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলো সে;-

--" আপনি নাশতা করেছেন ভাবি? বেলি চাচ্চু কই? ঘুম থেকে উঠেছে সে?"

তুষারের কন্ঠে টিভির ভলিউম কমিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো শুভ্রতা। তুষারের মুখ ফ্যাকাশে। শীতের মধ্যে কপাল জুড়ে ঘাম চিকচিক করছে। ভয় বাড়লো শুভ্রতার। মনে খারাপ চিন্তা আনতে চাইলো না সে। কিন্তু মানব মন চিন্তার আখড়া। একবার যা মস্তিষ্কে ঢুকে তা সহজে ভুলতে চায় না। ভাবনা রেখে, মৃদ্যু স্বরে শুভ্রতা সুধালো;-

--" বেলি ঘুমিয়ে আছে। কেনো ভাইয়া? কিছু হয়েছে?"

এক হাত কোমরে রেখে অপর হাত কপালে চাপলো তুষার।

--" আপনি নাশতা করেছেন?"

--" না,"

--" খিদে পেয়েছে। বেলি কে উঠিয়ে নিয়ে আসুন। নাশতা খাবো আমরা।"

কথাটা বহু কষ্টে শেষ করলো তুষার। তার গলা কাঁপছে। ঠোঁট জোড়া বার বার শুকিয়ে আসছে। এর মধ্যে তার ফোনটা বেজে উঠলো। তুষার দ্রুত পায়ে রুমের দিকে চলে গেলো। যাওয়ার আগে ব্যস্ত কন্ঠে বলে গেলো সে;-

--" বেলি চাচ্চু কে উঠিয়ে নিয়ে আসুন ভাবি। আমরা পিঠে খাবো এক সাথে।"

--" কিন্তু?"

--" কোনো কিন্তু না ভাবি। দয়া করে নাশতা খেতে বসুন। আমি আসছি।"

তুষার যেতে টিভি বন্ধ করে উঠে পড়লো শুভ্রতা। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো সে। তুষারের আচরণ দেখে চিত্তে অস্থিরতার ডাল পালা ছড়িয়ে পড়েছে। রৌদ্দুর বাড়ি না ফেরা অব্দি এই অস্থিরতা কাটবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে রৌদ্দুর কে নিজের চোখে দেখছে। রৌদ্দুরের শরীর ঘ্রাণ পাচ্ছে না। ততক্ষণ এমন চিন্তা নিয়ে থাকতে হবে।

রুমে ফিরে বেডে তাকালো শুভ্রতা। তার বাম পাশের জায়গা টা খালি। রুম টা কেমন খা খা করছে রৌদ্দুর কে ছাড়া। যেনো তাকে শ্বাস গ্রহণ করতে দিয়ে; হৃদপিন্ড কেড়ে নিয়েছে। আলগোছে বালিশের পাশ থেকে ফোন নিয়ে রৌদ্দুর কে কল দিলো শুভ্রতা। কল ঢুকলো না।

ফোন রেখে বেলির পাশে বসলো সে। মেয়ের চুলে বিলি কেটে ধীরে ডাকলো শুভ্রতা;-

--" বেলি মা? উঠো সোনা মা। সকাল হয়ে গেছে। চাচ্চুর তোমার সাথে নাশতা করবে বলে অপেক্ষা করছে।"

বেলি নড়ে চড়ে শুলো।

--" উঠো আম্মু।"

শুভ্রতার ডাকে হালকা হয়ে এলো বেলির ঘুম। চোখ ডলে আড়মোড়া ভেঙে ছোটো ছোটো চোখে মায়ের দিকে তাকালো সে।

--" বাবা এতেতে? তাহলে আমি উতবে।"

বেলির প্রশ্নে মলিন মুখে শুভ্রতা জবাব দিলো;-

--" না আম্মু তোমার বাবা আসেনি।"

--" কেনু?"

--" তোমার বাবা পাহাড়ে মিশনে গিয়েছেন। মিশন শেষে বাড়ি ফিরবেন।"

--" তাহুলে আমি ও তকল উতবে।"

--" জেদ করে না বেলি। উঠো, তোমার চাচ্চু অপেক্ষা করছেন তোমার জন্য।"

বেলি ফের কম্পোটার টেনে নিলো মুখের উপর। কাত হয়ে শুতে শুতে বললো সে;-

--" বাবা কে আততে বলু। ফুন দেউ তাকে।"

--" তোমার বাবা ফোন ধরছে না।"

--" আমি উতবো না।"

শুভ্রতা কথা বাড়ালো না। মেয়ে টা রৌদ্দুরের আস্কারা পেয়ে পেয়ে বড্ড জেদী হচ্ছে। রৌদ্দুরের জন্য তাকে কিছু বলা ও যায় না। কিছু বলতে গেলেই রৌদ্দুরের পেছনে লুকিয়ে পড়ে। রৌদ্দুর না থাকলে সেই দায়িত্ব তুষার পালন করে।

ওদের সবার মাঝে পড়ে। শুভ্রতার হয়েছে যতো জ্বালা। ফের রুম ছাড়লো সে। রান্না বসানো লাগবে।

-------------

--" মেজর শাহনাওয়াজের দেহ এসে পড়েছে?"

তুষারের বলা কথাটা কর্ণকুহরে প্রবেশ হতেই; হাত থেকে চায়ের কাপ টা ছেড়ে দিলো শুভ্রতা। কাপ ভাঙার শব্দে ফোন কান থেকে সরিয়ে। তড়িৎ বেগে ঘুরে দাঁড়ালো তুষার। শুভ্রতা কে দেখে আঁতকে উঠলো সে।

--" ভাবি?"

কাঁচ ভাঙা মাড়িয়ে সামনে এগোলো শুভ্রতা। তির তির করে তার অধর জোড়া নড়ছে।

--" রৌদ্দুর দেহ এসেছে মানে? কি বললেন ভাইয়া?"

তুষার কল কেটে ফোন পকেটে চালান দিয়ে এগিয়ে এলো শুভ্রতার পানে। দুই হাত সামনে এগিয়ে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললো।

--" আপনি অস্থির হবেন না ভাবি।"

--" আপনি কি বললেন আবার বলুন?"

--" রৌদ্দুর একটু আঘাত পেয়েছে। সেই নিয়ে কথা বলছিলাম। বেলি উঠেছে?"

শুভ্রতার বিশ্বাস হলো না রৌদ্দুরের কথা। তার কানে ঝনঝন করে বাজতে থাকলো কাল রৌদ্দুরের বলা কথা টা।

--" হাসি মুখে বিদায় দেবে না শুভ্র জান? যদি মিশন থেকে আর না ফিরি। তখন তোমার কষ্ট হবে না?"

উদভ্রান্তের ন্যায় শুভ্রতা সুধালো;-

--" ভাইয়া সত্যি করে বলুন রৌদ্দুরের কি হয়েছে?"

--" বললাম তো, রৌদ্দুর আঘাত পেয়েছে ভাবি। আপনি শান্ত হোন। সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাল্লাহ।"

--" আমার বিশ্বাস আপনার কথা হচ্ছে না। আমার থেকে কি লুকাচ্ছেন ভাইয়া?"

ঠোঁট ভেঙে শুভ্রতার কান্নারা বাঁধ ভাঙতে চাইলো। মস্তিষ্ক ফাঁকা ঠেকলো তার। খারাপ কিছু ভাবতে চাইছে না তবুও মনে খারাপ ভাবনারা হানা দিচ্ছে। হুট করে এম্বুলেন্সের সাইরেন কানে লাগতে দুই পা পিছিয়ে গেলো শুভ্রতা। তুষার বুঝলো শুভ্রতা কাঁপছে। শুভ্রতা হাত এগিয়ে দেয়াল ছোঁয়ার আগেই লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে। তুষার ছুটে এসে ও ধরতে পারলো না তাকে।

শুভ্রতার কানে বেজে উঠলো রৌদ্দুরের বলা কথাগুলো।

--" বেলি মাম্মা কে নিয়ে ভালো থাকবেন মিসেস শাহনাওয়াজ। আপনাদের দুজন কে আমি নিজের থেকে ও বেশি ভালোবাসি।"

সে আমার আপন জন পর্ব ১৪